• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৪ | অক্টোবর ২০২১ | উপন্যাস
    Share
  • পরিক্রমা (৫ - ৭) : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


    || ৫ ||

    “আরেহ্ দত্তাজি, ক্যায়সে হো আপ?” প্লাজার ম্যানেজার উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করল। অমিতাভদা স্পষ্টতই ম্যানেজারের পূর্ব-পরিচিত, হেসে হাত নাড়ল। জয়ন্ত আর দময়ন্তী অতিথিদের আপ্যায়ন করার জন্য দরজাতেই দাঁড়িয়েছিল। জয়ন্ত পরেছে ঘি রঙের চোস্তের ওপর দময়ন্তীর প্রিয় গাঢ় নীল রঙের শেরওয়ানি। আর দময়ন্তী কদিন আগেই নাল্লী থেকে কেনা ময়ূরকন্ঠী কাঞ্চীপুরম সিল্ক। পাশে শিমুলও ছিল। দময়ন্তী দেখল শিমুলের চোখ অমিতাভদাকে ছিনে জোঁকের মত অনুসরণ করছে। অমিতাভদা আজ ডেনিম জিনসের ওপর মেরুন কলার-উঁচু পাঞ্জাবি পরে এসেছে। দারুণ হ্যান্ডসাম লাগছে। পুলের ধারে একটা চেয়ার টেনে বসে হাতের লম্বাটে কেসটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখল। জয়ন্ত দময়ন্তীকে বলল, “অনেকে এসে পড়েছে। তোমরা কিছুক্ষণ এদিকটা সামলাও। আমি ম্যানেজারকে একটু তাড়া দিয়ে আসি।”

    ম্যানেজার টেবিল সাজানোর তদারকি করছিল। জয়ন্ত কাছে গিয়ে খবর নিল, সব কিছু ঠিকঠাক প্ল্যান অনুযায়ী চলছে কি না। ম্যানেজার বলল, বিলকুল, চিন্তার কোনও কারণ নেই। কাবাব শিকে চড়িয়ে কাঠ-কয়লার আগুনে ঝলসানো হচ্ছে। দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই অতিথিদের গরম-গরম সার্ভ করা হবে। জয়ন্ত ফিরে আসতে আসতে আলগা করে জিজ্ঞেস করল, “দত্তা-সাবকো ক্যায়সে জানতে হো?”

    ম্যানেজার বলল, বেলাগাঁওয়ের এক প্রান্তে একটা বৃদ্ধাশ্রম আছে, দত্তাজির সঙ্গে সেখানেই আলাপ। ম্যানেজারের এক কাকা সেখানকার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। তাই কাজেকর্মে ম্যানেজারের সেখানে যাতায়াত আছে। অমিতাভদা সপ্তাহান্তে, ছুটিছাটায় বুড়োবুড়িদের সঙ্গ দিতে, গান শোনাতে যায়। বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকরা অমিতাভদাকে খুব পছন্দ করে, ভালবাসে।

    জয়ন্ত সরে এল। সুইমিং পুলের তিনদিক ঘিরে গোটা দশ-বারো টেবিল। চতুর্থ দিকে বাফে টেবিল সাজানো। আজ আকাশ মেঘহীন, তারকাখচিত। হোটেল থেকে বলেছিল আচমকা বৃষ্টি এলে একখানা হলঘর খুলে দেবে। তার দরকার পড়েনি। অতিথিরা যে যার চেনা-পরিচিত মানুষের টেবিল খুঁজে একজোট হয়ে গল্পগুজব করছে। বন্ধু-বান্ধব ছাড়া অফিসের কিছু লোকজন ডেকেছিল, জয়ন্ত তাদের টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। সবাই ওকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। ওদের ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি বীণা ম্যাডাম জয়ন্তকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলল, ছুটির পর যখন অফিস যাবে তখন যেন ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশানের সার্টিফিকেটের একটা কপি জমা দেয়। দু’দিন আগেই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশানে গিয়ে রেজিস্ট্রেশান করিয়ে এসেছে জয়ন্ত আর দময়ন্তী। আনুষ্ঠানিক বিয়ের ছবি ইত্যাদি থাকায় অসুবিধে হয়নি। জিতেন আর সঞ্জয় জয়ন্তর দিক থেকে সাক্ষী ছিল। বিজন আর রাধিকা দময়ন্তীর দিক থেকে।

    তারের বাজনার টুংটাং শব্দে মুখ ফিরিয়ে দেখল, অমিতাভদা কেস খুলে ম্যান্ডোলিন বার করেছে। কেউ হয়তো কৌতূহল দেখিয়েছিল, কেসের মধ্যে কী আছে জানতে চেয়েছিল। অমিতাভদাকে ঘিরে ভিড় জমছে। যেকোনও পার্টিতেই অমিতাভদা মধ্যমণি। অতিথিদের মধ্যে অনেকেই অবাঙালি। অমিতাভদা পুরনো কিশোরকুমার ধরল – ম্যায় হুঁ ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম ঝুমরু... জয়ন্তর মনে হল পুলের জলেও যেন সুরের কাঁপন লাগল। অমিতাভদার ভরাট মিঠে গলা হোটেলের নিচু ফেন্স পার হয়ে ম্যানগ্রোভদের ওপর দিয়ে খাড়ির সমুদ্রের দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছিল, যেন সমুদ্র-পাখি, হাম-সফর হবার জন্য হাতছানি দিচ্ছে।

    নিরামিষ কেবাব দু’রকমের, হরাভরা আর পনীর টিক্কা। আমিষও দুই, চিকেন রেশমি আর চিকেন টিক্কা। স্বাস্থ্যের কারণে লাল মাংস আজকাল কেউ পছন্দ করে না, তাই মেনু থেকে বাদ গেছে। ওয়েটাররা কেবাবের প্লেট নিয়ে ঘুরছিল। টুথপিকে কেবাব গুঁজে এগিয়ে দিচ্ছিল, হাতে টিস্যু পেপার ধরিয়ে দিচ্ছিল। নরম পানীয়র পাত্র সাজিয়ে ঘুরছে অন্য আর একজন। উজ্জ্বল হলুদ আলো স্বর্ণরেণুর মত নারী-পুরুষের চুলের ওপর, পোশাক-আশাক, ত্বকের ওপর ঝরে পড়ছে। তাতে পুরুষদের প্রয়োজনের থেকে বেশি সুদর্শন ও মহিলাদের স্বাভাবিকের থেকে বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। জয়ন্ত দেখল শিমুল অমিতাভদার পাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধর মত গান শুনছে। তার দীঘল শরীর সর্পিণীর মত অল্প-অল্প দুলছে। দেখল দময়ন্তীও পায়ে-পায়ে ভিড়ের মধ্যে শিমুলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদের অন্তাক্ষরী খেলার পরিকল্পনা বোধহয় গানে গানে ভেসে যাচ্ছে। তা যাক, ক্ষতি নেই, আনন্দটাই আসল। সবাই গলা মেলাচ্ছে, পায়ে তাল ঠুকছে, নিজেদের পছন্দের গানের অনুরোধ জানাচ্ছে। পাশের টেবিল থেকে সঞ্জয় গলা তুলে বলল, “দাদা, এক ফোক হো যায়ে!”

    অমিতাভদা একটা রাজস্থানী ফোক গান ধরল। গানের মাঝে মাঝে অমিতাভদা দু’-একটা কথা বলছে, গানের মানে সরল ভাষায় বুঝিয়ে দিচ্ছে। বলছে, অনেক জনপ্রিয় হিন্দি ছবির গানের সুর এই সব ফোক গানের অনুকরণে তৈরি করা। ম্যানেজার জয়ন্তর পাশে দাঁড়িয়ে গান শুনছিল, ফিসফিস করে বলল, “দত্তাজিকো ফিল্মোমে যানা চাহিয়ে।”

    জয়ন্তর মনে হল শিমুলের কী দোষ? দময়ন্তীর সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হলে জয়ন্ত নিজেও খুব কষ্ট পাবে। একটা মানুষ এত সুন্দর হতে পারে অমিতাভদাকে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। অমিতাভদা ম্যান্ডোলিন পাশে নামিয়ে রেখে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। দময়ন্তী শিমুলকে বলল, “এই ফাঁকে আমাদের খেলাগুলো চালু করা যাক।”

    শিমুল হাততালি দিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, “এবার শুরু হচ্ছে কাপল-গেম...”

    ব্যাচেলার ছেলেপুলেরা সমস্বরে প্রতিবাদ জানাল, আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি? আমাদের কী হবে? দময়ন্তী তাদের আশ্বস্ত করে বলল, শান্তি, শান্তি, তোমাদের জন্যেও খেলা আছে, ধৈর্য ধরো।

    কাপল গেমে আশ্চর্যজনক ভাবে রাধিকা আর বিজন জিতে গেল। দেখা গেল যে সব দম্পতিদের বিয়ে তামাদি হয়ে ঝুরুঝুরু হলুদ কাগজ হয়ে গেছে তারা একে অন্যের ব্যাপারে রীতিমত উৎসাহ হারিয়ে বসে আছে। সঙ্গীর প্রিয় রঙ, প্রিয় গান, প্রিয় আরও অনেক কিছুই বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে। ব্যাচেলারদের জন্যে ডাম শারাড। খেলাটার সরঞ্জাম সাজাতে একটু সময় লাগল। পুলের ধারে একটা সরু টেবিল পেতে একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সয় একরাশ কাগজের পুরিয়া রাখা হল। চোখ বুজে পুরিয়া তুলতে হবে। মোড়ক খুললে দেখা যাবে ভেতরে কী লেখা আছে। সেটা সিনেমার নাম হতে পারে, টিভি শো বা অন্য কিছু। এইবার লেখা অনুযায়ী অভিনয় করে দেখাতে হবে। মুখে শব্দ করা চলবে না, মূকাভিনয়। অন্যরা আন্দাজ করবে কী করা হচ্ছে। যার অঙ্গভঙ্গি দেখে সব চেয়ে আগে পুরিয়ার লেখা অনুমান করা যাবে সে জিতবে।

    প্রথমে এল সঞ্জয়। তার পুরিয়ায় লেখা বেরোল - ফরেস্ট গাম্প। শিমুল সময়ের হিসেব রাখছিল, সঞ্জয় অনেক দৌড়ঝাঁপ করে যখন বোঝাল ততক্ষণে সাড়ে তিন মিনিট পেরিয়ে গেছে। কপাল থেকে ঘাম মুছে সঞ্জয় নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে বসল। এর পর এল জয়ন্তদের ডিপার্টমেন্টের শৈলজা। তার কাগজে উঠল - চাচী চারশ বিশ। জয়ন্ত দেখছিল হাসি-হুল্লোড়ে খেলা জমে উঠছে।

    ঝামেলা হল অমিতাভদা খেলার জন্যে চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে যেতে। শিমুল প্রথমে অমিতাভদাকে দেখেনি, মোবাইলে নাম আর সময় নোট করছিল। মাথা তুলে সামনে আচমকা অমিতাভদাকে দেখে নার্ভাস হয়ে দু-পা পিছু হঠতেই ঝুপ করে পুলের জলে পড়ে গেল। সবাই হৈ-হৈ করে উঠল। শিমুল যে দিকটায় পড়েছিল সেদিকে পুলটা প্রায় এক মানুষ গভীর। শিমুল হাবুডুবু খাচ্ছিল। কেউ কিছু বোঝার আগেই অমিতাভদা জলে নেমে শিমুলকে ধরে পুলের সিঁড়ির কাছে টেনে আনল। পাড়ে উঠে শিমুল ভয়ানক লজ্জায় পড়ে গেল। একে ভিজে পোশাক তার ওপর সবাই এসে জিজ্ঞেস করছে, কী করে জলে পড়ল। দময়ন্তী শিমুলকে উদ্ধার করল, বলল, বেচারা সবে জ্বর থেকে উঠেছে, মাথা ঘুরে গিয়েছিল বোধহয়।

    জয়ন্ত আর দময়ন্তী এক সেট করে অতিরিক্ত জামাকাপড় এনেছিল। অনুষ্ঠান শেষ হলে ধড়াচূড়া ছেড়ে সাধারণ পোশাকে বাড়ি ফিরবে বলে। দময়ন্তীর সালোয়ার কামিজ না-হয় শিমুলের ফিট করে যাবে। কিন্তু অমিতাভদার গায়ে জয়ন্তর শার্ট প্যান্ট উঠবে না। ম্যানেজার বলল, অমিতাভদার জামাকাপড় ড্রায়ারে শুকিয়ে ইস্তিরি করে দেবে। অমিতাভদা ম্যানেজারের সঙ্গে গেল। আর দময়ন্তী শিমুলকে নিয়ে গেল পোশাক বদলানোর জন্য। খেলাটা মাঝপথে থেমে গেল। সেজন্য সবাই একটু নিরাশ হয়ে পড়ল।

    রাত বাড়ছিল। জয়ন্ত দময়ন্তীর জন্য অপেক্ষা করছিল, কখন শিমুলকে নিয়ে ফিরবে। সমুদ্র থেকে উঠে আসা ভিজে হাওয়া সারা দিনের তাপ শুষে নিচ্ছিল শরীর থেকে। আরাম লাগছিল। ডিনার শুরু হচ্ছে, বাচ্চারা কলকল করে আগে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছে। বড়রা তাদের সামলাচ্ছে। খুব ছোট যারা তাদের মায়েরা কোলে বসিয়ে মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। টিস্যু পেপার দিয়ে বাচ্চার মুখ মুছিয়ে পাশের মায়ের সঙ্গে খোশগল্প করছে। সবার চোখেমুখে খুশি চলকাচ্ছে। জয়ন্ত ভাবল, আহা, জীবনটা যেন সবাইকে নিয়ে এইরকম উৎসব করতে করতেই কেটে যায়!

    *

    “বাসুর দাদা কবে আসছেন কিছু জানিয়েছেন?” অমিতাভদা জিজ্ঞেস করল। জয়ন্ত বলল, “সামনের সপ্তাহের মাঝামাঝি সম্ভবত, বিজন তো তাই বলল।”

    জয়ন্ত আর দময়ন্তী এসেছিল বই ফেরত দিতে। বই দুটো পড়া হয়ে গিয়েছিল, নানারকম ব্যস্ততায় আসা হচ্ছিল না। জয়ন্ত দময়ন্তীকে বলেছিল, চলো, অমিতাভদার ওখান থেকে ঘুরে আসি। বই ফেরত দেওয়াও হবে, উপরন্তু কথায় কথায় বাসুর ব্যাপারে যদি কিছু জানা যায়!

    বইয়ের আলমারিতে বই তুলে রাখতে রাখতে অমিতাভদা নিজে থেকেই বাসুর কথা তুলল, বলল, “তোমরা তো থানায় গিয়েছিলে... পুলিশ কিছু কিনারা করতে পারল?”

    জয়ন্ত বলল, “পুলিশ আন্দাজ পেয়েছে। কিন্তু সন্দেহভাজন লোকটা পলাতক।”

    অমিতাভদা জিজ্ঞেস করল, “কে? সেই জনি ডিসুজা?”

    জয়ন্ত আশ্চর্য হল একটু, জিজ্ঞেস করল, “তোমায় কে বলল?”

    অমিতাভদা বলল, “এস আই মোহিতে এসেছিল, জিজ্ঞেস করছিল, বাসুর ঘরে কারা আসত, ও কাদের সঙ্গে মিশত, এইসব আর কী? কথায় কথায় জানতে চাইল, জনি ডিসুজা বলে কাউকে চিনি কি না।”

    জয়ন্ত ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, “আর কিছু বলেনি?”

    অমিতাভদা একটু ইতস্তত করে বলল, “আজগুবি গল্প শোনাচ্ছিল, বাসু নাকি স্ট্রেইট ছিল না।”

    জয়ন্ত বলল, “গল্প না সত্যি কে জানে! মানুষকে চেনা দায়!”

    অমিতাভদা বলল, “তোমরা তো বন্ধু ছিলে। কখনও কোনও অসৈরন দেখেছ?”

    জয়ন্ত বলল, “বন্ধু হলেই কি আর মানুষকে চেনা যায়! কত মানুষই তো মুখোস এঁটে ঘোরে!”

    অমিতাভদা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “অস্কার ওয়াইল্ডের একটা খুব বিখ্যাত উক্তি আছে, জানো বোধহয়, গিভ হিম আ মাস্ক, অ্যান্ড হি উইল টেল দ্য ট্রুথ।”

    জয়ন্ত বলল, “জানি অমিতাভদা। মুশকিল হল, কে সত্যি কথা বলার জন্য মুখোস পরেছে আর কে মিথ্যে বলার জন্য, সেটাই আজকাল বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে।”

    অমিতাভদা যেন বাস্তবে ফিরে এল। আলোচনা লঘু করার জন্য হেসে বলল, “মাস্ক বলে জিম কেরির একটা মুভি এসেছিল নাইন্টিজে... কমেডি মুভি, দেখেছিলে কি? কখনও কখনও মুখোসটা মানুষের মুখে এমন ভাবে চেপে বসে যে সে শত চেষ্টা করেও খুলতে পারে না।”

    জয়ন্ত বলল, “সেটা কোনও ব্যাপার নয়। নিজে না খুলতে পারলে পুলিশ নিশ্চয়ই জোর করে টেনে খুলে দেবে। বাসু যেদিন মারা যায় তার আগের দিন রাত্তিরে নাকি ও জনি ডিসুজাকে সাত-আট বার কল করেছিল। সম্ভবত জনির সঙ্গে ওর আগে থেকেই চেনা-জানা ছিল।”

    অমিতাভদা বলল, “পুলিশের পদ্ধতির একটা বড় সমস্যা হল ওরা আগে থেকে সমাধান খুঁজে বসে থাকে। তারপর অঙ্ক মেলাতে না পারলে গোঁজামিল দেয়। জনিকে সাত-আট বার ফোন করার কথা মোহিতে আমাকেও বলেছে। তখন জিজ্ঞেস করার কথা মনে হয়নি। মোহিতে চলে যাওয়ার পর মাথায় এল। এর পরের বার যখন ওর সঙ্গে দেখা হবে। ওর কাছ থেকে জেনো তো - বাসু জনির সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলেছিল, মানে কল ডিউরেশান কতক্ষণের ছিল।”

    এমন ভাবে বলল যেন অমিতাভদা জানে বাসু জনির সঙ্গে ঠিক কতক্ষণ কথা বলেছিল। আর মোহিতে ঘাসে মুখ দিয়ে চলে। সে নির্বোধ গোঁয়ারের মত বুনো হাঁসের পেছনে ধাওয়া করছে। কল ডিউরেশনের কথাটা অবশ্য জয়ন্তর মাথায় আসেনি, খানিকটা একগুঁয়ের মত বলল, “তাতে তো আর বাসুর সঙ্গে জনির সম্পর্কটা মিথ্যে হয়ে যায় না।”

    অমিতাভদা বলল, “বিজ্ঞান কী বলে জানো? একটা থিওরিকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাকি সবগুলো সম্ভাব্য থিওরিকে যুক্তি দিয়ে যাচাই করে বাতিল করতে হয়। তাকে বলে মেথড অব এলিমিনেশান...”

    জয়ন্ত অমিতাভদার কথা কেটে দিয়ে বলল, “থিওরি দিয়ে কি ক্রিমিন্যাল ধরা যায় দাদা?”

    অমিতাভদা বলল, “না, দরকার পড়লে আড়ং ধোলাই দিয়েও স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু তার জন্যে আগে জনি ডিসুজা নামের লোকটাকে হাতে পাওয়া দরকার। তোমাদের মোহিতেকে দেখে মনে হল না সে জনির কোনও হদিশ করতে পেরেছে।”

    দময়ন্তীর গগনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। বেচারা স্বীকারোক্তি দিয়েও নিষ্কৃতি পায়নি। শান্তিপুর ছেড়ে কত দূরে চলে এসেছে দময়ন্তী! জায়গাটাকে যেন ভুলতে বসেছে। তবু সেদিন রাত্তিরে গঙ্গার ঘাটে গগনের রক্তাক্ত দেহটার কথা ভেবে গা ঘুলিয়ে উঠল, বলল, "মারধোর করা কোনও কাজের কথা নয়। ওতে কিছু লাভ হয় না।”

    অমিতাভদা বলল, “ঠিক বলেছ, ওটা মধ্যযুগীয় বর্বরতা। কিন্তু আমাদের আইনরক্ষকরা তক্তা দেখলেই ধরে পেরেক মারতে থাকে। সেটাই তাদের শেখানো হয়েছে।”

    দময়ন্তী বলল, “ওটা আপনার ভুল ধারণা, সব পুলিশ এক রকম নয়।”

    অমিতাভদা জিভ কেটে বলল, “দেখেছ, তোমার পেশার কথাটা তো ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম। দেখো, তোমাদের প্রজন্ম হয়তো পুলিশের ইউনিফর্মের গায়ে লেগে থাকা কালি মুছে দিতে পারবে। তবে কাজটা শক্ত।”

    ‘তোমাদের প্রজন্ম’ শব্দ দুটো এমন ভাবে উচ্চারণ করল, নিজে যেন আদ্যি কালের বদ্যি বুড়ো। অবশ্য কাজটা যে শক্ত সেটা দময়ন্তী হাড়ে-হাড়ে বুঝেছে, তবু বলল, “চেষ্টা করতে দোষ কী?”

    অমিতাভদা বলল, “বিন্দুমাত্র দোষ নেই। তবে তার জন্য তোমায় হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকা দরকার। সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা দেবার জন্য প্রস্তুতি নাও। কর্তা তো গ্র্যাজ্যুয়েশানের জন্যে লড়ছেই, তুমিও অবিলম্বে পড়াশুনো শুরু করে দাও, দেখি।”

    দময়ন্তী বলল, “ওরে বাবা, ওই সব কঠিন-কঠিন পরীক্ষা দেওয়া আমার কর্ম নয়।”

    জয়ন্ত দেখল আলোচনাটা সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘুরে যাচ্ছে, জোর করে পুরনো কথার জের টানল, “অমিতাভদা, তুমি যে বলছিলে বিকল্প থিওরি... সেটা কী শুনি।”

    অমিতাভদা বলল, “শুনবে? ধরো যদি ওই বডিটা বাসুর না হয়। এমনও তো হতে পারে ওটা সত্যি সত্যিই ভিকি বলে একজন সমকামীর। এবং ভিকি বাসু নয়।”

    জয়ন্ত বলল, “যাঃ! পুলিশ কি এতটাই দায়িত্বজ্ঞানহীনের মত কাজ করবে?”

    অমিতাভদা বলল, “পুলিশ হাতে কী প্রমাণ আছে, যাতে তারা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারে যে বডিটা বাসুরই?”

    জয়ন্ত চিন্তায় পড়ল, “তাহলে বাসু কোথায় উধাও হয়ে গেল?”

    অমিতাভদা হেসে বলল, “ভায়া, তোমাদের বাসুদেব রাও এলিয়েন ছিল, এই পৃথিবীর বাসিন্দা ছিল না। কোনও কারণে ওকে এই পোড়া গ্রহে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। পৃথিবী-বাসের মেয়াদ শেষ করে সে নিজের গ্রহে ফিরে গেছে।”

    জয়ন্ত বলল, “ঠাট্টা নয়। ছেলেটা পালাল কোথায়?”

    অমিতাভদা বলল, “সেটা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে বাসুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেই কার-না-কার লাশকে বাসুর বলে চালিয়ে দেবে, সেটা অন্যায্য।”

    “ওর দাদা তো আসছে, দেখা যাক কী বলে,” জয়ন্ত বলল, “সেরকম সন্দেহ হলে ডিএনএ টেস্ট-ফেস্ট করিয়ে দেখা যেতে পারে।”

    অমিতাভদা বলল, “পুলিশ ডিএনএ টেস্ট করাবে? তাহলেই হয়েছে…"

    জয়ন্ত বলল, “তোমার থিওরি কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দেয় না, ভিকিকে কে মারল, কেন মারল?”

    অমিতাভদা বলল, “সে প্রশ্নের উত্তর দেবার দায় আমার থিওরির নেই। আমার থিওরি বলছে ভিকির গল্পের সঙ্গে বাসুর গল্পের আদৌ কোনও সম্পর্ক নেই। একটা গল্প কোনোক্রমেই অন্যটার রাস্তা কাটে না।”

    জয়ন্ত ঘাড় নাড়ল, “একটা চোরাগলি দিয়ে যোগাযোগ আছে… জনি ডিসুজা, ঘটনাগুলো এমন অন্ধকার যে গলির মুখটা কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।”

    অমিতাভদা বলল, “হতে পারে আবার নাও হতে পারে। আলো ফেলে দেখলে হয়তো গলিটা কানাগলি, দেওয়ালে গিয়ে উঠেছে।”

    দময়ন্তী হঠাৎ জয়ন্তর হাত টেনে বলল, “আমার শরীরটা ভাল লাগছে না, এবার উঠি চলো।”

    অমিতাভদা ব্যস্ত হল, “কী হয়েছে? জল-টল খাবে?”

    দময়ন্তী বলল, “না, না, মাথাটা টিপ-টিপ করছে, মাইগ্রেনের সমস্যা আছে, মাঝেমধ্যে জ্বালায়।”

    ওরা উঠে পড়ল। রাস্তায় বেরিয়ে জয়ন্ত বলল, “কী হল, সিরিয়াস কিছু?”

    দময়ন্তী ঘাড় নেড়ে বলল, “না গো, একটু রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে মনে হয়।”

    জয়ন্তর মাথা থেকে ঘটনাগুলো সরছিল না, খানিকটা নিজের মনেই বলল, “মোহিতে যখন এসে জিজ্ঞেস-পত্তর করেছে, কিছু নিশ্চয়ই আঁচ পেয়েছে।”

    দময়ন্তী জবাব দিল না। মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকল।

    *

    জয়ন্ত আর দময়ন্তী ডক্টর নীতা মিশ্রর চেম্বারে এসেছিল। ভদ্রমহিলা নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট, এই অঞ্চলের বেশ নাম করা ডাক্তার। মানসিক অবসাদ, উদ্‌বেগ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি থেকে রেহাই পেতে বেশিরভাগ লোক তাঁর কাছে আসে। ডাক্তারের চেম্বারে আসার কারণ হল পর-পর তিন রাত্তির দু’-চোখের পাতা এক করতে পারেনি দময়ন্তী। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে জানলা দিয়ে আসা জ্যোৎস্নার আলোয় জয়ন্ত দেখেছে, সে বিছানায় উঠে বসে আছে। জিজ্ঞেস করেছে, “কী হল?”

    দময়ন্তী বলেছে, “ঘুম আসছে না এত আলো...”

    “পর্দা টেনে দেব?” জয়ন্ত জিজ্ঞেস করেছে।

    “না, পর্দা টানলে দমবন্ধ হয়ে আসে,” বলে দময়ন্তী আবার শুয়ে পড়েছে, কিন্তু চোখ বুজতে পারেনি, ড্যাবড্যাব করে ঘুরন্ত সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। জয়ন্ত পারলে হাত বাড়িয়ে চাঁদটাকে জানলা থেকে ঠেলে সরিয়ে দিত। সে উপায় নেই বলে চাঁদের আলো আড়াল করার জন্য দময়ন্তীকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে, চুলের মধ্যে বিলি কেটে দিয়েছে। কাজ হয়নি। দময়ন্তী আবার ছটফট করে উঠে বসেছে। যতবার চোখ বুজছে ততবারই গগনের মুখটা চোখের মধ্যে ভেসে উঠছে। নিজেকে প্রাণপণে বোঝাবার চেষ্টা করেছে লোকটা আদতে খুনি ছিল। তাকে বেশি করুণা করা উচিত নয়। কিন্তু কিছুতেই গগনের আধবোজা মৃত চোখ দুটোকে মাথার থেকে উপড়ে ফেলতে পারেনি।

    দিনের আলোয় জয়ন্ত দেখল দময়ন্তীর মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে, চোখের নিচে কালি পড়ছে, বলল, “শোনো, এই রকম চললে একটা বড় অসুখ বেধে যাবে। জিতেনের এক দূর সম্পর্কের দিদি মনোবিদ, সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং করেন, কাছেই... সী উডসে চেম্বার। একবার যাই চলো, কথা বলে আসি।”

    দময়ন্তী বলল, “কেবলই মনে হচ্ছে আমার রুখে দাঁড়ানো উচিত ছিল। আমি শান্তিপুর থেকে ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছি। কী কুক্ষণে যে অমিতাভদার সঙ্গে পুলিশের অত্যাচার নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম!”

    জয়ন্ত বলল, “ওই ভাবে দেখছ কেন, চলে আসা ছাড়া তখন তোমার সামনে আর কোনও পথ খোলা ছিল না।”

    দময়ন্তী ম্লান মুখে বলল, “বাবা মায়ের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে, জানো। ওদের কী দোষ বলো? মিছিমিছি আমার জন্য বিপদে পড়ল।”

    জয়ন্ত বলল, “ওঁরা ভাল আছেন, আমি খবর নিয়েছি।”

    দময়ন্তী শুনে অবাক হল, “মানে? কোত্থেকে খবর পেলে?”

    জয়ন্ত বলল, “আমার দাদার সঙ্গে কথা বলেছি। অবশ্য বলিনি তুমি আমার সঙ্গে আছ।”

    দময়ন্তী বলল, “খুব দেখতে ইচ্ছে করছে সবাইকে, কবে যে যেতে পারব!”


    তিন রাত না ঘুমিয়ে শেষ পর্যন্ত দময়ন্তী নিজের থেকেই বলল, “কষ্ট হচ্ছে, সারা দিন শরীর ঢিস-ঢিস করে। কোন কাউন্সেলরের কথা বলছিলে, চলো, একবার ঘুরে আসি। ঘুমের বড়িও যদি লিখে দেয়, তাই সই।”

    জিতেন ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিল। সন্ধেবেলা, জয়ন্ত অফিস থেকে ফেরার পর চলে এসেছিল দু’জনে। রিসেপশনিস্ট একটা জাব্দা খাতা খুলে ওদের নাম লেখা আছে কি না দেখে বসতে বলল। জয়ন্ত দেখল একজন কোট-টাই পরা ভদ্রলোক ডাক্তারের কেবিনে ঢুকল, মনে হল অফিস ফেরত এসেছে। মুখে কেমন চোর-চোর ভাব, যেন মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে এসে একটা সাংঘাতিক অপরাধ করে ফেলেছে। মিনিট কুড়ি হয়ে গেল সেই ভদ্রলোক ভেতরে। কী এত কথা বলছে কে জানে? এক বয়স্ক দম্পতি বসে আছে, ওদের আগে ডাক্তারের কাছে যাবে। ভদ্রমহিলাটি উসখুস করছেন, কখন কোট-টাই বেরোয়। ভদ্রলোক তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি একটা রংচঙে মরাঠি পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছে, সম্ভবত সিনেমার। মাঝেমধ্যে ল্যান্ডলাইনে ফোন এলে জাব্দা খাতায় পেসেন্টের নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর টুকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে।

    কোট-টাই যখন ডাক্তারের কেবিন থেকে বেরোল তাকে দেখে অনেক সপ্রতিভ লাগল। রিসেপশনিস্টের চোখের ইশারায় বয়স্ক দম্পতি কেবিনে ঢুকে গেলেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ভদ্রলোক বাইরে বেরিয়ে এসে জয়ন্তর পাশের চেয়ারে বসলেন। ভদ্রমহিলাটিই সম্ভবত রোগী, ডাক্তার হয়তো তাঁর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চান। জয়ন্ত ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করল। ভদ্রলোক ওড়িয়া, নাম গৌরদাস মহাপাত্র, বেলাগাঁওতেই থাকেন। বেশ সরল প্রকৃতির, একটু যেন বিচলিত। বার-বার ডাক্তারের কেবিনের বন্ধ দরজার দিকে অস্থির হয়ে তাকাচ্ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল স্ত্রীর জন্য কাতর হচ্ছেন। জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, যদি আপত্তি না থাকে, কী সমস্যার জন্য এসেছেন, জানতে পারি কি?

    ভদ্রলোকের মুখে অস্বস্তি ফুটল। দোনামনা করে শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোক বলেই ফেললেন। মাস তিনেক আগে তাঁদের তরতাজা উনিশ বছরের ছেলে বিপ্রদাস বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। বৃষ্টির মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিল লোনাভেলায়, ফেরার পথে এক্সপ্রেস ওয়েতে বাইক স্কিড করে ট্রাকের নিচে চলে যায়, স্পট ডেথ। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে গৌরদাস বাবুর স্ত্রী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তাঁর সাম্প্রতিক স্মৃতি চলে যায় এবং তিনি অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করেন। সম্ভবত ছেলের মৃত্যুশোক থেকে নিষ্কৃতি পেতে তিনি স্মৃতির একটা অংশকে নিজেই ধ্বংস করে দেন। কার্যত তিনি মানসিক ভাবে কুড়ি বছর আগের জীবনে ফিরে যান। যেন মাঝের বছরগুলো কেউ তাঁর মগজ থেকে ইরেজার দিয়ে মুছে দিয়েছে।

    গৌরদাসবাবু বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। নিজের শোক সামলাবেন না স্ত্রীকে! তখনই তিনি ডক্টর মিশ্রর খোঁজ পান এবং স্ত্রীকে দেখাতে তাঁর শরণাপন্ন হন। জয়ন্ত জানতে চাইল, চিকিৎসায় কোনও উন্নতি হয়েছে কি না। গৌরদাসবাবু জবাব দিলেন না, দুই কাঁধের মধ্যে মাথা নামিয়ে চুপ করে রইলেন। তাঁর ঝুলে পড়া মুখ দেখে মনে হল ব্যাপারটা সেখানেই থেমে থাকেনি। জয়ন্ত আর ঘাঁটাল না। বুঝল এর বেশি জিজ্ঞেস করে তাঁকে বিব্রত করাটা অনুচিত হবে। প্রৌঢ়ত্বের সীমানায় এসে কোনও নারী যদি যুবতীর মত ব্যবহার করে তার অর্ধাঙ্গের কী দুর্দশা হতে পারে সেসব না জিজ্ঞেস করাই সমীচীন। ডক্টর মিশ্র কেবিনের দরজা দিয়ে মুখ বার করে ভদ্রলোককে ডাকলেন। ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন।

    ওঁরা কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে জয়ন্তরা এগোল। ডক্টর মিশ্র ওঁর টেবিলের সামনে ফাঁকা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন। বললেন, জিতেন বলেছে তোমাদের কথা। বলো কী করতে পারি?

    দময়ন্তী বলল, ঘুমোতে পারছি না। কিছুদিন আগের একটা ব্যাপার ভয়ংকর জ্বালাতন করছে।

    ডক্টর মিশ্র বললেন, খুলে বলো।

    দময়ন্তী বিস্তারিত বলল। যেখানে যেখানে গল্প আবছা হল, ডক্টর মিশ্র প্রশ্ন করে জেনে নিলেন। শুধু মুম্বাই পাড়ি দেবার অব্যবহিত পূর্বের ঘটনা নয়, তার আগের, এমনকি দময়ন্তীর ছোটবেলার কথাও মন দিয়ে শুনলেন। ডক্টর মিশ্রর ব্যক্তিত্ব এমনই যে তাঁর সঙ্গে কথা বলে আরাম লাগে। সব শুনে বললেন, গগন-টগন নয় মনে হচ্ছে বাবা-মাকে না জানিয়ে চলে এসে তুমি একটা অপরাধবোধে ভুগছ। ভয়ের কিছু নেই, আমার ডায়াগনোসিস ঠিক হলে ব্যাপারটা সাময়িক। আপাতত একটা হালকা সেডেটিভ লিখে দিচ্ছি, দরকার পড়লে খেতে পারো। হেসে বললেন, বিয়ের পর হনিমুনে যাওনি তো? দু’জনে কোথাও বেড়িয়ে এসো। জায়গা পরিবর্তন হলে মন ভাল হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, গিয়ে দেখা করতে না পারলেও বাবা-মার সঙ্গে ফোনে কথা বলো। সেটাই আসল ওষুধ। দিন দশেক পরে এসে জানিয়ে যেও কেমন আছ।

    জয়ন্ত দময়ন্তী কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে দেখল রিসেপশনিস্ট মেয়েটি ফোনে কারো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিচ্ছে। জয়ন্ত বলল, “দাঁড়াও একটু, দশদিনের পরের অ্যাপয়েন্টমেন্টটা এখনই বুক করে দিই।”

    রিসেপশনিস্ট ফোন রাখতে জয়ন্ত কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটি জাব্দা খাতার একটা পাতা খুলে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এখানে পেসেন্টের নাম আর ফোন নম্বর লিখে দিন। জয়ন্ত সিরিয়াল নম্বর সাতে দময়ন্তীর নাম লিখতে লিখতে দেখল ছ’ নম্বরে অমিতাভ দত্তর নাম লেখা। ফোন নম্বরটাও চেনা।

    *

    সুজলা সুফলা বাংলাদেশের মেয়ে হয়েও দময়ন্তী সবুজের এত শেড আগে বোধহয় কখনও দেখেনি। লেবু রঙের হালকা সবুজ মাঠ-ঘাট-ফসল পেরিয়ে ধাপে ধাপে চড়ে পাহাড়ের গায়ে গাঢ় সবুজ কৃষ্ণচূড়ার বন। কালো পাথরের বিপরীতে যেন আরও মোহময় হয়ে উঠেছে। এবার বর্ষা যেতে দেরি করার জন্য নভি মুম্বাই থেকে পুণে যাওয়ার নতুন এক্সপ্রেস ওয়ের দু-দিকে সবুজের উৎসব এখনও চলছে। সহ্যাদ্রি পাহাড়ের যে দিকে সমুদ্র পুণে শহরটা তার উল্টো ঢালে, ঘাট-এরিয়া পেরিয়ে যেতে হয়। রাস্তাটা কখনও পাহাড় ডিঙিয়ে, কখনও পাথর ফাটিয়ে টানেল ধরে সটান এগিয়ে গেছে মহারাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরের দিকে। ডক্টর মিশ্রর কাছ থেকে ফিরে জয়ন্ত বলেছিল, “এই শনি-রবিতে পুণে ঘুরে আসি, চলো। বেড়ানোও হবে আবার মাতাজির আশ্রমেও ঢুঁ মেরে আসা যাবে। ফিরে এসে না-হয় তোমার বসের সঙ্গে একবার কথা বলে বাবা-মার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো।”

    দময়ন্তী হেসেছিল, “হনিমুনে পুণে নিয়ে যাবে?”

    উত্তরে জয়ন্তও হেসেছিল, বলেছিল, “আকাশে চাঁদ আর বুকে মধু থাকলে পুণের মুলা মুথা নদীতীরও যমুনা পুলিন মনে হবে, গ্যারান্টি দিচ্ছি, দেখে নিও।”

    শরীরে যতই ক্লান্তি থাকুক, বেড়ানোর নাম শুনে দময়ন্তী এক পায়ে খাড়া হয়ে গিয়েছিল। একটা গাড়ি ভাড়া করে শনিবার সকাল-সকাল ওরা বেরিয়ে পড়েছিল। ভেবেছিল পুণেতে পৌঁছে রাত কাটানোর জন্য দেখেশুনে একটা হোটেল খুঁজে নেবে। এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে গাড়িতে পুণে ঘণ্টা আড়াই, মাঝখানে চা খেতে নামলে বড়জোর তিন। ঘাট পেরিয়ে সমতলে নামতেই দময়ন্তী জয়ন্তর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। জয়ন্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ডক্টর মিশ্রর পরামর্শ ফল দিতে শুরু করেছে।

    পুণে পৌঁছে গাড়ির ড্রাইভারকে বলতে শিবাজী নগরে একটা হোটেলে নিয়ে গেল। ড্রাইভারের চেনা হোটেল, বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চেক-ইন করে এক এক কাপ গরম চা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল দু’জনে। তারপর পুণে ঘুরতে বেরোল। পুণে শহরটা সমুদ্রতল থেকে অনেকটা ওপরে। যার ফলে রোদের তেজ কম, পোষা বেড়ালের মত একটা মোলায়েম ঠান্ডা পায়ে জড়াচ্ছে। ওরা প্রথমে গেল শনিওয়ার ওয়াড়া, পেশোয়া বাজীরাও-১-এর বানানো মারাঠা প্রাসাদ দেখতে। দিল্লী দরওয়াজা দিয়ে ঢুকে প্রাসাদের বাগানে ঘুরতে ঘুরতে জয়ন্তর ভয়ানক খিদে পেয়ে গেল। সেই কোন সকালে জলখাবার খেয়ে বেরিয়েছে। দময়ন্তী বলল, “উফ, তোমার খিদের জ্বালায় শান্তিতে ঘোরার জো নেই।”

    গুগল দেখে কাছাকাছি একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে দু’জনে বসল। ছিমছাম বন্দোবস্ত। গোয়ান ফিস কারি আর রাইস অর্ডার করল জয়ন্ত। সঙ্গে একটা নিরামিষ পদ, পনীর পসন্দা আর রুটি। যস্মিন দেশে যদাচার… মহারাষ্ট্রে সবাই লাঞ্চ-ডিনার ভাত-রুটি মিশিয়ে খায়। এছাড়া দু’জনের জন্য ফ্রেশ ফ্রুট জ্যুস, বরফ ছাড়া। দময়ন্তীর পছন্দ আনারস, জয়ন্তর তরমুজ। গোয়ান ফিস কারির নারকোলের গ্রেভির মধ্যে কাঁচা মাছ, মুখে দিয়ে গন্ধ লাগল দময়ন্তীর। জয়ন্ত ওর জন্য একটা চিকেন ডিস অর্ডার করল। দময়ন্তীর খুঁটে খাওয়া অভ্যেস। জয়ন্ত ভাত দিয়ে মাছের ঝোল মেখে তো খেলই সঙ্গে সঙ্গে চিকেন প্লেটের অর্ধেক। খাওয়াদাওয়া শেষ করে মৌরি চিবোতে চিবোতে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে আদেশ দিল, চালাও পানসি মাতাজির আশ্রম।

    মাতাজির আশ্রম কোরেগাঁও পার্কে। আশ্রমের গেটে রীতিমত কড়া সিকিউরিটি, সারভেইল্যান্স ক্যামেরার প্রহরা। ভেতরে ঢুকে বাগান পেরিয়ে দেবী মন্দির। মন্দিরের সামনের চাতালে যত্রতত্র বোর্ড ঝুলছে - ছবি তোলা নিষেধ। মূল মন্দিরে যেতে হলে ক’ধাপ সিঁড়ি চড়তে হয়। ওরা নিচে চটি খুলে রেখে মন্দিরে উঠল। কারুকার্য করা স্তম্ভের সারি গর্ভগৃহের চূড়াটিকে ধরে রেখেছে। সকালের পুজো হয়ে গেছে। পট্টবস্ত্র পরিহিত, মুণ্ডিত-মস্তক, শিখাধারী এক দীর্ঘকায় পুরোহিত পুজোর সামগ্রী গুছিয়ে রাখছিলেন। কোনও দর্শনার্থী এসে দাঁড়ালে হাতে চরণামৃত, প্রসাদ দিচ্ছিলেন। পুরোহিতের চেহারাটি বেশ তেজী, দেখে ভক্তি জাগে। দেবী-মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে প্রণাম করল দময়ন্তী। শান্তিপুরে মায়ের মন্দিরেই জয়ন্তর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল। গর্ভগৃহ প্রদক্ষিণ করে এসে জয়ন্ত দেখল থামের গায়ে নোটিশ পড়েছে, মাতাজি আগামী মাসে পুণের আশ্রমে আসবেন।

    এই আশ্রমটা শান্তিপুরের আশ্রমের মত অত খোলামেলা নয়। জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড, সিকিউরিটি মোতায়েন। মন্দিরের পেছনে আশ্রমিকদের হোস্টেলে যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ। মনে হয় না এখানে পাতা পেড়ে প্রসাদ ভক্ষণের রীতি আছে। এই আশ্রমে বিদেশি ভক্তদের আনাগোনা বেশি। সবাই সাদা চামড়ার নয়, কিন্তু তাদের মুখ দেখে বোঝা যায় অন্যরকম জল-হাওয়ার মানুষ। বড়বাবুকে কী রিপোর্ট দেবে দময়ন্তী? আশ্রমের কিছুই প্রায় দেখতে পেল না। বাগানের মাঝখানে একটা পাথরে বাঁধানো ফোয়ারা, চারদিকে লিলি ফুলের কেয়ারী। ফোয়ারাটা আপাতত জল উগরোচ্ছে না। জয়ন্ত ঘাস মাড়িয়ে গিয়ে ফোয়ারার ধারে বসে পড়ল। মৃদুমন্দ হাওয়া দিচ্ছে, পারলে সেখানেই শুয়ে একঘুম দিয়ে নেয়। দময়ন্তী অভিযোগ করল, “এ কী, বসে পড়লে কেন? সিংহগড় ফোর্ট দেখতে যাবে বলেছিলে যে...”

    জয়ন্ত বলল, “দু-মিনিট জিরিয়ে নিই। খাওয়াটা বেশি হয়ে গেছে...”

    অগত্যা দময়ন্তীও বসল। বসতেই লোকটাকে দেখতে পেল। মন্দিরের একটা থামের আড়াল থেকে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিল। দময়ন্তীর নজর পড়তেই সরে গেল। খুব চেনা লোক, কোথায় দেখেছে... মানুষ চেনার মুশকিল হল বাজারের আলাপীকে মাজারে চেনা যায় না, জায়গা বদলে গেলে মানুষের চেহারাও বদলে যায়। দময়ন্তী অস্বস্তিটা মাথা থেকে সরিয়ে দিল, মধুযামিনীতে এসে চাপ নেবার মানে হয় না। ফোয়ারার ধারে এক পা তুলে জয়ন্তর পিঠে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। আঃ! কী শান্তি!

    সিংহগড়ে ওরা যখন গিয়ে পৌঁছোল বেলা পড়ে আসছে। গাড়ি পার্কিং থেকে ষাট সত্তরটা সিঁড়ি ভাঙলেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যাওয়া যায়। ওপরে উঠে দেখল চোখের সামনে খোলা আকাশ। সূর্যাস্তের বেশি দেরি নেই। তানাজি মেমোরিয়াল, কালী মন্দির দেখতে দেখতেই আলো পড়ে এল। নামার মুখেই দময়ন্তী হোঁচট খেল, একটা পাথর বেমক্কা উঁচু হয়ে ছিল। বিশেষ লাগেনি যদিও এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। জয়ন্ত এক ধাপ ওপরে ছিল, জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”

    উত্তর দিতে মুখ ফেরাতেই জয়ন্তর পেছনে আবার মাতাজির আশ্রমের লোকটাকে দেখতে পেল। আর সঙ্গে-সঙ্গে মনে পড়ে গেল আগে কোথায় দেখেছে। আসলে এই প্রথমবার রেলওয়ে স্টেশনের বাইরে দেখল, তাই চিনতে সময় লাগল। চোখাচোখি হতেই লোকটা সরে গেল। জয়ন্ত পাশে এসে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন জিজ্ঞেস



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণ: কল্লোল রায়
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)