




দৃশ্যটা রানীর নিছক কল্পনা নয়। চাঁদের ম্লান আলোয় মাঠের ওপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্কন্ধকাটা এক রমণীমূর্তি।
রাতের অন্ধকারে লণ্ঠন নিয়ে বেরিয়েছিল রানী। আজ ননদ ইলাকে পাঠিয়েছিল ছাগল চরাতে, সে মেয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই রানী খেয়াল করেছিল, তাদের কালো ছাগল কমলি বাড়ি আসেনি। কমলিটা বড্ড ভবঘুরে; তার দলছুট হয়ে হারিয়ে যাওয়া এই প্রথম নয়। পথ খুঁজে ফিরে আসবে, সেই ভরসাও নেই! একবার তো প্রায় পাশের গাঁ পর্যন্ত চলে গিয়েছিল, রাতের আঁধারে কোনো বুনো শেয়ালের পেটে পড়তে পারত, মাংসের লোভে এ গাঁয়ের কেউও… ভাবতেই শিউরে ওঠে রানী।
কমলির জন্য চিন্তা হলেও সঙ্গে সঙ্গে তার খোঁজে বেরোতে পারেনি রানী। ক’ মাস হলো, তার সংসারের ছন্দটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেছে। স্বামী মদন বড় শহরে গেছে কোন এক মন্দির গড়ার কাজে মজুর খাটতে। ছ’মাস আগে ধারকর্জ করে মদন তার আদরের বোন ইলার বিয়ে দিয়েছিল দুই গাঁ দূরে, সেই ধার শুধতেই এই শহরের কাজ ধরা। তার ফেরার কথা সেই শীতের গোড়ায়। ভাগ্যিস পোষা ছাগল ক’টা ভালোই দুধ দেয়, তাই বেচে আর এদিক ওদিক টুকিটাকি কাজ করে চালিয়ে নিচ্ছিল রানী আর তার বিধবা শাশুড়ি। এর মধ্যে হঠাৎ গত মাসে ইলা দাদার বাড়ি ফিরে এল। একদম একা, সঙ্গে স্বামী নেই, নেই শ্বশুরবাড়ির অন্য কোনো অভিভাবক।
না, ইলার কপালে বৈধব্য ঘটেনি। রঙিন কাপড়, গলায় মঙ্গলসূত্র, সব ঠিকই ছিল। কিন্ত সেই মঙ্গলসূত্রের নিচেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল একটা দগদগে কাটা ঘা। কেউ যেন ভারী কোনো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে। যখন এসেছিল, কোনো একটা রংজ্বলা শাড়ির ছেঁড়া টুকরো জড়িয়ে রেখেছিল ক্ষতস্থানে, পুঁজ রক্তে বড় ভয়ানক অবস্থা হয়েছিল তার। বৈদ্য মহারাজের হাতের গুণে কিছুটা নিরাময় হলেও, বিশ্রী একটা দাগ এখনও রয়ে গেছে। ঘাড় নাড়াতেও বড় কষ্ট হয় মেয়েটার। এমন হাসিখুশি, শান্ত মেয়ে ইলা, ঘরকন্নাও ভালোই জানে, তাকে এইভাবে আঘাত করল শ্বশুরবাড়ির লোকগুলো? কম যৌতুক তো দেয়নি মদন, তাদের গ্রামে কতজন অমন দেয়? তা যা হোক গিয়ে, এই অবস্থার সুরাহা শেষপর্যন্ত মদনকেই করতে হবে, সে ফেরা পর্যন্ত রানী আর তার শাশুড়িমার কাজ শুধু ইলাকে যত্ন করে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা। অনেক চেষ্টা করেও ইলার এ অবস্থা কী করে হলো, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জোগাড় করতে পারেনি রানী। কিছু জিজ্ঞাসা করলেই কখনও ভয়ে আর্তনাদ করে ওঠে ইলা, কখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আজকাল রানীও হাল ছেড়ে দিয়েছে।
বরঞ্চ ইলার মন ভালো করতে ওকে একটু একটু করে সংসারের ছন্দে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিল রানী। এক হপ্তা হলো শয্যা ছেড়ে রান্নাঘরে এসে বসেছে ইলা, হাতে হাতে আনাজ কোটা, চাল বাছা, মশলা বাটার কাজে হাতও লাগিয়েছে। অবস্থার উন্নতি দেখে আজ ভরসা করে ননদকে ছাগল চরাতে পাঠিয়েছিল রানী, তবে ইলা এখনও বোধহয় মানসিকভাবে ঠিক সেরে ওঠেনি, নইলে যে মেয়ে শুধু নিজেদের কেন, সমস্ত পাড়াপড়শির গরুছাগলের খোঁজ রাখত সে কিনা কমলির হারিয়ে যাওয়াটা টেরও পেল না?
রানীর এদিকে সারাদিন দম ফেলার ফুরসত নেই। কিছুদিন হলো গাঁয়ের পশ্চিম প্রান্তে কুটির বেঁধেছে এক মাঝবয়সী আগন্তুক, সামান্য মাসোহারার বিনিময়ে তার ঘরের সব কাজকর্ম করে দেয় রানী। সকালে একপ্রস্থ কাজ সারতে হয়, অল্প কিছু কাজ বিকেলেও। তবে এর ফলে সংসারের খরচে বেশ কিছুটা সুরাহা হয়ে যায়। সেখানে সবরকম কাজ সেরে ঘরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নামে। তারপর নিজের বাড়ির উঠোন নিকোনো, তুলসীতলায় প্রদীপ দেওয়া, শাশুড়িমায়ের সঙ্গে রান্নাবান্নার কাজে হাত লাগানো, এসব কাজ তো আর বসে থাকে না! সব গুছিয়ে যতক্ষণে কমলির সন্ধানে বেরোলো রানী, ততক্ষণে সুয্যি ঠাকুর পাটে। ধানক্ষেত ধরে কমলীর নাম ডাকতে ডাকতে সন্তর্পণে এগোচ্ছিল রানী; ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে তার ওই লণ্ঠনের আলোর আর কতটাই বা জোর! তবু সেই ক্ষীণ আলোয় যেটুকু চোখে পড়ল, তাতে একেবারে হাড় হিম হয়ে গেলো রানীর।
একটা মুণ্ডহীন ধড় আলপথ বেয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।
ভয়ে চিৎকার করতেও ভুলে গেল রানী। গ্রামের আর পাঁচ জনের মতো কন্ধকাটা ভুতের কথা সে ও শুনেছে বৈকি, ভূতপ্রেতকে অবিশ্বাস না করলেও এই আঠারো বছরের ক্ষুদ্র জীবনে কখনও ভুতের খপ্পরে পড়তে হয়নি তাকে। হনহন করে এগিয়ে আসছে কবন্ধ ছায়ামূর্তি, এই অন্ধকারেও রানী বুঝতে পারছে, তার গায়ে জড়ানো লালপেড়ে সাদা শাড়ি, গলার থেকে ভলকে ভলকে রক্ত এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার ঊর্ধ্বাঙ্গ; তার হাতদুটো সামনে বাড়িয়ে কী যেন ছুঁতে চাইছে সে, চুড়ি বালায় অল্প ঠুং ঠুং শব্দও কানে আসছে রানীর। পায়ে দুজোড়া নূপুরও রয়েছে মেয়েটার, আলতা রাঙানো, অপূর্ব সুন্দর তার দুই পা। আলতাই তো? নাকি রক্ত?
আর একটু হলে প্রসারিত হাতদুটো বোধহয় ছুঁয়েই ফেলত রানীকে। শেষ মুহূর্তে আলপথ থেকে লাফিয়ে সরে গেলো রানী। কবন্ধ নারীমূর্তিটিও এক মুহূর্ত না থেমে তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল দ্রুত পায়ে।
ভয়ে, বিস্ময়ে বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে গেল রানী। তারপর লণ্ঠন নিয়ে উল্টো পথে হাঁটা দিল সে; কমলির জন্য মনটা খুব কু গাইছিল, তবু তড়িঘড়ি ঘরে ফিরে এল।
রাতে সেভাবে ঘুমোতে পারল না রানী।
পরদিন জেগে দেখে, তুলসীমঞ্চের সামনে বসে নিবিষ্ট মনে ঘাস চিবোচ্ছে কমলি, যেন কিছুই হয়নি। তুলসীমঞ্চ ঘিরে এক প্রস্থ রক্তাক্ত পায়ের ছাপ। বড় সুন্দর সে পদচিহ্ন, যেন লাল রঙে আঁকা আলপনার মা লক্ষ্মীর চরণরেখা। তবে লাল রংটা রক্তের; সে নিয়ে এতটুকু সন্দেহ রইল না রানীর।
***
রানী তার এই অলৌকিক সাক্ষাৎকারের কথা কাউকে না জানালেও কন্ধকাটার গল্প চাপা রইল না বেশিদিন। এক’দিন মেথরপাড়ার হারু রাতের বেলা ফিরছিল দাইমার ঘর থেকে। তুমুল বৃষ্টি, সেই ঝড়ের রাতে প্রসববেদনা উঠেছে হারুর বউয়ের, কিন্তু ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে এ পাড়ায় আসতে চাইল না দাই। ফেরার পথে সেই কবন্ধ ছায়ামূর্তি চোখে পড়েছিল হারুর। ভয়ে প্রাণপণ ছুটতে ছুটতে ঘরে ফিরে এসে দেখেছিল হারু, পরম নিশ্চিন্তে আঁতুড়ঘরে ঘুমিয়ে রয়েছে তার বউ, সদ্যোজাত শিশুপুত্রটিকেও সাদা চাদরে মুড়ে কেউ রেখে গেছে তার পাশে। অস্থায়ী আঁতুড়ঘরের সেই বৃষ্টি ভেজা রোয়াকেও হারু স্পষ্ট দেখেছিল রক্তে ভেজা পায়ের ছাপ।
মাঝিপাড়ার ভেলুর রোগাভোগা ছেলেটার দিনের পর দিন ধুম জ্বর। কোথা থেকে এসে কে যেন রেখে গিয়েছিল ওষধি অনুপান, সেদিনও নাকি নাও বাইতে বাইতে ঘাটের কিছু দূরে ভেলু দেখেছিল সেই শিরবিহীন রক্তমাখা নারী অবয়ব। ওষুধ খেয়ে ভোরের আগেই তার খোকার জ্বর উধাও, আর এবারও তার কুঁড়েঘরের বাইরে সেই একই ধরনের পায়ের ছাপ।
ক্রমশ রটে গেল, প্রেতরূপ ধারণ করে কোনো দেবী ঘুরে বেড়ান গ্রামের পথে পথে, দুঃখী মানুষের যন্ত্রণা দূর করে যান। একেবারে প্রান্তিক, অস্পৃশ্য মানুষগুলোও তাঁর করুণায় বঞ্চিত হয় না। তাঁর কবন্ধ মূর্তি যা ভয়ের সঞ্চার করত প্রথম প্রথম, এখন তা চোখে পড়লে মানুষ আভূমি নত হয়ে প্রণাম করে।
"শুনেছ নাকি, ঠাকুর, এই নতুন দেবীর কথা?" আগন্তুকের উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে প্রশ্ন করে রানী।
অভিব্যক্তিহীন চোখে তার দিকে চেয়ে থাকে আগন্তুক। প্রয়োজন ছাড়া বিশেষ কথা বলে না মানুষটা, গাঁয়ের কেউও জানে না তার কী নাম, কাজটাই বা কী। একটা হেঁটো ধুতি ছাড়া কিছু পরিধান করে না ভদ্রলোক; রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রং, দাড়িগোঁফের আধিক্যে মুখের বেশিরভাগ অংশ দেখা যায় না। উজ্জ্বল দুটো চোখ আকৃতিতে সুন্দর, কিন্তু অদ্ভুত রকমের শীতল। লম্বা চুল মাথায় চুড়ো করে বাঁধা, একটু খর্ব হলেও বলিষ্ঠ পেশীবহুল দেহ, গলায় উপবীত। কুঁড়েঘরের দাওয়ায় বসে তীরের ফলায় চুপচাপ শান দিচ্ছিল লোকটা, রানী একতরফা বকবক করে চলে তার সঙ্গে।
"তোমরা বামুন, পুজো আচ্চা নিয়ে থাকো, ঠাকুরদেবতাদের কথা তোমাদের চেয়ে ভালো আর কে জানবে?" উঠোন সাফ করে উনুন জ্বালানোর কাজে মন দেয় রানী, "এমন কোনো দেবীর নাম জানো, যার মাথা নেই, অথচ সব মানুষের ভালো করে বেড়ায়?"
"আছেন এক মুণ্ডহীন দেবী। মা ছিন্নমস্তা। খড়্গ দিয়ে নিজের মস্তক নিজেই ছেদন করেন। বড় উগ্র অবতার। তিনি কুপিত হলে জগৎ ধ্বংস হয়ে যায়।"
"আমাদের দেবী এত বদরাগী নন ঠাকুর, ওসব ধ্বংসটংশ করে বেড়ান না। খড়্গ তরবারি নিয়ে মারকাটারির ধার ধারেন না, যার যা প্রয়োজন, রাতের বেলা এসে শুধু সেটুকু বর দিয়ে চলে যান।" আপন মনে বলে চলে রানী। "সারাদিন কোন মন্দিরে লুকিয়ে থাকেন, কেউ জানে না। রাতে গাঁয়ের পথে ঘুরে বেড়ান, যেন উদভ্রান্তের মতো কিছু খুঁজে চলেছেন। এমন বীভৎস গলাকাটা দেহ, চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ে গলা দিয়ে, রক্তে পোশাক ভিজে যায়; তবু তাঁকে দেখলে ভয় না হয়ে করুণাই হবে একরকম। যেন কোনো ভালো ঘরের বউ, কোনো পাপী-তাপী মানুষ এক কোপে গলা কেটে নিয়েছে, সেই ইস্তক কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন মা ঠাকরুন। বড় ভালো মানুষ, জানো? মানুষ, দেবী বা প্রেত, যাই হোন না কেন, সব্বার ভালো করে বেড়ান। যে মানুষগুলোকে কেউ কস্মিনকালে মন্দিরে ঢুকতে দেয় না, এমনকি তাদের ঘরে গিয়েও ইনি চুপিচুপি বর দিয়ে আসেন। এমন লক্ষ্মীমন্ত দেবীর এই অবস্থা হলো কে করলো, কে জানে! ভগবান করুন, এমন পাপিষ্ঠ যেন মরেও শান্তি না পায়!"
"হতে পারে, সে যে তার এই অবস্থা করেছে, সেও কোনো পরিস্থিতির শিকার, তাকে বাধ্য করা হয়েছে এই ঘৃণ্য কাজ করতে...আদতে হয়তো মানুষটা নিজেও এমন পাপ করতে চায়নি।"
"যা হোক কিছু একটা বললেই হলো? অস্ত্র দিয়ে কোপ মেরে একটা নরমসরম মেয়ের ধড়মুণ্ড আলাদা করে দিয়েছে পিশাচটা, আর তুমি বলছ পরিস্থিতির শিকার?" মিতভাষী মানুষটার কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে রানী। "বাপ মায়ের মুখে শুনেছিলাম একবার এ গাঁয়ে ডাকাত পড়েছিল, সে ইয়া মুশকো মুশকো লোক সব, মোটা মোটা গোঁফ, হাতে ধারালো খাঁড়া - তারা সোনাদানা, চালডাল সব লুটেপুটে নিয়ে গিয়েছিল; এ গাঁয়ের কটা লোক, লাঠি, রামদা নিয়ে বাধা দিতে গেলে খড়্গর ঘায়ে কাউকে মেরে ফেলেছিল, কাউকে জন্মের মতো পঙ্গু করে দিয়েছিল। আমাদের পাড়ার শিবু কাকাকেই তো দেখি, কাঁধ থেকে তার ডান হাত কাটা, এককালে চাষবাস করত, এখন শুধু দাওয়ায় বসে খায়দায় আর সারাদিন ডাকাতগুলোকে অভিশাপ দেয়! জানো ঠাকুর, সেই ভয়াল ডাকাতগুলো পর্যন্ত গ্রামের মেয়ে বউদের গায়ে একবারও হাত তোলেনি, তাদের মধ্যেও সেটুকু লজ্জাদ্বিধা ছিল...আর তুমি বলতে চাইছ এমন দেবীর মতো মেয়ের গলা নাকি একটা লোক 'পরিস্থিতির শিকার' হয়ে এভাবে কেটে ফেলেছে? তোমাদের মতো টোলে-পড়া বামুনদের ভাবনাচিন্তা যে কোন খাতে বয়, আমরা ছোটখাটো গরিব লোকেরা কোনোদিন তার তল পাই না।"
রানীর অনর্গল কথা শুনতে শুনতে একটু যেন কেঁপে ওঠে লোকটা, রানীর চোখে পড়ে না। ধারালো তীরগুলো তূণে গুছিয়ে রাখতে রাখতে মৃদুস্বরে রানীকে সে প্রশ্ন করে, "তুই নিজের চোখে দেখেছিস এই দেবীকে?"
কী যেন ভেবে রানী উত্তর দেয়, "আমি দেখিনি। তবে পরিচিত অনেকেই দেখেছে। রাতের আঁধারে না বেরোলে তাঁর দেখা মেলে না। খুব আতান্তরে না পড়লে গেরস্থ বাড়ির কে-ই বা রাতবিরেতে ঘর ছেড়ে বেরোয় বলো? তবে বিপদ যাই হোক না কেন, সবাই বলে, দেবীর দর্শনে সব বিপদের থেকে মুক্তি মেলে।"
***
শেষরাতে দুয়ারে শেকল তুলে চুপচাপ বেরিয়ে আসে রানী। আজ ঠিক করেছে, কাজে যাওয়ার আগে কুণ্ডে স্নান সেরে একবার দেবীর মন্দিরে একটু ফুল-নারকেল ঠেকিয়ে আসবে, মনটা কাল থেকে কেমন যেন কু গাইছে। মদন এত মাস ঘরের বাইরে, শাশুড়ি ননদের সব দায়দায়িত্ব রানীর, তার ওপর ইলাটাও বায়না ধরেছে তার সঙ্গে কাজে যাবে। এক দিক দিয়ে মন্দ বলেনি, ঘরের বাইরে বেরোলে মনটা ভালো থাকবে, অথচ কোনো কাজ দিয়ে একা পাঠানো যাবে না, সে অর্থে এই প্রস্তাবটা ভালোই। সঙ্গী থাকলে কাজও তাড়াতাড়ি চুকিয়ে ফেলতে পারবে রানী...তবু কোথায় যেন মনে হচ্ছে, ওই ব্রাহ্মণের বাড়ি ইলাকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।
যাত্রাপথে ওই অদ্ভুত লোকগুলোকে চোখে পড়ে গেল রানীর। দল বেঁধে তারাও চলেছে সব নাচতে নাচতে, ওই মন্দিরেরই দিকে। রংবেরঙের কাঁচুলি, ওড়না, ঘাঘরা পরে দেবীর জয়গান গাইতে গাইতে চলেছে পথ দিয়ে, অনেকে পায়ে নূপুরও পরেছে। আদতে এরা কেউই জন্মসূত্রে নারী নয়, তবু পরনে শাড়ি, গয়না, কপালে কুমকুমের টিপ। এদের দেখলে কেমন যেন গা গুলিয়ে ওঠে রানীর, গ্রামের মানুষও যে এদের তেমন পছন্দ করে, তা নয়। মন্দিরের আশপাশে কয়েকজনকে গান গেয়ে ভিক্ষা করতে দেখেছে বটে রানী, কিন্তু এত বড় দলের সঙ্গে এই প্রথম সাক্ষাৎ।
গ্রামের মানুষ এদের বলে, জোগাপ্পা। এরা নেচে গেয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায়, জাতের বিচারে অস্পৃশ্য না হলেও এই লোকগুলোকে গাঁয়ের মানুষ খানিকটা এড়িয়েই চলে। অদ্ভুত মানুষগুলোর মধ্যে কয়েকজন আবার ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলে! মা বাবা তাদের ত্যাজ্য করলেও জন্মসূত্রে উচ্চ ঘর; ভিক্ষা চাইলে তাদের অশ্রদ্ধাও করা যায় না, অথচ অস্বস্তি থেকে যায়। সকাল সকাল এদের মুখ দেখতে হলো, কেমন যে যাবে দিনটা, এই ভেবে একটু উদাস হয়ে গেলো রানী।
নারকেল, স্থলপদ্ম, জুঁইয়ের মালা, ধূপ, পাকা কলা - বেশ গুছিয়ে পুজোর থালা সাজিয়েছিল রানী। মন্দিরে ঢোকার মুখে এই নারীসুলভ পুরুষদের দুজন ঝাঁপিয়ে এসে পথ আটকে দিল তার। আকস্মিকতায় চমকে উঠল রানী, আরেকটু হলে পুজোর থালাখানা পড়েই যেত হাত থেকে।
"ও পুজোর থালা আমাদের দিয়ে দাও, মেয়ে!" একজন বলে ওঠে। "জগদম্বা আর তোমাদের ওই মন্দিরে নেই! সে এখন আমাদের ঘরের মেয়ে! তোমার পুজো না হয় আমরাই পৌঁছে দেব তাঁকে?"
রানী ভয় পেয়ে আঁচল দিয়ে থালা আড়াল করে। তার মুখের খুব কাছাকাছি মুখ এনে অন্যজন বলে ওঠে, "ভয় পাচ্ছ? অস্বস্তি, ঘৃণা হচ্ছে আমাদের দেখে? বিবমিষা জাগছে এই দেহে এই বস্ত্র, এই অলংকার দেখে? কেউ বোঝে না, সবাই তোমার মতো ঘৃণার চোখে তাকায়! শুধু দেবীই পারেন মা হয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতে। আর আমরা সন্তানরা যেমন ধন প্রাণ মান সম্মান সবকিছু পণ করে আগলে রাখি দেবীকে, তেমন করে তোমাদের বীরপুরুষরা কখনও পারবে না গো!"
রানী ভয়ে কাঁপতে থাকে, একতারা আর ঢোলকের সঙ্গে এদের সম্মিলিত দেবীকীর্তনের শব্দ আরও কাছে আসতে থাকে, অদ্ভুত এক মাদকতা সেই সুরে, তার সঙ্গে মিশে যায় তালে তালে নূপুরের নিক্কণ...কেমন যেন ঘোর লাগে রানীর, আর তার মধ্যেই সে বুঝতে পারে, সামনের এই লোকটার মুখাবয়ব তার বড় পরিচিত... কোথায় দেখেছে সে একে? সংবিৎ ফিরলে মনে হয়, ওই গ্রামের পশ্চিমপ্রান্তে থাকা যে আগন্তুকের বাড়িতে সে কাজ করে, সেই তার মুখের সঙ্গেই আশ্চর্য রকমের মিল রয়েছে এই স্ত্রীবেশধারী জোগাপ্পার। এদের কাপড়চোপড় পরবার ধরন স্বতন্ত্র, আগন্তুকের মাথায় চুড়ো বাঁধা চুল, অবিন্যস্ত দাড়িগোঁফ, পেশীবহুল দেহ; এই অর্ধপুরুষটির চুলে এলো খোঁপা, কপালে মস্ত কুমকুমের টিপ, অশ্মশ্রু মুখমণ্ডল, কানে ঝুমকো, দেহ জুড়ে নারীসুলভ পেলবতা; তবু তাদের দুজনের নাকচোখ যেন হুবহু এক, মুখের আদলটাও যেন এক ছাঁচে ঢালা! অস্বস্তিটা আরও চেপে বসে। পুজোর থালা শক্ত হাতে চেপে ধরে এই কীর্তনীয়ার দলটাকে কাটিয়ে মন্দিরের ভিতরে ঢুকে পড়ে রানী।
ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে কাকভোরে মন্দিরে এলেও পুজোটা সত্যিই আর দেওয়া হয়ে ওঠে না রানীর। পুরুত ঠাকুর নাকি আজ মন্দিরে এসে দেখেছেন, গর্ভগৃহ শূন্য, মাটির গভীরে প্রোথিত ওই প্রস্তররূপিণী স্বয়ম্ভূ দেবীমূর্তি বেমালুম মিলিয়ে গেছে, দেবীর আর চিহ্নমাত্র নেই কোথাও।
"তবে উপায় কী যজমান ঠাকুর?" কাঁদো কাঁদো গলায় প্রশ্ন করে রানী। "দেবী কি কোনো কারণে গ্রামবাসীদের উপর রেগে গিয়ে মন্দির ছেড়ে চলে গেছেন? আর দর্শন মিলবে না কোনোদিন? এ গাঁয়ের কেউ আর কোনোদিন পুজো দিতে পারবে না তাঁকে? আপনি পারেন না কোনো যজ্ঞটজ্ঞ করে দেবীমাকে ফিরিয়ে আনতে?"
পুরুত ঠাকুরকে বিন্দুমাত্র চিন্তিত মনে হয় না। উদাস হেসে বলেন, "ওরে মেয়ে, জগদম্বা নিজে আবির্ভূতা হয়েছিলেন, চলেও গেছেন স্বেচ্ছায়, তাঁকে ধরে রাখার আমি কে?" পুজোর উপাচার গুছিয়ে রাখতে রাখতে তিনি বলেন, "তবে আমার মন বলছে, তিনি ফিরে আসবেন। আজ রাতে বড় শুভলগ্ন, আমি বরণডালা সাজিয়ে অপেক্ষায় থাকব। আমার ভীষণভাবে মনে হচ্ছে, দেবী আজ নতুন রূপে ফিরে আসবেন।"
ভারাক্রান্ত মনে ঘরে ফেরে রানী। সাতসকালে এই লোকগুলোর মুখ দেখেছে বলেই বোধহয় দিনের এমন সূত্রপাত! পুজোর ডালি সাজাতে কম খরচ হয়নি, এক এক করে ফুল, ফল সবগুলো গৃহদেবতাকেই নিবেদন করে দেয় রানী। মাটিতে চাটাইয়ের ওপর শুয়ে ইলা এখনও মরার মতো ঘুমোচ্ছে, ওকে না জাগিয়েই বেরিয়ে আসে বাড়ির বাইরে। সত্যিই বড় অদ্ভুত কাটল সকালটা।
***
বিকেলে ইলাকে সঙ্গে নিয়ে কাজে বেরোলো রানী। পড়ন্ত আলোয় যেন তার গলার ক্ষতচিহ্নটা কেমন জ্বলজ্বল করছে। পথ চলতে চলতে আলতো করে স্পর্শ করে রানী।
"বড় যন্ত্রণা, তাই না রে?"
আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে ইলা। "বড্ড ব্যথা। শরীরে, মনে, সবখানে!"
"তোর শাশুড়ি, স্বামী কাউকেই তো তেমন খারাপ মনে হয়নি রে! কে করল এই দশা? তুইও তো বলতে চাস না কিছু!"
"ওরা কেউ আঘাত করেনি তো! ওরা শুধু সব কিছু দেখে আমায় বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ব্রহ্মশাপের ভয়ে!"
রানী শুনতে থাকে। ইলা যখন আজ মুখ খুলেছে, তাকে বলতে দেওয়া প্রয়োজন।
"সেই রাতের শেষ প্রহরে সবাই ঘুমিয়ে কাদা। কেন জানি না, আমার ঘুম আসেনি। গোয়ালঘরে একটা সামান্য শব্দ শুনে ছুটে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম এক বউ, বয়স ঠাওর হলো না, হয়ত মা বা শাশুড়ি মায়ের মতোই বয়স হবে, হয়তো আরও বড়...তবে অপূর্ব সুন্দরী, আর আগুনের মত তেজ! মনে হলো খুব বড় ঘরের বউ! গোয়ালে খড়ের গাদার আড়ালে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে! আলুথালু বসন, খোঁপার ছিরিছাঁদ নেই, ঘামে, চোখের জলে কাজল সিঁদুর লেপ্টে গেছে, তবুও কী অসাধারণ তাঁর রূপ! আমায় দেখে হাতজোড় করে বলল, 'দোহাই তোমার, আমায় আশ্রয় দাও, লুকিয়ে থাকতে দাও ক’দিন! ওরা আমায় মেরে ফেলবে!’
আমি তো শুনে অবাক। ছুটে গিয়ে এনে দিলাম একটু মুড়ি, খাওয়ার জল, গায়ে দেওয়ার চাদর। বললাম, ‘মা ঠাকরুন, কে মারবে তোমায়?’
ধাতস্থ হয়ে বলল, 'আমার নিজের পেটের সন্তান, গো! ওদের বাবা আদেশ দিয়েছেন, মাকে হত্যা করে পিতৃভক্তি প্রমাণ করতে হবে, বড় ছেলেরা কেউ রাজি হয়নি, অভিশাপ দিয়ে তাদের পৌরুষ কেড়ে নিয়েছেন আমার স্বামী, সন্তান বলে কাউকে রেয়াত করেননি উনি। আর আমার ছোট ছেলে, আমার সবচেয়ে আদরের সন্তান, যাকে সাক্ষাৎ ভগবানের বরপুত্র ভাবতাম, সে এক কথায় রাজি! অস্ত্র নিয়ে তেড়ে এসেছিল আমার দিকে, সেই ইস্তক পালিয়ে বেড়াচ্ছি আমি। দোহাই তোমাদের, আমায় ক’দিন লুকিয়ে থাকতে দাও, বিপদ কেটে গেলে আমি নিজেই চলে যাব। হয় কোনো মন্দিরে সেবিকা হয়ে, কিংবা অরণ্যের গভীরে কুটির বেঁধে কাটিয়ে দেব... মৃত্যু অনিবার্য জানি, কিন্তু আমার ছোট্ট ছেলেটা, বড় সহজ সরল অবুঝ, ও বুঝতে পারছে না কী পাপ করতে চলেছে, আমি চাই না ওর হাতে আমার রক্ত লাগুক!"
রানী শিউরে ওঠে। এমনও হয়? সন্তান মাকে হত্যা করার জন্য তাড়া করে বেড়ায়? সে শুনতে থাকে, ইলাকে বাঁধা দেয় না।
"প্রায় দু-তিন সপ্তাহ লুকিয়ে ছিলেন ঠাকরুন আমাদের গোয়ালে। সেই ক’দিন কাউকে গোয়ালের কাজ করতে দিইনি, যাতে কেউ তাঁর কথা জানতে না পারে। মা ঠাকরুন কত কিছুই যে শিখিয়ে দিয়েছিলেন আমায় সেই ক’দিনে! কোন শিকড় বেটে গরম তেলে মিশিয়ে মালিশ করলে শাশুড়ির বাতের ব্যথার উপশম হয়, কীভাবে সদ্যজাত বাছুরের যত্ন করতে হয়, কীভাবে কর্পূর মিশিয়ে পরমান্নের স্বাদ বৃদ্ধি করতে হয়, আরও কত কী! কিন্তু আমাদের কপালে সইল না আন্নি।"
"কী হলো তারপর?" রানী মন দিয়ে শুনতে থাকে। দূর থেকে জোগাপ্পাদের দেবীকীর্তন ভেসে আসে। আজ লোকগুলোর হলো টা কী, সেই ভোররাত থেকে গ্রাম জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে!
ইলা বলে চলে, "তারপর এল সেই অভিশপ্ত দিন। ওদের বাড়ির কোন গুরুপুত্র গ্রামে এসে ওদের দাওয়ায় গেড়ে বসল, পরিবারের নতুন বউ হিসেবে আমার উপর পড়ল সব সেবার ভার। অদ্ভুত একটা লোক, জানো! গলার স্বরে, চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত শীতলতা, কোথাও এতটুকু আবেগের লেশমাত্র নেই। আর কোনো রাজসৈনিককেও এত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘুরতে দেখিনি, যতটা এই ব্রাহ্মণ গুরুপুত্রের সঙ্গে... তূণভর্তি তীর, বিশাল ধনুক, খড়্গ, কুঠার! কী যে কঠিন ছিল সে ক’দিন লুকিয়ে লুকিয়ে গোয়ালে গিয়ে মা ঠাকরুন কে অন্নজল পৌঁছে দেওয়া!"
রানীর মনটা আবার প্রবল ভাবে কু গেয়ে ওঠে। তারা আগন্তুকের বাড়ির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জোগাপ্পাদের সম্মিলিত কীর্তন, একতারার পিড়িং পিড়িং, নূপুরের শব্দ - এগুলোও যেন দ্রুত এগিয়ে আসছে এই কুটিরের দিকে।
ইলার গলা কেঁপে ওঠে। "এ আমায় কোথায় নিয়ে এলে, আন্নি? এ বাড়িতেই বুঝি কাজ করতে আসো প্রতিদিন?"
রানী ওর ভয়ের কারণ বুঝতে পারে না। ননদকে জড়িয়ে ধরে বলে, "কী হয়েছে রে ইলা? এখানেই তো রোজ কাজ করি আমি, তুই এমন ভয় পাচ্ছিস কেন?"
ইলা কাঁপা কাঁপা হাতে আঙুল তোলে দাওয়ায় রাখা আগন্তুকের অস্ত্রসম্ভারের দিকে। "এত অস্ত্র কেন? কে এই আগন্তুক?"
"সে আগন্তুক অস্ত্র নিয়ে কী করে সে খবরে আমার কাজ কী? আমি ঘরদোর পরিষ্কার করি, রান্নাবান্নার আয়োজন করে দিই, বিনিময়ে ... ওকি রে ইলা, এত ভয় পাচ্ছিস কিসের?"
"ওই তীর ধনুক, ওই কুঠার! ও আমি জন্মেও ভুলব না আন্নি! সেদিন আমি পায়েস রেঁধেছিলাম। মা ঠাকরুন যেমন শিখিয়েছিলেন, ঠিক তেমন করে! ওই গুরুপুত্রটি মুখে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো, তারপর বলল, 'কোথা থেকে শিখেছ এই রন্ধনপ্রণালী? সত্যি করে বলো, নইলে এই কুঠারের কোপে…' আমি পায়ে পড়ে বললাম, রান্না ভালো হয়নি ঠাকুর? ক্ষমা করে দিন, আমি না হয় আরেকবার রেঁধে আনব...লোকটা এক ঝটকায় কুঠার তুলে নিল, বলল, 'সত্যি করে বল, কে শিখিয়েছে এই রান্না...মাথার উপর ওই উদ্যত কুঠার, আমি সে দৃশ্য কোনোদিন ভুলব না আন্নি!! লোকটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে আমার মাথার ওপর দিয়ে দুলিয়ে সে কুঠার দিয়ে গলার কাছে আঘাত করলো আমায়, আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলাম, আর ঠিক সেই মুহূর্তে..." ইলার চোখ বিস্ফারিত, ভয়ে, যন্ত্রণায়।
"কী হলো সেই মুহূর্তে?" ইলার ভয়টুকু ক্রমশ রানীর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। জোগাপ্পারা গান গাইতে গাইতে এ বাড়ির একদম কাছে চলে এসেছে।
"ঠিক সেই মুহূর্তে সেই মা ঠাকরুন গোয়াল থেকে ছুটে এসে আমায় ঠেলে সরিয়ে দিল পথ থেকে। খুব শান্ত গলায় বলল, 'রাম, আমি এখানে। ইলা বড় ভালো মেয়ে, আমায় শাস্তি দিতে গিয়ে ওকে আঘাত কোরো না পুত্র।' তাঁর কণ্ঠে আর এতটুকুও ভয় নেই, দ্বিধা নেই, পালানোরও কোনো চেষ্টা করলেন না তিনি । ওই নরপিশাচের সামনে শান্তভাবে মাথা পেতে দিলেন, আর লোকটাও কুঠারের এক কোপে... বড় ভয়াবহ সেই দৃশ্য, ধুনির আগুনে গিয়ে ছিটকে পড়ল সেই দেবীতুল্য মানুষটার কাটা মাথা, অমন অপরূপ মুখশ্রী, অমন কেশরাশি, মুহূর্তে ঝলসে শেষ! ততক্ষণে বাড়ির সবাই বেরিয়ে এসেছে, একজনও প্রতিবাদ করল না, মাটিতে লুটিয়ে পড়া রক্তমাখা নারীদেহের দিকে তাকিয়ে কারুর মনে কোনো প্রশ্ন জাগলো না, আমার গলার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে, সেই আমার দিকেও সাহায্যের হাত বাড়াল না কেউ। শ্বশুরঠাকুর শুধু বলল, 'তুমি এবার এসো, বউমা! আমাদের গুরুপুত্র যার ওপর এত অসন্তুষ্ট, তাকে আবার ঘরে তুললে অভিশাপ লাগবে।' সেই থেকে এই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি, শরীরে, মনে…রক্ত বন্ধ করতে গলায় নিজের ওড়নার খণ্ড বেঁধেছিলাম...মনের ব্যথার ওপর কীসের বাঁধন দেয় জানি না!"
গ্রীষ্মসন্ধ্যাতেও অসহ শীতবোধ হয় রানীর। জোগাপ্পাদের দলটা গাইতে গাইতে ঢুকে পড়ে ঘরের আঙিনায়। খর্ব পেশীবহুল আগন্তুকটি বেরিয়ে আসে।
"এই সে মানুষ। আমার গলার এই ক্ষত, এরই দেওয়া!" ইলা চিৎকার করে ওঠে। রানী শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার ননদকে।
আগন্তুক এসে সম্মুখীন হয় জোগাপ্পাদের দলটার। শীতল স্বরে বলে ওঠে, "কেন এসেছ? কী চাও আমার কাছে?"
সকালে রানীর দেখা সেই নপুংসকদ্বয় এখনও দলের পুরোভাগে। তারাই এগিয়ে আসে। আরও দু’জন আসে তাদের পিছন পিছন। আগন্তুকের সঙ্গে তাদেরও মুখের আদলে লক্ষণীয় সাদৃশ্য।
"অগ্রজদের অভিবাদন জানাবে না, রাম? নাকি পিতার অভিশাপের ফলে সেই সম্মানের অধিকারও হারিয়েছি আমরা?" দৃঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন করে দলের পুরোধা।
করজোড়ে সামান্য নতমস্তক হয় আগন্তুক। "অগ্রজ রুক্মবান, সুহোত্র, বসু ও বিশ্বাবসুর চরণে রামের প্রণাম। সব কিছু এত দ্রুত বদলে যাবে, ভাবতে পারিনি!"
"তুমিই বদলে দিয়েছ সব।" সুহোত্র নামক জোগাপ্পার কণ্ঠে স্পষ্ট বিদ্রূপ। "তুমি নাকি মায়ের বহু প্রার্থনার সন্তান, স্বয়ং ঈশ্বরের বরপুত্র, অধিক বয়সে, দুঃসহ প্রসবযন্ত্রণা ভোগ করে তোমায় পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলেন মা? আর সেই গর্ভধারিণীকে তুমি কিনা…"
"আমায় ক্ষমা করো, অগ্রজ। আমি পিতার অভিশাপ কাঁধে নিয়ে তোমাদের মতো নির্বীর্য হতে চাইনি। এত বছরের সাধনা এই অস্ত্রবিদ্যা, এই রণপারদর্শিতা--পৌরুষ ছাড়া এর সবটুকুই নিষ্ফল। সেই পুরুষকারকে ধরে রাখতে চাওয়া কি ভুল?"
"মাতৃহত্যার বিনিময়ে রক্ষিত পৌরুষের দর্প দেখাচ্ছ, রাম?" গর্জে ওঠে বিশ্বাবসু।
"মাও তো নিরপরাধ ছিলেন না।" প্রবল দ্বিধা আগন্তুকের কণ্ঠে।
"কার বিচারে অপরাধী, নিরপরাধের নির্ণয়, রাম? তপস্যাকালে অপ্সরী বা কিন্নরীদর্শনে মুনিঋষিদের নিত্য স্খলন ঘটে। কেউ তাদের অভিশাপ দেয় না, এতটুকু শাস্তি দেয় না, আর মা আকস্মিকভাবে কামার্ত গন্ধর্ব-গান্ধর্বীর মিলনমুহূর্ত দেখে ফেলেছিলেন বলে তাঁর প্রাপ্য মৃত্যুদণ্ড? তাও তাঁর আত্মজের হাতে?" রুক্মবান বলে ওঠে।
বসু নামক জোগাপ্পাটিও এগিয়ে আসে। "আমরা জীবনভর ক্লীবত্বকে বরণ করে নিয়েছি, রাম, তবু মায়ের গায়ে আঁচড়টুকু লাগতে দিইনি, আর তুমি তাঁর সবচেয়ে আদরের সন্তান হয়ে কিনা অস্ত্রের আঘাতে এইভাবে...? সত্যি ধন্য তোমার কুঠার, পরশুরাম! যে পরশু দিয়ে জননীর প্রাণহননের মত অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়!"
বিদ্রূপে জর্জরিত পরশুরাম বসে পড়েন মাটিতে। "জানি এর প্রায়শ্চিত্ত সম্ভব নয়। তাঁর চরণে ক্ষমাপ্রার্থনা করব, সে সুযোগও তো নেই।" প্রথম বুঝি পরশুরামের কণ্ঠে অনুতাপের সুর, চোখে অপরাধবোধের ছায়া। রানী অবাক হয়ে দেখে, এই স্বল্পবাক মানুষটির চির-অভিব্যক্তিশূন্য চোখ আজ অশ্রুধারায় ভেজা!
আকাশ এখন প্রায় অন্ধকার। জোগাপ্পাদের দলের ভিতর থেকে সামনে এসে দাঁড়ায় সেই মস্তকহীন নারীমূর্তি। পরম মমতায় সে হাত রাখে পরশুরামের মাথায়। তাঁর কাঁধ বেয়ে ঝরে পড়ে শোণিতধারা, যেন আশিসবিন্দু হয়েই স্পর্শ করে সন্তানের মস্তক।
তাঁর পা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন পরশুরাম। "মা, আমি পাপ করেছি, মহাপাপ! নিজের পৌরুষকে ধরে রাখব, আমার তপঃসিদ্ধ পিতার কাছ থেকে বরলাভ করব, শুধু সেই লোভে…জানি আমার পাপের ক্ষমা হয় না, মা। তবে পিতা বলেছিলেন যদি কোনো নারী স্বেচ্ছায় তাঁর মস্তক দান করেন, তাহলে পুনরায় প্রাণ ফিরে পাবে তুমি, মা। অবশ্য এভাবে স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণ দিতে সম্মত হবে, এমন নারী কোথায়, আমার জানা নেই।"
রানীর বাহুবন্ধন ছাড়িয়ে দ্রুত পরশুরামের সামনে ছুটে আসে ইলা। জানু পেতে তার সামনে মাটিতে বসে বলে, "গলায় এই ক্ষতযন্ত্রণা নিয়ে, স্বামীপরিত্যক্তা হয়ে বেঁচে আর কতই বা সুখ পাব, ঠাকুর? আপনি আমার মাথাই নিন, অভাগিনী ইলার বিনিময়ে মা ঠাকরুন প্রাণ ফিরে পেলে বরং বহু মানুষের উপকার হবে।"
পরশুরাম কুঠার উত্থিত করেন। রানী চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু তার কণ্ঠ থেকে কোনো আওয়াজ বেরোয় না। জ্ঞান হারানোর আগে রানীর কানে আসে, জোগাপ্পা দলের চিৎকার, “জয় মা রেণুকার জয়! জয় ইলাম্মার জয়!”
***
পুরোহিতের ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছিল। মন্দিরের শূন্য গর্ভগৃহে সেদিন আবির্ভূত হয়েছিলেন অদ্ভুত এক দেবীপ্রতিমা; তিনি গৌরাঙ্গী, কিন্তু তাঁর মুখাবয়ব কৃষ্ণবর্ণ। ব্রাহ্মণদের কাছে তিনি রেণুকা দেবী, তবে অধিকাংশ মানুষই দেবীকে বলে, ইলাম্মা বা ইয়েল্লাম্মা। আর রূপান্তরকামী মানুষের কাছে আজও তিনি পরম পূজনীয়া।
--------- সমাপ্ত----------
নেপথ্যের কিছু পৌরাণিক ও আঞ্চলিক কাহিনী
পুরাণের গল্প - জমদগ্নি মুনি বিবাহ করেছিলেন ক্ষত্রিয় রাজকুমারী রেণুকাকে। তাঁদের প্রার্থনায় তুষ্ট হয়ে তাঁদের কনিষ্ঠ সন্তান হিসাবে জন্ম নেন রাম - ভগবান বিষ্ণুর এক অবতার। ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি ক্ষত্রিয়দের মতো বহু অস্ত্রবিশারদ ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। পরে শিবের বরে তিনি দৈব কুঠার বা পরশু লাভ করেন, তাই থেকেই তাঁর নাম পরশুরাম।
রেণুকা একবার নদীতে জল আনতে গিয়ে জনৈক গন্ধর্ব গান্ধর্বীর সংগম দৃশ্য দেখে ফেলেছিলেন, সেই অপরাধে জমদগ্নি ক্রুদ্ধ হয়ে সন্তানদের মাতৃহত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার সন্তান অসম্মত হলে জমদগ্নির অভিশাপে তাদের পৌরুষ হারাতে হয়। পরশুরাম পিতৃ আদেশ পালন করেন। জমদগ্নি এই পিতৃভক্তি দেখে সন্তুষ্ট হয়ে বর দিতে চাইলে পরশুরাম মায়ের জীবন প্রার্থনা করেন। জমদগ্নি রেণুকাকে পুনরুজ্জীবিত করে তাঁকে সংসারে ফিরিয়ে আনেন।
দক্ষিণ ভারতের প্রচলিত লোককাহিনী - জমদগ্নি বলেছিলেন, কোনো রমণী স্বেচ্ছায় তাঁর মস্তক নিবেদন করলে তবেই রেণুকার পুনর্জীবন সম্ভব। ইয়েল্লাম্মা নামক এক অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্ণের মেয়ের (সম্ভবত রেণুকার সহচরী বা দাসীর) আত্মদানে রেণুকা প্রাণ ফিরে পান। দক্ষিণ ভারতে রেণুকা বা ইয়েল্লাম্মা দেবীর কয়েকটি মন্দির রয়েছে। রূপান্তরকামী মানুষ (স্থানীয় মানুষ তাদের জোগাপ্পা বলে) ইয়েল্লাম্মা দেবীকে নিজেদের ইষ্টদেবী মনে করে।