




ভোর সাড়ে পাঁচটায় জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল সুবীর। খালের ধারে উনিশটা নারকেল গাছ। আকাশে আষাঢ় মাসের মেঘ। এই দিকটা পুব দিক। সূর্য ওঠেনি এখনো। একটা সরু ডাঙার ফালিতে নারকেল গাছগুলো সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে মাথা দোলাচ্ছে। উনিশটা গাছের মধ্যে আঠেরোটা গাছ সমান ভাবে মাটির উপর শিকড় গেড়েছে। শুধু একটা গাছের গোড়া একটু নিচুতে, পাড় ভেঙে, জলের কাছাকাছি। গাছের সারির পেছনে একটা খাল। সামনে আরেকটা খাল। এপারে খাল পেরিয়ে এলে সরু একটা বাগান, তারপর সুবীরের রিসর্টের ঘর। বাগানে বড় বড় পোড়ামাটির কলসি-জাতীয় পাত্র সাজানো। তাতে পোড়ামাটির ঢাকা দেওয়া। বাগানের মধ্যে হাঁটার জন্য বাঁধানো পথ। ঘাস, পাতা, পথ – সব কিছু বর্ষায় ভেজা।
খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল সুবীর। এত সবুজে চোখ জুড়িয়ে যায়।
ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীকে দেখল সুবীর। তারপর খাটের অন্য দিকে গিয়ে ইলেক্ট্রিক কেটলিতে জল গরম করতে দিল।
জল ভরা আর কেটলি অন্ করার শব্দে বিশাখার ঘুম ভাঙল। বলল, “তুমি কখন উঠে পড়লে?”
সুবীর বলল, “কয়েক মিনিট আগে। চা খাবে?”
“হ্যাঁ।”
বিশাখা বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গেল। সুবীর টী-ব্যাগ দিয়ে দু’ কাপ চা বানাল। বিশাখার বেরোনোর পর সুবীর বাথরুম সারল। তারপর দুজনে চা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। লাগোয়া বারান্দায় চেয়ার টেবিল পাতা। সেখানে বসল ওরা। সামনে পুব দিকের মেঘে-ঢাকা আকাশে সূর্য যেখা যাচ্ছে না এখনো। কিন্তু চারপাশে আলো ইতিমধ্যেই অনেকটা বেড়েছে। কাছে দূরে সব কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মনে হয় মেঘের আড়ালে সূর্যোদয় হয়ে গেছে।
তিন-চার রকমের পাখি দেখা যাচ্ছে। ওড়াউড়ি করছে, ডালে বসছে। তার মধ্যে সব চেয়ে সুন্দর লাগছিল শঙ্খচিল – ডানাদুটো খয়েরী, ডানার ডগা কালো, গলা আর মাথা সাদা, পাদুটো হলুদ। অনেক দূর থেকে দেখেও বাঁকা ঠোঁটের তীক্ষ্ণতা বোঝা যায়।
নীল রঙের ছোট ছোট মাছরাঙাগুলোও ভারি সুন্দর।
আর সুবীরদের ঘরের ছাউনির নীচে, ছাউনির প্রান্তে, এক একটা পায়রা কাঠি মুখে আসছে আর যাচ্ছে। কোথাও একটা বাসা বানাচ্ছে। মুখে যখন কাঠি থাকছে না, তখন বকম বকম করছে।
চারদিকে শান্তি আর সবুজ। এই মেঘাচ্ছন্নতায় কোনো বিষাদ নেই।
চা শেষ করে বিশাখা মোবাইল দেখতে শুরু করল। টেবিলে কাপ নামিয়ে সুবীর দালান থেকে নেমে পড়ল বাগানে। কয়েকটা পদক্ষেপেই খালের ধার। তারপর জলের ধার দিয়ে বাঁ দিকে হেঁটে গেল কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই।
সুবীরের সামনের দিকে যেখানে খালের শেষ, তার পরই হোটেলের রিসেপশন। সেই উদ্দেশে হাঁটতে থাকল সুবীর। দেখল তীরের কাছে খালের ওপর একটা ছোট ডিঙি। তাতে একটা লোক বসে কিছু একটা করছে। কাছাকাছি পৌঁছে সুবীর দেখল লোকটা বুড়ো। বয়স কত বোঝা অসম্ভব। রোগা পাকানো চেহারা। পরনে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। লুঙ্গির নিচে যেখানে পা বেরিয়ে আছে, সেখানে পায়ের গুলে শিরা আর পেশীর দাগ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গেঞ্জিটা পেট থেকে উঠে গেছে। সম্পূর্ণ মেদহীন পেটটা ভেতরে ঢুকে আছে। মুখের হাড় আর চোয়ালের ওপর যতটুকু চামড়া না থাকলেই নয়, ততটুকুই আছে, মাংস বিশেষ নেই। মাথায় পাতলা সাদা চুল, কিন্তু ধবধবে নয়। জামাকাপড়ের মতই চুলটা মলিন। ডিঙির মধ্যে লোকটার সামনে রাখা আছে একটা বালতি। কোনো এক সময়ে হোটেল রঙ করা হয়েছিল বোধহয়, তখনকার রঙের বালতি। সুবীর উঁকি মেরে দেখল বালতিতে কিছু একটা আছে। ওগুলো কি আটারুটি? মনে হচ্ছে যেন জল বা অন্য কোনো তরল পদার্থের মধ্যে অনেক রুটি ভিজিয়ে রাখা আছে।
সুবীর এ দেশের ভাষা জানে না। গত কয়েকদিন দেখেছে বাঙালি হিন্দিটাও এখানে ভালো চলে না। বরং হোটেলগুলোয়, রেস্তোরাঁয় আর ড্রাইভারের সাথে ইংরিজি চলে। তাই ইংরিজিতে জিগ্যেস করল, “এগুলো কী?”
ভাষাটা বুড়ো বুঝল কিনা বলা মুশকিল। কিন্তু হাবেভাবে আন্দাজ করল বোধহয়।
একটু বিরক্ত স্বরে বলল, “ফীশ্! ফীশ্!”
সুবীর অনুমান করল যে বালতিতে যা আছে তা মাছের খাবার। গতকাল রিসর্টে পৌঁছনোর পর রিসেপশনের লোকটা বলেছিল বটে সে এই খালে মাছ আছে আর অতিথিরা ছিপ ফেলে সেই মাছ ধরতেও পারেন।
ডিঙি ছেড়ে দিল। বুড়ো চলল মাছ খাওয়াতে। আস্তে আস্তে ভেসে যাওয়ার ডিঙির দিকে সুবীর তাকিয়ে রইল।
(২)
এক হাতে ডিঙা বাইতে বাইতে বলরাম বিড়বিড় করছিল, “সকালবেলা! সকালবেলায় শহরের বাবু আমার সনে কথা কইতে চায়!”
এই সময়ে বাবুরা সাধারণত কেউ ঘুম থেকে ওঠে না। ভোর-সকালে বলরামের জীবনে আর কিছু থাকে না – শুধু এই জলের ছেলেপুলেগুলোর সাথে কথা কওয়া আর তাদের খাবার দেওয়া। থাকে বিঘ্নহীন শান্তি।
বালতির দিকে তাকাল বলরাম। আজ মনে হচ্ছে রুটি কম দিয়েছে। কাল রাতে নিশ্চই হোটেলের ছোঁড়াগুলো বেশি বেশি খেয়েছে। মনে মনে বলরাম বলল, “ওরে অরুণ, ওরে আলি, ওরে লিজো – আজ এ-ই খাবারটাই খাস্ তোরা। ওরে ইনিয়া, ওরে মারি, ওরে সানা – সবার সাথে ভাগ করে নিস্।”
ঢিমে গতিতে শান্ত খালের জলে ডিঙি এগিয়ে যাচ্ছিল। বাঁ দিকের পাড় একটু দূরে। ডান দিকের পাড় কাছেই। সেখানে একটার পর একটা বাবুদের থাকার বাড়ি। সব বাড়ির বারান্দাই খালি, শুধু একটাতে একজন দেবী বসে আছেন। ওই যে বাবু ইংরিজিতে কথা বলছিলেন, ওনারই স্ত্রী হবেন হয়তো।
স্ত্রী বলতে মনে পড়ল…
সতু!
তুমি যে বলেছিলে ফিরে আসবে। আর কবে ফিরবে সতু?
সে-ই প্রথম যৌবনের কথা মনে পড়ে। সে যেন হাজার হাজার বছর আগেকার কথা। তোমার মনে পড়ে, সতি?
একদিন আমরা দেবলা-বিলের ধারে আঠি-ডুমুর গাছের তলায় বসেছিলাম। কাছেই একপাল পায়রা বকম বকম করছিল। তুমি শুয়েছিলে আমার কোলে মাথা রেখে। তুমি অনেক কিছু বলছিলে, আমি শুনছিলাম। কী বলছিলে আমার মনে নেই। বলতে বলতে একবার চাইছিলে আকাশের দিকে, একবার চাইছিলে আমার মুখের দিকে। তোমার বড় বড় চোখের ধবধবে সাদার মধ্যে নীলচে কালো মণিদুটো জ্বলজ্বল করছিল। পুরো চোখে টলমল করছিল জল, যেন যেকোনো মুহূর্তে গড়িয়ে পড়বে চোখের বাইরে। তুমি কথা বলে যাচ্ছিলে গলগল করে। আর আমি? আমি দেখছিলাম তোমার গালের নরম ভাব, তোমার ঠোঁটের ভেজা ভাব আর তোমার নাক থেকে বেরোনো নিশ্বাসের উষ্ণ ভাব। আমি নিজের নাক ভর্তি করে টেনে নিচ্ছিলাম তোমার শরীরের গন্ধ। কথা বলতে বলতে এক সময় তুমি ঘুমিয়ে পড়লে। তোমার ঠোঁটদুটোর মধ্যে তখন অল্প একটু ফাঁক ছিল। সেখান দিয়ে তোমার নারকেলের মত সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছিল এক ঝলক। বন্ধ চোখের পাতায় কী নিশ্চিন্ত এক শান্তি! নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দে তোমার নাক ফুলে ফুলে উঠছিল। তার সাথে তোমার বুক ওঠা-নামা করছিল। তোমার সরু লম্বা গলার ত্বক মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল কেন কে জানে!
আমার কাছে কবে ফিরে আসবে, সত্য? আমার সময় তো ফুরিয়ে এল!
তুমি কেমন আছো সত্য?
মনে মনে বলরাম উত্তর পেল – আমি ভালো আছি।
সেদিন দেবলা-বিলের ধারে আঠি-ডুমুর গাছের নিচে যে দুপুরটা কেটেছিল, সেটাই ছিল বলরামের জীবনের সব চেয়ে সুখের দিন।
সত্যবতী বলরামের কোলে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিল। বলরাম সত্যবতীর চুলে বিলি কাটছিল, আঙুল দিয়ে গাল ছুঁয়ে দিচ্ছিল। নাক ভরে নিচ্ছিল সত্যবতীর নিজস্ব অনন্য গন্ধ। অনেকটা যেন মাছের গন্ধের মত। এই গন্ধটা বলরামের বড় প্রিয়। সত্যবতীর ঘুমের সুযোগ নিয়ে তার বন্ধ চোখের পাতায় চুম্বন রেখেছিল বলরাম। সত্যবতী টের পায়নি।
হঠাৎ এক সময় পায়রাগুলোর অনর্গল বকম বকম থেকে একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ উঠেছিল। বলরাম তাকিয়ে দেখেছিল যে একটা শঙ্খচিল উড়ে চলে যাচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার! চিলটা বোধহয় একটা পায়রা ধরতে এসেছিল। ধরতে পারেনি। চলে যাচ্ছে তখন। পায়রার চিল্লানিতে সত্যবতীর ঘুম ভেঙেছিল। সে উঠে বসেছিল।
একে অন্যের হাত ধরে ওরা বসেছিল কিছুক্ষণ। তারপর যার যার নিজের নিজের বাড়িতে ফেরার পালা।
যখন ওরা হেঁটে হেঁটে আঠি-ডুমুর গাছটার থেকে খানিকটা দূরে চলে গেছে, বলরাম লক্ষ করেছিল যে শঙ্খচিলটা আবার নিঃশব্দ ডানার ঝাপটে গাছটার দিকে ফিরে যাচ্ছে। পেছন ফিরে দূর থেকে ও পায়রাগুলোকে দেখেছিল। পায়রাগুলো আসন্ন বিপদের কথা জানতে পেরেছে কিনা বলরাম বুঝতে পারেনি। সত্যবতী ভয় পাবে ভেবে বলরাম ওকে কিছু বলেনি।
(৩)
ঘাটে নৌকো বাঁধা। গলুইতে বসে আছে সত্যবতী। ঘাটের ধাপে বসে আছে প্রিয়সখী সুহৃতা। দুজনেরই বয়স পনেরো বা আরো কম। সত্যবতী তার তিন মা আর দুই বাপের গল্প বলছে। গল্পটা আগেও অনেকবার বলেছে। কিন্তু সুহৃতা শুনে শুনে কখনো ক্লান্ত হয় না। সত্যবতী বলে বলে কখনো ক্লান্ত হয় না। প্রত্যেকবার বলার সময় একটা নতুন কিছু খুঁজে পায় নিজের জন্মের ইতিহাস থেকে।
ঘাটে আরো দুজন নারী কাপড় কাচছে এক ধারে। তাদের শ্রবণ অবধি সত্যবতীর কথা পৌঁছচ্ছে না। কোথাও কোনো পুরুষ নেই, তাই মেয়েরা সবাই সহজ মনে আছে। খোলামেলা নদীর তীরে মুক্ত হাওয়া বইছে মৃদুমন্দ।
“আমাদের মহারাজ রাজাধিরাজ রাজচক্রবর্তী পুরুষসিংহ শ্রী উপরিচর একদিন মৃগয়া করতে গিয়েছিলেন। খানিকক্ষণ শিকার করার পর, বিশ্রাম নেবার জন্য তিনি বসলেন। তখন মৃত এক হরিণের শরীর থেকে নিঃসৃত রক্ত দেখে তাঁর ঋতুস্নাতা মহিষীর কথা মনে পড়ল।”
“মানে আমাদের মহারানী গিরিকা।”
“হ্যাঁ। ঋতুমতী গিরিকার কথা কল্পনা করে মহারাজ কামার্ত হলেন। আমার পিতার মানসে কাম উদ্রেক করেছিলেন বলে গিরিকা আমার প্রথম মা। সেই কামবোধের আবেশে উপরিচরের জননেন্দ্রিয় রাজ-শিশ্ন উত্থিত হল এবং তার থেকে নিঃসৃত হল রাজ-শুক্র। তখন মহারাজ এক শ্যেন পাখিকে কাছে ডাকলেন।”
“শ্যেন মানে চিল? শঙ্খচিল?”
সত্যবতী মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“মহারাজ শ্যেনপাখিকে তাঁর বীর্য নিয়ে সত্বর মহারানী গিরিকার কাছে যেতে বললেন।”
“তারপর?”
“শ্যেনপাখি তো উড়ে চলল। তার মুখে ধরা রাজ-বীর্য। এমন সময় আরেকটা শ্যেন তাকে আকাশ-মধ্যে আক্রমণ করল। দুই শ্যেনের যুদ্ধে রাজ-বীর্য পড়ে গেল নদীতে।”
গল্পটা আগে শোনা হলেও সুহৃতার মুখ হাঁ হয়ে গেছে।
“নদীর মধ্যে ছিলেন অদ্রিকা। আসলে অপ্সরা, কিন্তু ব্রহ্মার শাপে মৎস্য। পড়ে যাওয়া বীর্য গলাধঃকরণ করে অদ্রিকা গর্ভবতী হলেন। আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন বলে তিনি আমার দ্বিতীয় মা।”
“তারপর?”
“গর্ভধারণের দশম মাসে অদ্রিকা ধরা পড়লেন এক ধীবরের জালে।”
“তোর বাবা?”
“হ্যাঁ। মহারাজ উপরিচর ছিলেন আমার জৈবিক পিতা। আর যার মাছের জালে অদ্রিকা ধরা পড়লেন তিনি আমার পালক পিতা। তিনি অদ্রিকার উদর বিদারণ করে আমাকে পেলেন। আর আমার যমজ ভাইকে।”
“অদ্রিকা মারা গেলেন?”
“অবশ্যই। একজন নিরপরাধ নারীর হত্যা হল একজন নিরপরাধ পুরুষের হাতে। তবে শুনেছি আমার জন্মের পর অদ্রিকা শাপমুক্ত হয়ে আকাশ-পথে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর সাথে কোনোদিনও দেখা হয়নি আমার।”
সত্যবতী একটু থামল। তারপর আবার বলতে শুরু করল।
“আমার পালক পিতা আমাকে আর আমার ভাইকে নিয়ে মহারাজ উপরিচরের কাছে গেলেন। মহারাজ ভাইকে রেখে দিলেন আর আমাকে ফেরত দিয়ে দিলেন। পালক পিতা আমাকে স্বগৃহে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমি বড় হলাম আমার পালিকা মাতার আদরে।”
সুহৃতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “পুরুষের হাতেই সব শক্তি। আমরা প্রকৃতি। আমাদের কাজ সেবা করা। আমাদের কাজ সন্তানপালন। পুরুষ আমাদের রক্ষা করেন।”
“মাঝে মাঝে করেন, তা ঠিক। আবার কখনো কখনো করেন না।”
“ছি ছি, ও কথা বলিস না। পুরুষের আছে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। আমাদের আছে বিশ্বস্ততা।”
“কেন? আমাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই? পুরুষের কাছেই বা কেন বিশ্বাসের আশা করা যাবে না?”
“চুপ কর্। চুপ কর্। অবিশ্বাসীর মত কথা বলিস না।”
“আমার প্রথম মাতার ভূমিকা ছিল অনুপ্রেরণা দেওয়া – তা সে পিতার মানসজগতেই হোক না কেন। দ্বিতীয় মাতার ভূমিকা ছিল সন্তানধারণের একটা বিকল্প হিসাবে। তৃতীয় মাতার ভূমিকা ছিল অন্যের সন্তান পালন। ওঁদের কারোর মতামত জানতে চাওয়া হয়নি, কারো অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আমার জৈবিক পিতা, আমাদের সবার যিনি রাজাধিরাজ, উত্থিত জননেন্দ্রিয় থেকে বীর্য ত্যাগ করেই তিনি নিজের সব কর্তব্য নিবারণ করেছেন।”
“তিনি তো রাজা, সত্যবতী! তাঁর কথা আলাদা। তোর পালক পিতা তো তোকে স্নেহ করে বড় করেছেন। করেননি?”
“তা ঠিক। কিন্তু পুরুষ বড় কামুক রে! পুরুষ বড় প্রতারক!”
“তুই কটা পুরুষ দেখেছিস?”
“ঢের দেখেছি। তবে হ্যাঁ, সব পুরুষই অধম নয়। যেমন আমার হলধর ওরকম নয়। আমি হলধরের সাথে পালিয়ে যাব একদিন, দেখিস!”
(৪)
ডিঙিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল সুবীর। ভেবেছিল কোথাও একটা থেমে যাবে বুড়ো লোকটা। তারপর মাছেদের খাওয়াবে। সেটা দেখার ইচ্ছে ছিল।
কিন্তু সে গুড়ে বালি। লোকটা কোথাও থামল না। শুধু ডিঙি বেয়ে বেয়ে দূরে চলে গেল। খালের পার বরাবর সোজা তাকালে যেখানে রিসর্টের শেষ বাড়িটা দেখা যাচ্ছে, সেখানে খালটা বাঁ দিকে বাঁক নিয়েছে। সেই পথেই ডিঙিটা এক সময় চোখের অন্তরালে চলে গেল।
সুবীর হেঁটে হেঁটে রিসেপশনের দিকে গেল। এত সকালে সেখানে কেউ নেই। কিন্তু বাঁই বাঁই করে ফ্যান চলছে। খালের শেষে পৌঁছে, জলের ধার ধরে ধরে সুবীর খানিকক্ষণ হাঁটল। যখন ঝোপ-ঝাড়ের বাধায় আর এগোনো সম্ভব হল না, তখন ফিরতে শুরু করল। মাথার ঠিক ওপর দিয়ে একটা শঙ্খচিল উড়ে গেল হুশ করে। খালের জলের একদম কাছাকাছি দিয়ে উড়ে গেল একটা গাঙচিল, জলের সার্ফেসটা ছুঁই ছুঁই করেও স্পর্শ না করে।
নিজের ঘরের কাছে ফিরে এসে সুবীর দেখল বিশাখা বারান্দায় একই চেয়ারে বসে আছে। এখন মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছে। সুবীরকে দেখে নাক সিঁটকে বলল, “এখানে হাওয়ায় মেছো গন্ধ।”
সুবীর বলল, “হ্যাঁ, তা তো হবেই। সমুদ্রের এত কাছে! আর কাল তো আসার সময় দেখলে – লম্বা লম্বা খালে মাছ ধরার বিরাট বিরাট জাল। এটা জেলেদের জায়গা। আমার তো এই নোনা আর মেছো গন্ধটা মন্দ লাগছে না! ছোটবেলাকার সাগরস্নানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।”
বিশাখা বলল, “এদিকে এস। সেল্ফি তুলব।”
সুবীর দুটো ধাপ বেয়ে বাগান থেকে বারান্দায় উঠল। ওরা দুজনে মিলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কয়েকটা সেল্ফি তুলল – পটভূমিতে খাল, গাছ আর আকাশ রেখে। বিশাখা আবার চেয়ারে বসে মোবাইলে ছবিগুলো দেখতে শুরু করল। সুবীর বুঝল এবার ওইসব ছবি ফেসবুক আর ইন্স্টাগ্রামে পোস্ট হবে।
সুবীর বলল, “শুনেছি ওদিকে একটা সুইমিং পুল আছে। আমি একটু দেখতে যাচ্ছি।”
বিশাখা কোনো উত্তর দিল না।
সুবীর জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি আমার সুইমিং ট্রাংক এনেছ?”
“হুঁ।”
সুবীর বারান্দা থেকে বাগানে নামল। কয়েকটা পদক্ষেপেই খালের ধার। তারপর জলের ধার দিয়ে ডান দিকে হেঁটে গেল ওই শেষ বাড়িটার উদ্দেশে। ওই বাড়িটার পেছনেই নাকি সুইমিং পুল। আর বুড়ো লোকটা ডিঙি বেয়ে মাছ খাওয়ানোর জন্য ওদিকেই গেছে।
আস্তে আস্তে ভেজা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে শেষ বাড়িটার কাছে পৌঁছল সুবীর। দেখল বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটা-পথটা আরো এগিয়ে গেছে। বাড়িটা বাঁ-দিকে রেখে সুবীর সেই পথে হেঁটে গেল। সামনে দেখল একটু উঁচু করে বাঁধানো সুইমিং পুল। কয়েকটা ধাপ উঠে পুলের স্বচ্ছ জল দেখতে পেল।
বাঃ! সুন্দর পুল। পরিষ্কার। চটি খুলে খুব সাবধানে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা জলে ছোঁয়ালো সুবীর। ঠান্ডা-ঠান্ডা, কিন্ত সাঁতার কাটতে ভালো লাগবে।
পুলের পাশে বাঁ-দিকে একটা ছাউনি দেওয়া। ছাউনির নিচে অনেকগুলো চেয়ার পাতা, আরাম-কেদারার মত দেখতে। একটা চেয়ারে রিসর্টের অতিথিদের জন্য ভাঁজ করে রাখা আছে বেশ কিছু তোয়ালে। পুলের ডান দিকে বাথরুম আর শাওয়ার।
সুইমিং পুলটা উঁচু করে বাঁধানো বলে এখান থেকে অনেক দূর অবধি দেখা যাচ্ছে। খালের পর সমান্তরাল খাল। অগুনতি নারকেল গাছ। মেঘে ঢাকা আষাঢ়ের নিচু আকাশ।
দূরে ডিঙিটা দেখতে পেল সুবীর। জলের ধারে, একটা বড় গাছের নিচে, একটা ভাঙা ঘরের পাশে, বুড়ো লোকটা ডিঙি লাগিয়েছে। চুপ করে বসে আছে। দেখে মনে হয় যেন এমন একটা জায়গায় গেছে যেখানে কোনো মানুষ ওকে অহেতুক প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে পারবে না।
একটু পর লোকটা ডিঙি থেকে নামল। দূর থেকে সুবীর দেখছিল। যত দূর বুঝতে পারল, লোকটা বালতিটা ডিঙি থেকে নামায়নি। ভাঙা বাড়িটার সামনে বসে বুড়োটা কী করছিল সুবীর বুঝতে পারল না। তারপর বুড়ো উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়েই বা ও কী করছিল সুবীর বুঝল না। একবার মনে হল লোকটা হাত-পা নেড়ে কথা বলছে। কিন্তু কেউ তো নেই! কার সাথে কথা বলছে?
সুবীর ধৈর্য হারিয়ে প্রায় ফিরে যাচ্ছিল, এমন সময় লোকটা আবার ডিঙিতে চেপে বসল।
(৫)
নৌকার গলুইতে সত্যবতী আধ-শোয়া অবস্থায় নদীর অন্য পারের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘাটের ধাপে বসে সুহৃতা নিজের পায়ের কাছে জলের ছলাৎ ছলাৎ দেখছিল। কাপড় কাচতে যারা এসেছিল, তারা চলে গেছে। কাছাকাছি আর কেউ নেই।
একটা গম্ভীর মন্দ্র পুরুষ কন্ঠস্বরে দুই সখী দিবাস্বপ্ন থেকে জেগে উঠল।
“এই নৌকার কর্ণধার কোথায়?”
মুখ তুলে সত্যবতী দেখল এক জটাধারী দীর্ঘকায় মুনি ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে। মাথায় দীর্ঘ শুভ্র চুল। তাঁর চোখদুটোয় এক দৈবিক ঔজ্জ্বল্য। তীক্ষ্ণ নাক শ্যেনপক্ষীর মত। সত্যবতী চোখ নামিয়ে মাথা নত করল।
সত্যবতী বলল, “এ নৌকা আমার ধীবর পিতার। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান নেই। তাই আমিই এই নৌকা চালাই।”
“তোমার নাম কী?”
“আজ্ঞে, আমি সত্যবতী। কিন্তু সারাক্ষণই জেলেদের সাথে থাকি বলে, আমার আরেক নাম মৎস্যগন্ধা।”
“তোমার জন্মবৃত্তান্ত আমার অবগত। তুমি উপরিচরের ঔরসজাত। আমার নাম পরাশর। আমাকে এই নদী পার করিয়ে দাও।”
মুনি নৌকাতে উঠে এলেন। ঘাটে সুহৃতা মাথা নিচু করে বসে থাকল। সত্যবতী বৈঠা ধরল। আস্তে আস্তে নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে, বিনা বাক্যব্যয়ে, অন্য পারের দিকে রওনা হল।
নিঃশব্দে নৌকা চলল।
মাঝ-নদীতে আসার পর পরাশর বললেন, “সুন্দরী! আমার দিকে তাকাও একবার।”
অবাক হয়ে বৈঠা টানা থামাল সত্যবতী। তারপর নম্রভাবে চোখ তুলল ধীরে ধীরে। দেখল পরাশর এক-দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। কী প্রচণ্ড শক্তি সেই দৃষ্টির মধ্যে! যেন পোশাক ভেদ করে, ত্বক ভেদ করে সত্যবতীর গভীরতম অন্তরে প্রবেশ করছে।
“তুমি কুমারী। তুমি অপরূপা সুন্দরী। আমি তোমাকে চাই। আমি তোমার কাছে আমার বংশধর পুত্র চাই। আমি এখনি এখানে তোমাকে চাই।”
ভয়ে সত্যবতীর বুক কেঁপে উঠল। চোখ নামিয়ে নিল সে।
পরাশর বললেন, “এখনি তোমার সাথে সঙ্গমে মিলব আমি।”
“কিন্তু দেব! নদীর ওই পারে কত ঋষি বসে রয়েছেন। তাঁরা তো সব দেখতে পাবেন!”
পরাশর স্মিত হাসলেন। প্রার্থনার মত ভঙ্গিতে আকাশের দিকে দু’হাত তুললেন। চোখ বন্ধ করে বললেন, “আর যদি কেউ না দেখতে পায়?”
সত্যবতী অবাক হয়ে দেখল কুয়াশা নেমে আসছে নৌকার চারপাশে। এক মায়াবী কুজ্ঝ্বটিকায় সমস্ত পৃথিবীর থেকে নৌকাটি পৃথক হয়ে গেল।
সত্যবতীর অন্তর্দৃষ্টিতে তার প্রিয় পুরুষ হলধরের মুখটা ভেসে উঠল।
কাতরস্বরে সত্যবতী বলল, “কিন্তু দেব! আমি কুমারী। আমি আমার পিতার সম্পদ। আমার কন্যাভাব দূষিত হলে আমি গৃহে ফিরব কী করে?”
“ভয় নেই। আমার আকাঙ্ক্ষা মিটিয়ে দেবার পর তুমি কুমারীই রয়ে যাবে। উপরন্তু আমার সাথে সঙ্গমে তোমার সর্বাঙ্গ থেকে মৎস্যের গন্ধ অপসারিত হবে। তোমার সুদর্শনা শরীর সুগন্ধময় হবে। তোমার নাম হবে গন্ধবতী। তোমার সুগন্ধ এত দূর থেকে পাওয়া যাবে যে তোমার নাম হবে যোজনগন্ধা।”
সত্যবতীর সারা শরীর কেঁপে উঠল। নিঃশব্দ আর্তনাদ করে সে মনে মনে বলল, “কিন্তু আমার শরীরের গন্ধ যে হলধরের বড় প্রিয়!”
মুখে কিছুই না বলে সত্যবতী পাথরের মূর্তির মত বসে রইল।
পরাশর উঠে দাঁড়ালেন। নৌকার ভিতরে যেখানে একটা সমতল পাটাতন ছিল, সেখানে লম্বমান পদদ্বয়ে বসলেন।
বললেন, “এখানে এসো। বোসো আমার অঙ্কে।”
হলধরের মুখ কল্পনা করতে করতে সত্যবতী উঠল। তিন পা হেঁটে গিয়ে পরাশর মুনির সামনে দাঁড়াল। পরাশর ডান হাত তুলে সত্যবতীর বাম পয়োধর স্পর্শ করলেন। থরথর করে কেঁপে উঠল সত্যবতী। চোখ বন্ধ করল। পরাশর ধীরভাবে সত্যবতীকে নিজের বাম কোলে বসালেন। সত্যবতীর পৃষ্ঠদেশ পিছন থেকে বাম হাতে ধারণ করে, দক্ষিণ হাতে সত্যবতীর কপোল স্পর্শ করে, পরাশর সত্যবতীর ওষ্ঠে মৃদু চুম্বন করলেন। সত্যবতী চোখ খুলল না। পরাশর সত্যবতীর নিম্নাঙ্গ অনাবৃত করে তার জঙ্ঘায় নিজের দক্ষিণ তর্জনী কোমলভাবে স্থাপন করলেন। সত্যবতীর সমস্ত শরীরে একটা আতঙ্কের বিদ্যুৎ খেলে গেল।
(৬)
ডিঙিতে বসে বলরাম ইষ্টদেবতার কাছে ক্ষমা চাইল। বলল, “আজ তোমার সাথে ঝগড়া করেছি বলে কিছু মনে কোরো না ঠাকুর।”
ডিঙিতে ওঠার একটু আগে বলরাম বসেছিল গাছের তলায়। সেখানে তার দৈনন্দিন শৌচ করেছিল। তারপরে অভ্যাসমত ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করেছিল। বলেছিল, “আমাকে এবার নাও ঠাকুর। অনেক তো হল!”
একই কথা নানা ভাবে বলতে বলতে তার রাগ হয়ে গিয়েছিল।
“তুমি কী চাও? আর কতদিন এই ভাবে চালাবে আমাকে? দয়া নেই তোমার? আমার সত্যকে তো ফিরিয়ে আনলে না! আমার সতির তরে অপেক্ষা করে করে সারা জীবন কেটে গেল। এই বারে থামাও এই অনন্ত ডিঙি বাওয়া! আমাকে নাও এবার। তোমার কোলে তুলে নাও। তুমি কিসের দেবতা? তুমি কি জেগে আছো, না ঘুমোচ্ছ? দয়া করো! ক্ষমা করো আমায়। এবার আমায় নাও।”
এখন ডিঙিতে বসে বলরাম মাছেদের খাওয়ানোর তোড়জোড় করল। ডাকল, “ওরে সানা! আয় আয় আয়! অরুণ, আলি, ইনিয়া, লিজো, মারি সবাই চলে আয়।”
বালতি থেকে একটা ভেজা রুটি নিয়ে টুকরো করে জলে ফেলল। তারপর আরেকটা রুটি।
“এই তো! লিজো এসেছিস। খা, খা! ভালো করে খা, মা আমার। অরুণ! চলে এসেছিস! ভাগাভাগি করে খেয়ে নে। ইনিয়া, ঝগড়া করবি না, একদম রাগারাগি করবি না। তোরা না সবাই আমার সন্তান? সবার জন্য খাবার আছে। একটুও কম পড়বে না।”
একটার পর একটা রুটি নিয়ে টুকরো টুকরো করে জলে ছড়াতে লাগল বলরাম। এইখানে, এই জায়গাটাতেই মাছেদের খাওয়াতে পছন্দ করে ও, এই গাছের ছায়ায়, ভাঙা বাড়িটার পাশে। এখানে উৎপাত করতে শঙ্খচিল আসে না।
মাছগুলো ছিল ঠিক জলের তলায়। ওদের ঘোরাফেরা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু ওরা কোনো ঢেউ তুলছিল না। ওদের খাওয়াতে খাওয়াতে অল্প অল্প বৃষ্টি সুরু হল। ছোট ছোট বরষার ফোঁটা খালের জলে পড়ে নানা রকম নকশা তৈরি করতে শুরু করল। এক একটা নকশা হচ্ছে, তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে। কখনো মনে হচ্ছে পাখির আকার, কখনো গোল, কখনো ডিমের মত। বালতি যখন প্রায় খালি, বলরাম দেখল জলের ওপর নকশাটা একটা মানুষের মুখের মত।
বলরামের চোখের সামনে জলের ওপর মুখের আদলটা আরো স্পষ্ট হতে লাগল। কিছু বোঝার আগেই জলের মধ্যে থেকে এক নারীমূর্তি ভেসে উঠল। অপরূপা সুন্দরীর মুখ, বয়স ষোল বছরও হয়নি। নিখুঁত ঠোঁট, নিটোল গাল, নির্মল কপাল। অপূর্ব সুন্দর নাক। চোখদুটো নম্র মাধুরীতে ভরা। দীর্ঘ চোখের পাতা।
তারপর জলে ভেসে উঠল মাথার চুল। লম্বা, কালো, আষাঢ়ের মেঘের মত চারদিকে ছড়ানো।
বলরাম অবাক হয়ে বলল, “সত্যবতী?”
মেয়েটির দীঘল সরু গ্রীবা দেখা গেল। তারপর কাঁধ।
“তুমি এসেছ, সত্যবতী! আমার সতু! আমার প্রাণের সত্য!”
সত্যবতী কোনো কথা বলল না। শুধু ওর মুখে একটা হালকা হাসির আবেশ লেগে থাকল।
“তুমি কি আমাকে নিতে এসেছ, সত্য?”
সত্যবতী কোমর অবধি জলের ওপর ভাসছে। হাতদুটো লতার মত শরীরের দু পাশে জলের ওপর আস্তে আস্তে নড়ছে। রুটি খেতে যে মাছগুলো এসেছিল তারা সত্যবতীর চারপাশে সাঁতরে বেড়াচ্ছে। সে এক অপরূপ দৃশ্য!
বলরাম বলল, “আমি জানতাম তুমি কথা রাখবে!”
সত্যবতী ডান হাত তুলে বলরামকে ইশারা করল। কাছে আসতে ইঙ্গিত দিল। কোনো কথা বলল না।
“আমি কি তোমার কাছে যাব, সত্য?”
সত্যবতী কোনো উত্তর দিল না।
বলরাম বলল, “আমি তোমার কাছে আসছি, সত্য। তুমি আমার সত্য!”
বলরাম উঠে দাঁড়াল।
ডিঙি টালমাটাল হল।
বলরাম খালের জলে পা বাড়াল।