• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share  
  • সাদা টিউলিপ — ‘আলো-ছায়ার’ নিঃসঙ্গ সম্রাটের ট্রাজেডি : রঞ্জন ভট্টাচার্য (২)

    সাদা টিউলিপ;— শুভংকর গুহ ; প্রকাশক— অভিযান; কলকাতা ৭০০০০৯; প্রচ্ছদ ও অলংকরণ- মোস্তাফিজ কারিগর; প্রথম প্রকাশ— জুলাই ২০২৬; ISBN: 978-93-7363-499-9

    ইউরোপে ক্যানভাস চিত্রকলার সূচনা বাংলার মঙ্গলকাব্যের প্রায় সমসাময়িক, অর্থাৎ কমবেশি ৫০০ বছর আগেকার ইতিহাস। ভারত তথা বাংলার শিল্পকলা যখন সীমাবদ্ধ মূলত মন্দিরগাত্রে খোদাই শিল্পে বা প্রাকৃতিক রঙে আঁকা পটচিত্রে তখন ইতালি বা নেদারল্যান্ডে কাঠের প্যানেলের ওপর এচিং-এর যুগ পেরিয়ে এসে রমরমিয়ে শুরু হয়েছে ক্যানভাসে ছবি আঁকা ও ছবির ব্যবসা। সমাজের অভিজাত স্বচ্ছল শ্রেণি আর্ট ডিলারদের কাছ থেকে সেই সব ছবি কিনছেন, শিল্পীদের দিয়ে আঁকানো হচ্ছে পোর্ট্রেট, সুন্দরী দেহোপজীবিনীরা কেউ কেউ পার্শ্ব জীবিকা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন মডেলের কাজ। ভারত ও বাংলার গ্রামীণ বা মফস্সলের ছায়াছন্ন শহুরে সমাজ যখন মজে রয়েছেন তুলসীদাসী বা কৃত্তিবাসী রামায়ণের দাস্যভাবের ভক্তিরসে তখন ইউরোপের বিত্তশালী বৌদ্ধিক সমাজ আলোচনা করছেন খ্যাতনামা চিত্রকরদের বিখ্যাত সৃজনকর্মগুলির সাবজেক্ট ও আঙ্গিকের গুণমান বিষয়ে। শুধু চিত্রকরদের সৃষ্টি নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ হয়ে উঠছে তাঁদের রাজা ও ধর্ম অনুশাসিত সমাজের নীতিনিষ্ঠতার বিপরীতে তথাকথিত কালাপাহাড়ি স্বেচ্ছাচারী, বোহেমিয়ান যাপনচিত্র। কখনও কখনও চার্চ নিয়ন্ত্রিত ধর্মীয় ভাবধারার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে অভিযোগের তীক্ষ্ণ সমালোচনায় শিল্পীদের বিদ্ধ হতে হচ্ছে। কারও কারও ছবিকে ‘অভক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যান করা হচ্ছে। ক্ষমতার বাইরে গিয়ে রাজকীয় জীবনচর্যা, চার্চ কর্তৃক ব্যান হওয়া বা শুধুমাত্র ছবিকে ভালোবেসে উদাসীন বেহিসাবী একধরনের মেলানকলিক জীবন যাপন মধ্যযুগের ইউরোপীয় বহু শিল্পীর জীবনে ডেকে এনেছিল তীব্র দারিদ্র্য ও নিদারুণ একাকিত্ব। পরবর্তী সময়ে তাঁদের এই বহুমাত্রিক আলো-অন্ধকারময় জীবন আকর্ষণ করেছে বিশ্ববিশ্রুত সাহিত্যিকদের। রচিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চিরায়ত ক্লাসিক জৈবনিক উপন্যাস। ভ্যান গঘ ও মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর জীবনকে নিয়ে আর্ভিং স্টোন লিখলেন লাস্ট ফর লাইফ ও অ্যাগনি অ্যান্ড এক্সট্যাসি, পল গঁগার জীবন আধারিত দ্যা মুন অ্যান্ড সিক্স পেন্স লিখলেন সমারসেট মম।

    চিত্রকরদের জীবন ভিত্তিক জৈবনিক উপন্যাসের বঙ্গীয় ধারাটি অবশ্য বেশ শীর্ণ। তাৎক্ষণিক ভাবে যে উপন্যাসটির নাম মুখে মুখে ফেরে সেটি শিল্পী ও ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজের জীবন বিষয়ে সমরেশ বসুর লেখা অসমাপ্ত দেখি নাই ফিরে । যামিনী রায় ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের জীবনের ওপর আধারিত দুটি উপন্যাস কিছুকাল আগে প্রকাশিত হয়েছে। সঞ্জয় ঘোষ যামিনী রায়কে নিয়ে লিখেছেন যামিনী কলকাতা সংবাদ ও কাজল গঙ্গোপাধ্যায় বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের জীবনকে ভিত্তি করে লিখেছেন নিঃসঙ্গ খোয়াই ও একটি তালগাছ । চিত্রকরদের জীবন ভিত্তিক বাংলা কথাসাহিত্যে সাম্প্রতিকতম সংযোজন সাদা টিউলিপ — লেখক শুভংকর গুহ। আগে উল্লেখ করা তিনটি উপন্যাসের থেকে সাদা টিউলিপ ভিন্ন গোত্রের। কারণ এর উপজীব্য নেদারল্যান্ডের সুবিখ্যাত মধ্যযুগীয় শিল্পী রেমব্রান্ট হারমেনসুন ভ্যান রিয়ন (১৫ জুলাই ১৬০৬ — ৪ঠা অক্টোবর ১৬৬৯)। শুধু বিদেশী শিল্পীর জীবনের কাহিনি হিসেবে নয়, আঙ্গিকের দিক থেকেও সাদা টিউলিপ ভিন্ন ঘরানার বাংলা উপন্যাস। জৈবনিক উপন্যাসের প্রথাগত চলনকে উপেক্ষা করে বর্তমান থেকে অতীত কালে উপর্যুপরি যাতায়াতের সেতুপথে কল্পিত এই উপন্যাস রেমব্রান্টের জীবন ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে তৈরি করতে চেষ্টা করেছে শিল্পীর জীবন, তাঁর ছবির বিশ্লেষণ, তৎকালীন সময় ও সমাজ এবং ২০২৫/ ২৬ এর দৃষ্টিতে রেমব্রান্টের সৃজন ভাবনার একটি বিস্তৃত তুলনামূলক বিচার ধারাকে।

    নয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত ১৫৯ পাতার উপন্যাস সাদা টিউলিপ ২০২৫ সালে হ্যালো টেস্টিং পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান বইটি সেই উপন্যাসেরই পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ। শুভঙ্কর গুহ লিখিত কাহিনির মুখ্য চরিত্র অবশ্যই শিল্পী রেমব্রান্ট। কিন্তু লেখক কাহিনিতে প্রায় সমগুরুত্ব সম্পন্ন একটি কাল্পনিক চরিত্রের উপস্থাপন করেছেন। আমস্টারডাম শহরের ‘দ্যা লিম বার্জার’ পত্রিকার শিল্প-সাংবাদিক ও শিল্প সমালোচক নামহীন এই চরিত্রটির উত্তম পুরুষে বর্ণিত কাহিনি সূত্রের মধ্যে দিয়ে উপসংহারের পথে এগিয়েছে সাদা টিউলিপ। চরিত্রটির কোনো নাম না থাকা ও উত্তম পুরুষে কথা বলা, বুঝিয়ে দেয় এই চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে লেখক তাঁর প্রিয় শিল্পী রেমব্রান্ট সম্বন্ধে যাবতীয় নিজস্ব ভাবনাকে বুনে দিতে চেয়েছেন কাহিনি শরীরে। সুতরাং এই আলোচনায় এরপর থেকে তাকে ‘লেখক’ বলেই উল্লেখ করা হবে।


    উপন্যাসের শুরুতেই লেখক নান্দীমুখ বা এই কাহিনি রচনার কৈফিয়ত হিসেবে বলেছেন, ‘প্রায় চারশো বছরের অধিক এই সময়কালের মধ্যে আমার কেন যেন মনে হয়, অনেকবার আমার জন্ম ও মৃত্যু ঘটে গেছে।… ………এক মহৎ চিত্রকরের দর্শন ও সাক্ষাতের জন্য, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, জন্ম ও মৃত্যুর পরেও বারেবারে তাঁর সঙ্গে অন্তহীন কথা বলার জন্য।’ লেখক কথিত এই চিত্রকর নেদারল্যান্ড তথা বিশ্বের আলো-ছায়াময় বারোক শিল্পধারার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী রেমব্রান্ট হারমেনসুন ভ্যান রিয়ন। আমস্টারডাম থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে ক্যুকেনহফের টিউলিপ বাগানে বসে তিনি কথা বলেছেন, কথা শুনেছেন বাতাসের মতো কায়াহীন রেমব্রান্টের সঙ্গে। ৪০০ বছরের ব্যবধানের দুটি শতাব্দীর (একটি অতীত ও একটি বর্তমান) দুটি চরিত্রের কথোপকথনে তৈরি হয়েছে জাদু বাস্তবতার অলৌকিক আবহ। অশরীরী রেমব্রান্ট কখনও একালের আবার কখনও সেকালের। কাহিনি শরীরে দুই সময়কালের এই সুসংবদ্ধ অবস্থানের মধ্যে দিয়ে যেন শিল্পী রেমব্রান্টের চিরকালীনতাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

    লেইডেন শহরের বাসিন্দা রেমব্রান্টের বাবা ছিলেন একজন দক্ষ মিলার বা কারিগর। তাঁর ইচ্ছে ছিল এই পুত্রটি যেন পড়াশোনা করে একজন বাস্তুকার বা চিকিৎসক হয়। কিন্তু রেমব্রান্ট যখন স্ব-ইচ্ছায় একজন চিত্রকর হয়ে উঠলেন তখনও তাঁর বাবা তাঁকে উৎসাহিত করেছেন। একসময় চিত্রকর হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠার জন্য তিনি লেইডেন ছেড়ে চলে এলেন রাজধানী আমস্টারডামে। ক্রমশ তাঁর খ্যাতি বাড়তে লাগল। ভালোবেসে বিয়ে করলেন প্রেয়সী সাসকিয়াকে। পরিবারের অমতে এই বিয়ে রেমব্রান্টকে বিচ্ছিন্ন করল তাঁর পরিবারের সঙ্গে। দু-হাতে তখন তিনি উপার্জন করছেন। খরচও করছেন লাগাম ছাড়া। আমস্টারডামে কিনলেন ৩৬ ঘরের বিশাল প্রাসাদ। ঠিক এইসময় থেকেই তাঁর জীবনে নেমে এল বিপর্যয়। বাইবেলের কিছু দৃশ্য অঙ্কনে দেবতার অবয়বে মানুষের প্রতিচ্ছবি বিরূপ করে তুলল চার্চকে। এরমধ্যে মৃত্যু হল তিন সন্তানের ও স্ত্রী সাসকিয়ার । ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞায় রেমব্রান্টের ছবি কেনাবেচা বন্ধ হয়ে গেল। চরম দারিদ্র আর মৃত্যু শোকের মধ্যে তিনি মানসিক আশ্রয় খুঁজলেন হেন্ড্রিকজে স্টোফেলসের মধ্যে। পেলেনও। কিন্তু বারাঙ্গনা স্টোফেলসকে বিয়ে করার সামাজিক ও ধর্মীয় অনুমতি পাওয়া গেল না। এরই মধ্যে মৃত্যু হল একমাত্র জীবিত সন্তান টাইটাসের। চরম দারিদ্র্য, নিদারুণ একাকিত্ব ও মৃত্যু শোকে ক্লান্ত রেমব্রান্ট টাইটাসের মৃত্যুর পর আর মাত্র একবছর বেঁচে ছিলেন।

    রেমব্রান্টের এই জীবনরেখা ধরেই কাহিনি এগিয়ে চলেছে। কিন্তু প্রথাগত জৈবনিক উপন্যাসের মতো পারম্পর্য বজায় রাখা হয়নি। বাস্তবের সাদা টিউলিপ-এর রচয়িতা শুভংকর গুহ বা কাহিনিতে সাদা টিউলিপ-এর কাল্পনিক লেখক দ্যা লিম বার্জার পত্রিকার শিল্প-সাংবাদিক, কেউ-ই রেমব্রান্টের জীবনের ঘটনাক্রমের পারম্পর্য রক্ষা করে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাননি। কারণ উভয়েরই উদ্দেশ্য উপন্যাসের কাল্পনিক লেখকের কথায়,

    ‘এমন একজন মহাপ্রতিভাধর চিত্রকর সম্পর্কে যা জেনেছি তার বাইরেও পড়ে আছে অনেক অনেক দিন-প্রতিদিনের আলো-আঁধার যা আমরা এখনও কুড়িয়ে নিতে পারিনি। যা পারিনি ইতিহাসে তার প্রমাণ নেই। আমি সেই অজানা জীবন নিয়েই কল্পনার মাধ্যমে অভিযাত্রীর মতো প্রবল ইচ্ছা নিয়ে অভিযান করতে চাই। ‘
    রেমব্রান্টের জীবন ও আঁকা ছবির বিষয়ে এ যাবৎ কয়েক হাজার বিভিন্ন আঙ্গিকের লেখা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি উপন্যাস বা কাহিনি নির্ভর জীবনীও আছে — The Life and Times of Rembrandt লেখক হেনড্রিক উইলেম ভ্যান লুন, Rembrandt: A Life লেখক: চার্লস এল. মি জুনিয়র, Young Rembrandt: A Biography লেখক: ওন্নো ব্লম, Rembrandt: Biography of a Rebel লেখক: জোনাথন বিকার। ভবিষ্যতে আরও লেখা হবে। কিন্তু রেমব্রান্ট নিজের জীবন সম্পর্কে কোথাও একটুকরো শব্দও না লিখে রেখে যাওয়ায় চিরাচরিত আঙ্গিকে বা গতানুগতিক আঙ্গিকের নির্দিষ্ট ধাঁচাকে ভেঙে রেমব্রান্টের জীবনকে কথাসাহিত্যের ক্যানভাসে শব্দের রঙ-তুলিতে ধরার চেষ্টা চলতেই থাকবে, যেমন করেছেন শুভংকর গুহ তাঁর আলোচ্য উপন্যাসে।


    কাল্পনিক লেখক কখনও ন্যারেটার, সাংবাদিক সুলভ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী, কখনও শরীর-মুক্ত শিল্পী রেমব্রান্ট হারমেনসুন ভ্যান রিয়নের স্মৃতিকথনের অনুলেখক বা শ্রুতিলেখক। এভাবেই লেখক শুভংকর গুহ প্রথাগত কাহিনি-বয়নের ফর্ম ভেঙেছেন ও সাফল্যের সঙ্গে নির্মাণ করেছেন পর্বতসম প্রতিভার অধিকারী এই মহান শিল্পীর জীবন। প্রসঙ্গত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য লেখক ও রেমব্রান্টের সাক্ষাৎকার গ্রহণের অংশগুলি। ক্যুকেনহফের টিউলিপ বাগানের অনির্দিষ্ট একটি বেঞ্চে বসে দুজনের এই কথোপকথনের অংশগুলি গ্রীক সাহিত্যের ডায়লগ-এর মতো রেমব্রান্টের সমাজ, ধর্ম, জীবন ও শিল্প দর্শন এবং তাঁর আঁকা খ্রাইস্ট ইন দি স্টর্ম অন দি সি অফ গ্যালিলি, নাইট ওয়াচ- এর মতো বেশ কয়েকটি বিখ্যাত ছবির পুঙ্খানুপুঙ্খ শৈল্পিক বিশ্লেষণকে তুলে ধরেছে স্বাদু কথকতায়। পাশাপাশি প্রাঞ্জল ভাষায় এচিং, ক্যানভাস তৈরির কারিগরি, বারোক শিল্প,ইমপোস্টা পদ্ধতি ইত্যাদি চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পারিভাষিক বিষয়গুলিকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আবার ন্যারেটিভের অংশ হিসেবে সপ্তম অধ্যায়ে বিশপ মার্কো ভ্যান ডোয়েসবার্গের সঙ্গে রেমব্রান্টের কথোপকথনে অজড়-অনড় প্রথাচার সর্বস্ব ধর্মভাবনার সঙ্গে স্বাধীন শিল্প চিন্তার দ্বন্দ্বটিকে স্পষ্ট করেছে। হয়তো এভাবেই চার শতাব্দী আগের সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে গেছে আজকের বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদী ধর্মচিন্তার সমাজবাস্তবতা। ‘অভক্তি’-র ছবি হিসেবে চিহ্নিত করে আমস্টারডামের সমাজে যেভাবে রেমব্র্যান্টের ছবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল, এই ২০২৬-এও ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানে একই রকম ঘটনা নিরন্তর ঘটে চলেছে।

    কয়েক শত বছরের ব্যবধানের দুটি কালপর্ব, তাদের মধ্যে অনায়াস যাওয়া-আসা এবং বিভিন্ন আঙ্গিক ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে চরিত্র নির্মাণ ও কথকতার সৌন্দর্য বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও লেখক শুভংকর গুহ দক্ষতার সঙ্গে পেরিয়ে এসেছেন সেইসব হার্ডলগুলিকে।

    রেমব্র্যান্ট চরিত্রের পাশাপাশি ৪০০ বছর আগের ঐতিহাসিক চরিত্র রেমব্র্যান্টের স্ত্রী সাসকিয়া উলেনবার্গ ভ্যান রিয়ন, তাঁর খুড়তুতো দাদা আর্ট ডিলার ও রেমব্র্যান্টের ছবির বানিজ্যিক সাফল্যের স্থপতি হেন্ড্রিক ভ্যান উলেনবার্গ, রেমব্র্যান্টের শেষ জীবনের সঙ্গিনী হেন্ড্রিকজ স্টোফেলস বা একবিংশ শতাব্দীর দ্যা লিম বার্জার পত্রিকার অন্যতম সাংস্কৃতিক ও চিত্রকলা বিষয়ক সম্পাদক স্যুলেত ভ্যান হ্যারিস চরিত্রগুলি তাঁদের সময়ের নিরিখে যথাযথ ভাবে বাস্তবানুগ হয়ে উঠেছে।

    শতাধিক বছরের ব্যবধানে গড়ে ওঠা দুটি পর্বের সমাজ পরিবেশ অনুযায়ী ভাষাভঙ্গিও ভিন্ন ধাঁচের। এই উপন্যাসে সেই ভাষা-পরিচ্ছদের বিভিন্নতাকেও বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শিল্পীর জীবন মানেই রঙ-তুলির বর্ণচ্ছটা। উপন্যাসের কিছু কিছু অংশের বর্ণনা ক্যানভাসে আঁকা রঙিন ছবির মতো মায়াময়। আমস্টারডাম, ক্যুকেনহফ, লেইডেন শহর বা মফস্বলের নিখুঁত বর্ণনা পড়তে পড়তে মনে হয় বাস্তবের লেখক শুভংকর গুহ আন্তরিক সৎ পর্যটকের মতো দুই শতাব্দী জুড়ে এইসব অঞ্চলে অলৌকিক পর্যটন শেষ করে লিখতে শুরু করেছেন এই উপন্যাস। কিন্তু একটি লেখা থেকে জানলাম, উনি কোনোদিনই আমস্টারডাম যাননি, সেই ব্যয়বহুল ভ্রমণের সামর্থ্যও তাঁর নেই। তবে সামান্য কয়েকটি বাক্যবিন্যাসে কিছু টাইপো বা গঠনগত শ্রুতি-মাধুর্যের ত্রুটি রয়ে গেছে। আগামী সংস্করণ নিশ্চিত এই ত্রুটি থেকে মুক্ত হবে।

    প্রাণপ্রিয় স্ত্রী সাসকিয়া সাদা টিউলিপ অত্যন্ত ভালোবাসতেন। রেমব্র্যান্ট প্রতিদিন সাদা টিউলিপে সাজিয়ে দিতেন তাঁর ঘর। সাদা টিউলিপ নামেই নামাঙ্কিত এই উপন্যাস আশা করা যায় অনুসন্ধিৎসু পাঠকের ভালো লাগবে।

    আলো-ছায়ার সম্রাট শিল্পী রেমব্রান্ট হারমেনসুন ভ্যান রিয়নের আঁকা সুবিখ্যাত আত্মপ্রতিকৃতি সহ মোস্তাফিজ কারিগরের প্রচ্ছদ বিন্যাস বিষয়ের সঙ্গে মানানসই ও যথাযথ।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments