• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share  
  • এলেম নতুন দেশে : ছন্দা চট্টোপাধ্যায় বিউট্রা


    আমাদের বাড়ি —জলরং, লেখিকা

    কয়েক দশক অন্তর সবারই একটু পিছন ফিরে দেখার দরকার হয়। আমারও এদেশে পাঁচ দশক হয়ে গেল। বুড়ো বয়সে সবারই ইচ্ছা করে পুরনো স্মৃতি হাতড়াতে। কেমন ছিল পঞ্চাশ বছর আগের আমেরিকা? কেমন লেগেছিল এই আনাড়ি ভারতীয়র চোখে? কোন জিনিশটা ভালো দেখেছিলাম, কোন অভিজ্ঞতাটা খারাপ? কিন্তু অন্য কারুর এ বিষয়ে কোনো কৌতূহল আছে কি? সবারই তো একই অভিজ্ঞতা। নতুন কিছু তো নেই। তবু লিখি। আমার নাতিনাতনি-মেয়েদের তো বাংলা পড়ার ক্ষমতা নেই। হয়তো বা আমারই সমসাময়িক কোন পরবাসী পাঠকের একটু ইন্টারেস্টিং মনে হতে পারে। তাই লিখি।

    আমি এদেশে প্রথম পা দিলাম ১৯৭৩ সালে। এর আগে কখনো প্লেনে চড়ার সৌভাগ্য হয়নি। দেশে তো সব জায়গায় রেলগাড়িতেই যাতায়াত করেছি। এবার প্রথমেই এয়ার ফ্রান্সের জাম্বো জেট। দিল্লী থেকে প্যারিস হয়ে টরোন্টো। পরনে একটা ভালো সিল্ক শাড়ি- প্রথম বিদেশ যাত্রা বলে কথা! সঙ্গে একটা সুটকেসে কিছু শীতের জামাকাপড় আর দুটো ভারী ডাক্তারি বই –পরীক্ষা দিতে হবে যে। পকেটে সাকুল্যে চল্লিশ ডলার। ব্যাস। মনে কোনো ভয়ডর চিন্তা ছিল কি? নাহ। তেইশ বছর বয়সে মনে কৌতূহল ছাড়া আর কিছুর জায়গা থাকে না। কোনো বন্ধু-আত্মীয় আসেননি আমাদের সী-অফ করতে। কেউ কপালে দই-চন্দনের ফোঁটাও দেননি। আমি একা একা স্বামীর হাত ধরে মাঝরাত্তিরে দেশ ছেড়ে দেশান্তরে পাড়ি দিলাম। মন খারাপ হয়েছিল কি? পরে, তখন নয়। খুব ইচ্ছা ছিল জানলা দিয়ে দেখব কেমন মাটি ছেড়ে উড়ছি। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না।

    পরদিন প্যারিস, ফ্রান্স। শাড়ি পরে ইংরেজি বলতে গিয়ে ঠোক্কর খেলাম। বিমান সেবিকারা যেন হঠাৎ ইংরেজি ভুলে গেছে! কিন্তু কী অদ্ভুত! আমি বেপরোয়া হয়ে হিন্দি শুরু করতেই মিষ্টি হেসে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল! ফরাসী ভাষা-স্নবারির সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়।

    টরোণ্টোতে আমার ভাসুর নিতে এসেছিলেন। (উনিই আমাদের প্রথমে ক্যানাডায় স্পন্সর করেন। সেখানে ডাক্তারি পরীক্ষা-টরীক্ষা দিয়ে, পাশ করে, তারপর আমেরিকায় চাকরি নিয়ে আসা।) টরোণ্টো থেকে উইনড্‌সরে প্রথম রোডট্রিপ, রাস্তায় নতুন মহাদেশের প্রথম ভোজন —কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন! দেশে কখনো ফ্রায়েড চিকেন খাবার সুযোগ হয়নি, ম্যাশ করা আলু আর রেড বিন্স তো নয়ই। খেয়ে তো বেশ ভালোই লাগলো।

    প্রথম পরিচয়: অনভ্যাসের আমেরিকা —

    নতুন দেশে এসে এইরকম ছোটখাটো জিনিশও চোখে লাগে। সবারই এরকম হয়। প্রথম কিছু একটা মনে গভীর দাগ কেটে রাখে। আমার যেটা প্রথমেই চোখে পড়েছিলো তা এখানকার হাইওয়ে সিস্টেম। পরিষ্কার, ঝকঝকে, লাইন কাটা, মসৃণ কিন্তু ঝড়ের গতিতে শত শত গাড়ি চলছে, কেউ হর্ন না বাজিয়ে, এটা ভারতে চিন্তাও করা যায় না। সেই থেকেই হয়তো আমার লম্বা পাড়ির স্বপ্নের শুরু। কিন্তু ভারতের মত যেখানে সেখানে রাস্তা পার করতে গেলে নির্ঘাত মৃত্যু। আমার তো আমেরিকার ট্রাকগুলোকে ভীষণ ভয়। ভারতীয় লরির তিনগুণ সাইজ, চলে দৈত্যের মত। দু’দুবার আমি মরতে মরতে বেঁচে গেছি। ওদের পাশ কাটাতেও আমার ভয় করে।

    আত্মীয় সঙ্গে থাকায় প্রথম কালচার শকের ধাক্কাটা তেমন লাগেনি। রান্নাঘর, বাথরুমের নতুন কলকব্জা শিখে নিলাম। গ্রসারি স্টোর (একে কি মুদিখানা বলা যায়?), কে-মার্ট এসব দোকানেও একা একা কেনাকাটা করতে শুরু করলাম। ওরে বাবা! প্রথম প্রথম সাইজের বহর দেখেই চক্ষু চড়কগাছ! মাইলের পর মাইল পসারের সারি। টুথপেস্ট থেকে সাবান, সকালে খাবার সিরিএল থেকে দুধ, সব কিছুর হাজার রকমফের, কোনটা ছেড়ে কোনটা নিই ভাবতেই ঘণ্টা লেগে যায়। তখন ভাবতাম—এখনও ভাবি—এত রকমের পছন্দ নিয়ে আমরা যে কত সময় নষ্ট করি তার হিসেব নেই। আর সবজিপাতির সাইজ বা কি! একেকটা আলু, পেঁয়াজ, সিমলা মির্চ-এর সাইজ তাদের ভারতীয় ভাইবোনদের তিনগুণ! (আমার এক বন্ধু পেঁয়াজ দেখে তাকে ‘obscene onion’ আখ্যা দিয়েছিল!) আর সবকিছুই প্লাস্টিকে মোড়া, কাগজ, কার্ডবোর্ড দিয়ে বাঁধানো। একটা ছোট্ট জিনিশ খুলতেই এতগুলো জঞ্জাল ফেলে দিতে হয়। দিল্লীতে থাকতে রোজ একটা ছোট্ট টুকরিতে এক মুঠো জঞ্জাল ফেলতাম, আর এখানে দু-তিনটে বড়ো বড়ো বাক্সেও কুলোয় না। দিল্লীতে সত্তরের শুরুতে এত প্লাস্টিকের চল ছিল না। এখন তো সারা পৃথিবীই প্লাস্টিকের তলায় চাপা পড়ছে।

    আরেকটা জিনিশ লক্ষ্য করেছিলাম। এদেশে সব ঘরবাড়ি, এমনকি বিরাট প্রাসাদও, সব কাঠ দিয়ে তৈরি। ভারতের মত গরম ট্রপিকাল দেশে কাঠ তো দুদিনেই উইয়ের পেটে। ইট পাথর সিমেন্ট ছাড়া বাড়িঘর কল্পনাই করা যায় না। এদেশে কিন্তু ল্যাম্পপোস্টগুলো পর্যন্ত কাঠে তৈরি! বাড়ির ভেতরেও হাঁটতে গেলে কাঠের মেঝে বা সিঁড়ির ক্যাঁচকোঁচ শব্দ। প্রথম প্রথম ঝড় আর আগুনের ভয় হতো খুব, পরে অবশ্য সব সয়ে গেল।

    মনে আছে প্রথম বছর শীত ও বসন্তের সময় ঋতুবদলের বাহার দেখে কেমন অবাক হয়েছিলাম। এমন রং বদলানো ও পাতাঝরা দেখে এখনও বিভোর হয়ে যাই। পঞ্চাশ প্লাস বছরেও একটুও পুরনো হয়ে যায়নি। তার চেয়েও মজার কাণ্ড বসন্তকালে কীরকম রাতারাতি গাছপালা পত্রহীন থেকে সবুজ পাতায় ভরে যায়! লনের ঘাস ফ্যাকাসে হলুদ থেকে এক রাতে চিকন সবুজ! ঘাসের ডগাগুলো প্রতিদিন দু’ইঞ্চি লম্বা হয়! ঠিক যেন ম্যাজিক!

    প্রথম তুষারপাত দেখলাম নভেম্বরে, উত্তর নিউ ইয়র্ক রাজ্যে, টরোন্টোয় পরীক্ষা দেওয়ার পর নায়াগ্রা ফলস দেখতে গেছিলাম। হাতে পয়সা কম বলে গ্রে-হাউন্ড বাসে যাত্রা। রাতে বাসে ঘুমিয়ে, সকালে উঠেই দেখি রাস্তার ধারে বরফ, ঠিক লেখকেরা যেমন বলেন, পেঁজা তুলোর মতই। বাস থামতেই আমি হ্যাংলার মত ছুটে গিয়ে বরফ ছুঁয়ে দেখছি কী রকম ঠান্ডা, মুখে দিয়ে চিবোচ্ছি। সবাই আমাকে দেখে হাসছে। ফলস-এর থেকেও প্রথম বরফ আমার মনে বেশি ছাপ ফেলেছিল। এখনও, বছরের প্রথম বরফকুচি আমি হাত পেতে মুখে দিই। আশেপাশে সমস্ত শব্দ বরফে শুষে নেয়। অবাক হয়ে আমি সেই নিস্তব্ধতা উপভোগ করি। দেশে ফিরে গেলে এই ঋতুবদলের পালাটা আমি ভীষণ মিস করবো।

    আমেরিকার ডাক্তারি (ECFMG) পরীক্ষাগুলো কিন্তু আমার সহজই মনে হয়েছিল। মানুষের শরীর অবশ্য সবদেশেই এক, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাও মোটামুটি একই। তাছাড়া মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নগুলি কঠিন নয়, দেশের ভয়াবহ প্রাকটিকাল পরীক্ষা আর লম্বা উত্তর লেখার থেকে অনেক অনেক সোজা। মাল্টিপল চয়েস পরীক্ষা আমার সুডোকু বা ক্রসওয়ার্ড পাজলের মতই মজার লাগে।

    ডাক্তারি পরীক্ষা আমি সহজেই পাশ করেছিলাম, শুধু একটা জায়গায় শক্ত লেগেছিল—নানা রকমের লোকের মুখে ইংরেজি রেকর্ডিং শুনে বোঝা—এমনিতে সোজা, কিন্তু দক্ষিণী প্রদেশের কালো লোকদের অ্যাকসেন্ট, আগে কখনো শুনিনি তো। যাই হোক, পাশ করলেও ক্যানাডায় তখন চাকরির টানাটানি। সেখানেই আমার প্রথম বর্ণবিদ্বেষের অভিজ্ঞতা— সোজাসুজি ‘তোমরা নিজের দেশে ফিরে যাও না কেন?’ জিজ্ঞাসা। এটা আমি আমেরিকাতেও দেখিনি। সত্তরের দশকে আমি দেখেছি, উইন্ডসরেররা লোকেরা রোজ ডেট্রয়েট শহরে কাজ শেষ করেই হুড়মুড় করে নিজের দেশে ছোটেন অন্ধকার হবার আগেই। কালোদের শহরে এক মুহূর্ত বেশি থাকতে চান না। আমরাও চাকরি পাওয়া মাত্রই খুশিমনে গ্রে হাউন্ড বাসে চড়ে ক্যানাডা ছেড়ে আমেরিকায় চলে এলাম।

    প্রাকৃতিক দুর্যোগ ---

    কয়েক মাস পরেই সত্যিকারের ভারী বরফপাতের সঙ্গে পরিচয় হল। প্রচণ্ড তুষারঝড় blizzard আর সেইসঙ্গে তিন ফুট বরফ, ঝড়ে উড়ে পাঁচ-ছ ফুট ঢিপি। আমাদের নতুন কেনা ছোট্ট ফিয়াট গাড়িটা একেবারেই বরফ চাপা। শুধু অ্যান্টেনার তারটা একটু দেখা যাচ্ছিল। আমরা হাসপাতালে আটকা পড়ে সারারাত কাটালাম। মনে আছে ল্যাবরেটরির অ্যালকহল আর ক্যাফেটেরিয়া থেকে নেওয়া অরেঞ্জ জুস মিশিয়ে ককটেল বানিয়ে পার্টি করেছিলাম। ঝড় থামলে কোদাল কুড়ুল দিয়ে বরফ খুঁড়ে গাড়ি বের করা, বাড়ির সামনে ফুটপাথ পরিষ্কার করা, বরফ ঢাকা রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে স্লিপ করা এসবই আমাদের একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা—যদিও এখানকার লোকেদের কাছে এসব তো জলভাত।

    তিন মাস পর এল আরেক বিপর্যয়। টর্নেডো। মিডওয়েস্টে প্রতি বছর গরমের সময় টর্নেডোর উপদ্রব। স্থানীয় লোকেরা ছোটখাটো টর্নেডোয় অভ্যস্ত, বিশেষ গা করে না। বড়সড় কিছু হলে অবশ্য অন্য কথা। ব্লিজারডের মত এটাও আমাদের চোখে নতুন। আমি ভারতে কখনো এর নামও শুনিনি। ছোটবেলায় পুরুলিয়াতে মনে আছে একবার কালবৈশাখী ঝড়ের সময় দেখেছিলাম একটা লম্বা, কালো ছায়া হাতির শুঁড়ের মত আকাশে দুলছিল, সবাই হাঁ করে দেখছিল, দুর্যোগের কথা কারুরই জানা ছিলো না। পঁচাত্তরের ঐ টর্নেডো নেব্রাস্কার সাম্প্রতিক ইতিহাসে বৃহত্তম। বিকেল চারটে নাগাদ, আমরা হাসপাতালে কাজে ব্যস্ত। আমার স্বামীটি ঝড়টা ভালো করে দেখার জন্য বাইরে পা দিতেই সিকিউরিটি গার্ড হিঁচড়ে টেনে ভিতরে এনে তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। আমরা সবাই রোগীদের খাটে বয়ে একেবারে নীচে বেসমেনটে নিয়ে এলাম। পাশেই মর্গের এত কাছে থাকাটা রোগীদের মোটেই পছন্দ হচ্ছিলো না। রেডিওয় শুনছিলাম কোন কোন জায়গা ঝড়ে বিধ্বস্ত হচ্ছে। আমরা মাত্র দুদিন আগে নতুন অ্যাপার্টমেন্টে বাসা পেয়েছি, আগের দিনই সব আনকোরা নতুন ফার্নিচার কিনে এনেছি। শুনলাম টর্নেডো আমাদের অ্যাপার্টমেন্টেই ল্যান্ড করেছে। আমরা ভাবলাম গেল সব টাকা গচ্চা, তবু প্রাণে তো বেঁচেছি।

    শহরে বড়ো রাস্তা ধরে টর্নেডোটা চলছিল, দুধারে বড়ো বড়ো অফিস বিল্ডিং, চার্চ, দোকানপাট, হোটেল, রেস্টরাঁ সব গুঁড়িয়ে চুরমার করতে করতে। প্রচুর ক্ষতি কিন্তু মাত্র দু’তিনজন প্রাণে মারা গেছিলেন। পরে দেখলাম আমাদের বিল্ডিঙটাও আস্তই ছিল কিন্তু আশেপাশে প্রচুর বাড়ি ভেঙে পড়েছিলো। আমাদের বিল্ডিঙেও জল-ইলেকট্রিসিটি নেই, ঝড়বৃষ্টির জল চারদিকে। সরকার পাহারা দিতে ন্যাশনাল গার্ড আনিয়েছিল। বাড়িতে ঢুকতে মানা। আমরা এক বস্ত্রে এক বন্ধুর বাড়িতে দু’দিন কাটালাম। ভাবলাম, প্রথমে ব্লিজার্ড, তারপর টর্নেডো, এবার তৃতীয় দুর্যোগ বন্যা বা ভূমিকম্প হলেই আমরা পাততাড়ি গুটিয়ে দেশে ফিরে যাবো। তাড়াহুড়োয় তখন মনে পড়েনি আমাদের আত্মীয় স্বজনদের ফোনে জানাতে যে আমরা বেঁচে আছি। তাঁরাও আমাদের বাড়িতে ফোনে না পেয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। পরে এজন্য অবশ্য প্রচুর বকুনি খেতে হয়েছিলো।

    প্রথম গাড়ি---

    প্রথম মোটরগাড়ি প্রথম প্রেমের মতই স্পেশাল ব্যাপার। (রোড ট্রিপার, পরবাস দেখুন)। আমার স্বামীর পরম প্রিয় ছোট্ট, লাল টুকটুকে, সেকেন্ড-হ্যান্ড ফিয়াট গাড়ি, প্রথম ক’দিন চলার পরেই বিগড়োলো। ধাক্কা দিয়ে দিয়ে চালাতে হয়, তারপর লাফ দিয়ে শাড়ি সামলে, চলন্ত গাড়িতে ওঠা। এমনকি রিভার্স গিয়ারটাও কাজ করে না। রীতিমত অঙ্ক কষে পার্ক করতে হয় যাতে ব্যাক না করেই বার করা যায়। শীত এসে পড়লো। আমি চাই গাড়িটা বিক্রি করে আরেকটা নতুন কিনতে, কিন্তু আমার স্বামী প্রাণে ধরে ছাড়তে পারছেন না। ইচ্ছা আরেকটু সারাবার চেষ্টা। আমি চেনাজানা কাউকে দিতেও পারছি না কারণ সবাই গাড়িটার কেচ্ছা-কাহিনি জানে। ডিলাররাও নাম শুনেই ‘না, ধন্যবাদ’ বলে দেন। মরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি গাড়িটা গুড উইল দাতব্যে দান করে দিলাম। তাও চালিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি। ওরাই এসে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে গেল! আমার স্বামী এখনও ঐ গাড়ির স্মৃতিতে হা-হুতাশ করেন।


    আমাদের ছোট গাড়ি চলে থেকে থেকে

    গাড়ি তো এক, গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেতেও ঝামেলা। আমি একটু ভীতু, তবু মন দিয়ে চালানোটা শিখে নিয়েছিলাম। লিখিত পরীক্ষাটাও পাশ করে গেছি, কিন্তু চালানোর টেস্টেই বিপত্তি। গাড়ি স্টার্ট করার আগেই পরীক্ষক শুধোলেন, “কোত্থেকে আসছ?” আমি বললাম ইন্ডিয়া। “ওদেশে তো বাঁ-দিকে চালায়, তাই না?” আমি মাথা নাড়লাম। “আর এক সপ্তাহ চালাও, তারপরে এসো।“ ব্যাস! বিনা বাক্যব্যয়ে আমায় ফেল করিয়ে দিলেন! এ কি অন্যায় কথা। আমি সারা জীবনে কখনো কোনো পরীক্ষায় ফেল করিনি। কিন্তু আমরা এদেশে তখন নতুন আগত। চুপ করে অপমানটা গিলে নিলাম। সেই আমার জীবনে একমাত্র পরীক্ষা ফেল। তার আঘাতটা এখনও ভুলিনি।

    প্রথম বাড়ি---

    ‘আমেরিকান স্বপ্ন’ যাকে বলে। দু’বছর অ্যাপার্টমেন্টে কাটানোর পর একটা বাড়ি কেনার স্বপ্ন। হাতে একটু টাকাও জমেছে। সবাই উপদেশ দিলো এইবেলা কিনে ফেলো। বাজার ভালো। এ-ও এক নতুন অভিজ্ঞতা। আগে সারা জীবন ভাড়া বাড়ি, কোয়ার্টার আর হস্টেলেই কাটিয়েছি। প্রথম বাড়ি কেনা, সে যে একটা বিরাট সিদ্ধান্ত। কত হাজার প্রশ্ন মনে। বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু আলগা উপদেশই তখন সম্বল ছিল। মনে আছে, উপার্জনের একটা বিরাট অংশ হস্তান্তর করতে কীরকম বুক দুরদুর করেছিলো। আগে কখনো এত টাকা একসঙ্গে খরচ করিনি। একটা মজার কথা-- বাড়িটা বেশ পুরনো । এর প্রথম দলিলটায় (প্রায় একশ’ বছর আগেকার) লেখা দেখেছিলাম —‘…not to be occupied by any other than Caucasian race.’! আমরা এখনও সেই আইনভঙ্গ করে চলেছি! আমি অবশ্য প্রথম দিনেই বাড়িটার চারধারে প্রচুর গাছপালা দেখে ভালবেসে ফেলেছিলাম। শহুরে মানুষ, এর আগে কখনো চারপাশে এত সবুজ দেখিনি তো। এখনও বিরাট গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আর পাখি দেখেই আমার মন ভরে যায়। অবশ্য তখন ভেবে দেখিনি এই বিরাট বাগানের দেখাশোনায় কত ঝামেলা, আর বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঝামেলা তো বেড়েই যাচ্ছে। তবু এই বাড়ি ছাড়তে মন চায় না। বাহান্ন বছর হয়ে গেল এই বাড়িতে। কত স্মৃতিই না জড়িয়ে আছে। কত হই-হুল্লোড়, পার্টি, জন্মদিন, বিয়ে, কত মজার ঘটনা, আবার দুর্ঘটনাও কিছু। আমাদের বার্ষিক ক্রিসমাস পার্টিগুলো হতো বিরাট, ষাট-সত্তর জন অতিথি। এখনও সকলের মনে আছে।

    তবে একটা বাড়ির দেখাশোনা এক বিরাট দায়িত্ব আর খরচ। টুকটাক, এটা সেটা ভাঙা, সারানো, বদলানো লেগেই আছে। এসবই আমার স্বামীর হবি। তাঁর জেদ, সব কিছু নিজেদেরই করতে হবে। তখন তো ইউ-টিউব ছিলো না। বই পড়ে, একে তাকে জিজ্ঞেস করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতাম। কতবার ভুল করেছি, আবার শুধরেও নিয়েছি। নতুন বাড়িতে প্রথম রেফ্রিজারেটর কিনলাম, ঠিক আমার শ্বশুর-শাশুড়ির প্রথম আমাদের বাড়ি আসার দুই দিন আগে। ফ্রিজের সব তার, প্লাগ ইত্যাদি লাগিয়ে আমরা মনের আনন্দে বাইরে খেতে গেলাম, বাড়ি ফিরে এসেই দেখি চারদিকে জল থইথই করছে! কিচেনের মেঝেয় গোড়ালি-ডুবো জল। জল মেঝের টাইল ভেদ করে, নীচে বেসমেনটের ছাদ ভেঙে, মেঝের কার্পেট চুবিয়ে আরও বেড়ে চলেছে। আমার স্বামী চট করে বুঝেছিলেন যে ফ্রিজ অন্ করে যাবার সময়, জলের পাইপটা ভালো করে লাগানো হয়নি। তাই এই অবস্থা। তারপর সারা রাত জেগে, সব জল পরিষ্কার করা, মেঝে, সিলিঙে নতুন টাইল লাগানো, কার্পেট খুলে শুকিয়ে, অতিথি আগমনের মাত্র দু-তিন ঘণ্টা আগে সব রেডি করতে পারলাম।

    বাড়ির বাগানেরও সেই অবস্থা। বাগান সম্বন্ধে আমরা দুজনেই অজ্ঞ। এখানকার কোনো গাছপালা চিনতাম না, আবহাওয়া মিলিয়ে কী লাগানো উচিত তাও জানতাম না। গারডেনিং আমার আসে না। আমি বাড়ির ভেতরে বেশ ভালোই ফুল ফোটাতে পারি কিন্তু বাইরে ঝড়বৃষ্টি, গরম, ঠান্ডা, পশুপাখি, পোকামাকড়ের সঙ্গে যুদ্ধে কেবলই হেরে যাই। বাইরে বাগানে ফুল, সব্জিপাতি, ফলের গাছ, সব কিছুতেই এক্সপেরিমেন্ট করেছি। প্রকৃতি সহনশীলা তাই রক্ষা। বেশিরভাগই ভুল করেছি, কয়েকটা হঠাৎই লেগে গেছে। গোলাপ ফুল আমার বাড়িতে একেবারেই টেঁকে না। খুব শখ ছিল, কিন্তু অনেক বছর, নানা টাইপের গোলাপ লাগাবার চেষ্টা করে করে এখন হাল ছেড়ে দিয়েছি। অনেক সবজিও লাগিয়েছি, কিন্তু প্রতি বছর পোকা, খরগোশ আর কাঠবেড়ালির সঙ্গে লড়াই করে রণে ভঙ্গ দিয়েছি। ডারউইনের মতানুযায়ী আমাদের বাগানে এখন survival of the fittest, তা সে ফুলই হোক বা আগাছা। বাড়ি ও বাগানের পায়ে অজস্র প্রণাম, আমাদের এত উৎপাত, অত্যাচার, গাফিলতি সয়েও এখনো টিকে আছে।

    আমাদের বাগানে গোড়া থেকেই অনেক জীবজন্তুর বাস। পাখি তো প্রচুর (যদিও আর সব জায়গার মতই এখানেও ইদানীং কমে আসছে)। ছোট্ট রেন আর চিকাডি থেকে বিরাট বাজপাখি আর হুতোম পেঁচা পর্যন্ত সারা বছরে প্রায় চল্লিশ জাতের পাখি গুণেছি। পাখি ছাড়াও আছে নির্বিষ গার্টার সাপ (স্লিঙ্কি হারিয়ে গেল, পরবাস দেখুন), বাদুড়, দুই জাতের কাঠবেড়ালী (ধূসর-বাদামী ও মিশমিশে কালো), খরগোশ, পসাম, গ্রাউন্ডহগ, রাকুন ইত্যাদি। কখনো সখনো দু’একটা হরিণ, একটা শেয়াল ফ্যামিলি, আর একদল টার্কিও দেখা দিয়ে যায়। এক রাত্রে ঘড়িতে টংটং করে বারোটা বাজার সময়ে ঝটপট করে ফায়ার প্লেস থেকে বেরুলো একটা বাদুড়! ঠিক ভূতুড়ে গল্পের মতই। আমরা ভাবলাম হয়তো চোখের ভুল, হয়তো লাস্ট ড্রিংকটা একটু কড়া হয়ে গেছিল। কিন্তু না, সত্যিই বাদুড়, বেশ ঘরময় উড়ে বেড়াচ্ছে। একটা তোয়ালে দিয়ে ধরে ফেলে সাবধানে বাইরে ছেড়ে দিলাম। কামড়-টামড় দিলে আবার জলাতঙ্ক রোগের ভয়!

    ফায়ার প্লেস দিয়ে হরেক রকম প্রাণীর আবির্ভাব হয়। শীতকালে প্রথম বার জ্বালাবার সময় অনেক বার পাখির বাসা বা মরা আধজ্বলা পাখি বার করেছি। একবছর ক্রিসমাসের সময় আমি অনেক যত্ন করে দুদিন ধরে একটা বিরাট জিঞ্জারব্রেড হাউস বানিয়েছিলাম (আমার বার্ষিক শখ), বসার ঘরের টেবিলে সাজিয়ে রেখেছি। মাঝরাত্রে ধুপধাপ, ঝনঝন শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ভাবলাম হয়তো চোর ঢুকেছে। পুলিশ ডাকতে যাচ্ছিলাম, স্বামী বললেন চোরেরা এতো শব্দ করে না। একবার দেখি তো। দেখি বসার ঘরে আমার সাধের জিঞ্জার ব্রেড হাউস মেঝেয় ভেঙে ছত্রাখান! ফায়ার প্লেসের সামনে এক হোমদা লোমশ রাকুন! দরজা খুলে তাকে বের করার চেষ্টা করছি, সে আমাদের দেখে ভয় পেয়ে এলোপাথাড়ি ছুটোছুটি শুরু করলো। আর নার্ভাস হয়ে সারা ঘরে পেচ্ছাপ করে দিলো। তাতে ছুটতে গিয়ে আমাদেরই পা হড়কে যায়। কোনওরকমে লাঠির বাড়ি দিয়ে ওকে বার করলাম। (ওদের কামড়েও জলাতঙ্ক হতে পারে।) তারপর সবকিছু পরিষ্কারের কাজ। দুদিন পর আবার সেই কাণ্ড। এবার ওকে ফায়ার প্লেসের ভেতরেই ধরেছিলাম। আমাদের দেখে চিমনী দিয়েই পালালো। এপর্যন্ত রাকুন-২, বিউট্রা-০! এবার ফায়ার প্লেসের সামনে স্ক্রিন লাগিয়ে শক্ত করে আটকে দিলাম। তাই রক্ষে।


    বারান্দায় রাকুন পরিবার
    ‘অন্য’ লোকেরা---

    আমাদের প্রথম সস্তা অ্যাপার্টমেন্টটা আমাদের কাজের জায়গা—হাসপাতালের--খুব কাছে ছিল। গাড়ি না থাকায় যাতায়াতের সুবিধার জন্য। পাড়াটা কিন্তু শহরের সবচেয়ে পুরনো ও গরীব, স্বভাবতই কালো আফ্রিকান-আমেরিকানদের পাড়া। সালটা ১৯৭৪, ম্যালকম এক্সের রায়টের একটু পরেই। আমি এসবে একেবারেই অজ্ঞ ছিলাম। বর্ণবিদ্বেষ, সিভিল রাইটস আন্দোলন, মারটিন লুথার কিং এসব তখনো জানতাম না। ভারতে তো খবরে এসব কখনো শুনিনি। আমরা কাজের পর বিকেলে বা ছুটির দিনে কাছাকাছি কালোদের পাড়ায় বেড়াতে যেতাম। বাড়ির বাইরে, সিঁড়ির ধাপে বসা লোকেদের সঙ্গে গল্পসল্প করতাম, ছোট ছেলেমেয়েদের ছুটোছুটি উপভোগ করতাম। ঠিক দিল্লীর মধ্যবিত্ত পাড়ার মতই। কিন্তু আমাদের শ্বেতাঙ্গ সহকর্মীরা জানতে পেরেই হইহই করে উঠলেন, “ওসব জায়গায় কক্ষনো যেও না। ওসব ভীষণ খারাপ, ডেঞ্জারাস পাড়া। তোমাদের পকেট কাটা যাবে, রেপ বা খুন টুনও হয়ে যেতে পারে।” আমাদের মনেও ভয় ঢুকে গেল। তাঁরা একেবারে ভুল বলেননি। গোলাগুলি, খুনজখম প্রায়ই হতো, এখনও হয়। আমরা আসার দু’তিন বছর আগেই কালোদের একটা বিরাট আন্দোলন হয়েছিলো, ম্যালকম এক্সের হত্যা, এবং অনেক দোকানপাট বাড়িঘর নষ্ট হয়েছিলো। আমরা অবশ্য এসবের কিছুই জানতাম না। আমি কিন্তু সহকর্মীদের পুরোপুরি বিশ্বাসও করিনি। বর্ণবৈষম্য কোথায়? আমরাও তো ওদের মতই কালো। এ পর্যন্ত কোনো কালো লোক আমাদের সঙ্গে কখনো কোনরকম খারাপ ব্যবহার করেনি। তবু, আমাদের পাড়া বেড়ানোটা বন্ধ হয়ে গেল।

    নস্টালজিয়া--

    নসটালজিয়ার বাংলা প্রতিশব্দ কী হতে পারে? স্মৃতিবেদনা? কাজেকর্মে, মেয়েরা জন্মাবার পর তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায়, নসটালজিয়া ব্যাপারটা আমায় খুব বেশি কষ্ট দেয়ার সময় পায়নি। তবে আমার প্রথম প্রথম কষ্ট হতো শীতকালে রৌদ্রের অভাবে। ছুটির দিন, সময় পেলেই দক্ষিণের জানলার পাশে বেড়ালের মত কুণ্ডলী পাকিয়ে রোদ্দুরে বসে থাকতাম যতক্ষণ পারি। অফিসে জানলা ছিলো না। আমি সুযোগ পেলেই বই, কাগজপত্র সব নিয়ে বাইরে হাসপাতালের করিডোরের জানলার সামনে মেঝেতে লেপটে বসে কাজ করতাম। সবাই অবাক হয়ে তাকাতো। আমি সান-ল্যাম্পও ব্যাবহার করেছি কিন্তু আমার মতে আসল আলোর বিকল্প হয় না।

    কিছু কিছু জিনিশ অবশ্যই মিস করতাম। আমার মতে খাবার আর সঙ্গীতের মত নসটালজিয়া-উৎপাদক বস্তু আর নেই। সত্তরের শুরুতে ওমাহায় (এমনকি আশেপাশের প্রদেশগুলিতেও) ভারতীয়দের সংখ্যা একহাতে গোনা যায়। বাঙালি তো একজনও ছিলো না। খাবারের কথায় পরে আসছি, গানের জন্য, ভাগ্যিস আমি কয়েকটা ক্যাসেট টেপ ভর্তি আমার প্রিয় গানগুলি রেকর্ড করে এনেছিলাম, নইলে মুশকিলে পড়তে হতো। পরে আরও জমিয়ে এখন একটা বিরাট অন-লাইন কালেকশন করেছি। বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীত, হিন্দি লোকসঙ্গীত, ছোটদের গান, বলিউড, ভজন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ইংরেজি ক্লাসিকাল ও পুরনো (ষাট-সত্তরের) পপ, সব রকম গান মজুদ আছে। আমার আধুনিক গানের থেকে পুরনো গানই বেশি ভালো লাগে। অনেকেই আমার সংগ্রহ থেকে পুরনো গান তুলে নিয়ে যান।

    রান্নাঘরে---

    আমাদের শহরে তখন ছিলো না কোনো ইন্ডিয়ান রেস্তরাঁ, দোকান বা মন্দির। (এখন অবশ্য Y2K-র কল্যাণে অল্পবিস্তর সব কিছুই এসে গেছে।) সেসময় ডাল বা মশলাপাতির জন্য আমি চিঠিতে লিস্ট পাঠাতাম শিকাগো বা ডেনভারের দোকানে। ডাকপোস্টে পেতে পেতে মাস লেগে যেত। দোসা, গোলগাপ্পা, ছোলে-ভটুরে, দোকানের মিষ্টি, এসব মনে পড়লেই মুখে জল আসতো।

    ডাক্তারি শেখার ব্যস্ততার মধ্যে রান্নাটা আর আমার শেখা হয়ে ওঠেনি। বিলিতি রান্না তো একেবারেই না। তখন কি জানতাম এদেশে এসে পড়বো? মা ও শাশুড়ির কাছ থেকে কিছু রেসিপি জোগাড় করে হাতে লিখে এনেছিলাম। তাছাড়া খাবারের প্যাকেজের ওপর লেখা রেসিপি পড়ে পড়ে যতটা পারি এদেশীয় খাবার তৈরি করতাম। একটা রান্নার বই—বেটি ক্রকার-–পড়ে রান্নার কিছু বেসিক নামধাম, প্রণালী ইত্যাদি শিখলাম। জানলাম বেসটিং আর লিভেনিং-এর তফাৎ। রান্না আর কেমিস্ট্রি এক্সপেরিমেন্টে তো কোনো তফাৎ নেই। শুধু রান্নার রেজাল্টটা মুখে দেওয়া যায়। এই যা। তখন তো মাইক্রোওয়েভ, স্লো কুকার, ইন্সটা-পট এসব কিছুই ছিলো না। ভারতীয় রান্নার, বিশেষ করে বাঙালি রান্নার বই পেতেও অনেক বছর লেগেছিল। আমেরিকান বই পড়ে পড়েই শিখলাম ওভেনে কেক ইত্যাদি তৈরি করা। প্রতি বছর মেয়েদের জন্মদিনে নানারকম কেক বানিয়ে হাত পাকিয়েছি। চটপট বিলাতি রান্নায় বেশ পাকা হয়ে গেছিলাম (দেশি রান্নার তুলনায় অনেক সোজা)। নানা রকম লজেন্স, চকোলেট দিয়ে সাজানো বিস্কুটের তৈরি জিঞ্জারব্রেড হাউসের গল্প তো আগেই বলেছি। প্রতিবার ক্রিসমাসের সময় এইটা আমার নাতিনাতনিদের সবথেকে প্রিয় ‘খাবার’। ছুটির শেষে হাউসেরও আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। বাচ্চারা না থাকলে অনেক সময় চিলড্রেন হাসপাতালেও দান করেছি। দেশে থাকতে তো কেকের ‘ক’ও জানতাম না। এদেশে এসে প্রতি বছর বাচ্চাদের জন্মদিনের কেক বানিয়েই এসব রান্নায় হাতেখড়ি। আমার ব্রেড পুডিং তো আমার আমেরিকান জামাইয়ের খুব প্রিয়। ঠিক নাকি ওর দিদিমার মতন। তাই প্রতি বছর ওর জন্মদিনে বানাই।

    দুর্গাপূজা, দেওয়ালীর অভাব মেটাতে আমি গোড়া থেকেই ক্রিসমাস, ইস্টার, হ্যালোউইন ইত্যাদিতে স্পেশাল রান্না, ঘর সাজানো এসব শুরু করেছিলাম। মেয়েরা হবার পর কোনো ধার্মিক অনুষ্ঠানের ধার না ধরেও সবাই মিলে অনেক ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন করেছি। সবার প্রিয় ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠান হল থ্যাঙ্কসগিভিং। প্রথম বছরেই দোকানে টার্কির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। আগে এত বড়ো পাখি কখনো দেখিনি, রান্না তো দূরের কথা। নিয়মাবলী দেখে দেখে রান্না তো করলাম কিন্তু দেশি মুখে মাংসটা বেশ স্বাদহীন লেগেছিল। ভাবলাম একটু দেশি ছোঁয়া চাই। মশলাপাতি, দই, লেবুর রস সব চেষ্টা করলাম পাখিটাকে জারিয়ে একটু যদি স্বাদু করা যায়। কিন্তু অতটা পুরু মাংস ভেদ করে মশলা ঢোকে না। মরিয়া হয়ে হাসপাতাল থেকে মোটা কার্ডিয়াক নীডল এনে তাই দিয়ে মশলার ইঞ্জেকশান দিলাম সারা শরীরে। রান্না করার পর দেখি মাংসের ভেতর জায়গায় জায়গায় মশলার ডেলা! একটা সাধারণ ডাক্তারি তথ্য ভুলে গেছিলাম যে মরার পর কোনো সারকুলেশন হয় না, তাই মশলাটা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে না, শুধু ইনজেকশনের জায়গায় দলা পাকিয়ে জমে থাকে। যাক, সেই এক্সপেরিমেন্টটাও ব্যর্থ হল।

    এরপর ঠিক করলাম, ছোট সাইজের পাখি চাই, চিকেনের থেকেও ছোট, (কারণ এদেশে আর সব কিছুর মতই চিকেনও খুব বড়ো)। পেয়ে গেলাম করনিশ গেম হেন, আমরা যাকে বলি তিতির পাখি। ছোট্ট সাইজ, একটা পাখি একজনের বেশ চলে যায়। আর ছোট বলে মশলা দিয়ে ম্যারিনেট করাও খুব সহজ। ব্যস। এই হয়ে গেল আমাদের নতুন ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন। মেয়েরা জন্মাবধি প্রতি বছর এইই খেয়ে এসেছে। প্রত্যেকের পাতে একটা পাখি আর ভেতরে একটা উইশ-বোন, তাই কোন ঝগড়াঝাঁটি নেই। আর দেশী, বিদেশী সবাই এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমনকি বিয়ের পরেও দুই মেয়ে নিজেদের ফ্যামিলিতে ঐ ট্র্যাডিশন চালু করেছে। আমার নাতিনাতনিরাও তিতির ছাড়া থ্যাংকসগিভিং ভাবতেই পারে না। এখন অন্য কারুর বাড়িতে টার্কি খেতে হলে ওদের মুখ হাঁড়ি হয়ে যায়।

    মেয়েদের আগমন ---

    এদেশে প্রথম এসে জন্ম দেওয়াও এক নতুন অভিজ্ঞতা। দিল্লীতে আমাদের মেডিকেল কলেজে আমি গোড়া থেকেই মহিলা গাইনিদের মধ্যে বড়ো হয়েছি। গাইনী ডিপার্টমেনটে (এবং প্যাথলজি, রেডিওলজি, শিশুবিভাগেও) খুব কম পুরুষ ডাক্তার ছিলেন। আমেরিকায়, সত্তরের গোড়ায় আমদের রাজ্যে ও আশেপাশে ৮০০ মাইলের মধ্যে একজনও মহিলা ডাক্তার ছিলেন না। আমি সত্যি সত্যিই দেশে ফিরবার প্ল্যান করছিলাম, AIIMS-এ আমার চেনাজানা ডাক্তার-বন্ধুদের কাছে। তাছাড়া ওমাহায় আমি একেবারেই একা, কাছেপিঠে কোন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব ছিলো না। শহরে মাত্র চার-পাঁচজন ভারতীয় মহিলা, তাঁরাই মিলে আমায় একটা শাওয়ার পার্টি দিলেন। অন্তত বাচ্চার জন্য কিছু জামাকাপড়, ডায়াপার ইত্যাদি পাওয়া গেল।

    আশ্চর্য, ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও এসব ব্যাপারে প্র্যাকটিকাল জ্ঞান আমাদের খুব কম ছিল। তা সত্ত্বেও হাসপাতালে কিন্তু আমি খুব ভিআইপি যত্ন পেয়েছিলাম। এখানে এসব রুটিন, কিন্তু ভারতে এরকম যত্ন লাক্সারি মনে হয়। আরও মনে পড়ে AIIMS ওয়ার্ডে ভিড়, চেঁচামেচি, নার্সেরা ক্লান্ত, প্রসূতি মায়েরা ব্যথায় চিৎকার করে তাদের স্বামীদের শাপশাপান্ত করছে। আমি একবার একজনকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম, মহিলা উলটে আমাকেই বকুনি দিতে শুরু করলো, “তুমি ব্যথার কী জানো? তোমার ছেলেমেয়ে হয়েছে? এখনও তো বিয়েই হয়নি। তুমি কী বুঝবে আমার শরীরে কী হচ্ছে...” ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমার যখন প্রথম ব্যথা উঠলো আমি মনে মনে সেই মহিলাকে সেলাম জানিয়েছিলাম।

    এদেশে সবকিছু চুপচাপ, নিরুদ্বেগ, নিশ্চিন্ত। নার্সেরা হাসিমুখে প্রশংসা করছে যেন আমি কোনো বিরাট কৃতিত্ব করেছি। দেশে তো কেউ পোঁছে না। বাচ্চা বিয়োনয় কী আর বাহাদুরি? সবাই করছে। ধনীর ঘরের বৌ হলে বা ছেলে জন্ম দিলেও না হয় কথা ছিল। একটা মেয়ের জন্য এত আদরযত্ন, এত আদিখ্যেতা আমিও আশা করিনি। এখানে প্রত্যেক নতুন মায়েদের বিরাট গিফট বাস্কেট ভর্তি বেবি ফরমুলা, বোতল, ডায়াপার, তোয়ালে, এমনকি একটা অ্যাসপিরিনের শিশি পর্যন্ত ( মায়ের জন্য)! ভারতে কেউ কাউকে এরকম ফ্রি কিচ্ছু দেবে না। আমি খুব ইমপ্রেসড হয়েছিলাম। বাড়ি ফিরবার আগের রাত্রে হাসপাতাল আমাদের দুজনকে ক্যাফেটেরিয়াতে একলা ফ্রি রোমান্টিক ডিনার – মোমবাতি, ফুল, মিউজিক সহ – দিয়েছিল। বক্তব্য হল, ‘বাচ্চা সমেত এখন কয়েক বছর তোমরা এরকম রোমান্টিক ডিনার কোথাও পাবে না, এখনি আনন্দ করে নাও।‘ দুই দেশে প্রসূতি মায়েদের আদর যত্নে এত তফাৎ আমাকে অবাক করেছিলো।

    সদ্যোজাত শিশু নিয়ে একলা বাড়িতে থাকা ভীষণ কষ্টকর। স্বামী তো এক সপ্তাহ পরেই কাজে ব্যস্ত। আমি বাড়িতে একেবারে একা, আশেপাশে কেউ নেই, কোন হোম নার্সও ছিলো না যে একটু সাহায্য বা উপদেশ দেবে। দিনরাত একা একটা বাচ্চা সামলানো অনেকটা হাসপাতালে নাইট ডিউটির মতই, শুধু ডিউটির শেষে কোনো ছুটি নেই, দিনের পর দিন চলতেই থাকে। আমি শুধু একটু প্রাপ্তবয়স্ক সান্নিধ্যের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। হয়তো আমার একটু পোস্ট পারটাম ডিপ্রেশনও হয়েছিলো কিন্তু সেসময় কেউ ওসবে বিশ্বাস করতো না। মন ভালো করতে বাচ্চা সমেত লম্বা কার ট্রিপ দিলাম—ওমাহা থেকে নিউ অরলিয়ান্স, অ্যালাব্যামা, ফ্লোরিডা, এভারগ্লেডস, কী ওয়েস্ট হয়ে পোর্টো রিকো পর্যন্ত। মন ভালো করতে বেড়াবার চেয়ে ভালো জিনিশ হয় না। বাচ্চা নিয়ে সফর কিন্তু বেশ সহজ। ওরা শুধু খায় আর ঘুমোয়। বাচ্চা সঙ্গে থাকলে হোটেল, গ্যাস ষ্টেশন, বার সব জায়গায় অনেক রকম সুযোগ, সুবিধা ও সহায়তা পাওয়া যায়।

    এদেশে আত্মীয়স্বজন না থাকার একটা মুশকিল-–বাচ্চাদের দেখাশোনা করা। মা’দের বাইরে কাজ করা তখন বেশ কমই দেখা যেত। আমার মনে আছে, প্রথম যখন Working Mother বলে একটা ম্যাগাজিন বেরোল, সবাই খুব অবাক হয়েছিলো, মায়েরা তো বাড়িতেই কাজ করে, তার জন্য ম্যাগাজিনের কী দরকার? আমার ভাগ্য ভালো, একজন খুব ভালো বেবি-সিটার পেয়েছিলাম। তিন মাস পর তার হাতে মেয়েকে তুলে দিয়ে আমি অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে কাজে যোগ দিতে পেরেছিলাম।

    ক্রাইম ইত্যাদি ---

    সত্তরের দশকে আমাদের শহরে ক্রাইম রেট খুবই কম ছিল। লোকে দরজায় তালা পর্যন্ত লাগাত না। আমার তো অটোমেটিক লকের আরও ভয়, যদি হাতে চাবি না থাকে। তাহলে বাইরে লক-আউট হয়ে তো আরও বিপত্তি, বিশেষ করে শীতের সময়। তাই আমিও ছোটখাটো কাজে বেরুতে হলে দরজা আধখোলাই রাখতাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শহর বাড়ে, লোকজন বাড়ে, আর ছোটোবড়ো চুরি, গোলাগুলি, খুন-জখমও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে অল্পবয়সীদের ড্রাগ সংক্রান্ত চুরি-ছিনতাই বেশ বাড়ছিল। একবার খোলা বাড়ি পেয়ে আমাদের টি ভি, আর রেকর্ড প্লেয়ার চুরি হয়ে গেল। ব্যাস, নিরাপত্তার স্বর্ণযুগ শেষ। তারপর থেকে সবসময় দরজা, জানলা বন্ধ করতে শুরু করলাম।

    একবার তো মাঝরাতে বিকট শব্দ আর আলোর ঘূর্ণিতে ঘুম ভেঙে গেল। মাথার ওপর হেলিকপ্টার আর সামনে রাস্তায় গোটা তিন-চার পুলিশের গাড়ি, প্রত্যেকের মাথায় লাল-নীল বাতি ঘুরছে আর কানফাটানো সাইরেন। সদর দরজা খুলতেই মেগাফোনে পুলিশের আওয়াজ—আমরা যেন বাইরে এক পা-ও না বেরুই, আর সব দরজা জানলা বন্ধ করে চারদিকে সব কটা আলো জ্বালিয়ে রাখি। একজন পলাতক আসামীকে খোঁজা হচ্ছে। তার হাতে আবার বন্দুক। সে নাকি আমাদেরই পাড়ায় কোথাও লুকিয়েছে। আমাদের পাড়ায় সবার বাড়িতেই বড়ো বড়ো বাগান আর ঘন গাছপালা। মাঝে মধ্যে কিছু জঙ্গলে ভরা খালি জমি। আসামী তারই মধ্যে কোথাও হয়তো লুকিয়েছিল। ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে ধরা গেল না।

    কয়েক বছরের মধ্যে বাড়ির অ্যালার্ম সিস্টেম সহজলভ্য হওয়ার পর অন্যান্য পড়শিদের মত আমরাও লাগিয়েছিলাম। তবে প্রায়ই ভুল করে দরজা বা জানলা খোলা রাখার জন্য অ্যালার্মটা বেজে উঠত, আর পুলিশের মেসেজ পেয়ে আমরা অফিস থেকে তড়িঘড়ি বাড়ি এসে দেখতাম বাড়ির সামনে আমাদের কন্যাটি পুলিশের গাড়িতে বসে হেসে হেসে গল্প করছে।

    তবে অ্যালার্ম সিস্টেমটি একবার আমাদের এক সিরিয়াল খুনির হাত থেকে মোক্ষম রক্ষা করেছিলো। আমরা ভাগ্যিস বাড়ি ছিলাম না। দরজা খোলায় অ্যালার্মের শব্দ শুনে খুনীটি পালিয়েছিল কিন্তু ধরা পড়ার পর আমাদের দরজার হাতলে তার আঙুলের ছাপ ও ডি.এন.এ থেকে তাকে সনাক্ত করা হয়। সে আরেক রোমহর্ষক কাহিনী।

    সত্তরের কর্মক্ষেত্র ---

    সত্তরের গোড়ায় যে ইউনিভারসিটি হাসপাতালে আমি রেসিডেন্সি বা পোস্ট গ্রাজুয়েট কাজ করছিলাম সেখানে অন্য কোনো মেয়ে ডাক্তার ছিলো না। আমিই একমাত্র মেয়ে। মেডিকাল স্কুলের ১০০ জনের ক্লাসে মাত্র দশ-বারো জন মেয়ে। আমার চেয়ারম্যানের কোনো ধারণা ছিলো না একজন অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে-ডাক্তারকে নিয়ে কী করবেন। কিন্তু ভদ্রলোক আমার নিরাপত্তা ও সুবিধা নিয়ে খুব চিন্তা করতেন। আমার কি অটপ্সি করা উচিত, জোর করে মাস্ক, দস্তানা পরিয়ে দিতেন, যাতে ইনফেকশন সংক্রমণ না হয়, দাঁড়িয়ে কাটাকুটি করার থেকে হয়তো চেয়ারে বসা ভালো, ইত্যাদি। সেসময় মেটারনিটি লিভ আইন চালু হয়নি, আমাকেই জিগ্যেস করলেন কতদিনের ছুটি চাই। আমি হুট করে বলে দিলাম—তিন মাস। বিনা বাক্যব্যয়ে দিয়ে দিলেন তিন মাস। পুরো মাইনেতেই। আজকাল ছ’সপ্তাহের বেশি ছুটি পাওয়া যায় না। তাও পরে রিপিট করতে হয়। আমাকে সেসব কিছুই করতে হয়নি। আমার আট মাস গর্ভাবস্থায় আমাকে USMLE বা FLEX পরীক্ষা দিতে হয়েছিলো। তিনদিন ধরে পরীক্ষা, আমাকে বারে বারে বাথরুম যেতে হচ্ছিলো আর ইনভিজিলেটর আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন যেন আমি পেটের ভেতর নোট লুকিয়ে বাথরুমে টুকে নিচ্ছি।

    এদেশে আসার আগে পর্যন্ত আমি কোনো ইহুদী, কৃষ্ণাঙ্গ, বা স্পানিশ-ভাষী (হিস্পানিক) লোক দেখিনি। এদেশীয় বর্ণবৈষম্য, লিঙ্গবৈষম্য, নারীবাদ, ইহুদীবৈষম্য ইত্যদি বিষয়েও কোনো ধারণা ছিলোনা। তবে এ নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত ছিলাম না। নতুন দেশে, কালো চামড়ার মেয়েমানুষ বলে আমার কিছু বৈষম্য তো পাওনা ছিলই। ভারতীয় বলে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতাও ছিল। দিল্লীর রাস্তাঘাটে, স্কুলে, কলেজে মেয়েদের হয়রানির কথা তো আমাদের সবার জানা। হিন্দিভাষীদের কাছে বাঙালি সুরে কথা বলায় বা ভুল হিন্দি বলার জন্য অনেক জ্বালাতন, অনেক খেপানি সয়েছি। দিল্লীতে বাঙালিরা তো চিরকালই বিদেশী। তাই এসব আমার গা-সওয়া ছিল।

    এদেশে এসে প্রথম প্রথম অনেক রকম উদ্ভট প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলাম। বেশিরভাগই বাচ্চাদের মুখে -- যেমন ‘তোমরা তো ইন্ডিয়ান, তোমাদের তীর-ধনুক কোথায়?’ বা ‘তোমরা কি বিছানায় শোও না মাটিতে?’ আমার মত সব ভারতীয় প্রবাসীদেরই এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এসব শুনে অবাক হবে, হয়তো রেগে যাবে, বলবে এসব বেআইনি, micro-aggression ইত্যদি। সেসময় আমরা সবাই মোটা চামড়া তৈরি করে নিয়েছিলাম। এসব প্রশ্ন এদেরই মূর্খতা ধরে নিয়ে হেসে উড়িয়ে দিতাম, কোনরকম অপমান বলে গায়ে মাখিনি। হাসিমুখে, মজা করে উত্তর দিতাম আর শিখিয়ে দিতাম। এখনও তাই করি। আমি যে AIIMS-এর র‍্যাগিং-এ অভ্যস্ত! এসব আমার কাছে কিছুই না। ভারতীয়রাও তো বিদেশী বৈষম্যে কিছু কম যান না। আমেরিকার মিড-ওয়েস্টার্ন লোকেরা এমনিতে বেশ রক্ষণশীল কিন্তু এক হিসেবে খুব উদারও। একবার চিনে নিলে এরা বেশ গভীর বন্ধুত্ব পাতিয়ে নেয়। কোন বৈষম্যের ধার ধারে না। সেদিক দিয়ে, আমার মতে, আমেরিকানরা ক্যানাডা বা ইংল্যান্ডের বাসিন্দাদের থেকে অনেক ভালো।

    সহকর্মীদের থেকেও প্রচুর কৌতুক (নির্দোষ) হাসিঠাট্টা পেয়েছি। সারা হাসপাতালে একমাত্র মেয়ে ডাক্তার, তাও কালো রং আর বিজাতীয় accent! কিছু ঠাট্টা তো করবেই। শাড়ি পরা নিয়ে কোন মুশকিল হয়নি কিন্তু অপারেশন রুমে শাড়ি পালটানো, তারপর কাচা, ইস্তিরি এসব ঝামেলা এড়াতে হাসপাতালে আমি নিজেই সালওয়ার, প্যান্ট, ড্রেস ইত্যাদি শুরু করেছিলাম। এদেশে বন্ধুত্ব দেখাতে অনেকেই পিঠ চাপড়ে, বা কাঁধে হাত দিয়ে কথা বলে, কিন্তু তার বেশি নয়। একজন প্রফেসর, বিরাট দশাসই চেহারা, দূর থেকে আমাকে দেখলেই ‘How the hell are you’ বলে এমন জোরে ভালুক-আলিঙ্গন করতেন যে আমার মনে হতো পাঁজরার হাড়গুলো চুরমার হয়ে গেল! কিন্তু কেউই কোনরকম সিরিয়াস অশালীন, ঘৃণ্য, নীচ ব্যবহার করেনি। এরাই আবার আমাকে পরে রিসার্চ, প্রমোশন, পাবলিশিং ইত্যাদি ব্যাপারে প্রচুর সাহায্যও করেছিলো।

    আমার মেয়েরা অবশ্য বলে আমার আরও বেশি যুদ্ধ করা উচিত ছিল। এখন ‘Me too’-র যুগ। কিন্তু সে সময় আমি ঠিক করেছিলাম যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো —পেশাদারি মর্যাদা, বেতন, পদোন্নতি, পরিবার-- ইত্যাদি সম্বন্ধে আমি কোনরকম বৈষম্য সইব না, আর বাকি সব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে সময় নষ্ট না করলেই ভালো।

    বেতন-বৈষম্য নিয়ে ঝগড়া হয়েছিলো প্রথম যখন চাকরি পাই। আমার সঙ্গেই একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আমেরিকান কাজে যোগ দিয়েছিল। আমরা দুজনেরই এক কাজ, এক কোয়ালিফিকেশন, কিন্তু ছেলেটির মাইনে আমার চেয়ে বেশি। আমি তক্ষুনি প্রতিবাদ জানালাম, কিন্তু আমার বস চেয়ারম্যান বললেন, ‘তোমার স্বামী তো ডাক্তার, চাকরি করছেন, তোমরা দুই ইনকাম ফ্যামিলি; ডেভিডের বউ তো কোনো কাজ করে না, ওর একটাই ইনকাম, তাই ওর মাইনেটা একটু বাড়িয়ে দিয়েছি।’ এ আবার কী অদ্ভুত কারণ! কিন্তু আমার সজোর প্রতিবাদের উত্তরে ভদ্রলোক একটু দোনামনা করেও আমাদের দুজনের বেতন সমান করে দিয়েছিলেন। তবে এরকম ব্যাপার আজকাল কেউ ভুলেও করবে না।

    সেকালের প্যাথলজিঃ বৈষম্যের লড়াই ---

    আমার বেশিরভাগ প্যাথলজির কাজ সরাসরি রোগীদের সঙ্গে নয়, তাদের ডাক্তারদের সঙ্গে। অন্যান্য ডাক্তাররা অনেকেই প্যাথলজিসটদের সঙ্গে সুব্যবহার করেন না, মনে করেন আমরা যেন কোনো ফেলনা কর্মচারী। আমি যখন কাজ শুরু করি, এই ব্যাপারটা এতই ব্যাপক ছিল যে এক নামকরা প্যাথলজি জার্নালে প্রতি মাসে একটা কার্টুন ছাপা হতো—Perils of Pauline, পলিন নামী এক জুনিয়র মেয়ে প্যাথলজি রেসিডেনটের সার্জেন ও অন্য ডাক্তারদের হাতে কেমন হেনস্থা তারই গল্প। এ বিষয়ে সার্জেনদের বিশেষ দুর্নাম ছিল (এখনও আছে)।

    আমাদের সার্জারির চেয়ারম্যান ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান, সেযুগে এত উঁচু পদে কালোদের দেখাই যেত না। ভদ্রলোককে নিশ্চয়ই অনেক বর্ণবৈষম্য সহ্য করতে হয়েছে; তবু আমাকে দেখলেই একটু র‍্যাগিং করার লোভ সামলাতে পারতেন না। আমার চুলের লম্বা বিনুনি ধরে টান দিতেন, ‘দেখি তো, এটা সত্যি চুল না পরচুলা!’ কিংবা ছুটির দিনে আমায় ডিউটিতে দেখে ঠাট্টা করতেন, ‘এখানে কী করছো? তোমার তো বাড়িতে বাচ্চাদের দেখাশোনা করার কথা!’ আমিও হেসেই জবাব দিতাম, ‘আপনিও এখানে? কী সুন্দর দিনটা আজ। আপনার সব বন্ধুরা নিশ্চয়ই গলফ কোর্সে আপনার অপেক্ষায়।‘ এইরকম অনেক ঠাট্টাতামাশা সয়েছি। গায়ে কোনো দাগ পড়েনি।

    মেডিকেল কলেজ সেই সময় ---

    সত্তরের গোড়ায় আমাদের (এবং সারা দেশেই) মেডিকেল কলেজে মেয়ে-টিচার ও মেয়ে-ছাত্রী দুই-ই খুব কম ছিল। ব্যাপক ছিল নারীবিদ্বেষ, লিঙ্গবৈষম্য, সমকামী-বিদ্বেষ ও খোলাখুলি অ্যালকহল আর সিগারেটের ব্যাবহার। AIIMS-এও মেয়ে ছাত্রী খুব কম ছিল, কিন্তু মহিলা শিক্ষিকা ছিলেন অনেক। আর প্রথম একমাস র‍্যাগিং ছাড়া পরে মেয়েদের কোন রকম জ্বালাতন দেখিনি। মাদকীয় পদার্থ তো শুধু লুকিয়ে চুরিয়েই চলত। এখানে এসে দেখলাম ছাত্ররা খোলাখুলি বিয়ার চালিয়ে যাচ্ছে। ক্লাসরুমে দরজার পাশেই একটা বিয়ারের কেগ, ছাত্ররা যে যার ইচ্ছামত গেলাসে ঢেলে নিয়ে যাচ্ছে। বিকেল বেলা, টিউটোরিয়াল ক্লাসে কেউ কেউ আবার ককটেল বানাবার পুরো সাজ সরঞ্জাম নিয়ে আসতো। সঙ্গে মুখরোচক খাবারও! আর ছাত্রদেরই বা দোষ দিই কী করে? হাসপাতালে প্রতি মাসে যকৃতের রোগের একটা মিটিং হতো —liver round নাম। সারা শহরের বিশিষ্ট স্পেশালিষ্টরা জড়ো হতেন। তার জন্য যোগ্য পানীয় অবশ্যই বিয়ার আর সঙ্গে পিৎজা! লিভারের বারোটা বাজানো হতো আর কি।

    সিগারেট, পাইপ, চুরুট ইত্যদি সারা দেশেই জলভাতের মত সাধারণ ছিল। মিটিং রুমগুলি ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যেতো। আমার প্রফেসরের অফিসে মেঝের কার্পেট এখানে সেখানে সিগারেটের আগুনে পুড়ে ফুটো হয়ে গেছিল।

    প্রফেসররা লেকচারের সময় মেয়েদের নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করতেন, অ্যানাটমির অজুহাতে playboy ম্যাগাজিন থেকে ছবি দেখানো হতো। আমার এক রসিক প্রফেসর বন্ধু তাঁর ‘জোক’-এর জন্য ছাত্রদের মধ্যে খুব পপুলার ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই equal opportunity জোকার। তাঁর সরেস উপহাসগুলি মেয়ে, পুরুষ, ছেলে, বুড়ো, দেশী, বিদেশী, সাদা-কালো, হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদী, সমকামী, কাউকেই বাদ দিতো না। ক্যালিফোর্নিয়া বা নিউ ইয়র্ক থেকে আগত ছাত্রছাত্রীরা প্রথম প্রথম খুব অবাক হয়ে যেতো, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে সবাই তাঁর জোকের ভক্ত হয়ে যেতো। একবার তো একটা জোক বলতে গিয়ে প্রফেসর থেমে গেলেন কারণ এক ছাত্রী তার সাত-আট বছরের ছেলেকে ক্লাসে নিয়ে এসেছিলো। তার মা তাড়াতাড়ি ছেলেকে ক্লাসের বাইরে বসিয়ে ফিরে এল, প্রফেসর নির্দ্বিধায় তাঁর x-rated জোকটি শোনালেন, সবাই খুশি!

    সমকামিতা সম্পর্কে সেই সময় সারা দেশ ভীষণ স্পর্শকাতর ছিল। বিশেষ করে মিড-ওয়েস্ট এলাকা। ছাত্ররা কেউ এসম্বন্ধে আভাস মাত্র দিতে পারতো না। ডাক্তার ও প্রফেসররা সদলে এদের ঘৃণা করতেন। আমরা গে বা হোমোসেক্সুয়াল জানতাম, বাকিদের তখনো নামকরণই হয়নি। আমি ও কয়েকজন সহৃদয় ডাক্তার মিলে একটা গ্রুপ করেছিলাম, নাম—Safe Room। আমাদের অফিসের দরজায় একটি ছোট্ট সাইন লাগানো থাকতো — যে কোন ছাত্র, যে কোনো ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে নির্দ্বিধায় আলোচনা করতে পারে বা সাহায্য চাইতে পারে।

    অবশ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজও বদলায়, জোক এক্সপার্ট প্রফেসররা গত হয়েছেন, স্মোকিং ও মাদক পানীয় অনেক দিন আগেই আইন করে বন্ধ করা হয়েছে, আজকাল সেফ-রুমেরও আর দরকার পড়ে না।

    পরবাসে পাঁচ দশকঃ দুই গোলার্ধে অর্ধেক জীবন---

    আমার প্রবাসী পাঠকদের কাছে প্রশ্ন—আপনারা কোন দেশে নিজেকে বেশি স্বচ্ছন্দ মনে করেন? বাহান্ন বছর এদেশে কাটানোর পর এখন ভারতবর্ষ আমার কাছে অন্য দেশ মনে হয়। আমার ছোটবেলার ভারত নব্বুইয়ের পর থেকে একেবারে হারিয়ে গেছে। তাকে এখন আর চিনতে পারি না। আবার, এদেশেও সম্পূর্ণ স্বচ্ছন্দ বোধ করি না। কোথাও একটা বাধা থেকেই যায়। এটা বোধহয় সব প্রথম প্রজন্ম প্রবাসীদের অভিশাপ। সারা জীবন ধোপার কুকুরের মত না ঘর কা, না ঘাট কা হয়ে থাকতে হবে। আমার তো জন্ম থেকেই এই অবস্থা, একেবারে স্বচ্ছন্দ নিজবাস ঠিক কেমন লাগে সেটা তো কখনো জানতেই পারলাম না। মন ভালো করতে আমরা নিজেদের বলি গ্লোবাল সিটিজেন! সব দেশে মোর ঘর আছে।

    এক এক সময় আমার মনে হয় আমরা প্রবাসে জীবনটা উল্টোভাবে কাটিয়েছি। জীবনের প্রথম ভাগ—শৈশব, কৈশোর, যৌবন--আমাদের আমেরিকায় কাটানো উচিত ছিল। এদেশে কত মজা, কত প্রশ্রয়, সমাজ এখানে ছেলেমেয়েদের মাথায় তুলে রাখে। এখানে সর্বদাই যৌবনের জয়গান। তুলনায়, ভারতে এখনো মধ্যবিত্ত সমাজ অনেক রক্ষণশীল, অনেক বাধানিষেধ। উলটোদিকে, এদেশে বুড়ো হয়ে কোনো মজা নেই। অথচ আমরা জীবনের শেষভাগটাই এখানে কাটাচ্ছি। এই সময় দেশে কত সুযোগ সুবিধে, ঝি, চাকর, মালী, ড্রাইভার, চিকিৎসা সবই আমেরিকার তুলনায় অনেক সহজলভ্য। এখনো ভারতে বুড়ো বয়সে কিছুটা অন্তত মর্যাদা ও শ্রদ্ধা পাওয়া যায়।

    সেই চিরাচরিত প্রশ্ন —বুড়ো বয়সে এখানেই থেকে যাবো না দেশে ফিরবো আবার? অবশ্যই দুদিকেরই ভালো ও মন্দ আছে। সবথেকে শক্ত টান এদেশে নিজেদের পরিবার, ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনিদের সান্নিধ্য। ভারতে আমাদের নিকট আত্মীয়দের অনেকেই স্বর্গারোহণ করেছেন, আমাদের বয়সী কাছের লোক বলতে কেউই হয়তো বাকি নেই। এই বয়সে ফিরে গিয়ে আবার নতুন করে সম্পর্ক করা বা বন্ধুত্ব পাতানো সহজ নয়। অল্প বয়সে কত সহজে এক দেশ ছেড়ে আরেক দেশে পাড়ি দিয়েছিলাম। এখন আর সেটা অত সহজে সম্ভব বলে মনে হয় না।

    অনেক স্মৃতিবিচরণ হল। এবার মধুরেণ সমাপয়েত? যখন প্রথম এদেশে আসি, আমেরিকার বাক্-স্বাধীনতা, ধার্মিক স্বাধীনতা, সমান ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা এইসব আমাকে সজোরে আকর্ষণ করেছিলো। ভারতে এগুলো এখনো নামমাত্র। পরপর কয়েক জায়গায় ধাক্কা খেয়ে এদেশে এসে বিদেশী হয়েও নিজেকে অনেক নিরাপদ মনে করেছিলাম। সেই বোধটা এখনো আছে। দু’শ পঞ্চাশ বছর পরে এখন সেই প্রতিষ্ঠানগুলোয় কিছু ধাক্কা লেগেছে বইকি। তবে আশা করি, আমার নতুন দেশ আমেরিকার সংবিধান ভারত ও পৃথিবীর অন্য সব দেশের উদাহরণ হয়ে সুষ্ঠু ভাবে বেঁচে থাকবে।



    অলংকরণ (Artwork) : লেখক
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments