• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৪ | অক্টোবর ২০২১ | উপন্যাস
    Share
  • পরিক্রমা ৭ : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


    || ৭ ||

    “অমিতাভদা সম্ভবত ভিকির মৃতদেহটা জল-পাথরের মধ্যে পড়ে থাকতে দেখেছিল,” জয়ন্ত বলল, “না-হলে ভিকি আর বাসু যে একই মানুষ নয় সেই কথাটা অত জোর দিয়ে বলতে পারত না।”

    পুণের মাতাজির আশ্রম থেকে পুলিশ জনি ডিসুজাকে গ্রেফতার করেছিল। জনি কল্পনাও করতে পারেনি এত তাড়াতাড়ি তার ছদ্মবেশ খুলে যাবে। নিশ্চিন্ত হয়ে বসে ছিল, ধর্মীয় স্থানে পুলিশ ঢোকার সাহস পাবে না। জেরার মুখে জনি স্বীকার করেছে সে ভিকিকে খুন করেছে। ভিকি নাকি জনির কোন গোপন কথা তার তিন নম্বর প্রেমিকের কাছে ফাঁস করে দেয়। গোপন কথাটি কী সংক্রান্ত সে বিষয়ে জনি এখনও মুখ খোলেনি। তবে পুলিশের ধারণা আর একটু চাপ দিলেই সে বাপ বলবে। পুলিশ তদন্ত শুরু করার পর জনি ভয় পেয়ে মাতাজির আশ্রমে গা ঢাকা দিয়েছিল। তার সঙ্গে আশ্রমের এক কর্তা ব্যক্তির হৃদ্যতা আছে। সেই তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। সেই আশ্রয়দাতাটি আপাতত বেপাত্তা। মুম্বাই পুলিশ পশ্চিম বাংলার পুলিশের মারফৎ মাতাজির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে।

    তবে জনি বাসুদেব রাও বলে কাউকে চেনে না। খুনের রাতে বাসুর সঙ্গে কথোপকথনের কোনও কথাই সে মনে করতে পারে না। এবং সবথেকে জরুরি তথ্য হল ভিকি চেম্বুরের একটা অনাথ আশ্রমে মানুষ। অর্থাৎ কিনা ভিকির সঙ্গে বাসুর আদপেই কোনও সম্পর্ক নেই। এই ব্যাপারটা পুলিশ যে আগে কেন যাচাই করেনি বোঝা মুশকিল। ভিকি ছ’মাস বয়সে সেই অনাথ আশ্রমে এসেছিল, এবং সেখানকার নিয়ম অনুযায়ী আঠারো বছর বয়সে তাকে সেখান থেকে ভাগিয়ে দেওয়া হয়। সে পড়াশুনোয় অষ্টরম্ভা, ‘আটমি-ফেল’। অনাথ আশ্রম থেকে বেরিয়ে মোটামুটি উঞ্ছবৃত্তি করেই জীবন চালাত। বছর খানেক আগে জনির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারপর থেকে জনিই মোটামুটি তার ভরণপোষণ করত।

    কথা হচ্ছিল জিতেনের ঘরে বসে। জিতেন গৌরদাসবাবুর বাড়ি শিফট করে গেছে। সে পারতপক্ষে লিফট-লবির দরজাটা ব্যবহার করে না। সদর দরজা দিয়েই আসা-যাওয়া করে। ডাইনিং হল থেকে তার ঘরে যাওয়ার দরজাটা খোলাই থাকে। খাওয়াদাওয়াও এক সঙ্গেই। গৌরদাসবাবু আজ সন্ধ্যায় স্ত্রীকে নিয়ে ডক্টর মিশ্রর কাছে গেছেন। জিতেন রান্নার লোকটাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। আজকে রাতের রান্না জিতেন করবে, কচি পাঁঠার ঝোল আর ভাত। গৌরদাসবাবু বলেছিলেন জিতেন যেন তার বন্ধুবান্ধবদেরও ডাকে। রাতের খাবার এক সঙ্গে খাওয়া যাবে। জয়ন্ত, দময়ন্তী, বিজন, রাধিকা, সঞ্জয় অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে। স্বাভাবিক ভাবেই যে নেই তার কথা উঠল। সঞ্জয় বলল, পুলিশ বাসুর ব্যাপারে কী বলছে? বাসু কোথায় গেল?

    জয়ন্ত হাত ওলটাল, জানি না...

    বিজন বলল, ফালতু-ফালতু বাসুর দাদাকে দৌড় করাল। ভদ্রলোক নিজের কাজকর্ম ফেলে একবার করে আসছেন আর যাচ্ছেন।

    জয়ন্ত বলল, যদি কেউ বাসুর ব্যাপারে কিছু জানে সে হল অমিতাভদা।

    বিজন বলল, তোর কেন মনে হচ্ছে অমিতাভদা জানে?

    জয়ন্ত বলল, অমিতাভদা এমন অনেক কথা বলেছে যেগুলো আগে থেকে না জানলে বলা মুশকিল। যেমন ধর, কল ডিউরেশনের ব্যাপারটা। অমিতাভদা কী করে আন্দাজ করল বাসু জনির সঙ্গে নামমাত্র কথা বলেছে?

    বিজন বলল, হতে পারে বাই চান্স বা মাথা খাটিয়ে বার করেছে। লোকটা যে বুদ্ধিমান সে নিয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই।

    জয়ন্ত মাথা নাড়ল, বলল, সেভাবে দেখলে পুরো পৃথিবীটাই বাই চান্স চলছে। আমার মনে হয় না অমিতাভদা কথাটা আকাশ থেকে পেড়ে এনেছে... বুদ্ধিমান যুক্তিনিষ্ঠ মানুষ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া বিচার করে না। অনুমানের ওপর নির্ভর করে কাজ করে মধ্যমেধার মানুষ। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছিল না। পুলিশের কাছ থেকে যা জানা গিয়েছিল তাতে ভুষিমাল ছিল বেশি, তথ্য কম।

    সঞ্জয় বলল, অমিতাভদাকে চেপে ধরলেই জানা যাবে।

    জয়ন্ত বলল, যতটা সহজ ব্যাপারটা ভাবছিস, ততটা নাও হতে পারে। এমন নয় যে অমিতাভদা জেনেশুনে ইচ্ছে করে ঘটনাগুলো চেপে রেখেছে বা পুলিশকে বলেনি। আসলে ও নিজেও পুরোপুরি সুস্থ নয়। তোরা জানিস কি না জানি না, অমিতাভদা ডক্টর মিশ্রর পেশেন্ট।

    জিতেন বলল, নীতাদিদির কাছে যায়? জানতাম না তো।

    আমার ধারণা ও যে মানসিক রোগে ভুগছে সেটার নাম ডি-আই-ডি, ডিসোশিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসর্ডার। এই রোগটায় একটা মানুষের পারসোন্যালিটি মিনিমাম দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যায়। দুটো আলাদা ব্যক্তিত্ব, নাম-ধাম, আচার-ব্যবহার সব আলাদা। অমিতাভদা একবার গেয়ে শুনিয়েছিল মনে আছে – তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা, মন জান না...

    বিজন বলল, সে কী? অমিতাভদা নিজেই... ভাবাই যায় না।

    জয়ন্ত বলল, আমার ভুলও হতে পারে। জিতেন একবার ডক্টর মিশ্রকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারিস। প্রোফেশনাল এথিক্সের বাইরে গিয়ে যদি বলেন ব্যাপারটা অনেক পরিষ্কার হয়।

    সঞ্জয় বলল, একটা মুভি দেখেছিলাম আ বিউটিফুল মাইন্ড, জন ন্যাশের ওপর, ওঁরও বোধহয় এই ধরনের কোনও রোগ ছিল।

    জয়ন্ত বলল, জন ন্যাশ হ্যালুসিনেট করতেন, ওই রোগটাকে বলে স্কিজোফ্রেনিয়া। ডি-আই-ডি রোগটা একটু আলদা। এই রোগে দুটো ব্যক্তিত্বর একটা অন্যটার কথা মনে রাখতে পারে না। সেই জন্যই বলছিলাম অমিতাভদা হয়তো ভিকির লাশটা দেখেছিল। বাইক নিয়ে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘোরে, অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু যখন দেখেছিল কী মানসিক অবস্থায় ছিল সে নিজেই জানে না। পরে মনে করে কাউকে কিছু বলতে পারেনি। কিন্তু অবচেতনে রয়ে গিয়েছিল। সেটাই আমার আর দময়ন্তীর সঙ্গে কথা বলার সময় অন্যভাবে বেরিয়ে এসেছিল। যাই হোক সেটা কোনও ক্রাইম নয়। পুলিশ পরে লাশটাকে খুঁজে পেয়েছিল।

    দময়ন্তী বলল, আমি তো ভেবেই বসেছিলাম, অমিতাভদাই জনি ডিসুজা।

    রাধিকা বলল, ইস, সেটা হলে কিন্তু খুব খারাপ হত।

    জয়ন্ত বলল, আমি অমিতাভদার স্প্লিট পারসোন্যালিটির ব্যাপারটা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিলাম। ইন্টারনেটে পড়ছিলাম ওয়ান্ডা ওয়েস্টন বলে এক ডি-আই-ডি রোগী হাসতে হাসতে সাক্ষী দিচ্ছে যে জুয়ানিতা ম্যাক্সওয়েল এক বুড়িকে হোটেলের ঘরে অতি সামান্য কারণে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এদিকে বাস্তবে ওয়ান্ডা আর জুয়ানিতা একই মহিলা। তাদের একটাই শরীর। চিন্তা ছিল অমিতাভদার কেসটাও সে রকম নয়তো? এখন অবশ্য আর সে ভয় নেই।

    জিতেন বলল, অমিতাভদা ডক্টর মিশ্রকে দেখাচ্ছে যখন সেরে যাবে। এ বাড়ির আন্টি অনেকটা ভাল হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম ভাবত আমি ওঁর হারিয়ে যাওয়া ছেলে। ভুল করে বিপ্র বলে ডেকে ফেলত। এখন আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে নিজের ছেলে আর কোনওদিনই ফিরবে না। আজকাল আমায় জিতেন বলে ডেকেই পাশে বসিয়ে গল্প করে।

    জয়ন্ত বলল, ডি-আই-ডি রোগটার কোনও ওষুধ হয় না। একমাত্র চিকিৎসা রোগীর সঙ্গে কথা বলে তাকে বোঝানো। তাকে দ্বিতীয় সত্তার কাছে যেতে না দেওয়া। তবে অমিতাভদা যখন নিজে থেকেই ডাক্তারের কাছে গেছে তখন আমার ধারণা ও শিগগিরই সেরে উঠবে।

    এইসব কথাবার্তার মধ্যেই গৌরদাসবাবু ও তাঁর স্ত্রী ফিরে এলেন। গৌরদাসবাবু ওদের দেখে খুব খুশি। জিতেন মাঝখানে উঠে গিয়ে পেঁয়াজ রসুন ভেজে মাংস কষতে বসিয়ে দিয়ে এসেছিল। ঢিমে আঁচে মাংস সেদ্ধ হচ্ছিল। মনোহরণ গন্ধ উড়ে আসছিল কিচেন থেকে। গৌরদাসবাবুর স্ত্রী বাইরের পোশাক ছেড়ে চা বানাতে গেলেন। দময়ন্তী আর রাধিকা উঠে গেল যদি কিছু সাহায্য লাগে। জিতেনের ঘর থেকে বেরিয়ে ওরা সবাই লিভিংরুমে এসে বসল। ডাক্তারের কাছ থেকে ফেরার পথে গৌরদাসবাবু কিছু রজনীগন্ধার স্টিক কিনে এনেছিলেন। সেগুলি বুককেসের ওপর ফুলদানিতে ছেলের ফ্রেম করা ছবির সামনে সাজিয়ে রাখছিলেন। বললেন, বিপ্র সাদা ফুল খুব ভালবাসত। জয়ন্তর মনে হল কথাটার মধ্যে যেন বিষাদ কম, প্রিয়জনকে ভালবাসার জিনিস এনে দেওয়ার আনন্দ বেশি। এ বাড়ির মানুষগুলো আবার স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে যাচ্ছে। এর থেকে ভাল আর কি হতে পারে!

    *

    জয়ন্ত আর দময়ন্তী ডক্টর মিশ্রর ক্লিনিকে যাচ্ছিল, রিপোর্ট করতে। জিতেন বলল, চল আমিও যাই। সম্ভব হলে অমিতাভদার কথাটা আলোচনা করে আসব।

    আজ ভিড় কম, বেশিক্ষণ বসতে হল না। ওরা তিনজন একসঙ্গেই কেবিনে ঢুকল। দময়ন্তীর সমস্যাটা কেটে গেছে, ও রাত্তিরে আগের মত ঘুমোতে পারছে শুনে ডক্টর মিশ্র খুশি হলেন। দময়ন্তী বলল, বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, ওঁরা সব মেনে নিয়েছেন। ডক্টর মিশ্র হেসে বললেন, তোমাদের আগেই বলেছিলাম, সমস্যাটা সাময়িক।

    জিতেন বলল, নীতাদি তোমার সঙ্গে অন্য একটা ব্যাপারে আমরা একটু পরামর্শ করতে চাই।

    ডক্টর মিশ্র বললেন, তোর আবার কী হল?

    জিতেন বলল, আমার কিছু নয়। আমাদের এক বন্ধু আছে, অমিতাভ দত্ত। তোমার পেশেন্ট। সে মাঝে-মাঝে উৎপটাং আচরণ করে। আমরা ওকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম, আর কী!

    ডক্টর মিশ্র গম্ভীর হয়ে গেলেন।

    জয়ন্ত বলল, আপনি যদি আলোচনা না করতে চান, অসুবিধে নেই। আমার যেন মনে হচ্ছিল ও ডিসোশিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিস-অর্ডারে ভুগছে। অনেকসময় ডাকলে সাড়া দেয় না, অচেনা মানুষের মত ব্যবহার করে। আসলে আমরা সবাই ওকে হেল্প করতে চাই। আপনি গাইড করলে আমরা হয়তো কোনওভাবে ওর উপকারে আসতে পারব।

    ডক্টর মিশ্র জয়ন্তকে বললেন, তোমার অনুমান নির্ভুল। যদিও মানসিক রোগের ডাক্তারদের কোনও রোগীকে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা অনুচিত, তবু তোমাদের জানাচ্ছি, কারণ তোমরা ওর বন্ধু, ওর সাপোর্ট সিস্টেম। ওকে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারবে।

    জয়ন্ত বলল, থ্যাঙ্ক ইউ ডক্টর, একটু যদি ডিটেলস-এ বলেন...

    ডক্টর মিশ্র বললেন, কোনও একটা অপ্রিয় ঘটনা বা তার স্মৃতি দ্বিতীয় ব্যক্তিত্বটাকে আচমকা ট্রিগার করতে পারে। রোগী চায় ব্যক্তিত্ব বদলে ঘটনাটাকে ভুলে যেতে, অস্বীকার করতে। এই স্যুইচটাকে আটকান দরকার। সব চেয়ে ভাল হয় যদি সবসময় মানুষটার সঙ্গে কেউ থাকে। তাকে মানসিক ভাবে আগলে রাখে।

    জয়ন্ত বলল, অমিতাভদা একা থাকে, সেটা আরেকটা ভয়।

    ডক্টর মিশ্র বললেন, দেখো, দত্ত বেশিরভাগ সময় নিজে নিজেই ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করতে পারে। কদাচিৎ নিয়ন্ত্রণ ওর হাতের বাইরে চলে যায়। সেই সময়গুলোই কারোর ওর পাশে থাকা দরকার।

    চেম্বার থেকে বেরিয়ে দময়ন্তী বলল, “ব্যাপারটা শিমুলকেও জানানো দরকার।”

    জয়ন্ত বলল, “রয়ে-বসে বোলো, নইলে আবার কান্নাকাটি শুরু করে দেবে।”

    বাড়ি ফিরে দময়ন্তী শিমুলকে ফোন করে বলল, অমিতাভদার ব্যাপারে কিছু কথা বলার আছে। শিমুল কি একবার ওদের বাসায় আসতে পারবে? শিমুল উড়তে উড়তে চলে এল, তার চোখেমুখে উদবেগ, “কী হয়েছে দময়ন্তীদি?”

    দময়ন্তী ওকে বলল, “বোসো, বোসো, শান্ত হও। বলছি...”

    শিমুল দময়ন্তীর হাত ধরে বলল, “না এক্ষুণি বলো,” দময়ন্তী দেখল শিমুলের হাতের পাতা বরফের মত ঠান্ডা। দময়ন্তী বলল, “ভাবলাম তোমায় বলা কর্তব্য। তোমার অমিতাভদা একটা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে।”

    শিমুল বলল, “সে কী?”

    দময়ন্তী বলল, “সেই জন্যেই বোধহয় তোমার সঙ্গে ওই রকম অদ্ভুত ব্যবহার করেছিল।”

    শিমুল গালে হাত দিয়ে বলল, “দেখেছ কাণ্ড! আর আমি ভাবছি... আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি!”

    জয়ন্ত বলল, “অমিতাভদা নিজেও জানে ওর অসুখটার কথা। ডাক্তারি পরিভাষায় রোগটার নাম ডি-আই-ডি – স্প্লিট পার্সোন্যালিটি ডিস-অর্ডার। অমিতাভদা অবশ্য ডাক্তারের কাছে কাউন্সেলিং নেয়। মনে হয় না চিন্তার কিছু আছে।”

    ওরা ভেবেছিল অমিতাভদার অসুখের কথা শুনে শিমুল ভেঙে পড়বে। তার নাক টানা শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু সে বরং একটু রাগ রাগ গলায় বলল, “এসব জিনিস লুকিয়ে রেখে দেওয়ার কী মানে বুঝি না। লোকটাকে নিয়ে সত্যিই আর পারা যায় না।”

    দময়ন্তী বলল, “আমরা সবাই অমিতাভদাকে ভুল বুঝেছিলাম। বুঝতে পারিনি ও অন্যদের থেকে আলাদা কিন্তু একজন খুব ভাল মনের মানুষ। তোমার কিন্তু ওর পাশে থাকাটা খুব দরকার। ডাক্তার বলেছেন ওর সাহচর্য জরুরি।”

    শিমুল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “দময়ন্তীদি, আজ চলি গো। পরে আবার আসব।”

    দময়ন্তী বলল, “তাড়াহুড়ো করে চললে কোথায়? এই তো এলে। রাতের খাওয়া খেয়ে যেও।”

    শিমুল বলল, “অমিতাভদার বাসায়। লোকটা আমায় ভেবেছে কী? আমি বাচ্চা মেয়ে? কিছু বুঝি না, না? আজ ওর একদিন কী আমার একদিন!”

    দময়ন্তী শিমুলের এমন রণরঙ্গিণী মূর্তি আগে দেখেনি। বলল, “হঠকারী হয়ে এমন কিছু করে বোসো না যাতে পরে পস্তাতে হয়। অমিতাভদা কিন্তু এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়।”

    শিমুল কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখ দেখে মনে হল সে আজ ব্যাপারটার শেষ দেখে ছাড়বে। দময়ন্তী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। জয়ন্ত তাকে আটকাল, বলল, “যেতে দাও।”

    জয়ন্তদের বাসা থেকে বেরিয়ে শিমুল সটান অমিতাভদার দরজায় গিয়ে বেল বাজাল। অমিতাভদা দরজা খুলে শিমুলকে দেখে আশ্চর্য হল, জিজ্ঞেস করল, “কী রে, এমন অসময়ে? শরীর ঠিক আছে তো?”

    শিমুল অমিতাভদাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। অমিতাভদার পরনের বেনিয়ানের গলার কাছটা খিমচে ধরে বলল, “ভেবেছ কী? তুমি কিছু না বললে আমি জানতে পারব না?”

    শিমুল দেখল অমিতাভদার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটছে, বেচারা রীতিমত ঘাবড়ে গেছে। একটু মায়া হল, কিন্তু ছাড়ল না। অমিতাভদা সন্ত্রস্ত গলায় বলল, “এই দেখো, কী বলিনি তোকে? ছাড়, ছাড়, লাগছে।”

    শিমুল বেনিয়ান খামচাতে গিয়ে অমিতাভদার বুকের চামড়াতেও চিমটি লাগিয়েছিল বুঝতে পারেনি। গুণ্ডাগার্দি করার অভ্যাস না থাকলে যা হয়। খানিক নরম হয়ে বলল, “কী সব অসুখ-বিসুখ বাধিয়ে বসে আছ। আমায় বললে কী চিকিৎসার ত্রুটি হত?”

    অমিতাভদা বলল, “তুই কোথা থেকে জানলি?”

    শিমুল বলল, “কোথা থেকে জানলাম সেটা বড় কথা নয়। তুমি যে বলনি সেটাই কষ্ট দিচ্ছে।”

    অমিতাভদা বলল, “স্যরি, স্যরি, আসলে তোকে এই সবের থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলাম। ভাবেছিলাম সেরে উঠি আগে তারপর বলব।”

    শিমুল আর পারল না, কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “ওই জন্যেই আমায় দূরে ঠেলে দিচ্ছিলে?”

    অমিতাভদা বলল, “জানিস কি না জানি না, এই রোগটা কখনোই সম্পূর্ণ সারে না। সুযোগ পেলেই হানা দেয়। আমার এই দুর্ভাগ্যের সঙ্গে তোকে জড়াতে চাইনি।”

    শিমুল বলল, “সারে না, তবে আটকে রাখা তো যায়। দু’জনে মিলে ঠেলা-গুঁতো মেরে রোগটাকে আটকে রাখতে পারি না?”

    অমিতাভদা বলল, “তোর বয়স অল্প। কেন আমার জন্যে নিজের জীবনটা নষ্ট করবি?”

    শিমুল বলল, “তোমার কি মনে হয় তোমাকে ছেড়েই আমি ভাল থাকতে পারব? তুমি তো এমনিতেই আমার জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছ অমিতাভদা।”

    অমিতাভদা হেসে বলল, “খুব পাকা পাকা কথা শিখেছিস।”

    পাকা পাকা কথা মানে? কারা পাকা পাকা কথা বলে? উফ, লোকটা সত্যিই কি তাকে বাচ্চা মেয়ে ভাবে নাকি? এই জন্যেই তো মাথা গরম হয়ে যায়! শিমুল এগিয়ে গিয়ে অমিতাভদার ঠোঁটে জম্পেশ করে একটা চুমু খেল। অমিতাভদা এই আকস্মিক চুমুর জন্যে একেবারেই তৈরি ছিল না। ছাড়া পেয়ে হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে বলল, “এর পর কিন্তু আমি নিজেকে সামলাতে পারব না, শিমুল। তখন আমায় দোষ দিতে পারবি না। তুই এখান থেকে শিগগির পালা।”

    শিমুল অমিতাভদার বুকের কাছে ঘন হয়ে এসে বলল, “সামলাতে কে মাথার দিব্যি দিয়েছে তোমায়?”

    দুটি সবল বাহুর আকর্ষণে পিষ্ট হতে-হতে যথারীতি শিমুলের কান্না পেল। সিঁথি থেকে নেমে চোখের পাতায় পৌঁছে অমিতাভদার ঠোঁট ততক্ষণে নোনা স্বাদ পেয়েছে। দু’হাতের অঞ্জলিতে শিমুলের মুখখানা ধরে অমিতাভদা জিজ্ঞেস করল, “শিমুল, তুই কাঁদছিস কেন? কষ্ট হচ্ছে?”

    মানুষ কি সবসময় দুঃখ-কষ্টেই কাঁদে নাকি? লোকটা যে কী? কিছুই বোঝে না।

    *

    মন্দিরে ঢোকার দরজাটা ভাঙা। ভেতরে কোনও বিগ্রহ নেই। শূন্য বেদীর ওপর একটা প্রদীপ জ্বলছে। পাশে ইট দিয়ে বানানো একটা যজ্ঞকুণ্ড। তার মধ্যে কিছু অর্ধদগ্ধ সমিধ। ছাইয়ের সঙ্গে আগুনের দু’-একটা স্ফুলিঙ্গ এখনও উড়ছে। বেদীর ওপর কোশা-কুশি, নৈবেদ্যর থালার পাশে ইতস্তত ফুল বেলপাতা ছড়িয়ে রয়েছে। কেউ যেন খানিক আগেই পুজো করে গেছে।

    জয়ন্ত আর দময়ন্তী মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

    সন্ধেবেলা সমুদ্রের ওপর থালার মত একটা চাঁদ উঠেছিল। জয়ন্ত বলেছিল, “চলো, পাহাড়ের ওপর মন্দিরটা থেকে ঘুরে আসি।”

    দময়ন্তী আঁতকে উঠেছিল, “ওরে বাবা, এই অন্ধকারে?”

    জয়ন্ত বলেছিল, “অন্ধকার কোথায়? এমন ফুটফুটে জ্যোৎস্না, অসুবিধে হবে না।”

    দময়ন্তী আটকানোর চেষ্টা করেছিল, “রাস্তা খুঁজে না পেলে?”

    জয়ন্ত বলেছিল, “মন্দির যখন আছে, ওঠার রাস্তাও নিশ্চয়ই থাকবে। এখন তো বর্ষা-বাদল নেই। শুকনো খটখটে। ঠিক খুঁজে পেয়ে যাব।”

    দময়ন্তী তাও পিছু টেনেছিল, “অন্ধকারে কোথায় সাপের গায়ে পা পড়বে...”

    জয়ন্ত বলল, “সঙ্গে বড় টর্চটা নিয়ে নেব। পা ঠুকে ঠুকে উঠে যাব। কতটুকু আর রাস্তা!”

    দময়ন্তী দেখল জয়ন্ত নাছোড়বান্দা, বলল, “চলো, সঙ্গে একটা লাঠি থাকলে ভাল হত।”

    বৃদ্ধাশ্রমের পেছন থেকে পাকদণ্ডী শুরু হয়েছে। খুব চওড়া নয় যদিও, পাথর বিছোন পথ, বোঝা যায় লোকজনের আনাগোনা আছে। পায়ে পায়ে পাথর মসৃণ হয়ে গেছে। তার ওপর চাঁদের আলো পড়ে চকচক করছে। ভিজে বলে ভুল হচ্ছে। রাস্তার ধারের একটা গাছ থেকে মোটা শুকনো একটা ডাল ভেঙে দময়ন্তীর হাতে ধরিয়ে দিল, “এই নাও তোমার লাঠি।”

    পাহাড়ের নিচের দিকে ছোট ছোট ঝোপঝাড়, কদাচিত কোথাও একটা ঝাঁকড়া গাছ চলার পথ অন্ধকার করে রেখেছে। মন্দিরটা চূড়ার থেকে বেশ খানিকটা নিচে। ওপরে তাকালে দেখা যায় মন্দির পার করে জঙ্গল আরও ঘন হয়েছে। ওদের মন্দিরে পোঁছোতে আধ ঘন্টা সময় লাগল। শ্বাস সামলে নিয়ে দু’জনে পেছন ফিরে দেখল বেলাগাঁও বেশ অনেকটা নিচে পড়ে আছে। ধোঁয়াশার মধ্যে শহরতলীর আলোগুলো জোনাকির মত টিমটিম করে জ্বলছে নিভছে। মন্দিরটা বড় জোর দশ ফুট বাই দশ ফুট, চৌকো পাথর গেঁথে তৈরি। দেওয়ালগুলো পলেস্তারাহীন, মনে হল সদ্য চুন দিয়ে কলি ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। চুড়োটা সিমেন্ট লেপা, নীল রং করা। টঙে একটা লোহার শিক থেকে তেকোনা গৈরিক পতাকা ঝুলছে। ভাঙা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ওরা দেখল প্রদীপের শিখাটা হাওয়ায় কাঁপছে। নিভে যেতে যেতেও আবার জ্বলে উঠছে, আলো ছড়াচ্ছে। জয়ন্ত চারদিকে তাকিয়ে বলেছিল, “কাউকে তো দেখছি না।”

    দময়ন্তীর গা ছমছম করছিল। পুলিশে চাকরি করে বলে ভূতের ভয় পেতে নেই নাকি? দময়ন্তী ঠাকুর-দেবতা, ভূত-প্রেত, দত্যি-দানো সবেতেই বিশ্বাস করে। মন্দিরে বিগ্রহ নেই বলে তার আরও বেশি ভয় লাগছিল। কে জানে কোন দেবতার মন্দির? দেবতার না কি অপদেবতার তারই বা কে খবর রাখে? জয়ন্তর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “মন্দির দেখা হয়ে গেছে তো, চলো এবার নেমে যাই।”

    জয়ন্ত বলল, “এসো না, এই পাথরটার ওপর একটু বসি। এই রাতটা তো আর ফিরে আসবে না।”

    পাথরটা বেশ চ্যাটালো। দু’জনের বসার মত। অগত্যা জয়ন্তর পাশ ঘেঁষে বসল। কেন যে মরতে এই রোম্যান্টিক ছেলেটার প্রেমে পড়েছিল! মাথার ওপর হিমের সঙ্গে জ্যোৎস্না চুঁয়ে পড়ছিল। শীত শীত হাওয়া দিচ্ছিল। দময়ন্তী ভেতরে ভেতরে একবার কেঁপে উঠল। জয়ন্ত বলল, “এইসব সময়ে আক্ষেপ হয়, যদি গান গাইতে পারতাম!”

    দময়ন্তী দেখল, একচক্ষু দানবের মত একটা আলোর বিন্দু নিচের গহিন অন্ধকার থেকে এঁকেবেঁকে ওপরে উঠে আসছে। পাশে বসে জয়ন্তর হাত ছেড়ে দিয়েছিল। এখন আবার চেপে ধরল। বলল, “ওটা কী?”

    জয়ন্ত বলল, “জানোয়ার হলে চড়াই বেয়ে সোজা আসত। আঁকাবাঁকা পাকদণ্ডী বেয়ে আসছে মানে মানুষ। হাতে সম্ভবত মোবাইল।”

    আলোটা কাছাকাছি আসতে চাঁদের আলোতেই মানুষটার অবয়ব দেখা গেল। একটা কঙ্কালসার, গলার কন্ঠা বার করা লোক। পরনে পাজামার ওপর শার্ট, মাথায় টুপি, লোকাল লোক। হাতে একটা জেরিক্যান ঝুলিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসছিল। ভর সন্ধেবেলা যে এই পোড়ো মন্দিরে দর্শনার্থী আসবে সেটা সম্ভবত ভাবেনি। ওদের দেখে চমকে উঠল। জয়ন্ত উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ভাউ, তুমি কি এই মন্দিরের সেবায়েত?

    লোকটা জেরিক্যানটা নামিয়ে রেখে দম নিল। বলল, আমি মন্দিরের সাফ-সাফাই করি। এখানে তো আর কর্পোরেশনের জল আসে না। নিচে থেকে জল নিয়ে এলাম। এবার পুজোর ফুলটুল সরিয়ে ধুয়ে-মুছে রাখব।

    জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, এই মন্দিরটা কোন দেবতার?

    লোকটা হাত উলটে বলল, জানি না। ভেতরে মূর্তিটুর্তি তো নেই। এক পূজারী ব্রাহ্মণ এসে মাঝেমধ্যে পুজো করেন। হোম-যজ্ঞ করেন। কবে আসেন কোনও ঠিক নেই। আজ একটু আগে এসে পুজো সেরে গেছেন। আমাকে মোবাইলে নির্দেশ দেন পরিষ্কার করে যাওয়ার জন্য। নিয়মিত মাসোহারা পাঠিয়ে দেন গুগল-পে করে।

    জয়ন্ত বলল, তুমি সেই ব্রাহ্মণ কে দেখোনি কোনওদিন?

    লোকটা বলল, দেখেছি দু’-এক বার। লম্বা, ফর্সা স্বাস্থ্যবান, বড় বড় চোখ, যখন তাকান মনে হয় তোমার ভেতর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছেন, দেখলেই ভক্তিতে মাথা নুইয়ে আসে।

    জয়ন্ত বলল, আচ্ছা বেশ, আমরা না-হয় পরে আবার একদিন আসব। তাঁর সঙ্গে দেখা করে যাব। আজ চলি। তুমি কাজকর্ম সেরে নাও।

    লোকটা জেরিক্যান হাতে উঠিয়ে মন্দিরে ঢুকছিল। জয়ন্ত এক পা বাড়িয়েও থেমে গেল। পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করল, ভাউ, বলতে পারো, কবে থেকে এই ব্যবস্থা চলছে?

    লোকটা ভুরু কোঁচকাল, কোন ব্যবস্থা?

    জয়ন্ত বলল, এই পুজো-আর্চা, তোমার মাসোহারা?

    লোকটা দু’-মুহূর্ত ভেবে বলল, তা চলছে বছর তিনেক। সেই যেবার সাংঘাতিক বৃষ্টি হল, পাহাড়ের মাথায় হ্রদ ভেসে গিয়ে হড়পা বান এল, তার পর থেকে।

    জয়ন্ত বলল, তুমি তখন এই মন্দিরে ছিলে নাকি?

    লোকটা বলল, আরে না না, মন্দিরে কেন থাকব? আমি আমার ঘরেই ছিলাম। বছরটা মনে আছে কারণ সে বছর ধুম বৃষ্টির মধ্যে কয়েকটা দামাল ছেলে পাহাড়ে উঠেছিল। তারমধ্যে একজন ওই হড়পা বানে ভেসে গিয়েছিল। পরে ওর লাশটা নালার মধ্যে পাওয়া যায়।

    জয়ন্ত বলল, সে বছরই প্রথম মন্দিরে পুজো শুরু হয়? তোমার ঠিক মনে আছে?

    লোকটা বলল, একদম। মন্দিরটা তো জঙ্গল হয়ে পড়েছিল। বর্ষার পরে আমি গোসাপ ধরতে এসেছিলাম, দেখি সেই ব্রাহ্মণ। আমায় পয়সাকড়ি দিয়ে বলল, তোকে আর গোসাপ ধরতে হবে না। এখন থেকে তুই এই মন্দিরটার দেখভাল করবি।

    আর তৎক্ষণাৎ তুমি এই ভগবান-পরিত্যক্ত মন্দিরে কাজ করতে রাজি হয়ে গেলে, জয়ন্ত বলল।

    লোকটা বলল, কাজ আর কী? হপ্তায় একদিন এসে ঝঁট-পাট দিলেই চলে যায়। আর পুজোর পরে বেদীটা জল দিয়ে ধুয়ে দিই। মাস গেলে অতগুলো করে টাকা, কে দেয়?

    তা বটে, জয়ন্ত মাথা দোলাল।

    চাঁদ মাথার ওপর উঠে আসছে। পাহাড় থেকে নামবার সময় বেশি সতর্ক থাকতে হয়, সাবধানে পা ফেলতে হয়। জয়ন্ত দময়ন্তীর হাত ধরে নামছিল। দময়ন্তীর হোঁচট খাওয়ার অভ্যেস আছে। বেলাগাঁওয়ের আলোগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। একটা জনপদের যে কত রূপ থাকে! যখন তার মধ্যে আছ, তখন একরকম, আবার যখন পাখির চোখ দিয়ে দেখছ, তখন আর এক। জয়ন্ত ভাবল রাত্তিরের দেখাটা কি পেঁচার চোখ দিয়ে দেখা? শুনেছিল পেঁচাদের চোখ নাকি দূরবীনের মত, সোজা শিকারের ওপর ফোকাস করতে পারে। জয়ন্ত তাদের বাসাটাকে খোঁজার চেষ্টা করল। অনেক আলোর ভিড়ে ঠিক মত ঠাহর করতে পারল না।

    *

    অমিতাভদা সন্ধেবেলা সবাইকে ফোন করে চা খেতে ডেকেছিল। সঞ্জয় দেশে গেছে মেয়ে দেখতে। জিতেন শেষ মুহূর্তে আসতে পারেনি, গৌরদাসবাবু সায়টিকার ব্যথায় শয্যাশায়ী, ওঁর স্ত্রীকে নিয়ে ডক্টর মিশ্রর কাছে গেছে। আজ তাই পরিপূর্ণ বঙ্গ সম্মেলন। অমিতাভদার বাসায় পৌঁছে ওরা দেখেছিল শিমুল কোমরে ওড়না বেঁধে চায়ের আয়োজনে ব্যস্ত। বাঙালিদের যেমন হয়, আড্ডা শুরু হলে বিষয়ের কোনও মা-বাপ থাকে না, অর্থনীতি থেকে রাজনীতি... পারস্পরিক যুক্তির পারদ চড়তে থাকে, গলাও চড়তে থাকে। অন্যান্য দিন বলতে হয় না, অমিতাভদা নিজে থেকেই আড্ডা জমায়। আজ চুপ করে বসেছিল। শিমুল চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে ঢোকার পর সাময়িক বিরতি নিল সবাই। শিমুল আজ চোখের নিচে মোটা করে কাজল পরেছে। গালে অল্প প্রসাধন লাগিয়েছে, বেশ উজ্জ্বল লাগছে তাকে। বলল, “কথা বলে সবার গলা শুকিয়ে গেছে নিশ্চয়ই। একটু ভিজিয়ে নিয়ে আবার গলাবাজি শুরু করো।”

    যে যার চায়ের কাপ টেনে নিচ্ছিল।

    “তোমাদের একটা খবর দেবার ছিল, তাই ডাকলাম,” অমিতাভদা বলল। ওরা সবাই অপেক্ষা করে রইল অমিতাভদা কী বলে শোনার জন্য। অমিতাভদা একটু সময় নিয়ে বলল, “বাসু ভাল আছে।”

    ঘরের মধ্যে বাজ পড়লে কম আশ্চর্য হত সবাই। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে প্রত্যেকেই হতচকিত হয়ে বসে রইল। বিজন বলল, “মানে?”

    অমিতাভদা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “প্রথমেই স্যরি বলে নিই। বাসুর কাছে প্রমিস করেছিলাম কাউকে কিছু জানাব না, ও কোথায় যাচ্ছে। আজ সকালে ওর সঙ্গে ফোনে কথা হল। ও আমায় অনুমতি দিয়েছে তোমাদের জানাতে, তাই বলছি।

    অমিতাভদা চায়ে চুমুক দিল। বাকিরা চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে রাখল।

    জয়ন্ত বলল, “কিন্তু কেন? কেন ও আমাদের জানাতে চায়নি?”

    অমিতাভদা বলল, “ও বোধহয় চায়নি, শেষ মুহূর্তে তোমরা কেউ ওকে বাধা দাও। ও যে কাজে যাচ্ছিল তাতে বন্ধু, প্রিয়জন, আত্মীয়রা সব থেকে বেশি পিছু টানে।”

    বিজন রাগত গলায় বলল, “তুমি কী বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসু কী এমন কাজে যাচ্ছিল যে কাউকে বলে যেতে পারল না? আমরা ওর জন্যে দুর্ভাবনায় রাতে ঘুমোতে পারছি না, থানা পুলিশ করছি... আর ও আড়ালে বসে মজা দেখছে?”

    অমিতাভদা বলল, “ওকে ভুল বুঝো না প্লীজ। ওর আর কোনও উপায় ছিল না।”

    দময়ন্তী বলল, “বাসু কি মুম্বাইতেই আছে নাকি অন্য কোথাও?”

    অমিতাভদা বলল, “আপাতত ওর ঠিকানা খারের রামকৃষ্ণ মঠ। সন্ন্যাস নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সাধুদের একটা দলের সঙ্গে তীর্থভ্রমণে মানসসরোবর চলে গিয়েছিল। ক’দিন হল ফিরেছে। ও এদিকের কোনও খবরই জানত না। এমনিতেও সন্ন্যাসীদের পূর্বাশ্রমের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করাই নিয়ম।”

    জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “প্রজ্ঞানন্দজি মহারাজের সঙ্গে কি তুমিই ওর যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলে?”

    অমিতাভদা জয়ন্তর দিকে তারিফের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “বাঃ! ঠিক ধরেছ। আসলে বাসুর পক্ষে সংসারে থাকা দিন-দিন কষ্টকর হয়ে উঠছিল। আমি ওর মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পেরেছিলাম। ওকে আটকে রাখলে হিতে বিপরীত হতে পারত। একদিন না একদিন ও চলে যেতই, আমি শুধু ক্যাটালিস্টের কাজ করেছি। তার বেশি কিছু নয়।”

    রাধিকা বলল, “এটা কিন্তু আপনার অন্যায়। আমরা সবাই ওর জন্যে ভয়ানক চিন্তায় ছিলাম।”

    অমিতাভদা বলল, “বাসুর সন্ন্যাস নেওয়ার খবরটা তোমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে আমারও ভাল লাগছিল না। তাই আজ কথা বলার সময় জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের জানাব কি না। ও সম্মতি দিল।”

    বিজন বলল, “জয়ন্ত, তুই প্রজ্ঞানন্দজি মহারাজের কথা জানলি কোত্থেকে?”

    জয়ন্ত বলল, “ভিকির খুন হওয়ার দিন রাতে বাসু বোধহয় প্রজ্ঞানন্দজি মহারাজকে ফোন করতে গিয়ে ভুল করে জনিকে ফোন করে ফেলেছিল। অদৃষ্টের কী আশ্চর্য পরিহাস, একজন সর্বত্যাগী সাধু আর একজন নৃশংস অপরাধী... দু’জনের মোবাইল নম্বরে মাত্র এক ডিজিটের ফারাক। আমার কাছে দুটো নম্বরই আছে, আমি চেক করে দেখেছি।”

    অমিতাভদা বলল, “প্রজ্ঞানন্দজির নম্বরটা আমিই দিয়েছিলাম বাসুকে। বাসু টুকতে ভুল করেছিল। জনি প্রথমে কয়েকটা কল নেয়নি। শেষে একবারই মাত্র ফোন ধরেছিল। তারপর ‘রং নাম্বার’ বলে ফোন কেটে দেয়। বাসু তখন রামকৃষ্ণ মঠে যাবার জন্য বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। কী কারণে প্রজ্ঞানন্দজির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল। না পেয়ে আমায় ফোন করে। আমি ওঁর নম্বরটা বাসুকে মেসেজ করে দিই। তোমাদের সবজান্তা গেঞ্জিওয়ালা মোহিতে বাসুর কল-লগ দেখে ভিকিকে বাসু বলে ভুল করে বসে।”

    দময়ন্তী বলল, “মোহিতে ওই ভুলটা করেছিল বলেই কিন্তু জনি ডিসুজা ধরা পড়ল।”

    অমিতাভদা হেসে বলল, “জানতাম তুমি মোহিতেকে সাপোর্ট করবে। মোহিতে যে তোমার মাস্তুতো ভাই হয়।”

    দময়ন্তীও হাসল, বলল, “যাই বলুন অমিতাভদা পুলিশ না থাকলে সমাজ উচ্ছন্নে যেত।”

    অমিতাভদা মেনে নিল, “তা ঠিক। তবে পুলিশকে ভুল ধরিয়ে দেবার জন্যেও লোক দরকার। তোমার কর্তাটি না থাকলে কিন্তু জনি-সাহেব এখনও অধরাই থেকে যেতেন।”

    দময়ন্তী বলল, “আপনিও আমাদের কম বিভ্রান্ত করেননি।”

    অমিতাভদার চোখে ছায়া ঘনাল। বলল, “ইচ্ছা করে নয় ভাই, কতকটা অজান্তেই...”

    শিমুল চায়ের ট্রে টেবিলে নামিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথাবার্তা শুনছিল। এগিয়ে এসে অমিতাভদার কাঁধে হাত রাখল। জয়ন্ত বলল, “জানি। কিন্তু সেই বিভ্রান্তির মধ্যে একটা লুকোনো সামঞ্জস্য ছিল। আপনার বোধবুদ্ধি আপনার অজ্ঞাতেই হাওয়া-মোরগের মত আমায় দিশা দেখিয়েছে। সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের সামনে আপনাকে দেখে আমার মাথার মধ্যে অনেকগুলো জট খুলে যায়।”

    অমিতাভদা দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার কর্তাটি প্রখর বুদ্ধি ধরে। অনেক ভাগ্য করে এমন বর পেয়েছ। সামলে-সুমলে রেখো।”

    দময়ন্তী বলল, “শুধু আমার কর্তাটিকে দেখছেন, আর আপনি যে প্রাইজটি পেলেন তার বেলা? তাতে কিন্তু আমারও কিছু অবদান আছে। খেয়াল রাখবেন।”

    অমিতাভদা কাঁধের ওপর ফেলে রাখা শিমুলের হাতে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, “তুমি কি এই পাগলি মেয়েটার কথা বলছ? প্রাইজ কীসের? ও তো আমার একটা কথাও শোনে না। সারাদিন শুধু আমায় শাসন করে। ওর হুকুম তামিল করতেই আমার সময় চলে যায়।”

    জয়ন্ত বলল, “অমিতাভদা, আপনি হলেন ক্রীকের ধারে বেঁধে রাখা নৌকোর মত। যাতে ইচ্ছে মত ভেসে যেতে না পারেন তার জন্য একটা নোঙ্গর দরকার। শিমুল হল সেই নোঙ্গর।”

    দময়ন্তী দেখল শিমুলের চোখ ছলছল করে উঠছে। তাড়াতাড়ি বলল, “ও শিমুল, আমাদের দুধ-চায়ের কী হল। এই ট্যালটেলে লিকার চা আমার মুখে রোচে না বাপু।”

    শিমুল বলল, “দাঁড়াও দময়ন্তীদি বানিয়ে আনি।”

    রাধিকাও বলল, “আমার জন্যেও এক কাপ বানিও শিমুল।”

    বিজন বলল, “মোহিতে ফোন করেছিল। ভিকির বডিটা পুলিশই কাল দাহ করবে। ভাবছি শেষকৃত্যর সময় একবার শ্মশানে যাব। কিছুদিনের জন্যে অন্তত ওকে বন্ধু ভেবেছিলাম।”

    জয়ন্ত বলল, “আমিও যাব তোর সঙ্গে।”

    অমিতাভদা জিজ্ঞেস করল, “মোহিতে আর কী বলল? জনিকে যে লোকটা শেলটার দিয়েছিল তার খোঁজ পাওয়া গেছে?”

    বিজন ঘাড় নাড়ল, “না। সে এখনও নিপাত্তা।”

    দময়ন্তী বলল, “কাল দাদা ফোন করেছিল, শুনলাম মাতাজি নাকি কোলকাতা হাইকোর্টে অ্যান্টিসিপেটরি বেইলের জন্যে আবেদন করেছেন। বোঝা যাচ্ছে না জল কতদূর গড়াবে।”

    অমিতাভদা ভুল শুধরে দিলেন, “বরং বলো কোথাকার জল কোথায় গড়াবে। ব্যাপারটার মধ্যে আন্তর্জাতিক কোনও অপরাধী চক্রের যোগ থাকলেও আশ্চর্য হব না। বলছিলে না, মাতাজির আশ্রমে বিদেশি ভক্তদের সমাগম বেড়েছে।”

    জয়ন্ত চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে নামিয়ে রেখে বলল, “অমিতাভদা এই চা পাতাটা কোন বাগানের? কী নাম? বেশ সুন্দর গন্ধ কিন্তু।”

    অমিতাভদা বললেন, “রুংলি রুংলিয়ট – কথাটার মানে জানো কি?”

    জয়ন্ত ঠোঁট উলটে বলল, “না...”

    অমিতাভদা বলল, “দাস ফার এন্ড নো ফারদার...”


    (প্রথম পর্ব সমাপ্ত)




    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণ: কল্লোল রায়
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)