




হামজানামা ফোলিওর একটি পৃষ্ঠা
সাধারণ অব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরবদেশে আমীর হামজা নামক এক অভিজাত পুরুষ বাস করতেন। অতীব সুপুরুষ, শালপ্রাংশু দেহ, বাহুতে যাঁর ছিল ব্যাঘ্রসম বল, হাতে যিনি তরবারি ধরলে হঠে যেত পুরো একটি সেনাবাহিনী! তিনি ভ্রমণ করেছিলেন ইরান থেকে চীনদেশ—বধ করেছিলেন মুখে আগুন-উগরানো ড্রাগনের দল!
সম্পর্কে ইনি হতেন মহানবী হজরত মহম্মদের চাচা। এঁকে নিয়ে কিংবদন্তী চালু হয়ে আছে আজ বারোশো বছর ধরে।
কাস্পিয়ন হ্রদের তীর থেকে এহেন পরাক্রমশালী হামজাকে ছলে-বলে-কৌশলে অপহরণ করল দুষ্ট শাহরাসব, এবং নিয়ে গিয়ে ফেলল শত্রু-রাজা মালিক আর্গসের রাজ্য টাকাও-তে।
তারপর বহু প্রয়াসে, বহু নদী-পর্বত-হ্রদ-কেল্লা পেরিয়ে, বহু ঝড়-তুফান সামলে হামজার বন্ধু ওমর পরাজিত করল শত্রু জামরুদ শাহ্-কে ও উদ্ধার করে আনলে নায়ক আমীর হামজাকে।
এই নিয়েই হলো দাস্তান-এ’-আমীর হামজা (‘আমীর হামজার রোমাঞ্চকর কাহিনী’)! ফার্সীভাষার এক বিশাল মহাকাব্য!
***
না, নিছক এক কাহিনী শোনাতে বসিনি আজ—সাধারণ শ্রোতা তো এমন কিস্সা কতই শুনে থাকেন। কিন্তু যে-সে নয়, এই শ্রোতা যদি হন স্বয়ং আকবর বাদশাহ্?
ছেলেবেলা থেকেই কিস্সা, মানে গপ্প শুনতে বড়ই ভালোবাসতেন আকবর, এবং যেখানেই যেতেন সভাকথাকার দরবার খান-কে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এমন অনেক মিনিয়েচার পেইন্টিং আজও দেখতে পাওয়া যায়।
১৩ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করে বাদশাহ্ আকবর প্রথম যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছিলেন তার মধ্যে একটি হলোঃ এই ‘হামজানামা’ মহাকাব্যকে লেখায়-ও-রেখায় বাঁধতে হবে।
ইরানের সফবীয় সম্রাট শাহ্ তামাসের দুই সভাশিল্পী মীর সৈয়দ আলী ও খ্বাজা আবদুস সামাদকে আমন্ত্রণ করে আগ্রায় আনানো হলো, এবং তাঁদের নেতৃত্বে একশো জন শিল্পী ১৫ বছর ধরে ১৪০০টি ছবি/পোস্টার এঁকেছিলেন, যেগুলির প্রত্যেকটির সাইজ ৬৯ সে.মি. X ৫৪ সে.মি., এবং প্রত্যেকটি ছবি-পোস্টারের পিছনে ১৯টি করে লাইনে ফার্সীভাষায় হামজার কাহিনীটি বিবৃত হয়ে হয়ে চলেছে।
সামনে-পিছনে লেখা-রেখা রাখবার কারণ হচ্ছে দাস্তানকার (গল্প-বলিয়ে) এক দিকে বসে হাতে ছবিটি ধরে ঐ ১৯টি লাইনের ভাষ্যটি পাঠ করে চলবেন, এবং উল্টোদিকে দূরে বসে সভার ভদ্রজনেরা সেই গল্প শুনতে শুনতে নিবিড় আনন্দে তাকিয়ে দেখতে থাকবেন বহুবর্ণের অপূর্ব ছবিগুলিকে।
কেমন চমৎকার ব্যবস্থা, না?
যেন আজকের ‘গ্রাফিক নভেল’! (?? ও পটুয়ার পটচিত্র-সহযোগে কাহিনীর বিবরণ—যোগ করা যায়?)
একটি ‘বই’ হিসেবে, অবশ্য, সেকালে ‘হামজানামা’-কে বাঁধাই করা হয়নি। প্লেটগুলি অনেক অনেক বাক্সের মধ্যে সিরিয়ালি সাজিয়ে রাখা হতো। এর বহু বৎসর পরে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে এসে, হামজার উর্দু ভাষান্তর যেটা প্রকাশিত হয় সেটাই ছিল এর দীর্ঘতম সংস্করণ—এতে তখন ছিল ৪৫,০০০ পৃষ্ঠা। অনন্তর, কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ থেকে ১৮১০ নাগাদ এর একটি হ্রস্বতর সংস্করণ ছিল হামজার প্রথম ছাপা সংস্করণ। বস্তুত, যুগে যুগে ‘হামজানামা’-তে সংযুক্তি-বিযুক্তি হতেই থেকেছে।
***
মুঘল যুগের গ্রন্থ অবশ্যই হতো সুচিত্রিত। ক্যালিগ্রাফি করে সুন্দর হরফে লেখা বইগুলির প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই রঙিন মার্জিন থাকত, তাতে ফুল-গুল্মলতা-পশুপক্ষীর ছোট ছোট ছবি আঁকা হতো। ক্লাসিক্যাল ইসলামে মানুষ/পশুপক্ষীর ছবি আঁকায় যে বাধা আছে তা মুঘল মিনিয়েচরে মানাই হতো না। কেতাবকে সুন্দর করে উপস্থাপন করার উপরে জোর দেওয়া হতো।
‘হামজানামা’ হলো মুঘল পুস্তক-প্রকল্পের মধ্যে বৃহত্তম ও শ্রেষ্ঠ, তাই এর কথা প্রথমেই বলা গেল।
এবার গোটা মুঘল লাইব্রেরির কথায় আসা যাক্।
ভালো কথা, কিন্তু আজ কোথায় চলে গেল এই ‘হামজানামা’ চিত্র-পুস্তক?
কোথায় আছে এখন এ’ বই/চিত্রাবলী?
শেষে বলব।

মুঘল মিনিয়েচার
‘মুঘল আমল’ বলতেই চোখের সামনে প্রথমেই ভেসে ওঠে তাজমহলের ছবি থেকে গোলাপ-হাতে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা সম্রাজ্ঞী নূরজাহান থেকে স্কুলপাঠ্যে পড়া আকবরের ঔদার্য আর আওরঙজেবের ধর্মান্ধতার গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং নানান যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মোঘলাই শান-ও-সৌকত, খানাপিনা!
কিন্তু পুস্তক ও গ্রন্থাগারের সঙ্গে যে তৈমুরীয় বংশের নাড়ির যোগ সেই কবে থেকে—তার হিসাব কে রাখে?
মধ্যযুগীয় কোনো একটি মুসলিম রাজবংশের উপরে এত এত লিখিত ডায়েরি, চিঠিপত্র, বৈদেশিক-ভাষ্য ইত্যাদি যতটা মুঘলদের উপরে রয়েছে তার জুড়ি মেলা ভার। এখানে বাবর ও জাহাঙ্গীর দুই সম্রাট প্রত্যহ রোজনামচা লিখে রাখতেন। বিদূষী রাজকুমারী গুলবদন বেগম লিখে গিয়েছেন ভাই হুমায়ুন ও তাঁর সময় নিয়ে অনবদ্য ‘হুমায়ুননামা’।
পানিপথের যুদ্ধ জিতে (১৫২৬ খৃ.) বাবর যখন ইব্রাহিম লোদীর ‘পুরানা কিল্লা’ প্রাসাদে ঢুকলেন, দখল নিয়েছিলেন তাঁর পুস্তকভাণ্ডারেরও। তা থেকে অনেক বই তাঁর দুই ছেলে হুমায়ূন (??হুমায়ুন না হুমায়ূন?) ও কামরানকে ভাগ করে দিয়েছিলেন। হুমায়ূন এতই পুস্তকপ্রেমী ছিলেন যে ভারত থেকে বিতাড়িত হয়ে ইরান ভ্রমণকালেও উটের পিঠে চাপিয়ে পুস্তক-পেটিকা সঙ্গে নিতে ভুলতেন না। ভারত-পুনরুদ্ধারের এক বছরের মধ্যে, অবশ্য, তাঁর অকস্মাৎ এন্তেকাল ঘটল লাইব্রেরির সিঁড়ি থেকে পা হড়কে পড়ে।
বিদ্যোৎসাহী সম্রাট আকবর নিজে নিরক্ষর ছিলেন বলে সাধারণত মনে করা হয়, যদিও এলেন স্মার্টের মতো এ’কালের গবেষিকা দেখিয়েছেন যে আকবরের সম্ভবত ‘পঠনবিকার’ (dyslexia)-এর মতো স্নায়বিক কোনো ব্যয়রাম ছিল যে কারণে উনি অক্ষর পড়তে বা বানান করতে পারতেন না, অথবা অক্ষর দেখতেন উল্টো উল্টো। আকবরের স্মৃতিশক্তি কিন্তু ছিল অসাধারণ, এবং তিনি মুখে মুখে ফার্সী পদ রচনা করতেন (“গোলাপের পাপড়িতে ও’ তো নয় শিশিরকণা/ ও’ এক বুলবুলের অশ্রুবিন্দু !”)। প্রতিদিন ওঁকে নানান বই থেকে অবশ্যই পড়ে পড়ে শোনাতে হতো, যে অভ্যাসটি ছিল তাঁর পূর্বপুরুষ তৈমুরলঙ্গেরও। মহাকবি হাফিজ ও রুমির কাব্য ছিল আকবরের অতি প্রিয়, যেগুলি নিয়মিত আবৃত্তি করে শোনানো হতো। সম্রাট বিশেষ উপভোগ করতেন।
মুঘল দরবারের পাঠকক্ষ এবং তর্জমা-অলংকরণ প্রভৃতি সারস্বত কর্মকাণ্ড আকবরের সময়েই প্রতিষ্ঠিত ও পুষ্ট হয়, হতে থাকে। যেমন, ঐ ‘হামজানামা’ পুস্তক/চিত্র-প্রকল্প যার সম্বন্ধে প্রথমেই বলা হয়েছে।
আকবরের সময়েই মুঘল পাঠাগারে ২৪,০০০ পুস্তক ছিল বলে জানা যায়। ফার্সী পণ্ডিতদের পাশাপাশি বহু ব্রাহ্মণ ও জৈন পণ্ডিত যুক্ত ছিলেন আকবরের অনুবাদ-প্রকল্পে। সংস্কৃতভাষার বিশেষ সম্মান ছিল মুঘল রাজদরবারে।
দেশ-বিদেশের বহু পুস্তক আকবর আনান ও সেগুলির অনুবাদ করান, যেমন-- ‘মহাভারত’!
আরব্যভাষায় ‘রজম’ মানে যুদ্ধ, আর ‘নামা’—কাহিনী। আকবরের আদেশে তাঁর সভাকবি আবুল ফয়েজ ইবনে মুবারক ‘ফৈজী’ ও আব্দুল কাদির বদায়ূনী ফার্সীভাষায় মহাভারতের অনুবাদ করলেন পদ্যে ও গদ্যে—নাম দিলেন ‘রজমনামা’; প্রথম মুসাবিদাটি অবশ্য করে দিয়েছিলেন ইরানদেশ থেকে আগত পণ্ডিত নকীব খান। সুলতান হাজী থানেশ্বরী ও মৌলানা শিরির মতো পণ্ডিতগণ যুক্ত ছিলেন এই অনুবাদ-প্রকল্পে।
দুই বছর লেগেছিল মহাভারতের অনুবাদে, যাতে প্রায় পৌনে দু’শো ছবি ছিল।
‘রামায়ণ’-এর ফার্সী অনুবাদ ফতেহপুর সিক্রির ঐ তর্জমাশালাতেই করা হয়েছিল, মহাভারতের বছর দশেক পরে। রামায়ণের, অবশ্য, একটু সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করানো হয়েছিল, বদায়ূনীর নেতৃত্বে। এটা বাদশাহ্ করিয়েছিলেন, বিশেষ করে, ওঁর মাতা হামিদা বানুর জন্যে।
এ’ছাড়াও যে যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাদি আকবরের তর্জমাশালায় অনূদিত হয় ও রাজ-গ্রন্থাগারে ছিল বলে জানা যায় সেগুলি হলোঃ
১. মাতৃভাষা চুঘতাই-তুর্কীতে বাবর বাদশাহ্ আত্মজীবনী লিখেছিলেন বাবরনামা। নাতি আকবরের অভিভাবক বৈরাম খানের পুত্র কবি আবদুর রহিম এর ফার্সী অনুবাদ করেন (যিনি আবার সংস্কৃতভাষাতেও ছিলেন সুপণ্ডিত)। বাদশাহ্ আকবর চাইতেন সকল শাহজাদাগণ পূর্বপুরুষের এই আত্মজীবনীটি মন দিয়ে পড়ুক।
২. ব্যাসদেব-কৃত হরি-বিষ্ণুর মর্ত্যলীলা হরিবংশ-র ফার্সী অনুবাদ করেছিলেন তর্জমখানার পেইড স্টাফ মৌলানা শিরি।
৩. হাজী ইব্রাহিম সিরহিন্দি করেছিলেন ‘অথর্ব-বেদ’-এর ফার্সী অনুবাদ। ইনি অবশ্যই সেই শেখ আহমদ সিরহিন্দি নন, যিনি ছিলেন অতীব গোঁড়া এক মুসলমান ও আকবরের মেলবন্ধনকারী ধর্ম ‘দীন ইলাহী’-র বিরুদ্ধাচারী। মুঘল শাসনব্যবস্থায় হিন্দুদের না নিতে ইনি বাদশাহ্ আকবরকে একাধিক চিঠি লিখেছিলেন।
৪. ‘রাজতরঙ্গিনী’! দ্বাদশ শতকে সংস্কৃতভাষায় কাশ্মীরের ইতিহাস লিখে গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত কলহন, যেটিকে কোনো ভারতবাসীর লেখা প্রথম ইতিহাসগ্রন্থ বলে মানা হয়। পঞ্চদশ শতকে এর ফার্সী-অনুবাদ করেছিলেন কাশ্মীরি সুলতান জয়নুল আবেদিন স্বয়ং। তাই, যদিও এটি আকবরের তর্জমাশালার কাজ নয়, বাদশাহের গ্রন্থাগারে বইটির এক কপি মহা সমাদরে ঠাঁই পেয়েছিল।
৫. শাহজাদা দারাশিকোহ্ স্বয়ং উপনিষদের অনুবাদ করেছিলেন সংস্কৃত থেকে ফার্সীভাষায় (‘সির্-ই-আকবর’—অর্থাৎ, ‘শ্রেষ্ঠ রহস্য’)। তাঁর প্রখ্যাত ‘মাজমা-উল-বাহরেইন’ গ্রন্থেও তিনি সুফী মতবাদের সঙ্গে বেদান্তের সম্বন্ধের অন্বেষণ করেছিলেন। এগুলি শাহী কিতাবঘরের অলংকার ছিল।
৬. শাহজাদা দারাশিকোকে এক রাত্রে স্বপ্নে দর্শন দেন মহর্ষি বশিষ্ঠ ও স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র। তাঁদের কথোপকথন নিয়ে প্রখ্যাত ‘যোগ-বশিষ্ঠ’ গ্রন্থের ফার্সী অনুবাদ করান তিনি নিজামুদ্দীন পানিপথীকে দিয়ে। এই গ্রন্থ পরে পারসিক বিদ্বজ্জনের মধ্যেও বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল।
শাহী পাঠাগারের যে অংশ দারাশিকোহ্ গড়েছিলেন বা বাড়িয়েছিলেন তার কিছু গ্রন্থ আজও দিল্লি-সরকার সংরক্ষণ করছে কাশ্মীরি গেটের কাছে এক পাবলিক লাইব্রেরিতে। পাটনার খুদাবক্স লাইব্রেরিতে এমন বেশ কিছু অরিজিন্যাল গ্রন্থ সংরক্ষিত আছে—তৈমুরনামা, পাদশাহ্ নামা ইত্যাদি। গুলবদন বেগমের লেখা ‘হুমায়ূননামা’ মূল গ্রন্থটি (খণ্ডিত) লণ্ডনের বৃটিশ লাইব্রেরিতে রয়েছে।
৭. কবি ফৈজী প্রসঙ্গে বলতে ভুলে গেলাম যে দ্বাদশ শতাব্দীর মারাঠী জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভাস্করাচার্যের প্রখ্যাত গণিতগ্রন্থ ‘লীলাবতী’-র ফার্সী অনুবাদও উনিই করেন। মুঘল তর্জমাশালায় বিজ্ঞানের গ্রন্থ বেশি ছিল না সংখ্যায়, এটি তার মধ্যে অন্যতম প্রধান।
৮. দ্বিতীয় খৃষ্টীয়পূর্বাব্দের কাশ্মীরি পণ্ডিত বিষ্ণুশর্মাকৃত ‘পঞ্চতন্ত্র’ গ্রন্থটি ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আরবী ও ফার্সী অনুবাদের মাধ্যমেঃ ‘কালিয়া ওয়াহ্ ডিমনাহ্’। এই গ্রন্থ বাদশাহ্ আকবরের এতই প্রিয় ছিল—এতে পশুপাখির রূপকে নীতিকথা থেকে রাজনীতির শিক্ষা হয়—যে উনি মুঘল শাহজাদাদের বিশেষ পাঠ্য হিসেবে বইটির একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ সচিত্র সংস্করণ করান।

মুঘল মিনিয়েচার
বাদশাহ্ আকবরের আমল থেকেই অতি যত্ন সহকারে মুঘল পাঠাগার, তর্জমাশালা তথা চিত্রশালাকে গড়ে তোলা হতে থাকে, যাদের মধ্যে সীমারেখাটি ছিল ক্ষীণ। মুঘল লাইব্রেরিয়ানের (‘কিতাবদার’) পদটি ছিল অতি গৌরবের ও মান্য। সভাকবি ফৈজী দীর্ঘদিন অলংকৃত করে ছিলেন এই পদ।
অনুবাদ, ক্যালিগ্রাফি, মিনিয়েচার পেইন্টিং ও বই-বাঁধাই—এইগুলি ছিল উপবিভাগ।
অনুবাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল এই যে প্রকৃত দ্বিভাষিক পণ্ডিত খুঁজেই পাওয়া যেত না। ব্রাহ্মণ ও জৈন পণ্ডিতগণ তাই তাঁদের টেক্সটের অনুবাদ মুখে মুখে পড়ে শোনাতেন কথ্যভাষায়—যেমন খাড়ীবোলিতে। ফার্সী লেখক-অনুবাদকগণ সেগুলি ফার্সীতে তখনই লিখে ফেলতেন। অতঃপর ফৈজী, বদায়ূনীর মতো মান্য দানিশমন্দ্ (পণ্ডিত) ব্যক্তিগণ লেখাটির ফাইনাল রূপ দিতেন।
কেতাব লেখার কাগজ বানানো হতো বহু তরিবৎ করে। শণ, তিসি, পাট প্রভৃতি দিয়ে মণ্ড পাকিয়ে ভাতের ফেনের মতো স্টার্চ দিয়ে হাতে পিটিয়ে পিটিয়ে বানানো হতো মসৃণ কাগজ। পৃষ্ঠার মার্জিন রাখা, নাশতালিক হরফে লেখা প্রভৃতিরও নির্দিষ্ট রীতি ছিল। বসওয়ান ও তৎপুত্র মনোহর, দশ্বনাথ, মুকুন্দ, কেসুদাস প্রমুখ ছিলেন মুঘল কোর্টের নামী নামী চিত্রশিল্পী। পরে জাহাঙ্গীরের আমলে গোবর্ধন হয়ে ওঠেন সব চাইতে নামী মুঘল-চিত্রকর। সিন্দুর, নীল, হলদি, লাপিস-লাজুলি ইত্যদি দিয়ে রঙিন করা হতো বইয়ের পৃষ্ঠাগুলিকে।
লাইব্রেরির বই-বাঁধাই করা হতো অতি যত্নে ও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। পাতায় পাতায় মার্জিনও নানান ফুল-পাতা-পশুপক্ষীর ছবি দিয়ে চিত্রিত করা হতো। বাঁধাইয়ের জন্য স্থান ছেড়ে রাখা হতো। চামড়া ও গালা দিয়ে বাঁধাই করা হতো বইগুলি।
***
অনুবাদকার্য ছাড়াও আর যে-সব বিখ্যাত বই আকবরের লাইব্রেরিতে স্থান পেয়েছিল তার এক দীর্ঘ লিস্ট করে গেছেন আবুল ফজল।
১. খ্বাজা নাসিরুদ্দিন তুসী ছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর এক পারসিক বহুমুখী প্রতিভাধর পণ্ডিত। নীতিশাস্ত্রের উপরে লিখিত তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘আখলাক-ই-নাসিরি’-র এক সু-অলংকৃত সংস্করণ স্থান পেয়েছিল এখানে।
২. ষোড়শ শতাব্দীর ইতালীতে বসে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ লেখার পাঁচশ’ বছর আগের পারস্যদেশে আমীর কেইকাবস লিখেছিলেন ‘কাবস-নামা’ গ্রন্থ—দু’টিই প্রশ্নোত্তরের ছলে রাজার দায়িত্ব-কর্তব্য আলোচনা করে। অষ্টাদশ শতকের জার্মান মহাজ্ঞানী যোহান উলফগ্যাং গ্যোটে বইটির ভূয়সী প্রশংসা করে গিয়েছেন, যেটি ছিল আমাদের আকবর বাদশাহেরও এক প্রিয় গ্রন্থ, স্থান পেয়েছিল তাঁর লাইব্রেরিতে।
৩. বস্তুত, ইতিহাস-গ্রন্থের প্রতি আকবরের ছিল বিশেষ আগ্রহ। ত্রয়োদশ শতকের ইরানী ঐতিহাসিক রসিদুদ্দিন হামদানির বিপুল কলেবর ‘জামিয়াল তারিখ’ গ্রন্থে চেঙ্গিস খানের সময় থেকে মোঙ্গল ইতিহাস বিধৃত হয়েছে। সেখানে আছে চেঙ্গিসের একাদশতম ‘পূর্বপুরুষ’ সুন্দরী রাণী এলানকোয়ার কথা, যিনি আকবর বাদশাহের এক প্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠেন, এবং সম্রাটের আদেশে তাঁর মুকুটে শতেক পালক গুঁজে অপরূপা করে আঁকানো হয়।
৪. ‘হিন্দোস্তানের তোতা’ কবি আমীর খসরুর (১২৫৩-১৩২৫ খৃ.) কিছু কাজও আকবরের স্টুডিওতে ইলাস্ট্রেট করানো হয়েছিল—যেমন গুজরাটের দেবল রাণী ও খিজির খানের উপাখ্যান।
আকবরের লাইব্রেরিতে অবশ্যই ছিল ফার্সি মহাকবি ফিরদৌসির ‘শাহ্নামা’-র এক চিত্রিত সংস্করণ, এবং কবি নুরুদ্দীন জামি-র ‘ইউসুফ-জুলেখা’-র উপাখ্যান, কিন্তু এত বড় মুঘল লাইব্রেরিতে ‘সহস্র এক আরব্য রজনী’-র কাহিনীর কোনো সংস্করণ ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়নি এটাই আশ্চর্য। অষ্টম শতাব্দী থেকে এই আরব্য কাহিনীমালার শুরুয়াৎ ও জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। পৃথিবীর বহু ভাষাতে অনূদিত হয়েছে এই কাহিনী, আজও হয়ে চলেছে।
এইভাবে মুঘল আমলে ভারতে ফার্সীভাষা ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের এক বিশাল জোয়ার এসেছিল বলে কোন কোন ঐতিহাসিক ভারতকে ইরানের এক সাংস্কৃতিক-তাঁবেদার (a cultural vassal of Persia) বলে বর্ণনা করেছেন। সেই সুলতানী আমলের গোড়ার দিক থেকেই ক্রমে ক্রমে দিল্লী-রাজদরবারের ভাষা হিসেবে ফার্সীর চল শুরু হলেও আকবরের সময় থেকেই এই ভাষা মুঘল দরবার ও রাজকার্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
উপরের আলোচনাক্রমে আমরা দেখলাম, আকবরের তর্জমা-প্রকল্প ছিল প্রধানত ফার্সী-কেন্দ্রিক, যদিও পাঞ্জাবী-সিন্ধি-হিন্দি-উর্দুর মতো উত্তর-ভারতীয় ভাষাও কিছু কিছু মুঘল-পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। সেটা আরেক গল্প হবে।

মুঘল মিনিয়েচার
অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতাব্দীব্যাপী মুসলিম-দুনিয়ায় জ্ঞানবিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। আল বিরুনি, আল খোয়ারিজমি, ইবন সিনা, ওমর খৈয়ামের মতো দিগ্গজ পণ্ডিতগণ জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত, রসায়ন ইত্যাদির মতো বিজ্ঞানের নানান দিকে উল্লেখযোগ্য উন্নতির নিদর্শন রেখেছিলেন যা সমগ্র মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের কথা, মুঘল লাইব্রেরিতে কাব্য-দর্শন-ইতিহাসের যত যত বই পাওয়া যায় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বই সেই তুলনায় সামান্যই; যা ছিল কিছু জ্যোতির্বিদ্যার উপরে।
অপর কয়েকটির কথা এখানে বলা যাক--
রাজকবি ফৈজী দ্বারা ভাস্করাচার্যের ‘লীলাবতী’ গণিতগ্রন্থের ফার্সী অনুবাদের কথা আগেই বলেছি, আরও কয়েকটি গ্রন্থ হলঃ
মুসা-উল-দামিরি কৃত জীববিদ্যার কোষগ্রন্থ ‘হায়াত-আল-হায়াওয়ান’
মুঘল আমলের শেষদিকে অষ্টাদশ শতকে ইউনানী-ও-আয়ুর্বেদের মিশ্রণে মুহম্মদ আকবর আরজানি-কৃত গ্রন্থ ‘টিব্-ই-আকবরী’
এটিও মুঘল আমলের শেষদিকপানের গ্রন্থঃ —দারাশিকোহ্ অনুবাদ করিয়েছিলেন, ‘নুশ্কাহ্-দার-ফান্নি-ফলাহৎ’ (কৃষিশিল্প)—সেচ, চাষাবাদ ও লতাগুল্মের উপকারিতা সংক্রান্ত।
‘ইলম্-আল-সানা’ইয়াৎ’—ধাতুবিদ্যা ও এলকেমির পাঠ।
ভূগোল-বিদ্যার চর্চায় ভারতবর্ষ পিছিয়েই ছিল। নানান উপঢৌকনের সঙ্গে স্যর টমাস রো যখন বাদশাহ্ জাহাঙ্গীরকে একখানি মানচিত্রও উপহার দিয়েছিলেন সেটি ‘পাঠ’ করবার উপযুক্ত মানুষ মুঘল রাজদরবারে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর আগে জেসুইট পাদ্রীরা আকবর বাদশাহ্কেও কয়েকটি মানচিত্র উপহার দিয়েছিলেন যেগুলি অপঠিত অবস্থায় পড়ে ছিল শাহী গ্রন্থাগারে।
***
বিভিন্ন ধর্ম সম্বন্ধে জানতে উদগ্রীব সম্রাট আকবর গোয়া থেকে জেসুইট পাদ্রীদ্বয় এন্টনিও মঁসেরেটা ও ফাদার রুডলফ একোয়াভিভা-কে আগ্রায় আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন ইরানী কনভার্ট-কাম-দোভাষী ফ্রান্সিসকো হেনরিক্স। এঁরা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন আট ভল্যুমের রয়াল পলিগ্লোট বাইবেল। আগ্রাতে ফাদার মঁসেরেটা দায়িত্ব পেয়েছিলেন রাজকুমার মুরাদের গৃহশিক্ষকতারও, কিন্তু সম্ভবত ভাষার বাধার কারণে ঐ বাইবেলের ফার্সী অনুবাদ করানো যায়নি।
***
সম্রাট আকবরের করানো ‘হামজানামা’ দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম, তা দিয়েই শেষ করিঃ
১৫৫৮ খৃষ্টাব্দ নাগাদ সম্রাট আকবর এই পুস্তক/চিত্র প্রকল্পের সূচনা করেন, যা ১৫ বছর ধরে চলেছিল।
এর ১৬৬ বছর পরে, ১৭৩৯ খৃষ্টাব্দে, ইরানী বাদশাহ্ নাদির শাহ্ ভারত আক্রমণ করে ৩০,০০০ দিল্লিবাসীকে হত্যা করে ৭২ কোটি টাকা মূল্যের মুঘল ধনদৌলত লুঠ করে নিয়ে চলে যায় ৭০০ হস্তী, ৪০০০ উট ও ১২০০০ ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে, যার মধ্যে ‘কোহিনূর’ হীরে ও ‘ময়ূর সিংহাসন’-ও ছিল।
এবং ছিল আকবরের আঁকানো সেই ‘হামজানামা’-র অপরূপ ১৪০০ চিত্র।
হাহাকার করতে করতে পরাজিত মুঘল বাদশাহ্ মুহম্মদ শাহ্ রঙ্গীলে বিশেষ দূত পাঠালেন নাদিরের কাছে যে অন্তত ঐ ‘হামজানামা’ বই-চিত্রগুলি ফিরত দিয়ে যেতে।
নাদির বলেছিলেন, ‘বাকি সব ধনদৌলত ফিরত চেয়ে নাও, কিন্তু হামজানামা দেব না’!
অতঃপর কোথায় গেল সেই ১৪০০ ছবি?
নানা স্থানে ছড়িয়ে/হারিয়ে লুঠ হয়ে যায় সে সব অমূল্য চিত্র, বর্তমান বিশ্বে শ’দুয়েক প্লেট বেঁচে আছে, যার বেশিরভাগই অস্ট্রিয়ান মিউজিয়ম ভিয়েনাতে।
সেখানে গেল কী করে?
দিল্লি লুঠ করে ফেরবার কয়েক বছরের মধ্যে নাদির যখন নিজের শহর খোরাসানেই গুপ্তঘাতকের হাতে খুন হয়ে গেলেন, তাঁর ছোট ছেলে মোস্তাফাকে বাঁচাতে এক বিশ্বস্ত সভাসদ্ তাকে নিয়ে তুরস্কের মধ্যে দিয়ে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় চাইল। সেখানে প্রবল প্রতাপান্বিতা হোলি-রোমান সম্রাজ্ঞী মারিয়া টেরেসা বালক-শাহজাদাকে মাতৃস্নেহে বুকে তুলে নেন, যাঁর নিজের সন্তানই ছিল ১৬টি।
(খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত হবার পরে নাদির শাহের ছোট ছেলের নাম হয় যোসেফ ফন সেমলিন, যিনি জার্মান ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন ও পরে জার্মান বাহিনীর কমান্ডার হয়েছিলেন।)
তখনই আকবর বাদশাহের বেশ কয়েকটি ‘হামজানামা’ চিত্র সাম্রাজ্ঞীকে উপঢৌকন দেওয়া হয়েছিল রাজধানী ভিয়েনা নগরীতে, যার মিউজিয়মে এখন ছবি/বইগুলি আছে।
***
মুঘল পুথিপত্র/কেতাব ও চিত্রমালার ভাণ্ডার মস্ত বড় । এত সহজে সে গল্প বলা শেষ হবে না।
গ্রন্থসূত্রঃ
By Annemarie Schimmel:
1. The Empire of the Great Mughals: History, Art and Culture (original German: *Im Reich der Großmoguln: Geschichte, Kunst, Kultur*, C.H. Beck, 2000; English translation by Corinne Attwood, edited by Burzine K. Waghmar, with a foreword by Francis Robinson; Reaktion Books, 2004; Oxford University Press
2. Islam in the Indian Subcontinent (Brill, Handbuch der Orientalistik series, 1980):
3. Calligraphy and Islamic Culture*. New York, 1984.
4. Francis Robinson: The Mughal Emperors and the Islamic Dynasties of India, Iran and Central Asia, 1206–1925(Thames & Hudson, 2007
5. Life Stories in Mughal India: Indo-Persian biographies, 16th-18th Centuries, by Shivangini Tandon, Routledge, Oxon, first published in 2025
6. হামজানামা, সুপর্ণা দেব, জয়ঢাক, কলকাতা, ২০২৬
7. The Empire of The Great Mughals : History, Art and Culture by Dr Suraj Nandan Prasad, World Heritage Inc, 2018