




আজ নিত্যানন্দ আর কৃষ্ণার বিয়ের আটচল্লিশ বছর পূর্ণ হল। বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিশেষ কিছু করেননি তাঁরা। শুধু সকাল থেকে গান বাজছে বাড়িতে। গীতবিতানের প্রেম পর্যায়ের। আর লাঞ্চে স্পেশ্যাল মেনু। পোলাও, চিংড়ি, পোস্ত-বড়া।
জম্পেশ লাঞ্চের পর দিবানিদ্রা থেকে উঠে এখন বিকেলের চা পর্ব চলছে। নিত্যানন্দর চায়ের কাপ পাশে টিপয়ের উপর রাখা। স্মার্ট ফোনে ফেসবুক খুলে খুটখুট করতে করতে তিনি বললেন, “বুঝলে কৃষ্ণা, আর মাত্র দু-বছর। তারপরই স্বর্ণকমল। পঁচিশ বছরেরটা হয়নি। আমাদের পঞ্চাশ বছরের বিবাহবার্ষিকী কিন্তু ধুমধাম করে মানাবো।”
কৃষ্ণার হাতের কাপে গাঢ় বাদামি চায়ের উপর হাল্কা সর। ডান হাতের তর্জনী দিয়ে সরটা সরাতে সরাতে কৃষ্ণা ঠোঁট বাঁকালেন। বললেন, “কেন? ফেসবুকে মালা পরা ছবি দেবে? এই বয়সে?”
নিত্যানন্দর কপালে হাল্কা ভাঁজ পড়ল। বললেন, “যদি দিই, ক্ষতি কী। আমাদের বয়স হয়েছে। তাই বলে বুড়ো তো হইনি।”
নিত্যানন্দ নামটা যতটা সেকেলে, মানুষটা ততটা পুরনো নয়। তাঁর বয়স পঁচাত্তর। কৃষ্ণা তিয়াত্তর। বয়স অনুপাতে দুজনেরই স্বাস্থ্য খারাপ নয়। হাঁটুতে কনকনানি, কোমরে ব্যথা, চোখে হাইপাওয়ার – এসব লেগেই আছে। তবে নিত্যানন্দর মতে, ওসব কোনও ফ্যাক্টর নয়। ওইটুকু সমস্যা আজকাল চল্লিশ বছরের খোকা-খুকুদেরও থাকে।
মুখের চা গলায় চালান করে কৃষ্ণা বললেন, “অ্যান্টি এজিং ক্রিম আর হেয়ার কালারের দৌলতে আমি কিন্তু ঠিকই আছি। তুমি বুড়িয়ে গেছ। চুলে রঙ লাগাও।”
ফেসবুকে কমেন্ট লিখছিলেন নিত্যানন্দ। তাঁর হাত থেমে গেল। গম্ভীর স্বরে বললেন, “বুড়ো হওয়া একটা মানসিক অবস্থা। তার সঙ্গে টাক বা গ্রে-হেয়ারের সম্পর্ক নেই।”
ঝাঁঝিয়ে উঠলেন কৃষ্ণা, “তোমার মানসিক অবস্থাও বুড়ো।”
দুজনের তর্কের মাঝে ডোর-বেল বেজে উঠেছে।
দরজা খুলে দেখেন, ক্যুরিয়ার। তাঁদের একমাত্র পুত্র রাতুল অ্যামেরিকা থেকে বিবাহবার্ষিকীর গিফট পাঠিয়েছে।
তাঁরা জানেন, এসব ব্যপারে রাতুলের অত দিনক্ষণের হিসেব থাকে না। কিন্তু পুত্রবধূ সোমার কখনও ভুল হয় না। জন্মদিনে কেক, পুজোতে শাড়ি, বিবাহবার্ষিকীতে উপহার সোমা ঠিক মনে করে পাঠায়। আর উপহার এমনই এক বস্তু যা প্রাপ্তিতে শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রত্যেকের হৃদয়েই আলো জ্বলে। যে আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে রঙিন কাগজের মোড়ক খোলার উত্তেজনা।
ক্যুরিয়ারের প্যাকেট নিয়ে দুজনেই হাসি হাসি মুখে পরস্পরের দিকে তাকালো। খোলা হল প্যাকেট। প্যাকেটের ভিতর থেকে বেরোলো সাত রাজার ধন মানিক। নিত্যানন্দ আর কৃষ্ণা দুজনেই মানিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। বুঝলেন, ছেলে আর ছেলের-বৌ বেশ চিন্তাভাবনা করেই তাদের সত্তরোর্ধ্ব মা-বাবাকে বিবাহবার্ষিকীর গিফট পাঠিয়েছে। প্যাকেটের উপর লেখা, AI ওয়েলনেস অ্যাসিসটেন্ট।
কিছুক্ষণ পরেই রাতুলের ফোন এল। ফোন স্পীকারে। রাতুল বলল, “মেসেজ এল, ক্যুরিয়ার ডেলিভারড। প্যাকেট খুলেছো? দেখেছো অ্যাপলায়েন্সটা? ম্যানুয়ালটা ভালো করে পড়ে নিও। দুজনেই।”
সোমা মিষ্টি গলায় বলল, “হ্যাপি ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি বাপি অ্যান্ড মাম্মা! গিফট পছন্দ হয়েছে তোমাদের? এইবার গিফট সিলেক্ট করেছে রাতুল।”
রাতুল বলল, “ইয়েস। মা, দেখো, অ্যাপলায়েন্সটা খুব ইউজফুল হবে তোমাদের এই বয়সে। বাবার কোমরে ব্যথা। তোমার হাঁটুর সমস্যা। আমরা পাশে নেই। এই AI বেসড ওয়েলনেস অ্যাসিসটেন্ট তোমাদের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখবে, ভালো থাকতে সাহায্য করবে।”
কৃষ্ণা কিছু বলার আগেই নিত্যানন্দ বললেন, “AI কি ডাক্তার? আর ভালো থাকার সঙ্গে বয়সের কী সম্পর্ক! তোমরা ইয়াং। তোমাদের কি ভালো থাকার দরকার নেই?”
কৃষ্ণা সামান্য উঁচু গলায় বললেন, “আবার শুরু করলে! আমাকে ছেড়ে রাতুলের সঙ্গে তর্ক জুড়লে?”
সোমা হেসে ফেলল। তারপর বলল, “বাপি, অ্যাপলায়েন্সটা দেখেছো তো? একটা ছোট্ট ক্যামেরার মতো। ড্রয়িংরুমের শো-কেসের উপর রেখে দিও। ওটা সারাদিন তোমাদের মুভমেন্ট অ্যানালাইজ করবে। মোবিলিটি স্কোর অনুযায়ী নির্দেশ দেবে, টাইম টু ওয়াক, টাইম টু হাইড্রেট, কখন ঘুমোতে যাবে। মানে ডেইলি হেলথ সংক্রান্ত ব্যাপারে তোমাদের কম্যান্ড করবে বা রিমাইন্ডার দেবে বলতে পারো। ভালো না?”
নিত্যানন্দ বললেন, “তার মানে, তোমাদের মা-র থেকেও বেশি টিকটিক করবে বলছ?”
কৃষ্ণা বললেন, “সেই। তোমার ভালো থাকা নিয়ে আমি তো টিকটিক করি। আমার শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে টিকটিক করার মানুষ না থাক তবু একটা যন্ত্র তো এল। খুব কাজের জিনিস হয়েছে রে রাতুল। থ্যাঙ্ক ইউ সোমা ফর দ্য গিফট!”
কয়েকদিনের মধ্যে নিত্যানন্দও বুঝলেন, যন্ত্রটা মন্দ নয়। তবে খবরদারিতে কৃষ্ণার উপর দিয়ে যায়। যন্ত্রের নির্দেশে তাঁদের জল খাওয়া বেড়েছে, শোয়ার রুটিন থাকায় ঘুম ভালো হচ্ছে, আর তাঁরা আবার নিয়ম করে হাল্কা ব্যায়াম শুরু করেছেন। যন্ত্রের আদেশমতো চলে কোমরের ব্যথায় ততটা হেরফের না হলেও অ্যাসিডিটির উৎপাত অনেকটা কমেছে।
তিন মাস কেটে গেছে।
রবিবার ভিডিও-কল করেছে রাতুল। আজকাল তাদের কথোপকথনের অনেকটাই জুড়ে থাকে ওয়েলনেস অ্যাসিসটেন্ট প্রসঙ্গ। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
সোমা হঠাৎ মৃদু গলায় বলল, “আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে তোমাদের কাছে। আই মিন হেল্প দরকার। করবে?”
কৃষ্ণা আর নিত্যানন্দ দুজনেই অবাক হলেন। নিত্যানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, “হেল্প! কী হেল্প? কী ব্যাপারে?”
কৃষ্ণা বললেন, “হেল্প নিশ্চয়ই করব। আমরা যদি তোমাদের উপকারে আসি সে তো আনন্দের কথা।”
কিন্তু কিন্তু গলায় সোমা বলল, “আমার একটা ফেসবুক পেজ আছে। অনেকদিন ইন্টারেস্টিং কিছু পোস্ট করিনি। ভিউ কমে গেছে। ভিউয়ার কমে যাচ্ছে। ভাবছি, তোমাদের এক্সারসাইজ রুটিনের একটা ভিডিও পোস্ট করব। আইডিয়াটা কেমন? ভালো না?”
রাতুল বলল, “গ্রেট।”
সোমা বলল, “মাম্মা, তুমি ভিডিও তোলার আগে চুল আঁচড়ে নিও। আমার দেওয়া ব্যাক ক্লিপটা লাগিও। আর হাল্কা লিপস্টিক। বাপি, তুমি ফতুয়া নয়, স্পোর্টস টি-শার্ট পরে এক্সারসাইজ করবে।”
নিত্যানন্দ বেজার মুখে বললেন, “ফেসবুকের জন্য হেল্প! ভিউয়ার কমেছে তো কী হয়েছে? আর আমাদের ব্যায়ামের ভিডিও তুলে কী হবে। বুড়ো-বুড়ির ব্যায়াম দেখবে কে?”
কৃষ্ণা বললেন, “ফেসবুকে ‘ভিউয়ার’ আর ‘লাইক’ এক নয়, তবু ওই একই টাইপের ব্যপার হলো, তাই না? তুমি নিজেও তো প্রোফাইল পিকচার আপলোড করে একশো বার চেক কর যে, ক-টা লাইক পড়ল। তাহলে? না রে সোমা। ঠিক আছে। দু-দিন সময় দে। আমি ভিডিও পাঠিয়ে দেব।”
তৈরি হলো ভিডিও। শুধু এক্সারসাইজের ভিডিও নয়। এক্সারসাইজের শেষে কৃষ্ণা এক লাইন নিজের মন্তব্যও রাখলেন। বললেন, “শরীরের খেয়াল রাখলে শরীরও আপনার খেয়াল রাখবে। ঠিক মানুষের মতো। আর একা নয়। একসঙ্গে এক্সারসাইজ করুন। তাতে আনন্দ বেশি।”
ভিডিও পোস্ট করতে কেল্লা ফতে।
প্রথম দিন পাঁচশো। দ্বিতীয় দিন পাঁচ হাজার। তৃতীয় দিন পঞ্চাশ হাজার ভিউ!
খুশিতে ফেটে পড়ল সোমা। ফোন করে বলল, “তোমরা তো ফেমাস হয়ে গেলে মাম্মা!”
নিত্যানন্দ বললেন, “কোথায় ফেমাস হলাম? ফেসবুকে?”
খুশি ঝরা গলায় কৃষ্ণা বললেন, “ছাড়ো তো। ফেমাস হয়েছি এই যথেষ্ট। তবে আমারও কেমন অদ্ভুত লাগছে রে সোমা। আমরা ফেমাস। এদিকে পাড়ায় আমাদের কেউ চেনেও না, জানেও না।”
রাতুল বলল, “দ্যাট ডাজনট ম্যাটার। তোমরা ফেমাস ইন্টারনেটে।”
কৃষ্ণা বললেন, “কিন্তু বিখ্যাত হওয়ার একটা কারণ তো থাকবে। সেটাও তো বুঝলাম না।”
বোঝা অবশ্য গেল কয়েকদিন পর। ইতিমধ্যে ভিডিও-র ভিউ পাঁচ লাখ ছুঁই ছুঁই। একটা ওয়েলনেস কোম্পানি থেকে ফোন এল। প্রোজেক্ট ম্যানেজারের। বললেন, “আমি ব্যাঙ্গালোর থেকে নায়ার বলছি। ফেসবুক থেকে আপনাদের স্পট করা হয়েছে। আমাদের কোম্পানির সিনিয়র ওয়েলনেস প্রোডাক্টের ব্রান্ড অ্যামব্যাসাডর করতে চাই আপনাদের। আপনারা যদি রাজি থাকেন তাহলে আপনাদের নিয়ে একটা স্টোরি করতে হবে।”
নিত্যানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাদের নিয়ে স্টোরি! সেটা কীরকম?”
নায়ার বললেন, “আপনাদের দৈনন্দিন রুটিনের গল্প। আটচল্লিশ ঘণ্টা ক্যামেরা অন রাখব। আপনাদের প্রতিদিনের জীবনের ছবি তুলে যাবে ক্যামেরা। সেখান থেকে কাট অ্যান্ড পেস্ট করে আমরা স্টোরি তৈরি করে নেব। ঠিক আছে তো?”
ক্যামেরা লাগানোর বাহাত্তর ঘণ্টা পরে আবার নায়ারের ফোন এলো। বললেন, “সব ঠিকই আছে। তবু আপনাদের মর্নিং রুটিন একটু বদলে দিন। সকালে বোন চায়নার কাপে মকাইবাড়ির সেকেন্ড ফ্লাশ টি। ব্রেকফাস্টের পর কোনও ব্র্যান্ড ড্রিঙ্ক। আর ম্যাচিং ড্রেস পরুন। অন ক্যামেরা ভালো দেখাবে।”
নিত্যানন্দ বললেন, “বাড়িতে ম্যাচিং ড্রেস? আমরা তো বিয়েবাড়িতেও ম্যাচিং ড্রেস পরে যাই না। কখনসখনও ম্যাচিং হয়ে যায় বটে। তবে সেটা পুরোপুরিই কাকতালীয়। পরিকল্পনা করে নয়।”
এদিকে ব্র্যান্ড অ্যামব্যাসাডর চুক্তির অ্যাডভান্স পেমেন্ট নেওয়া হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামলাতে কৃষ্ণা এগিয়ে এলেন। বললেন, “ওর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। মানুষটা আসলে ঠিক কমার্শিয়াল মেটিরিয়াল নয়। তবে আপনি যা চাইছেন, তাই হবে। ডিটেইলিংয়ের ব্যপারটা আমি খেয়াল রাখব।”
নায়ার হাসলেন। বললেন, “সেটা আমি বেশ বুঝতে পারছি। আর শুধু ম্যাচিং ড্রেস নয় ম্যাডাম। কমার্শিয়াল কারণেই স্টোরিটা একটু পার্সোনাল, ইন্টিমেট, ইমোশনালও করতে চাই। আপনাদের প্রথম দেখা কোথায়?”
নিত্যানন্দ বললেন, “কলেজে।”
নায়ার বললেন, “সামথিং মোর...”
নিত্যানন্দ বললেন, “ও আমার থেকে ইকনমিক্সের বই নিয়েছিল। ফেরত দেয়নি।”
তিয়াত্তর বছরের কৃষ্ণা কুলকুল করে হেসে বললেন, “বই ফেরত নেওয়ার অজুহাতে আবার দেখা করতে চেয়েছিল।”
ওদিকে নায়ারের উচ্ছ্বসিত গলা শোনা যায়, “ওয়াও! এই তো হচ্ছে। ওয়ান্ডারফুল ফার্স্ট লাভ।”
নিত্যানন্দ বললেন, “আমার ফার্স্ট লাভ। কৃষ্ণার কথা জানি না। বলে তো, আমিই প্রথম পুরুষ ওর জীবনে। তবে কি না, নারীচরিত্র বেজায় জটিল।”
কৃষ্ণা হাসিমুখে বললেন, “খালি বাজে কথা।”
তারপর নায়ারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “ফার্স্ট লাভ হলেও চশমা হারানো নিয়ে, বাজার থেকে কুচো চিংড়ি আনা নিয়ে, কখনও-সখনও কারণ ছাড়াই আমাদের ঝগড়া বাধে। ছেলের বিয়ে নিয়ে এমন ঝগড়া হয়েছিল যে, পনেরো দিন কথা বন্ধ।”
বিজ্ঞাপন তৈরি হলো।
চমৎকার লাইটিং, মিউজিক, ম্যাচিং ড্রেস।
দুজনেরই হাসি হাসি মুখ। হাত ধরে হাঁটছেন। কথা বলছেন। বেশিটাই সিনিয়র ওয়েলনেস প্রোডাক্ট নিয়ে। শেষে কোম্পানির তরফ থেকে ক্যাপশন, “এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার।”
ভিডিও দেখে প্রথমে নিত্যানন্দ আর কৃষ্ণা দুজনেই খুশিতে গদগদ।
কৃষ্ণা বললেন, “কী সুন্দর করেছে গো। চেনাই যাচ্ছে না। কী ভালো দেখাচ্ছে আমাদের। একেবারে রোমান্টিক জুটি যেন। সেই কলেজবেলার মতো।”
নিত্যানন্দ বললেন, “তোমার আমার রোমান্স কি এখনও কম কৃষ্ণা? যৌবনে ছিল রঙের উন্মাদনা। আর এখন জীবনে হাল্কা হাল্কা হিম হিম ভাব, অল্প অল্প কুয়াশা। অনেকটা বসন্ত আর হেমন্ত ঋতুর মতো। দুটো ঋতুর ডায়নামিক্স আলাদা। কিন্তু কেউ ফ্যালনা নয়।”
রাতুল বলল, “উপস, কী লাগছে তোমাদের! চেনাই যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, মেড ফর ইচ আদার।”
সোমা বলল, “মাম্মা, আই এনভি ইউ। বোথ অফ ইউ আর লুকিং সোওও গুড। ট্রুলি হ্যাপি কাপল।”
সাত দিন গড়িয়ে যেতেই নিত্যানন্দ আর কৃষ্ণা দুজনেরই গদগদ খুশিটা কমে এল।
নিত্যানন্দ বললেন, “ভিডিওটা একটু বাড়াবাড়ি লাগছে না? মনে হচ্ছে যেন আটচল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে আমরা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে শুধু মৃদু মৃদু হেসেই চলেছি। কোথাও কোনও সমস্যা নেই। কোথাও কোনও সমস্যা ছিল না। আর কী কায়দার ক্যাপশন! এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার! আমার বয়স পঁচাত্তর। নিজেকে পঁয়তাল্লিশ বছরের খোকা মনে করলে কি আমার কোমরের ব্যথা কমে যাবে?”
কৃষ্ণা বললেন, “আমিও তাই ভাবছি, জানো? ভিডিওটা যেন ভুয়ো, মিথ্যে। মনগড়া গল্প। আমাদের জীবনে আনন্দ ছিল। আবার স্ট্রাগলও তো ছিল। তোমার চাকরি চলে গেল। বাবার ক্যান্সার। রাতুলকে অ্যামেরিকায় পাঠানোর সময় আমার গয়না বিক্রি। আরও কত সাংসারিক ঠোকাঠুকি। এদিকে ভিডিওতে শুধুই সুখী সুখী ভাব।”
নিত্যানন্দ বললেন, “সুখের বাজার আছে কৃষ্ণা। কান্না দেখার মানুষ কম।”
মাস খানেক পর হঠাৎ একদিন নিত্যানন্দ বললেন, “চলো কৃষ্ণা, আমরা নিজেরা একটা ভিডিও তৈরি করি। নো প্রোডিউসার। নো স্ক্রিপ্ট রাইটার, নো মেক আপ। হান্ড্রেড পার্সেন্ট অরিজিন্যাল।”
ক্যামেরা অন হলো।
নিত্যানন্দ চায়ের কাপ হাতে বসেছিলেন।
কৃষ্ণা রান্নাঘর থেকে বিস্কুটের কৌটো নিয়ে এসে বসলেন।
প্রাথমিক আলাপের পর নিত্যানন্দ বললেন, “আমাদের বয়স হয়েছে। এত বছর চেষ্টা করেও আমরা পার্ফেক্ট হতে পারিনি। কিংবা চেষ্টায় হয়তো ত্রুটি ছিল, ফাঁকি ছিল। মোটের উপর আমরা ইমপার্ফেক্ট। আমাদের লিমিটেশন আছে। আমাদের দুজনেরই খুব স্ট্রং ওপিনিওন। মাঝে মাঝে এমনও মনে হয়, আলাদা বাড়িতে থাকলে মন্দ হতো না।”
কৃষ্ণা বললেন, “কিন্তু থাকো না। কেন?”
নিত্যানন্দ হাসলেন। বললেন, “একটা কারণ, দুটো বাড়ি কেনার পয়সা নেই। আর দ্বিতীয় এবং প্রধান কারণ, কে রান্না করবে শুনি? মাইনে করা লোকের হাতের রান্না মানেই বেশি তেল-মশলা। আমি ছোট থেকেই পেট রোগা। বাইরের খাবারও খেতে পারি না।”
কুলকুল করে হাসলেন কৃষ্ণা। বললেন, “শুনলেন তো? আমি কিন্তু জানতাম না। বিয়ের আটচল্লিশ বছর পর জানতে পারলাম বিয়ে করার আসল কারণ। যাত্রা শুরু হয়েছিল দুজনের ইকনমিক্সের বই হাতে। এখন দিনের বেশিটা সময় ওর কাটে স্টাডিতে। আর আমার কিচেনে।”
নিত্যানন্দ হাসলেন। শেষে বললেন, “বয়স বাড়লে শুধু শরীরের যত্নই যথেষ্ট নয়। একজন সঙ্গীর সঙ্গও খুব প্রয়োজন।”
সোমা পোস্ট করলো ভিডিও। ভিডিও আবার ভাইর্যাল। প্রচুর ভিউ। অজস্র কমেন্টস।
একজন লিখল, “দিস ইজ রিয়েল লভ।”
একজন লিখল, “মাই পেরেন্টস আর এগজ্যাক্টলি সেম।”
একজন লিখল, “আপনাদের দেখে অনুপ্রেরণা পেলাম। আজ আমার স্ত্রী-কে নিয়ে ডিনারে যাব।”
কমেন্টস পড়তে পড়তে নিত্যানন্দ বললেন, “কৃষ্ণা, আমার তৈরি ভিডিও, আমাদের গল্প কি সত্যিই মানুষকে প্রভাবিত করছে?”
কৃষ্ণা বললেন, “করছে তো। পুতুলের মতো সাজানো নয়। মানুষের মতো বেঁচে থাকার নামই জীবন। আর সেই বেঁচে থাকার অহংকার আলাদা।”
কয়েকদিন পর আবার নায়ারের ফোন এল। বললেন, “সামনের মাস থেকে সিনিয়র ওয়েলনেস অ্যাওয়ারনেস নিয়ে একটা প্রোগ্রাম শুরু করছি। ফিউ কাপলস আর অলরেডি সিলেক্টেড। আপনারাও আসুন।”
নিত্যানন্দ আর কৃষ্ণা এখন মাঝে মাঝে সভা সমিতিতে যান। সিনিয়র মোবিলিটি, নিয়মিত ব্যায়াম অভ্যাসের প্রয়োজন, সাহচর্যের ম্যাজিক, হেলদি এজিং – এইসব বিষয়ে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।
সেদিন এক সভায় নিত্যানন্দর প্রতি প্রশ্ন এল, “আপনাদের বিয়ের সাফল্যের রহস্য কী?”
নিত্যানন্দর হয়ে কৃষ্ণা উত্তর দিলেন। বললেন, “আটচল্লিশ বছর আমরা এক সঙ্গে এক ছাদের নীচে আছি। ভালোটুকু এক সঙ্গে উপভোগ করেছি। মন্দ যা দুজনেই মানিয়ে নিয়েছি। এটা শুধু বিবাহিত জীবনের সাফল্যের রহস্য নয়, যে কোনও টিম ওয়ার্কের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।”
সভা থেকে ফিরে ফতুয়া গায়ে চা খেতে খেতে নিত্যানন্দ বললেন, “কৃষ্ণা, তোমার উত্তরটা আজ জব্বর হয়েছে। দারুণ বলেছ। দিনে দিনে স্মার্ট হয়ে উঠছো, বুঝলে?“
কৃষ্ণা বললেন, “আমি চিরকালই স্মার্ট। তোমার চোখে পড়ল দেরিতে।”
নিত্যানন্দ বললেন, “আর আমি?”
চায়ের কাপ সিঙ্কে রেখে ফিরে এসেছেন কৃষ্ণা। বললেন, “আহ, আর কথা বলো না তো। ওঠো। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। হাঁটতে বেরোব। আর দেরি করলে ফিরতে রাত হয়ে যাবে।”
ফতুয়া ছেড়ে টি-শার্ট পরছিলেন নিত্যানন্দ। ওয়েলনেস অ্যাসিসট্যান্ট মনে করিয়ে দিল, টাইম ফর ইয়োর ইভনিং ওয়াক!
চুলে ক্লিপ লাগাচ্ছিলেন কৃষ্ণা। তাঁর হাত থেমে গেল। নিত্যানন্দর দিকে ফিরে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন, “কার কথা শুনে হাঁটতে যাচ্ছ? AI না আমার?”
সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। আকাশে আধফালি চাঁদ।
তাঁরা দুজন পাশাপাশি হাঁটছিলেন। কোনও বিজ্ঞাপনের জন্য নয়। এমনিই।
আটচল্লিশ বছরের পুরনো এক দম্পতি। একজন একটু ধীরে হাঁটছেন। অন্যজন হাঁটছেন তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
ওয়েলনেস অ্যাসিসট্যান্ট তাঁদের মোবিলিটি স্কোর জানে। ফেসবুক জানে ফলোয়ার সংখ্যা। নায়ার তাঁদের স্টোরি জানে। কিন্তু সম্পর্কের ভিতের ফর্মুলা? সেটা অঙ্ক কষে বের করার মতো কোনও যন্ত্র নেই।
নিত্যানন্দ বিড়বিড় করলেন, “ভাগ্যিস, পৃথিবী এখনও ততটা যান্ত্রিক হয়ে যায়নি!”
নিত্যানন্দর দিকে মুখ উঁচু করে তাকালেন কৃষ্ণা। বললেন, “কী বললে? কিছু বলছ?”
কৃষ্ণার বাঁ-হাতটা নিজের ডান-হাতের মুঠোয় ধরলেন নিত্যানন্দ। চলতে চলতে বললেন, “কিছু না। এমনিই।”