• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | প্রবন্ধ
    Share  
  • জগদীশচন্দ্র বসু, গাছের প্রাণ ও সহজ পাঠ চতুর্থ ভাগ : প্রদীপ পারেখ

      

    জগদীশচন্দ্র বসুর নাম সকলেই জানে। কিন্তু তিনি কী করেছিলেন জিজ্ঞাসা করলে আজও অনেকেই উত্তর দেয়, “গাছের প্রাণ আছে আবিষ্কার করেছিলেন”। কথাটা সত্যি না হলেও বেশির ভাগ সাধারণ মানুষেরই এই ধারণা। কেন এই ধারণা হল, বলা মুশকিল। নির্ঘাত স্কুলে পাঠ্য কোনও কোনও বইতে কথাটা ঢুকে গেছে। বলা বাহুল্য, কথাটা একেবারেই সত্যি নয়। গাছ যে জীবন্ত, সেটা তো আমরা বহুদিন থেকে জানি। হাঁটা-চলা না করতে পারলেও তার জন্ম-মৃত্যু আছে, আছে বেড়ে ওঠা ও বংশবিস্তার। এগুলো কি জীবনের লক্ষণ নয়?

    প্রায় এই কথাটাই কত সহজ করে বলা আছে সহজ পাঠ-এর একটা লেখায়। লিখেছিলেন তেজেশচন্দ্র সেন। ছোটোবেলায় সহজ পাঠ আমরা প্রায় সকলেই পড়েছি। আমাদের ক্ষেত্রে স্কুলে পাঠ্য ছিল সহজ পাঠ প্রথম এবং দ্বিতীয় ভাগ। তারপর এসে গেল ‘কিশলয়’। এর ফলে বহুদিন জানতামই না, সহজ পাঠের তৃতীয় ও চতুর্থ ভাগ আছে। সম্প্রতি সহজ পাঠ চতুর্থ ভাগ হাতে এল আর পড়তে শুরু করলাম। বড়ো হয়ে এই বই পড়ার অনুভূতি অবশ্যই অন্য রকম। যত পড়তে লাগলাম ততই যেন আমার মুগ্ধতা বৃদ্ধি পেতে লাগল। সরল ভাষায় লেখা রচনাগুলি একই সঙ্গে সরস ও সাহিত্যগুণ সম্পন্ন, আকর্ষক এবং কৌতূহল জাগিয়ে তোলে: ছোটোদের জন্যে একেবারে আদর্শ পাঠ-বস্তু।

    সহজ পাঠ ৪-এ রয়েছে ৩১টি লেখা। তার মধ্যে কবিতা (বা গান) ১৩টি, সবগুলোই রবীন্দ্রনাথের। গদ্যের মধ্যে কেবল একটি লেখা (‘গেছোবাবা’) তাঁর, অন্যগুলি লিখেছেন ক্ষিতীশ রায়, তেজেশচন্দ্র সেন, তনয়েন্দ্রনাথ ঘোষ, নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। বইয়ের ১৮টি গদ্যের মধ্যে ৫টি হল বিজ্ঞানের প্রবন্ধ: উদ্ভিদ-রাজ্য, গরম জলে ও গরম হাওয়ায় স্রোত (প্রমথনাথ সেনগুপ্ত), চুম্বকের ব্যবহার (তনয়েন্দ্রনাথ ঘোষ), চাঁদ ও চাঁদের কলঙ্ক (তেজেশচন্দ্র সেন), মাকড়সা (পুণ্যময় সেন)। এছাড়া ‘কুকুর সম্বন্ধে দু-চার কথা’-তেও রয়েছে বিবর্তনবাদের প্রসঙ্গ। প্রতিটি লেখাই ছোটো, ২-৪ পৃষ্ঠার বেশি নয়। কোনো কোনো লেখার সঙ্গে রয়েছে হাতে আঁকা ছবি। বইতে সম্পাদক হিসেবে ক্ষিতীশ রায়ের নাম দেওয়া থাকলেও শিল্পীর নাম উল্লেখ করা নেই, যদিও ছবিতে রেখার টান দেখলে নন্দলাল বসুর কথাই মনে আসে।

    গাছের প্রাণ, প্রাণের লক্ষণ— এইসব কথা কী চমৎকারভাবেই না ফুটে উঠেছে তেজেশচন্দ্র সেন রচিত ‘উদ্ভিদ-রাজ্যে’। লেখাটি আরম্ভ হয়েছে এইভাবে:

    “আমরা যে প্রাণীজগতে বাস করি তার এক ভাগ জন্তুর, এক ভাগ উদ্ভিদের। এদের দুই পৃথক কোঠায় ফেললেও, এক জায়গায় এরা সমান, উভয়েই এরা প্রাণী। উদ্ভিদ চলে না এবং কথা বলে না ব’লে এই সত্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় না, আমরা তাদের জীব পদবী দিতে ভুলে যাই।

    “এ কথা সকলেরই জানা আছে, গাছপালাদের আমাদেরই মতো আহার ক’রে বাঁচতে হয়; খাদ্য জোটাতে না পারলেই তারা মারা পড়ে। ...আলাদা ক’রে ধরলে, জন্তুরা প্রত্যেকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাঁচে, তার পর মরে। কিন্তু, তাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে দিয়ে যে প্রাণধারা ব’য়ে যায় তার আর অন্ত পাওয়া যায় না। গাছপালারাও ফুল-ফল-বীজের সাহায্যে আপন বংশকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, মরতে দিচ্ছে না।”
    ‘প্রাণধারা’: জীবনের সার সত্যটি কী সহজে বলে দেওয়া হল। উদ্ভিদের এই প্রাণধারাই সহজ পাঠ প্রথম ভাগে ধরা দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতায়: “কাল ছিল ডাল খালি, আজ ফুলে যায় ভ’রে।... /গাছের ভিতর থেকে করে ওরা যাওয়া আসা।...” এই যাওয়া আসা তো কেবল ফুলের নয়, অবিরাম বয়ে চলা প্রাণধারার। মানুষ-সহ সব জন্তুরাও তো তাই করে, সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে দিয়ে বংশকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া। ভেবে দেখতে গেলে, সেইজন্যেই জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ড। সেইজন্যেই আমাদের বেঁচে থাকা, প্রাণধারাকে অব্যাহত রাখা।

    তেজেশচন্দ্র সেনের ছোটো লেখাটিতে গাছ সম্বন্ধে রয়েছে আরও কত জরুরি কথা। তিনি লিখছেন, “বাঁচবার ধরনে তফাত দেখি জন্তুর সঙ্গে গাছপালার। বেশির ভাগ জন্তুই চলাফেরা ক’রে আহার সংগ্রহ করে, অধিকাংশ গাছ তা করে না। ডাঙার গাছ দেয় মাটির নীচে শিকড় চালিয়ে।... আশপাশ থেকে অন্য গাছের শিকড় এসে ঠেলাঠেলি করে, আবার আহারের ভাগ নিয়েও পাল্লা দিতে থাকে। কিন্তু, শিকড় সহজে দমতে চায় না। সুবিধে খোঁজবার জন্য আঁকাবাঁকা পথ নেয়,...” ইত্যাদি। কিন্তু শুধু কি শিকড় দিয়েই তার আহার হয়? তা তো নয়। দেখা যাক ‘উদ্ভিদ-রাজ্য’ প্রবন্ধে এর পর কী বলা হচ্ছে।

    “একমাত্র মাটির ভাণ্ডারেই যে গাছের রসদ জমা থাকে তা নয়। গাছ তার প্রধান প্রাণপদার্থ জোগাড় করে হাওয়া থেকে। আর, তার চাই আলো। সেজন্য গাছের ডালে পাতায় কী কাড়াকাড়ি।... গাছের ডাল বা পাতা সর্বদাই ছড়িয়ে পড়তে চায়, চার দিকে যতটা পারে আলো হাওয়া ধরবার জন্যে।”
    তাহলে মাটি থেকে উপাদান নেওয়ার কথা বলা হল, আর বলা হল আলো ও বাতাসের কথা। এবার আসছে সালোকসংশ্লেষ, অর্থাৎ মাটি থেকে নেওয়া জল আর বাতাস থেকে সংগ্রহ করা কার্বন ডাই-অক্সাইড আলোর উপস্থিতিতে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে প্রস্তুত হবে শর্করা, অর্থাৎ খাদ্য। তার জন্য চাই ক্লোরোফিল। এই জিনিসটা কীভাবে বোঝাচ্ছেন তেজেশচন্দ্র?
    “গাছের পাতায় একরকম সবুজ পদার্থ আছে, জন্তুর তা নেই। গাছে ও জন্তুতে এই হল প্রধান তফাত।... গাছের খাদ্য তৈরি হয় গাছের পাতায়। গাছ মাটি থেকে যে খাবার টেনে নেয় সে-সব জিনিস কাঁচা মাল... এই কাঁচা মালকে আলোর সাহায্যে খাদ্যে পরিণত ক’রে দেবার কাজ করে গাছের পাতা। পাতার সবুজ পদার্থ সূর্যকিরণ থেকে শক্তি সঞ্চয় ক’রে খাবার-পরিপাকের সাহায্য করে।”
    সালোকসংশ্লেষ, ক্লোরোফিল বা শর্করা শব্দগুলি উল্লেখ না করেও পুরো প্রক্রিয়াটি বুঝিয়ে দেওয়া হল অত্যন্ত সহজে। প্রবন্ধের শেষে আছে উদ্ভিদের ব্যাপারে পরম সত্যটি: “জীবজগতের প্রাণ রক্ষা করছে উদ্ভিদ। উদ্ভিদ-দেহ থেকেই জন্তু-দেহের পুষ্টি। যে-সব প্রধান মাল-মসলায় জীবদেহ তৈরি তা সবই ছড়িয়ে আছে মাটিতে, হাওয়ায়। তাদের খাদ্যে পরিণত করবার শক্তি কোনো জীবেরই নেই। সে শক্তি একমাত্র আছে উদ্ভিদের।”

    উদ্ভিদ সম্পর্কে এটাই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা। এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কথা। পড়ে কত কিছুই যে মনে হচ্ছিল। ভেবে দেখতে গেলে উদ্ভিদ যেন আমাদের মায়েরই মতো। যেমনভাবে গরুকে ‘মাতা’ ভাবা হয়, সেইরকমই উদ্ভিদও মাতা। তিনি ঠায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করে খাদ্য প্রস্তুত করেন, তাই খেয়ে বেঁচে আছেন আমাদের গো-মাতারা, তাই খেয়ে বেঁচে আছি আমরাও। কেবল তাই নয়, বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে সেটা থেকে খাবার বানানোর সময়ে বৃক্ষ-মাতা বাতাসে ছেড়ে দিচ্ছেন অক্সিজেন, আমাদের সবার প্রাণগ্রহণের জন্য সবচেয়ে দরকারি জিনিসটি।

    এই সত্যটা মনে রাখলে সমগ্র উদ্ভিদ জগৎকে আমরা আরও বেশি সম্মান করতে বাধ্য হব। অনেকগুলো কংক্রিটের বাড়ি বানাতে হবে বলে নির্দ্বিধায় রাশি রাশি বৃক্ষ নিধন করার আগে অনেকবার ভাবতে হবে। একটি গাছ, একটি প্রাণ। এবং কেমন সে প্রাণ? যে কেবল নিজের সন্তান-সন্ততিদের সৃষ্টি ও পুষ্টি ছাড়াও সৃষ্টি করতে পারে মহা মূল্যবান আরো কিছু, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে জন্তু জানোয়ার, পোকামাকড়, মানুষ— সব্বাই।

    আর জগদীশচন্দ্র কী করেছিলেন গাছ নিয়ে?

    মাথা খাটিয়ে নানারকম যন্ত্র বানিয়ে জগদীশচন্দ্র বসুই প্রথম প্রমাণ করেন যে জীবজন্তুর মতো উদ্ভিদেরও আছে যন্ত্রণার বোধ, অর্থাৎ তারা ‘চেতনা-সম্পন্ন’। প্রাণীজগতে উদ্ভিদকে আমরা যতটা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখি তারা তার চাইতে আরও অনেক বেশি গুরুত্ব ও সহমর্মিতার যোগ্য। গাছ যে কেবল একটা ‘নির্জীব আড়ষ্ট’ জিনিস নয়, এ কথাটা আমরা জানতে পেরেছি জগদীশচন্দ্রের কাজের দৌলতেই।

    *

    সহজ পাঠ চতুর্থ ভাগে বিজ্ঞান বিষয়ক অন্যান্য যে প্রবন্ধগুলি আছে, সেগুলিরও বৈশিষ্ট্য হল সহজ ভাষায় স্বল্প পরিসরে বিষয়টির মূল ভাব ধরিয়ে দেওয়া। ‘গরম জল ও গরম হাওয়ায় স্রোত’ প্রবন্ধে জল গরম করলে গরম জল উপরে উঠে আসা ও ঠাণ্ডা জল নীচে নেমে যাওয়ার নিদর্শন থেকে শুরু করে বাতাসের ক্ষেত্রে কী হয় বলা হয়েছে, সেই প্রসঙ্গেই বলা হয়েছে ঝড়-তুফান-সাইক্লোনের কথা। এই প্রবন্ধের আকার মাত্র ৩৫০ শব্দের কাছাকাছি, ভাবা যায়? তেমনই ‘চুম্বকের ব্যবহার’ লেখাটিতে রয়েছে ইলেকট্রোম্যাগনেটের কথা, কীভাবে নানা ক্ষেত্রে তা মানুষের কাজে লাগছে সে-সব কথা। ‘মাকড়সা’ প্রবন্ধে তাদের শরীরের গড়ন, খোলস ছাড়া, পুরুষ ও স্ত্রী-মাকড়সা, জাল বোনা ও শিকার ধরার কথা তো বলা হয়েছেই, নানা প্রকারের মাকড়সার কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— যারা জালে ইঁদুর ধরে খায়, যারা জাল বোনে না, লাফিয়ে পড়ে শিকার ধরে, কিংবা জলচর মাকড়সা। এসবের মধ্যে সন্তর্পণে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, “মাকড়সার আর-এক নাম ঊর্ণনাভ, অর্থাৎ এদের নাভিতে নাকি সুতো থাকে। মাকড়সার নাভি নেই, তবে এদের পেটের তলাতেই জাল বোনার যন্ত্র থাকে”।

    আবার মনে হল, সার্থক এই নাম— সহজ পাঠ। পড়তে সহজ, বুঝতে সহজ। চতুর্থ ভাগ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে ৭৫ বছর আগে— পৌষ ১৩৪৭। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা নতুন নতুন অনেক কিছু জানতে পারি, জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়। তবে সহজ পাঠ-এ দেওয়া বিজ্ঞান সম্পর্কিত লেখাগুলোর মূল কথা যে এখনও পালটে যায়নি, সেটাও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

    পাঠকেরা আবার একবার সহজ পাঠ: ৪ পড়ে দেখতে পারেন। কীভাবে সহজ ভাষায়, সরল ভঙ্গিতে জ্ঞানের কথা লেখা যায়, তারও পাঠ নিতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments