• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | ছোটদের পরবাস | গল্প
    Share  
  • বুবুনের গাছ : অনন্যা দাশ

    বুবুন সেদিন স্কুল থেকে ফিরে খুব উত্তেজিত হয়ে মাকে বলল, “মা আমাদের কাল স্কুলে টাকা নিয়ে যেতে হবে। মিস ডাইরিতে লিখে দিয়েছেন। তোমাদের দেখাতে বলেছেন।”

    বুবুনের দিদি তুতুল এখন অন্য বড়ো স্কুলে যাচ্ছে। সে শুনেই বলল, “টাকা দিয়ে আবার কী হবে? বাসে করে বেড়াতে নিয়ে যাবে? সেবার যখন তোদের পিকনিকে নিয়ে গিয়েছিল তখন তুই ওখানে গিয়ে কোন একটা গাছের তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলি। ফেরার সময় হয়ে গিয়েছিল, টিচাররা ডাকছিলেন তাও তুই ঘুম থেকে উঠছিলি না নাকি! তোর জন্যে নাকি ওদের ফিরতে চল্লিশ মিনিট দেরি হয়ে গিয়েছিল। তোর আর পিকনিকে গিয়ে কাজ নেই।”

    বুবুন বিরক্ত হয়ে বলল, “না, না এটা পিকনিকের জন্যে নয়। আমাদের একটা জিনিস দেওয়া হবে সেই জন্যে।”

    “কী জিনিস?”

    “এখনও জানি না, “বুবুন বলল, “মিস বলেছেন দারুণ জিনিস। এমন জিনিস যাতে পৃথিবীর সবার ভালো হবে।”

    “তুই মহা বোকা! আগে কী জিনিস সেটা তো জেনে আসবি! দারুণ জিনিস তো কত কিছু হতে পারে। যেটা তোর মিসের দারুণ মনে হচ্ছে সেটা তোর দারুণ নাও মনে হতে পারে। যেমন আমাকে একটা বার্বি ডল দিলে আমার দারুণ মনে হবে কিন্তু তোর তো ওসব পুতুলটুতুল পছন্দ নয়!”

    ব্যস তারপরই কোন জিনিসটা দারুণ আর কোনটা দারুণ নয় সেই নিয়ে ভাই-বোন দুজনের মধ্যে হাতাহাতি লেগে গেল। মা এসে দুজনকে বকে ঝকে শান্ত করিয়ে বললেন, “ঠিক আছে। টাকা নিয়ে যেও। আর যতদিন না জিনিসটা পাওয়া যাচ্ছে ততদিন ওটা নিয়ে কোন কথা নয়। এবার দুজনেই খাওয়া শেষ করো। অঙ্ক টিচার এসে পড়বেন।”

    পরদিন স্কুলের যাওয়ার সময় টাকা নিতে ভুলল না বুবুন। তারপর শুরু হল অপেক্ষা।

    পরের সোমবার দিন বুবুন লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফিরল। তার হাতে একটা ছোট্ট টব আর সেই টবে একটা গাছ।

    ঘরে ঢুকেই বুবুন চিৎকার করে বলল, “এই দ্যাখ দিদি। দারুণ জিনিসটা এনেছি! তুই না বলছিলি পুতুল টুতুল, সেই সব কিছু নয়! একটা গাছ পেয়েছি! এটা আমার!”

    তুতুল দেখে ঠোঁট উলটে বলল, “এমা একটা গাছ! কি বোরিং!” তুতুলের কাছে এখন অবশ্য সবই বোরিং! বোরিং কথাটা ওর প্রিয় শব্দ এখন, “গাছ দিয়ে কী হবে? ছাদে তো ঘোষদাদুর কত গাছ! সুযোগ পেলে আরো লাগাবেন।”

    বুবুন বলল, “এই যে, টবের গায়ে তারিখ লিখে দিয়েছেন মিস। তিন মাস পর এই গাছটাকে আবার স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। তখন মিস দেখবেন গাছটা বড়ো হয়েছে কিনা। যার গাছ সব চেয়ে ভালো হবে সে প্রাইজ পাবে। তবে আমাকেই মনে করে রোজ জল দিতে হবে। অন্য কেউ জল দিলে হবে না মিস বলে দিয়েছেন। একটা ভালো জায়গায় রাখতে হবে টবটাকে, যেখানে আলো হাওয়া পাবে।”

    তুতুল হি হি করে হেসে বলল, “তুই রোজ জল দিবি? তাহলেই হয়েছে! তুই নির্ঘাৎ ভুলে যাবি আর ওই গাছ দুদিনেই পটল তুলবে!”

    বুবুন দিদির কথায় কান দিল না। দিদিটা যেন কেমন, সবেতেই বুবুনকে নিয়ে ঠাট্টা! মার সাহায্যে বারান্দায় একটা টুলের ওপর গাছসুদ্ধু টবটাকে রাখা হল। রোজ সকাল বিকেল জল দেওয়া চলল, টিচার অবশ্য বলে দিয়েছেন বেশি জল দেওয়া চলবে না তাহলে গাছ পচে যাবে।

    তারপর একদিন বুবুন খুব মন খারাপ করে স্কুল থেকে ফিরল। মা ‘কী হয়েছে?’ জিগ্যেস করতে সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “রিদ্ধিমার মা আজ মিসকে ছবি পাঠিয়েছিলেন। ওর গাছটা অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে! ওই প্রাইজ পেয়ে যাবে। আমি আর প্রাইজ পাব না।”

    মা ওকে সান্ত্বনা দিলেন, “এখনও তো অনেক দিন সময় আছে। চিন্তা নেই, তুমি মন দিয়ে জল দিচ্ছ তাই তোমার গাছও বড়ো হয়ে যাবে।”

    বুবুন বলল, “রিদ্ধিমার গাছের শিকড় নাকি মজবুত হয়ে গেছে। শিকড় কী মা?”

    “গাছটা ওপরে যেমন বাড়ে নিচের দিকেও তেমন বাড়ে। সেই মাটির নিচের অংশটাকে শিকড় বলে। সেই শিকড় দিয়েই গাছের খাওয়া দাওয়া সব যায়। মাটির নিচের অংশটাকে দেখত পাওয়া যায় না কিন্তু সেটা বড়ো আর মজবুত হওয়া খুব দরকার। নাহলে গাছ ভালো বাড়ে না।”

    বুবুন মন দিয়ে সব শুনল। এদিকে যত দিন যায় সবার গাছ বাড়ছে কিন্তু বুবুনের গাছ আর বাড়ে না। দিন কে দিন যেন দুর্বলই হয়ে যাচ্ছে মনে হতে লাগল।

    তারপর এক রবিবার তুতুলের কৌতূহল হল বুবুন কী করছে দেখার। সে ঠিকঠাক গাছে জল দিচ্ছে কিনা দেখার জন্যে উঁকি দিয়ে দরজার আড়াল থেকে দেখতে লাগল বুবুনের কীর্তিকলাপ। যা দেখল তাতে তো তার চক্ষু চড়কগাছ!

    চিৎকার করে তুতুল বলতে লাগল, “মা, বাবুই, এসে দেখে যাও বুবুনের কাণ্ড! ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে!”

    পিলে চমকানি চিৎকার শুনে মা-বাবা দুজনেই ছুটে এলেন। এসে দেখলেন বুবুন গাছটাকে হাতে নিয়ে বারান্দায় থ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

    মা বলে উঠলেন, “একি বুবুন! এটা কী করছ? গাছটাকে মাটি থেকে তুলেছো কেন?”

    বুবুন ঘাবড়ে গিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে বলল, “আমি তো দেখছিলাম গাছের শিকড়টা বেড়েছে কিনা! সবাই তো বলছে গাছের শিকড় না বাড়লে গাছ বাড়বে না!”

    তুতুল তো ওর কথা শুনে হেসে গড়াগড়ি খেল, “ও তুই বুঝি রোজ ওই রকম করে গাছটাকে মাটি থেকে তুলে তুলে তার শিকড় বেড়েছে কিনা দেখিস? সেই জন্যেই তোর গাছের ওই দুর্দশা! তাও ভাগ্যিস আজকে আমি দেখতে পেলাম নাহলে আর কয়েকদিন তুই তোর কারবার চালিয়ে গেলে গাছটা নিশ্চিতভাবে পটল তুলত!”

    মা-বাবা দুজনে মিলে বুবুনকে বোঝালেন যে গাছের শিকড় মাটির নীচেই থাকতে দিতে হয়। তাকে টেনে টেনে বার করলে লাভ হয় না। তার অন্ধকার মাটির তলাই পছন্দ।

    এর পর অবশ্য আর বুবুন ওই ভুলটা করেনি। মা-বাবা-দিদি সবার সেবা আর দেখাশোনায় বুবুনের গাছটা তার হাতে অনেক অত্যাচার সহ্য করেও মরেনি। আর তিন মাস পরে প্রাইজ মিস ক্লাসের সবাইকেই দিয়েছিলেন, ‘আমি সবুজ ভালোবাসি’ লেখা একটা ব্যাজ!



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments