




১
ছোট-ছোট শহরে অসময়ে দমকা ঝড়ের পর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলে কাঁচা হলুদের মত একরকম রোদ্দুর ওঠে। সে আলোয় পথ-চলতি সাধারণ, হাটুরে মানুষগুলিকেও অন্যরকম দেখায়। সাইকেল রিকশাকে মনে হয় পুষ্পক রথ। রোগা-সোগা, সলওয়ার কি জিনস পরা টিউশন-ফেরত কিশোরীগুলি যেন গোলাপি সাইকেল-চড়া পরি এক-একটা, এখুনি উড়ে যাবে প্রজাপতির মত।
শহরের পাশে একটা নদী থাকলে তো কথাই নেই। অথবা নদ, যেমন দামোদর। বৃষ্টিটা একটু ধরল কি প্রজাপতির ঝাঁক, কখনো বা একটা-দুটো দলছুট প্রজাপতি চলল সেই দিকে। দামোদর অবশ্য বালির লরিতে ছয়লাপ। তবু নদীর বুকে-চাপা সেতুতে ওঠার কলমবাড়া রাস্তা ছেড়ে পাশে পাথর-বাঁধানো ঢাল ধরে খানিক গেলেই সাইকেল রাখার ব্যবস্থা হয়ে যায়। ব্রিজের স্প্যানের ঠিক নিচে। নিজ দায়িত্বে।
আজকেও কয়েক জোড়া সাইকেল দাঁড় করানো, তার মধ্যে একটা গোলাপি সাইকেল আর একটা মরচে ধরা পুরনো হারকিউলিস একে অন্যকে ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মালিকরাও বৃষ্টির সময় হয়ত এখানেই ছিল। বৃষ্টি থামতেই ওপারের আকাশে মেঘের ছেঁড়া কাঁথা থেকে উঁকি দেওয়া সূর্যের আলো যেই আশ্চর্য হলুদ বর্ণের হয়ে উঠল, অমনি তারাও নিশ্চয়ই একে অন্যের হাত মুঠিতে ধরে নেমে গিয়েছে জলের দিকে।
এরকম পরিস্থিতিতে কুশীলবদের শতকরা নব্বই শতাংশের কথা ফুরিয়ে যায়, অন্যের মুঠির ভেতর হাত ঘামে, শ্বাসের গতি বেড়ে যায়...গলা বুজে আসে। নতুন কথা তো নেই কিছু। শুধু আলপটকা মন্তব্য উড়ে এলে এক অলক্ষ্য বর্মে নিজেদের মুড়ে নেয় তারা।
বাকি দশ? নাঃ... আজ মনে হয় তারই পালা।
একজন আস্তে আস্তে বলছে, এই শুরু হল। তুই অনেকদূর যাবি। আমাকে মনে রাখবি তো? কলকাতায় গিয়ে আমাকে ভুলে যাবি না?
—ন্যাকা! তুই যেন কলেজে ভর্তি হবি না! ফিজ়িক্স নিয়ে পড়বি...অ্যাস্ট্রোনমি...তুই যে কত তারার কথা বলতিস...ওরায়ন, উর্সা মেজর...
—না রে, সত্যিই হব না।
অন্যপক্ষ কী বলল শোনা গেল না ঠিক।
—বললাম তো। বাবার আর পড়ানোর মত পয়সা নেই, আসলে আমাদের দুবেলা খাবার মত পয়সাই নেই। এখুনি আমি রোজগারে না নামলে মুশকিল।
এর পর ওরা যা বিলকি-ছিলকি বলে তার মানে হয় না। ষোলো-আঠেরোর রক্তস্রোতই কেবল সেইসব ভাবনা মন্থন করে তুলে আনতে পারে। স্বপ্ন দেখতে দেখতে দুটি সাইকেল পাশাপাশি হাঁটে ফিরতি পথের কিছু সময়। কলেজ মোড়ে এসে আলাদা হয়ে যায়...বর্ধমানে সন্ধ্যা নেমে আসে।
২
আরব-সমুদ্র এখান থেকে ক্রমাগতই দূরে সরে যাচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে ...নিজে থেকে নয়, কারা যেন ট্রাকে করে পুরনো ইমারত-ভাঙা মাল-মশলা, ফিল্মি স্টুডিওর সেট...আরো কী কী সব এখানে ঢেলে দিয়ে যায় সুযোগ পেলেই। অবোলা গরানের ঝোপ অনাদিকাল ধরে সমুদ্রের লোলুপ হাতের থেকে উপকূলরেখা রক্ষা করে এসেছে, কিন্তু উপকূলের বাসিন্দাদের লুব্ধ হিংস্রতার থেকে আত্মরক্ষার উপায় তো জানে না। কাজেই যা হবার তাই হচ্ছে। অবশ্য দায়ও কারো একার, কোনো এক সময়ের না। একদা সাতখানা দ্বীপের সমষ্টি এই শহর তো গড়াই হয়েছে সমুদ্র থেকে ক্রমাগত জমি ছিনিয়ে নিয়ে।
এদিকে কোলিদের গ্রামও আছে কয়েকটা। যেখানে বালির চর জেগে আছে সেইখানে দিনের বেলা তাদের নৌকা মেরামত হয়, রং শুকায়, জালের ফাটাফুটি রিপু হয়। তাদের গ্রাম থেকে দেখাও যায় বেআইনি মাটি ভরাট করার কাজকারবার। কিন্তু, জমি-হাঙরদের হাত খুব শক্ত, কোলিদের জালের চেয়েও তাদের জাল অনেক বেশি দূর অব্দি বিস্তৃত। ঠোকাঠুকি লাগলে হয়ত গ্রামগুলিই লোপাট হয়ে যাবে। কোলিরাও তাই এদের বেশি ঘাঁটায় না।
একটা রুকস্যাক ব্যাগ কাঁধে ফেলে সে হাঁটছিল। হাল্কা ঝোড়ো হাওয়া ভালই লাগছিল তার। বৃষ্টি না পড়লেই হল। কোলি-জেলেদের গ্রামের একটা টাপড়ি থেকে রসা-রসা মাছ-চালগুঁড়ির রুটি সাঁটিয়ে মেজাজ ফুরফুরে। রাওয়াস মাছের শিরকাঁটাটা একটা কুকুরকে দিয়েছিল, সেই থেকে ব্যাটা ছিনে জোঁকের মত পিছনে পিছনে চলেছে তো চলেছেই। ভাবল ক্যাঁৎ করে একটা লাথি কষাবে, তারপর মনে হল, ব্যাটা তো কিছু বিরক্ত করছে না, তাছাড়া তাকে আরো কয়েকদিন এদিক দিয়েই যাতায়াত করতে হবে। এরকমই রাত-বিরেতে।
কে-কে, তার হ্যান্ডলার একটা অসমাপ্ত ইমারতের হদিশ দিয়েছে। বলেছে কর্ণাটক আর গোয়ার পুলিশ তাকে খুঁজছে, কদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে। বিল্ডিংটা কার, সে জানে না, আট-দশ তলা কংক্রিটের খাঁচা উঠে থেমে গিয়েছে আইনি ঝঞ্ঝাটে। তবে এর মালিকও কে-কের মক্কেল মনে হয়। কারণ, পাহারাদার বাহাদুর কোনো প্রশ্ন করেনি। বরং দুর্দান্ত এই মাছের রসা আর চালের রুটির দোকানটার সুলুক-সন্ধান সে-ই দিয়েছে। নিজে থেকেই।
সেই থেকে গত তিন-চারদিন সে এখানে। মুশকিল হচ্ছে যে ওই টাপড়ি থুড়ি দোকানটার মালকিনের মেয়েটা একটু বেশিই কৌতূহল প্রকাশ করে ফেলছে। হয়তো তার হাতের উল্কি দেখে মেয়ের ধারণা হয়েছে এ বান্দা নাবিক না হয়ে যায় না। গলগল করে একগাদা বকে যাচ্ছে, নিজের নাম যে রোজ়ি সেটা জানাতে দুই মিনিটের বেশি নেয়নি। হাতে নোঙর আঁকা থাকলেই যে লাইফ সর্টেড হয় না, সেটা বোঝার বয়স হয়নি বলেই বোধহয় ...সে নিজের মনেই হাসল।
নিজেও তো এক সময় ছবির মত দেখতে পেত যেন মৃত্যুপুরী থেকে বীণা বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে আসছে সে, পিছনে তার পুনর্জীবিত প্রেমিকা। ভালবাসার উপর এতটাই ভরসা ছিল অথচ শেষমেশ তারই পেশা হয়ে দাঁড়ালো কি না লোকেদের মৃত্যুপুরীতে পাঠানো। কে-কের, আরো অনেকের জন্য নির্ভরযোগ্য শুটার।
মনে হয় এখানেও কিছু একটা করানোর মতলবে আছে কে-কে। একটা ঠিকানা দিয়েছে। বলেছে সড়গড় করে রাখতে। সেই রেকি করতেই আজ সে গেছিল জুহুর দিকে। সমুদ্রতট থেকে ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁ বা রেস্তোরাঁ থেকে পায়ে হেঁটে সমুদ্রতট পৌঁছে যাওয়া যায় কিনা। মনে হয় তার মত সুশরীর যোদ্ধার পক্ষে ডাল-ভাত। হোটেলে ঢোকেনি, যা নজর করার সমুদ্রতট থেকেই করেছে। কাল লবি থেকে ঢুকবে। ইনভিটে এসে যাবে, কে-কে বলেছে।
বিল্ডিং-এ পৌঁছে শেষ বারের মত পিছন ফিরল সে। কুকুরটা দাঁড়িয়ে পড়েছে, আর এগোচ্ছে না। নিশ্চয়ই অন্য কুকুরের গন্ধ পেয়েছে। টেরিটোরি। বাহাদুর গুমটিতে বসে রিল দেখছে মনে হয়। ফোন থেকে হি-হি হাসির শব্দ আসছে। গেট খোলার শব্দ পেয়ে একবার উঁকি দিল, নিয়মরক্ষা। তাছাড়া লাগলে বাহাদুরের থেকেই পাওয়ার-ব্যাঙ্ক নিতে হয় তাকে। সিম কে-কের দেওয়া।
টুকটুক করে ন্যাড়া সিঁড়ি বেয়ে আটতলা। ফ্লোরের একটেরে একটা খোপরি বানানো হয়েছে চটজলদি। ন্যাড়া ইঁটের দেওয়াল, দরজার জায়গায় ফোকর। বাথরুম-পায়খানা সারতে সেই নিচে। একটা ব্যাটারি-চালিত ক্ষীণ আলো। পাতলা শতরঞ্চি আর একটা স্লিপিং ব্যাগ। রাতে খোলা ফ্লোরে শীত করে রীতিমত।
ধড়াচূড়া ছেড়ে ব্যাগে ঢুকতে যাবে, টিং-টিং করে ওয়াসসাপ মেসেজ ঢুকল। একটা ছবি, তিরিশ বত্রিশের পরিষ্কার কামানো মুখ, রিমলেস চশমা, সামনের চুল পাতলা হয়ে এসেছে। একবার দেখতেই ছবি গায়েব। কে-কেটা মহা ত্যাঁদড়। ব্রিফিং করে, তাও এরকম আলগা-আলগা। ঘুমে ঢলে পড়ার আগে সে একবার মনে মনে পাখি-পড়া করে নিল - পরিষ্কার কামানো ফর্সা মুখ, রিমলেস চশমা, সামনের চুল পাতলা হয়ে এসেছে।
৩
পশ্চিমে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ওরলির ডিভাইন টাওয়ার। বাইশ তলা। সাগরিকা আর নীরজের ফ্ল্যাট আঠেরো তলায়। ওয়ান এইট জ়িরো টু। ওয়ান এইট জ়িরো ওয়ানে থাকে নীরজের জ্যাঠার ছেলে নীরব ও তার স্ত্রী।
এই টাওয়ারের আঠেরো থেকে বাইশ তলার প্রতিটি ফ্ল্যাটে নীরজদের বৃহৎ জ্ঞাতি-গুষ্টির কেউ না কেউ থাকে। ডিভাইন ফার্মা তাদের পারিবারিক উদ্যোগ।
কাল রাতে সাইক্লোন পসেইদনের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। এখন সকাল সাতটা। এক কাপ চা নিয়ে সাগরিকা আনমনে আরবসাগরের ঢেউয়ের উত্তাল খেলা দেখছিল ব্যালকনি থেকে। অন্যদিন নীরজ আর সে... ভাবছিল তবে কি কালকেও নীরজ রাতভ'র অনলাইন মিটিং করে শুতে গেছে! আজকাল অনিয়ম করছে খুব। স্টাডির বন্ধ দরজার ওধার থেকে চলন্ত ফোন-কলে রীতিমত তর্কাতর্কির ধাতব শব্দ শোনা যায়। কখনো কখনো রাত'ভর চলে সেই সব কনফারেন্স-কল।
সাগরিকা এই কোম্পানির অংশীদার, এমনকি সে একাই পেন শহরে তাদের একটা প্ল্যান্টের দায়িত্বে আছে। অথচ, কে জানে কেন, নীরজ নিজে ব্যবসার যেদিকটা দেখে সেটা নিয়ে সাগরিকার সঙ্গে মোটেও আলোচনা করতে চায় না। তবে সাগরিকা খানিকটা আন্দাজ করতে পারে।
এক "বঙ্গালি বহু" এসে তাদের পারিবারিক প্রথার অনেকটাই ওলটপালট করে দিয়েছে, এরকম একটা মনোভাব আছে এই পরিবারের কারো কারো। তারা সময়-সুযোগ পেলেই কুটকুট করে বলে, এর আগে এ'বাড়ির বহুরা আপিস সামলাতে দৌড়ায়নি কখনো। নীরজই কুণ্ঠিতমুখে একবার জানিয়েছিল সে কথা।
—তা এর আগে এ বাড়ির আর কোন বহু তোমারই সঙ্গে বি ফার্ম পড়েছে?
সাগরিকার উত্তর শুনে নীরজ চুপ। সাগরিকা ক্লাস টপার ছিল। নীরজের বাবাও নাকি সব শুনে হো-হো করে হেসে উঠে বলেছিলেন, হক কথা।
এক জ্ঞাতি কাকাও ইয়ার্কির ছলে বলেছিলেন, তবে তো নীরজকে কলকাত্তায় পড়তে পাঠানোই গলৎ ফৈসালা থা, ওখানকার মেয়েরা কালা জাদু জানে।
ব্যাপারটা রস-রসিকতায় মিটে গেছিল।
কিন্তু আবার একটা মেঘ ঘনাচ্ছে কি? ডিভাইন গ্রুপে নীরজ, নীরজের বাবা একদিকে, কাকা-জ্যাঠারা অন্যদিকে এরকম একটা অলক্ষ্য রেখা টানা হয়ে যাচ্ছে কোথাও?
এরই মধ্যে ডিভাইন বাজারে শেয়ার ছাড়বে...আই পি ও। নীরজই গ্রুপ ফিনান্স দেখে, এই সময় কোনো ঝামেলা... হয়ত এসবের থেকে সাগরিকাকে দূরে রাখতেই...
—সাগর, দেখো না, মেরা গ্রে জ্যাকেট...?
তাকিয়ে দেখে নীরজ স্নান করে রেডি।
—একী! চা না'হয় না নিলে, ব্রেকফাস্ট?
—বিনোদ প্যাক করে দিচ্ছে, গাড়িতে খেয়ে নেব।
সাগরিকা চুপ করে যায়। বিনোদ তাদের গৃহ-সহায়ক, সত্যিই সামলে নেবে।
তাকেও তো বের হতে হবে তাড়াতাড়িই। আজকে প্ল্যান্ট ভিজ়িটের দিন...সেও অনেকটা পথ। ভাবতে ভাবতেই ইন্টারকমে সুরভি ভাবি, নীরব-ভাইয়ার স্ত্রী।
—কী রে সাগর, আজ কী পরছিস? নাতাশার গাউন?
আজ সন্ধ্যায় সী মারমেড হোটেলে ডিভাইন গ্রুপের পার্টি আছে। কিন্তু ডিজ়াইনার ড্রেস! সে তো এতদূর ভাবেনি! তাছাড়া আজ তার সারাদিন কাটবে পেন-এ, সেই ফ্যাকটরিতে। ভেবেছিল ফিরে, যা হয় একটা পাঞ্জাবি সুট গলিয়ে নেবে। ভাবি বলে কী, নাতাশার অফ-শোল্ডার ডিজ়াাইনার ড্রেস! উফ, পারে বটে!
কী বলবে ভাবছে, এমন সময় ভাবি বলল, হ্যাঁ রে, তোর বর বাজারে গ্রুপের শেয়ার ছাড়া বন্ধ করতে চাইছে কেন, সবকা ভালা জিস মেঁ...
ও হরি, তাহলে খবর বের করার জন্যই ফোন... সাগরিকা এবার অকপটে বলল, ভাবি, বিশ্বাস করো, আমি এ ব্যপারে কিচ্ছুটি জানি না। ও শুধু আমাকে বলেছে পাবলিক মানি নিয়ে কাজ করতে হলে আমাদের আরো অনেক সতর্ক হতে হবে। আই পি ও বন্ধ করার কথা বলেনি আদৌ।
সুরভি বলল, হুঁ। বিশ্বাস করল কি না বোঝা গেল না।
সাগরিকার খুব রাগ হচ্ছিল। যে কথাটা তার হোম-মেকার জা পর্যন্ত শুনে ফেলেছে, সেটা তাকে একটু আগে থেকে জানিয়ে রাখলে কী ক্ষতি হত!
আসুক আজ নীরজ।
৪
রাত দেড়টা। রাজেশ তাকে সঙ্গে করে বোরিভলিতে ইন্দোরগামী একটা ভলভো বাসে বসিয়ে দিয়েছে। ছেলেটা ভাল। এই কদিন বাইকে করে তাকে শহরের আনাচ-কানাচ ঘুরিয়েছে। নিশুতি রাতে ভারসোভায় ছেড়ে দিয়েছে। রেকির সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে। আজকেও অপারেশন সেরে বেরোতেই দেখে রাজেশ বাইক নিয়ে রেডি। কে-কের নির্দেশমত তাকে নাকি বেরিয়ে পড়তে হবে। এক্ষুনি।
রাজেশ বলল, আপনা খ়য়াল রাখিও প্রভীনভাই। পোলিস বোখলা হুয়া রহেগা। বহ্ বহোত বড়া ইন্ডাসট্রিয়ালিস্ট থা।
-তু ভি সমহালকে রেহ্ না। ওয়সে তেরা আসলি নাম রাজেশ নহি।
রাজেশের মুখটা দেখার মত হল। সত্যিকারের ভাল মানুষদের যেমন হয়।
প্রতীম কোই নহি বলে রাজেশের পিঠ চাপড়ে দিল একবার। বলল, প্রথম দিনই তোর নাম ধরে ডেকে দেখেছিলাম, সাড়া দিতে দেরি করলি। সামলে থাকিস। এ লাইনে খতরা অনেক। সতর্ থাকতে হয়।
তার নিজের নামও যে আসলে প্রভীন নয়, সেটা আর বলল না।
সাইক্লোন পসেইদন আছড়ে পড়ল মনে হয়। পৎপৎ করে ঢেউটিন উড়ে গেল একটা।
বাসের ভিতরে ডীপ ফ্রিজের মত ঠাণ্ডা। কম্বল চেয়ে নিল সে। গায়ে দিতে না দিতে কে-কের ফোন, একেবারে উন্মত্ত কুকুরের মত চিৎকার...
—*** কা অওলাদ। এক কাম ঠিকসে করনা হোতা নহি।
—কী হয়েছে? পটাখা তো চলা থা! প্রায় ফিসফিস করে সে বলল।
—নিশানা চুক গয়া তেরা। তু চালানেমেঁ দের কর দিয়া। বহ্ বঙ্গালনকে আঁখো মে কেয়া ঝাঁক রহা থা মাদার...
—কেয়া বকওয়াস...
—বকওয়াস তু বন্দ করিও। পার্টিমে লোগ থে জিসনে সব দেখা। অব মেরী বাত ধ্যান সে সুন। কোই স্মার্টনেস দিখানেকা নহি। ইন্দোরসে ওয়ান-টু করনেকে লিয়ে ভি হিলনা নহি। সমঝা? বাকি ম্যায় দেখ লেতা হুঁ।
যেমন ফোন করেছিল, তেমনই ঝড়ের মত কেটে দিল কে-কে।
প্রতীম একটু অবাক হল। শার্প-শুটারের রেপুটেশন খারাপ হওয়ায় যতটা মুষড়ে পড়ার কথা, ততটা খারাপ তো লাগছে না! বরং স্বস্তিতে যেন নাচতে ইচ্ছা করছে!
পার্টিতে ঢুকে ভিড়ে মিশে যেতে তার সময় লাগেনি। সময় লাগেনি পুরুষদের জটলা ঠিক কোনখানে সেটা বুঝে নিতে। বার কাউন্টারের সামনে যথারীতি ভিড়। মনে সেভ করে রাখা ছবিটা একবার আওড়ে নেয় সে — পরিষ্কার কামানো ফর্সা মুখ, রিমলেস চশমা, সামনের চুল পাতলা হয়ে এসেছে।
মুশকিল হল এটা একটা পারিবারিক পার্টি মনে হয়, অধিকাংশ তরুণ মুখগুলি একই রকম লাগে। সে সময় নেয়...কে-কে অবশ্য আজ একটা নামও পাঠিয়েছে। নীরজ, নীরজ শর্মা। সে চিতাবাঘের মত ওৎ পেতে থাকে। একটা মুখ বর্ণনার সাথে মিলছে অনেকটা। আরেকটু নিশ্চিত হলেই...
—নীরজ, জ়রা সুনিয়ে তো!
যে ডাকল তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতীম কেঁপে উঠেছিল। এও কি সম্ভব! হা ঈশ্বর! একটা মানুষ এরকম সপাটে আরেকজন মানুষের স্মৃতি নিয়ে আসে? পরক্ষণেই মনে হয়, আরে দূর, স্মৃতি কেন হবে, এ তো সে-ই...একই চেনা নদী...মাঝে কিছু বছরের পলি পড়েছে শুধু।
কিন্তু এই মেয়ে এখানে কী করে? পুলিশের তাড়া খেয়ে প্রথম যে বার সে ঝাড়খণ্ডে গা-ঢাকা দেয় তখনই শুনেছিল অবাঙালি সহপাঠীকে বিয়ে করছে সাগরিকা। মা-বাপ মরা মেয়ে। মামা-মামী নাকি সমস্ত সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছে।
সে আজ কতদিন হল! দশ...বারো...হ্যাঁ, বারো বছর!
নীরজই তবে সেই সহপাঠী। একদম পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের মধ্যে। হাতে ঠেকে পকেটের ঘেমে ওঠা রিভলভার। বের করে আনলক করে ট্রিগার...
—এ কী! তুই...
চিনতে পেরেছে, এত বছর বাদে, এক মুখ দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল এড়িয়ে ঠিক চিনতে পেরেছে...দেহে-মনে অজস্র অর্থহীন আঁচড়ের আড়ালে মানুষটাকে ঠিক চিনতে পেরেছে। আর কী চাই! নীরজের কনুই ধরে আছে, তাতে কী? প্রতীমকে ভোলেনি।
সশব্দে গুলি ছুটে যায়। প্রতীমের নিজের হাতের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই যেন। সে ফায়ার করতে চায়নি। কিন্তু নীরজের কপাল থেকে রক্তের ধারা...নীরজ পড়ে যাচ্ছে। সাগরিকা যেন সম্বিৎ ফিরে পায়, চিৎকার করে, কল এ্যান এ্যামবুলেন্স, ড্যাম ইট।
কী হয়েছে বুঝতে না পেরে সবাই এলোমেলো, মেয়েরা চিৎকার করছে, এরই মধ্যে প্রতীম রেকি করা পথে বাইরে...যেখানে রাজেশ দাঁড়িয়ে।
৫
—ওয়েল, হি লস্ট আ লট অভ ব্লাড। বাট লেট আস ট্রাই। ডিউটি-রত প্রবীণ ডাক্তার ভাবলেশহীন, নন-কমিটাল।
তুলনায় পুলিশের তরুণ এস আইটির মুখ মায়া জড়ানো।
—ম্যাডাম, আম্হী হামলাব্যরেলা লওকরচ আটক করু। (আমরা আততায়ীকে জলদিই ধরে ফেলব।) আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। সাহেব ঠিক হয়ে যাবেন। আপনি এদিকে এসে বসুন। মহিলা কন্সটেবলকে বলল, তিলা পানি দ্যা। মেয়েটি একটা জলের বোতল এগিয়ে দিল চটপট।
বাইরে আসতেই বাড়ির লোকজন ঘিরে ধরল তাকে। সবাই জানতে চায়...
গুলি চলার সঙ্গে-সঙ্গেই নীরজের কপালে কিছু একটা এসে লাগে। পড়ে যাওয়ার আগেই সাগরিকা নীরজকে ধরে ফেলে। আস্তে আস্তে মাটিতে শুইয়ে দেয়। রক্তে নীরজের জ্যাকেট ভিজে উঠেছে ততক্ষণে।
—বহ্ কৌন থা, পেহ্চানা? নীরজের বাবা প্রশ্ন করেন।
সাগরিকা জবাব দিতে গিয়ে থমকাল একটু। চেনা বলে মনে হয়েছিল বটে, কিন্তু আততায়ী তো স্বীকার করেনি, সাগরিকার প্রশ্নে তার মুখের রেখাও টসকায়নি এতটুকু। নাঃ, চেনা যায়নি তাকে, চোখ দুখানি শুধু সেই অনেকদিন আগের চেনা ছেলেটার মত। কিন্তু সে কি এরকম বিনা প্ররোচনায় মানুষ মারে? তারপর টুক করে সিন থেকে বেরিয়ে যায়?
মাথা নেড়ে না বলে দিল সাগরিকা।
—কিন্তু তুমি তাকে কিছু বলছিলে। এত আওয়াজ, কী বলেছিলে ঠিক শুনতে পাইনি। নীরজের জ্যাঠার কন্ঠস্বর তীক্ষ্ণ।
—ম্যাডাম? এস আই শিন্ডে আবার এসে দাঁড়িয়েছেন ঠিক তখনই।
—বলুন।
-কেয়া আপ অ্যাসাইল্যান্টকো পহেচানা? আপনে কুছ বতা রহি থি উসকো। কই লোগ বোল রহে হ্যায়।
সাগরিকা সতর্ক হয়ে যায়, নীরজ বাঁচবে কিনা ঠিক নেই, আর এমন সময়ে সে কী দেখেছে তাই নিয়ে নিজেরই লোকেরা ছক কষছে! শুধু তাই নয়, সেই খবর পুলিশের কানে তুলে দিয়েছে!
সে মনস্থির করে ফেলে, গলা পরিষ্কার করে বলে, উসকো পুছ রহি থি কেয়া আপ সচমুচ ডিভাইন গ্রুপসে জুড়ে হ্যায়, আপ কো তো পেহচানা নহি। জবাব নহি মিলা।
শিন্ডে বলে, ওহ্ , আই গেট দ্যাট। চলে যায়।
আরো ঘন্টাখানেক পরে ডাক্তার বাইরে আসেন।
—মিসেস শর্মা। হি ইজ় ক্রিটিকাল বাট স্টেবল। ইট ওয়জ় আ গ্লাস শার্ড লজ়ড অন হিজ় আইব্রো দ্যাট কজ়ড সো মাচ ব্লিডিং। নো বুলেট ইনজুরি।
গুলি নয়, গুলির আঘাতে কোনও বোতল-টোতল ভেঙে কাচের টুকরো ছিটকে এসেছিল।
—সামওয়ান ফ্রম দি ফ্যামিলি ক্যান স্টে হিয়ার। ওনলি ওয়ান। রেস্ট মে গো হোম। ডাক্তার আবার বলেন।
—আমি থাকছি। নীরব বলে।
—না ভাইয়া, আমাকে থাকতেই হবে। তার কন্ঠস্বরের দৃঢ়তা ব্যপারটার নিষ্পত্তি করে দেয়।
৬
ভোর, সাড়ে তিনটে।
ইন্টারস্টেট ভলভো বাসটা একটা ঝলমলে দোকানপাট-ওয়ালা ডিপোয় যাত্রা-বিরতি নিল। ড্রাইভার চোখে-মুখে জল দেবে, যাত্রীরা প্রাকৃতিক কাজকর্ম সারবে। পনেরো মিনিটের বিরতি। বাসে দেড়-দুই ঘন্টা ঘুমিয়ে বেশ ঝরঝরে লাগছিল প্রতীমের।
কে-কের উন্মত্ত সংলাপ মনে পড়ে হাসিই পাচ্ছিল তার। হাত বদল হতে হতে তাকে কে-কের কাছে এনে দিয়েছে ভাগ্য। প্রথমে নিজের শহরের উঠতি স্থানীয় নেতার চামচাগিরি, ছোটখাটো হুজ্জুতি, ধমকি-ধামকি। তার পরে আস্তে আস্তে বিবিধ ডিলের তদারকি...শেষে একটা হাতাহাতি থেকে আলপটকা একটা খুন...সোজাসুজি পুলিশের খাতায় নাম উঠে গেল। এর পরের ইতিহাস অপরাধজগতে পিচ্ছিল পতনের। উগ্র রাজনৈতিক কর্মী থেকে ক্রমশঃ ভাড়াটে গুন্ডা হয়ে ওঠার।
কে-কের চেয়ে অনেক বেশি ঘাটের জল খাওয়া হয়ে গেছে এই কাটা ঘুড়ির মত জীবনে। তাকে ভয় দেখিয়ে কিছু পাবে না কে-কে। বড়জোর ইন্দোরেই গুম করে ফেলতে পারে, কে-কের ইন্দোরে বিরাট সেট-আপ আছে, সে কথা বাইকে করে আসার সময় রাজেশ বলে ফেলেছে। ছেলেটার পেটে কথা থাকে না।
কিন্তু কে-কের একটা, না, দুটো কথা তাকে ভাবাচ্ছে। ম্যায় দেখ লেতা হুঁ আর লোগোনে দেখা হ্যায়। প্রথমটা তো স্পষ্ট। কে-কে আবার চেষ্টা করবে, হয়তো অন্য ভাড়াটে খুনীকে দিয়ে। এ-ই তার রোজি-রোটি।
কিন্তু কারা তাকে রুটি দিচ্ছে এই কেসটায়? যারা দেখেছে, নজর রাখছে? তারা কী নজর রাখছে? খুনটা যাতে না হয়, নাকি যাতে হয়? আর এক বঙ্গালনকে দেখে সে যে থতমত খেয়ে গেছিল সেটাই বারবার দাগানোর জোরদার চেষ্টা চলছে? কেন?
৭
শেষ রাতে চটকা এসেছিল সাগরিকার। নীরজের গোঙানিতে চোখ খোলে।
নীরজ চেয়ে আছে। কিছু বলছে। বলতে চাইছে। সাগরিকা তার মুখের কাছে কান পাতে।
—দেখো তো পোলিস আখুনো তৈনাৎ আছে কি না। স্টেটমেন্ট দেনা হ্যায়, জ়রুরী।
—সব হবে। আগে ডাক্তার পারমিশান দিক। ইউ আর স্টিল ক্রিটিকাল।
—সাগর, উই আর ক্রিটিকাল। আমাদের খুব বিপদ। স্টেটমেন্ট, এখনই চাই।
সাগরিকা অবাক হয়ে নীরজের দিকে তাকায়। এখনও বিপদ? এই হাসপাতালের সিকিওরিটির মধ্যে?
—আই পি ও কি বজহ্ সে হো রাহা হ্যায় সব। আপনেহি লোগ...
নীরজ যা বলে তাতে সাগরিকা স্তম্ভিত হয়ে যায়।
ডিভাইন গ্রুপের কোনো কোনো কোম্পানির ভিতরে অনেক ঘাপলা আছে। পয়সা তছরূপ, ফার্মা মলিকুল আমদানি নিয়ে দুর্নীতি যা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি লুকাতে পারবে না। নিয়ন্তা সংস্থাও সহ্য করবে না। নীরজ তাই আই পি ও-তে যাবার আগে এই ময়লা পরিষ্কার হোক এই দাবি করছিল। গ্রুপের কারো-কারো তাতে আপত্তি।
সাগরিকা পাথর হয়ে শোনে।
তাহলে আততায়ীকে সে চেনে কি না, সাগরিকা কী বলেছিল তাকে, এসবের কোনটাই নীরজের জিজ্ঞাস্য নয়, ভাবনার কারণও নয়!
—দেখ কেয়া রহে হ্যায় পাগলি! উসকা হাতসে গান ছুট গয়া জ়রুর, পর বহ্ মুঝে মারনা নহি চাহতে থে। নহি তো পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জসে...ম্যায় ভি উসে পেহচানা, একবার আয়া থা না ক্যাম্পাসমে, জানে কিঁউ তুনে মুঝসে নহি মিলায়া উস বকত, তেরা স্মল-টাউন মজনু...ইয়াদ নহি?
আছে, আছে, ছবির মত মনে আছে। কী একটা পলিটিকাল র্যালিতে এসেছিল পাগলটা...ময়দানে না গিয়ে তাদের ক্যাম্পাসে এসে ঘুরঘুর করছিল। ভেবেছিল তখনই বুঝিয়ে বলবে, কিন্তু অনেক না-বলা কথার মত এটাও না-বলাই থেকে গেছে।
—অব পোলিস কো বুলা লে প্লীজ়। দের না কর, বহ্ নহি, পর দুসরা কোই অ্যাটেম্পট করেগা জ়রুর।
সাগরিকার মাথার জট খুলে যায়। সত্যিই তো, যে পার্টিতে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট হয় ওটিপি দিয়ে, মোবাইল ইনভিটে থেকে, সেখানে পাগলটা ঢুকল কী করে!
৮
বাসটা আবার থেমেছে। আবার ওয়াশরুমে লাইন, স্ন্যাক্সের দোকানে, স্মোকিং জ়োনে ভিড়। তবে এটাই মনে হয় শেষ বিরতি। গন্তব্যের আর বেশি দেরি নেই।
প্রতীম রাস্তার একদম ধারে এসে দাঁড়াল। এদিকে কি সাইক্লোনের প্রভাব তত নেই? সামনের আকাশে লাল আভা দেখা যায়। দিগন্তের কাছে ওটা কি শুকতারা? উঁহু, অত নিচে তো শুকতারা হবে না, ওটা কি তবে ভেগা, অভিজিৎ? লিরা তারকাপুঞ্জ, অর্ফিয়াসের বীণার একটা তারা। ইসকুলের নীহারবাবু আকাশ দেখতে শিখিয়েছিলেন...শহরের এক-প্রান্তে স্যারের বাড়ির ছাদ থেকে উল্কাপাত দেখার জন্য প্রতীমরা যে কতবার সদলবলে উদয় হয়েছে......একটু একটু মনে আছে। হয়ত সঙ্গে স্যারের মুখের এইসব গল্পগুলোর জন্যই।
লোকেশন ম্যাপে দেখল কাছেই একটা নদী, নদীর ওপর ড্যাম। পাশেই পাহাড়ে একটা কেল্লা। সূরজগড়।
সে যাক, আপাাতত সে কী করবে? ইন্দোরে একবার কে-কের খপ্পরে পড়ে গেলে কে-কের চালেই চলতে হবে। উসকা স্ক্রিপ্ট। তা অর্ফিয়াস সাহস করে গিয়েছিল পাতালপুরী। আশ্চর্য বীণার ভরসায়। তার পকেটে বীণা না হোক, অস্ত্রটা তো আছে।
ফিরতি রুটের বাসে উঠে পড়লেই হয়।
কিন্তু সত্যি কি তাই?
আজ হোটেলের লবিতে পৌঁছে দেখেছিল বাউন্সারে বাউন্সারে ছয়লাপ অবস্থা। অতিথিদের মোবাইলের তালিকা তাদের কাছে আছে, অতিথিদের মোবাইলে ওটিপি পাঠানো হচ্ছে। এরকম অবস্থার জন্য সে তৈরী ছিল না। কে-কেরও পাত্তা নেই। কী করবে ভাবছে এমন সময় পিঠে টোকা দিল কেউ।
পিছনে ফিরে মানুষটাকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠল সে। এখন তারও পরনে কালো ইউনিফর্ম, সিকিউরিটি-ব্যাজ। সে ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে তাকে চুপ থাকতে বলল, সঙ্গে করে লবি থেকে সরিয়ে এনে এমপ্লয়ীদের প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে পাঠিয়ে দিল।
তাহলে শার্প শুটারের ব্যর্থতাও কে-কের হিসেবের মধ্যেই ছিল। শুটারের অতীতও। এর পর যদি কে-কে ইন্দোরে তাকে শেষ করে পুলিশের হাতে তার কুষ্ঠী-কুন্ডলী তুলে দেয়...অথবা মুম্বাই ফিরলে পুলিশের হাতে তাকে তুলে দেয়, একই স্ক্যান্ডাল হবে। আরেকটা জীবন বরবাদ হবে।
পিঠে টোকা দেওয়া বাউন্সার মানুষটা আর কেউ নয়, ভারসোভার সেই টাপড়ির রোজ়ি।
মানে, বিকল্প স্ক্রিপ্টও রেডি।
বাসটা ডাকাডাকি করছে। আরেকটা দূরপাল্লার বাস এসে ঢুকল ডিপোয়। ভিড়। মিশে গেলেই হয়...চট করে একটা ফন্দি এল মাথায়। কোট-পরা একটা লোক গুঁতোগুঁতি করে আগে উঠতে চাইছিল। টুক করে সেই লোকটার কোটের পকেটে ফোনটা গলিয়ে দিয়েই সরে দাঁড়াল। যেন একটু ধাক্কাধাক্কি কমলেই বাসে চড়বে।
বাস ছেড়ে দিল।
অর্ফিয়াস পিছনে ফিরে তাকিয়েছিল, তাই ইউরিদিসের আার ফেরা হয়নি।
সে ফিরে তাকাবে না।
সূরজগড়ের তালাওয়ের গর্ভে, তারা-ভরা আকাশের নিচে বিদায়-রাগিণী বাজিয়ে যাবে অনেকদিন। তারাটি শ্বেত-বামন হয়ে ওঠা পর্যন্ত। কত বিলিয়ন বছর যেন তার বাকি এখনো।
তা হোক।