• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৩ | জুলাই ২০২১ | উপন্যাস
    Share
  • পরিক্রমা : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


    || ২ ||

    সুপারভাইজার জীবন হালদার বেধড়ক তড়পাচ্ছিল। সামনের লোকটা কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়েছিল। সম্ভবত কন্ট্রাক্টারের লোক, ঝাড় খাওয়ার অভ্যেস আছে। জয়ন্তর বিরক্ত লাগছিল। কাজে গাফিলতি হয়ে থাকলে হালদার অনায়াসে সাইটে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিতে পারে। দরকার হলে বকাবকিও করতে পারে। অফিসের করিডোরে দাঁড়িয়ে ফালতু চেঁচামেচি সহ্য হচ্ছিল না। কিছু বলতেও পারছিল না। হালদার সাংঘাতিক চুগলিখোর লোক, কোথায় কোন বসের কান ভাঙাবে বলা যায় না। পাশের কিউবিক্‌ল থেকে শ্যামল চেঁচিয়ে বলল, “ও হালদারদা, ভল্যুমটা একটু কম করুন না।”

    শ্যামলের কথায় বিশেষ কাজ হল না। কম হওয়ার বদলে জীবন হালদারের আস্ফালন বরং বেড়ে গেল। জয়ন্তর মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল। লোকটাকে কষিয়ে একটা চড় মারতে পারলে খানিকটা উপশম হত। কিছু একটা করা দরকার। অন্তত কাছে গিয়ে একবার বিনীত অনুরোধ। না শুনলে... উঠছিল, দেখল বিজন আসছে। বিজন জয়ন্তর ব্যাচের, একই দিনে জয়েন করেছিল। এখন একই বিল্ডিং-এ বসে, তবে ডিপার্টমেন্ট আলাদা, ফ্লোর আলাদা। জয়ন্ত ডিজাইনে, বিজনের প্রোজেক্ট প্ল্যানিং। স্বভাব-চরিত্রে দু’জনে দুই বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। তবু কোনও অজ্ঞাত কারণে বন্ধুত্বটা টিঁকে আছে। বিজনকে দেখেই জীবন হালদার চুপ করে গেল, যেন জোঁকের মুখে নুন পড়ল। জয়ন্ত অবাক হল, ম্যাজিক নাকি? দেখল, হালদার মাথা নিচু করে বিজনকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিজন জয়ন্তর কাছেই আসছিল। হাসিহাসি মুখ করে বিজনের কিউবিকেলের পার্টিশানের ওপর হাতের ভর রেখে দাঁড়িয়ে বলল, “কী রে, কাল সন্ধেবেলা কোথায় ছিলি? সঞ্জয়দের বাসায় এলি না?”

    সঞ্জয় বলেছিল যেতে। সঞ্জয়, জিতেন আর বাসুদেব রাও একসঙ্গে থাকে, সেক্টর সিক্সে একটা টু-বি-এইচ-কে ভাড়া ক’রে। সঞ্জয় ইউ-পি, জিতেন উড়িষ্যা আর রাও অন্ধ্র। তিন জনেই জয়ন্তদের ব্যাচের। বাসুটা শান্তশিষ্ট। বাকি দু’জন সাংঘাতিক হুল্লোড়ে, একটা কিছু ছুতো পেলেই হল, ব্যাস! পার্টি... আর আকন্ঠ মদ্যপান। বাসু নিরামিষাশী, মদ খায় না। জয়ন্তরও পোষায় না, এড়িয়ে যায়। কথা ঘোরানোর জন্য বলল, “কী ব্যাপার বল তো? লোকটা এতক্ষণ অসভ্যের মতো চিৎকার করছিল, তোকে দেখেই থেমে গেল... রহস্যটা কী?

    বিজন চোখ টিপল, “হে, হে, রহস্য হ্যাজ… গভীর রহস্য। চল কফি খেয়ে আসি।”

    জয়ন্ত মাথা নাড়ল, “না রে বিজু, আজকের মধ্যে ড্রয়িংটা রিলিজ করতে হবে।”

    বিজন বলল, “রাখ তোর ড্রয়িং, ওদিকে ক্যানটিনে রাধিকা পথ চেয়ে বসে থাকবে। তোর ঢপের ড্রয়িং তুই ফিরে এসেও শেষ করতে পারবি, অনেক সময় আছে।”

    জয়ন্ত নিমরাজি হয়ে উঠল, মাথাটা ছাড়ানোর জন্যও এক কাপ কালো কফি দরকার। ক্যানটিনটা ওদের বিল্ডিং থেকে একটু দূরে, হেঁটে মিনিট পাঁচেক। সারাদিন বসে কাজ, কফির সঙ্গে সঙ্গে একটু হাত পা চালানোও হয়ে যায়। বিজনের অবশ্য ধান্ধা অন্য, ক্যানটিনে অনেক সুন্দর-সুন্দর ট্রেনি মেয়েরা আসে, তাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয়, সোজা কথায় লাইন মারা... নিদেন পক্ষে চোখের শুশ্রূষা। আপাতত রাধিকা-পর্ব চলছে। বিজনকে বুঝিয়ে লাভ নেই, জয়ন্ত জানে।

    আসলে ছেলেটার বেড়ে ওঠার মধ্যেই কোথাও একটা গোলমাল আছে। দিল্লির সচ্ছল বাঙালি পরিবারের ছেলে। একবার কথায়-কথায় বলেছিল, ওর বাবা মা একসঙ্গে থাকে না। সেটা কোনও কারণ নয়। এবং সেসব নিয়ে যে বিজনের বিরাট কোনও ক্ষোভ আছে এমন মনে হয় না। তবে জয়ন্ত লক্ষ করেছে, ওর স্বভাবের মধ্যে একটা নিয়ম ভাঙার প্রবণতা আছে। মাঝে-মাঝে সেটা বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যায়। ছেলেটা এমনিতে একরোখা আর সৎ। বন্ধুরা সমস্যায় পড়লে পাশে দাঁড়ায়। আর ব্যাচেলার ছেলেদের সমস্যার তো শেষ নেই। আজ কারো মেয়ে-বন্ধু লেঙ্গি মারল তো কাল কারো বাড়িওলা ঘর ছেড়ে দেবার নোটিশ দিল। সবগুলোই জীবন-মরণ সমস্যা, সমাধান না করলে পথে বসতে হবে।

    ক্যানটিনে বিজনের রাধিকা নেই। বিজন স্পষ্টতই হতাশ হল। দু’-চারজন দল বেঁধে এদিক-ওদিক চায়ের কাপ নিয়ে বসে আছে, আড্ডা দিচ্ছে। জয়ন্ত একটা ফাঁকা টেবিল খুঁজে বিজনকে কোণের দিকে টেনে নিয়ে গেল। বিজন অনুযোগ করল, “মাঝামাঝি বসলে হত না? দরজার দিকে চোখ রাখা যেত।”

    জয়ন্ত পাত্তা দিল না, কফিতে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “হালদারের ব্যাপারে কী বলছিলি?”

    বিজন বলল, “আরে, সে অনেক কথা। মালটার ধক নেই, এদিকে শখ ষোলো আনা। অবশ্য ও একা নয়, সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল...”

    জয়ন্ত বলল, “ঝেড়ে কাশ, এই সব স্যাম্পেলগুলোকে চিনে রাখা ভাল।”

    বিজন বলল, “গত বছর ডিসেম্বরে বি-এইচ-ইউ-তে একটা কনফারেন্সে গিয়েছিলাম, মনে আছে? রেজিস্ট্রেশান ফী কম ছিল। অফিস থেকে ঝেঁটিয়ে পাঠিয়েছিল। সারাদিন লেকচার শুনতে-শুনতে কান ঝালাপালা, সন্ধেবেলা চার-পাঁচ জনের পুড়কি উঠল, বাইজিবাড়ি গান শুনতে যাবে। বেনারসে এসে বাইজি-সন্দর্শন না করলে নাকি জীবনটাই বৃথা।”

    জয়ন্ত ভুরু তুলল, “বাইজি-বাড়ি?”

    বিজন দাঁত বার করে হাসল, “আরে বাইজি-ফাইজি আজকাল আছে নাকি? থাকলেও, খানদানি বাইজির গান শোনার মতো মেজাজ আর ট্যাঁকের জোর ক’জনের থাকে? বুঝলি না? প্লেইন এন্ড সিম্পল, মাগীবাড়ি যাবে। সব বুড়ো হাবড়ার দল, দাঁত পড়ে গেছে কিন্তু নোলা সকসক, হালদারও ছিল সেই দলে। এদিকে সন্ধান জানে না... এসব জায়গার খোঁজ তো আর গুগল ম্যাপে পাবে না। বেনারসের গলি ভুলভুলাইয়ার থেকেও মারাত্মক... হারিয়ে গেলে হোটেলে ফিরতে পারবে না। আমাকে ধরল। বেনারস আমার চেনা জায়গা। বললাম, চলো, আমার খরচাও কিন্তু তোমাদের খাতায়...”

    জয়ন্ত বলল, “সাহস আছে বলতে হবে।”

    বিজন বলল, “সাহস বলে সাহস! আমার লেজ ধরে তো পৌঁছোল। আমায় তো জানিস, পুরনো পাপী, আগে অনেকবার গেছি। কলেজে থাকতে ধর্ম করতে দল বেঁধে কাশী যেতাম। তা যে কোঠাবাড়িটায় ঢুকলাম, যাদব বলে একটা পালোয়ান সেই কোঠার মেয়েগুলোর দেখভাল করে। আমি যাদবের হাতে মক্কেলদের জমা করে বেছেবুছে একটা মেয়ের ঘরে ঢুকলাম। শালা, কাজ-কর্ম সেরে বেরিয়ে কী দেখি জানিস?”

    জয়ন্ত কৌতূহলী হল, “কী?”

    বিজন বলল, “দেখি যাদব আর ওর লোকজন কোঠার বৈঠকখানা ঘরে মালগুলোকে নাঙ্গা করে বসিয়ে রেখেছে। শেষ মুহূর্তে নাকি তারা ভয় পেয়ে কেটে পড়ার তাল করছিল। আদতে বুঝলি তো, সবগুলোই গৃহপালিত, ঘাসফুস খাওয়া পাবলিক। বাজারি মেয়ে দেখে নেতিয়ে গেছে। যাদব ছাড়বে কেন? ওদেরও রেপুটেশান বলে একটা ব্যাপার আছে।”

    জয়ন্ত দৃশ্যটা কল্পনা করে হেসে ফেলল। বিজন বলে যাচ্ছিল, “হালদাররা প্রথমে গা-জোয়ারি করেছিল। মুম্বাইয়া দাদাগিরি দেখাতে গিয়েছিল। তারপর দালালরা ঘিরে ধরে দু’-ঘা দিতে সংবিৎ ফিরেছে। তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। অনেক কাকুতি-মিনতি করেছে, টাকা-পয়সা যা সঙ্গে ছিল পকেট উল্টে দিতে গেছে। যাদব নাছোড়, কোঠায় ঢুকেছ তো পয়সা-উসুল না-করে যেতে পারবে না। আমায় দেখে জীবন হালদার তো হাঁউমাউ করে কেঁদেই ফেলল।”

    জয়ন্ত ফুট কাটল, “শেষ পর্যন্ত তুই কি পরিত্রাতার ভূমিকা নিলি?”

    বিজন হাত উল্টিয়ে বলল, “কী আর করি? সঙ্গে করে নিয়ে গেছি, একটা দায়িত্ব আছে, ফিরিয়ে না আনলে অফিস মুখ দেখানোর জো থাকবে না। যাদব বাবাজীবনকে বলে-কয়ে মহাশয়দের উদ্ধার করে আনলাম।”

    বিজন কথা বলতে বলতে কাকে হাত তুলে ডাকল। জয়ন্ত ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, বাসুদেব রাও... বাসু। ওদের দেখে কফির পেয়ালা নিয়ে ওদের টেবিলেই এসে বসল। বিজন হিন্দীতে বলল, কী রে বাসু, শুনলাম নাকি তুই ঘর শিফট করছিস, একা থাকবি। বিয়ে-থা ফিক্স হয়েছে নাকি?

    বাসু দু’-দিকে মাথা দোলালো। দক্ষিণিদের নিয়ে এই এক ঝামেলা, ‘হ্যাঁ’ বলছে, নাকি ‘না’ স্পষ্ট করে বোঝা যায় না।

    *

    বাসুর নতুন বাসা সেক্টর ফোরে, আগেরটার থেকে খুব দূরে নয়। ভারী মালপত্র বলতে খাট-বিছানা, কম্প্যুটার টেবিল আর চেয়ার। সেগুলো ঘাড়ে করেও আনা যেত। তাও একটা মাল বয়ে নিয়ে যাওয়ার গাড়ি ভাড়া করেছিল বাসু। কেরিয়ারে মাল তোলার সময় জয়ন্ত দেখল গাড়িটার মেঝেয় কুচো পালং শাক আর লঙ্কা ছড়িয়ে আছে। সকালের দিকে এই সব গাড়িতেই বস্তা ভরে এ-পি-এম-সির পাইকিরি বাজার থেকে কাঁচা সবজি আসে। কিছু গাড়ি খাড়ি-ব্রিজ ডিঙিয়ে মুম্বাই রওনা দেয়। চড়া রোদের মধ্যে সবজির বস্তার ওপর শুয়ে ঢুলতে-ঢুলতে মেয়েমদ্দ বেপারিরা সমুদ্র পাড়ি দেয়। মুনাফার স্বপ্ন দেখে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে স্বপ্ন ভাঙে জোড়ে। তবে অধিকাংশ স্বপ্নই দেশি দারুর ঠেকের কাচের গ্লাসের মতো আচমকা হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়।

    বাসুও হয়তো একটা অন্যরকম জীবন যাপনের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি বদলাচ্ছে। ছেলেটা বড্ড চুপচাপ থাকে। বিয়ে-থা হলে হয়তো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। জয়ন্ত, সঞ্জয় আর বিজন বাসুর মালগুলো ঘরের মধ্যে জায়গা মত সাজিয়ে দিচ্ছিল। জিতেন আসেনি, রান্না করছে, শিফটিং হয়ে গেলে আজ এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া হবে। পানীয়রও বন্দোবস্ত আছে নিশ্চয়ই। ডেস্কটপ কম্প্যুটারটা বাসু বুকে করে নিয়ে এসেছে। সেটা আলগোছে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। কে জানে কী মহার্ঘ বস্তু তার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে। বিজন জিজ্ঞেস করল, “কী রে বাসু হার্ড্ডিস্কে নীল ছবি-টবি ডাউনলোড করে রেখেছিস নাকি? আমাদের দেখাবি না?”

    বাসু লজ্জা-লজ্জা মুখ করে চুপ করে রইল। বাসুর অ্যাপার্টমেন্টটা গ্রাউন্ড ফ্লোরে। মালপত্র আনা-নেওয়া হচ্ছিল বলে সদর দরজাটা খোলাই ছিল। জয়ন্ত দেখল দরজায় একজন শালপ্রাংশু পুরুষ এসে দাঁড়িয়েছে... অমিতাভদা, কোন একটা কোঅপরেটিভ ব্যাঙ্কে কাজ করে, ওদের থেকে বেশ ক’বছরের সিনিয়র। চেনা-জানা বাঙালি অ্যাসোসিয়েশানের সূত্রে। দুর্গা পুজোয় নাটক মানেই অমিতাভদা।

    কে না জানে, এক পাড়ায় দশজন বাঙালি মানেই দুর্গাপুজো আর দুর্গাপুজো মানেই সপ্তমীর সন্ধেবেলা লোকাল বাঙালিদের নিয়ে নাটক। অষ্টমী আর নবমীর সন্ধে কলকাতার শিল্পীদের জন্য সংরক্ষিত। দুপুর বেলা পাত পেড়ে ভোগের খিচুড়ি, লাবড়া, টোম্যাটোর চাটনি আর পায়েস, চার-পাঁচটা দিন মনেই হয় না বাংলার বাইরে বসবাস। অবাঙালিরাও দুর্গা-প্রণাম করে ভোগ খেয়ে যায়। দশমীর দিন সকালে সিঁদুর খেলা, রাত্তিরে প্রতিমা বিসর্জনের পর পুজোর ভাঙা মণ্ডপেই মিষ্টিমুখ, কোলাকুলি।

    অমিতাভদা আক্ষরিক অর্থেই নাটের গুরু, নাট্য-নির্দেশক এবং মূল অভিনেতা। ফি-বছর হিরোর রোল বাঁধা। দুর্গাপুজোর মাস খানেক আগে থেকেই লোকজন জোগাড় করে নাটকের মহড়া শুরু করে দেয়। অমিতাভদা কথা বলে যখন মনে হয় মেঘ ডাকছে, বলল, “ভালই হল। এবারের নাটকে একটা ছোট মাদ্রাজি ক্যারেক্টার আছে। বাসু যখন এসেই পড়ল, ওকে দিয়েই করিয়ে নেব ভাবছি। তোমাদের পাল্লায় পড়ে দু’-চারটে বাংলা কথাও নিশ্চয়ই শিখে গেছে এতদিনে।”

    বিজন বলল, “অমিতাভদা, আমাদের দিকেও তাকিও কখনও-সখনও।”

    অমিতাভদা হেসে বলল, “মাথায় আছে, নাটকে বিহারি গুণ্ডার রোল থাকলে তোমার কথা ভাবব।”

    জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “আরে, তুমিও কি এই বিল্ডিং-এই থাকো নাকি?”

    অমিতাভদা ঘাড় নাড়ল, বলল, “হ্যাঁ, ফোর্থ ফ্লোরে। তোমাদের কাজ-কর্ম মিটলে আমার বাড়ি চলে এসো, চা খাওয়াবো।”

    বাসুর ঘর গুছিয়ে, দরজায় তালা লাগিয়ে অমিতাভদার ঘরে পৌঁছে ওরা দেখল চায়ের সঙ্গে টা মানে সামোসারও আয়োজন রয়েছে। অমিতাভদা ব্যাচেলার মানুষ, কিন্তু তার বাড়ি খুব পরিপাটি করে সাজানো। সোফার সামনে কাচের সেন্টার টেবিলে ট্রের ওপর চায়ের কাপ, প্লেট আর টি-কোজি ঢাকা টি-পট সাজিয়ে রেখেছিল অমিতাভদা, দুধ, চিনি আলাদা। জয়ন্ত দেখছিল এক পাশে স্টুলে রাখা ল্যান্ডফোনের ওপর কুরুশে বোনা সুদৃশ্য কভার, দেওয়ালে ঝোলানো টেলিভিসন, ঘরের কোণে কর্নার টেবিলের ওপর একটা টেবিল ল্যাম্প, তার নিচে কাচের ফুলদানি। জয়ন্তকে সব থেকে যেটা বেশি টানল সেটা হল বইয়ের কাবার্ড।

    সুবাসিত দার্জিলিং চা, এখানকার লিকার সর্বস্ব ঘন ক্বাথ নয়। চা খাওয়া শেষ হলে উঠে গিয়ে বইয়ের কাবার্ডের সামনে দাঁড়াল জয়ন্ত। রবীন্দ্র-বঙ্কিম-শরৎ, তিন বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদির সঙ্গে থরে-বিথরে ইংরিজি ক্লাসিক... ভিক্টর হুগো, অস্কার ওয়াইল্ড, হেমিংওয়ে, সমারসেট মম... হালফিলের মার্কোয়েজ, এমনকি বিক্রম শেঠ পর্যন্ত। কী নেই! ছোটখাটো একটা লাইব্রেরিই বলা যায়। ছুঁয়ে দেখতে খুব লোভ হচ্ছিল জয়ন্তর। বুঝতে পারছিল না অমিতাভদা সেটা পছন্দ করবে কি না। যারা বই ভালবাসে তারা বইয়ের ব্যাপারে স্পর্শকাতর হয়। অমিতাভদা বোধ হয় বুঝতে পারল, হেসে বলল, “পড়তে ইচ্ছে করলে ধার নিতে পারো। কিন্তু ফেরত দেওয়া আবশ্যিক।”

    জয়ন্তও হাসল, বলল, “তোমার যা সংগ্রহ... বেশির ভাগ বইই না পড়া। একটা করে নিয়ে পড়ব। ফেরত দিয়ে আর একটা...”

    অমিতাভদা অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, “হোয়াট অ্যাবাউট আদার্স? ডু ইউ গাইজ এভার বদার টু রিড বুকস?”

    বিজন বলল, “আরে দাদা, ফেসবুক হোয়াটস্যাপ পড়ারই সময় হয় না তো বুকস...”

    সঞ্জয় বলল, “বচপনমে হ্যারল্ড রবিন্স, আরভিং ওয়ালেস ইয়ে সব ফালতুকা চীজে পড়ে থে... উস্কে বাদ স্রিফ ফিজিক্সকা কিতাব... বাস...”

    অমিতাভদা দু’-হাত ছড়িয়ে বললেন, “হে করুণাময় ঈশ্বর, এরা জানে না কী ভুল করছে, এদের তুমি ক্ষমা কোরো।”

    বিজন বলল, “টাইম কোথায় দাদা? কাজ কি কম? অফিস থেকে ফিরে রান্না-খাওয়া সেরে বিছানায় যেতেই দিন ফুরিয়ে যায়। বই পড়ব কখন?”

    অমিতাভদা মুচকি হেসে বলল, “তোমায় আমি চিনি ভায়া, তুমি পহুঁছা হুয়া আদমি। মাঝেমধ্যে তোমার হিডনিস্টিক ওয়ার্ল্ড ভিউ পাশে সরিয়ে রেখে নিজের মধ্যে একবার উঁকি দিয়ে দেখতে পারো। ইউ মে ফাইন্ড দেয়ার্স মোর দ্যান মিটস দি আই!”

    বিজনের চোখে যেন একটা বিষণ্ণতা ঝিলিক দিল, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি মস্তিখোর পাবলিক, অমিতাভদা, আমায় দিয়ে হবে না।”

    অমিতাভদা উদাত্ত গলায় গেয়ে উঠল, “তোমার ঘরে বাস করে কারা ও মন জান না, তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা, মন জান না...”

    সঞ্জয় বলল, “ওয়াও, কেয়া খুব গাতে হো দাদা, ইয়ে গানেকা মীনিং বাতাও ঝটপট... মীনিং...?

    অমিতাভদা হিন্দিতেই বলল, অল্টার ইগোর মানে জানো? তোমার ভেতর তুমি একা নও, আরও অনেকে দিব্যি আরামে বসবাস করে। কখনও তারা নিজেদের মধ্যে গল্প-গুজব, হাসি-মস্করা করে, কখনও আবার ঝগড়া করে মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেয়। অমিতাভদার সঙ্গে দু’-মিনিট কথা বললেই মন ভাল হয়ে যায়। অমিতাভদা বাউল তত্ত্বের রহস্য নিয়ে কথা বলছিল। সহজ করে সহজিয়া ঈশ্বর সাধনার কথা বোঝাচ্ছিল। বাসু হঠাৎ বলল, “ডু ইউ হ্যাভ সাম বুকস ফর স্পিরিচ্যুয়াল আপলিফটমেন্ট?”

    অমিতাভদা ভুরু কুঁচকে তাকাল, বলল, “লেট মি সি... হোয়াই ডু ইউ নিড দেম?”

    বাসু অন্যমনস্ক ভাবে বলল, “অ্যাট টাইমস আই ফিল রিয়ালি ডাউন... অ্যাজ ইফ আয়াম গোইং থ্রু আ পিচ ডার্ক টানেল...”

    বিজন বলল, “আরে বাসু, কিতাব পড়নেসে তেরা কুছ অসর নেহি হোগা, তুঝে কিতনে বার বোলা, হামারে সাথ দো ঘুঁট দারু পী লে, ইউ উইল বি আপ্লিফটেড টু ক্লাউড নাইন।”

    অমিতাভদা বলল, “ডোন্ট ইউ ওরি বাসু... ফলো ইয়োর ইনার সেলফ, ইট উড বি ফাইন। হোয়েনেভার ইউ ফিল লাইক দ্যাট কাম ওভার টু মাই প্লেস, নাও দ্যাট উই আর ইন দ্য সেম বিল্ডিং…”

    বাসু কিছু বলতে যাচ্ছিল, জয়ন্তর মোবাইল বাজল। দময়ন্তীর ফোন। জয়ন্ত ওদের ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। দময়ন্তীর গলায় উদ্বেগ। জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”

    ফোনের অন্যদিকে মেয়েটা কেঁদে ফেলল।

    *

    ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ টার্মিনাসে নেমে দময়ন্তীর ভ্যবাচ্যাকা লেগে গেল। এত মানুষের মধ্যে জয়ন্তকে সে কোথায় খুঁজে পাবে? সাতাশ ঘন্টার লম্বা ট্রেন জার্নি নিদারুণ অশান্তিতে কেটেছে। বারবার সন্দেহ হয়েছে সে কি ঠিক কাজ করল? বাবা, মা, দাদা, আজন্মর চেনা মফস্‌সল শহরের মানুষজনদের ছেড়ে একা একা অনিশ্চিতের পথে পাড়ি দিয়েছে। কোথায় যাচ্ছে কাউকে বলে পর্যন্ত আসেনি। কিন্তু সেই অনিশ্চিতের কাছে সে যতখানি নির্ভরতা পেয়েছে তা চেনা মানুষদের কাছ থেকে তার ভগ্নাংশ পেলে এই অবস্থা হত না।

    সেদিন বিকেলে থানায় গিয়ে সটান বড়বাবুর ঘরে উপস্থিত হয়েছিল দময়ন্তী। বড়বাবু মানুষটা ভাল। কিন্তু ভাল মানুষরা কবে কোনও ভাল কাজ করতে পেরেছে? সব শুনে বড়বাবুর মুখ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে সব জেনে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “জানি না কতদূর কী করতে পারব। সর্ষের মধ্যে ভূত বাসা বাঁধলে ঝাড়া মুশকিল। আমি কমিশনার সাহেবকে জানাব। কিন্তু বুঝতেই পারছ, যখন সব জানাজানি হয়ে যাবে তখন তোমাকে প্রোটেকশন দেওয়া সম্ভব হবে না। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তোমার কোনও আত্মীয়-পরিজন থাকলে, কিছুদিনের জন্য সেখানে চলে যাও। সব মিটলে আমি তোমায় খবর দেব।”

    দিশেহারা লাগছিল, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে কোন আত্মীয়র কাছে যাবে? গেলেই বা তারা কতদিন আশ্রয় দেবে? তাছাড়া বাবা কোনওমতেই রাজি হবে না। বলেছিল, “কোথায় যাব স্যর? আমি চলে গেলে মেজবাবু বাবা-মার ওপর উপদ্রব করবে।”

    বড়বাবু চিন্তিত মুখে বলেছিলেন, “যদি সম্ভব হয়, আপাতত বাবা-মাকে জানিও না কোথায় যাচ্ছ। বোলো আমি তোমায় একটা কাজে বাইরে পাঠিয়েছি। এসব ক্ষেত্রে ইগ্নোরেন্স ইজ ব্লিস। আমি দেখব যাতে তোমার বাবা-মার ওপর কোপ না পড়ে।”

    বেরিয়ে এসে জয়ন্তকে একটা ফোন করেছিল, সেই মুহূর্তে আর কারো নাম মাথায় আসেনি। ভয় হচ্ছিল, যদি ফোন না ধরে! অন্য প্রান্তে জয়ন্তর সাড়া পেয়ে কেন জানি কথার সঙ্গে কান্না জড়িয়ে গিয়েছিল। সব শুনে জয়ন্ত বলেছিল, “কিচ্ছু ভাবতে হবে না। সোজা মুম্বাই চলে এসো। আমি টিকিট, রিজার্ভেশন করে পাঠাচ্ছি। ফোনে মেসেজ আসবে। আসার সময় আধার কার্ড আনতে ভুলো না।”

    দময়ন্তী জিজ্ঞেস করেছিল, “চিনি-জানি না, ওখানে গিয়ে থাকব কোথায়?”

    জয়ন্ত বলেছিল, “সে সব চিন্তা আমার ওপর ছেড়ে দাও...”

    বড়বাবুকে ফিরে গিয়ে বলতে নিজের কম্প্যুটারে টাইপ করে, নিচে সই করে, স্ট্যাম্প লাগিয়ে একটা চিঠি বানিয়ে দিয়েছিলেন। মাস তিনেকের জন্যে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশান ডিউটিতে দময়ন্তীকে নতুন মুম্বাই পাঠানো হচ্ছে। সেই রাতটা নির্ঘুম কেটেছিল। পরের দিন ভোরবেলা কারো ঘুম ভাঙার আগেই ডাইনিং টেবিলের ওপর একটা দু’-লাইনের চিঠি লিখে রেখে এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল দময়ন্তী। পার্স আর মোবাইল ছাড়া কিছু আনেনি। যদি কেউ দেখে ফেলে! যদি কারো সন্দেহ হয়!

    লোকাল ট্রেন ধরে হাওড়া স্টেশন, তারপর প্ল্যাটফর্ম খুঁজে হাওড়া-মুম্বাই দুরন্ত এক্সপ্রেস। যতক্ষণ ট্রেন না ছাড়ে বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করছিল। জানলার ফ্রেমে হাতের ভর দিয়ে বাইরে নজর রাখছিল। হে ভগবান, চেনাজানা কেউ যেন না এই ট্রেনটায় চড়ে। ট্রেনটা গড়াতে শুরু করার পর একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখেছিল। রেলওয়ে পুলিশ ফোর্সের দু’-জন কনস্টেবল একটা লোককে হেঁচড়াতে-হেঁচড়াতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটা তাদের হাত ছাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করছে। পেরে উঠছে না। দময়ন্তীর মনে পড়ে গেল বইমেলা থেকে ফেরার সময় চুঁচড়ো স্টেশনে এই লোকটাকেই দেখেছিল। অদ্ভুত তো! কেবল রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মেই লোকটার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়!

    ট্রেনে অনেকবার ফোন এসেছে বাড়ি থেকে... কেটে দিয়েছে, ধরেনি। মাকে ছোট্ট করে একটা মেসেজ করেছে, ভেবো না। ঠিক আছি। অফিশিয়াল কাজে এসেছি, পরে যোগাযোগ করব। হাতে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠেই থেমে গেল। ঠিক যেমন চুঁচড়োর বই মেলায় হয়েছিল। উদ্বেগের মধ্যে ওটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে। পিঠে কার হাতের মৃদু স্পর্শ পেয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই জয়ন্তর হাসি ভরা মুখটা দেখল। ওর চোখে জল এসে গেল। মনে হল সামনে দেবদূত দাঁড়িয়ে আছে।

    ট্যাক্সিতে উঠে থিতু হয়ে বসে জয়ন্ত দময়ন্তীকে বলল, “শোনো, তোমাকে না জানিয়ে হঠকারীর মত একটা কাজ করে ফেলেছি। কাল আর্য সমাজে আমাদের বিয়ের আয়োজন করেছি। তোমার আপত্তি নেই তো?”

    দময়ন্তীর কীসের আপত্তি? বলতে হয় বলে বলল, “সে কী?”

    জয়ন্ত বলল, “একসঙ্গে থাকতে হলে বিয়েটা সেরে নেওয়াই ভাল। রেজিস্ট্রেশনটা ক’দিন পরে করে নিলেই চলবে। বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি থাকলে লম্বা নোটিস দিতে হবে না।”

    জয়ন্তর কথার মধ্যেই ঝুপ-ঝুপ করে বৃষ্টি নেমেছিল। এবারের বর্ষা যাই-যাই করেও মুম্বাই ছেড়ে যাচ্ছে না। দময়ন্তী জয়ন্তর হাতের ওপর আলগা করে সম্মতির হাত রেখেছিল। জয়ন্ত বলেছিল, “আজ রাতটা কিন্তু আমার বাসায়... অসুবিধে হবে না তো?”

    দময়ন্তীর মনে হচ্ছিল পাশে বসা মানুষটা খুব পরিচিত। অনেকদিন পরে সে নিজের ঘরে চেনা মানুষের কাছে ফিরছে। জয়ন্তর দ্বিধা দেখে মজা পেয়েছিল। যে মানুষের মনে পাপ আছে সে আগ বাড়িয়ে এত কথা বলে না। জয়ন্তকে আশ্বস্ত করার জন্য অস্ফুট স্বরে বলেছিল, “ধ্যুত... অসুবিধে কীসের?”

    জয়ন্ত ওর হাতে চাপ দিয়ে বলেছিল, “বিয়ের জন্য একটা বেনারসি কিনেছি, জানি না তোমার পছন্দ হবে কি না… বাকি যা লাগবে আজ সন্ধেবেলা বেরিয়ে কিনে নিও।”

    দময়ন্তী একটু মনখারাপ হয়েছিল, বলেছিল, “বিয়ের সময় তোমার আমার বাবা মা কেউ থাকবে না…”

    জয়ন্ত ঘাড় ঝাঁকিয়েছিল, “বন্ধুরা থাকবে… তাছাড়া উপায় কী?” তারপর হেসে বলল, “কী পাগলামি করলে বলো দেখি! তোমার বাবা মা নিশ্চয়ই ভেবে অস্থির হচ্ছেন।”

    দময়ন্তী এই মুহূর্তে বাবা-মার কথা ভাবতে চাইছিল না। মন দিয়ে ট্যাক্সির জানলায় বৃষ্টি দেখছিল। চারদিকে উঁচু-উঁচু বাড়ি। পাঁশুটে রঙের মেঘেদের দল যেন তাদের কার্নিশ ছুঁয়ে আছে। মাহ ভাদর নয় যদিও তবু আজ ভরা বাদর। ট্যাক্সির জানলার কাচে ঝিরঝির বৃষ্টির শব্দ, ভাপ জমে বাইরের চলমান শহর আবছা দেখাচ্ছিল। এমন ঘষা-ঘষা শহর দময়ন্তীর পছন্দ হচ্ছিল না, কাচ নামিয়ে মুখ বাড়াল। অমনি বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে এক গুচ্ছ ভায়োলেট রঙের ফুরুস ফুল হুড়মুড় করে ট্যাক্সির ভেতরে ঢুকে পড়ল। দময়ন্তী চোখ তুলে দেখল রাস্তার পাশে এক সারি ঝুঁটি বাঁধা গাছ। নতুন বউ এলে এক ঝলক দেখার জন্য যেমন পাড়াপড়শিরা ভিড় করে আসে, গাছগুলো তেমনি ঝুঁকে রয়েছে। জয়ন্ত মৃদু শাসন করল, “কী করছ? ভিজে যাবে যে!”

    ফুলগুলোকে হাতে নিয়ে দময়ন্তীর মনে হল ফুল নয়, সেগুলো ছেলেমানুষ মেঘ, মুখে রঙ লাগিয়ে ফুলের ছদ্মবেশ নিয়েছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর কে কোথায় মনখারাপ করে বসে আছে আর সুযোগ পেলেই হাপুসুটি ভিজিয়ে দিচ্ছে। দময়ন্তী হেসে বলল, “ভিজতে ইচ্ছা করছে খুব।”

    হাই-রাইজের অন্তরাল ছেড়ে ট্যাক্সিটা মুম্বাই-পুনে হাইওয়ে ধরল। দময়ন্তী দেখল, রাস্তার দু’-দিকে যতদূর চোখ যায় গরান গাছের জঙ্গল। খাড়ির সমুদ্র জোরজুলুম করে ঢুকে এসেছে মূল ভূখণ্ডের মধ্যে, বোধ হয় ইচ্ছে ছিল পশ্চিমঘাট পাহাড় ছোঁয়। যদিও পারেনি, কিছু দূর গিয়েই দম ফুরিয়ে গেছে। আপাতত ভাঁটা চলছে। পাথুরে কালো মাটি উপুড় হয়ে রোদ পোহাচ্ছে। দু’-চারটে জেলে নৌকো নোঙর নামিয়ে পড়ে আছে এদিক-ওদিক। মাছখেকো পাখির দল তাদের গলুইয়ে বসে ডানা শুকিয়ে নিচ্ছে। ব্রিজ পেরিয়ে নতুন মুম্বাই, পুরনো শহরের তুলনায় অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হু-হু করে হাওয়া দিচ্ছিল। দময়ন্তীর ঘুম পাচ্ছিল, গত দু’-তিন দিনে যা ঝক্কি গেছে! ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিল। ট্যাক্সির জানলা ছেড়ে এসে, গুটিসুটি হয়ে সে জয়ন্তর কাঁধে মাথা রাখল।

    *

    সেক্টর মার্কেটের চবুতরায় উঁচু স্টেজ বেঁধে গড়বার বাজনা বাজছে। প্রতি বছরই নওরাত্রির সময় গড়বার আয়োজন হয়। মহল্লার সমস্ত ছেলেমেয়ে বাজনা ঘিরে পা মেলায়। নতুন মুম্বাইয়ের এই নোডটা পশ্চিমঘাট পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। আবার সমুদ্রও খুব দূরে নয়। পাহাড় আর সমুদ্রের মাঝের এক টুকরো জায়গায় পুরনো বেলাগাঁওয়ের পাশে গড়ে উঠছে আধুনিক ছক-কাটা শহর। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছিন্নমূল মধ্যবিত্ত মানুষেরা এসে ভিড় জমাচ্ছে। সেক্টারের পরিমাপে ভাগ করা পরিকল্পিত শহর, বেশির ভাগই সরকারি প্রকল্পের বাড়ি, ঘরের আয়তন দেশলাই বাক্সকে হার মানায়। তার মধ্যেই গাদাগাদি করে মেহনতি মানুষের সংসার, ধর্ম-কর্ম, সন্তান-প্রজনন, অবরে-সবরে বিনোদন।

    গড়বার বাজনার নিয়ম হল তার বীট বদলায় না। একই বীটে বদলে যায় গান। বদলে যায় সঙ্গী। হাতে-হাতে ঘুরছে বাহারের লাঠি। সঙ্গীর লাঠি স্পর্শ করে ফিরে আসছে। নাচিয়ের দল দু’-ভাগে ভাগ হয়ে বিনুনি বাঁধার মত একে অন্যকে জড়িয়ে ঘুরছে। এক দল ঘড়ির কাঁটার দিকে, অন্য দল বিপরীতে। মেয়েরা নতুন কামিজের বুকে আয়না সেলাই করিয়েছে। ঝুটা কাচ, তবু আলো ঝিকিয়ে উঠছে। ছেলেদের চোখেও আলো, তাদের সুঠাম শরীর জড়িয়ে ঘোরানো লোহার সিঁড়ির মত লাঠি ঘুরছে। পুরনো আমলের বাড়িতে ওই রকম সিঁড়ি থাকত। আগুন লাগলে তাড়াহুড়োয় পালানোর জন্য। কে না জানে, কম বয়সী ছেলেমেয়েদের বুকের মধ্যে সবসময়ই ধিকিধিকি করে আগুন জ্বলে। বাইরের যত না, ভেতরের উত্তাপেই সম্ভবত শক্ত সমর্থ শরীরগুলো ঘেমে উঠছে। নাচিয়েদের ঘিরে সাধারণ মানুষের ভিড়। সবাই সমান ধেই-নাচুনে নয়, সহজে অনেকের পা ওঠে না, কারো বা নাচতে ভয়ানক সঙ্কোচ।

    সেক্টার মার্কেট ঘিরে থাকা বাড়িগুলোর এক তলায় কমার্শিয়াল, হরেক রকম দোকান-বাজার। দর্জির দোকান, লন্ড্রি, মোবাইল রিপেয়ার, ষ্টেশনারি, গুজরাটি কিরানা-ঘর কী নেই! দোকানদাররাও সব ঝাঁপ ফেলে গুটিগুটি পায়ে নাচের চত্বরে জড়ো হয়েছে। স্টেজের একদম সামনে দু’-সারি প্লাস্টিকের চেয়ার, বয়স্ক মানুষদের বসার জন্য। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। একমাত্র ‘টুইঙ্কল বার আনি রেস্তোরাঁর’ দরজা খোলা। নওরাত্রি উপলক্ষে বাহারি এল-ই-ডি আলোয় সেজেগুজে অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। ভেতরের আলো স্তিমিত। দু’-চার জন লোক মাংসর রকমারি কেবাবে কামড় দিচ্ছে, মদের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে ছম্মক-ছল্লু মেয়েদের গান শুনছে। আজকাল নিয়ম করে সরকার ডান্স বার তুলে দিয়েছে। মেয়েরা শুধু গান গায়, চটুল হিন্দি গান, মাঝে মাঝে মেয়েদের গলা বাজনার আওয়াজে চাপা পড়ে যাচ্ছে। তখন সুর এবং সুরারসিকরা তাদের কাছে ডাকছে। এমনই তাদের সংগীত-প্রীতি, মেয়েদের খোলা কোমরে হাত রেখে, আদর করে পাশে বসিয়ে গান শুনছে। ওয়েটারকে ডেকে তাদের জন্যও পানীয় দিতে বলছে। মেয়েরা মদে ভেজা ঠোঁট নেড়ে গুনগুন করে তাদের কানে কানে গান শোনাচ্ছে।

    টুইঙ্কল বারের সামনের পান-সিগারেটের গুমটিতেও দেদার ভিড়। চুন-সুপুরি-খয়ের দিয়ে পান মুড়ে হাতে-হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে দোকানের ছেলেটা। তার আঙুল খয়েরের রঙে লাল হয়ে আছে। গুলকন্দ দেওয়া মিঠে পান চাইছে কেউ, বানারসি পাত্তা। পানের রস সোজা মাথায় গিয়ে ধাক্কা দেয়। তখন মানুষ পান চিবোতে চিবোতে পা ঠোকে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পায়ে তাল দেয়। তখন আর জড়তা থাকে না। সেও ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। অপরিচিতদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলে মনে হয় সে অদৃশ্য হয়ে গেছে। যেমন কাচের মধ্যে দিয়ে আলো পার হয়ে যায়, আশপাশের মানুষের দৃষ্টি তার শরীর ফুঁড়ে চলে যাচ্ছে, স্পর্শ করছে না। এইমাত্র সমুদ্র থেকে উঠে আসা ঝোড়ো হাওয়ায় তার পাঁজরের মধ্যে দিয়ে নুনের মত গুঁড়ো-গুঁড়ো সোডিয়াম ভেপার উড়ে গেল। এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া তার একটা প্রিয় খেলা। এই খেলাটা খেলতে তার বেশ আমোদ হয়। এখন কার্যত সে একজন নেই-মানুষ। তার শরীর নেই, মন নেই, ইচ্ছে-অনিচ্ছে, হাসিকান্না কিচ্ছু নেই।

    এমনকি তার গালের ওপর হিম পড়েও শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলত তার চোখের নিচের কালো দাগ ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। কী যেন একটা কাজ করার ছিল। খুব জরুরি। ভুলে গেছে। সে নাচের দলের দিক থেকে অন্যমনস্ক ভাবে মুখ ফেরাল। উল্টো দিকে হাইওয়ে, পার হয়ে জলাজমি, নুনঢিপি, ম্যানগ্রোভ, ইতস্তত পাথর। আবছা মনে হল ওইখানে একটা বেওয়ারিশ লাশ পড়ে আছে। দুটো বিস্ফারিত চোখ, মৃত্যুর সময় আতঙ্কের থেকে বিস্ময়বোধ বেশি ছিল। যার লাশ তাকে কি সে চিনত? হয়তো চিনত, না-হলে চোখদুটো নেই-আঁকুড়ের মত পিঠে লেগে আছে কেন? কোথায় দেখেছে চোখদুটো?

    এতক্ষণে হয়তো বিষ পিঁপড়েরা সারি বেঁধে শরীরটার দিকে এগোচ্ছে। কে আগে নাগাল পাবে? সমুদ্র না পিঁপড়েরা? জোয়ার আসছে, সমুদ্রের জল বাড়ছে। পিঁপড়েরা হয়তো জলের শব্দ শুনে ফিরে যাবে। তারা জলকে ভয় পায়। জল তাদের শত্রু। মাঝরাতের জোয়ারে শরীরটা ভেসে যাবে। কোন আঘাটায় গিয়ে উঠবে কেউ হদিশ পাবে না। হদিশ পেলেও ফোলা-ফাঁপা একটা লাশ শনাক্ত করা মুখের কথা নয়। লাশটা ভেসে যাবার আগেই তাকে দুটো ব্যাপারে মনস্থির করতে হবে। এক, সে সত্যিই লাশটাকে দেখেছিল কি না। দুই, লাশ হয়ে যাবার আগে মানুষটা তার পরিচিত ছিল কি না।

    হাতে সময় নেই। সিমেন্টের চাতালে দলছুট একটি মেয়ে বসে আছে, নাচতে নাচতে হাঁপিয়ে গেছে, দু’-দণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছে। তাকে সে চেনে না, স্বভাবতই মেয়েটির ঠোঁটের উপরে জমে ওঠা স্বেদবিন্দুর ওপর তার কোনও অধিকার নেই। মানুষের ছুটির উৎসব শেষ হয় না। ক্ষণিক থেমে আবার বাজনা শুরু হয়। ঘাম শুকিয়ে গেলে মেয়েটি আবার উৎসবে ফিরে যাবে, গড়বার বাজনায় পা মেলাতে। সময় নেই। তার আগে তার সামনে গিয়ে হাত পেতে দাঁড়াতে হবে। যেন এই পরকীয়া তার ভবিতব্য। যদি সেই মেয়ে করুণাভরে এক বার তার পায়েসের বাটির মত আয়ত চোখ তুলে তাকায়! চেনা কেউ নয়, সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন কোন নারীর কাছে মাধুকরী করে যদি এক মুষ্টি ভালবাসা পায়, হয়তো সে এ যাত্রায় বেঁচে যাবে।

    সে পা বাড়াতে গিয়ে দেখল একটি যুবক মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটি মুখ তুলে তাকাল। ওরা কি পরস্পরকে চেনে? মেয়েটি সম্পূর্ণ অচেনা হলেও ওই যুবকটি তার চেনা। ওর নাম বিজন। বিজনের ঠোঁট থেকে সিগারেট ঝুলছে। সিগারেটে টান দিতে দিতে বিজন মেয়েটির সঙ্গে কথা বলছে, এদিকে তাকাচ্ছে না। তাকালেও ভিড়ের মধ্যে তাকে দেখতে পেত না। মেয়েটি বিজনের দিকে তাকিয়ে হাসল। হাত বাড়িয়ে বিজনের হাত থেকে অর্ধেক পুড়ে যাওয়া সিগারেট নিয়ে ঠোঁটে লাগাল। আলোর নিচে থেকে উঠে মেয়েটি বিজনের হাত ধরে অন্ধকারের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ওইদিকে একটা পার্ক আছে। সন্ধের পরে পার্কটা মূলত নেশাড়ুদের দখলে চলে যায়। ঢলানি মেয়েরা মোটর বাইক থেকে নেমে টাপোরিদের হাত ধরে পার্কে ঢুকে যায়, আড়াল খুঁজে বসে।

    বিজন মেয়েটিকে নিয়ে পার্কের ভিজে অন্ধকারের মধ্যে নেমে গেল। শঙ্খলাগা সাপের মত তারা এখন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরবে। একে অন্যের গালের মধ্যে চেরা জিভ পুরে দেবে। হয়তো ঘাসের ওপর আছাড়ি-পিছাড়ি করবে, যেমন সাপেদের স্বভাব। ঘাসের নিচে মাটিতে জমে থাকা শ্যাওলায় তাদের শরীর সবুজ হয়ে যাবে। সে কেন অযথা তাদের অনুসরণ করছে? এই পৃথিবীর কোনও মেয়েই তাকে মুষ্টিভিক্ষা দেবে না। সেই ভাগ্য করে সে জন্মায়নি। সে ফিরে আসতে আসতে গড়বার বাজনার শব্দ থেমে গেল।

    স্টিলের কানা উঁচু থালায় কাগজের কাপ সাজিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে স্টেজে উঠল। বাজনাদাররা রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ছেলেটার হাতে ধরা প্লেট থেকে কাটিং চায়ের কাপ তুলে নিচ্ছে। শব্দ থেমে গিয়ে স্টেজের ওপর সাময়িক ভাবে মৃত্যুকালীন স্তব্ধতা পড়ে রয়েছে। যেমন উৎসব শেষ হলে প্লাস্টিকের পা-ভাঙা চেয়ার পড়ে থাকে। রাত বাড়ছে, খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে। সে সিদ্ধান্ত নিল যে আর সমুদ্রের কাছে যাবে না। বাসায় ফিরে যাবে। সেক্টার মার্কেটের হট্টগোল ছেড়ে সে পিচ রাস্তায় নামল। খানিকক্ষণ হাঁটার পর বুঝতে পারল বাড়ি ফিরে যাবার পথ হারিয়ে গেছে। অথচ এই রাস্তাটাই ডানদিকে বেঁকে তার বাসার দিকে যাবার কথা।

    এমন নয় সমস্যাটা নতুন, আগেও দু’-একবার এরকম হয়েছে, সে চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে অথচ কিছুতেই বাসা খুঁজে পায়নি। গেল কোথায় হতচ্ছাড়া বিল্ডিংটা? রাস্তাটা নির্জন, দু’-একটা উটকো কুকুর ছাড়া জনপ্রাণী নেই। কাকে জিজ্ঞেস করবে? কে যেন বলেছিল জঙ্গলে রাস্তা হারালে গাছের গায়ে ঢেড়া কাটতে হয়। কংক্রিটের জঙ্গলে উপায়টা কাজ দেবে কি? সে একটা ইটের টুকরো তুলে নিয়ে বাঁ-দিকের বাড়িটার লোহার গেটে একটা গুণ চিহ্ন আঁকল। এবার আর চিনতে ভুল হবে না। সে এগোল, মিনিট পাঁচেক হেঁটে থমকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল সেই গুণ চিহ্নটার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে রাস্তাটা থেমে আছে, কোথাও যাচ্ছে না। শরীর ভেঙে আসছে, পা দুটো আর দিচ্ছে না। সে হতাশ হয়ে পেভমেন্টের ওপরই বসে পড়ল। ঠিক সেই সময় তার বুক পকেটে রাখা মোবাইলে টুং করে একটা মেসেজ ঢুকল আর তার মনে পড়ে গেল, আরে বাঃ, সে তো গুগল ম্যাপ দেখেই ফিরে যেতে পারে। মনে পড়ে গেল, আগের বারও যখন সে পথ হারিয়েছিল, গুগল ম্যাপ দেখেই বাসায় ফিরে গিয়েছিল।


    (এর পরে)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণ: কল্লোল রায়
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)