



তিনি বাংলার এই ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেননি, জন্মসূত্রেও বাঙালি নন, কিন্তু তবুও তিনি বাংলা সংগীতজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ সংগীতশিল্পী যাঁর নাম বাংলা গানের আলোচনায় অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। তিনি শুধু গায়ক নন, পাশাপাশি গীতিকার-কবি-সুরকার-সাংবাদিক-চলচ্চিত্র পরিচালক-সম্পাদক-গবেষক-গদ্যকার-শিক্ষাবিদ। তিনি ‘The Bard of Bramhaputra’, ‘সুধাকণ্ঠ’ ভূপেন হাজারিকা (৮ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬ - ৫ নভেম্বর, ২০১১)। তাঁর জন্ম পরাধীন ভারতের উজানি অসমের তিনসুকিয়া জেলার শদিয়া নামের ছোটো এক মহকুমা শহরে। জন্ম থেকেই কানে এসেছে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রধান শাখা লুইতের জলস্রোতের শব্দ, পাশাপাশি সেই গহন অরণ্যের ছায়াবৃত্তে, নানা জাতির পাখির ডাক, উদার প্রকৃতি তার নানা সুরের সিম্ফনি পৌঁছে দিয়েছে তাঁর সাংগীতিক সত্তার গভীরে।
খুব শৈশবে মাত্র ন-মাস বয়সে তিনি একবার হারিয়ে গিয়েছিলেন এবং শদিয়া অঞ্চলে উপজাতি শ্রেণির মানুষদের বাড়িতে ছিলেন শুধু নয়, সেখানে রমণীদের স্তন্য পান করে দিন কেটেছিল তাঁর। তাই হয়তো খুব ছোটো থেকেই তিনি সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতির মানুষকে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শুধু মানুষ বলেই ভেবেছেন। তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন মানবতাবাদী এবং নিজের জীবন ও কর্মে আমৃত্যু সেই বিশ্বাসে অটল থেকেছেন। তাঁর বাবা নীলকান্ত হাজারিকা ছিলেন শিক্ষক এবং তাঁর ছিল বদলির চাকরি। তাই ভূপেন শিশুকাল থেকেই ‘যাযাবর’। প্রথমে শদিয়া, তারপর ধুবড়ি সরকারি হাই স্কুল, জোড়হাট হাই স্কুল, তেজপুর হাই স্কুল এবং অবশেষে গুয়াহাটির কটন কলেজিয়েট স্কুলে ছাত্র হিসেবে তাঁর স্থিতি। শৈশব থেকেই তিনি পড়াশোনায় মনোযোগী এবং মেধাবী ছাত্র হিসেবে শিক্ষকপ্রিয় ছিলেন। ছোটোবেলা থেকে মা শান্তিপ্রিয়া দেবীর গলায় ঘুমপাড়ানি গান তাঁর ভিতরে সুরের বীজ বপন করেছিল, শান্তিপ্রিয়া খুব ভালো আধুনিক গানও গাইতেন। তাঁর বাপের বাড়িতে ‘বরগীত’-এর চর্চা ছিল। শান্তিপ্রিয়ার এক ভাই অনাথবন্ধু ভালো সেতার ও তবলা বাজাতে পারতেন যদিও তিনি ভূপেনের জন্মের আগেই মারা যান। তাঁর ব্যবহৃত নানা বাদ্যযন্ত্র ছোটোবেলায় ভূপেন পেয়ে যান। এই সাংগীতিক পরিমণ্ডল তাঁকে সারাজীবন সুরের খেয়ার যাত্রী করেছে যার সুদূরপ্রসারী ফল উত্তরকালে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন জনপ্রিয় বিশিষ্ট সুরকার ও গায়ক হিসেবে।
ওইটুকু বয়সে তাঁর জীবনে আরও অনেক কিছু আশ্চর্য ঘটনা অপেক্ষা করছিল। তেজপুরে থাকাকালীন ১৯৩৬ সাল নাগাদ তাঁদের বাড়িতে এলেন অসম সাংস্কৃতিক জগতের তিন পুরোধা ব্যক্তিত্ব-- জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা ও ফণী শর্মা। উদ্দেশ্য দশ বছর বয়সী ভূপেনকে দিয়ে গান রেকর্ড করানো। তাঁরা ভূপেনকে কলকাতায় অরোরা স্টুডিয়োতে নিয়ে এলেন অসমীয়া ছবি ‘জয়মতী’ ও ‘শোণিত কুঁঅরি’ নামে দুটি ছায়াছবির গান রেকর্ড করার জন্য। গীতিকার ও সুরকার বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার কথায় ও সুরে তিনি দুটি গান রেকর্ড করেন— ‘উলাহতে নাচি বাগি হলি বেয়াকুল’ এবং ‘কাষতে কলসী লৈ যায়’। রেকর্ডের কভারে লেখা হয়েছিল ‘ভারতীয় রেকর্ড সংগীতের কনিষ্ঠতম শিল্পী’। সেই সময় বিষ্ণুপ্রসাদ তাঁকে দিয়ে একটি গজলও রেকর্ড করান ‘আঁজলি হিয়ার মাঝে বিজুলি বাণ মারে।’ এছাড়াও সংগীতজীবনের শুরুতে তিনি অসমীয়া সংগীতজগতের কয়েকজন প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের— গীতিকার আনন্দীরাম দাস, পার্বতীপ্রসাদ বরুয়া, কমলানন্দ ভট্টাচার্য প্রমুখের সান্নিধ্যে এসেছিলেন।
ছোটোবেলা থেকে তাঁর পারিবারিক সূত্রে অসমের বিখ্যাত বরগীতের সঙ্গে পরিচয় তো ঘটেই ছিল, এইসব গুণীজনদের মাধ্যমে তিনি পরিচিত হলেন গোয়ালপাড়ার গান, চা বাগিচার শ্রমিকদের গান, বিহুগীত-সহ নানা লোকগীতের সঙ্গে। তবে শুরুরও শুরু থাকে তেমন একটি ঘটনার উল্লেখ না করলে নয়,--৩০ অক্টোবর, ১৯৩০ অসমের গুয়াহাটির কটন কলেজিয়েট স্কুলে ছাত্রদের বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত আধুনিক অসমীয়া সাহিত্যের অন্যতম লেখক লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়ার সামনে সেই স্কুলের শিক্ষক নীলকান্ত হাজারিকার চার বছর বয়সি ছোট্ট ছেলে ভূপেন ধুতি আর কুর্তা পরে একটি টেবিলের উপর উঠে গান গেয়ে উপস্থিত সকল শ্রোতাদের মুগ্ধ করে দেন। এই ঘটনা লক্ষ্মীনাথকেও এতখানি মুগ্ধ করেছিল যে তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘মোর জীবন সোঁয়রণ’ গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
শুধু গান গাওয়া নয়, ভূপেন সত্যিসত্যিই ছিলেন এক বিস্ময়বালক! সেই তিনি ছোটো ভাই অমরকে সঙ্গী করে কাবুলিওয়ালাদের কাছে শেখা একটি গান ‘আগানিমা উল্লাহা’ গেয়ে সকলের মন জয় করে নেন। এই গানের মধ্য দিয়ে হয়তো তাঁর মনে আন্তর্জাতিকতার এক বোধের জন্ম হয়েছিল যা তাঁকে জীবনের পরবর্তী সময়ে বারবার ছুটিয়ে নিয়ে গেছে নানা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন সুরের সন্ধানে। এক অর্থে সত্যিই তাঁকে ’পৃথিবী আপন করেছে ’আর ‘ভুলেছেন নিজের ঘর’।
জীবনে দুজন মানুষের প্রভাব সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন : ‘জ্যোতিপ্রসাদ এবং বিষ্ণুপ্রসাদের আকাশচুম্বী ভাবনা সুউচ্চ পাহাড়ের মতো। ভিত্তি তাঁদের মাটির মানুষ, তাঁদের পা জনতার মাঝখানে। তাঁদের উন্নত শির এবং প্রশস্ত বক্ষে কল্পনার আকাশে মেঘেরা স্পন্দিত হয়। বয়স দশ বছর হলেও এই দুজন বড়ো মনের মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে অনেক কথা উপলব্ধি করেছিলাম। ধীরে ধীরে কৈশোর থেকে যৌবনে এলাম। তাঁদের সান্নিধ্যের প্রভাবেই আমি মানুষের কথা ভাবতে শিখেছি।’ জ্যোতিপ্রসাদ ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর আগে ১৯৩২ সালে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের কারণে ১৫ মাস কারান্তরালে ছিলেন। অফুরন্ত প্রাণশক্তি ছিল তাঁর। লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়ার কাহিনি অবলম্বনে ১৯৩৫ সালে প্রথম অসমীয়া সবাক ছবি ‘জয়মতী’ সাফল্যলাভ না করায় সেই ক্ষতি পূরণ করার জন্য দ্বিতীয় ছবি ‘ইন্দ্রমালতী’ ছবি নির্মাণে তিনি উদ্যোগী হলে ভূপেন তাতে অভিনয় করেন। বাবা নীলকান্ত হাজারিকার লেখা ‘অ মই না কেতিয়া আহিলি তই’ গানটিতে শুধু সুর দেওয়া নয়, পাশাপাশি জ্যোতিপ্রসাদের লেখা ও সুরারোপিত ‘বিশ্ববিজয়ী ন-জোয়ান’ গানটিও গেয়েছিলেন। ১২/১৩ বছরের বয়সি কিশোরের গাওয়া এই বিদ্রোহের গানটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এই সময় তিনি প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে আরো অনেক সাংগীতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত হন, যেমন আনন্দীরাম দাস, পার্বতী বড়ুয়া, কমলানন্দ ভট্টাচার্য প্রমুখ। পরবর্তী কালে ভূপেনের গানে এঁদের সকলেরই পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে।
খুব ছোটো বয়সে মায়ের কাছে ভূপেন অসমীয়া বরগীতের মতো ধর্মীয় সংগীতের চর্চাই বেশি করতেন। অসমে নব্য বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীমন্ত শঙ্করদেব ও শ্রীমাধবদেব রচিত আধ্যাত্মিক ভাবধারা আশ্রিত শ্রীকৃষ্ণের বন্দনাগান হল বরগীত। ভূপেনও মাত্র এগারো বছর বয়সে একটি বরগীত রচনা করেছিলেন ‘কুসুম্বর পুত্র শ্রীশঙ্কর গুরুয়ে/ধরিছিল নামরে তান’। এরপর তেরো বছর বয়সে তিনি লিখলেন জীবনের দ্বিতীয় গান ‘অগ্নি যুগর ফিরিঙতি মই’। অবাক হতে হয় এই কথা ভেবে যে, এই গানে ওইটুকু এক কিশোর তাঁর রচনায় সম্পূর্ণ পৃথিবী জুড়ে সমাজে সাম্যের প্রতিষ্ঠা কামনা করছেন, বলছেন সর্বহারাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। পরবর্তী জীবনের সিংহভাগ তিনি যে দর্শনে বিশ্বাস করেছেন তার বীজরোপণ ঘটেছিল যেন এই গানে: ‘… সর্বহারার সর্বস্ব /পুনর ফিরাই আনিম/নতুন ভারত গড়িম।’ — ‘অগ্নিযুগের এক স্ফুলিঙ্গ আমি/নতুন ভারত গড়ব’ —এমন শপথের বাণী শোনা গিয়েছিল। পরে বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা যখন তাঁর ‘মুক্তি দেউল’ নামে গীতিসংকলন প্রকাশ করেছিলন সেখানে এই গানটিকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
ছাত্র হিসেবে উজ্জ্বল ভূপেন ১৯৪০ সালে তেজপুর সরকারি হাই স্কুল থেকে যখন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন তখন তাঁর প্রকৃত বয়স ১৩ বছর ৯ মাস হওয়ায় বাবা নীলকান্ত বাড়িয়ে ১৪ বছর ৬ মাস করে দিয়েছিলেন। তাই নথিতে লেখা হয়েছিল ১ মার্চ, ১৯২৬ খ্রি. এরপর তিনি গুয়াহাটি কটন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট স্তরে ভর্তি হলেন। তখন গায়ক হিসেবে তাঁর খানিক পরিচিতি ঘটেছে। এই সময়ে বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার সঙ্গে তাঁর আবার যোগাযোগ ঘটল। বস্তুত, ভূপেন হাজারিকার শিল্পী হিসেবে আবির্ভাব শুধু অসমীয়া সাংগীতিক জগৎকে সমৃদ্ধ করেনি, ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার সংগীত, বিশেষত বাংলা সংগীতের পরম্পরাকে শক্তিশালী করেছে। প্রাদেশিক নানা সুর, দেশ ও বিদেশসহ আন্তর্জাতিক নানা সুরের সমন্বয়ে তিনি একাধিক ভাষায় কালজয়ী সব গানের জন্ম দিয়েছেন। বিখ্যাত গণসংগীত শিল্পী-সুরকার-গায়ক হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর কালজয়ী আত্মকথন ‘উজান গাঙ বাইয়া’ গ্রন্থে ‘গীতের ধারা’ উপশিরোনামে অসমে গণনাট্য সংঘের ভূমিকা সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে জ্যোতিপ্রসাদের বিশেষ উল্লেখ করেছেন। লোকগায়ক আনন্দীরাম দাস, হেমেন ঠাকুর, আব্দুল মালেক-এর রচনা তাঁদের প্রথম দিকে সাহায্য করেছিল কিন্তু এই ধারায় সত্যসত্যই ঢল নামিয়ে দেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁর অবিরল গানের ধারায় গণজীবনের বিভিন্ন স্তরের সামাজিক বাস্তবতা অনুপম সুরের অবলম্বনে মুখর হয়ে উঠল। আসামের গণজীবনের কাঠুরিয়া, পাথর ভাঙানিয়া, রেলচালক, চা মজুর জুগনু, চাষি রংমন, তাঁত-শালের মেয়ে রহদই আর পালকিচালক দোলাভারী— এইসব চরিত্র এতদিনকার নৈর্ব্যক্তিক সমাজচেতনাহীন গানের ধারাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সুর সংযোজনার ক্ষেত্রে এল একটা নতুন প্রকাশ ও স্টাইল।
১৯৪২ সাল। সেই উত্তাল সময়ে ভূপেন আইএ পাশ করলেন। কিন্তু তাঁর বাবা ঘটনামুখর অস্থির সেদিনের কলকাতায় ও অসমে না ভর্তি করে উচ্চশিক্ষার্থে তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তিনি বিএ পড়ার সুযোগ পেলেন। শুধু লেখাপড়াই নয়, সংগীতপ্রেমী ভূপেনের সামনে আরও বিরাট এক ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দরজা খুলে গেল। সেখানেই তিনি দেখা পেলেন উস্তাদ বিসমিল্লা খান, পন্ডিত কণ্ঠে মহারাজ সহ প্রমুখ ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের। তাঁর লেখাতেই উল্লেখ পাওয়া যায় :
‘… বারাণসীর সংগীতময় পরিবেশে আমার মনটা ভরে উঠেছিল। বারাণসীর রাজপথও যেন গান করে, নাচে, সারেঙ্গি বাজায়, তবলা বাজায়; সেহনাই রচনা করে সুরের দেউল।’সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে নানাভাষী শিক্ষার্থী নয়, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকেও একাধিক ছাত্রছাত্রী আসে। তাই সেখানে পৃথিবী তাঁকে আপন করার পাঠ শেখাল, ভুলিয়ে দিল নিজের ঘরের ঠিকানা। তিনি ভালো ছবিও আঁকতেন। বারাণসী সেই চর্চার সুযোগ আবার তাঁকে করে দিল। তিনি সেখানের শিল্প বিদ্যালয়ে রণদাচরণ উকিলের কাছে শনি ও রবিবার আঁকা শিখতে যেতেন। শিল্পকলার নানা শাখায় পারঙ্গম ভূপেন অমৃতবাজার পত্রিকার এলাহাবাদ সংস্করণে শিক্ষক রণদাচরণের নির্দেশে ‘বারাণসীর শিল্পকলা’ প্রসঙ্গে একটি প্রবন্ধ লিখলেন। ১৯৪৪ সালে বিএ (সাম্মানিক) ও ১৯৪৬ সালে এমএ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) পাশ করে ১৯৪৭ সালে দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছরে ভূপেন অসমে ফিরে এলেন এবং সেখানে গুয়াহাটির বি বড়ুয়া কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগদান করলেও ছ-মাস পরে সেই চাকরি ছেড়ে ১৯৪৮ সালে গুয়াহাটি বেতার কেন্দ্রে প্রোগ্রাম অ্যাসিসট্যান্ট পদে যোগ দেন। শিলং-গুয়াহাটি কেন্দ্রে তিনিই প্রথম ‘অসমীয়া কণ্ঠ’ অনুষ্ঠানে শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৩৭/৩৮ সাল নাগাদ কিশোর ভূপেন পানবাজারের এক জনসভায় গান্ধিজিকে একটি অসমীয়া ভজন ‘জয় রঘুনন্দন’ শুনিয়ে তাঁর আশীর্বাদ পেয়েছিলেন।
১৯৪৯ সালে বৃত্তি লাভ করে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অডিওভিস্যুয়াল এডুকেশন’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন এবং ১৯৫২ সালে সেখান থেকে ‘Proposal for preparing India’s Basic Education to use Audio-visual Technique in Audult education’ শিরোনামে থিসিস জমা দিয়ে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কলম্বিয়ায় থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় বিশ্ববিশ্রুত গায়ক পল রবসন, পিট সিগার প্রমুখের সঙ্গে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তাঁকে চিরকাল ব্যথিত করেছে। সাম্যবাদের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর আস্থা। তাই হাতের গিটারকে দেখিয়ে রবসনের উত্তর ‘this is social instrument’— তাঁর ভিতরে এক নতুন চেতনার জন্ম দিল, গানই হয়ে উঠল পরবর্তী জীবনে তাঁর কাছে নানা বৈষম্য, অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার। সেই ভাবনায় আগুন ধরাল অস্কার হ্যামারস্টেইনের কথা ও জেরোম কার্নের সুরে পল রবসনের কণ্ঠে ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ গানটি। এই গান থেকেই পরবর্তী কালে জন্ম নিল অসমীয়া ভাষায় ভূপেনের কলমে ও সুরে কালজয়ী গান ‘বিস্তীর্ণ পাররে অসংখ্য জনেরে’ আর তারও পরে বাংলায় শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কথায় ভূপেনের কণ্ঠে ‘বিস্তীর্ণ দু-পারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও’। পিট সিগার ছিলেন ভূপেনের বিশিষ্ট বন্ধু। তাঁর জীবনে সিগার, বব ডিলান—এঁদের প্রভাবও পড়েছিল। নোবেলজয়ী (২০১৬) বিখ্যাত গায়ক বব ডিলান বলেছিলেন ‘৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে ভূপেন হাজারিকা নামে একজন শিল্পী আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি ভারতের মতো একটি দেশ থেকে এসেছিলেন এবং আরো দুর্ভাগ্যের যে তিনি নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদি তিনি এখানে (আমেরিকা) থেকে যেতেন, পৃথিবীর নানা জায়গার অনেক মানুষ তাঁদের নিজেদের ভূপেন-ভক্ত বলে পরিচয় দিতেন।’ রবসন সহ উল্লিখিত সবাই মনে করতেন পৃথিবীর সব মেহনতি মানুষের হাসি-কান্না-প্রেম-ভালোবাসার সুরের মধ্যে কোনো তফাত নেই। তাই ভূপেন আফ্রিকায় সাধারণ শ্রমিকের কণ্ঠে শোনা সুরের সঙ্গে অসমের প্রবাদপ্রতিম আরেক লোকশিল্পী প্রতিমা বড়ুয়ার সুরের মিল খুঁজে পান।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘সুধাকণ্ঠ’ ভূপেনের প্রেমে পড়ে যান প্রিয়ম্বদা প্যাটেল, সেই প্রেম ১৯৫০ সালে বিবাহে স্থিত হয়। ১৯৫৩ সালে তাঁদের একমাত্র পুত্র তেজের জন্ম হয়। এরপর দেশে ফেরা। দেশে ফিরে ভূপেন দেখলেন অসমে শুরু হয়েছে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA)-এর আন্দোলন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সন্ধানে বিভোর শিল্পী ভূপেন জড়িয়ে পড়লেন সেই আন্দোলনে, সহযোদ্ধা হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নগেন কাকতি, সৈয়দ আব্দুল মালিক, মঘাই ওঝা, নরহরি বুঢ়াভকত প্রমুখের সঙ্গে। গান লেখা, সুরারোপ, গায়ক হিসেবে সংগীত পরিবেশন সব ক্ষেত্রেই ভূপেন অতীব জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। প্রতিষ্ঠান বিরোধী শিল্পী হিসেবে সরকারের কুনজরেও পড়লেন। অসমের লোকপ্রিয় বিহুর সুরে তিনি প্রতিবাদের গান বাঁধলেন ‘বিহুরে বিরিণা ব্রিটিছ রজা উঠি গ’ল/পাতে সমনীয়া দেশর নেতা রজা হ’ল’। সেই গানের শেষে লিখলেন ‘চতালত গছে বন মূর থিয় দি/ অ’বোলো নাচনি নাচিবি তই কি?’ বঙ্গানুবাদে এমন দাঁড়ায় ‘বিহুর আনন্দে সকলে মাতোয়ারা, ব্রিটিশরাজ দেশ ছেড়েছে, দেশের নেতা রাজা হয়েছে। … সারা উঠোন জুড়ে ঘাস ও গাছ গজিয়েছে, নাচনি তুমি নাচবে কোথায়?’ তাঁর লেখা সম্ভবত প্রথম বিহুর সুরে বাঁধা গান ‘ছাগর ছাল ছেলাবর ডবুয়া কটারী/পহুর ছাল ছেলাবর মিট্/ দেশর বুঢ়া-মেথা দায়ে নধরিবা/গাই যাঁও আজিরে গীত।’ অর্থাৎ ছাগলের চামড়া ছাড়ানোর ছুরি আর হরিণের চামড়া ছাড়ানোর ছুরি আলাদা। দেশের প্রবীণ মানুষেরা আমায় অপরাধী কোরো না, আমি আজকের গান গাইব। এই গানের মধ্যে ছিল সাধারণ মানুষের প্রতিধ্বনি মানুষের শোষণ ও অত্যাচারের কথা। জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন রংমন নামে একটি চরিত্রকে। এই চরিত্রটি আমরা পাই ১৯৬০ সালে। গোটা অসম জুড়ে যখন ভিনভাষী উদ্বাস্তু মানুষকে নিয়ে হিংসার আগুন জ্বলে উঠেছিল সেই সময়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে ভূপেন ‘আহোঁ আকৌ আমি মিলোঁ (‘Let us meet’/ ‘এসো আমরা মিলিত হই’) নামে একটি সংগীতনির্ভর শান্তিযাত্রায় সামিল হয়েছিলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনজাতির শিল্পীদের নিয়ে একটি ভ্রামণিক দল গঠন করে সেদিনের অসমের রাজধানী শিলং থেকে শুরু করে হিংসামুখর প্রতিটি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গিয়ে উজান অসমের নিজের জন্মস্থান শদিয়া পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই অভিযাত্রায় হেমাঙ্গ-ভূপেনের দ্বৈত সংগীত ‘হারাধন–রংমন কথা’ পরিবেশনে দুই ভিন্নভাষী মানুষের সুরনির্ভর কথোপকথনে বাঙালি হারাধনের কথাগুলি বাংলা ভাষায় ভাটিয়ালির সুরে বাঁধা আর অসমীয়া রংমনের বিহুর সুরে। এই শান্তিযাত্রার সময়েই নগাঁওয়ে থাকাকালীন অসমীয়া ভাষায় তিনি লিখলেন ‘মানুহে মানুহর বাবে’, পরে যে গানটি বিশিষ্ট গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে অতীব জনপ্রিয়তা পেল ‘মানুষ মানুষের জন্যে’। সেই গানের মাঝেই তিনি সুরে সুরে প্রশ্ন রাখলেন শ্রোতা তথা সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে : ‘মানুষ যদি সে না হয় মানুষ/ দানব কখনো হয় না মানুষ/ যদি দানব কখনো বা হয় মানুষ, লজ্জা কি তুমি পাবে না?’
ভূপেন তো সত্যিই জাতপাত, ধর্মীয় সংকীর্ণতার দর্শনে বিশ্বাস করতেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার পূজারী। সেই পাঠ তিনি অর্জন করেছিলেন নানা দেশে, নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষের সঙ্গে দ্বিধাহীন মেলামেশার সূত্রে। গোটা বিশ্বের যেখানেই মানবতার লাঞ্ছনা ঘটেছে, সাম্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চলেছে তার বিরুদ্ধে ভূপেন তাঁর গানকেই করে তুলেছেন প্রতিবাদের হাতিয়ার। তাই পরিবেশন করেছেন ‘কৃষ্ণকায়া আফ্রিকা মোর/কৃষ্ণকলি মা’, ‘মোরা যাত্রী একই তরণীর, সহযাত্রী একই তরণীর/ যদি সংঘাত হয় তবে ধ্বংস হবে গর্ব মোদের প্রগতির।’ আবার ১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গেয়েছেন সেই বিখ্যাত গান ‘জয় জয় নবজাত বাংলাদেশ/জয় জয় মুক্তিবাহিনী’। ১৯৯০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের প্রবাদপ্রতিম নেলসন ম্যান্ডেলা যখন কলকাতায় আসেন তখন তাঁর নাগরিক সম্বর্ধনায় লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে ইডেন গার্ডেন্সে নিজের কথা ও সুরে গেয়েছিলেন ‘জিন্দাবাদ ম্যান্ডেলা ম্যান্ডেলা জিন্দাবাদ/ সাতাশ বছর আর সাতটা মাসের অন্ধ কারাগার ভাঙলে’। তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন বিশ্বনাগরিক। তাই তিনি বলতেন ‘শিল্পীর কোনো জাত হয় না, শিল্পীর কোনো দেশ হয় না।’ নাগা জাতির প্রতি অবজ্ঞা ও উপেক্ষায় তাঁর শিল্পীমন ব্যথিত হয়েছিল বলে আমৃত্যু নাগা সাহিত্যসভায় পাওয়া টুপি ও তাদের প্রতীক শিরোপা করে রেখেছেন। যেকোনো ধরনের সংকীর্ণতা ছিল তাঁর অপছন্দ। তাই গানে বলেছেন ‘মনের চড়াই পাখিটির বাঁধন খুলে দে/ শিকল খুলে মেঘের নীড়ে আজ উড়িয়ে দে/যত বন্ধ হাজার দুয়ার ভেঙে আয়রে ছুটে আয়।’ তাঁর ছিল মুক্ত, উদারমনা এক বিশ্বদৃষ্টি যার গুরুত্বপূর্ণ ফল ভূপেনের সৃষ্ট শিল্পে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকতার মেলবন্ধন। তাঁর সাংস্কৃতিক পরিচয়বোধ যত গভীর হয়েছে, তাঁর মানবতাবাদ ততই বিস্তৃত পরিসর লাভ করেছে।
ভূপেনের মতো এক বহুমুখী প্রতিভার আলোচনা একটি প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে ধরা সম্ভব নয়। এই নিবন্ধের অভিমুখ মূলত সংগীতশিল্পী ভূপেন সম্পর্কে। তার বাইরেও আছে তাঁকে নিয়ে নানা বিষয়ে আলোচনার প্রসঙ্গ। সেই বিষয়ে আলোচনা অন্য সময়ে করার সদিচ্ছাটুকু সঙ্গী করে আর কিছু কথা বলা যাক। ১৯৫৪ সালে আবার কলকাতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটল। সেই বছর ওয়েলিংটন স্কোয়ারে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম প্রাদেশিক সম্মেলনে তিনি সংগীত পরিবেশন করলেন। সেই বছরেই সর্বভারতীয় স্তরে পাটনা, মাদ্রাজ (চেন্নাই), বোম্বাই (মুম্বই)-এ সংগীত পরিবেশন করলেন। এর আগে অসমীয়া চলচ্চিত্রের নেপথ্য গায়ক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ঘটেছে। ১৯৫৬ সালে তিনি ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে রাশিয়া যাত্রা করলেন। ওই পঞ্চাশের দশকেই ভূপেন অসমের চলচ্চিত্র জগতে সংগীত পরিচালক, গীতিকার, শিল্পী-গায়ক, প্রযোজক–পরিচালক, চিত্রনাট্যকার রূপে খ্যাতি লাভ করলেন। ওই দশকের মধ্যপর্বে ১৯৫৬ সালে ‘অসমাপ্ত’ ছায়াছবির মাধ্যমে ভূপেনের বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ ঘটল। এই ছবিটির একটি বিশেষত্ব ছিল যে সেখানে পাঁচজন গীতিকার ও পাঁচজন সুরকার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই পাঁচজন গীতিকারের অন্যতম পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূত্রে ভূপেন একজন সুরকার হিসেবে নির্বাচিত হলেন। বাকি চারজন ছিলেন অনুপম ঘটক, অনিল বাগচী, দুর্গা সেন ও নচিকেতা ঘোষ। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় ও ভূপেন হাজারিকার সুরে তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাবলীল কণ্ঠে ওই ছায়াছবির একটি গান দারুণ জনসমাদর পেল— ‘কন্যা তোমার কাজল ধুলো কী সে/ কোন বেহায়া খোঁপা খুললে’। পরের বছরেই ‘কড়ি ও কোমল’ ছায়াছবিতে এককভাবে বাংলা ছবিতে ভূপেন সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন। সেই যোগসূত্রও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ছবিতে ভূপেনের সুরে লতা মঙ্গেশকর গাইলেন ‘অস্ত আকাশে বোনের চিতা জ্বলে’ ও ‘তীর বেঁধা পাখি’ গান দুটি। ওই বছরেই ১৯৫৭ সালে তিনি বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক অসিত সেনের পরিচালনায় নির্মিত ‘জীবন তৃষ্ণা’ ছায়াছবিতে সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পেলেন এবং নির্ধারিত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রবল ইচ্ছায় উত্তমকুমারের লিপে নেপথ্যে গাইলেন ‘সাগরসঙ্গমে সাঁতার কেটেছি কত’। এই গানটিই ভূপেনের অসমীয়া গানের প্রথম বাংলা অনুবাদ, গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। চলচ্চিত্রে সুরকার হিসেবে অনেক জনপ্রিয় গান ভূপেন দর্শক- শ্রোতাকে উপহার দিয়েছেন। যেমন, ‘জীবনের কিছু কিছু রঙ’ (শিল্পী: মাধুরী চট্টোপাধ্যায়/ ছায়াছবি: ‘এখানে পিঞ্জর’), ‘ও বিদেশি তাকাও সামনে তোমার’ (শিল্পী: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়/ ছায়াছবি: ‘চামেলি মেমসাহেব’), ‘ক খ গ ঘ’ (আশা ভোঁসলে/ ঐ), ‘অসম দেশের মেয়ে আমি’ (আরতি মুখোপাধ্যায়/ ঐ) প্রভৃতি। ওই সময়েই বাংলা আধুনিক গানের জগতে প্রবেশ করলেন ভূপেন। গীতিকার পবিত্র মিত্রের কথায় ও ভূপেনের সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের চিরসবুজ কণ্ঠে দুটি গান ‘গুম গুম মেঘ ওই গরজায়’ ও ‘আঁকাবাঁকা এ পথের’ দুটি গানই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। সেই গানে হেমন্তের গানের মাঝে ভূপেনের কণ্ঠে লোকায়ত ভঙ্গিতে ‘হেইয়াঁ না, হেইয়াঁ না’ সুর আলাদা এক মাত্রা যোগ করেছিল। এই সুরেই পরবর্তী কালে ভূপেনের প্রিয় গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় গান লিখলেন ‘আঁকাবাঁকা পথে মোরা কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই /রাজা-মহারাজাদের দোলা’। এই কম্পোজিশনটি ১৯৭৬ সালের পুজোয় রুমা গুহঠাকুরতার পরিচালনায় ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার পরিবেশন করেন, পরে দু-বছর বাদে ১৯৭৮ সালে ভূপেন নিজে গানটি রেকর্ড করেন। এই সময়ের পর থেকে ভূপেন জনপ্রিয় অনেক বাংলা আধুনিক গান শ্রোতাদের উপহার দেন। যেমন, ‘চৈতালি চাঁদ যাক ডুবে যাক’ (কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়/ শিল্পী: শ্যামল মিত্র), ‘রঙ্গিলা বাঁশিতে কে ডাকে’ (ঐ/ লতা মঙ্গেশকর), পরে ১৯৮১ সালে আর একটি জনপ্রিয় গান তাঁর সুরে বাঙালি শ্রোতারা শুনতে পেলেন ‘ভালো করে তুমি চেয়ে দেখো’ (শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়/লতা), ‘কালো মেঘের ডম্বরু/গুরু গুরু ওই শুরু’ (পুলক/সুবীর সেন), ‘কী যেন বলবে আমায় গো’ (ঐ/তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়), ‘বড় ভয় ছিল যাবার বেলায়’ (পুলক/দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়), ‘তোমায় কেন লাগছে এত চেনা’ (পুলক/প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়), ‘আকাশের সিঁড়ি বেয়ে’ (শিবদাস/ ইলা বসু), ‘একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে’ (শিবদাস/রুমা গুহঠাকুরতা/অনুপ ঘোষাল/ভূপেন) ইত্যাদি। ভূপেনের বাংলা গানের সবচেয়ে জনপ্রিয় একক অ্যালবামটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে ‘আমি এক যাযাবর’। সেখানে ভূপেনের মূল অসমীয়া থেকে শিবদাস অনুবাদ করলেন তিনটি গান— ‘আমি এক যাযাবর’, ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লেখেন ‘ও মালিক সারাজীবন কাঁদালে যখন’, এই গানের সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ; অন্যান্য গানের মধ্যে ‘একটু গেলেই অথৈ সাগর পা বাড়ালেই নদী/বুকের মাঝে কুলুকুলু গঙ্গা ভাগীরথী’ (কথা: শিবদাস) ‘সহস্রজনে মোরে প্রশ্ন করে’ (কথা: ভূপেন), ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনাতে নজরুল’ (কথা: শিবদাস)। ভাবে ও মননে অসীমান্তিক এক যাযাবর মনের অধিকারী ভূপেন তাঁর বেশির ভাগ গানে অসমের প্রচলিত নানা লোকসুর ও বিভিন্ন প্রাদেশিক সুর ও পাশ্চাত্যের নানা সুরের চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠ, গায়কী ও সুরের এক নিজস্বতা আছে। প্রেম, প্রতিবাদে মানবজীবনের নানা মুহূর্তের নানা অনুভূতি—যেকোনো ধরনের গানেই তিনি পারঙ্গম। তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর ধরা আছে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিমুখর সব গানে। কিছু হিন্দি গানেও তাঁর অনায়াস পদসঞ্চার ঘটেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে বিখ্যাত কবি ও গীতিকার গুলজারের সঙ্গে ‘ম্যাঁয় ঔর মেরা সায়া’ নামে ছ-টি হিন্দি গানের একটি চমৎকার হিন্দি গানের অ্যালবাম (১৯৯৩) আছে। ১৯৭৪-এ হিন্দিতে পরিচালক আত্মারামের ছবি ‘আরোপ’-এ তিনি প্রথম সুরকার হিসেবে যুক্ত হন। বিশিষ্ট পরিচালক কল্পনা লাজমির একাধিক ছবিতে তিনি সুর দিয়েছেন। সেই ছবি ১৯৯৩ সালে তাঁকে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়। একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা জীবনে ভূপেন লাভ করেছেন— ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির জন্য বাংলাদেশ থেকে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক (১৯৭৭), ওই বছরেই ‘মেরে ধরম মেরি মা’ ছবির জন্য অরুণাচল প্রদেশ সরকারের স্বর্ণপদক, ‘এক পল’ ছবির জন্য BFGAসম্মাননা (১৯৮৬), অসম সরকারের ‘শ্রীমন্ত শঙ্করদেব পুরস্কার’, সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৭), পদ্মভূষণ, মধ্যপ্রদেশ সরকারের লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার(২০০১), সংগীত নাটক আকাদেমি সম্মাননা ‘সংগীতরত্ন’, ‘অসমরত্ন’ (২০০৯), বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ (মরণোত্তর, ২০১১), ’পদ্মবিভূষণ’ (২০১২), ‘ভারতরত্ন’ (মরণোত্তর, ২০১৯) ইত্যাদি। গায়নের ক্ষেত্রে তিনি গানের বাণীকে সুরের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষের প্রতি সীমাহীন আস্থায়, বুকের নীচে যে গভীর বিশ্বাসকে তিনি বহন করেছেন তারই প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছেন তাঁর গানে। তাঁর এই ভাবনার কথা আরও জোরালো হয়েছে তাঁর গানের এই ভাষায়: ‘আর ফুল নয়, আর মালা নয়/নয় ফাগুনের কোনো কাব্য/মধুরাত নয়, মায়া চাঁদ নয়/মানুষের কথা ভাবব’। তাঁর চেতনার রঙ হচ্ছে বিশ্বমানবতা। তাই ভারতীয় তথা বাঙালির কাছে ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টি আজ বড়ো প্রয়োজনীয়, বড়ো প্রাসঙ্গিক।