• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share  
  • একগুচ্ছ অ-রূপকথার রূপকথা : পাপিয়া ভট্টাচার্য

    হরি, হ্যারি পটার ও মাগল দুনিয়া — দময়ন্তী দাশগুপ্ত ; প্রচ্ছদ – নির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রকাশক- কেতাব-ই, কলকাতা- ৭০০০১০; প্রথম প্রকাশ-- নভেম্বর ২০২৫; ISBN: 978-81-992442-5-2

    পরাবাস্তব অথবা রূপকথা— জাদু তবে পিসি সরকারের ম্যাজিক নয় ,বাস্তবের দেশকালের সীমানা ছাড়িয়ে এক অন্য কল্পলোক, চেতনের গভীরে এক স্বপ্নালু অবচেতনের বাসভূমি। যেখানে যুগ যুগ ধরে শিশুমনের নিত্য আস্তানা। এক যে ছিল রাজা, সঙ্গে দত্যি, দানো, যক্ষ, পরী, ডাইনি উড়ন্ত কার্পেট আর গিলি গিলি গে হোকাস ফোকাস।

    আবহমান সময় ধরে মা, ঠাকুমা দিদিমাদের মুখে মুখে প্রচলিত লোককথার গল্পে লালিত শৈশব পায়ে পায়ে বেড়ে ওঠে এই সব রুপোলি রূপকথার হাত ধরেই। বয়োঃবৃদ্ধ ঠাকুমার ঝুলি থেকে পোস্টমর্ডান হ্যারিপটার পর্যন্ত তার আবেদন প্রায় একই রকম। অতিবড় সাহিত্য বিচ্ছিন্ন মানুষেরও সাহিত্যের এই বিশেষ ঘরানার ছোটো ছোটো গল্পের সঙ্গে রয়ে যায় আজন্ম নাড়ির টান।

    কিন্তু রূপকথাহীন মাটির পৃথিবী অন্য কথা বলে। বাস্তবের হরিরা কোনোদিন হ্যারিপটার হতে পারে না। স্বপ্নের সঙ্গে তাদের চিরকালের আড়ি। এখানে রুখাসুখা রণভূমিতে প্রতিনিয়ত নুন ভাতের লড়াইয়ে টিকে থাকতে হয় সেই সমস্ত মাগলদের যাদের জীবনে কোনো ম্যাজিক নেই। বহুস্তরীয় সমাজ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত দীন-হীন সেই সব স্বপ্নহীন মানুষের জীবনের ওপর কিছুটা আলোকপাত লেখিকা দময়ন্তী দাশগুপ্তের লেখা ‘হরি, হ্যারি পটার ও মাগল দুনিয়া’।

    ‘হরি, হ্যারি পটার ও মাগল দুনিয়া’ এই বইটি মোট চোদ্দোটি ছোটো গল্পের একটি সংকলিত গ্রন্থ। আপাত ভাবনায় এটি কিশোর পাঠ্য বলে মনে হলেও এই বইয়ের প্রতিটি গল্পে উঠে এসেছে এক নির্মম সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। আসলে ছোটোদের গল্প বলে বোধহয় কিছু হয় না। কেননা পৃথিবীটা একই। সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘সে’ যেমন ছোটোদের হয়েও বড়দের জন্য লেখা ঠিক তেমনি দময়ন্তী দাশগুপ্তের ‘হরি হ্যারি পটার ও মাগল দুনিয়া’ বয়সের বেড়া টপকে হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ের চালচিত্র।

    ‘হরি হ্যারি পটার ও মাগল দুনিয়া’ ছিয়ানব্বই পাতার এই নাতিদীর্ঘ গল্প সংকলনটিতে বহু চরিত্র সমাবেশ ঘটেছে কিন্তু গল্প পৃথক হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যেকটি চরিত্রই যেন বাঁধা পড়েছে একই সূত্রে। দারিদ্রের কোনো ধর্ম হয় না। সেখানে ফুটপাতবাসী বিশু, বহুরূপী সাজা অনাথ কিশোর রাজকুমার, গ্রাম থেকে শহরে কাজ করতে আসা লক্ষ্মী, দেহপসারিনি শবনম অথবা হরি ছদ্মনামে বেঁচে থাকা মণিরুল এদের প্রত্যেককেই মনে হয় সহযোদ্ধা।

    এই গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘ছোটোদের গল্প’। এখানে ফুটপাত বাসী ভিখারী বিশু তার মা ভাই বোনের জীবন থেকে অভাব মুছে দিতে চায়। রাস্তার দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে সে সিনেমা দ্যাখে। কিন্তু সে জানে সিনেমার হিরোর মতো বাস্তবের কোনো কিছুই বদলে দেওয়া যায় না। স্বপ্ন আসলে কাচের তৈরি দেওয়াল, যা সহজেই ভেঙে যায়।

    ‘ঢাকি’ গল্পে কিশোর আনোয়ার দুর্গাপুজোর সময় তার চাচার সঙ্গে কলকাতার রাজবাড়িতে যায়। চাচা ঢাক বাজায়, আনোয়ার বাজায় বাঁশি। সেখানে নন্দিনীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু এই অসম বন্ধুত্বের পরিণামেও লেখা থাকে বিচ্ছেদ ।

    ‘রাজকুমার’ গল্পে অনাথ রাজকুমার হাটে বহুরূপী সেজে পয়সা রোজগার করে। আধার কার্ড নেই বলে ও ইস্কুলে যেতে পারে না। মিড ডে মিল খেতে পায় না। খিদে পেলেই ওর বাবা-মার কথা মনে পড়ে।

    ‘হরি হ্যারি পটার ও মাগল দুনিয়া’ এই নামে দুটি পর্বে আসে বছর বারোর অনাথ মণিরুলের কথা। হরি নাম নিয়ে সে বাবুদের বাড়ি কাজ করে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সমবয়স্ক বনি দাদার সঙ্গে টিভি দ্যাখে। ও হ্যারি পটার দেখেছে। রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ও জাদুর দেশে চলে যেতে চায়। বাবুদের বাড়িতে অত্যাচারিত হয়ে অসুস্থ মণিরুল কাজে ঢোকে বাজি কারখানায়। সেখানে সে দুর্ঘটনার শিকার হয়। সামাজিক আঁস্তাকুড়ে বিবর্জিত মানুষের জীবনের মূল্য বোধহয় এটুকুই।

    দেশভাগ ও দাঙ্গায় ভিটেমাটি হারায় রুকসানা। কোলের মেয়ে শবনমকে নিয়ে রুকসানা শহরে আসে আশ্রয়ের খোঁজে। কারফিউ-এর শহরে ভিক্ষে দেবার লোক ছিল না ঠিকই, কিন্তু শরীর বেচার জন্য দালাল ছিল। আজ বহু বছর পর এ শহর একইভাবে ঠকিয়েছে তার মেয়ে শবনমকে। এখন শিয়ালদা জগৎ সিনেমার সামনে প্রতিদিন বিকেলে এসে দাঁড়ায় শবনম। এটাই ওর রুজিরুটি। ‘উত্তরাধিকার’ গল্পে রুকসানা ও শবনমের যন্ত্রণাবিদ্ধ জীবন কাহিনির মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয় অস্তগামী এক সময়ের কথা। এছাড়াও ‘তিন্নির পৃথিবী’ গল্পে অপর্ণা মাসী, ‘নিখোঁজ’ গল্পে মাধুরী, ‘ঘর’ গল্পে আয়ি, এদের প্রত্যেকের জীবনই অর্থহীন সম্বলহীন খড়কুটোর মতো। যুগ যুগ ধরে এক পেট খিদে নিয়ে বড়লোকের খিদমত খেটে ভদ্রবিত্ত মানুষের সন্দেহের চোখ এড়িয়ে এরা বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে।

    শেষ দুটি গল্পে লেখিকা সম্পর্কের গল্প বলেছেন। খানিকটা প্যারাসোস্যাল রিলেশনশিপ-এর মতো। এককথায় একপাক্ষিক এক কল্পনার জগৎ। যেখানে মানুষ ভীষণ ভাবে ভালো থাকতে চায়।

    নির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ লেখিকা দময়ন্তী দাশগুপ্তের ভাবনাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করেছে।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments