• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গল্প
    Share  
  • গরিলার এক প্রহর : ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত

    [দিল্লী, ১৯৮৩]

    ১ম পর্ব            ২য় পর্ব            ৩য় পর্ব


    নেউলেদার দুল পিসি

    রবিবার এসে পড়ল। ঘুম ভেঙে গিয়েছিল লুচির গন্ধে। ভাবলাম স্বপ্নের ভিতর এসেছে, স্বপ্নেই খেয়ে শেষ করতে হবে। নইলে উঠে দেখব আজ আসলে সোমবার এবং পম্পা আমাকে তার নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করাতে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হল মা বলছে — গন্ধ পেয়ে এক মাইল দূর থেকে নেউলে এসে হাজির। এবার তুই যদি না উঠিস তাহলে ও একাই সব খেয়ে নেবে।

    তাও আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমটা দ্বিতীয়বার ভাঙল যখন দাঁত ফাঁক করে কার মোটা মোটা আঙুল আমার মুখে একটা আধখাওয়া ময়দার টুকরো ঢোকাবার চেষ্টা করছিল।

    দলাটা গিলে বললাম — নেউলেদা, তুমি এ বাড়িতে কেন এসেছ? আমার নামে চতুর্দিকে মিথ্যে গুজব রটাবার পর এখন আমার লুচিগুলো খাবে বসে বসে?

    লুচি আমাদের বাড়িতে একটু বেশি হয়, এবং সব সময়ে ভালো না লাগলেও আমরা যতগুলো পারি খাই, কারণ মামা কোত্থেকে জানতে পেরেছে যে একাদশ না দ্বাদশ শতাব্দীতে আমাদের এক পূর্বপুরুষ লুচি আবিষ্কার করেছিলেন। নিজেদের জিনিস যদি নিজেরা কদর না করি তো কে করবে?

    নেউলেদা কানের জুলপি ধরে টেনেও আমাকে তুলতে না পেরে বলল — কয়েকটা তোর জন্য রেখে দেব যদি তুই এক্ষুণি উঠে পড়ে আমার একটা কাজ করে দিস।

    আস্তে আস্তে ওঠার পর দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসি। এই বদের ব্যারিস্টারের মাথায় কোনো নতুন দুর্বুদ্ধি এসেছে। নইলে সাত সকালে আমার কাছে ছুটে আসত না। যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে। ভিজে গামছার মতো শিষ্টাচারের শেষ আচ্ছাদনটাও ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয়। ঠাণ্ডা গলায় বললাম — আমাকে দিয়ে কার সর্বনাশ করাতে এসেছ আজ?

    নেউলেদা আমার অভদ্রতায় একটু বিমর্ষ হয়ে যায়। যদিও তার লুচি খাওয়া থামেনি। তার ফাঁকে সে একটু সময় পেয়ে বলল — তুই আমাকে আজীবন ভুলই বুঝে এলি, জয়। জার্নালিজমে শুধু নেগেটিভ হলে চলে নাকি? সময়, সীজন, এসবের সঙ্গে প্রতিদিন বদলাতে হয়।

    — তুমি পজিটিভ হয়ে গেছো? তোমার আক্কেল দাঁত গজিয়েছে এতদিন পর?

    জলখাবার নিয়ে ব্যস্ত নেউলেদা আমার দিকে তাকায় অবধি না। লুচিতে ফুঁ দেবার ফাঁকে ফাঁকে সে বলল — পজিটিভ শব্দটা বড্ডো সেকেলে শোনায়। নেগেটিভের নেগেটিভ বল। গোটা শহর একটা বাঘ শিকার করতে নেমেছে। আমি সেটাকে বাঁচাব।

    — বাঘ? গাছের সঙ্গে বাঁধা ছাগলের মতো শব্দটার পুনরাবৃত্তি করলাম।

    এতক্ষণ পরে যেন নেউলেদা আমার মধ্যে একটা প্রতিভার স্ফুলিঙ্গ দেখতে পায়। সেটা আরো ভালো করে দেখার জন্য দু-পা এগিয়ে এবং চোখে চোখ রেখে সে বলল — বাঘ মানে বগ্‌গা, মানে রঘুবীর, মানে বেতাল, মানে যে লোকটাকে তোর বন্ধু অক্কির মাসি যমুনার ধারে খুঁজে পেয়ে নিজের ভাই বলে ঘরে এনে ঢুকিয়েছে। যার ফলে সে এখন অক্কির মামা।

    এখানেও বেতাল! বেতালের ভূত আমার পিছু ছাড়ছে না। পালাব বলে উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে।



    মা আমার জন্য লুচি আলাদা করে রেখে দিয়েছিল। তার সঙ্গে সরু সরু করে কাটা আলুর তরকারি আর চা। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে তার একটা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম — নেউলেদা তোমাকে আমার বিষয়ে খারাপ কিছু বলেছে?

    — বলেছে তুই একটা কাঁচা হীরে। তোকে ও ঘষা-মাজা করে রত্ন বানিয়ে দেবে। লুচি ভাজতে ভাজতে বলল মা।

    ইচ্ছে হল কড়াইটাতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জননীর প্রায় চোখের সামনে নিজের মাথাটা নিয়ে গিয়ে বললাম — মা, কখনো এই মিথ্যেবাদীকে বিশ্বাস কোরো না। পরের ক্ষতি করা ছাড়া নেউলেদার কোনো উদ্দেশ্য নেই জীবনে।

    — তাহলে ওর সঙ্গে যাচ্ছিস কেন?

    — কে বলেছে আমি যাচ্ছি? জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তুমি আটকাও।

    খানিকক্ষণ চুপচাপ লুচি ভাজার পর মা বলে — ঠিক আছে তুই ঘরে গিয়ে বোস। আমি ওকে দেখাচ্ছি মজা।

    একটু নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে এসে বসি। নেউলেদার পাতে তখনো গোটা দুয়েক লুচি পড়ে আছে। খাচ্ছেও না, রেখেও আসছে না।

    আমার প্লেটটা দেখে শিমলিপুরের একমাত্র এবং নিকৃষ্টতম সাংবাদিক আরো হতোদ্যম হয়ে যায়। একটা প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল — দুল পিসি বড্ডো বেশি লুচি বানায়।

    অর্থাৎ নিজেরগুলোই খেয়ে শেষ করতে পারছে না তো আমারটা কী খাবে। বললাম — জোর করে খেও না। যা পারবে না রেখে যাও, আমি বিকেলে খেয়ে নেব।

    — পারব না কেন? একটু আস্তে আস্তে খেতে হবে। তোর সঙ্গে কথাগুলোও বলা হয়ে যাবে।

    দূরে জানালার কাছে সরে যাওয়ার সময়ে মনে মনে বললাম ‘স্টাফ ইট’। মুখে বললাম — লুচি খেয়ে বাড়ি যাও। আমি তোমার কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছি না। আমার অন্য কাজ আছে।

    — তোর বন্ধুর লাইফ তুই বাঁচাবি না? নেউলেদা মর্মাহত হবার ভান করে।

    — কার লাইফ?

    — অক্কন কুমার তওয়াতিয়া। ওরফে অক্কি। চোখ পাকিয়ে ভয় দেখায় নেউলেদা। — পুলিশের খাতায় যার অলরেডি নাম। তার মাসি তো থানায়। বাকি পরিবারও ঢুকব ঢুকব করছে। মাসিটা থানায় বলেছে অক্কন কুমার অমাবস্যার রাতে ভেড়িয়ার আওয়াজ শুনলেই গলা ফুলিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

    কী রাবিশ! তড়াং করে মেজাজের পারা চড়ে গেল। লোকাল কাগজগুলো খবরের নামে বাঁদরের বক্‌ওয়াস ছাপায়। এটাও বাস্তবিক ছাপিয়ে দেবে। দাঁত কিড়মিড় করে বললাম — নেউলেদা, তুমি আবার মিথ্যে রটানো শুরু করেছ?

    — আরে, আলুর দম, থানায় আমার ইনফর্মার সেট করা আছে। কালকের মধ্যে টপ নিউজ হয়ে যাবে। নেউলেদা একটা চেশায়ার বেড়ালের মতো হাসির ফাঁক দিয়ে শব্দগুলো উগরে দেয়। — তখন দেখে নিস আমি সত্যি বলছি না মিথ্যে। দুনিয়ায় যত রিপোর্টার সব এখন দিল্লীর এই সন্‌সনী খেজ কেসটাকে ঘেঁটে দিতে নেমে পড়েছে। পাবলিক যত ক্ষেপবে তত সেল। আজকের স্কুপ, বেতালটার পূর্ব পরিচয় জানা গেছে। আগে ছিল গরীব স্কুল মাস্টার রঘুবীর চৌহান। সেখান থেকে হয়ে গেল জনতা পার্টির গুণ্ডা সদস্য বগ্‌গা। সেই বগ্‌গা অন্য দলের গুণ্ডাদের হাতে খুন হয়ে যাওয়ার পর এখন হয়েছে বেতাল।

    গুড গড!

    এগুলো সত্যি, না নেউলদা আর তার মতো শহরের আরো আধ ডজন লোকাল কাগজের ধুর্‌রা স্টাফ পরস্পরের সঙ্গে গুল মারার প্রতিযোগিতায় নেমেছে? এত খবর এক সঙ্গে কোথায় পেল এরা?

    — বু-ল্‌-ল্‌-ল্‌-শিট! আমি এক চড়ে গুজবের মাছিগুলো মেরে ফেলার চেষ্টা করি।

    নেউলেদা আমার মুখের কাছে মুখ এনে বলল — কাল অবধি অপেক্ষা করলে ন্যাশানাল ডেইলিতেই দেখতে পাবি, নির্বোধ। পাবলিক এরকম বহুরূপীদের পছন্দ করে না। তারা এই গিরিগিটির রক্ত দেখতে চাইছে। ওর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে অক্কির পাগলা মাসিটা তার পুরো ফ্যামিলিকে ডোবাবে।

    নেউলেদার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমার উদ্বেগ তুঙ্গে উঠে গিয়েছিল। অক্কির মাসি যে তার ফ্যামিলিকে ডোবাবে সেটা কেউ বলার আগেই আমি জানতাম। শিমলিপুর না হয়ে অন্য কোনো জায়গা হলে এরা সবাই এতদিনে জেলে গিয়ে বসে থাকত। এখানকার পুলিশ কোনো কাজের নয় বলে দেরি হচ্ছে। ভিতরটা চুরমার হয়ে গেলেও উপরে সেটা না দেখিয়ে বলি — শাবাস! ডাহা মিথ্যের আগুনে আরো পেট্রল ঢালাই তো তোমার ব্যবসা।

    নেউলেদা যেন প্রশংসা শুনেছে এমনভাবে খুশি হয়ে যায়। — আরে আমার চিনির সেপাই, মূলোর ক্ষেত, মঙ্গলবারের লাড্ডু, সে আনন্দে ডগমগ হয়ে বলল — ওরা ডাল-ডাল তো আমি পাত-পাত। সব সময়ে এক স্টেপ আগে থাকি। দিল্লীর দশটা কাগজ যদি বলে বেতাল মুজরিম হ্যায় তো আমার কাগজ বলবে বেতাল বেকসুর হ্যায় মাই লার্ড! আমরা কেস পুরো উলটে দেব। ওদের সাজানো সেট লণ্ডভণ্ড করে দেব আমি।

    — তুমি একা? এত ক্ষমতা তোমার?

    — পাওয়ার অফ ট্রুথ! উৎসাহের চোটে এক গরাসে একটা লুচি সাবাড় করে নেউলেদা। তার চোখ ধর্মযুদ্ধের উদ্দীপনায় চক চক করে উঠেছে। ক্ষিদেও ফিরে এসেছে আবার। ‘দাঁড়া’, বলে আরেকটা লুচি আনার জন্য সে রওনা দিল।



    ***

    পরে নাক সিঁটকে আমি নেউলেদাকে বলেছিলাম — পাওয়ার অফ ট্রুথ? হাসিও না। তোমার চিতাভস্ম ঘেঁটে কেউ এক আউন্স সততা বের করতে পারবে? হাফ গ্রেন এথিক্‌স্‌? লোকে তোমাকে মিথ্যেবাদী ধীমান রায় বলেই চিনবে। পুরো কাণ্ডটা তুমি করছ অক্কির বা বেতালের ভালোর জন্য নয়। নিজের ভালোর জন্য।

    নেউলেদা কোনো কারণে একটু দমে গিয়ে বা হয়তো ক্ষিদের অভাবে পরের লুচিটা আর খেতে পারেনি। সে বলে — ঠিক আছে। ধরে নেওয়া যাক আমি পয়সার জন্য বেতালের পক্ষ নিচ্ছি। কিন্তু তাহলেও তুই আর আমি এখন এক টীমে। তুই নিজের বন্ধুকে বাঁচাবার জন্য আর সত্যের জন্য খেলবি। আমি পেশাদার। টাকার জন্য লড়ব। হাত মেলা।

    উত্তরে হাত আরো গুটিয়ে নিয়েছিলাম আমি। নেউলেদার কথায় তিন-আনা যুক্তি যদি বা থাকে, তেরো আনা কাঁকড়। বললাম — তোমাদের কাগজটাকে কোনোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছ বেতালকে সাপোর্ট করলে কাটতি বাড়াবে। কিন্তু তাতে তোমার লাভ কী? খাটনি অনেক বেশি। পয়সা মোটেও তেমন বাড়বে না। এটা তোমার নিজের আইডিয়া বলে মনে হচ্ছে না। কেউ তোমাকে দিয়ে করাচ্ছে।

    নেউলেদাকে যা বলেছিলাম সেটা একটা পেটেন্ট করা ট্রুথ সেরাম। গোপন কথা বার করার এই কৌশল টোটোদা শিখিয়ে দিয়েছিল। বলতে হয় অন্য কেউ তোমাকে দিয়ে কাজটা করাচ্ছে। লেগে গেলে লোকেরা ভাবে তার গুপ্ত কথাগুলো ফাঁস হয়ে গেছে। আর না লাগলে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টায় অনেক সময়ে নিজের আসল মোটিভ ফাঁস করে দেয়।

    সেরামটা দেবার পর আরাম-সে লুচির ছোট শিঙার মধ্যে অর্ধ-তরল তরকারি ভরে মুখে পুরি। চোখ বন্ধ। যেন আর কোনো দিকে মন নেই।

    ফুলকো হয়ে এসেছিল নেউলেদা। হঠাৎ অনেকটা চুপসে গিয়েছে। শেষ লুচিটাকে ছেঁড়াছিঁড়ি করতে করতে বলল — শিমলিপুরের দিক্‌পালরা কেসটাতে ইন্টারেস্ট দেখিয়েছে। তুইও চিনিস।

    শিমলিপুরে দিক্‌পাল এল কোথা থেকে? জিজ্ঞেস করি - যেমন?

    — যেমন ডাক্তার বাজাজ...।

    মুখের খাবার চিবোতে ভুলে গেলাম। এই বাজাজের নামে নেউলেদা কী না অকথ্য ক্রাইম স্টোরি রটিয়ে বেড়াত! নেউলেদাকে মনে করিয়ে দিই। - এই মানুষটার নামে তুমি জঘন্য সব অপবাদ ছড়িয়েছ। তিনি এখন তোমার কাছে দিক্‌পাল হয়ে গেছেন?

    নেউলেদা বলে — ওসব পুরোনো খবর। বাজাজের দেশভক্তির উপর আর্টিকেল বেরিয়েছে আমার।

    চায়ে একটা চুমুক দিয়ে ঝুঁকে পড়ে বললাম — তিনি তোমায় টাকা দিয়েছিলেন লেখার জন্য। তাই না?

    — মা কালীর দিব্যি। তা নয়। কথাটা বলার সময় নেউলেদার চোখ ডাইনে বাঁয়ে চট করে একবার ঘুরে কাছাকাছি কোথাও মা কালী আছেন কিনা দেখে নিল।

    মাথায় ঢুকছিল না। গুলজারীলালজী বেতালকে বাঁচাতে চাইছেন? হোয়াই? আর নেউলেদাই বা সেটা আমাকে জানাতে এত ব্যগ্র কেন? ট্রুথ সেরাম দিতে না দিতেই বেরিয়ে এসেছে।

    নেউলেদা কাছে চলে আসে। — বাজাজ আমাদের সাহায্য করতে রাজি হয়েছে। সত্যের খাতিরে। সেইজন্য আমাদের তিনজনকে এককাট্টা হতে হবে। তোর বন্ধু আর বন্ধুর মামা, দুজনকেই আমরা বাঁচাব, জয়।

    — আমি কেন তোমাদের মতো দুটো উন্মাদ সাইকোপ্যাথের মধ্যে ঢুকব?

    নেউলেদার চোখ আবার আমার চোখ থেকে সরে গিয়েছিল। সে একটু ভেবে বলল — কারণ পায়ে চামড়ার জুতো আর সঙ্গে তুই না থাকলে ব্যাটা আমাকে ঘরে ঢুকতে দেবে না।

    যতবার নেউলেদার সাথে কথা হয়, ততবার আমার মাথাটা বোঁ বোঁ ঘুরিয়ে ছাড়ে সে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। খাওয়ার বারোটা বেজে গেল। প্লেট প্লেট রইল না, কাপ কাপ রইল না। দুটো ডাম্ববেল হয়ে গেছে। মাটিতে নামিয়ে রাখতে হল।

    — কোন ঘরের কথা বলছ, নেউলেদা? কী গুল খিলিয়ে এসেছ তুমি?

    — কোনো গুল খিলাইনি। সিম্পল্‌ ব্যাপার। নেউলেদাও নিজের প্লেটটা মাটিতে নামিয়ে দিয়ে বলল। — আজ রবিবার। হাসপাতাল খালি থাকে। পুলিশের কাজগুলো হয়। মন্দিরের যে পুরুতটা মরেছিল, অ্যাডমিনিস্ট্রেশানের রিকোয়েস্টে বাজাজ তার পোস্ট মর্টেম করতে রাজি হয়েছে। আমরা পুরো ব্যাপারটা কাছ থেকে দেখতে পাব যদি তুই আমার সঙ্গে যেতে রাজি হোস। আরে, আমার সালগিরহের তোহ্‌ফা, বিয়ের সানাই, পদ্মবিভূষণের গুলদস্তা, এরকম স্কুপ দিল্লীতে তোর গোটা জন্মে কেউ পায়নি!



    ***

    বাইরে থেকে মা’য়ের গলা পাওয়া গেল — নেউলে তুই জয়কে নিয়ে বেরোস না! তার আগে আমি তোর সাথে একটু কথা বলব।

    নেউলেদা “ঠিক আছে!” বলে হাঁক দিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে। — মা’কে বলিস না। খামোখা চিন্তা করবে। বাজাজ জানিয়েছে মুর্দাটাকে গলা টিপে মারা হয়নি। খুব সম্ভবত কোনো জংলী জন্তুর হাতে মরেছে সেটা। ভেড়িয়া ছাড়া আর কি? বেতালের ইতিহাস নিয়ে যে যা ইচ্ছে লিখুক। পোস্ট মর্টেমের পর এমন রিপোর্ট বেরোবে যে বেতাল-মামার টিকিও ছুঁতে পারবে না পুলিশ। স্কুপটা পেয়ে গেলে বিকেলের কাগজেই প্রমাণ করে দেব সে নির্দোষ। কোনো কেস দাঁড়াবে না।

    — ধরো তোমার সঙ্গে গেলাম আর তুমি অক্কির মামার সপক্ষে একটা ভালো লেখা দিলে না! মিথ্যে বলা তো তোমার পক্ষে নতুন না?

    নেউলেদা এক লাফে আমার কাছে চলে আসার পর জামার কলারটা খিমচে ধরে পাকাতে থাকে। — লোকে তোকে বুদ্ধিমান ভাবার ভুল করে কেন রে? একটু ভেবেচিন্তে কথা বল। স্কুপ যদি পাই তাহলে কি সেটাকে বাড়িতে বসিয়ে ডিম পাড়াব? অন্যের হাতে লেগে যাওয়ার আগে ছাপিয়ে দেব না?

    মা এক কাপ চা নিয়ে ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে পড়ে বলল — নেউলে, তুই আমার ছেলেকে এত কষ্ট দিয়েছিস কেন? ও তোর সঙ্গে কোথাও যাবে না।

    নেউলেদা থতমত খেয়ে কলার ছেড়ে দেয়। তারপর হাত-টাত ঝেড়ে সে বলল — দুল পিসি, জয়কে আমি নিয়ে যাচ্ছি না কোথাও। তুমিই জিজ্ঞেস করো। ও নিজে যদি কোথাও যেতে চায় তো স্কুটারে লিফ্‌ট দিতে পারি।

    মা নেউলেদার কথাটা শুনতেও পায়নি। নিজেরটাই বলে চলল। — ছেলেটা ভীষণ খাটছে। রাত জেগে পড়াশোনা করে। কম্পিটিটিভ পরীক্ষাগুলো দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। ওর ঘুম দরকার।

    নেউলেদা অমনি ধুয়ো ধরে ফেলে। — চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি ভালো ঘুমোয় না। চোখের কোণে কালি। কিন্তু এত রোগা হল কী করে? মাঝে মাঝে চিকেন খাওয়াও না তোমার ছেলেটাকে?

    হয়ে গেল বিজয়া দশমী। মা’য়ের দুঃখের সলতে জ্বলে উঠেছে। জননী চা খাওয়া ভুলে গিয়ে গলা নামিয়ে বলল — এ বাড়িতে চিকেন ঢোকে না, নেউলে। তুই জানতিস না? বৌদি হরিবাড়ির মেয়ে। কৃষ্ণের মাথায় পালক থাকে বলে বাড়িতে পাখি রান্না করার উপায় নেই। এদিকে সবাই বলে খুব দরকার ওটা খাওয়ানো। কী যে করি?

    আর কী! নেউলেদার ভুরুও কপালে উঠে যায়। — সর্বনাশ!! এরকম ব্রিলিয়ান্ট একটা ছেলে চিকেন খেতে পাচ্ছে না? আমি আজই খাইয়ে আনছি। স্কুটার আছে সঙ্গে। সোজা কাকেদা’য় নিয়ে যাব।

    — কিন্তু আজ যে বাড়িতে ভালো রান্না হচ্ছে।

    — ও...। তাহলে না হয় অন্য এক দিন।

    মা হঠাৎ টপ করে ভিতরে চলে গিয়ে গোটা চল্লিশেক টাকা এনে নেউলেদার হাতে দিয়ে বলল — তুই ওকে কালকে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দে তো। দুজনে মিলে ভালো করে খেয়ে আয়।

    টাকাটা অম্লানবদনে পকেটে পুরে নেউলেদা আমাকে বলল — তন্দুরী খাব বুঝলি? বেশি মশলা হবে না। পুরোটা গায়ে লাগবে। ব্রিলিয়ান্ট ছেলেদের এইরকম ব্রেন ফুড দরকার।

    মা’কে ঠকিয়ে টাকাটা আত্মসাৎ করার পর নেউলেদা আমাকে বলল — কি রে? কোথাও ড্রপ করে দেব তোকে?

    উঠে পড়লাম। যতক্ষণ বসে থাকব নেউলেদা নির্লজ্জভাবে মা’য়ের ব্যাগ খালি করে যাবে। মা বলল — তুই নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছিস তো জয়? ও জোর করছে না তো?

    — না, মা। এটা নিজের কাজে যাচ্ছি। কোনো চিন্তা কোরো না।

    মা হঠাৎ নেউলেদার দিকে ফিরে বলল — নেউলে, তোর ঠাকুরদা একটা কত বড়ো লোক ছিলেন জানিস? এখানে যত দুস্থ বাঙালি পরিবার পার্টিশানের পর এসে হাজির হত তিনি তাদের বিনে পয়সায় দিনের পর দিন খাওয়াতেন। সপরিবারে তোদের বাড়িতে উঠেছে কত লোক! দয়ার সাগর বলতে যা বোঝায় তাই ছিলেন। কাউকে ঠকাননি, কোনোদিন মিথ্যে বলেননি। শুধু দিয়ে গেছেন। নিজে তদ্বির করে নতুনদের চাকরি খুঁজে দিতেন। প্রায়ই তাঁকে দেখেছি আমার বাবার কাছে একটা কাউকে এনে বলছেন — ব্রজেন, একেও একটা কোথাও লাগিয়ে দে লক্ষ্মী ভাই। ওনার আগে কিম্বা পরে শিমলিপুরে এরকম একটা মানুষ আসেনি।

    এতটা গড়গড় করে বলার পর একটু থেমে গিয়ে মা যোগ করল — তোর মুখশ্রীতে আমি তাঁর সেই সাগরের মতো চোখদুটো দেখতে পাই।

    নেউলেদার হাসিহাসি মুখচন্দ্রমা হঠাৎ মঙ্গল গ্রহের মতো থমথমে লাল। সাগর না হলেও চোখের খিড়কি পুকুরে জল। সেটা না পারছে ঢাকতে, না পারছে ফেলতে। নিঃশব্দে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাচ্ছে নিজের স্কুটারের কাছে। আমাকে সে মুখ ফুটে ডাকতেও পারল না। পিছন থেকে চেঁচিয়ে বললাম — বসে যাও। বেশিক্ষণ লাগবে না আমার।



    ***

    যাওয়ার পথে একটা থলে তুলে নিতে হল। তানিয়ার ফ্লাস্ক আর একটা স্টিলের গ্লাস সঙ্গে না নিয়ে সকালে বাড়ি থেকে বেরোই না। নেউলেদা আমাকে জোর করে চামড়ার জুতো পরিয়েছে। গুলজারীলালের নির্দেশ।

    পম্পার সুপার-পাওয়ারওয়ালী বন্ধু তানিয়া বলেছিল এগারো দিন তার হয়ে শিবের মাথায় জল দিতে পারলে আমারও একটা ফাঁড়া কাটবে। সবে তৃতীয় দিন হল। এদিকে রাহুর মতো হাঁ করা বাজাজের গ্রাসের দিকে আমি আরো এগিয়ে চলেছি। তানিয়া সঙ্গে থাকলে আজ ভালো হত। জিজ্ঞেস করতাম — কোথায় তোমার সুপার-পাওয়ার একটু দেখাও।

    স্কুটারে ওঠার আগে নেউলেদাকে বললাম — পোস্টমর্টেমের ধারে কাছে যাওয়ার আগে আমাকে একটু দুর্গামন্দিরে যেতে হবে। তোমার কি অসুবিধে হবে সেখানে দাঁড়াতে?

    — নো প্রবলেম জয়। আজ তুই বস্‌, আমি তোর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট।

    কাল আমার দেখাদেখি দুফিও শিবের মাথায় জল দিয়ে গেছে। আজ নেউলেদা আমার পিছু পিছু হেঁটে শিবলিঙ্গ প্রদক্ষিণ করল। আজব এই দুনিয়া। গজব তার লোক। একটা খ্রীষ্টান মেয়ের কল্যাণে আমি কমিউনিস্ট বাবার ছেলে হয়ে সবান্ধবে মন্দিরে ঢুকেছি। মসৃণ আর লম্বা পাথরের টুকরোটার উপর জল ঢালার সময়েও আমি মনে মনে পম্পার উরু দেখছিলাম। যেন সেটাকে বেয়ে একটা কালো ইলাস্টিকের ব্যাণ্ড উঠে আসবে। সারাদিন ধরে মিনিটে একবার করে আমার মাথায় এই সব লেস আর নাইলনে শোভিত দৃশ্য। থামাবার কোনো উপায় যখন নেই তখন দু-চোখ বন্ধ করে থাকি দৃশ্যটাকে ধরে রাখব বলে। এদিকে আমাকে চোখ বুজতে দেখে ভক্তির জোয়ার আসছে আশে পাশে অন্যদের মনে।

    কী রাবিশ!

    নেউলেদা একবার প্রদক্ষিণ করে থামল না। গদগদ ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে কী সব বলেও যাচ্ছে। দুর্গার মূর্তির সামনে গিয়ে একবার দাঁড়াল। আরেক প্রস্থ বিড়বিড়। তারপর একটা ভগবদ্‌প্রীতির ভূমিকম্প এসে ধাক্কা দিয়ে তাকে মাটিতে শুইয়ে দিল। সাষ্টাঙ্গ প্রণামের ভঙ্গিতে শোওয়া নেউলেদা হুঙ্কার দিয়ে বলল — শক্তি দে শক্তিরূপিনী!

    এদিক ওদিক যে সব অন্যান্য ভক্তরা ছিল (যারা কেউই বাঙালি নয়), মানুষটাকে পাগল কুকুরে কামড়েছে ভেবে ভয়ে সরে গেছে। নেউলেদা আড়চোখে সেটা দেখতে পেয়ে বোধহয় ঠিক করল বাড়াবাড়িটা বেশি হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তার হুঁশ ফিরে এসেছে এরকম ভাব দেখিয়ে সে জামা ঝেড়ে উঠে পড়ল মাটি থেকে।

    একটু পরে একটা পয়সাও দক্ষিণা না দিয়ে বীরের মতো বিদায় নিচ্ছিল নেউলেদা। আমি প্রত্যেকবারের মতো কাঠের বাক্সে সিকি ফেলে দিয়ে পিছু পিছু বেরোলাম। নেউলেদার মাথায় হেলমেট। আমার মাথায় ঋতুওয়ালীকে স্পর্শ করার অভিশাপ।

    একই গন্তব্যের যাত্রী হলেও দুজনের পথ কত আলাদা! একজনকে ধরেছে স্কুপের ভুত। আর একজনের কল্পনার দৌড় শকুন্তলার কালো প্যান্টিজ আর নীল স্কার্টের তটরেখা অবধি! এর বাইরে যা কিছু ঘটছে তা থেকে বিন্দুমাত্র কিছু পাওয়ার লোভ বা আকাঙ্ক্ষা নেই আমার।

    তাহলে বাজাজকে ভয় করব কেন?



    ***

    বালকবাবা হাসপাতালের সামনে পুরোনো ভেস্পা স্কুটারটাকে দাঁড় করিয়ে নেউলেদা বলল — ডাক্তার বলেছিল ন’টায় আসতে। আমাদের দেরী হয়ে গেছে কছুয়া।

    আমার হাতে ঘড়ি নেই। জিজ্ঞেস করলাম — কটা বাজে?

    — নটা চার।

    চার মিনিটের দেরীর জন্য নেউলেদার হাওয়া ফুস্‌। মুখের ভাব দেখে মনে হল গুলজারীলাল বেচারাকে নিয়মিত জুতো বা পেপারওয়েট ছুঁড়ে মারছেন। পিঠে একটা হাত রেখে বললাম — ভয়ের কিছু নেই। তৈরি থাকব। যাই আসুক, আমরা ক্যাচ করে নেব।

    — তুই আগে থাক তাহলে।

    এক তলার সবচেয়ে দূরের হল ঘরটা বাজাজের ল্যাবরেটরি। টোকা দেবার পরে ওয়ার্ড বয় এসে দরজা খুলেছে। আমাদের দাঁড়াতে বলে সে গেল বাজাজকে ডাকতে। আরো একটু পরে একটা মাস্ক পরা গরিলা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়।

    — ওয়্যালকম্‌ টু দ্য হাউস আফ দ্য ড্যাড্‌। গরিলাটা আমাদের অভ্যর্থনা করে বলল। — এখানে একবার যে আসে তার আর অন্য কোথাও মন লাগে না।



    ১ম পর্ব            ২য় পর্ব            ৩য় পর্ব
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments