




বৈদিক ক্রিয়াকর্মে স্বস্তিবাচন কিংবা মন্ত্রোচ্চারণ অবধারিতভাবে শেষ হয় শান্তি উচ্চারণ দিয়ে – ওঁ শান্তি, ওঁ শান্তি ওঁ শান্তি। অনেক যুগ পেরিয়ে এসে বর্তমান সময়েও পূজা-অনুষ্ঠান শেষে – পারিবারিক অথবা সর্বজনীন উভয় ক্ষেত্রেই – পুরোহিত মশাই শান্তিপাঠ করতে করতে শান্তিজল ছিটিয়ে দেন ভক্তবৃন্দের নতমস্তকের উপর। শান্তিলাভের জন্যে ব্যাকুলতা প্রবহমান রয়েছে সেই বৈদিক সময় থেকে এখনও পর্যন্ত।
শান্তির জন্যে কেন এই ব্যাকুলতা? তার উত্তর খুঁজতে শান্তিমন্ত্রের উদ্গাতা ঋষিদের সময়কালে ফিরে যেতে হয়। বিরুদ্ধ কিছু মতবাদ সত্ত্বেও এটা প্রায় প্রতিষ্ঠিত সত্য যে ভারতে আর্যদের আগমন ঘটেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। এক যাযাবর জাতি – যাদের সঞ্চরণ ছিল এক পশুপালন-ক্ষেত্র থেকে অন্য এক পশুপালন-ক্ষেত্রে নেহাতই জীবিকা নির্বাহের তাগিদে –- ভাগ্যক্রমে এসে পৌঁছেছিল ভারতের সিন্ধু উপত্যকায়। তখনও এই ভূভাগ ভারত নামে পরিচিত হয় নি, পুরাণে উল্লিখিত হয়েছে জম্বুদ্বীপ নামে। ভারত নাম এসেছে অনেক শতাব্দী পরে –- পৌরাণিক ইক্ষ্বাকু বংশের এক পরাক্রান্ত নৃপতি ভরতের নামে, যিনি দুষ্মন্ত-শকুন্তলার পুত্র, এবং যাঁর নাম বহন করে সৃষ্ট হয়েছে তাঁর পরবর্তী বংশধরদের আখ্যান নিয়ে মহাভারত। সেই মহাভারত, যে নাম উচ্চারণে এখনও আবিষ্ট হয়ে মনে করতে হয় ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’ – মহাভারতে যা নেই, তা ভূভারতে নেই।
মহাভারত তো অনেক পরের কথা। ঊষর মধ্য এশিয়া থেকে সুজলা-শস্যশ্যামলা সিন্ধু নদীতীরে পৌঁছে যাযাবর গোষ্ঠীর কোন এক মননশীল ব্যক্তির কন্ঠে স্বতঃস্ফূর্ত ধ্বনিত হয়েছিল ঃ ‘মধু বাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরতি সিন্ধবঃ’ – বাতাস মধু বহন করছে, নদী সিঞ্চন করছে মধু। এই ধরনের স্বতন্ত্র-চিন্তার ব্যক্তিরা সর্ব কালে সর্ব সমাজে দুর্লভ – ‘শুধু দিন যাপনের শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি’র সীমানা পেরিয়ে যাঁরা করেন অমৃতের সন্ধান – যাঁরা ঘোষণা করতে পারেন –
শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ
আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূঃ,
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্
আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।
তমেব বিদিত্বাহমৃত্যুমেতি
নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায়। (শুক্ল যজুর্বেদ)
তাঁরা কবি –-ক্রান্তদর্শী। তাঁরা ঋষি –-যাঁরা প্রত্যক্ষ করতে পারেন এক অতিবাস্তবের, যা এই বাস্তব জগতের সঙ্গে একান্তভাবে সম্পৃক্ত।
শান্তি মানে কী? অস্থিরতা থেকে মুক্তি –- তা সে ব্যক্তিগত জীবনেই হোক বা সমাজ জীবনে। এই অস্থিরতা আসে জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে। শুধু বাঁচার জন্যে সংগ্রাম করতে হলে থাকে না উচ্চতর চিন্তার অবকাশ। উর্বর জমি আর অনুকূল পরিবেশ যাযাবরদের স্থিতু করল নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে—উদর পূরণের চিন্তা অতিক্রম করে তারা অনুভব করল ‘Man cannot live by bread alone’। অবকাশ সুযোগ দিল মহত্তর সৃষ্টির –এল বেদ উপনিষদ দর্শন। এই সব সৃষ্টির মূলে রয়েছে সামাজিক শান্তি, যার স্তুতি প্রতিফলিত হয়েছে বারংবার শান্তিবাচন উচ্চারণে। অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতাতেও একই ভাবে ঘটে থাকবে এই মানসিক উত্তরণ। সেমিটীয় সভ্যতায় তাই অনিবার্যভাবে এসেছে ‘সালাম আলেকুম’ – আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।
আধ্যাত্মিক আধিদৈবিক আর আধিভৌতিক –-এই ত্রিতাপ দুঃখে মানবজীবন জর্জরিত। এগুলো প্রত্যক্ষ করে আর এদের থেকে পরিত্রাণের পন্থা খুঁজতে রাজপুত্র গৌতম গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। কঠোর সাধনায় লাভ করেছিলেন বুদ্ধত্ব, পেয়েছিলেন নির্বাণের সন্ধান। ভারতের ভূভাগ ছাড়িয়ে তাঁর বাণী প্রচারিত হয়েছিল এক বিশাল ভূখণ্ডে। তাঁর ভক্তেরা নির্বাণ লাভ করতে না-পারলেও কোন এক শান্তির সন্ধান পেয়েছেন। ধর্মকে কার্ল মার্ক্স অভিহিত করেছেন ‘জনসাধারণের আফিং’ হিসাবে, অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে যার যাথার্থ অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তাঁর অন্ধ অনুগামীরা কি এক অন্যতর আফিং-এ আসক্ত হয়ে পড়ে নি? মানুষের চিন্তার জগৎ বড়ো জটিল –- ফ্রয়েড সাহেব সেই জগতের দ্বার উন্মুক্ত করে দিলেও সেই জগতের বৃহত্তর ক্ষেত্র এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। আর সেখানেই মানুষের প্রয়োজন পড়েছে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানেরব-–‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোন্ খানে’।
তাই শান্তির প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এসেছে, এবং এখনও আসছে। ব্যক্তিগত মানসিক শান্তি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন কেউ কেউ তাঁদের তপশ্চর্যা আর পুরুষকারের জোরে—কিন্তু তাঁরা কোটিতে গুটি। বৃহত্তর সংখ্যার কিছু জন তাঁদের সান্নিধ্যে বা পথ নির্দেশনায় পেয়েছে সাময়িক শান্তি। কিন্তু দুর্যোগ মহামারী দুর্ভিক্ষ যুদ্ধ রাষ্ট্রবিপ্লব প্রতিনিয়ত বিপন্ন করে রেখেছে বৃহত্তর জনসমাজকে। অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না, মানুষের সুচেতনা তাকে আশ্বাস দেয় –
…এই পথে আলো জ্বেলে—এ-পথেই
পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে,
সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ। (সুচেতনা, জীবনানন্দ দাশ)
মানুষ থেমে থাকতে পারে না –- তাকে এগিয়ে যেতে হয় বন্ধুর পথে, অশান্ত বাতাবরণকে উপেক্ষা করে। তাকে প্রত্যক্ষ করতে হয় সুর-অসুরের যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাম-রাবণের যুদ্ধ, কুরু-পাণ্ডবের মহাভারতীয় যুদ্ধ, সিজার, হানিবল, আলেকজান্দার, মহম্মদ ঘোরি, চেঙ্গিস খান পেরিয়ে এসে সভ্যতার গৌরবস্পর্ধী বিংশ শতাব্দীতে প্রথম আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিধ্বংসী তাণ্ডব – এবং এখনও রুশ-ইউক্রেন আমেরিকা-ইরানের ক্ষমতা দখলের লড়াই। ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। উলুখাগড়াদের শান্তি কোথায়? ভরসাস্থল হিসাবে সংগঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপুঞ্জ –-ক্ষমতাগর্বীরা যাকে অহরহ বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে চলেছে।
নতুন কিছু অভিজ্ঞতা নয়। রবীন্দ্রনাথ মর্মাহত হয়েছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানি সৈন্যদের বুদ্ধ মন্দিরে গিয়ে নরসংহারের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে দেখে। মহাযুদ্ধের সূচনা পর্বে তাঁকে লিখতে হয়েছিল --
নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,
শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।
এবং একই সঙ্গে তার পরের লাইনগুলোতে –
বিদায় নেবার আগে তাই
ডাক দিয়ে যাই
দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে
প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে। (প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা)
ললিতবাণী নয়, প্রতি-আক্রমণই নিশ্চিত করতে পারে যুদ্ধ-অবসান আর শান্তি প্রতিষ্ঠা --Preparation for the war is the best way to ensure peace – হয়তো তাঁর মননে, সাময়িকভাবে হলেও, সক্রিয় ছিল, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ এই প্রত্যয়ে আস্থা রেখেও। যুদ্ধের বীভৎসতা ফুটিয়ে তুলেছিলেন পাবলো পিকাসো তাঁর বিখ্যাত ‘গুয়ের্নিকা’ চিত্রে, এবং তাঁর আঁকা ‘শ্বেত পারাবত’ এখনও শান্তির প্রতীক হয়ে রয়েছে।
সমাজ জীবনে শান্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে না। শান্তির বাতাবরণ মানুষের নান্দনিক সৃষ্টির সহায়ক। তার চেয়ে বড়ো কথা, শান্তির পরিবেশ ‘শত শত সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ ‘পরে’ যারা কাজ করে তাদের আশ্বাস দেয় নিশ্চিত জীবন যাপনের –- ‘পান ফুরাল ধান ফুরাল খাজনার উপায় কী’ এই ভাবনার অনেকটাই লাঘব হয়। তাই প্রার্থনা, ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, দ্বিধা থেকে যায়, ব্যক্তি জীবনে অনাবিল শান্তিই কি সর্বতোভাবে কাম্য? আমাদের অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলে। বিবেকানন্দ, তখনও নরেন্দ্রনাথ, ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে ‘নির্বিকল্প সমাধির’ বর চেয়ে তিরস্কৃত হয়েছিলেন –- তাকে যে মানবহিতে কাজ করতে হবে। মহৎ কাজে আর নান্দনিক সৃষ্টির প্রয়াসে মানুষের চিত্তকে --অন্তত সেই সব মানুষের চিত্তকে যাঁরা স্বীয় কীর্তির জন্যে অমর সাক্ষ্য রাখেন—অস্থির হতে হবে, উদ্বেলিত হতে হবে। ‘অশান্তি যে আঘাত করে তাই তো বীণা বাজে’ –শ্মশানের শান্তিতে শবসাধনা করা চলে, বীণা বাজে না। কিছু মানুষকে সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়, তারা বিব্রত হয় এই চিন্তায় –
সকল লোকের মতো বীজ বুনে আর
স্বাদ কই! ফসলের আকাঙ্ক্ষায় থেকে,
শরীরে মাটির গন্ধ মেখে,
শরীরে জলের গন্ধ মেখে,
উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে রহিবে জেগে পৃথিবীর ‘পরে?
স্বপ্ন নয় – শান্তি নয় – কোন্ এক বোধ কাজ করে
মাথার ভিতরে। (বোধ, জীবনানন্দ দাশ)
অশান্তি-তাড়িত এই গুটিকয় ব্যাতিক্রমী মানুষই সাহিত্যে বিজ্ঞানে দর্শনে আলোর দিশারী হয়েছেন।