




ফাল্গুনের রোদে ঠাকুমা পাকা তেঁতুল শুকুতে দিত। সারাদিন ধরে বাড়িতে চলে তেঁতুল নিয়ে নাড়াচাড়া। গোটা ফাল্গুন মাস জুড়ে সে এক মহা হৈহৈ-রৈরৈ ব্যাপার। সে ছিল রূপেনদের তেঁতুল উৎসব। আর এখন, শহর থেকে বাড়ি ফিরে রূপেন দেখে, তেঁতুলের বদলে তার ঠাকুমার পাশে চুপ করে বসে আছে রায় পাড়ার মিনতি রায়।
মিনতি রূপেনের চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। ছোটবেলায় একসঙ্গে খেলা, একই স্কুল, বাড়িতে যাতায়াত—ইত্যাদি কারণে ওর সঙ্গে রূপেনের প্রেম হয় ও পরে ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। যতদূর মনে পড়ে ক্লাস সেভেন থেকে মাধ্যমিক অবদি তাদের এই সম্পর্কটা নানাভাবে টিকে ছিল। পরে সময়ের দাবি মেনে তা একদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন মিনতির বয়স বত্রিশ-তেত্রিশ হবে। ইতিমধ্যে ওর দুবার বিয়ে হয়েছে। প্রথম বরটা সাপের কামড়ে মারা যায়। ছেলেটা রেলে চাকরি করত। অবস্থাপন্ন পরিবার। মিনতি ধরেছিল বেশ। সেই পক্ষের একটি ছেলে হয় মিনতির। কিন্তু স্বামী মারা যেতে ওরা ছেলেটাকে রেখে মিনতিকে আর থাকতে দেয়নি। বাপের বাড়ি ফিরে আসে মিনতি।
মিনতির বাপের অবস্থা ভালো নয়। আগেও ছিল না, এখনও নয়। মিনতি মাধ্যমিক পাশ করেছিল কিনা এখন আর মনে নেই রূপেনের। তবে ও ক্লাস টেনে উঠেছিল, এটুকু মনে আছে তার। মিনতি ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকেই তাদের সম্পর্কের মধ্যে এক শৈত্যতা শুরু হয়, সেটা কেন, তা আজ আর ভালো করে মনে পড়ে না রূপেনের। দীর্ঘদিন পরে মিনতিকে দেখে অতীতের কথা মনে পড়ল তার। গা-টা শিরশির করে উঠল। মিনতির আগেই যথেষ্ট ঝাঁঝ ছিল, এখন তার চেহারায় তাকানোয়, কথার ভঙ্গিমায় সেই ঝাঁঝাঁলো ভাবটা এতটা বেড়েছে যে রূপেনের মনে হল, আগে সেটা অসচেতনভাবে ওর মধ্যে ছিল—এখন তা সচেতনভাবে নিজের দেহের সঙ্গে, মনের সঙ্গে ব্যভার করে মিনতি। ফলে যৌনতার এমন ব্যভার ওর সারা গা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। মিনতি কালো। খুবই কালো। কিন্তু চেহারার টান এমনই, তাতে হাঁ করে তাকিয়ে দেখতে হয়।
প্রথম স্বামী মারা যাবার ও বাপের বাড়ি ফিরে আসার তিন বছর পরে মিনতি আবার বিয়ে করে। এটিও প্রেম করে বিয়ে। কিন্তু এটা সে ঠিকঠাক ধরতে পারেনি, অর্থের প্রাচুর্য দেখে ঝুলে পড়েছিল। এই বিয়েটা ও টেঁকাতে পারেনি। একটি ছেলে কোলে বাপের ভিটেতে সে ফের ফিরে এসেছে। এখনও কোনো কাজকর্ম পায়নি। তাই সময় কাটাতে এপাড়া-ওপাড়া ঘোরে আর মাঝেমাঝে রূপেনের ঠাকুমার পাশে এসে চুপটি করে বসে থাকে। কখনও পান সেজে দেয়। গা-হাত-পা টিপে দেয়। বা এটা-সেটা গল্প করে। তবে ও যখন ঠাকুমার পাশে ঝুপ মেরে বসে থাকে, কথাটি কয় না তখন ওকে দেখে মনে হয় ওর আসলে চুপ করে বসার কোন জায়গা নেই। ও কেবল নীরবে, নিঃশব্দে বসে থাকতেই এখানে আসে। কখনও কখনও এ পক্ষের ছেলেটাকেও নিয়ে আসে।
এই বিয়েটা মিনতির ভাঙেনি। মিনতি তাকে ছেড়ে ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছে। কোন যোগাযোগও রাখে না। প্রথম স্বামী মারা যাবার পরে, বাপের বাড়ি ফিরে এসে মিনতি মাস ছয় বসে ছিল। কিন্তু বসে খেলে চলবে না। ওর বাপ, রায় পাড়ার মাখম রায়, নিজের জমিজমা নেই, পরের জমিতে কিষেন খাটে। তার আয় অল্প। তাছাড়া পরিবারটিও নেহাত কম নয়। মাখম নিজে, ওর বউ ভারতী, একটি বিয়ে না হওয়া হতকুচ্ছিত মেয়ে ও ছেলে-বউ নিয়ে তার সংসার। একটিই ছেলে মাখমের, কিন্তু কর্মক্ষম নয়। গায়ে-গতরে ছেলের কোন অসুবিধে নেই, বিড়ি ছাড়া আর কোন নেশা নেই—কিন্তু দোষের মধ্যে বড্ড কুঁড়ে। একদিন কাজে গিয়ে টাকা কামিয়ে নিয়ে এসে সেই টাকায় বসে বসে তিন দিন খাবার মতলব। এমনি করে চলে? কেবল পেটে খাওয়া তো নয়, সংসারে আরও অন্যান্য খরচ থাকে, আত্মীয়-কুটুম্বের আসা-যাওয়া থাকে, পালা-পাব্বন থাকে। ছেলে এসব বোঝে না। এই নিয়ে মাখমের দুঃখের শেষ নেই।
প্রথমবার ফিরে আসার মাস ছয়েকের মধ্যে মিনতি একটি কাজ পায়। একটি নার্সিংহোমে আয়ার কাজ। ওখানে থাকার ব্যবস্থাও ছিল। মিনতি প্রথম প্রথম যাতায়াত করত। কিন্তু মাইনে যা তাতে পোষাল না। ফলে তাকে থাকতেই হল। আর এতে মাথায় বাপের বাড়ির ছাদের অপ্রতুল অবস্থাটাও এড়ানো গেল। সে প্রথম প্রথম পনেরো দিন অন্তর বাপের ভিটেয় ফিরত, পরে পরে তা মাসান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানেই থাকতে থাকতে তার আলাপ হয় গিরীন্দ্র গুপ্তার সঙ্গে। গুপ্তা বিহারী। লরির ড্রাইভার। নিজের লরিও আছে। ভাড়া খাটায়। পয়সার অভাব নেই। না, গিরীন্দ্রর আগে-পরে কোন বউ নেই। মিনতি তার সঙ্গে ঝুলে গেল। কাজে ঢোকার সাত মাসের মধ্যেই প্রেম ও বিবাহ। বিয়ের পরে সে আবিষ্কার করে, গিরীন্দ্রর নব নব নেশার কথা।
বিয়ের আগে গিরীন্দ্র তাকে বলেছিল, সে একজন লরি ড্রাইভার। নিজের লরি আছে। তা থেকে আয় মন্দ নয়। তাছাড়া সে বাড়ির দাবি ত্যাগ করে চলে এসেছে। ফলে বাড়ির সম্পত্তির টাকা সে বুঝে নিয়েছে। সে টাকার পরিমাণও কম নয়, সাত লাখ! আপাতত সে ভাড়া বাড়িতে থাকে বটে তবে নিজের জন্য এক কামরার একটি ঘর করাই যায়। জায়গা-জমি, জলার ওদিকে, কেনাই আছে তার। এসব শুনে মিনতি আর দ্বিরুক্তি করেনি। বিয়েটা সেরে নিয়েছিল। তার আগে একবার বিয়ে হয়েছিল সেকথা বললেও আগে যে একটি বাচ্চা আছে, সেটা গোপন করে গিয়েছিল। আজও গিরীন্দ্র সে কথা জানে না।
এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু গোল অন্যত্র।
মদ না খেলে তার চলে না। তবে রোজ নয়, সপ্তাহে একবার খায় গিরীন্দ্র। পেট ভরে, ঠাসিয়ে, নানা চাট সহ খায়। বউয়ের কথায় সে সাতদিনের বদলে দশদিন অন্তর করতে পারে ব্যাপারটা, তবে একবারে ছাড়বে না। ছাড়তে পারবে না।
আর বিড়ি, সিগারেট?
ওগুলো হিসেবের মধ্যে আসে না।
মিনতি সানন্দে রাজি হয়ে গেছিল। নতুন সংসার, নতুন বর, নতুন জীবন। যে নৌকা স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল তা যেন একটা ঘাট পেল।
কিন্তু বিয়ের একমাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই সে আবিষ্কার করল, কোন নেশাই বাদ নেই গিরীন্দ্রর। বিড়ি, সিগ্রেটকে হিসেবের মধ্যে না রাখলেও হেরোইন, গাঁজাকে রাখতেই হয়। মিনতি মুষড়ে পড়ল। বিধবা ছিল, জীবন ছিল একপ্রকার। আর এখন? বাড়ির কেউ তার বিয়ে দেয়নি, বিয়ের কথা বলেওনি। যা করার সে নিজে করেছে। ট্রেন থেকে সে লরিতে নেমে এল, কিন্তু এমন হবে সে ভাবেনি। এখন মনে হচ্ছে, সে বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে!
ক্রমে গিরীন্দ্রর আরও অনেক গুণ প্রকটিত হল। তার মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য। জুয়া ও বেশ্যাপল্লী গমন। এই দুই উপাদানই তার জীবনে নিত্য। কাজ থেকে সকাল সকাল ফিরলে সন্ধেতে বসে মদ সহ জুয়ার আসর। আর সকাল হলেই চলে বেশ্যাপল্লী ভ্রমণ। এটি নিত্য। বউ অনিত্য। এই জায়গায় না গেলে তার পেটের ভাত হজম হয় না। সাত-সকালে বেশ্যাদের মুখ না দেখলে তার দিন ভালো যায় না। মিনতি প্রতিবাদ করেছিল। গিরীন্দ্র বলে, দেখ মিনু, আমি সতেরো বছর বয়স থেকে বেশ্যাবাড়ি যাচ্ছি। আমার বাড়ির লোক জেনেও কিছু বলেনি; তাহলে তুই বারণ করছিস কেন? তোর আপত্তি কেন? তুই কে!
ক্রমে মিনতি মদ ও হেরোইন বিষয়ে নিমরাজি হলেও বেশ্যাবাড়িটি মানতে পারল না কিছুতেই। এই নিয়ে নিত্য ঝামেলা, অশান্তি। শুরু হল মারধোর ও না-খেতে দেওয়ার মতন ব্যাপার। তারপরে আলোচনার পরে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে, গিরীন্দ্র বেশ্যাদের সঙ্গে যত ইচ্ছে কথা বলুক, সারাদিন কথা বলুক; কিন্তু ওখানে যেতে পারবে না। এমনটি চলল বেশ কিছুদিন। সকাল হলেই গিরীন্দ্র ফোন করতে শুরু করে বেশ্যাপাড়ার কাউকে না কাউকে, যতক্ষণ সে ঘরে থাকে ফোনের মধ্যে অশ্লীল কথা, হা-হা-হি-হি ও খিস্তি-খেউড়ের বন্যা বয়ে যায়। অনেক বেশ্যা আবার বলে, লাউডে দাও, তোমার বউয়ের সঙ্গে ভাটাই।
তবুও সংসার বাঁচানোর আশায় মিনতি সেখানে বছর দুয়েকের মত টিকে ছিল। এইসব নিয়েই ছিল। তার যেসব পড়শি ছিল, তারা তাকে বোঝাল, বাচ্চা নিয়ে নাও। কোলে বাচ্চা দেখলে পুরুষেরা বদ নেশা থেকে বেরিয়ে আসে। তখন তুমি যা বলবে সে তাই শুনবে।
কিন্তু গিরীন্দ্র সে জিনিস নয়। বাচ্চা এল। সরকারি হাসপাতালে বাচ্চা জন্মাল। গিরীন্দ্র কোন খরচ দিল না। ঘরে ফেরার পরে বাচ্চার দুধ জোটে না। বাচ্চার জোটে তো তার মায়ের পেটে টান পরে। নানারূপ নেশায় গিরীন্দ্র মাঝে মধ্যেই সব টাকা বাইরে উড়িয়ে দেয়। বাচ্চা হবার পরে বেশি করেই দেয়।
এই অবস্থায়, সেখানে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠলে, বাচ্চা কোলে ফের বাপের বাড়ি ফিরে এল মিনতি। না, নতুন করে সে আর কোথাও কাজ নিল না। সে গ্রামের বাইরে গেল না। বরং সে যা করতে লাগল, ছেলেকে কোলে নিয়ে এ-বাড়ি, সে-বাড়ি, এ-পাড়া, ও-পাড়ার বুড়িদের কাছে, বউদের ঘরে-দোরে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কারণ আর কিছু নয়, তাদের হাত নুড়কুত হিসেবে কিছু কাজ করে দেওয়া। বিনিময়ে কলাটা-মুলোটা আদায়। আর এইভাবেই রূপেনের সঙ্গে মিনতির দেখা হয় বহু বছর পরে।
রূপেন একজন ডাক্তার। এই এলাকা থেকে একমাত্র ডাক্তার সে। মেডিসিনে এমডি করেছে। এই পড়াটা পড়তে গিয়েই একটি মেয়ের সঙ্গে তার আলাপ হয়। মেয়েটি তখন পেডিয়াট্রিক-এর উপরে এমডি করছিল। রূপেন যেমন এমবিবিএস করে চাকরি করতে করতে এমডি করতে গেছে, মেয়েটি তা নয়। সে গ্র্যাজুয়েশন করেই এমডিতে চান্স পেয়ে যায়। মেয়েটির নাম আজমিরা লস্কর। রোগা, ফর্সা, লম্বা। দেখতে সুন্দর।
মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক হয় রূপেনের। পাশ করার পরে তারা বিয়ে করে ফেলে। কিন্তু ধর্মের কারণে দুই বাড়ি থেকেই তাদের সম্পর্ক মানেনি। তারা শহরের উপান্তে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। রূপেন এমডি করার পরে অন্য এক হাসপাতালে সুপি হিসেবে জয়েন করে। আজমিরা সরকারি চাকরির ঝামেলায় যাবে না বলে, তিন বছরের বন্ড মিটতেই সে কয়েকটি নার্সিংহোম ও চেম্বার করতে শুরু করে।
বিয়ের এক বছর পরেই তারা বাচ্চার জন্য ট্রাই করতে থাকে। কিন্তু বাচ্চা আসে না। টানা তিন বছর চেষ্টা করার পরে ব্যর্থ হলে তাদের মধ্যে সম্পর্কে শৈথিল্য আসে। এছাড়া আরও কিছু কারণে তাদের মধ্যে ফাটল তৈরি হয়। এখন আর তারা একসঙ্গে থাকে না। আগের ঘরটি ছেড়ে দিয়ে তারা নিজেদের পছন্দমত জায়গায় ঘরভাড়া নিয়েছে। রূপেন নিয়েছে তার হাসপাতালের কাছে। ফলে আগের মতন দুঘণ্টা ধরে জার্নি তাকে করতে হয় না। এখন একটা রিক্সা বা টোটো ধরেই সে কর্মস্থলে পৌঁছতে পারে।
রূপেন যেহেতু প্রায় সমস্ত চেম্বার অফ করে দিয়েছে তাই সে গ্রামে আসার সুযোগ পায়। গ্রামের ক্লাবের ছেলেরা তাকে দিয়ে ক্লাবঘরেই দাতব্য চিকিৎসালয় খুলিয়েছে। কিছু মানুষ দেখাতে আসে। পুরানো দিনের কথাবার্তা হয়। রূপেনের ভালো লাগে। মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের কাছ থেকে পাওয়া ফ্রি স্যাম্পল ওষুধ রূপেন সেইসব গরীব-গুর্বো মানুষদের জন্য ব্যাগ ভরে নিয়ে আসে। ক্লাবঘরে চায়ের সরঞ্জাম থাকে। রূপেন খরচা দেয়। সকলের জন্যে চা আসে। এই করেই এখন তার জীবন চলছে।
এবারেই, এই ফাল্গুনে বাড়ি ফিরে সে দেখল, ঠাকুমার কাছে মিনতি বসে আসে। তেঁতুল রোদে দিতে তাকে সাহায্য করছে। আবার কখনও, তেঁতুলের বদলে মিনতিই বসে আছে চুপ করে। তাকে এক ঝলক দেখেই বোঝা যায়, জীবন ও যৌবন সম্পর্কে সে নির্মোহ হয়ে গেছে। জীবনে কে কার? কিছুই তো থাকে না শেষ অবদি। কিন্তু মিনতি এই করে, লোকের উঞ্ছবৃত্তি করে কদিন টানবে? অনেকগুলি দিন এখনও বাঁচতে হবে যে!
আর ঠাকুমা ক্রমাগ্রত বকবক করে চলেছে তার সঙ্গে। কী বকছে, হয়ত নিজেও বোঝে না, অন্যকে কী বোঝাবে। মিনতি তাই হুঁ-হাঁ দিয়ে কাজ সারছে আর মাথা নাড়ছে মাঝেমধ্যে। রূপেন মিনতিকে দেখে অবাক হয়ে গেল। মাথাটা ফট করে ঘুরে গেল যেন। সে বসে পড়ল। তার সুগার ধরা পড়েছে। ওষুধ কখনও খায়, কখনও খায় না। কখনও নিয়ম মানে, কখনও হাতের কাছে যা পায় সব খেয়ে ফেলে। আগে যেমন কেরিয়ার, ডাক্তার হব, এই ধ্যানজ্ঞান ছিল—জীবনের মানে ছিল অন্যরকম। এখন জীবন পালটে গেছে। মনে হয়, ডাক্তার না হলেই বা কী হত! মুদি দোকানি হলেই বা কি এমন এসে যেত। আগে সে সময়কে চালনা করত, এখন সময় তার লাগাম ধরে নিয়েছে। ইচ্ছেমত তাকে ঘোরাচ্ছে, ফেরাচ্ছে। জীবনের এই খেলা থেকে কে বা কবেই মুক্তি পেয়েছে!
রূপেন মনে করার চেষ্টা করতে লাগল কিশোর বয়সে মিনতির সঙ্গে কাটানো সেইসব দিনগুলো। সেদিনটা কি সুখের ছিল? পাত্রী হিসেবে সে কি খুব খারাপ হত?
ঠিক এই ভাবনার সময়ই, ঠাকুমা একথা-সেকথার পরে আচমকা বলে বসল, সেদিন তুই যদি মিনতিকে বিয়ে করতিস তাহলে আজ আর এইদিন দেখতে হত না।
ঠাকুমার এই কথায় হতচকিত হয়ে গেছিল রূপেন। ঠাকুমা বলে কী! সেদিন মানে কোনদিন? মিনতি যেদিন পালিয়ে রেলের ছেলেটাকে বিয়ে করে? নাকি লরির ড্রাইভারকে? তার সঙ্গে মিনতির সম্পর্ক ছিল এটা ঠাকুমা জানল কী করে? মিনতি কি বসে বসে এসব গল্প করে?
মিনতিও মুখটা নিচু করে নিয়েছে। কিন্তু ওর নত মুখে খুশির আভাস ওর শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা একঝলক দেখলেই বোঝা যায়। অথচ তার সঙ্গে যখন মিনতির সম্পর্কটা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায় তখন মিনতির দিক থেকেই কোন চেষ্টাই ছিল না সেটাকে মেরামত করার। বদলে মিনতিই আবার একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে দেরি করেনি। তারপরে আসে রেলবাবু। মাঝে আরও কেউ ছিল না, পুরোপুরি শহরবাসী হওয়ায় রূপেনের কাছে সে খবর নেই।
রূপেন উঠে পড়ল। ঠাকুমা বলল, উঠলি যে! চলে যাবি নাকি?
না। ঘড়ঘড়ে গলায় বলল রূপেন। বলল, একটু বাইরে যাব।
তোর চেম্বার নেই আজ? কেলাবে মাগনায় যেটা করিস!
আছে।
বিনি পয়সায় ওসব না করে কিছু পয়সা নিতে পারতিস তো। গেরামের লোকের জন্য যতই করিস, তাতেও ওদের মন ওঠে না। আর টাকা যদি নিস বিশ-পঞ্চাশ—তাহলে সেখেনে মিনতিকে তোর কম্পাউন্ডার করে পাঠাতুম। ও কিছু পয়সা হাতে পেত, মাগনায় কি কিছু হয় বাবা!
হঠাৎ-ই রূপেন কোনকিছু না ভেবেই বলে বসল, ও তো এখনও কম্পউন্ডার হতে পারে। আমি তো বারণ করিনি।
তখন ঠাকুমা উদ্ভাসিত মুখে মিনতির দিকে তাকিয়ে বলল, দেখলি? আমি বলেছিলুম না, আমার নাতি যত বড়ই ডাক্তার হোক না কেন, আমার কথা ফেলতে পারবে না। তোর একটা কাজ হল তো। মাসে এখন দুদিনের কাজ, তাই কর না কেন। পরে পরে কেলাবের ছেলেদের বললে ওটা হপ্তায় করে হবে। মাসে চার দিন। আমার নাতি যদি তোকে হাজার টাকা করেও দেয়, মাস গেলে চার হাজার টাকা ইনকাম, খারাপ কি? বাকি সময় অন্যকিছু করলি। এইভাবে তোর ঠিক চলে যাবে। কারও কাছে হাত পাত্তে হবে নে।
মিনতি রূপেনের পিছু পিছু ঠাকুমার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বলল, তুমি আমার অনেক উপকার করলে রূপেনদা। তোমায় অনেক ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ! কথা বলার এমন কায়দা শিখলি কোথায়?
মিনতি লাজুক হেসে বলল তুমি কদিন থেকে যাও এখানে, বুঝলে। অনেক তো ডাক্তারি করলে, আর কেন? তোমার ঠাকুমার শরীর ভাল নয়। অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। সারাক্ষণ শুয়েই থাকে। আমি মাঝে মাঝে আসি, পায়ে তেল মালিশ করে দিই, দুটি কথা কই। না হলে বুড়ি মানুষের সঙ্গে কে কথা কইবে? এখন তুমি আসবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছে। ঠাকুমা এখনও মনে রেখেছে তুমি রোদমাখা তেঁতুল নুনে জারিয়ে খেতে ভালবাসো। আমাকে একটু এগিয়ে দেবে?
তুই কি দিনের বেলাতেও একা চলতে পারিস না?
পারব না কেন। আমার ছেলেটা আজ দু-দিন ধরে অসুস্থ। তুমি ফিরবে, তোমাকে দেখাব, সেই আশায় পথ চেয়ে বসে আসি।
কিন্তু আমি বসব তো সেই সন্ধেবেলা।
সেই জন্যে তো বলছি। যদি আমার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে যেতে একবার—
ডাক্তার না দেখিয়ে ছেলেটাকে ঘরে ফেলে রেখেছিস কেন?
ডাক্তার দেখাতে যে পয়সা লাগে রূপেনদা!
আমাকে ফোন করতে পারতিস। ওষুধ বলে দিতাম।
তোমার ফোন নম্বর আমার কাছে আছে নাকি!
মিনতির ঘাড়ের কাছে ট্যাটু করা। পাঁচটা স্টার। স্টারগুলো ঘাড়ে নিচ থেকে উপর দিকে উঠে যাচ্ছে লাইন করে। বড় থেকে ছোট স্টার। মিনতি চুলটা খোঁপা করে নিতে স্টারগুলো সব চোখে পড়ল।
পথে যেতে যেতে মিনতি বলে, একটা সত্যি কথা বলবে রূপেনদা?
বল।
তোমার বউয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক ভাঙল কেন?
রূপেন চুপ করে রইল।
ধর্মের জন্য মিলমিশ হল না শেষ অবদি?
রূপেন উত্তর দিল না।
নাকি বাচ্চা হল না বলে? বাচ্চা তো অনেকেরই হয় না, তাতে কি? তোমরা দুজনেই ডাক্তার, পয়সার অভাব নেই; ইচ্ছে করলেই দত্তক নিতে পারতে। তেমন কিছু না করে, আলাদা হলে, কিন্তু ডিভোর্স নিলে না, কেন?
তুই জেনে কী করবি?
এমনিই।
এমনিই! এমনি কেন?
কেন আবার, কৌতূহল।
এত কৌতূহল কেন তোর!
বারে, তোমার জীবন নিয়ে আমার কৌতূহল থাকবে না তো কার থাকবে?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, দুদিকে মাথা নেড়ে রূপেন বলল, তা বটে!
কতদিন পর সে মিনতির বাড়ি যাচ্ছে? মনে নেই। উচ্চ মাধ্যমিকের পর থেকেই সে হোস্টেলবাসী; এখনও একপ্রকার তাই, গ্রামের লোকজন তাকে প্রায় ভুলেই গেছে! একমাত্র যারা ক্লাবে দেখাতে যায় তারা চেনে, তবে সেখেনে চেনার থেকেও ফ্রি ওষুধের দিকেই তাদের মনোযোগ থাকে, বাদবাকি কিছু দেখে না। মিনতির বাপের বাড়িটি আরো জীর্ণ হয়েছে। আগে দুটি ঘর ছিল, আজও তাই। ইটের ঘর টালির ছাউনি। আগে যেমন ছিল মেরামত না হওয়ায় তার চেহেরা যেন ধ্বসে পড়া পোড়ো বাড়ির মতন দেখায়। মিনতির বছর পাঁচেকের ছেলেটা যথেষ্ট রুগ্ন, অপুষ্টিতে ভুগছে। ঘরের মধ্যে মাদুর পেতে শুয়েছিল। তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে মাখম রায় বললে, এটি কে?
কথা না বাড়িয়ে মিনতি বলল, ডাক্তার।
ছেলের জন্য ডাক্তার ধরে আনলি? তুই ফিজ দিতে পারবি না, ডাক্তার সেটা জানে? বলে মাখম রায় রূপেনের মুখের মুখে তাকাল। অনেকক্ষণ চেয়ে রইল। তারপরে বলল, মুখটা চেনা চেনা লাগছে যেন!
মিনতি কোনো উত্তর করল না। রূপেনকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। রূপেন শিশু ডাক্তার নয়। তবুও এইসব জায়গায় চিকিৎসা দিতে হয়। এখানেও তাই দিল। ভাইরাল ফিভার। অযত্নে পড়ে থেকে ব্যাপারটা পাকিয়েছে। দোকান থেকে প্যারাসিটামল খাইয়ে রেখে দিয়েছে। এখুনি এন্টিবায়োটিক চালু করতে হবে।
শিশুদের জন্য ফ্রি স্যাম্পেল যা এনেছিল তা দিল রূপেন। বলল, এগুলো এখুনি চালু করে দে। তিনদিনে জ্বর নেমে যাবে। আর কিছু রক্ত পরীক্ষা করা।
আমার কাছে টাকা নেই। কিছু দিয়ে যাও।
কথাটা বলতে মিনতি দু-বার ভাবল না। খুব সোজাভাবেই বলল।
পাঁচশো টাকার দুটি নোট মিনতির হাতে ধরিয়ে, ছেলেটাকে দেখে সে বেরুচ্ছে, মাখম রায় তেমনি করে বাইরে বসে ছিল। মুখ উঁচু করে বললে, তুমি আমাদের যতনের ছেলে, না? আমি শুনেছি তুমি ডাক্তার হয়েছ।
পিছু পিছু খানিকটা এল মিনতি। তারপরে দাঁড়িয়ে গেল। বলল, আমার কাজটা?
কাজ?
তোমার ঠাকুমা যেটা বললে।
মনে পড়ে গেল রূপেনের। বলল, দেখছি।
আবার কবে আসবে?
আসি তো।
গ্রামের কথা বলছি না, আমাদের বাড়িতে।
রূপে্ন কথা বলল না। সে ফিরে এল। আজকে ক্লাবে বসবে। মিনতি তাতে হেল্প করতে আসবে সে জানে। ক্লাবের ছেলেদের বলে রাখতে হবে। ওরা সব ইয়ং ছেলে। রূপেনের বয়সীও কয়েকজন আছে ক্লাবে। তারা মিলেমিশে ক্লাবটা চালায়। নানান পুজো করে, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত সন্ধ্যা, বসে-আঁকো প্রতিযোগিতা; শীতকালে নানা বয়সীদের জন্য স্পোর্টস, হাঁড়িভাঙ্গা—সে গ্রামে থাকতে যা যা দেখেছে এখনও সব চলে।
সেদিন ক্লাবে যথারীতি পনেরো জনকে রূপেন চিকিৎসা দিল। ক্লাবের ছেলেরা উপস্থিত ছিল। না, সেদিন আর তাকে হেল্প করতে মিনতি আসেনি। অথচ রূপেন সারাক্ষণ ভেবেছে সে ‘এই আসে এই আসে’ বলে। কিন্তু মিনতি এল না। ক্রমে যখন সে বুঝল মিনতি আসবে না তখন সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আবার এটাও ভাবল, মিনতি এল না কেন? ওর ছেলের শরীর কি আরও খারাপ হল? না কি ইচ্ছে করেই এল না? ক্লাবের ছেলেরা কিছু বলবে বলেই পিছিয়ে গেল? তবে মিনতি ছোট থেকেই একটু ডেস্পারেট। সে এতে পিছিয়ে যাবে, এমন নয়। তবে? নিশ্চয় কিছু একটা ভেবেছে সে বা ঘটেছে। জানতে হবে।
তাই পরেরদিন সকালেই সে গেল মিনতির বাড়ি। নিজে থেকেই গেল। গিয়ে দেখল ছেলেটা ভালই আছে। চিকিৎসায় সাড়া দিয়েছে। তবে ওকে কিছু ফলমূল খাওয়ানো প্রয়োজন। মাছ, ডিম।
সে যেতে মিনতি খুব খুশি। মুখেও বলল সেটা। বলল, তুমি আসবে রূপেনদা, আমি ভাবতেই পারিনি।
কী ভেবেছিলি তবে?
কত বড় হয়ে গেছ তুমি, কত সম্মান পাও—তুলনায় আমি কত ছোট—
নিজেকে ছোট ভাবিস কেন?
চারিদিক সেটাই ভাবিয়ে দেয় রূপেনদা। সমাজ আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমি কতটা খারাপ।
আমাদের বাড়ি যাবি না? ঠাকুমা যে তোকে চোখে হারায়।
যাব, বিকেলে যাব; ছেলেটা এখন সুস্থই। যাই একটু ভালো হয়েছে অমনি খেলতে ছুটছে।
বাচ্চারা অমনিই হয়।
তুমি খুব ভাল রূপেনদা। আমি তোমাকে চিনতে পারিনি। তুমি ডাক্তার হয়েছ বলেই নয়, মানুষ হিসেবে তুমি খুব ভাল। তখন অল্প বয়স ছিল, মানুষ চেনার ক্ষমতা ছিল না। তাছাড়া বাইরেটা দেখিনি। এখন যখন সাতঘাটের জল খেয়ে আবার সেই পুরানো ভিটেতে এসে থিতু হলুম, দেখি জীবনের মানে পালটে গেছে। জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। জীবন আমাকে জানিয়েছে, ভাল কিছু, বড় কিছু, মানোন্নত কিছু পেতে গেলে অপেক্ষা করতে হয়। আমি যেটা কোনোদিনই করিনি। মানুষ বিয়ে করে কেন রূপেনদা? বিয়ে করে কী পায়? বিয়ে না করলেই বা কি এসে যায়? কিছুই না! বিয়ে করে আমি ভুল করেছি। আর সেই ভুলের খেসারত আমাকে নিজের জীবন দিয়ে দিয়ে যেতে হচ্ছে, আগামী দিনে আরও দিতে হবে।
পরদিন রূপেন শহরে ফিরবে। আবার আসবে পনের দিন পরে। কিন্তু সেদিন একটা বিপত্তি দেখা গেল। বেকায়দায় পড়ে গিয়ে হাত ভাঙল রূপেনের।
না। ভেঙেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না, যেহেতু ছবি তোলা হয়নি। এক্স-রে দেখেই ফাইনাল বলা সম্ভব। কিন্তু ব্যথা যেমন হচ্ছে বোঝা যায়, নির্ঘাত ভেঙেছে।
এই অবস্থাতেই রূপেন ফিরতে চাইছে। কে জানি, তার এখানে আর ভাল লাগছে না। কেন জানি, সে যেন নিজের উপরেই বিরক্ত হয়ে উঠেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে চলে যেতে চায়। হাত ভাঙাটা তার কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখন ফিরে যাওয়াটাই সব। তারপরে আজই নিজের হাসপাতালে দেখিয়ে সম্ভব হলে সেখানেই বা বাইরে থেকে চিকিৎসা নেওয়া। অনেকদিন ছুটি নিতে হবে, সে বুঝতে পারছে।
ঠাকুমা বললে, এই অবস্থায় তুই শহরে ফিরবি? থেকে গেলে হত না?
না। যেতে হবে। এমনিতেই দুদিন ছুটি হয়ে গেছে। আর ছুটি পাব না। এবারে কামাই করতে হলে মেডিকেল নিতে হবে।
আমি গাড়ি বলে দিচ্ছি, গাড়ি করে যা; কেলাবের ছেলেরাই সব ব্যবস্থা করে দেবে—এত রাস্তা যাবি—বাসে-ট্রেনে আর যেতে হবে না।
ঠাকুমাই সব ব্যবস্থা করে দিল। নির্দিষ্ট সময়ে একটা টাটাসুমো এসে দাঁড়াল তাদের বাড়ির দরজায়। গাড়িতে উঠতে গিয়ে রূপেন দেখে, সেখেনে আগে থেকেই বসে আছে রায় পাড়ার মিনতি রায়।
তুই!
হ্যাঁ। বলে মিষ্টি করে হাসল মিনতি। অনেকদিন পরে তার বাঁ-গালে সেই টোলটা পড়তে দেখল রূপেন। ওর সাদা দাঁত ঝকঝক করে উঠল। গাড়ির মেদুর আলোয় তার কালো রঙে যেন রূপের তীব্র বান ডেকেছে। তার যৌন আবেদন যেন আরও সরেস। কোন কালো মেয়ে যে এতটা সুন্দরী ও যৌবনবতী হতে পারে, রূপেন এর আগে দেখেনি। তাও দু-বার বিয়ে করেছে দুটি বাচ্চাও আছে। হয়ত এদেরকেই বলে, ব্ল্যাক বিউটি। প্রেমের সম্পর্কে থাকাকালীন এই মেয়ের ঠোঁটে একবারই চুম্বন করেছিল রূপেন, মনে পড়ল। হাজার পুরুষের ভিড়ে মিনতির কি মনে আছে তা?
তুই গাড়িতে কী করছিস?
আমার বাড়ির সামনে দিয়ে গাড়িটা আসছিল, বলল তোমাকে শহরে ছাড়তে যাচ্ছে; তাই উঠে বসলাম। আগে আমাকে তুলল, এখন তোমায় তুলবে। কী? ঠিক করিনি? বলে সে একগাল হেসে দুদিকে মাথা ঝাঁকাল।
তুই কোথা যাবি?
শহরে।
সেখানে তোর কী কাজ?
অনেক কাজ।
ফিরবি কবে?
ফিরব না।
থাকবি কোথা?
তোমার ঘরে।
মানে!
হ্যাঁ। নইলে অতবড় শহরে আমাকে কে থাকতে দেবে? কেউ কি চেনে আমায়? সেখানে তুমিই আমার একমাত্র চেনাজানা।
আমার ঘরে থাকবি কী জন্যে?
তোমার জন্য তেঁতুল নিয়ে যাচ্ছি। রোদ খাওয়ানো তেঁতুল। তোমার ফ্ল্যাটের ছাদে রোদে রেখে বেগুনটোপা করে দেব তোমায়। তুমি তেঁতুলের বেগুনটোপা খেতে খুব ভালোবাসতে, মনে আছে?
শুধু এই জন্যে যাচ্ছিস?
হ্যাঁ তো। বলে বড় করে ঘাড় হেলাল মিনতি। বলল, কেবল তুমি খাবে না, আমিও খাব।
তোর বাড়িতে জানে?
সব কথা বাড়িতে বলার কী দরকার?
আর তোর ছেলে?
ও এখন ঠিক আছে। ও জানে ওর মা কাজে যাচ্ছে। আমাকে নিয়ে ওর বিশেষ হেলদোল নেই। দিদুন-দাদু-মামা-মামী—সবাইকে নিয়ে ওর সংসার।
আর তোর সংসার?
তোমাকে নিয়ে।
মানে!
আমি একা ছেড়ে দেব না তোমায়। এই ভাঙা হাত নিয়ে শহরে তুমি একা-একা কী করবে? কে দেখবে তোমায়? কী খাবে? তোমায় আমি জ্বালাব না, সারাদিন সেবা করব তোমার, আর বাইরের ঘরের সোফাতে শুয়ে থাকব সারারাত। তুমি ডাকলে তবেই ঘরে ঢুকব, নইলে নয়; তুমি নিশ্চিন্তি থাকতে পারো।
তখন ঠাকুমা এগিয়ে এসে বলল, রূপেন তুই এখনও গাড়িতে উঠলি না? যা, দেরি করিস না। মিনতিকে আমিই পাঠাচ্ছি। তুই সুস্থ হলেই ও চলে আসবে। ও তোর দেখভাল করবে, রান্নাবান্না করে দেবে। অসুস্থ অবস্থায় তুই হোটেলে খাবি, ক্যান্টিনে খাবি—এটা কি ভাল? ওরা সব না-জানি কীসব অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়ায়—আর তুই আবার ঘুরে পড়িস! ওসব আমি আর বরদাস্ত করব না—এই সাফ কথা কয়ে দিই। ওকে নিয়ে তোকে যেতেই হবে। আর ও ফিরে আসার আগে ওর হাতে কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে দিস। আর সবচেয়ে ভালো হয় যদি কলকাতায় ওকে কোনো কাজ জুটিয়ে দিতে পারিস। যেমন এখেনে বলেছিলুম, তোর চেম্বারের হেল্পার করে নে। খাতায় নাম লিখবে, পেশেন্ট ডাকবে, ভিজিট গুনে নেবে—কাজ কম? এমন ভালো মেয়ে আর তুই পাবি না। কই হে ডেরাইভার, গাড়ি ছাড়ো, আর দেরি কোরো না।
গাড়ি ছেড়ে দিল। মেইন রোডে উঠে গাড়ির ভেতরের আলোটা নিভিয়ে দিল ড্রাইভার। রূপেন বলল, তুই আমার ঠাকুমাকে এমন করে বশ করলি কী করে যে ঠাকুমা তোর কথায় ওঠবস করে!
অন্ধকার গাড়ির ভেতরে রূপেনের ভাঙা হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে মিনতি চুপিচুপি বলল, ঠিক যেভাবে একদিন তোমায় করেছিলাম।