• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | গ্রন্থ-সমালোচনা
    Share  
  • ফিরে দেখাঃ নিশিকুটুম্ব: আলো-আঁধারি আখ্যান : সৃজা মণ্ডল

    নিশিকুটুম্ব; — মনোজ বসু; প্রকাশক— বেঙ্গল পাবলিশার্স; প্রথম প্রকাশ- আগস্ট ১৯৬০

    প্রান্তিক জনসমাজ, যেখানে সূর্যের আলো আজ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি— অনাহুত, অবাঞ্ছিত এক পেশাজীবী, রাত্রিকালীন আগন্তুক, লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপনে যাদের কর্মতৎপরতা, ধৃত হলে শাস্তি যাদের অনিবার্য পরিণতি, কুটুম্বের মতো আদরণীয় নয় যারা মোটেই, সেই নিশিকুটুম্বরা সাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কারে স্বীকৃত মনোজ বসু’র দুখণ্ডের দীর্ঘ উপন্যাস ‘নিশিকুটুম্ব’-এ। ‘নিশিকুটুম্ব’ বাংলা সাহিত্য তথা আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। পাঠকনন্দিত এই বিখ্যাত উপন্যাস পুস্তকের মুদ্রিত রচনাকাল ১৯৬১। চৌষট্টি কলার অন্যতম চৌর্যবিদ্যা যে উপন্যাসের বিষয়বস্তু হতে পারে, বাংলা ভারতীয় এবং পৃথিবীর সাহিত্যে মনোজ বসু তার প্রথম নজির দেখালেন। বিশালায়তন উপন্যাসটির অধ্যায় থেকে অধ্যায়ান্তরে উন্মোচিত হতে থাকা নিশাচর কিছু মানুষের করুণ জীবনের ইতিবৃত্ত, ঘটনা-দুর্ঘটনা, অভিজ্ঞতার সমন্বয়— পাঠ শেষে এক গভীর করুণায় দ্রবীভূত হয় পাঠকমন। নিশিকুটুম্বদের গড়ে ওঠার করুণ নিষ্ঠুর ইতিবৃত্ত বলতে বলতে লেখক পৌঁছে যান মানবাত্মার সুকুমার বৃত্তির উন্মেষের চিরন্তন উপলব্ধিতে।

    এ বছর মনোজ বসু-র ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী। বিচিত্র মানব-সম্পর্কিত কৌতূহল লেখককে ‘নিশিকুটুম্ব’ রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। নিজ সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য ও বহুমুখিনতা সম্পর্কে দিল্লিতে সাহিত্য আকাদেমি আয়োজিত সাহিত্যিক সম্মেলনে (১৯৬৭ সাল, মার্চ) লেখক বলছেন:

    “...উপন্যাস লিখতে বসে কয়েকটি বৃদ্ধ চোরের সঙ্গে ভাব জমিয়ে তাদের অতীত কথা শুনলাম। শুনে রোমাঞ্চ লাগে, ঘৃণ্য চৌরকর্মের মধ্যেও আশ্চর্য মানবিকতা মাঝে মাঝে তাদের জীবনে ঝলক দিয়ে গেছে।...এত কালের অনাবিষ্কৃত এক আশ্চর্য জগৎ— নিশিকুটুম্ব বইয়ে সেই বিচিত্র জগতের পরিচয়।...তাদের চলাচল নিশিরাত্রে...তাদের অলিখিত আইন আছে, সেগুলি তারা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। সুনিপুণ কর্মবিভাগ ও নিয়মশৃঙ্খলা।... চোরদের মতন সাধু অতিশয় বিরল। সাধুরা কামিনী কাঞ্চনে বীতরাগ, চোরের ক্ষেত্রে ঠিক অর্ধেক-কাঞ্চন লিপ্সু তারা, কিন্তু কামিনীতে অনীহা। লেখকের হাত নিশপিশ করে এমন জিনিস নিয়ে লিখতে।”
    চোরদের জগৎ ও জীবন রহস্যময়। সুকঠিন অধ্যাবসায়ে লেখক সেইসব অজানিত রহস্য ও সত্য আবিষ্কার করেছেন— “ন্যাশনাল লাইব্রেরী ও এশিয়াটিক সোসাইটিতে পড়াশুনো করেছি এই বিষয় নিয়ে। যত ভিতরে ঢুকি, বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। ... মহাদেবের পুত্র দেব-সেনাপতি স্কন্দ বা কার্তিকেয় চোরশাস্ত্রের প্রবর্তক— চোরের অধিদেবতা তিনি। ... বাংলার চোরসমাজে স্কন্দ ছাড়াও এক দেবী ঢুকে পড়েছেন—কালী। ... নিজে তিনি সযত্নে চুরিবিদ্যা শেখাচ্ছেন, চোরকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।” এইসব সংগৃহীত তথ্য ও সত্যের সঙ্গে লেখক অত্যাশ্চর্যভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন তাঁর কল্পনা। চোরদের জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন তিনি। তাই রচনার মধ্যে ঘৃণা চৌর্যকর্মের সম্পর্কে লেখকের ঘৃণা প্রকাশ পায়নি, তাদের জন্য বরং অসীম মমতা ও সহানুভূতি অনুভব করেছেন। চোরদের জীবনে তাই ‘সমাজের আদিম পাপের’ চেহারাই শুধু ফুটে ওঠেনি, পরিপূর্ণ মানবিক মহিমায় তারা ভাস্বর। মানুষকে ভালো না বাসলে এরূপ উপলব্ধি সম্ভব নয়। এর থেকে উপেক্ষিত অবহেলিত মানুষদের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধার পরিচয় পাওয়া যায়।

    এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাহেব। গঙ্গার ঘাটে কুড়িয়ে-পাওয়া ছেলে। তার পিতৃমাতৃ-পরিচয় অজ্ঞাত। সে জানে পকেটমার নফরকেষ্ট তার বাবা আর মা সুধামুখী। বলাধিকারী বলেন স্বয়ম্ভু। এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তার। জন্মমাত্র গঙ্গাঘাটে নবজাতককে ত্যাগ করে যারা, তাদের অবয়ব বয়ে নিয়ে চলাতে বরং কুণ্ঠিত সাহেব। কিন্তু জীবনে স্নেহবঞ্চিত নয় সে— সুন্দর সুদর্শন চেহারা সকলের মন জয় করে। তাকে দেখলেই বাৎসল্যের উদয় হয় মনে। সুধামুখী তাকে মায়ের স্নেহ উজাড় করে দিয়েছে। কুড়িয়ে পাওয়া শিশুটিকে নিজের হারানো সন্তানসম বুকে তুলে নিয়ে ‘ভদ্রলোক’ করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলেও, সুধাময়ীর সে স্বপ্ন পরাজিত হয় রূঢ় প্রয়োজনের কাছে। ক্ষুন্নিবৃত্তির নিষ্ঠুর প্রয়োজনে, রানীর কানের মাকড়ি চুরির মধ্য দিয়েই নিশিকুটুম্ব হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু সাহেবের। চোর হওয়ার প্রথম দীক্ষা সাহেব পায় নফরকেষ্টর কাছে। পচা বাইটা তার আসল শিক্ষাগুরু। কিন্তু অজ্ঞাতকুলশীল পিতার জন্য সাহেব ব্যাকুল। এই মনোবেদনার উদ্ঘাটন হয়েছে উপন্যাসের প্রথম পর্বে। দ্বিতীয় পর্বে লেখক সাহেবের চৌর্যবিদ্যা-শিক্ষা এবং তার নিপুণ প্রয়োগের বিভিন্ন ঘটনার কথা লিখেছেন।

    সাহেবের জীবন-বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে পারুল, রানী, সুভদ্রা, আশালতা, নমিতা, মধুসূদন, নটবর, বলাধিকারী, নফরকেষ্ট প্রমুখ চরিত্ররা। তাই এই উপন্যাস শুধু সাহেবের গল্প নয়, ভদ্রঘরের মেয়ে সুধামুখীর গণিকা হওয়ার গল্প, নফরকেষ্ট-এর ভদ্র হওয়ার গল্প, সৎ পুলিশ অফিসার বলাধিকারীর চোরের মহাজন হওয়ার গল্প, কাজলীবালার সরলতার গল্প, চোরকে স্বামী মনে করে আশালতার গয়না হারানোর গল্প, মধুসূদনের আজীবন চোরকে ফাঁসি দেওয়ার ইচ্ছা থাকার পরেও নিজে চোর হওয়ার গল্প, আর ক্ষুদিরাম ভট্টাচার্যের পাহারাদার থেকে চোর হওয়ার গল্প।

    কেন সুধামুখী বাধ্য হয় নিষিদ্ধ পল্লীর জীবন বেছে নিতে? কেন আত্মহত্যায় মুক্তি খুঁজে নিতে হয় ভুবনেশ্বরীর, কেন সৎ দারোগা জগবন্ধু আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় অন্ধকার জগতের কাছে, কেন প্রথাবদ্ধ গার্হস্থ্য জীবনের স্বপ্ন নিয়ে রানীকে হারিয়ে যেতে হয় নিষিদ্ধ জীবনে, কেন সুপণ্ডিত হয়েও বদনাম ঘোচে না পচা-বাইটার ছেলে মুকুন্দের? লেখক এইসব প্রশ্নের উত্তর রেখে যান নির্মোহ স্বাভাবিক বর্ণনায়। যেমন আসে সুধামুখীর কথা- “সতেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল সুধামুখীর, বিশ বছরে সব ঢুকিয়ে বুকিয়ে বাপের বাড়ি উঠলো”, তারপর বৈধব্যের কঠোর সংযমের ফাঁক গলে বয়সের স্বাভাবিকত্বে জীবনে যে পুরুষ আসে পিতৃত্বের দায় অস্বীকার করে পালায় সে। উপায়হীন জীবনে সুধামুখী তো সৎপথই খুঁজে নিতে চেয়েছিল নবজাতক আত্মজার হত্যা মেনে নিয়ে, প্রেমিকের প্রতারণা ভুলে। কিন্তু সমাজ এমন কী নিজের পরিবারও তো সহমর্মিতার হাত বাড়ায়নি তার দিকে। বরং তারাও ধিক্কারে ধিক্কারে জর্জরিত করেছে তার ব্যক্তিজীবন। লেখক যখন খুব নির্মোহ স্বাভাবিক বর্ণনায় সুধামুখীকে পৌঁছে দেন নিষিদ্ধ পল্লীতে, তখন আমরা পাঠক আর সুধামুখীকে দোষী সাব্যস্ত করি না। নারীর চিরন্তন গৃহজীবনের আকাঙ্ক্ষা ও সন্তান-স্নেহ পরিপূর্ণ হয় না বলে পতিতারা জীবনে ভীষণ রিক্ত। রানী তাই বলে, “একটা ভিখারি মেয়ের যা আছে, তা ও যে আমার নেই।”

    মানুষের হৃদয়হীনতা ও নিষ্ঠুরতার যারা শিকার, তাদের দুঃখে মানবতাবাদী লেখকের মন আর্দ্র— বড় দুঃখে সুধামুখীও বলে, “আমাদের ভালবাসা জীইয়ে রাখতে কি কষ্ট রে পারুল।” পাপ নয়, পাপীই হয়েছে লেখকের সহানুভূতির আশ্রয়। তাদের দুঃসহ যন্ত্রণায় নিষ্ফল মাথা কোটা লেখকের সমবেদনা আকর্ষণ করে। মানুষের লালসার শিকার হয়েও সুধামুখী পারুল মাতৃত্বকে বিসর্জন দেয়নি, রানী বিসর্জন দেয়নি তার প্রেমকে। ‘নিশিকুটুম্ব’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সাহেব— ‘জন্মই যার আজন্ম পাপ’, চুরির মাল বিক্রি করতে গিয়ে না জেনে ‘জোচ্চুরি’তে ধরা পড়া স্যাকরার কাছে দু টাকা করুণা পেয়ে যার জীবন সংগ্রাম শুরু, নদীর পাড়ে ঘুমিয়ে যার রাত কাটে, শীত কাটে শ্মশানের আগুনের আঁচে, কী ভয়াবহ তার জীবন সংগ্রাম, চুরি করে একসময় পুরো অন্ধকার নিশিতেই হারিয়ে যাবার জীবন সংগ্রাম। সাহেব ফেরে রানীর কাছে, কৈশোরের ভালোবাসার কাছে। সুধামুখীর স্মৃতির কাছে। কিন্তু রূঢ় বর্তমান আহত করে তাকে দ্বিগুণ রূঢ়তায়। সাহেব বুঝে নেয় চাইলেই ফেরা যায় না। তার জন্য মায়াময় ভালোবাসার আঁচল পাতা নেই কোথাও। সে আবার ফিরে যায় পুরনো জীবনে। এই পরিণতির জন্য কী কেবল সাহেবের প্রবৃত্তিই দায়ী? এককথায় কী পৌঁছনো যায় এমনতর সরল সমাধানে?

    এক অমোঘ কৌতূহল শেষ পর্যন্ত পাঠককে টেনে নিয়ে যায় সাহেবের বার্ধক্যে। চোর হিসাবে সাহেব তখন কিংবদন্তি। দারোগা, পুলিশ, প্রশাসনের মনোযোগের কেন্দ্রে সে। আসলে ব্যক্তিজীবনে নিয়তি পর্যুদস্ত এক সহায়-সম্বলহীন মানুষ সে। জীবনের প্রতি পিছুটানহীন, পেশার প্রতি নিবেদিত প্রাণ এক বাউন্ডুলে। সাহেবের চরিত্রে দ্বৈত সত্তার দ্বন্দ্ব প্রবল। প্রকৃতপক্ষে যা হতে চায়, পরিবেশের জন্য সে তা হতে পারেনা— তারই জন্য বুকভরা হাহাকার সাহেবের। আবার অনুশোচনাও! দুই বিচিত্র মনোভাবের দ্বন্দ্বে অন্তরাত্মা ক্ষতবিক্ষত। সাহেব চোর, কিন্তু পাষণ্ড নয়। তার মধ্যে অনুভূতিশীল হৃদয় আছে। সেজন্য মেয়েদের কান্না, শিশুদের কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না। এমনকি যে-বাড়ি চুরি করে সে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে, সে বাড়ির জন্য একপ্রকার মমতা বোধ করে অন্তরের মধ্যে। এই মনোবৃত্তি চোরের নয়। নয় বলেই তার মনে এক প্রকার অস্থিরতা ও যন্ত্রণা আছে। যন্ত্রণার মূলে রয়েছে সৎজীবনের প্রতি লোভ। মানুষের স্নেহ সমাদর ভালবাসায় মন এক এক সময় কানায় কানায় ভরে ওঠে, তখন মানুষের মধ্যে বসবাসের জন্য সে আকুল হয়। রানীও সতী-সাধ্বী গৃহলক্ষ্মী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু অভিশপ্ত পরিবেশ সে সুযোগ তাকে দেয়নি। তাই মানুষের প্রতি, সমাজের প্রতি সাহেবের অভিমান। আরাধ্যা দেবী মা-কালীর কাছে সে প্রার্থনা করে : “আমায় মন্দ করে দাও মা-জননী—একেবারে নিখুঁত নির্ভেজাল মন্দ।” সমাজের প্রতি লেখকের প্রচ্ছন্ন শ্লেষ সাহেবের অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।

    লেখক কিন্তু সাহেবের কামনা পূরণ করেননি। মানুষ অমৃতের পুত্র, সে কখনও খারাপ হতে পারে না। যে বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে সে, সেই বাড়ির কর্ত্রী নমিতা যখন সাহেব-চোরকে না খাইয়ে ছাড়ে না, তখন চোখের সামনে সারি সারি মুখগুলো ভেসে ওঠে সাহেবের। মানবজীবনের দর্শন মূর্ত সত্য হয়ে ওঠে— “মানুষ জাতটারই দোষ রে! চেষ্টা যতই করো, মন্দ হবার জো নেই।” চোরদের ‘নিশিকুটুম্ব’দের জগৎ-সংসার ঘুরে অবশেষে লেখক জানান সাহেব-চোরের আত্মোপলব্ধি— “ভালোর অভিশাপ একলা তার উপরেই নয়। এ জীবনে বিস্তর ভালো চোখে পড়েছে। যাদের দেখেনি তাদের মধ্যেও কত না-জানি রয়েছে। দেখে যাদের মন্দ ভেবেছে— তিলকপুরের মন্দাঠাকরুন যেমন— আজকে মনে হচ্ছে, ঢং দেখিয়ে তারা মন্দ সেজে বেড়ায়। দায়ের মুখে ভাল মূর্তিটা বেড়িয়ে পড়বে।” যেমন সাহেবের মাঝে মাঝে বেড়িয়ে পড়ত। চোর হয়েও সাহেব রাখালের স্ত্রীর গহনা গ্রাস করেনি। নমিতার গহনাও ফেরত দিয়েছে সে। “জন্মসূত্রে পাওয়া ভালমানুষী মনের মধ্যে চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, চেষ্টা করেও রোধ করতে পারে না।” সাহেবের মানসিক আচরণের ব্যাখ্যা করে লেখক বলেন, “অমৃতের বেটাবেটি সব, ভালো না হয়ে উপায় আছে?” সাহেব তাই চেষ্টা করেও খারাপ হতে পারেনি। গল্পের পরিণতিতে এসে সাহেব চোর মানবিক মহিমায় ভাস্বর।

    ‘নিশিকুটুম্ব’ একটি স্বতন্ত্র উপন্যাস। বাংলা সাহিত্যে এই গ্রন্থখানি সম্ভবত এক এবং অদ্বিতীয়। জীবনের আকস্মিক অপ্রত্যাশিত ঘটনা, যেসব নাটকীয় মুহূর্ত সৃষ্টি করে, লেখক তার সদ্ব্যবহার করেছেন। পাঠকের কৌতূহল আর উৎকণ্ঠার ফাঁকে ফাঁকে তিনি চোরদের জগতের নিয়মকানুন এবং বহু অপরিজ্ঞাত তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন। গ্রামের নদী, পোড়ো বাড়ি, ভূত মন্ত্র তাদের জীবিকা অজস্র লোকজীবন সম্বলিত উপাদানকে চুরিবিদ্যার সাথে একত্রীভূত করেছেন লেখক। উপন্যাসের নায়ক সাহেব চরিত্রের ওস্তাদ হয়ে ওঠার কাহিনির সাথে বিভিন্ন কুশলী চোরদের উপকাহিনীর যোগ রয়েছে। শৈশব থেকে প্রৌঢ়বয়স্ক সাহেব বহু বিচিত্র মানুষের আভ্যন্তরীণ দর্শন প্রত্যক্ষ করেছে চুরি শিক্ষার ব্রতনিষ্ঠায়। পিতা হিসেবে জাহির করা নফরকেষ্ট শহর ও গ্রামের সংযোগের সাহেবের সঙ্গী। আবার খুলনার নৌকাঘাট পর্যন্ত চৌর্যবৃত্তির গুরু হিসেবে বলাধিকারির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সমাজ দৃষ্টির খারাপ কাজটাই সাহেবের কাছে শিল্প গুণান্বিত। বিভিন্ন ছোট ছোট জীবনকাহিনী এবং ঘটনার মধ্যে তাদের কাহিনীকল্পকে লেখক এমনভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন যে উপন্যাসের গতিপথ রুদ্ধ হয়নি। দুই খণ্ডের বিস্তৃত কাহিনি রহস্যে ঘনীভূত। পাঠকের কৌতূহল শুধুমাত্র চুরির ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তার চারপাশে আমাদের অপরিচিত জগৎ ও মানুষ এসে ভিড় করে দাঁড়ায়। প্রত্যক্ষ হয় একটা মহাকাব্যিক জীবনের রূপ।

    উপন্যাসের গভীরে প্রবেশ করতে করতে উন্মোচিত হতে থাকে নিশীথে সচল হয়ে ওঠা অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষগুলোর অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার করুণ ইতিবৃত্ত। যে ইতিবৃত্ত অন্ধকার কিংবা অন্ধকারের মানুষগুলোর নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতার শিকার মানুষগুলোর যাপিত জীবনের দুর্ভোগ-দুর্দশার প্রতি ক্ষুব্ধ করে পাঠককে। লেখকের উপস্থাপন ভঙ্গিতে পাঠকের হৃদয় আর্দ্র হয় করুণায়, ভালোবাসায়। কী বলতে চান লেখক ‘নিশিকুটুম্ব’ উপাখ্যান শেষ করে? শেষ পর্যন্ত মানুষ মানুষই। অমৃতের সন্তান। ভালো আর মন্দের সংঘাতে ভালো হয়ে ওঠার বাসনাই তাঁর আজন্ম বাসনা। আর মন্দ যেটুকু, তার যতটা দায় সহজাত প্রবৃত্তির, তার চেয়ে বেশি বিভেদময় ব্যবস্থার। সমাজপ্রথা, রীতি, শোষণ, আইন, নিয়ম ইত্যাদি বিচিত্র মুখোশে ব্যক্তিসত্তাকে আক্রমণ করে সে। ‘নিশিকুটুম্ব’ পড়ার পর সাহেবের মতো এই প্রান্তকায়িত মানুষের প্রতি একরাশ মমতা বোধ হয়— অমৃতের পুত্র মানুষের মানবিকতার জয়ই সভ্যতার শেষ কথা।

  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments