




‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে!’
‘তেপান্তর’ শব্দটির সঙ্গে ছোটবেলায় আমার পরিচয় হয় দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের লেখা ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ পড়বার সময়ে। ‘সোনার কাটী রূপার কাটী’ গল্পে পড়েছিলাম রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র ইত্যাদি চার বন্ধু ‘ঘোড়া ছুটাইতে ছুটাইতে ছুটাইতে ছুটাইতে তেপান্তরের মাঠের সীমায় আসিয়া পৌঁছিলেন’। লেখক চার-চার বার ‘ছুটাইতে’ ব্যবহার করে পাঠকের কাছে স্পষ্ট করে দেন কী বিশাল ছিল সেই মাঠ! কিন্তু সেখানেও আবার হোঁচট খাই। তেপান্তর তো শিখলাম ‘বড় মাঠ’ তাহলে কেন লেখক ‘তেপান্তরের মাঠ’ বললেন! এবার গিয়ে ধরলাম আমার বোন রূপাকে যে বাংলার অধ্যাপিকা। রূপা বোঝালো যে এখানে ‘তেপান্তর’ শব্দটি বিশেষ্য নয়, ‘বড়’ অর্থে মাঠের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
‘ঠাকুরমার ঝুলি’-র নীলকমল ও লালকমল, ডালিমকুমার ইত্যাদি সব ক’টি গল্প পড়ে মুগ্ধ হতাম ঠিক-ই কিন্তু ঐ বইয়ের ‘সাতভাই চম্পা’ গল্পটি ছিল আমার বিশেষ প্রিয়। একে তো সেখানে আমার নাম ব্যবহৃত হয়েছে তার ওপরে আমার ঠাকুমা খুব সুন্দর করে ঐ গল্পটি বলতেন। বারবার শুনতে চাইতাম গল্পের ঐ অংশটা যেখানে চাঁপা ফুলেরা পারুল বোনকে বলে ‘না দিব, না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর, / আগে আসুক রাজার বড় রাণী, তবে দিব ফুল’। হাসি-হাসি মুখে ঠাকুমার সুর করে বলা সেই কথাগুলো এখনও যেন আমার কানে বাজে!
প্রসঙ্গত বলি, বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারি দেখাশোনা করতে গিয়ে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার সেখানকার প্রচলিত লোকগাথা সংগ্রহ করেন। সেইসব গল্প নিয়ে তিনি প্রথমে লেখেন ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত সেই বইটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর, দক্ষিণারঞ্জন একই বিষয় নিয়ে লেখেন ঠাকুরদাদার ঝুলি (১৯০৯), ঠানদিদির থলে (১৯০৯), দাদামশাইয়ের থলে (১৯১৩)। এছাড়াও, তিনি পৃথিবীর নানাদেশের রূপকথার অনুবাদ করে প্রকাশ করেছিলেন ‘পৃথিবীর রূপকথা’ নামে একটি বই।
ছোটবেলায় অন্য যে বইটি পড়ে কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়াতাম তার নাম ‘বাংলার উপকথা’। বাংলার প্রচলিত গল্প যা বহুযুগ ধরে দিদিমা-ঠাকুমা তাঁদের নাতিনাতনিদের বলেন, ইংরিজি ভাষায় তার একটি সংকলন করেন রেভারেন্ড লালবিহারী দে। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত সেই বইটির নাম Folk Tales of Bengal। আমি অবশ্য তার বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম আর ফকিরচাঁদ, সহস্রদল-চম্পকদল, শ্বেতবসন্ত ইত্যাদি গল্পগুলো বারবার পড়ে আমার প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
বাংলার রূপকথার বইগুলো শুধু রাজা-রাণি-রাক্ষস-খোক্কসের কাহিনিতেই আমার শিশুমনকে ভরিয়ে রাখেনি। সেখানেই আমার পরিচয় হয় সাপের মাথার মণি, মন-পবনের নৌকা আর আশ্চর্য-পাখি ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর সঙ্গেও। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী (বা বিহঙ্গম-বিহঙ্গমী) কাল্পনিক পাখি। নানাগুণের অধিকারী এই পক্ষী-যুগল বড় দয়ালু। ঘন জঙ্গলের মধ্যে বিশাল কোনও এক গাছের ডালে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর বাস। তারা মানুষের মতো কথা বলতে পারে। সেই গাছের নিচে যদি কোনও দুর্দশা-পীড়িত পথিক আশ্রয় নেয়, তারা সেই আশ্রিতকে নানাভাবে সাহায্য করে। ব্যাঙ্গমা আবার ভবিষ্যৎ-ও দেখতে পায়। সে যখন পথিকের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে ভবিষ্যৎ-বাণী করে, ব্যাঙ্গমী তার কাছে বিপদ এড়ানোর উপায় জানতে চায়। ব্যাঙ্গমা তখন তাকে উপায়গুলোও বলে দেয়। পথিক সেই কথোপকথন শোনে ও যথাকালে যখন বিপদ আসে সে ব্যাঙ্গমার কথামতো চলে বিপদ এড়িয়ে যায়। আমার বা আমার মতো কোমলমতি পাঠকের জন্য সে ছিল এক স্বস্তির ব্যাপার।
যাহোক, ‘লালকমল আর নীলকমল’ গল্পের দুই রাজকুমারের সঙ্গেও ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর দেখা হয়। রাজকুমাররা রাক্ষসের মাথার তেল আনতে বেরিয়ে বনের মধ্যে মস্ত এক অশ্বত্থ গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। সেই গাছে ছিল ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর বাসা। রাজকুমাররা শুনতে পেল ব্যাঙ্গমী ব্যাঙ্গমকে বলছে ‘আহা, এমন দয়াল কারা, দু’ফোঁটা রক্ত দিয়া আমার বাছাদের চোক ফুটায়!’ সেকথা শুনে রাজকুমারেরা ‘আঙ্গুল চিরিয়া রক্ত’ দিল আর পাখির ছানাদের চোখ ফুটল। তারপর, কৃতজ্ঞ দুই ছানা রাজকুমারদের পিঠে নিয়ে ‘হু হু করিয়া শূন্যে উড়িল’ রাক্ষসদের দেশে যাবার জন্য। সাত দিন সাত রাত উড়ে গিয়ে তারা রাজকুমারদের গন্তব্যের কাছাকাছি এক পাহাড়ের ওপর নামল। রাজকুমাররা যুদ্ধ-টুদ্ধ করে রাক্ষসদের মেরে ফেলল আর রাক্ষস-নিধনের পর পাখিরা আবার রাজকুমারদের ফিরিয়েও আনল।
এখানে শুধু ব্যাঙ্গমদের কৃতজ্ঞতা-বোধ নয়, তাদের ডানার জোরও পাঠককে অবাক করে! এছাড়া, তাদের পিঠে বসা, তরোয়াল হাতে সুসজ্জিত রাজপুত্রদের ছবি দেখলে বোঝা যায় কী বিরাট মাপের ছিল সেই পাখিগুলো! সম্প্রতি আবার ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, সেখানকার সব ক’টি ছবি দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের নিজের আঁকা। মজার ব্যাপার হলো যে পাখিদের মুখের আদল খানিকটা মানুষের মতো! হয়তো তারা মানুষের মতো কথা বলে বলেই শিল্পী তাদের এমন হাঁসজারু বানিয়েছিলেন। আরও মজার ব্যাপার হল, আন্তর্জালে কাল্পনিক পাখিটি সম্বন্ধে যে তথ্য রয়েছে তার সঙ্গের ছবিটিতে পাখির দাড়ি-গোঁফ-সমন্বিত মুখটি যেন কোনও এক জ্ঞানী প্রৌঢ়কে মনে করায়!
বিখ্যাত শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুলিতেও মূর্ত হয়েছে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী। সেখানে অবশ্য তাদের দেখতে পুরোপুরি পাখির-ই মতো – বলা যায়, কতকটা চড়াই পাখির মতো। ১৯৩৯ সালে জলরঙে আঁকা ছবিটি মাপে ছোট -- চওড়ায় ৮ ইঞ্চি আর লম্বায় ১১ ইঞ্চি। তাতে পাখিদের গায়ের রঙ হালকা বাদামি, ঠোঁট ছোট কিন্তু শক্ত। তারা দু’জন যেন মেঘের মধ্যে বেশ অন্তরঙ্গ ভাবে বসে মনের কথা বলছে। মাপে বড় বলে যাকে পুরুষ বা ব্যাঙ্গমা বলে ধরে নেওয়া যায় তার ঠোঁট, চোখের চারধার ও পিঠ কালো রঙের, মেয়ে পাখিটির মানে ব্যাঙ্গমীর ঠোঁটটি লাল আর গায়ে নীল ছোপ, পিঠে হালকা নীলের আভা আর পায়ে লালের ছোঁয়া। ছবির নিচে লাল রঙে লেখা ‘বেঙ্গমা বেঙ্গমী’ আর ওপরে ডানদিকে দেবনাগরী অক্ষরে শিল্পীর শুধু নামটুকু লেখা। আন্তর্জালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এই ছবিটি ‘ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল হল’-এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে এবং ইংরিজিতে তার শিরোনাম The Vision Anybird। ছবিটির এমন ধারা নামের মানে আমি বুঝিনি তবে তাই নিয়ে মাথার মধ্যে একটা অস্বস্তি ঘুরপাক খাচ্ছিল! তারপর একসময় হঠাৎই মনে হল ব্যাঙ্গমা যেহেতু ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা, ছবিটির নাম বোধহয় The Visionary Bird।
এমনিভাবে, রূপকথা নিয়ে লিখতে বসে কখন যেন ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর পিঠে চেপে, তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে আমিও হারিয়ে গেলাম আমার শৈশবে – মনে মনে।