



সারা ভারতবর্ষ জুড়ে তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঢেউ। সত্তরের দশককে মুক্তির দশক করে তোলার গভীর প্রত্যয়ে বাংলার যুবক-যুবতীরা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। এইরকম একটি বারুদের গন্ধেভরা সময়ে ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় শিল্পী সংসদ প্রযোজিত ও উত্তমকুমার পরিচালিত ‘বনপলাশির পদাবলী’। উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশ ১৯৬২ সালে। লেখক রমাপদ চৌধুরী এই উপন্যাস প্রসঙ্গে জানিয়েছেন: ‘এ উপন্যাসে আমি শুধু গ্রামজীবনকে উপস্থিত করতে চাইনি। চেয়েছিলাম স্বাধীনতা পরবর্তীকালের গ্রামজীবনের পরিবর্তিত ছবিকে পুরনো দিনের পটভূমির ওপর গড়ে তুলতে। অট্টামা সেই প্রাচীনতার পরাধীনতার, কুসংস্কারের প্রতীক; গিরিজাপ্রসাদ তথাকথিত সাফল্যের ও স্বাধীনতার ব্যর্থতায় মোড়া একটি জীবন, স্বার্থ ক্ষুদ্রতা ও অকৃতজ্ঞতার ভিতর থেকে উঠে আসা গ্রামের প্রাণস্পন্দন মোহনপুরের বউ, বহির্বিশ্বের হাতছানি উদাসের মধ্যে। উপন্যাসের চিত্রকাল প্রায় ষাট-সত্তর বছর, যদিও ঘটনাকাল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত।’ এই উপন্যাস পড়ে মুগ্ধতার কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন পদাবলী সাহিত্যের অনন্য পণ্ডিত শ্রদ্ধেয় হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ গ্রন্থে এই উপন্যাসের দীর্ঘ আলোচনা করেন।
রমাপদ চৌধুরী আরো লিখেছেন:
‘বনপলাশির পদাবলী’ উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করতে দেওয়ার আদৌ কোনও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু শেষঅবধি পরাস্ত হতে হয়েছিল সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অতি বিনয়ী, অতি ভদ্র এবং অতি সজ্জন সেই কিংবদন্তীতুল্য মানুষটির কাছে, যাঁর নাম উত্তমকুমার। দীর্ঘ সাত বছর ধরে তিনি আমার মত পাল্টানোর চেষ্টায় অক্লান্ত ছিলেন। সে কৌতুককর কাহিনি প্রসঙ্গান্তরে বলা যাবে। লভ্যাংশ দুঃস্থ শিল্পীদের সেবায় নিয়োজিত করার সদিচ্ছা জানিয়ে তিনি নিজেই পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সেই প্রথম। ছবিটিকে তিনি দুরন্ত জনপ্রিয় করতে চেয়েছিলেন এবং তা পেরেছিলেন। তাঁর মুখে সাফল্যের সেই উজ্জ্বল আনন্দ দেখে বিন্দুমাত্র অনুযোগ করতে ইচ্ছে হয়নি। একটি ভাল ছবি করার জন্য তাঁর নিষ্ঠার কোনও অভাব ছিল না। উপন্যাসটি লেখার পিছনে আমারই কি কোনো নিষ্ঠার অভাব ছিল!উত্তমকুমার পরিচালিত ‘বনপলাশির পদাবলী’ চলচ্চিত্রের আলোচনার মুখবন্ধ হিসেবে এইটুকু তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি।
ম্যাটিনি আইডল হিসেবে স্বীকৃত উত্তমকুমারের ‘নায়ক’ (সত্যজিৎ রায় পরিচালিত, ১৯৬৬) চলচ্চিত্রে অভিনয় তাঁর শিল্পীজীবনের একটি ব্রাহ্মমুহূর্ত। কেননা সত্যজিৎ রায় তাঁর অভিনয় প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন: ‘উত্তমের অভিনয় দেখে আমি অকপটে বলতে পারি যে, তাঁর অভিনয়ের মধ্যে একটিও ত্রুটি খুঁজে পাইনি।’
তাঁর অকালপ্রয়াণের পরে Sunday পত্রিকায় (3rd August 1980) সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন: ‘Uttam was certainly a star in the true Hollywood sense of the term. The question was: was he also an actor?
This is a moot question. There is at least one known instance in Hollywood of an actor with no acting abilities whatever who was propelled into stardom on the strength of the fan mail received after his first film opened. This was Gregory Peck, who remain to this day, I am told, an actor ‘who needs handling’. But Uttam, even in the most inconsequential of pasts, excluded confidence which Peck never did. (Deep Focus, Satyajit Ray, Harper Collins Publishers India, 2011) অধোরেখ এই লাইনটি বিশেষভাবে স্মরণীয়।
উপন্যাসকে অনুসরণ করে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন উত্তমকুমার। ছবি শেষ হবার পর রমাপদ চৌধুরী ও আরো অনেকে প্রথম ছবিটি দেখতে যান। উত্তমকুমারের ভাবনা ছিল ‘গান উইথ দি উইন্ড’ ছবির মতো দুটো পার্টে ছবিটি দেখাবেন। আপত্তি জানিয়েছিলেন রমাপদ চৌধুরী। পরে সম্পাদনা করে প্রস্তুত হয় ছবিটি।
মনে রাখা প্রয়োজন যে ‘বনপলাশির পদাবলী’ যখন মুক্তি পায় (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩) তখন সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৭০), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩)। মৃণাল সেনের ইন্টারভিউ (১৯৭০), এক আধুরি কাহানি (১৯৭১), কলকাতা-৭১ (১৯৭২), পদাতিক (১৯৭৩), পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘স্ত্রীর পত্র’ (১৯৭৩) মুক্তি পাচ্ছে। পাশাপাশি উত্তমকুমারের নিজের ছবি মুক্তি পাচ্ছে— ১৯৭০-এ ‘মঞ্জরী অপেরা’, ‘দুটি মন’, ‘নিশিপদ্ম’, ১৯৭১-এ ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘ধন্যিমেয়ে’, ‘ছদ্মবেশী’; ১৯৭২-এ ‘স্ত্রী’ ‘মেমসাহেব’। আর ১৯৭৩-এ ‘বনপলাশির পদাবলী’র পাশাপাশি মুক্তি পাচ্ছে ‘কায়াহীনের কাহিনী’, ‘রাতের রজনীগন্ধা’, ‘সোনার খাঁচা’, ‘রৌদ্রছায়া’। অর্থাৎ পরিচালক উত্তমকুমার আর অভিনেতা উত্তমকুমারের মধ্যে এক নীরব অন্তঃশায়ী প্রতিযোগিতার মধ্যে মুক্তি পায় ‘বনপলাশির পদাবলী’।
উপন্যাসের কাহিনি বিন্যাসের সূত্র ধরেই শুরু হয় ‘বনপলাশির পদাবলী’-র চলচ্চিত্রায়ন। বনপলাশির ছেলে গিরিজাপ্রসাদ শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর গ্রামে ফিরে আসছেন এই বার্তার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় এই চলচ্চিত্র। গ্রামের বাড়িতে এখন থাকেন গিরিজাপ্রসাদের ভাই গিরীন, তাঁর স্ত্রী (যাকে মোহনপুরের বউ বলা হয়) এবং একমাত্র মেয়ে টিয়া।
গ্রামে পৌঁছেই গিরিজাপ্রসাদ অট্টামার কাছে দেখা করতে যান। এই অট্টামা চরিত্রটি বিষয়ে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন: ‘এই ধূসর মধ্যবিত্ততার মধ্যে যে কয়েকটি ব্যতিক্রমস্থানীয় চরিত্র আছে, তাহারাই বনপলাশির জীবনে স্বাতন্ত্র্য আনিয়াছে ও উহার ইতিহাস-রচনার প্রেরণা দিয়াছে। ইহাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বৃদ্ধা অট্টামা। সে গ্রামের পূর্ব গৌরবের স্মৃতিকাহিনি ও নিজেও অতীতের শেষ স্মৃতিচিহ্ন।’ বলা বাহুল্য উত্তমকুমার পরিচালক হিসেবে উপন্যাসের এই মূল ভরকেন্দ্রটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাই অট্টামার পাকা কেশরাশি আর উজ্জ্বল ঘষা কাচের চশমার ওপর ফ্ল্যাশব্যাক করার সময় চলচ্চিত্রভাষার পারঙ্গমতার দৃষ্টান্ত রাখেন উত্তমকুমার। অট্টামা চরিত্রের অভিনেত্রী মলিনা দেবীর মুখের ওপর ক্যামেরা মাস্ক-শট-এ স্থির করে অতীতের কাহিনিতে ফিরে যান। ছবির শুরুতেই চলচ্চিত্র ভাষার আধুনিক আঙ্গিকের সযত্ন ব্যবহার আমাদের আশান্বিত করে তোলে।
অট্টামার সূত্র ধরে বনপলাশির পুরনো ইতিহাসের মুখোমুখি হই আমরা। যৌবনে পরমাসুন্দরী অট্টামার সঙ্গে গিরিজাপ্রসাদের গভীর সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়। এই সূত্র ধরে উঠে আসে এক সামাজিক ইতিহাস। বনপলাশিতে প্রচারিত ছিল অট্টামার স্বামী আছেন; তিনি তাঁকে ঘরে স্থান দেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে জানা যায় সেই করুণ ইতিহাস, যেখানে সংস্কার আর নীতিবোধের এক সামাজিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হই আমরা।
অট্টামার স্বামী ব্রজমোহন ভট্টাচার্য। তিনি কলকাতায় থাকেন এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন। কারণ জানে না গ্রামের মানুষ। চলচ্চিত্রে এই অংশটির বয়ান অত্যন্ত সুগঠিত এবং পরিমিত পরিসরে চলচ্চিত্রভাষার আধুনিক প্রয়োগ অবশ্যই তৃপ্তিকর। ধীরে ধীরে বালক গিরিজা জানতে পারে অট্টামার স্বামীর নাম। অট্টামা তাকে দিয়ে চিঠি পাঠায়। এই বিশেষ অধ্যায়টি উত্তমকুমার-কৃত চিত্রনাট্যে চমৎকারভাবে উপস্থাপিত। ব্রজমোহনের দাদা কালীমোহন ব্রজমোহনের স্ত্রী (অট্টামা) থাকা সত্ত্বেও আরো একটি বিবাহের আয়োজন করেন। ব্রজমোহন অস্বীকার করেন। তিনি কলকাতায় ফিরে যান এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। চলচ্চিত্রে একটি দৃশ্য আছে ব্রজমোহন এসেছেন স্ত্রীকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে কিন্তু বিধর্মী স্বামীর কাছে তিনি যেতে পারলেন না। সংস্কারের বেড়ি তাকে ঘিরে ধরল। তিনি শেষ পর্যন্ত পারলেন না।
গিরিজাপ্রসাদ বুঝতে পারতেন না কেন অট্টামা তাঁকে বারবার শুধু একটি অনুরোধই করে যান: তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহটি যেন তাঁর স্বামীর পাশে গোর (সমাধিস্থ) দেওয়া হয়। পরিচালক উত্তমকুমার উপন্যাসের মতো চলচ্চিত্রেও এই অট্টামা চরিত্রটিকে এক শৈল্পিক বিভায় আবৃত করে দিয়েছেন।
‘বনপলাশির পদাবলী’ উপন্যাসের সূচনায় রমাপদ চৌধুরীর একটি ছোট্ট স্বীকারোক্তি আছে:
...ছেঁটেকেটে বনপলাশিকে বৃত্তের পরিধিতে হয়তো ধরা যায়, কিন্তু তখন আর সেই মানুষ ও মৃত্তিকার উদ্বেলিত নিসর্গ থাকে না, তা সাজানো বাগানে পরিণত হয় মাত্র। অথচ আমার স্থির বিশ্বাস, বনপলাশি তা নয়,—জীবনের মতোই যতি আছে হয়তো সেখানে, কিন্তু বিরতি—সে কখনো নয়। বনপলাশি তাই শাস্ত্রীয় উপন্যাস না হয়ে শেষপর্যন্ত লৌকিক জীবনের অনন্ত রহস্য নিয়ে—বনপলাশির পদাবলীই রয়ে গেল।লেখকের এই শেষ উক্তিটিকে নির্ভর করে উপন্যাসটির চলচ্চিত্রভাষ্য নির্মাণে প্রয়াসী হয়েছিলেন উত্তমকুমার। চিত্রনাট্যের প্রস্তুতিপর্বে বারবার আলোচনা করেছেন লেখকের সঙ্গে। আর সেই কারণেই হয়তো উপন্যাসের কাহিনি বলয়কে চলচ্চিত্রের ভাষ্যে ধরতে চান উত্তমকুমার। তিনি পরিকল্পনা করেন গান উইথ দি উইন্ড * ছবিটির মতো দুটি পর্বে ‘বনপলাশির পদাবলী’ দেখাবেন। শেষপর্যন্ত তা হয়নি। সম্পাদনা করে ১৫ রিলের ছবি রিলিজ করেন। শুরু থেকে যে পারিপাট্য লক্ষ করা যায়, ক্রমশ তা জনপ্রিয় ছবির পরিচিত ফর্মূলায় প্রবেশ করে। অথচ শুরু থেকে প্রতিটি শট ডিভিশনের নেপথ্যে উত্তমকুমারের সৃজনীবিভা টের পাওয়া যায়। সাদা-কালো ফটোগ্রাফির ভিতরে যে নান্দনিকতা তার পূর্ণ ব্যবহার করেন উত্তমকুমার ডিপ ক্লোজ আপ, ক্লোজ আপ আর মিড ক্লোজ আপের নান্দনিকতায়। মাধবী মুখোপাধ্যায়, বিকাশ রায় ও অনিল চট্টোপাধ্যায়ের পরিশীলিত সংলাপে টের পাওয়া যায় নেপথ্যের কারিগরকে।
‘বনপলাশির পদাবলী’-তে অনেকগুলি সম্পর্কের বৃত্ত আছে। কিন্তু কেন্দ্রে আছেন গিরিজাপ্রসাদ। এই উপন্যাস আসলে গিরিজাপ্রসাদের বনপলাশিতে আসা, তার স্বপ্নভঙ্গ ও শহরে প্রত্যাবর্তন করার পথরেখা ধরে এগিয়েছে। ঠিক এরই পাশাপাশি রয়েছে উদাসের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, গ্রামজীবন থেকে মুক্তি পাবার আকুতি ও তার ভালোবাসার পিছুটান—পদ্মকে না পাওয়ার হতাশা, যন্ত্রণা। প্রায় সমান্তরালে কথিত হয় গ্রামের উন্নতির স্বপ্নে বিভোর ডাক্তার অবিনাশের কথাও। গিরিজাপ্রসাদকে সবার আগে তিনি স্কুল নির্মাণের জন্য পাঁচশো টাকা দেবার কথা বলেন। রমাপদ চৌধুরীর এই উপন্যাস যেন বনপলাশির কৌমসমাজের কথা বলে। এরই মাঝে উঠে আসে বিডিও প্রভাকর আর গিরিজাপ্রসাদের বড়ো মেয়ে বিমলার নিষ্পাপ প্রণয়ের কাহিনি। একইসঙ্গে বৈষয়িক চিন্তাভাবনায় পারঙ্গম গিরীনও ওই সুপাত্র প্রভাকরকে হারাতে চান না। তিনি তাঁর মেয়ে টিয়ার সঙ্গে দশ হাজার টাকার বরপণে রাজি হয়ে প্রভাকরের বিবাহ পাকা করে ফেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মোহনপুরের বউ জানতে পারেন প্রভাকরের সঙ্গে বিমলার ভালোবাসার কথা। মোহনপুরের বউ, সারাজীবন যিনি সংসারে মাথা নিচু করে জীবনযাপন করেছেন, আজ তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন। মাধবী মুখোপাধ্যায় পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘স্ত্রীর পত্র’-এর মৃণালের মতো প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। এই পর্বে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য ক্লোজ আপের ব্যবহার স্মরণীয়।
কিন্তু চলচ্চিত্রে উদাস-পদ্মর কাহিনির সূচনা হওয়ার পর থেকেই বনপলাশির কাহিনি উদাস-পদ্মর প্রণয়ের টানাপোড়েনে আস্তীর্ণ হয়ে যায়। চলচ্চিত্রের প্রথমদিকে উদাসের পর্দায় আবির্ভাবপর্বে শ্যামল মিত্রের ‘আমার মনটা টানে’ গানটি বা ব্রজমোহনের বনপলাশিতে ফিরে আসার মুহূর্তে ‘বহুদিন পরে ভ্রমর’ (উৎপলা সেন) বা ব্রজমোহন প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে ‘আমার এ পথ’ (দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় গীত রবীন্দ্রসঙ্গীত) গানের শিল্পিত ব্যবহার পরিচালকের রুচি ও পরিমিতির সাক্ষ্য দেয়। ওই গানেরই অংশ ‘আমার ফুলে আর আর কি কবে’ ওভারল্যাপ করে গিরিজাপ্রসাদকে দেখা যায়। পদ্ম আর উদাসের যখন প্রথম দেখা হচ্ছে চলচ্চিত্রে, তখন শ্যামল মিত্রের ‘আহা মরি মরি’ গানটি আবহসঙ্গীতে বেজে ওঠে। এই ব্যবহার অত্যন্ত শিল্পিত ও সুচিন্তিত। পরে গানটি উদাসের কণ্ঠে শোনা যায়। কিন্তু ‘দেখুক পাড়া পড়শিতে’ গানটি আলাদাভাবে শুনতে ভালো লাগলেও চলচ্চিত্রে তার উপস্থাপনা অনেকটাই স্খলিত মনে হয়। আবার শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে ‘ভোলা মন, মনের কথা’ গানের অনুষঙ্গে আলো-ছায়ার ভিতরে ক্লোজ আপের ব্যবহার মনে পড়িয়ে দেয় প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ইঙ্গমার বার্গম্যানের কথা। বার্গম্যান একটি লেখায় বলেছেন, ‘একটি ফিল্মের প্রতিটি ফ্রেমের প্রতিফলন এবং পরবর্তীটির প্রতিফলনের মধ্যবর্তী যে সময়টি সেটি কিন্তু ঘন গভীর অন্ধকার অর্থাৎ এই মধ্যবর্তী সময় কোনো রূপকেই ধরে না। আবার পরবর্তী ফ্রেমটির প্রতিফলন পর্দায় পড়লে দর্শক আলোয় ফিরে আসেন।’ (চলচ্চিত্র ও তার নির্মাণ) মনে রাখা প্রয়োজন উত্তমকুমার বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করলেও নিয়মিত বিদেশি ছবি দেখতেন, চর্চা করতেন। কিন্তু পরিচালক হিসেবে তাঁর ভাবনার কথা তিনি লিখে যেতে পারেননি। তবে এই ছবির চিত্রগ্রাহক কানাই দে-র বাঙ্ময় চিত্রগ্রহণের কথা অবশ্যই বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে।
‘বনপলাশির পদাবলী’ চলচ্চিত্রে যে-মুহূর্ত থেকে পদ্ম আর উদাসের টানাপোড়েন মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে সেই মুহূর্তেই বনপলাশির বহুমাত্রিকতা উত্তমকুমার-সুপ্রিয়া দেবী অভিনীত যে-কোনো বাণিজ্যিক ছবির মতো হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত উদাসের হাতে পদ্মর মৃত্যু এবং উদাসের ফাঁসি হওয়ার অন্তিম মুহূর্তে এই ছবির বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়। যদিও সতেরো সপ্তাহ চলেছিল এই ছবি। কিন্তু শেষপর্যন্ত পরিচালক উত্তমকুমার তাঁর শিল্পচেতনা, নান্দনিকতা, রুচিবোধের সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে বাণিজ্যিক ছবির সহজ পথকেই নির্বাচন করে নিতে হয়তো বাধ্য হয়েছিলেন। বিকাশ রায়, নির্মলকুমার, মলিনা দেবী, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, স্বপনকুমার, জহর রায়, প্রমুখের এবং অবশ্যই উত্তমকুমার ও সুপ্রিয়াদেবীর অভিনয় সমৃদ্ধ হয়েও ‘বনপলাশির পদাবলী’ পরিচালক উত্তমকুমারের এক সম্ভাবনাময় উত্তরণের আখ্যান হয়ে রইলো।
________________________
*গান উইথ দি উইন্ড: মার্গারেট মিচেলের মহাকাব্যিক উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৯-এ নির্মিত একটি আমেরিকান মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র। পরিচালক ভিক্টর ফ্লেমিং।