• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | ভ্রমণকাহিনি, প্রকৃতি, বাকিসব
    Share  
  • শুধু তিনটি পাখি : ছন্দা চট্টোপাধ্যায় বিউট্রা

    আমি পাখি ভালবাসি। তবে খাঁচায় ধরে রাখার মতো ভালবাসা নয়। আমি বনের প্রাণীকে বনেই দেখতে পছন্দ করি। তারই জন্য দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াই। গত তিরিশ বছরে প্রায় চোদ্দো-পনেরোশ’ জাতির পাখি দেখার সুযোগ হয়েছে। অনেকেই জিজ্ঞেস করেন কোন পাখিটা আমার সবথেকে প্রিয়। এর উত্তর দেওয়া মুশকিল। কোনোটি হয়তো অতি বিরল। দর্শন পেলে নিজেকে ধন্য মনে করি। কোনো পাখির গলায় অসাধারণ মিষ্টি সুর, যেমন কোস্টারিকার ক্লে কালার্ড রবিন, বা অ্যামাজন জঙ্গলের ওরোপেন্ডলা পাখি। সুরের জোরেই এরা মন কেড়ে নেয়। কোনো পাখির ঝকমকে পাখার বাহার সবাইকে সহজেই হারিয়ে দেয়, যেমন ময়ূর বা হামিংবার্ড। কাকে রেখে কাকে দেখি! সবাই যে ভগবানেরই সৃষ্টি।

    তবে প্রিয় পাখিদের লিস্ট বানাতে গেলে তিনটি পাখির কথা প্রথমেই আমার মনে আসে। এরা দেখতে এমন কিছু সুন্দর বা রংদার নয়, গলায় কোনো গানও নেই। তবে এরা স্থান ও সময়বিশেষে অনন্য এবং আমার নিজস্ব স্মৃতিবিজড়িত। সে হিসেবে এরাই আমার প্রিয়তম পাখি।


    ১ তুষার পেঁচা

    প্রথম পাখি স্নো আউল বা তুষার পেঁচা। বিরাটকায় পাখি, ধবধবে সাদা রং-এর ওপর একটু কালো আঁকিবুঁকি। সাইজে দু ফুটের মতো, ওজনে ছ-সাত পাউণ্ড। আমি আগে স্নো আউল শুধু ছবির বইয়ে আর চিড়িয়াখানাতেই দেখেছি। বাইরে কখনো দেখিনি। এরা থাকে সাইবেরিয়া, উত্তর ক্যানাডা, আলাস্কা ইত্যদি অঞ্চলে বরফের দেশে-- তাই সাদা রং। ভারতে এদের দেখা যায় না। ভারতে আমরা যাকে সাদা পেঁচা বা লক্ষ্মী পেঁচা বলি—মা লক্ষ্মীর বাহন—সেটা অনেক ছোট সাইজের বার্ন আউল, চ্যাপ্টা মুখ, বাদামি-সাদা রং। তুষার পেঁচারা খাবারের অভাব হলে বা আবহাওয়া অনুকূল থাকলে, কখনো-সখনো একটু দক্ষিণে নেমে আসে, আমেরিকার মিনেসোটা, বা ম্যাসাচুসেটস অঞ্চলে। আরও দক্ষিণে ওমাহাতে এদের কখনোই দেখা যায় না—শুধু...

    এক বছর, সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে, একটি কৌতূহলী তুষার পেঁচা হয়তো বা পথ ভুলে আমাদের শহরে আবির্ভূত হল। তাও কোনো পার্কে বা বাগানে নয়, একেবারে শহরের মাঝে, শপিং মলের সিমেন্ট বাঁধানো পারকিং লটে! হয়তো কাছেই খাবারের দোকানের আস্তাকুঁড়ে ইঁদুর ছুঁচোর সন্ধান পেয়ে থাকবে। পেঁচাটি মেয়ে পাখি, তাই আরও বড়ো সাইজ। ঠিক হ্যারি পটার-এর পোষা পেঁচা হেডউইগ-এর মতই! বসে ছিল বেড়ার একটা খুঁটির ওপর। আমি দূর থেকে ফোটো তুলতে তুলতে সাবধানে এগোচ্ছিলাম যাতে ভয় পেয়ে উড়ে না যায়। কিন্তু এরকম রাজকীয় পাখি ভয় পায় না, অবশ্য বিরক্ত হয়ে উড়ে যেতে পারে। আমার দিকে তাকাচ্ছিল খুব অবজ্ঞাভরে, কেন আমায় বিরক্ত করছ? আমি যখন দু-তিন গজ দূরে, পাখিটা ধীরেসুস্থে বিরাট দুই ডানা মেলে আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল বিল্ডিঙের ছাতের কোণে। অতবড়ো পাখিটা উড়ল এত কাছে থেকে, কিন্তু একেবারে নিঃশব্দে! প্যাঁচারাই একমাত্র পাখি যারা রাতের অন্ধকারে, নিঃশব্দে খাবারের সন্ধানে উড়তে পারে। এই ক্ষমতার জন্য প্যাঁচাদের নিয়ে অনেক প্রবাদ ও অপবাদও আছে।

    প্যাঁচাটা দুদিন ঐ পারকিং লটে ছিল। ইতিমধ্যে আমাদের স্থানীয় বার্ডিং ক্লাব মারফত খবরটা ছড়িয়ে গেছিল। অনেকেই আমার মত ফোটো তুলেছিলেন। খবরের কাগজে ছবিও বেরিয়েছিল। দুদিন পর আবার যেমনি এসেছিল তেমনিই নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল। কোথায় গেল কে জানে। আর কখনোই এরকম কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি।

    আমার দ্বিতীয় স্মরণীয় পাখির দর্শন সুদূর অচিন দেশ পাপুয়া-নিউগিনিতে। আমি সেখানে গেছিলাম স্বর্গের পাখির (Bird of Paradise) সন্ধানে। পেয়ে গেলাম আরেকটি বিরল পাখি। বিষাক্ত পাখি! সাধারণত আমরা বিষাক্ত প্রাণী বলতে সাপ, ব্যাঙ আর কিছু সামুদ্রিক মাছের কথা মনে করি। আমি আগে কখনো বিষাক্ত পাখির নামও শুনিনি। এবার জানলাম দুই জাতীয় বিষাক্ত পাখি—পিটোহুই আর ইফ্রিতা –একমাত্র পাপুয়া-নিউগিনিতেই এদের দেখতে পাওয়া যায়। স্থান-কাল বিশেষে আরও দু-একটা পাখি একটু-আধটু বিষ উৎপাদন করে কিন্তু পিটোহুই-এর মত বিষাক্ত কেউ নয়। পাখিরা কিন্তু সাপের মত কামড়ে বিষ ঢালে না, শুধু পালক বা শরীর ছুঁলে বা খেলে বিষটা শরীরে ঢোকে। বিষটা দক্ষিণ আমেরিকার ‘পয়জন অ্যারো’ ব্যাঙের বিষের মতই, বৈজ্ঞানিক নাম batrachotoxin, সারা শরীরের স্নায়ু অসাড় করে দেয় আর হার্টও বিকল করে ফেলে। আগে আমি অ্যামাজনের জঙ্গলে এই ব্যাঙের দেখা পেয়েছিলাম। ছোট্ট এক ইঞ্চি সাইজ, ঝকমকে রং, দেখতে এত সুন্দর যে ইচ্ছে করে হাতে তুলে বাড়ি নিয়ে যাই। কিন্তু ছুঁলেই মরণ। আমাজনের আদিবাসীরা ঐ বিষ দিয়ে তীর শানায় আর লম্বা বাঁশের মধ্যে পুরে শুধু ফুঁ দিয়ে তীরটা ছোঁড়ে। অব্যর্থ লক্ষ্যে শিকার নামিয়ে দেয়। আমি চেষ্টা করেছিলাম, খুব দম লাগে ঐ রকম তীর ছুঁড়তে। তবে বিষাক্ত পাখিরা ব্যাঙ বা সাপের মত বিষটা শরীরের মধ্যে উৎপাদন করে না। এরা বিষটা পায় এক ধরনের গুবরে পোকা খেয়ে। এই বিষ সাপ, ঈগল, এবং অন্যান্য শিকারি প্রাণীর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার। স্থানীয় আদিবাসীরা অনেক রকম পাখি শিকার করে ও খায় কিন্তু এই পাখিটিকে সবাই সযত্নে এড়িয়ে চলে।


    ২ বিষাক্ত হুডেড পিটোহুই

    আমরা এর দেখা পেলাম একদিন আচমকাই। Hooded Pitohui একটি ছোট্ট পাখি, শালিকের সাইজ, লাল-কালো রং, কিন্তু গভীর, অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যেও উজ্জ্বল লাল টুকটুকে রংটি চোখে পড়তে বাধ্য। যেন সাবধান সংকেত। “কদাপি স্পর্শ করিবেন না!” ছবি তুলে ভয় মিশ্রিত কৌতূহল নিয়ে দেখলাম, যেমন জঙ্গলে দূর থেকে সাপ দেখার মত। পাখিটা দেখতে এমন কিছু নয়, গান-টানও করে না, শুধু বিষের জন্যই এর নাম (বা দুর্নাম)। আমার বিরল পাখির লিস্টে এটাই সবথেকে বিরল। ভাবি, এরকম কত বিরল প্রাণীই যে পাপুয়া-নিউগিনির জঙ্গলে লুকিয়ে আছে কে জানে!

    তৃতীয় পাখিটির নাম পাইলিয়েটেড কাঠঠোকরা (Pileated Woodpecker)। এটা আমেরিকা মহাদেশের সব থেকে বড়ো সাইজের কাঠঠোকরা, দাঁড়কাক সাইজ, কালো-সাদা রং, মাথায় ত্রিকোণ আকারের উজ্জ্বল লাল ঝুঁটি। আমি শুধু এ পর্যন্ত ছবিই দেখেছি, আসল পাখিটা এখনও দেখা হয়ে ওঠেনি। এরা গাছের গুঁড়ি ঠুকরিয়ে পোকা খায় তাই গাছেরও উপকার হয়। কিন্তু কখনো কখনো গাছের বদলে কাঠের বাড়ি বা টেলিফোনের খুঁটিতে ঠুকরিয়ে গর্ত করে ফেলে, তখন কেউ এদের প্রশংসা করে না। এদের বাসার গর্তগুলো বেশ বড়ো আর চৌকোমত। কাঠবেড়ালি ও অন্যান্য পাখিরাও সেখানে বাসা বাঁধে। আমেরিকায় টেক্সাস ও অন্যান্য দক্ষিণী প্রদেশগুলিতে এদের সহজে দেখা যায়। ইদানীং পূর্ব অ্যাটলান্টিক প্রদেশেও এরা ছড়াচ্ছে। কিন্তু দেশের মধ্য ভাগে, আমার কাছেপিঠে এখনও পৌঁছয়নি।


    ৩ পাইলিয়েটেড কাঠঠোকরা

    সেদিন ফিলাডেলফিয়ায় আমার মেয়ের বাড়িতে দুপুরবেলা আমি একা। সবাই কাজেকর্মে বাইরে। প্রতিদিনের মতই আমি বাগানের দিকে অলস ভাবে তাকিয়ে, যদি দুএকটা পাখি দেখা যায়। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে ক্যালিফোর্নিয়াতে, আমার প্রিয়তমা বান্ধবী, আমার মতই প্রকৃতি ও পক্ষিপ্রেমী, সে গুরুতর অসুস্থ, হাসপাতালে। এমন সময়ে বন্ধুর মেয়ের ফোন এল, আমার বন্ধু আর নেই, দু মিনিট আগেই সব শেষ। বেচারা কাঁদতে কাঁদতে ডিটেলে মায়ের শেষ সময়ের বর্ণনা দিচ্ছে, আর আমি পাথর হয়ে শুনছি। আমারও দু গালে জলের ধারা। হঠাৎ ঝুপ করে একটা বিরাট কালো পাখি নেমে এল বাগানের সিডার গাছের গুঁড়ির ওপর। পাখিটাকে আগে কখনো না দেখলেও আমি এক পলকেই চিনে নিয়েছি –মাথায় লাল ঝুঁটি, এ পাইলিয়েটেড উডপেকার না হয়ে যায় না। শহরের বাগানে এদের দেখা পাওয়া দুর্লভ। তাও আমার প্রথম নতুন দেখা! আনন্দে, উত্তেজনায় সবাইকে ডেকে দেখাতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বাড়িতে তো কেউ নেই। একটা ছবি তোলারও সুযোগ নেই কারণ ফোন-কামেরাটা তো কানে লাগানো, আমার বন্ধুর কাহিনী শুনছি। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। আমার বন্ধুর শোকে বুকটা ফেটে যাচ্ছে আর একই সঙ্গে নতুন দুর্লভ পাখি দেখে আনন্দে লাফাতেও ইচ্ছা করছে। আনন্দ আর দুঃখ একই সঙ্গে এভাবে কখনো অনুভব করিনি। চোখে জল, মুখে হাসি, এক অসীম কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে গেল।

    পাখিটা মাত্র কয়েক সেকেন্ড বসেছিল। আমার মন ভরিয়ে দিয়ে একটু পরেই আবার হুশ করে উড়ে গেল। মারগারেট তখনো কথা বলে যাচ্ছে। আমি শুনছিলাম কিন্তু মনের ভেতরে একেবারে অযাচিত ভাবেই আরও একটা ধারণা উঁকি মেরে গেল, ঐ পাখিটা যেন আমার প্রিয় বান্ধবী, আমায় শেষ বিদায় জানিয়ে গেল। সান্ত্বনা দিয়ে গেল যে সে থাকবে আমার কাছেই, আমাদেরই প্রিয় প্রকৃতিতে বিলীন হয়ে।


    (প্রথম দুটি ছবি লেখিকার তোলা। কাঠঠোকরার ছবিটা তুলতে পারিনি, তাই ইন্টারনেট থেকে নেওয়া)

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments