




“হাঁটুটা সকাল থেকে কনকন করে চলেছে, চোখেও ভালো দেখি না, মাথাটা দপদপ করে…তবু যে কেন বেঁচে আছি, কীসের আশায় বেঁচে আছি, ভগবান জানেন!”
ক্ষুব্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে কমলাকান্ত আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিল । এক মুহূর্ত পরে কানে পায়ের মলের শব্দ আর নাকে জর্দা পানের গন্ধ ভেসে এল। ব্যাস, এনারই কমতি ছিল।
“কবে থেকে তো বলছি, চল ঘুরতে যাই,” হাতে বোরোলিন মাখতে মাখতে নলিনী ঘরে ঢুকল। “সারাটা জীবন এই এঁদো বাড়িটাতে কাটিয়ে দিল, আর থেকে থেকে ওনার বেঁচে থাকার কারণ খোঁজার তলব ওঠে।”
একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে, বালিশে দুটো চাপড় মেরে নলিনী খাটে বসল। কমলাকান্ত না দেখি না দেখি করে খবরের কাগজ খুলল।
“আরে যাব বললেই তো হুট করে বেরিয়ে যাওয়া যায় না। সবকিছুর, কী বলে যেন, একটা প্রস্তুতি লাগে।”
“ওই প্রস্তুতিই নিতে থাক। সতুদা গেল, কালীদা গেল, শিশির পর্যন্ত ছুটি কাটাতে চলে গেল, একা উনি আজও প্রস্তুত হতে পারলেন না। তোমার দ্বারা কাঁচকলা হবে।”
খবরের কাগজের আড়াল থেকে কমলাকান্ত বউকে ভেংচি কাটল।
“খোকা আর টিয়ার কথাটাও তো ভাবতে হবে। ওরা কি সব দিক সামলাতে পারবে?”
“ঢং আমার! খোকা এখন তার নিজের ছেলের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত। আর টিয়াও আজ বাদে কাল ছেলের বউ ঘরে আনবে। এখনো যদি ওরা সামলাতে না শিখে থাকে তো কোনদিন শিখবে না।”
“হুঁঃ! তোমার আর বলতে কী? নিজের কোলে করে তো মানুষ করতে হয়নি…”
বলতে বলতেই কমলাকান্ত বুঝতে পারল কথাটা বেফাঁস বলে ফেলেছে। নলিনীর একটা ক্ষতকে খুঁচিয়ে ফেলেছে। যা ভেবেছে তাই। পায়ের মলের শব্দ ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। কমলাকান্ত কাগজ নামিয়ে দেখল খাট ফাঁকা। নলিনী কোন ঘরে গেল কে জানে! একবার ভাবল, খুঁজতে যায়। কিন্তু হাঁটুর ব্যথাটা আবার খুব বেড়েছে। থাক গে, রাগ পড়লে আপনা থেকেই ফেরত আসবে।
কমলাকান্তর চোখ জানলার দিকে চলে গেল। পুবদিকের এই জানলাটা বরাবরই তার খুব পছন্দের। একটা সময় ছিল, যখন বাইরে তাকালে ঘন কাশফুলের বন, আর পুকুর দেখা যেত। আজকাল অবশ্য শুধু ফ্ল্যাট বাড়ি আর সাইনবোর্ড দেখতে পাওয়া যায়। তবু্ও, বর্ষার রাতে, ভিজে হাওয়া এসে কমলাকান্তর সারা গায়ে ঠান্ডা আঙুল বুলিয়ে দিয়ে যায়। কমলাকান্ত বলে, “দেখ নলিনী, ঠিক আমাদের ফুলশয্যার রাতের মতো!”
নলিনী বলে, “জানলাটা বন্ধ করে দাও। একে তো হেঁপো রুগী৷ এবার ভিজে হাওয়া গায়ে লেগে নিউমোনিয়া বাঁধাবে!”
“ধ্যাৎ, নিউমোনিয়া…বেঁচে থেকে হবেই বা কী? সুখহীন চিরদিন পরাধীন ওহে, ভ্রমিছ দীনহীন সতত মোহে…”
“রবি ঠাকুর যদি জানতেন তুমি মাঝরাতে কাব্যি শুনিয়ে আমাকে জাগিয়ে রাখবে, আমার মুখ চেয়ে তিনি একটি কলিও লিখতেন না।”
নলিনীটা বরাবর এরকম। এমনকি ফুলশয্যার রাতেও “এমা, তোমরা পানে জর্দা দাও না?” “এই দেখ, ভোলাদা টেবিলের পেছনটা মোটে ঝাড়ে না!” “বালিশটা একটু শক্ত নয়?” বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কমলাকান্ত ঘুমোয়নি। অপলক চোখে চন্দন, সিঁদুর আর গা ভর্তি গয়নায় সাজা কুড়ি বছরের সদ্য তরুণীর মুখ দেখে প্রায় সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছিল।
ঘুম ভাঙল যখন, বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। একবার মনে হল, সময়টা মাঝরাত, ফুলশয্যার আচার-বিচার শেষ করে সবে চোখটা লেগেছে। তারপর দেখল, কই না তো। ঘড়িতে মোটে ন'টা বাজে। ধীরে ধীরে অতীতের ছায়া মিলিয়ে গিয়ে বর্তমান স্পষ্ট হয়ে উঠল। ঘরে আলো জ্বলছে। দরজায় কে যেন টোকা দিচ্ছে। চশমা পরে চিনতে পারল, শুভ্রা।
“খেতে আসবে না বাবা?” শুভ্রা দরজা থেকেই জিজ্ঞেস করল, “নাকি ঘরে দিয়ে যাব?”
“না, দাঁড়াও, যাচ্ছি,” বলতে বলতে কমলাকান্ত লাঠিটা চেপে ধরল।
“হাঁটুর ব্যথাটা বেড়েছে, নাকি?” শুভ্রা এবার এগিয়ে এসে কমলাকান্তকে হাত ধরে তুলল। “অল্প জ্বরও আছে। সেরকম হলে আজ নাহয় নীচে না নামলে।”
“নাঃ, সারাদিন পরে তোমাদের মুখগুলো তবু দেখতে পাই। সারাদিন তো শুধু আমি আর নলিনী এ বাড়িটাতে ভূতের মতো ঘুরে বেড়াই।”
শুভ্রার হাত ধরেই কমলাকান্ত সিঁড়ি দিয়ে নেমে টেবিলে বসল। খোকা আগেই বসে গেছে। জোজো দাদুকে দেখে এক গাল হাসল।
“ঘুম ভাঙল তাহলে? আমি কতবার ওপরে গিয়ে দেখে এলাম।”
“তুই আমার ঘরের আলো জ্বালিয়েছিলি বুঝি? আমি ভাবলাম নলিনী এসেছিল। হ্যাঁ রে খোকা, নলিনী খাবে না?”
খোকা ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
“জানি না। তুমি জিজ্ঞেস করো।”
“আরে, দুপুরবেলা আমার ওপর রাগ করে পাশের ঘরে চলে গেল। ভাবলাম বিকেলে একসঙ্গে চা খাব, কিন্তু আর এল না।”
“তুমি কী করে জানলে আসেনি?” জোজো জিজ্ঞেস করল। “হয়তো এসেছিল, তুমি তখন ঘুমচ্ছিলে।”
“আমি দেখে এসেছি বাবা,” শুভ্রা বলল, “দুধ মুড়ি খেয়ে ঘুমচ্ছেন।”
খোকা ডালের বাটিটা ঠেলে সরিয়ে দিল।
“আবার এই নলিনীকে নিয়ে আদিখ্যেতা শুরু হল।”
“নলিনী কী রে?” কমলাকান্ত ঝাঁঝিয়ে উঠল, “মা বলতে পারিস না?”
“না পারি না!” খোকা এখনো কমলাকান্তর চোখে চোখ রেখে কথা বলে না, কিন্তু গলার আওয়াজে বিরক্তি লুকিয়ে রাখতে পারল না। “আমার মায়ের নাম চারুশশী চ্যাটার্জি। এবং তিনি আমার পাঁচ বছর বয়সে মারা গেছেন। এই নলিনী তোমার জন্য এ বাড়িতে এসেছে, তোমার জন্য থাকে, তুমি তার খোঁজ নাও গে যাও। আমি বা শুভ্রা এসব নাটক করতে পারব না!”
“আঃ, সন্দীপ!” শুভ্রা মাংসের হাতাটা নামিয়ে রাখল। “এভাবে উত্তেজিত হওয়ার কী আছে? আমার কোন অসুবিধা হয় না, বাবা। তুমি চিন্তা কোরো না।”
ঝম ঝম ঝম।
মলের শব্দ শুনে কমলাকান্ত দোতলার বারান্দার দিকে তাকাল। শুভ্রাও একটু অবাক হয়ে তাকাল। কখন যেন নলিনী ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
“খোকা যখন চায় না, তুমি কেন জোর করে 'মা' বলাতে চাও?” ওপর থেকেই নলিনী বলল। “মা বলে না ডাকলেই কি আমি ওর মা হলাম না?”
খোকা নলিনীর দিকে তাকিয়ে দেখল না। উত্তরও দিল না।
“তুমি খেয়ে এস, আমি শুতে গেলাম।”
নলিনী ঘরের দিকে রওনা দিল। কমলাকান্ত খাওয়া শেষ করে গিয়ে দেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। কমলাকান্তর আবার এক অদ্ভুত রোগ আছে। সারারাত ঘুম আসে না। এ রোগ তার অনেকদিনের। নলিনী একবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি মাঝরাতে জেগে জেগে করো কী?”
কমলাকান্ত ওকে সব খুলে বলেছিল।
সে ছিল লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাত। সদ্য মাকে হারানো টিয়ার কান্না থামাতে কমলাকান্তর মা, শাশুড়ি হিমসিম খাচ্ছে। পাঁচ মাসের শিশু, ঝিনুকে করে খেতে শেখেনি, মায়ের দুধ চায়। শোকে বিহ্বল কমলাকান্তকে সেদিন মেয়ের জন্যে স্বেচ্ছা কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। সারা রাত বাগানে পায়চারি করে, আর মেয়েকে গান শোনায়। শোনাতে শোনাতেই চোখ থেকে জলের ধারা নেমে আসে। ঠাকুমা, দিদিমা সেই ফাঁকে মেয়ের মুখে দুধ ঢেলে দেয়।
তারপর টিয়ার অন্নপ্রাশন হল, ভাত চটকে খাওয়ানো শুরু হল, কিন্তু কমলাকান্তর মেয়েকে বুকে করে সারারাত বাগানে ঘোরা বন্ধ হল না। মাঝেমাঝে খোকাও যোগ দিত। গান গেয়ে ছড়া বলত। পরদিন সকালে কমলাকান্ত ন'টার মধ্যে অপিসে ঢুকে যেত। যেন সবই আগের মতো স্বাভাবিক গতিতে চলছে।
তারপর ধীরে ধীরে টিয়া, খোকা, দু'জনেই রাত জাগা বন্ধ করে দিল। কমলাকান্তও যে মোটে ঘুমত না, তা নয়। কিন্তু যখন তখন ঘুম ভেঙে যেত। তারপর শুরু হত বাগানময় পায়চারি, অস্থিরভাবে কাকে নিরন্তর খুঁজে চলা।
তখন কোথায় ছিলে, নলিনী?
এখন আর কমলাকান্ত রাতে বাগানে যায় না। ঘুম ভাঙলে উঠে হাঁ করে নলিনীর দিকে তাকিয়ে থাকে। স্ত্রীকে হারানোর পরের সেই দিনগুলো কাটানোর সময় কমলাকান্ত কি আর জানত, আজকের এই দিনটাও আসবে?
ভাবতে ভাবতে কমলাকান্তর বুকের ভেতরের জমা বরফটা গলে গিয়ে উষ্ণ হাওয়া বইতে থাকে। খোকা আর টিয়া না বুঝলেও, কমলাকান্ত জানে। নলিনী কীভাবে তার জীবনটা পুরো বদলে দিয়েছে। যদিও তাকে দেওয়া একটা কথা এখনো রাখা হয়নি। আজও কমলাকান্ত নলিনীর সঙ্গে ছুটি কাটাতে যেতে পারেনি।
কতবার কমলাকান্ত নিজেকে প্রশ্ন করেছে। কেন, কীসের আশায় সে এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে নিজেকে আটকে রেখেছে? সময় তাকে ফেলে এগিয়ে গেছে। খোকা, টিয়া বড় হয়ে গেছে। তাকে ছাড়া সংসারের কোথায়, কোন্ কাজটা বাকি রয়ে যাবে? চারুশশী তো কবেই “এ জীবন নিশার স্বপন” বলে পরপারে চলে গেছে। মা, ভাই, সবাই সেই পথ ধরে হেঁটে চলে গেছে। আর সামান্য একটা ছুটি নিতে তার এত ভয়? যতবার ভেবেছে ততবার মলের শব্দ কানের কাছে বেজে উঠেছে। নলিনী হাত বাড়িয়ে বলেছে, “চল না, দু'জনে মিলে বেরিয়ে পড়ি। শিলিগুড়ি, কার্শিয়াং, দার্জিলিং…বা অন্তত পুরী, ভুবনেশ্বর।”
কিন্তু প্রতিবার কমলাকান্ত কিছু না কিছু ছুতো করে পিছিয়ে গেছে। খোকা, টিয়ার কী হবে? খোকার চাকরিটা হয়ে যাক, তারপর। টিয়ার বিয়েটা তো দিতে হবে। সবে বাড়িতে নাতি এসেছে, এখনই কী করে যাব?
প্রত্যেক বার নলিনী নিঃশব্দে হাত সরিয়ে নিয়েছে। কোন দাবি ছাড়াই সে আড়ালে সরে গেছে, যেন চারুশশীর রেখে যাওয়া সংসারে তার হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।
“নলিনী…আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
***
“হ্যালো…হ্যালো টিয়া, বাবার শরীরটা ভালো নয় রে…শুভ্রা সকালে চা দিতে গিয়ে ডাকল, তখন চিনতে পারল না…না না, নিঃশ্বাসে কোন কষ্ট নেই। হ্যাঁ, তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়। আমি কস্তুরীকে ফোন করছি…”
ফোন ছেড়ে খোকা কস্তুরীর নম্বর টিপতে শুরু করল।
কস্তুরী কমলাকান্তর বন্ধু শিশিরের মেয়ে। দুই পরিবার পরস্পরকে প্রায় আত্মীয়ের মতোই দেখে। স্টেথো দিয়ে রুগীর বুক, পেট পরীক্ষা করে সে গম্ভীর মুখে খোকার দিকে তাকাল।
“কী বুঝছিস রে? কী হয়েছে বাবার?”
“কয়েকটা পরীক্ষা না করে বলা যাবে না, তবে মনে হচ্ছে একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে।”
ঘরের মধ্যে কেউ একজন আঁতকে উঠল। হয় শুভ্রা নয়তো টিয়া।
“এখন কেমন আছে? লাইফের রিস্ক নেই তো?”
“জেঠুর নব্বই বছর বয়স হয়েছে, সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আমি হসপিটালে একটা ফোন করে বেড রাখতে বলে দিচ্ছি। তোমরা তৈরি হয়ে নাও।”
কস্তুরী একটা শুকনো হাসি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। টিয়া অস্ফুট স্বরে বলল, “এই জন্য বলেছিলাম একজন রাতের নার্স রাখতে, কিন্তু বাবার ওই এক জেদ…”
হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে ঘরের দরজা জানলা কাঁপিয়ে দিয়ে গেল।
ঝম ঝম ঝম…
মলের আওয়াজে খোকা, টিয়া, শুভ্রা, জোজো সবাই দরজার দিকে তাকাল। মুহূর্তের জন্যে খোকার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
অসম্ভব…অসম্ভব…
“মা…”
খোকার অজান্তেই ওর মুখ থেকে নামটা বেরিয়ে পড়ল। চোখের সামনে দেখা দৃশ্যটা সত্যি না মায়া? নাকি হ্যালিউসিনেশন?
মায়ের চেহারায় কোন পরিবর্তন নেই। অসুখের আগে যেমন ছিল, ঠিক সেরকম – মাথায় একঢাল কালো চুল, কাজললতার মতো চোখ, হাত ভর্তি চুড়ি, শাঁখা, পলা…টিয়াও পুরনো আ্যালবামে এই ছবি দেখেছে। সে ধপ করে একটা চেয়ারের ওপর বসে পড়ল। শুভ্রা, জোজো যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে।
“দাদা, তুইও দেখতে পাচ্ছিস?”
“মা, মা তুমি এসেছ? এসব কী হচ্ছে?”
মলের আওয়াজ বিছানার দিকে এগোতে থাকল। সোজা কমলাকান্তর দিকে।
“নলিনী…” কমলাকান্ত জড়ানো গলায় বলে উঠল, “নলিনী তুমি এসেছ?”
নলিনী হাত বাড়িয়ে দিল।
“চল, টিকিট কাটা হয়ে গেছে। এবার আর তোমার কোন ছুতো শুনব না।”
মায়ের কথার মানে বুঝতে খোকা আর টিয়ার এক মুহূর্ত সময় লাগল। তারপর দু'জনেই পাগলের মতো ছুটে এল।
“টিয়া, মা বাবাকে নিয়ে যেতে এসেছে! বাবাকে নিয়ে যেয়ো না মা!”
“তোমাকে আমার মনে পড়ে না। মা কাকে বলে কোনদিন জানতে পারিনি। বাবা-ই আমার সবকিছু। বাবাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না মা!”
অবশেষে নলিনী খোকা, টিয়ার দিকে মুখ ঘোরাল। সেই পরিচিত ভঙ্গি, ঘাড়টা একটু বেঁকিয়ে মুখ তুলে তাকানো – যেন খোকা কত জন্ম পরে আবার দেখতে পেল।
নলিনী ঠান্ডা গলায় বলল, “আজও তোরা শুধু নিজেদের কথা ভাববি? আমাকে ছাড়া, মা, ঠাকুরপোকে ছাড়া, সতুদা, কালীদা, শিশিরকে ছাড়া, তোদের বাবা কীভাবে বেঁচে আছে তোরা একবারও জানতে চেয়েছিস? শুধু তোদের ভালোবেসে, তোদের মুখ চেয়ে মানুষটা এতদিন নিজেকে কাঁটাতারে বেঁধে রেখেছে। সেই সব ক্ষত তোরা দেখতে পাস না? তোদের মানুষ করেছে, বিয়ে দিয়েছে, নাতি নাতনী খেলিয়েছে, আর কত চাই তোদের? এখনো তোদের সাধ মেটেনি?”
“আর ক'টা দিন…আরো ক'টা দিন!”
টিয়া বারবার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। খোকা মায়ের থেকে চোখ সরিয়ে বাবার দিকে তাকাল। জলে তার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
“বাবা, এখনই যেয়ো না বাবা! আর ক'টা দিন… অন্তত জোজোর বিয়েটা দেখে যাও!”
নলিনী আর এক পা এগিয়ে এল।
“তোমাদের সাধ মেটানোর জন্যে আমি এখানে আসিনি। আমার স্বামীর সঙ্গে কথা ছিল। কথামতো সে ডেকেছে, তাই এসেছি।”
কমলাকান্ত মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, এবার ছুটি নেব…”
কোথা থেকে যেন বসন্তের হাওয়া গায়ে লাগছে। আরামে কমলাকান্তর চোখ বুজে এল।
যখন চোখ খুলল তখন সে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আজকের ঘর নয়, অনেক দিন আগের, যখন পুবের জানলা দিয়ে পুকুর দেখা যেত। এখন পশ্চিমের জানলা দিয়ে শেষ দুপুরের সোনালি রোদ ঘরে ঢুকে চকচকে সেগুন কাঠের আলমারির ওপর পড়েছে। আলমারির গায়ে লাগানো আয়নায় কমলাকান্ত নিজেকে দেখতে পেল। পাটভাঙা ধুতি আর পাঞ্জাবী পরা, চার মাস আগে বিয়ে হওয়া এক নব্য যুবকের ছায়া তার দিকে তাকিয়ে একটু বোকা বোকা হাসল। পেছন থেকে জর্দা পানের গন্ধ ভেসে এল। কমলাকান্ত আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই জিজ্ঞেস করল, “লেটারবক্সে তোমার নাম লিখিয়েছি, দেখেছ? এবার থেকে তোমার বাপের বাড়ির চিঠি এলে, তোমার নামেই আসতে পারবে।”
“ধুর! দেখার আবার কী আছে, সেকেলে নাম একটা - চারুশশী – শুনলে মনে হয় এখনি বুড়ো হয়ে গেছি। ও নাম লিখলেই বা কী আর না লিখলেই বা কী?”
কমলাকান্ত এবার ঘুরে দাঁড়াল। লালের ওপর সাদা কাজ করা ঢাকাই শাড়িতে যেন নববধূকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছে। দু'হাত বাড়িয়ে সে চারুর কাঁধ জড়িয়ে ধরল।
“আমার নাম তো কমলাকান্ত। সে-ই বা কী এমন আধুনিক শুনি?”
“তোমার নাম তো আর আমি মুখে আনব না, 'এই যে', 'ওই যে', 'শুনছ', এসব করেই চালাব। কিন্তু আমার নামটা তো সারাক্ষণ তোমার মুখে শুনতে পাব।”
“বেশ, তবে তোমার জন্যে নতুন নাম খুঁজি।”
এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে হঠাৎ পুকুরের দিকে চোখ পড়ে গেল। টলটলে জলে শালুক ফুল ফুটে আছে। তাই দেখে মনে হল,
“নলিনী…”
চারু ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“এই নাম ভেবে পেলে?”
“হ্যাঁ। বেশ বিদুষী, কবি কবি নাম। আমি কমলাকান্ত, আর তুমি আমার নলিনী। এবার কেমন হল?”
চারু কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর পান দিয়ে রাঙানো ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটল।
“বেশ। কিন্তু শুধু যখন আমরা একা থাকব। মা, ঠাকুরপোর সামনে আবার বলে বস না।”
“না না, পাগল নাকি?”
“না তুমি একটু মুখ ফসকা। ঠিক বলে ফেলবে। আমার গা ছুঁয়ে বলো।”
“আরে বলছি তো, শুধু যখন তুমি আর আমি থাকব তখন বলব।”
“তাহলে ঠিক আছে।”
কমলাকান্ত স্ত্রীর দিকে সামান্য ঝুঁকল। বিয়ের চার মাস কেটে গেলেও কালিদাসের কাব্যে পড়া অধরচুম্বনটা এখনো সে ভালোভাবে রপ্ত করতে পারেনি। একটা আনাড়ি প্রচেষ্টা করল। নলিনীও একটু লাজুক হেসে তার প্রতিদান দিল।
“চল, বায়োস্কোপ দেখতে যাই। সবাই বলছে, 'ইন্দ্রাণী' খুব হিট হয়েছে। উত্তম সুচিত্রার ছবি।”
নলিনী ঠোঁট বেঁকিয়ে জানলার দিকে চলে গেল।
“তোমার দৌড় ওই বায়োস্কোপ অবধি। বিয়ের চার মাস হয়ে গেল এখনো কোথাও ছুটি কাটাতে গেলাম না। দিদি জামাইবাবু বিয়ের এক মাসের মাথায় শিলিগুড়ি, কার্শিয়াং, দার্জিলিং সব ঘুরে এসেছিল।”
“যাব, যাব, সামনে একটা প্রমোশন আসছে না? ওটা ভালোয় ভালোয় হয়ে যাক, তারপর তোমাকে নিয়ে ঘুরতে বেরব।”
নলিনী কী উত্তর দিল তা আর শোনা হল না। কমলাকান্তর চোখের সামনেটা দুলে উঠল। নলিনী, জানলা, পুকুর, সবটা তালগোল পাকিয়ে ঘুরতে থাকল। ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে থামল এক শীতের দুপুরে। আবার ঘর ভর্তি সোনালি আলো ঝলমল করছে। কমলাকান্ত পালঙ্কের একধারে শুয়ে আর নলিনী অন্য ধারে বসে উল বুনছে। খোকা মাঝখানে খেলা করছে।
“ভাবছি কাল খোকাকে নিয়ে চিড়িয়াখানা যাব,” কমলাকান্ত হাত বাড়িয়ে ডিবে থেকে একটা পান তুলল। “এখন বুঝতে শিখেছে, বাঘ সিংহ দেখে মজা পাবে। কী বলো?”
“সদুদি বলছিল পুরীতে একখানা ভালো বাড়ির খোঁজ জানে,” নলিনীর উলের কাঁটা চলতে থাকল, “বড় বাড়ি। রান্নাঘর আছে। মা, ঠাকুরপো সবাই যেতে পারবে। মার জন্যে আলাদা রান্না করতে পারব।”
“পুরী?” কমলাকান্ত উঠে বসল। “কিন্তু খোকার যে মোটে আড়াই বছর বয়স! এত ছোট বাচ্চা নিয়ে রেলগাড়ি করে যাওয়া…”
“বুড়ো থেকে বাচ্চা সবাই রেলগাড়ি চড়ে যাচ্ছে, একা তোমার খোকা-ই পারবে না, নাকি? খোকাকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। আমি আছি, মা আছেন, আমরা সামলে নেব।”
“অপিসে নতুন বস এসেছে, সবাই বলছে খুব কড়া। যদি ছুটি না দেয়…”
“বুঝলাম,” নলিনী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমার বাকি জীবনটা এই ঘরেই কাটতে চলেছে।”
“আরে তা কেন? ছুটি কাটাতে যাব বৈ কি! শুধু খোকা আরেকটু বড় হয়ে যাক…”
“বেশ।”
“নলিনী, এই নলিনী, রাগ করে না…”
নলিনী কাঁটা নামিয়ে রাখল।
“খোকার সামনে নলিনী বলে ডাকলে যে?”
“তাতে কী হয়েছে? ও কি কিছু বুঝতে পারে নাকি?”
“সব বোঝে। এখুনি সারা বাড়ি রাষ্ট্র করে আসবে।”
“বাপ রে, নিজের বউয়ের নামকরণ করেছি না গোহত্যা করেছি বুঝতে পারছি না।”
নলিনী হেসে কমলাকান্তর দিকে উলের গোলা ছুঁড়ে মারল।
আবার সব তালগোল পাকাতে শুরু করল। কমলাকান্ত জানে, সময় কোনদিকে ছুটে চলেছে। সে প্রাণপণে চেপে ধরে ঘড়ির কাঁটা থামানোর চেষ্টা করতে থাকল, কিন্তু সে কি থামিয়ে রাখা যায়?
জানলা দিয়ে সোনালি আলো এসে ঘরে উপচে পড়ছে। যেন চারিদিকে কত না আনন্দের হিল্লোল উঠেছে। নলিনী খাটে শুয়ে। মা পাশের ঘরে টিয়াকে সামলাচ্ছে। খোকা? খোকা বোধহয় ইস্কুলে গেছে।
একটু আগে শিশির এসে নলিনীকে দেখে গেছে। জ্বরের কারণ ধরা যাচ্ছে না। শিশির বলেছে, হাসপাতালে দিতে।
নলিনী তার শাঁখা, পলা, আর একগুচ্ছ চুড়ি পরা হাত কমলাকান্তর দিকে বাড়িয়ে দিল।
“দেখলে তো, কী বলেছিলাম? সারাটা জীবন আমার এই ঘরেই কেটে যাবে।”
কমলাকান্ত নলিনীর হাত নিজের দু'হাতের মধ্যে চেপে ধরল।
“কী যা তা বলছ? শিশির বলল তো, হাসপাতালে ভর্তি করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নলিনীর চোখের কোনা থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
“টিয়া বড্ড ছোট…ওকে তুমি চোখে চোখে রেখ। কথা দাও, রাখবে।”
“না…আমি পারব না…তুমি না থাকলে…আমার দ্বারা হবে না।”
নলিনী হাল্কা হাসল। কমলাকান্ত অনুভব করল, চোখের জলে তার গাল ভিজে যাচ্ছে।
“পারতে যে তোমাকে হবেই। এখন ক'দিন।”
“আর তারপর?”
“তারপর? তারপর যদি ক্লান্ত হয়ে যাও, প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে, এই বাড়ির সীমানা ছেড়ে অনেক দূরে যেতে ইচ্ছে করে, আমি এসে নিয়ে যাব। আমাকে তো নিয়ে গেলে না, আমিই তোমাকে নিয়ে যাব।”
“কথা দিচ্ছ, আমি ডাকলেই এসে নিয়ে যাবে?”
নলিনীর যেন নড়তেও কষ্ট হচ্ছে। অনেক চেষ্টা করে সে মাথা ঝাঁকাল।
“কথা দিচ্ছি।”
বিছানা থেকে উঠে কমলাকান্ত তার শীর্ণ, কোঁচকান হাত নলিনীর হাতে রাখল। নলিনী তাকে নিয়ে চলল, ঘর পেরিয়ে বারান্দায়। কমলাকান্ত পাশের ঘরের দিকে তাকাল। এক সময়ে মা ওঘরে টিয়াকে নিয়ে থাকত, আর খোকা শুত কমলাকান্তর সঙ্গে। ভাই থাকত কোণের ঘরটাতে।
তারপর ভাই বিয়ে করে বোম্বাই চলে গেল। মা চলে গেল না-ফেরার দেশে। ঘর দুটো খোকা আর টিয়ার দখলে গেল। তারপর টিয়ারও বিয়ে হয়ে গেল। এখন টিয়ার ঘরে জোজো থাকে। কমলাকান্ত আগেই নলিনীকে সব ঘুরিয়ে দেখিয়েছে।
নলিনীর হাত ধরে কমলাকান্ত সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল। নলিনী যখন এ বাড়ির কর্ত্রী ছিল, তখন অন্য সিঁড়ি, অন্য বসার ঘর, রান্নাঘর ছিল। সেসব দুমড়ে মুচড়ে শুভ্রা নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে।
“তুমি তো এই সিঁড়ি দিয়ে একটিবারও নামনি,” কমলাকান্ত বলে উঠল, “নীচের তলার সবকিছু অচেনা ঠেকে?”
“অচেনা কেন?” নলিনী আঙুল তুলে দেখাল, “ওই তো সব আগের মতন আছে।”
কমলাকান্ত তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তার সেই চেনা রান্নাঘর! যার সবখানে নলিনীর হাতের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। মাত্র সাত বছরের বিবাহিত জীবন, কিন্তু কমলাকান্তর কাছে সেটাই ছিল সংসার। ওই তো, শিল নোড়ায় পোস্ত বাটা হচ্ছে। মায়ের জন্যে আলাদা নিরামিষ রান্না হবে। ওই যে, নিরামিষ বঁটিটা ধারে রাখা আছে। উনুন থেকে হাল্কা ধোঁয়া উঠছে, জানলা দিয়ে ভেসে আসা ত্রসরেণুর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। কার বাড়িতে যেন রেডিও বাজছে – আগে ভী জানে না তু, পিছে ভী জানে না তু… বাথরুম থেকে মার্গো সাবানের গন্ধ ভেসে আসছে – ভাই বোধহয় স্নানে গেছে। এই তো, এই তো কমলাকান্তর চেনা জগৎ!
ঘড়ির কাঁটার আওয়াজ ছাপিয়ে মলের আওয়াজ বাজতে থাকে। ঝম ঝম ঝম।
দেখতে দেখতে কখন যেন কমলাকান্ত সদর দরজার কাছে চলে এসেছে। নলিনী দরজা খোলার জন্যে হাত বাড়াল।
কিন্তু কমলাকান্তর পা সরল না।
“নলিনী, একটা কথা ভাবছিলাম…”
মুখ ফিরিয়ে নলিনী সামান্য হাসল। তিক্তমধুর। যেন কমলাকান্তর মনের ভেতরটা সে আগেই বুঝে ফেলেছে।
“মানে বলছিলাম,” কমলাকান্ত আমতা আমতা করতে থাকে, “সামনে জোজোর বিয়ে। এই সময়ে এরকম একটা অঘটন ঘটলে…”
পোস্ত বাটা, রেডিও আর মার্গো সাবানের গন্ধ কোথায় মিলিয়ে গেল। তার জায়গায় নতুন নতুন ছবি ফুটে উঠতে লাগল। টিয়াকে নিয়ে সারারাত ঘরময় পায়চা্রি করা, খোকার ফুটবল খেলে হাঁটু ছড়ে বাড়ি ফেরা, শুভ্রার প্রথম লুচি বানিয়ে খাওয়ানো, টিয়ার সঙ্গে ধুলোপায়ে এসে অমলের লজ্জা, ছোট্ট জোজোর প্রথম বাড়িতে আসা… এই সদর দরজা, রান্নাঘরের সঙ্গে সঙ্গে কমলাকান্ত নিজেও কি সেসব দিনের সাক্ষী নয়?
মলের শব্দ থেমে আবার ঘড়ির কাঁটা চলতে থাকে। পঁয়ষট্টি সালে নলিনীর জীবন শেষ হয়ে গেছে কিন্তু কীভাবে যেন, এক লহমায় চেনা জীবনকে সম্পূর্ণ পালটে দেওয়া সেই ভয়ংকর বজ্রপাতের পরেও, সময়ের তুলি অপ্রত্যাশিতভাবে বারবার পুরনো ছবি মুছে দিয়ে জীবনের ক্যানভাসে নতুন রঙ বুলিয়ে দিয়েছে। ক্লান্ত হলেও, জীর্ণ হলেও, কমলাকান্তর জীবন ব্যর্থ হয়নি।
“টিয়াকে এভাবে কাঁদিয়ে চলে যাব? খোকা কোনদিন আমার কাছে কিছু চায়নি। আজ এরকম করে কেঁদে বলছে… শুভ্রা আর জোজো কতবার শুধু আমার মন রাখার জন্যে বানিয়ে বানিয়ে বলেছে, তোমাকে দেখে এসেছে, তুমি ভালো আছ… ”
নলিনী এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তারপর আলতো করে নিজের হাত সরিয়ে নিল। আরো একবার।
“বেশ। বুঝলাম। এখনো ওই এঁদো ঘরখানা ছেড়ে বেরতে চাও না। কিন্তু আমি আবার আসব। জোজোর বিয়ে হয়ে গেলে আর কোন অজুহাত শুনব না।”
কমলাকান্ত হেসে ফেলল।
“তুমি একটুও পালটালে না। বেশ, এরপর যখন আসবে আমিও বোঁচকা বেঁধে তৈরি থাকব। যেখানে বলবে মার্চ করে রওনা দেব।”
“কথাটা যেন মনে থাকে।”
কমলাকান্ত ঘুরে দাঁড়াল। বাড়ির ভেতর দিকে মুখ করে। তারপর নীচের তলা ছেড়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকল। ওপরে, যেখানে সবাই তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে। খোকা, টিয়া, শুভ্রা, জোজো…
নলিনীকে পেছনে ফেলে।
একবার ফিরে তাকাল। ততক্ষণে একতলাটা ফাঁকা ধু-ধু করছে।