




ব্যস্ত রাস্তার ফুটপাথ ধরে স্বামীটি নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছেন, স্ত্রী আগে, মাঝেমাঝে পেছন ফিরে দাঁডিয়ে পুরুষটির সমানে আসা অবধি অপেক্ষা করছেন, আবার দুজনে চলছেন, মহিলাটি আবার এগিয়ে যাচ্ছেন। কিছুদিন আগেও ছিল উলটো। সে সময়ে সরকারি উচ্চপদে কর্মরত সুবীর নিচের দিকে বা পেছনে তাকাতেন না, সামনে তাকিয়ে সবল পদক্ষেপে এগিয়ে যেতেন; সঙ্গী থাকলে তাকেই স্পীড বাড়িয়ে তাঁর সঙ্গে চলতে হত। বীণা অত পারতেন না, তাই তিনি সুবীরের সঙ্গে বড়ো একটা বেরোতেন না।
গুটিগুটি চলতে চলতে হঠাৎ সুবীর থামলেন। ফুটপাথ লাগোয়া রাস্তার ধারে ধুলোয় একটা কিছু পড়ে আছে— ঝুঁকে দেখে বউকে ডাকলেন, বীণা, এসো, দেখো। বীণা কয়েক পা এগিয়েছিলেন, পিছিয়ে এসে দেখলেন, একটা বড়ো শুঁয়োপোকা, হাল্কা সবুজরঙের, মেরুন দাগে শরীরের পর্ব চিহ্নিত, গায়ের সবুজে পিনের ডগার মত মেরুনের ছিটছিট। বাড়ির বাগান বরাবর দেখাশোনা করার কারণে তিনি কীটপতঙ্গ পাখিপশু এদের কিছু খবর জানেন, তবু এধরনের রঙিন শুঁয়োপোকা তিনিও কম দেখেছেন। তবুও একটা পোকার জন্য চলাচলের রাস্তার উপরে বাচ্চাদের মত নাটক করতে তাঁর ইচ্ছে করছিল না। বললেন, থাক না ওটা। এখন চলো।
কিন্তু এখানে থাকলে পোকাটা একসময় মারা পড়বে, সুবীর বললেন, দুটো পাতা দাও তো।
বীণা ফুটপাথের ওপাশের ঝাড় থেকে দু’তিনটে পাতা আনলেন, সুবীর তা দিয়ে পোকাটাকে উঠিয়ে ঝোপে ছেড়ে দিলেন-- যা, নিজের জায়গায় গিয়ে বাঁচ। পাতার পরশ পেয়ে পোকাটা নড়েচড়ে উঠল।
সুবীর বললেন, চলো।
বীণা বললেন, চলো, বাড়ি যাই।
কেন, বাজারে যাবে বলেছিলে?
বীণা বললেন, জীবনে তো কারো দিকে কোনো দিকে তাকালে না, এখন এই পা না-চলা বয়সে পৌঁছে বাচ্চাদের মত পায়ে পায়ে তুচ্ছ এটা-সেটা দেখে আশ্চর্য হবে আর এগিয়ে গিয়েও আমাকে তোমার খেয়ালে বারবার পিছিয়ে আসতে হবে! এরকম করে করে বাজারে যেতে সারা বেলা রাস্তায়ই কেটে যাবে।
কী হল তাহলে? তাড়া তো নেই, না তোমার, না আমার। ধীরেই চলো না।
না, তোমার সঙ্গে আর চলা যাবে না, বীণা বললেন। আগেও তোমার সঙ্গে ছুটে পারিনি, এখন তোমার কথায় কথায় পিছোতেও পারব না।
বীণা উল্টোমুখে হাঁটা দিলেন, অগত্যা সুবীরও। জীবনে প্রথম নিজের ইচ্ছেয় সুবীরকে চলতে বাধ্য করে বীণার মনে একটা হিংস্র আনন্দ হল।