• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | স্মৃতি
    Share  
  • দশভূজা, কুঁচফল আর নাই-নাকু : মৌসুমী ভট্টাচার্য্য

    ১.

    বর্ষা কেটে গেলেই গ্রামের সন্ধেটা চলে যেত ঝিঁঝিঁ পোকার দখলে। আমাদের উঠোনের কোণের দিকের ঝোপ থেকে নাগাড়ে ডেকে চলত ওরা। চিঁ শব্দে ভরে যেত বাড়ি। কে যেন বলেছিল, ওরা নাকি এসময় মা দুর্গার গয়না গড়ে। তারই শব্দ ওটা। মা দুর্গার অস্ত্রশস্ত্র দেবতারা দিলেন আর গয়নার ভার পড়ল ঝিঁঝিঁ পোকাদের ওপর! এ কেমন কথা! দোরে বসে হ্যারিকেনের আলোয় পড়তাম। কানে বাজত ঝিঁঝিঁর সিম্ফনি। যখন শব্দ কান ঝালাপালা করার পর্যায়ে পৌঁছত, আমি পা টিপে টিপে ঝোপের কাছে গিয়ে জোরে একটা তালি দিতাম। চমকে গিয়ে ওরা চুপ করে যেত। কিছুক্ষণ চুপ। মিনিট পাঁচেক বড় জোর। তারপর আবার দু-একজন গলা নামিয়ে ভয়ে ভয়ে ডাকতে শুরু করত, ক্রমে যোগ দিত সব সাঙ্গপাঙ্গরা। আবার সিম্ফনি, আবার পা টিপে টিপে গিয়ে হাততালি।

    আমাদের গ্রামে দুটো মাত্র দুর্গাপুজো হত। দত্ত পাড়ায় আর চক্রবর্তী পাড়ায়। দত্তদের বাড়ি আমাদের ভট্চায্যি পাড়ার সামনেই। তাই ওদের পুজোতেই আমাদের যাতায়াতটা বেশি। তবে মুশকিল হল, সে পুজোয় ঠাকুর দেখা যায় না। ওদের অষ্টধাতুর তৈরি ছোট্টো দশভূজা মূর্তি। সে নাকি বিস্তর দামি। মন্দির থেকে মূর্তি বের করে ঠাকুর দালানে এনে পুজো হত। আমি শুধু সিংহাসনটাই দেখতে পেতাম প্রতিবছর। দত্তদের পরিবারের যে-সব লোকজন শহরে থাকত, তারা সবাই ওই সময় গ্রামের বাড়িতে আসত। তাদের অনেকেই আমাদের বাড়িতে মা-বাপীর সঙ্গে গল্প করতে আসত। সন্ধেবেলায় পুজো মন্ডপে গিয়ে মা-ও আড্ডা জমাতো পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে। মা খুব গল্প করতে পারে। আমার কোনও গল্প নেই। হইহইও করতে পারি না। উৎসবের ভিড়ে একলা হয়ে যাওয়ার একটা মজা আছে। আমি নাটমন্দিরের এক কোণে বসে লোকজনকে দেখতাম। আরতির সময় সব লোক এক দৃষ্টে ঠাকুর দালানের দিকে তাকিয়ে থাকে। ধূপধূনো, কাঁসর, ঘণ্টা, পুরোহিতের একটার পর একটা উপাদান পালটানো অপলকে দেখে সবাই। এদিকে উঠোনে ঢাকি হরেক বোল তোলে তার ঢাকে। লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তালে তালে কতরকম ভঙ্গিমায় নেচেও নেয়। আমি ঢাকির কসরতের একনিষ্ঠ দর্শক। একটা কথা বরাবরই মনে হত, এরকম বেয়াড়া আওয়াজের বাদ্যি শুনতে ঠাকুর দেবতারা কি সত্যিই ভালবাসে! কী জানি, বাসে হয়তো। তবে ঢাকি যে ঢাক বাজাতে ভালবাসে সেটা বিলক্ষণ বুঝতাম। তাকে মাঝপথে কেউ থামিয়ে দিলে বেশ ক্ষুণ্ণ হত। সব শিল্পেরই তো নিজস্ব ছন্দ আর চলন থাকে। বাধা পেলে ব্যথা পায় শিল্পী।

    ছোটোবেলা থেকেই শুনতাম, এই দশভূজা মা নাকি বেশ জাগ্রত। বাপীর মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। বাপী তখন ক্লাস নাইন-এ পড়ে। একদিন বন্ধুরা মিলে ঠিক করে রাতে ফিস্ট করবে। দত্তবাড়ির ছেলেরাও সেই দলে ছিল। ওরাই পরামর্শ দেয় ওদের পুকুর থেকে মাছ চুরি করতে। সাত কিশোর যখন রাতের অন্ধকারে চুপি চুপি ছোটো জাল ফেলে মাছ ধরায় ব্যস্ত, তখন দূর থেকে কেমন যেন ঠুং ঠাং আওয়াজ কানে আসে। দত্তবাড়ির ছেলেরা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে — ‘মা দশভূজা বেড়াতে বেরিয়েছেন। মা এরকম বেরোন।’ কেউ আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ মাছ ধরে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে নিজেরাই মাছের ঝোল আর ভাত রান্না করে। ফিস্ট খেয়ে মাঝরাতে যে-যার বাড়ি চলে যায়। পরদিন সকালে শোনা যায় মা দশভূজার অষ্টধাতুর মূর্তিটি চুরি গেছে, সঙ্গে ঠাকুরের বাসনকোসনও। রাতে ঠুং ঠাং শব্দের রহস্য তাহলে এটাই ছিল! কিন্তু সেই শব্দ বাপীরা যে শুনতে পেয়েছিল এটা তো কাউকে বলা যাবে না। তাহলেই বড়রা প্রশ্ন করবে, ‘তোরা পুকুরপাড়ে কী করছিলি অত রাতে!’ বাপী বলত, ‘কোন লজ্জায় বলতাম, চোর যখন দত্তদের দশভূজা চুরি করছিল, আমরা তখন দত্তদের পুকুর থেকে মাছ চুরি করছিলাম!’

    ২.

    চক্রবর্তী পাড়ার পুজো ছোটোবেলায় বেশ জমজমাট হত। তারপর ধীরে ধীরে ওদের অবস্থা পড়তে থাকে। তাই আয়োজনেও ক্রমশ ভাটা পড়ে। মা দুর্গার আকার বছর বছর ছোটো হতে থাকে। একসময় দেখলাম মা দুর্গা কার্তিকের সমান আর কার্তিক প্রায় এক শিশু! ঠাকুরকে অত ছোটো হয়ে যেতে দেখে ভারি মায়া হত। আমাদের গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তাই পুজোয় জেনারেটর ছাড়া গতি নেই। চক্রবর্তী পাড়ার পুজোয় সেটাও একসময় বাদ গেল। হ্যাজাকের আলো টিম টিম করত অত বড় দুর্গা দালানে। আমাদের পাশের গ্রাম সোনাতলায় ওই তল্লাটের সবচেয়ে জাঁকের পুজোটা হত। সোনাতলা মিলন সঙ্ঘ। এক বড় রাজনৈতিক নেতা এবং এক-বারের বিধায়কের পুজো। অনেক বাজেট। ওখানেই প্রথম দেখেছিলাম এক-চালচিত্র ছেড়ে লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গনেশ সব আলাদা আলাদা দাঁড়িয়ে আছে। দূরে দূরে। মনে হত এই মণ্ডপে এসে মা দুর্গার ছেলেমেয়েরা স্বাবলম্বী হয়ে গেছে। ঠাকুরদের সাজগোজ এবং হাবভাবও বেশ আধুনিক। মণ্ডপের পাশেই একটা পুকুরের ওপরে ওদের বিশেষ আলোকসজ্জার প্রদর্শন হত। সেটাই বড় চমক। বিশ্বকাপ জয়, ট্রেন দুর্ঘটনা কিংবা সাইক্লোন, বছরের সাড়া জাগানো এমন সব ঘটনা ফুটে উঠত আলোকমালায়। লোকে ভিড় করে দেখত। পুজো মণ্ডপের অনেক আগে থেকেই রাস্তার দু-ধারে টুনি লাইটে সাজানো ফ্রেমে লতা-পাতা-নক্সা ঝিকমিক করত। কিন্তু আমার আকর্ষণ ওই ফ্রেমে বন্দী আলো নয়, ফ্রেমের পিছনের আলো। টুনি লাইটের ফ্রেমগুলোর পিছনে একটা করে ছোটো মোটর লাগানো থাকত। সেই মোটরগুলোর ওপর একটা করে নীল আলো ছিকিৎ ছিকিৎ করে ছোটাছুটি করত। মনের আনন্দে তারা যেন দৌড়ে বেড়াচ্ছে। কেউ তাদের দিকে তাকায় না। রংচঙে আলোর বন্যায় ওরা যেন জোনাকি।

    লোকের ঢল নামত পঞ্চমীর সন্ধে থেকেই। ওই তো কটা পুজো! বাজারে দালান-জোড়া বড়বড় চোখে তাকানো এক চালের দুর্গা। দেবীমূর্তি। আর একটু এগোলে চন্দ্র বাড়ির ঢাউস ঠাকুর দালানে প্রাণহীন পুজো। আর ছিল ‘হাড়ির ডাঙা’র পুজো। খুব আচার মেনে অনাড়ম্বর পুজো। ওই পুজোর আয়োজকরা বাপীর বন্ধু। তাদের অনুরোধে বাপী সে পুজোর পূজক। আমি জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখতাম পুজোর ক-দিন বাপী অনেক রাতে বাড়ি ফিরত। বাপী ফিরলে আমরা এক সঙ্গে খেতে বসতাম। ঘি আর ভাতে ভাত। বাপীর গায়ে ভুর ভুর করত পুজো পুজো গন্ধ।

    যেদিন স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ত, সেদিন হাফ ছুটি হত। স্কুল ছুটির পর বন্ধুরা মিলে স্কুলের আশপাশের ঠাকুরগুলো দেখতে যেতাম। ক্লাস ফাইভ থেকে এইট অবধি প্রতি বছরই এটা হত। বেশির ভাগ বন্ধুর বাড়িই স্কুলের কাছাকাছি। আমিই যেতাম দূর থেকে সাইকেল চালিয়ে। সে-দিন আমার বন্ধুরা অভিভাবকের মতো আমায় সঙ্গে নিয়ে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যেত। স্নিগ্ধা, অচিরা, প্রীতিলতা, পরভিন, কৃষ্ণা, রওসেনারা, সুপ্রিয়া, সুজাতা, যূথিকা, আনোয়ারা, সবাই দল বেঁধে রাস্তার দখল নিয়ে নিতাম। আমার সঙ্গে হাঁটত আমার সাইকেলও। রোদ্দুর মাথায় নিয়ে প্রথমেই যেতাম গড়ভবানীপুরের জমিদার বাড়ি, সবাই বলত ‘বাবুদের বাড়ি’। আমাদের ঊষারানী করাতি বালিকা বিদ্যালয়ের সামনেই বাবুদের বাগান। আম, লিচু, জাম, সবেদার বাগান। প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা সেই বাগানের মাঝখানে জমিদারদের তিন মহলা বাড়ি। তোরণ দ্বার পেরিয়ে বাবুদের বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকলেই সামনে চোখ জুড়ানো বিশাল সবুজ লন। তার পাশেই শান বাঁধানো পুকুর। সিনেমায় যেমন দেখায়। বাঁদিকে এক একটা মহল। বার মহলের ঠাকুর দালানে দুর্গাপুজোর আয়োজন হত। সারা বছরের জমা ধুলো ঝেড়ে সাজানো হত দালান। দালানের কার্নিশ আর মোটা মোটা থামের মাথায় পায়রার কুবুর কুবুর শব্দ। পুজোর ক-দিন ঢাকের আওয়াজে তা অবশ্য চাপা পড়ে যেত। ঘাসে ঢাকা উঠোনের মধ্যে দিয়ে একটা সরু পায়ে চলা পথ খিলান গেট পেরিয়ে ঢুকে গেছে অন্দরমহলে। সেখানেও আবার একটা উঠোন, আর তিন দিকে উঁচু উঁচু দোতলা ঘরের সারি। তার পরেও ছিল আরো এক মহল। সে-দিকে বিশেষ কেউ যেত না। ইতিহাস আর অন্ধকার যেন জট পাকিয়ে রয়েছে ওই রহস্যময় তৃতীয় মহলে। ওদিক তাকালেই গা ছমছম করত। কত গল্প যে লোকের মুখে ঘুরত! কত মানুষকে নাকি শেষবার দেখা গিয়েছিল জমিদার বাড়ি ঢুকতে। অন্দরের অন্ধকুঠুরিতে নাকি ছিল এক গুমঘর! সেসব সত্যি কী না কে জানে! বিখ্যাত ই-এন-টি স্পেশালিস্ট ডাক্তার সত্যবান রায় ওই পরিবারের সন্তান। পরের প্রজন্মের কেউ আর জমিদারীর হাল ধরার মতো ছিলেন না। শেষ বংশধর ছিলেন প্রাণধন রায়, ডাকনামে সোনাবাবু। কী সম্ভ্রান্ত তাঁর ব্যক্তিত্ব! আমাদের স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কয়েকবার দেখেছিলাম তাঁকে। আমার চোখে জমিদার বলতে আজও সোনাবাবুর চেহারাটাই প্রথম ভাসে। জমিদার বাড়ির পুজো ‘বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত’ মতে হত। তাই বাকি পুজোর সঙ্গে ওঁদের নির্ঘণ্ট মিলত না। সেটা নিয়ে আমাদের বেশ দুশ্চিন্তা হত, বাবুদের বাড়ির পুজোটা যদি অনেক দিন এগিয়ে বা পিছিয়ে যায় তাহলে তো আমাদের লিস্ট থেকে একটা ঠাকুর কমে যাবে। না। আমার দেখায় সেরকম কিছু ঘটেনি কখনো। আমি মনে মনে ভাবতাম, ওটা যদি বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত হয়, বাকি পুজোগুলো কি তবে অশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে!

    ৩.

    দুর্গাপুজোর মাসখানেক মাসদেড়েক আগেই মা পুজোর কেনাকাটা করতে নিয়ে যেত। তিন ভাই বোনের একটা করেই জামা কেনা হবে। কিন্তু সেটা হবে বেশ ভাল। পুজোর পাঁচ দিনই ওই একটা জামা পরেই ঠাকুর দেখা। মা’র পছন্দের দোকান ছিল পদ্মারূণ। বাপীর পুরোনো ছাত্রের দোকান। তাই খাতির বেশি। নতুন জামা কাপড়ের আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকত আরো অনেক আনন্দ। ওই দোকানেই প্রথম দেখেছিলাম পেপার ওয়েট। কাঁচের প্রায়-গোলকের মধ্যে কেমন করে বুদবুদ আর নানা রঙের ফোঁটা ঢুকল সে বড় রহস্য। আমি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দেখতাম ভিতরের বুদবুদটা নড়ছে কিনা। ওই দোকানের একদিকে জামা কাপড় আর বাকিটায় ছিল সোনার দোকান। ওঁদের পারিবারিক ব্যবসা। পিতলের ছোট্টো তুলাদণ্ড, বাটখারার বদলে লাল-কালো কুঁচফল দিয়ে সোনা ওজন করা দেখতে খুব মজা লাগত। সোনার দোকানের দাদু আমার কৌতূহল দেখে দু-চারটে কুঁচফল হাতে দিয়ে বলতেন, ‘খেলার জন্যে দিলাম, মুখে দেবে-না কিন্তু।’ বাড়ি এসে সেই মহার্ঘ্য কুঁচফল নিয়ে খেলা শুরু হত। একটা ছোটো পাটকাঠির এক প্রান্ত মুখে নিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে তাকাতে হবে। ফাঁপা কাঠির ওপরের প্রান্তে কুঁচফলটা বসিয়ে দিতে হবে। তারপর তলা থেকে ধীরে ধীরে ফুঁ দিলে ওপরে কুঁচফলটা কাঠির ওপর নাচতে থাকত। এখন ভাবলে হাসি পায়, এটুকুতেই তখন কী আনন্দ হত। এর নামই যে শৈশব!

    দুর্গাপুজো শেষ হলেই মন খারাপ। সবারই হয়। কিন্তু আমাদের ততটা খারাপ লাগত না। কারণ দুর্গাপুজোর পর পরই আমাদের পাড়ার কালী পুজোর প্রস্তুতি শুরু হত। একদিন কুমোর এসে মাটি রেখে যেত। আগের বছরের ঠাকুরের কাঠামোটা জল থেকে তুলে রাখাই থাকত। সারা বছর বেঁকেচুরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কাঠামোতে আরো কিছু খড় বেঁধে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিত কুমোর। আমরা বলতাম, ঠাকুরের মেড় বাঁধা হল। এবার আমাদের অপেক্ষার শুরু, কবে প্রথম মাটি লাগবে মেড়-এ। একদিন দুপুরে এসে হাজির হত কুমোরের ছেলে। প্রথম প্রলেপ পড়ত কালী আর শিবের খড়ের শরীরে। তখনও মুণ্ডহীন তারা। তার ক-দিন পর দ্বিতীয় প্রলেপ। সেটা শুকোলে একদিন ফাটল সারাই আর মুখ-হাত-পা লাগানো। পুজোর দিন চার-পাঁচ আগে রঙ। সেও দু-প্রস্থ। সব রঙ হয়ে গেলে আসত এক বাচ্চা ছেলে। দশ-এগারো বছরের হবে হয়তো। শিবঠাকুরের পেটের দু-পাশে পা রেখে দাঁড়িয়ে কালী ঠাকুরের চোখ আঁকত সেই বালক। কী অসাধারণ তার হাত! মাটির প্রতিমা ওর হাতের গুণে যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। তারপর শিবঠাকুরের চোখ আঁকত সে। ঢুলুঢুলু চোখে যেন ঘুম জড়িয়ে আছে। শিবনেত্র! অতটুকু বয়সেই কী পরিণত তার তুলির টান! তবে আমাদের সবচেয়ে উত্তেজনা ছিল শেয়ালের চোখ নিয়ে। এবার কী রঙের মার্বেল বসাবে শেয়ালের চোখে তাই নিয়ে আমাদের উৎকন্ঠার শেষ নেই। কালী পুজো বড়দের। কিন্তু শেয়াল আমাদের, ছোটোদের। বিসর্জনের সময় শেয়ালকে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে পুকুরে ফেলতাম ছোটোরাই।

    কালীপুজোর সন্ধেবেলা পাড়ার সব ছোটোরা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে একগোছা করে পাটকাঠির ডগায় আগুন ধরিয়ে নাড়াতাম আর সুর করে বলতাম, ‘ধারে মশাই ধারে/ আমাদের পাড়ার যত মশা মামারবাড়ি যা রে।’ আমরা ‘ধারে মশাই’ বলতাম, কেউ বলত ‘এঁজোলে পেঁজোলে’। তারপর প্রদীপ দিয়ে বাড়ি সাজানো আর বাজি পোড়ানো। আমার দিদির পটকা ফাটানোয় বেজায় ভয়। সে একটা চকলেট বোম দূরে বসিয়ে রেখে আসত। তারপর একটা লম্বা পাটকাঠির ডগায় আগুন ধরিয়ে প্রায় দশ ফুট দূর থেকে বোমের সলতেতে আগুন লাগানোর চেষ্টা করত। স্বভাবতই সলতে আর আগুনের যথাযত সংযোগ হত না। হয় পাটকাঠি নিবে যেত না হয় সলতে পুড়ে যেত। ‘দুম ফটাশ’ শব্দটা আর হত না। অনেক সময় দিদি চকলেট বোম বসিয়ে আসার পরেই পাড়ার ডানপিটে সমরেশ সেটা তুলে নিয়ে হাতে করেই আগুন লাগিয়ে ফাটিয়ে দিত। আমরা হেসে গড়িয়ে যেতাম। দিদির মুখ কাঁদো কাঁদো।

    কালীপুজোও একদিন শেষ হয়ে যায়। খাঁ খাঁ করে ঠাকুর দালান। স্কুল খুললেই অ্যানুয়াল পরীক্ষা। কেমন যেন বিষণ্ণতা ছেয়ে থাকে চারপাশ জুড়ে। রাতের দিকে একটু গা শিরশির করে। ভোরের দিকে হিম পড়তে শুরু করে। রোববারের সকালগুলোয় আমাদের যা খুশি করার স্বাধীনতা। পুজোর রেশ কাটতে চায় না আমার দাদার। তাই রোববারগুলোয় ওর পছন্দ পুজো-পুজো খেলা। আমাদের পোড়োবাড়ির এদিক-ওদিকে ছড়িয়ে থাকে অনেক পাতলা ইঁট। চারপাশে কারুকাজ করা, চওড়া, টালির মতো। আমার দাদা সেই ইঁটের ওপর কাদা দিয়ে কালী ঠাকুর বানায়। সাকুল্যে ছয় সাত ইঞ্চি লম্বা কালী ঠাকুর। শিবঠাকুর শুয়ে থাকে, তাকে নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু কাঁচা তলতলে শিবের ওপর কালী ঠাকুরকে দাঁড় করানো ভারী মুশকিল। যতবারই কালীকে দাঁড় করাতে চায়, কাঠামো বিহীন কাঁচা কাদার কালী, শিবের পেটের ওপর যেন বসে পড়ে। তারই মধ্যে নারকেল কাঠি দিয়ে দুই ঠাকুরের চোখ-নাক-মুখ এঁকে দেয় দাদা। হাতের কাদা ধুয়ে এবার পুজোর পালা। মা’র রান্নাঘর থেকে যা পায়, তা-ই প্রসাদ। কখনো বাতাসা, কখনো বিস্কুট, আর কিছু না পেলে চকলেট, লজেন্স। পাড়ায় পুজোর ফুলের অভাব নেই। সব শেষে আরতি। পুরোহিতের হাতে ঘন্টা না থাকলে কী আর আরতি জমে! তাই বাঁ হাতে কাল্পনিক ঘণ্টা আর ডান হাতে ফুল নিয়ে আরতি চলে। বাঁ হাতের মুঠো ঘন ঘন নাড়াতে থাকে দাদা, যেন মিছিমিছির ঘণ্টা নাড়াচ্ছে। আর মুখে তৈরি করে ঘণ্টাধ্বনি — নাই নাকু নাই নাকু নাই নাকু...। একটানা বলতে বলতে ঘেমে নেয়ে একশা হয়ে যায় বালক পূজারী। স্নানের বেলা হয়। মা ডাক দেয়। সবাইকে প্রসাদ ভাগ করে দিয়ে ঠাকুর মাথায় নিয়ে ভাসানে যায় দাদা। আমি যাই পিছু পিছু। ইঁট সমেত শিব-কালীর বিসর্জন হয় সামনের পুকুরঘাটে। ফেরার সময় দাদা আরো একটা ইঁট বেছে রাখে পরের সপ্তাহের জন্যে। বিসর্জনের ফিরতি পথেই শুরু হয় আবাহনের প্রস্তুতি। অতএব পুজোর রেশ কিছুতেই ছেড়ে যেতে পারে না আমাদের। সে রেশ আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে পোড়োবাড়ির ইঁট আর কাদা মাটির যুগলবন্দিতে। সঙ্গতে থাকে বালক পুরোহিতের স্বরচিত ঘণ্টাধ্বনি। কান পাতলে আজও দিব্যি শুনতে পাই — নাই নাকু, নাই নাকু, নাই নাকু...।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments