• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৩ | জুলাই ২০২১ | উপন্যাস
    Share
  • পরিক্রমা : সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়


    || ৩ ||

    মিতাভদা অসহিষ্ণু হয়ে নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখা পাতাগুলো ছুড়ে ফেলে দিল। ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, “হচ্ছে না, কিস্যু হচ্ছে না।”

    বার বার দেখিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও শিমুল বলে একটা মেয়ে ডায়ালগ বলতে গিয়ে তোতলাচ্ছিল, ঠিক সময়ে সহ-অভিনেতার কিউ ধরতে পারছিল না। অমিতাভদার কথা শুনে মেয়েটা ভয় পেয়ে গেল। কাঁদো-কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। অমিতাভদা ধমকে বলল, “তুই কী রে, ছোট্ট একটা তিন লাইনের ডায়ালগ, মনে রাখতে পারিস না? শেষে স্টেজে উঠে কি হাবলার মত দাঁড়িয়ে থাকবি?”

    যে ছেলেটা শিমূলের সঙ্গে পার্ট বলছিল সে ওপর-চালাকি করে কিছু বলতে গেল। অমিতাভদা তাকেও ধমকাল, বলল, “তোকে আর পাকামি করতে হবে না। ঘাড় গুঁজে ডায়ালগ বলছিস। মাইক কোথায় ঝুলছে খেয়াল না রাখলে কিন্তু পস্তাবি। ডায়ালগ শুনতে না পেলে পাবলিক পেছন থেকে আওয়াজ দেবে।”

    জয়ন্ত আর দময়ন্তী এসেছিল অমিতাভদাকে নেমন্তন্ন করতে। হাইওয়ের ধারে প্লাজা বলে একটা হোটেল খুলেছে নতুন। ওদের পুল সাইডে ছোটখাটো পার্টি আয়োজন করা যায়। দু’-জনে গিয়ে দেখে এসেছে গিয়ে ছিমছাম বন্দোবস্ত, নৈশভোজনের সঙ্গে গল্পগুজব করার জন্য চমৎকার জায়গা। পুজোর পরের রবিবার বিয়ে উপলক্ষ্যে ওরা পার্টি দেবে। এখনও দু-বাড়িতে বিয়ের ব্যাপারে কিছু জানায়নি ওরা। বন্ধুবান্ধব, অফিসের চেনা পরিচিতদের নিয়ে সামান্য হৈ-হুল্লোড় হবে। অমিতাভদার বাসায় গিয়ে দেখেছিল দরজা বন্ধ। বাসুকেও পায়নি। আন্দাজ করেছিল অমিতাভদা নিশ্চয় বাঙালি অ্যাসোসিয়েশনের দালানে নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত। চলে এসেছিল। এসে দেখেছিল অমিতাভদা রিহার্সাল দেখতে দেখতে মাথার চুল ছিঁড়ছে। নাটকের কুশীলবরা সবাই আনাড়ি। কারো ভাল করে পার্ট মুখস্ত হয়নি। অধিকাংশর উচ্চারণের আড় ভাঙেনি, দু’-একজন আবার শ্যাম বাজারের শশীবাবু।

    উঁচু দালানের পাশে কালী মন্দির। সন্ধ্যা-পূজা, আরতি হয়ে গেছে। পুরোহিত ভট্‌চার্জিদা কোষা-কুষি, নৈবেদ্যর থালা, বাকি পুজোর সামগ্রী গুছিয়ে তুলে রাখছেন। ঠাকুর প্রণাম সেরে ওরা দু’জন দালানের নিচে দুটো চেয়ার টেনে বসে পড়েছিল। অপেক্ষা করছিল, রিহার্সাল শেষ হলে অমিতাভদার সঙ্গে কথা বলে ফিরবে। দময়ন্তীর মোবাইল বাজল, বড়বাবুর ফোন। ওদিকের কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হল দময়ন্তী। মেজবাবু উমাপদ সাসপেন্ড হয়েছেন, বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। দময়ন্তী কোথায় আছে, কী করছে বাড়িতে জানানো যাবে কি না জিজ্ঞেস করতে বড়বাবু বললেন, আর ক’টা দিন যাক। কার গায়ে কী রং ঠিক মত বুঝে নিই। জিজ্ঞেস করলেন, দময়ন্তী একবার পুনেতে মাতাজির আশ্রমে যেতে পারবে কি না। তেমন কিছু না, একবার সরজমিনে দেখে আসা। কোনও অশৈলী নজরে এলে জানাতে বললেন। বললেন পুনের আশ্রমের ঠিকানাটা মেসেজ করে পাঠিয়ে দেবেন।

    অমিতাভদা রিহার্সাল থামিয়ে দিল, বলল, “আজ জমছে না, এই পর্যন্ত থাক।”

    ছেলেপুলেদের বোধহয় ইচ্ছে ছিল আরও কিছুক্ষণ রিহার্সাল চলুক। যে কোনও কারণেই হোক অমিতাভদার মেজাজ বিগড়ে গেছে, বলল, “কাল সবাই পার্ট মুখস্ত করে আসবি। যদি দেখি একটাও ভুল হচ্ছে নাটক ক্যানসেল করে দেব। সকাল সাড়ে দশটা… শার্প… এক মিনিটও যেন দেরি না হয়। আমি কোনও অজুহাত শুনব না।”

    সবাই হাত নেড়ে চলে যাচ্ছিল। কেবল শিমুল এক দিকে সরে গিয়ে অপেক্ষা করছিল। কার জন্য কে জানে? জয়ন্ত আর দময়ন্তী এগিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়াল। অমিতাভদা মুখ তুলে ওদের দেখে খুশি হল, বলল, “আরে হংসমিথুন, তোমরা জলকেলি ছেড়ে হট্টমেলায়… কী ব্যাপার?”

    জয়ন্তদের বিল্ডিংটার নাম সরোবর, তাই অমিতাভদা ওদের হংসমিথুন বলে। জয়ন্ত হেসে বলল, “কত আর জলে থাকা যায়! মাঝে মাঝে ডাঙায় উঠে পাখা থেকে জল ঝরিয়ে নেওয়া তো দরকার।”

    অমিতাভদা হো হো করে হাসলেন, বললেন, “বাঃ, এই তো বেশ কথা ফুটেছে দেখছি!”

    জয়ন্ত নেমন্তন্ন করল, মুখেই… বলল, “সামান্য আয়োজন, আত্মীয়-স্বজন তো এখানে কেউ নেই, বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ছোট্ট একটা গেট-টুগেদার… তোমায় আসতেই হবে। তুমি না এলে পার্টি জমবে না।”

    অমিতাভদা বলল, “তোমাদের বিয়ের পার্টি, আসব না, তা কি হয়? নিশ্চয়ই যাব।”

    জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “বাসু নেই নাটকে? দেখলাম না আজ, তুমি যে বলেছিলে…”

    অমিতাভদা বিরক্ত মুখে বলল, “একদিন এসেছিল, তারপর থেকে বেপাত্তা… বাধ্য হয়ে ওর জায়গায় অন্য একজনকে নিলাম। এত ইনসিনয়ার হলে চলে?”

    জয়ন্ত ভেবেছিল বাসুকে পেয়ে যাবে এখানেই। হতাশ হল। ওকেও পার্টিতে আসতে বলার দরকার ছিল। বিজন বলছিল ছেলেটা অফিসে আসছে না দু’-দিন। মোবাইলে ফোন করলে হয় বলছে স্যুইচ অফ না-হলে সাবস্ক্রাইবার নেটওয়ার্ক কভারেজ এরিয়ার বাইরে। কোথায় যে উধাও হয়ে গেল। বিয়ে-থার কথা চলছিল, সে জন্য হয়তো দেশে গেছে। যাবার আগে কাউকে বলে যাবে তো!

    জয়ন্তরা চলে যেতে শিমুল অমিতাভদার কাছে এসে দাঁড়াল, “আমায় একটু বাড়িতে ছেড়ে দেবে, অমিতাভদা? রাত হয়ে গেছে, অটোরিকশা পেতে অসুবিধে হবে।”

    কাগজপত্র কাঁধের ঝোলা ব্যাগটায় ঢোকাতে ঢোকাতে অমিতাভদা বলল, “দাঁড়া একটু, মানিককে বলে আসি, রিহার্সাল হয়ে গেছে, লাইট ফ্যান অফ করে দেবে।”

    মানিক অ্যাসোসিয়েশানের কেয়ার টেকার। তার সঙ্গে কথা বলে ফিরে এসে শিমুলকে হাতের ইশারায় ডাকল, বলল, “চল।"

    বাইরে যেতে যেতে অমিতাভদা শিমুলকে বোঝাচ্ছিল কী করে একটা চরিত্রর মধ্যে ঢুকে পড়তে হয়, “যখন আয়না দেখবি তখনও মনে মনে ভাববি, তুই নয়, আয়নায় সেই চরিত্রটাকে দেখছিস। তার মত পোশাক পরবি, সে যেখানে যেখানে যেতে পারে সেখানে সেখানে যাবি, এমনকি তার মত স্বপ্নও দেখবি।”

    অমিতাভদার মোটরবাইকটা অ্যাসোসিয়েশানের বাইরে বাদাম গাছের নিচে পার্ক করে রাখা। মোটরবাইকে স্টার্ট দিল অমিতাভদা। শিমুল পেছনের সীটে চড়ে বসে অমিতাভদার পিঠে আলগা করে হাত রাখল। অমিতাভদা বলে যাচ্ছিল, একবার অফিস থেকে লম্বা ছুটি নিয়ে কোন বাউলের আখড়ায় গিয়ে একমাস পড়ে ছিল, তাদের জীবন-দর্শন, ঈশ্বর-সাধনা কাছ থেকে দেখার জন্য। কোন একটা শর্ট ফিল্মে নাকি মিনিট তিনেকের কাজ ছিল, বাউল চরিত্রে। ইউ টিউবে আছে ছবিটা। শিমুল খুঁজে বার করে দেখেছে। অমিতাভদা জানে না।

    শিমুল নাটক-টাটক তেমন বোঝে না। রিহার্সালের সময়টা অমিতাভদার কাছাকাছি থাকা যায়, কথা বলা যায়, তাই আসে। মানুষটাকে ভাল লাগে, আভাসে ইঙ্গিতে সে কথা অনেকবার বলতে চেষ্টা করেছে। অমিতাভদার কোনও হেলদোল নেই। এখন যেমন, নাটক নিয়ে বকবক করে মাথার পোকা নড়িয়ে দিচ্ছে। অর্ধেক কথা শিমুলের কানে ঢুকছে, অর্ধেক মোটরবাইকের চলার টানে হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। শিমুলের মনে হল আর তো মাত্র ক’দিন! নাটক একবার মঞ্চস্থ হয়ে গেলে তারপর কী আর অমিতাভদার সঙ্গে এত ঘন-ঘন দেখা হবে? কথাটা মনে হতেই হঠাৎ খুব কান্না পেল শিমুলের। তার লিকার চায়ের মত বাদামী মণি-ভাসা চোখের কোল উথলে জল এল। মুশকিল হল এই যে চোখে জল এলেই শিমুলের নাক বন্ধ হয়ে যায়। বার বার নাক টানতে লাগল সে। অমিতাভদা কথা থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী রে, কী হল? সর্দি লাগল নাকি?”

    শিমুল বলল, “না, না… কিছু হয়নি।"

    অমিতাভদা বললেন, “দেখিস বাবা, দু’-দিন পরেই নাটক, ঝোলাস না যেন।”

    লোকটার মাথায় নাটক ছাড়া কি আর কিছু ঢোকে না? হাওয়ায় যেন হিম উড়ছে, গালে ছুঁচের মত ফুটছে, আড়াল নিতে শিমুল একটু ঝুঁকে বসল। সামনের চওড়া পিঠটায় যদি একবার গাল ঠেকাতে পারত! গড়িয়ে পড়া জলের ফোঁটার উষ্ণতাটুকু টের পেলে লোকটার হয়তো সংবিৎ ফিরত। লোভ হচ্ছিল খুব। অমিতাভদা নির্ঘাত বেহায়া ভাববে, শিমুল সাহস পেল না।

    *

    শূন্য থেকে সংসার পাতার পরিশ্রম ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝে না। জয়ন্তর ওয়ান বেডরুম-হল-কিচেন ফ্ল্যাটে ঢুকে দময়ন্তী দেখেছিল আসবাব বলতে বসবার ঘরে একখানা গদি-আঁটা বেতের দোলনা চেয়ার আর দেওয়াল জুড়ে ছাদ ছুঁই-ছুঁই বইয়ের র‍্যাক। শোওয়ার ঘরে সাদামাটা বক্সহীন চার-বাই-ছয় খাটের ওপর নতুন বেনারসি, টুকিটাকি প্রসাধন সামগ্রী রাখা ছিল, দময়ন্তী আসবে বলে জয়ন্তর যা মাথায় এসেছে কিনে রেখেছে। জিনিসগুলো কোথায় তোলে? জানলার পাশে রাখা গোদরেজের মিলিটারি রঙের আলমারিটার পাল্লা খুলতেই হুড়মুড় করে জয়ন্তর ইস্তিরি না করে গুঁজড়ে রেখে দেওয়া জামা-কাপড় মেঝের ওপর লাট হয়ে ঝরে পড়েছিল। কোনও জানলায় পর্দার বালাই নেই, দেখেছিল মেঝেয় পড়ে থাকা শার্ট-প্যান্টের পাশে যথেচ্ছ রোদ্দুর লুটোচ্ছে। শোওয়ার ঘরের লাগোয়া একচিলতে বারান্দায় বেরোতেই অবশ্য চোখ জুড়িয়ে গিয়েছিল। বিল্ডিঙের ভেতরেই, কম্পাউন্ড ওয়ালের ধার ঘেঁষে এক সারি কৃষ্ণচূড়া। বাইরে উঁচু পায়ে চলা রাস্তা, নয়ানজুলি, পার হয়ে মুম্বাই-পুনে হাইওয়ে, তারপর যতদূর দেখা যায় ম্যানগ্রোভ, সবুজের সমারোহ।

    প্রথমেই ছুতোর ডেকে পর্দা লাগানোর বন্দোবস্ত করা হল, তারপর এল মাপ মত পর্দা। জয়ন্ত প্রশংসার চোখে তাকিয়ে বলল, বাঃ! যেন নিজের নয়, অন্য কারো বাসা, সে বেড়াতে এসেছে। আগে তোয়াক্কা করত না, এখন আব্রু জরুরি হয়েছে। ক’দিন ছুটি নিয়েছিল জয়ন্ত। ভেবেছিল একটু সামলে নিয়ে একেবারে পুজোর পরে অফিস জয়েন করবে। বিয়ের অনুষ্ঠানের পরের দিন থেকেই ফর্দ মিলিয়ে জিনিস কেনা শুরু হয়ে গেছে। লোকাল মার্কেটে পছন্দসই জিনিস মেলা ভার, অগত্যা মল… সবচেয়ে কাছের মলটা দুটো স্টেশনের দূরত্বে। রেলওয়ে স্টেশনের ওপরেই, যেতে আসতে খুব সুবিধে। নতুন খুলেছে, আড়ে-বিঘতে মলটা প্রমাণ সাইজের ক্রিকেট মাঠকে লজ্জা দেবে। ব্র্যান্ডেড জিনিস কিনতে হলে এখানে আসা ছাড়া গতি নেই। জয়ন্ত হেসে অজুহাত দিয়েছিল, “তুমি এসে পছন্দ করে সব কিনবে বলেই এতদিন কিছু করিনি।”

    দময়ন্তী জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি জানতে আমি আসব?”

    ঘুরে ঘুরে বাজার করে দু’জনে হাঁপিয়ে পড়েছিল। ফুডকোর্টে বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিচ্ছিল। দময়ন্তীকে টেবিলে বসিয়ে জয়ন্ত ট্রেতে করে দু’-কাপ কফি নিয়ে এসেছিল। কফি মানে ব্রু, দুধ, চিনি আলাদা। কফির পেয়ালায় প্যাকেট কেটে চিনি ঢালতে ঢালতে বলেছিল, “প্রথম যেদিন মাতাজির আশ্রমে দেখা হয়েছিল, সেদিন থেকেই জানতাম… তোমার কি সন্দেহ ছিল?”

    দময়ন্তী মুখে বলল, “কী জানি?”

    মনে মনে বলল, না এসে কি উপায় ছিল… তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ। দু’জনে দু’জনের চোখে চোখ রেখে জরিপ করছিল সর্বনাশের স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় কি না। ঠোঁট আর পেয়ালার মধ্যে ব্যবধান কমছিল না, কফি জুড়িয়ে জল হয়ে যাচ্ছিল। জয়ন্তর পিঠে কে হাত রাখল। জয়ন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বিজন। বিজন দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার কাছে আমার একটা কমপ্লেইন আছে। আমার কফির পার্টনারকে তুমি জপ্ত করে নিয়েছ।”

    বিজনের বাংলা কথার মধ্যে টুকটাক হিন্দি আর ইংরিজি শব্দ ঢুকে পড়ে। দময়ন্তী লজ্জা পেয়ে হাসল, বলল, “বিজুদা, অফিস গেলে তোমার বন্ধুকে যত খুশি কফি খাইয়ো। আমি দেখতে যাব না।”

    “বেশি কফি খেয়ে রাত্তিরে ঘুম না এলে কিন্তু দায় তোমার," বলে বিজন হাসল। ইঙ্গিত বুঝে দময়ন্তীর গালে রক্ত উঠে এল। পাশের কাউন্টার থেকে নিজের জন্য ক্যাপুচিনো এনে চেয়ার টেনে ওদের টেবিলেই বসে পড়ল বিজন। জয়ন্ত বলল, “এটা কী হল? কাবাব মে হাড্ডি না হলে কি তোর চলছিল না?”

    বিজন ঠোক্করটা এড়িয়ে গেল, নিরেট মুখ করে বলল, “শোন, তোকে একটা খবর দিই। বাসু অ্যাবস্কন্ডিং।”

    জয়ন্ত অবাক হয়ে বলল, “অ্যাবস্কন্ডিং… মানে?”

    বিজন বলল, “ওটা অফিসিয়াল টার্ম, মানে ওর বাসা তালা বন্ধ, অফিসে আসছে না… কাউকে কিছু বলে যায়নি কোথায় গেছে। ওর পার্সোনাল ফাইলে নেটিভ প্লেসের অ্যাড্রেস আর টেলিফোন নাম্বার ছিল। সেই নাম্বারে ফোন করা হয়েছিল, অফিস থেকেই। ওর দাদা ফোন ধরেছিল, বলেছে বাসু সেখানে যায়নি।”

    জয়ন্ত উদ্বিগ্ন হল, “আজব তো, গেল কোথায় ছেলেটা?”

    বিজন কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। বাসুর হাউস ওনারের কাছ থেকে ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে ওর ঘর খুলে দেখেছি। সঙ্গে অমিতাভদাও ছিল। নরম্যাল সব… বিছানা পরিপাটি করে পাতা, জামাকাপড় গুছিয়ে আলমারিতে রাখা, সন্দেহ করার মত কিছু দেখলাম না। ওর দাদা আসছে আগামী কাল, আমায় ফোন করেছিল। ওর বাসাতেই উঠবে, দেখা যাক, কী হয়।”

    জয়ন্ত বলল, “পুলিশে একটা খবর দিলে ভাল হত না?”

    বিজন বলল, “অফিস থেকে ইনফর্ম করেছে। ওরা বলেছে খোঁজ-খবর নেবে। পুলিশের ধারণা ইয়াং ছেলে, খাণ্ডালা লোনাবেলা কোথাও মস্তি মারতে গেছে… ফিরে আসবে ঠিক। নওরাত্রি চলছে... ফেস্টিভ্যাল টাইম, পুলিশ মাল্লুখোরদের বাওয়াল সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে, কতটা সিরিয়াসলি পারস্যু করবে, কে জানে?”

    দময়ন্তী একটু ইতস্তত করে বলল, “তোমরা ছাড়া ও অন্য কাদের সঙ্গে মিশত খোঁজ নিয়ে দেখো।”

    জয়ন্তর দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, মস্তি মারার ব্যাপারটা বাসুর চরিত্রর সঙ্গে একেবারেই মেলে না, বলল, “বাসু অন্তর্মুখী ছেলে ছিল, খুব একটা কারো সঙ্গে মিশত না। কোথাও ঘুরতে-টুরতে গেলে আমরাই টেনে-টেনে নিয়ে যেতাম। তিরুপতি বালাজীর ভক্ত ছিল, পুজো-আচ্চা করত, নওরাত্রির সময় উপোস রাখত। আমাদের না-বলে অন্য কোনও বন্ধুদের গ্রুপের সঙ্গে চলে যাবে… ভাবতেই পারছি না।”

    দময়ন্তী বলল, “কোনও আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি গিয়ে বসে নেই তো?”

    জয়ন্ত ঘাড় নাড়ল, “ওর দাদা নিশ্চয়ই খোঁজ নিয়ে দেখেছে। না-হলে কি আর এত দূর দৌড়ে আসত?”

    দময়ন্তী বলল, “যতক্ষণ না মিসিং কমপ্লেইন লেখাচ্ছ, পুলিশ গুরুত্ব দেবে না। বাসুর দাদা এলে প্রথমেই ওঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে লোকাল থানায় রিপোর্ট করো।”

    বিজন বলল, “হুঁ, ঠিক। বলা কওয়া নেই জলজ্যান্ত একটা ছেলে অচানক লা-পতা হয়ে গেল, কুছ তো লাফড়া হ্যায়।”

    দময়ন্তী বলল, “দৈনিক খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়াও দরকার…"

    বিজন বলল, “সোশ্যাল মিডিয়ায় বাসুর ছবি দিয়ে একটা পোস্ট দেব ভাবছিলাম, আসলে ওর দাদার পারমিশান না নিয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে কি না ডিসাইড করতে পারছি না।”

    তিনজনেই চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। চাইনিজ খাবারের কাউন্টার থেকে একজস্ট এড়িয়ে উড়ে আসা ধোঁয়ায় ফুডকোর্টের হাওয়া ভারী হয়ে উঠছিল। বিজন বলল, “তোদের মজা মাটি করে দিলাম, স্যরি।”

    জয়ন্ত হাত নেড়ে বলল, “আরে না না… কিন্তু তুই অফিস যাসনি কেন? ভর দুপুরে মলে কী করছিস?”

    বিজন মুচকি হেসে বলল, “রাধিকা ম্যাডামের সঙ্গে অ্যাপো আছে…"

    জয়ন্ত ভুরু তুলে বলল, “উইক ডে-তে অ্যাপো? পারিস তুই!”

    বিজন ছদ্ম বিষাদে গলা ভারী করে হাত উল্টে বলল, “উপায় কী বল? সারা সপ্তাহ হোস্টেলে থাকে, পৃথিবী রসাতলে গেলেও উইকেন্‌ড সে বাবা-মার সঙ্গে কাটাবে। রাধিকা বাঙালি হলেও মুম্বাইতে জন্ম, বড় হয়ে ওঠা। বান্দ্রা ওয়েস্টে নিজেদের বাড়ি আছে। রিসার্চ স্কলারদের আর কাজ কী? উইক ডেজে মাঝে-মধ্যে ফাঁকি দিলে কেউ দেখতে আসবে না। আমিও বসকে টুপি দিয়ে চলে এলাম।”

    জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “কী বললি বসকে?”

    বিজন বলল, “বললাম, সাইটে যাচ্ছি…”

    জয়ন্ত বলল, “যখন জানতে পারবে যাসনি, ঝাড় খাবি…”

    বিজন পাত্তাই দিল না, বলল, “আরে দূর! বলব গাড্ডায় পড়ে বাইক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বরষার পরে হাইওয়ের অবস্থা দেখেছিস? চাঁদের গায়েও ওই সাইজের গর্ত নেই।”

    জয়ন্ত বলল, “কিন্তু যার জন্যে বাইক-সুদ্ধু ঘাড় মুখ গুঁজে গাড্ডায় পড়লি, সে কোথায়?”

    বিজন বলল, “সেটাই ভাবছি, এতক্ষণে চলে আসার কথা…”

    জয়ন্ত ফাজলামি করে বলল, “মনে হচ্ছে তোকে ভোগা দিয়ে অন্য কারো সঙ্গে ডেটিঙে গেছে।”

    “ধ্যাত, রাধিকা সেরকম মেয়ে নয়, আসবে ঠিক। কোনও কারণে আটকে গেছে হয়তো,” বলতে বলতে বিজনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাত তুলে দেখাল এস্কালেটরের সিঁড়িতে রাধিকা।

    *

    বাসুর দাদা শান্ত-ধীর প্রকৃতির মানুষ। জয়ন্ত আর দময়ন্তী দেখা করতে গিয়েছিল। দেখল বিজনও রয়েছে। গ্রাম-গঞ্জের মানুষ, নতুন জায়গায় এসে ফাঁপরে পড়েছেন, কোনও কিছুরই হদিশ করতে পারছেন না। বিজন রেলওয়ে স্টেশনে গিয়েছিল, তাঁকে বাসুর বাসায় এনে তুলেছে, খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করেছে। তবু যেন থিতু হতে পারছেন না। হিন্দি বলা দূর অস্ত ভাল করে বোঝেনও না। জয়ন্ত ইংরিজিতেই বলল, দাদা, উতলা হবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভদ্রলোকের ইংরিজি জ্ঞানও কাজ চালিয়ে নেওয়ার মত। ভাঙা-ভাঙা ইংরিজিতে বলছিলেন, বাসুকে নিয়ে ছোটবেলা থেকেই চিন্তা। আট দশ বছর বয়সে সে নাকি একবার জিপসিদের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। মাস তিনেক পর কেউ খবর দেয় কোথায় কোন গ্রামের হাটে সে নাকি মেয়েদের মত সাজগোজ করে, ল্যাহেঙ্গা-চোলি পরে পুঁতির মালা বেচছে। তড়িঘড়ি লোক পাঠিয়ে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।

    জয়ন্ত বাসুর পড়ার টেবিলে নজর বোলাল, একটা আধখোলা সাত দিনের পুরনো টাইমস, দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা ইংলিশ টু হিন্দি ডিকশনারি, অটোবায়োগ্রাফি অফ আ ইয়োগী, রামকৃষ্ণ কথামৃতর ইংরিজি অনুবাদ আরও দু’-চার খানা বই। উঠে গিয়ে একটা বই টেনে নিয়ে দেখল, হাতে যেটা পেল, অস্কার ওয়াইল্ডের দ্য পিকচার অভ ডোরিয়ান গ্রে। কথামৃতর সঙ্গে ডোরিয়ান গ্রে-র সহাবস্থান দেখে একটু অবাক হল। প্রথম পাতা উল্টে দেখল অমিতাভদার নাম লেখা – অমিতাভ দত্ত, পাশে যে বছরে কিনেছিল ২০১২। বাসু পড়তে এনেছিল, হয়তো বিষয়বস্তু না জেনেই। পায়ে কিছু ঠেকল, দেখল বাসুর অফিসের ব্যাগটা টেবিলের পাশে নামানো। কী মনে হতে জয়ন্ত টেবিলের ড্রয়ারটা টানল, ব্যাঙ্কের পাস বই, চেক বই, অফিসের আইডেন্টিটি কার্ড, পার্স… পার্সের ভাঁজে শ-পাঁচেক টাকা, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড… যেন বাসু চটজলদি পকেটে খুচরো টাকা ফেলে সেক্টর চারের বাজারে গেছে ওয়ার্নার দুধের গুমটি থেকে দুধ কিনতে। দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবে।

    দময়ন্তী আলমারির ওপরে রাখা একটা ওভার নাইট ব্যাগের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওই ব্যাগটা নিয়েই কি ও বাইরে-টাইরে যেত?”

    বিজন সবার জন্য চায়ের জল চড়িয়েছিল, কিচেন থেকে মুখ বার করে বলল, “হ্যাঁ, আর একটা বড় স্যুটকেস আছে, খাটের নিচে ঢুকিয়ে রাখা, খুলে দেখেছি, ফাঁকা।”

    বাসুর দাদা বলল, ওর সঙ্গে সবসময় একটা ইয়েডুকোন্ডালুওয়াড়া শ্রী ভেঙ্কটেশ্বারা মানে বালাজী ভগবানের ছবি থাকত।

    জয়ন্তও দেখেছে, বাসু কখনো কখনো সেটা বুক পকেট থেকে বার করে মাথায় ঠেকাত। ড্রয়ারে সেটা নেই। জয়ন্ত বাসুর অফিসের ব্যাগে খুঁজে দেখল। পেল না, দু’-চারটে হাবিজাবি কাগজ ছাড়া কিছু নেই। সব কিছু রয়েছে শুধু ছবিটা নেই। বাসুর সঙ্গে সঙ্গে ছবিটাও হাওয়া। হয়তো যে জামাটা গায়ে চড়িয়ে বেরিয়েছে সেটার বুক পকেটে রাখা ছিল।

    দময়ন্তীর মুখ গম্ভীর হচ্ছিল, বলল, মিসিং কমপ্লেইনটা লেখানো জরুরি। পুলিশ অন্তত ওর মোবাইলটা শেষবার কখন কোথায় অন হয়েছিল ট্রেস করতে পারবে। তাছাড়া লোকাল হাসপাতালগুলোতেও… বলতে বলতে বাসুর দাদার চোখ ছলছল করছে দেখে থেমে গেল। বিজন চায়ের কাপ এগিয়ে দিল বাসুর দাদার দিকে, বলল, ভাববেন না, কিছু একটা উপায় হবে। পুলিশ নিশ্চয়ই ওকে খুঁজে বার করতে পারবে।

    জয়ন্ত বলল, চা খেয়ে দাদাকে নিয়ে পুলিশ স্টেশন চলে যা। আমরা রান্না করে রাখছি, ফিরে এসে আমাদের সঙ্গে লাঞ্চ করে নিস।

    দময়ন্তী বলল, পুলিশ স্টেশন যখন যাবে ওর একটা ছবি নিয়ে যেও। রিসেন্ট ফটোগ্রাফ, ওরা চাইবে… ফ্রন্ট ফেস হলে ভাল হয়।

    বিজন বলল, পাসপোর্ট সাইজ ছবি পেয়েছি, কিন্তু সেগুলো পুরনো, দু’-তিন বছর আগেকার। গ্রুপ ফটো আছে একটা, মালসেজ ঘাটে গিয়েছিলাম এ বছরই, মনসুন ট্রেকে, বাসু ছিল দলে। দেখো তো চলবে কি না।

    দময়ন্তী দেখে বলল, চলবে। পাসপোর্ট ফটোটাও দেখিও।

    বিজন বাসুর দাদাকে ওর মোটর বাইকের পেছনে বসিয়ে রওনা দিল। জয়ন্ত বলল, যদি দরকার লাগে ফোন করিস, আমি চলে আসব।

    বাড়ি ফেরার পথে দময়ন্তী বলল, “সবজি বাজার করে নিয়ে গেলে হত।”

    জয়ন্ত মোবাইলে সময় দেখে বলল, “এত বেলা হয়ে গেছে, এখন কি আর পাবে?”

    সেক্টর চারের সবজি বাজার উঠি উঠি করছিল। দময়ন্তীকে দেখে এক মৌসি হাতছানি দিয়ে ডাকল। আরও একটি মেয়ে সবজি কিনছিল তার থেকে। দময়ন্তী চিনতে পারল, শিমুল। এগিয়ে গিয়ে আলাপ করল। শিমুল কাছাকাছিই থাকে। একটা আইটি কোম্পানিতে কাজ করে। খুব মিশুকে মেয়ে। দময়ন্তী বলল, “এসো না একদিন আমাদের বাড়িতে, জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।”

    শিমুল বলল, “ফোন করে আসব, তোমার মোবাইল নম্বর দাও।”

    দময়ন্তী বলল, “আমার নম্বর নাইন এইট থ্রি… একটা মিসড কল দাও, আমি তোমার নামে সেভ করে নেব।”

    শিমুল হাত নেড়ে চলে গেল। দময়ন্তী দেখল মৌসির ঝুড়িতে বাঙালি সবজি বলতে ঝিঙে, পটল আর সম্বৎসরের কপি, কেমন যেন রুখো-সুখো, দেশের মত তরতাজা নয়। কালো মাটির ফসলে স্বাদ হয় কম। তাই বোধ হয় মরাঠিরা সব রান্নাতেই কষে ঝাল দেয়। জয়ন্ত একদম ঝাল খেতে পারে না। লঙ্কা মুখে পড়লেই হেঁচকি ওঠে। বিজন আর বাসুর দাদা খাবে, বাড়ি ফিরে রান্নার তোড়জোড় করছিল দময়ন্তী, জয়ন্তর মোবাইল বাজল। কথা শুনে বুঝল ওদিকে বিজন। দেখল জয়ন্তর মুখ কালো হচ্ছে।

    ফোন ছাড়ার পর জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”

    জয়ন্ত বলল, “পুলিশ বলছে একটা ডেডবডি পাওয়া গেছে, সমুদ্রের ধারে, পাথরের খাঁজে আটকে ছিল। বাসু যেদিন থেকে মিসিং তার দিন দুয়েক পরে জেলেরা দেখতে পায়, ভোরবেলা মাছ ধরে ফেরার সময়। বডিটা এখনও কেউ শনাক্ত করেনি। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী হাইট-টাইট বাসুর সঙ্গে ম্যাচ করছে… ”

    জয়ন্তর গলা ভাঙছিল। দময়ন্তী বলল, “এখনই খারাপটা ভাবছ কেন? যে মারা গেছে তার পরনের জামা কাপড়, বডি থেকে আর যা যা পায় পুলিশ একসঙ্গে প্যাকেট করে রেখে দেয়, বিজনদা কি সেগুলো দেখে চিনতে পেরেছে?”

    জয়ন্ত বলল, “পুলিশ দেখাবে বলছে, সময় লাগবে, ওরা বসে আছে।”

    দময়ন্তী বলল, “বিজনদাকে একটা ফোন করে দাও, বালাজী ভগবানের ছবিটা প্যাকেটে আছে কি না যেন অতি অবশ্যই চেক করে।”

    জয়ন্ত ফোন করল বিজনকে। বিজন বলল, “ভাল মনে করিয়েছিস, দেখব…”

    জয়ন্ত বলল, “টেনশান হচ্ছে রে, তুই জিনিসগুলো দেখেই ফোন করবি, বাসুরই কি না… দেরি করবি না।”

    সাধারণত জয়ন্ত সবজি কেটে দেয় আর দময়ন্তী খুন্তি নাড়ে। রান্না বসাতে বসাতে দু’জনে খোশগল্প করে। আজ সবজি কাটতে গিয়ে জয়ন্ত আঙুল কেটে বসল। দময়ন্তী ব্যান্ড এড লাগিয়ে ধমক দিয়ে বলল, “তুমি যাও, বই-টই পড়ো। আমি কেটেকুটে রান্না বসিয়ে দেব।

    গত কয়েক দিন মারকোয়েজের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার অভ সলিচিউডের ইংরিজি অনুবাদ পড়ছে জয়ন্ত। সময় নিয়ে পড়ছে, তারিয়ে-তারিয়ে। পড়তে-পড়তে মনে হচ্ছে বইটার শেষ পাতায় পৌঁছে গেলে বেশ দুঃখ লাগবে। বুকের ভেতরটা খালি হয়ে যাবে। বুকমার্ক করা পাতা খুলে পড়তে শুরু করল। খানিকটা পড়ে খেই হারিয়ে ফেলল। ফিরে আবার পড়ল, মন বসছে না কিছুতেই।

    ফোন বাজল, চারদিকে তাকিয়ে পেল না। দময়ন্তী এনে হাতে দিল, কিচেনেই ফেলে এসেছিল। বিজনের ফোন, বলল, প্যাকেটের জামাকাপড় দেখে বোঝা মুশকিল বাসুর কি না। ছেঁড়াখোঁড়া টি-শার্ট আর বারমুডা… মনে হচ্ছে রোদে-জলে পড়ে থেকে রঙ জ্বলে গেছে। আদতে কী রঙ ছিল আন্দাজ করা কঠিন। বাসুর হতেও পারে, নাও হতে পারে। তবে হ্যাঁ, প্যাকেটে বালাজী ভগবানের ছবি নেই।

    জয়ন্ত বলল, তাহলে?

    বিজন বলল, পুলিশ বলছে একবার মর্গে গিয়ে বডিটা দেখতে। আমি দাদাকে নিয়ে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হবে। বাইরে কোথাও খেয়ে নেব। তোরা খেয়ে নিস, আমাদের জন্য বসে থাকিস না।

    *

    সপ্তমীর সন্ধেবেলা নাটক মঞ্চস্থ হল আর অষ্টমীর দিন সকাল থেকে শিমুল জ্বরে পড়ল। একেবারে ধুম জ্বর, গা পুড়ে যাচ্ছে, চোখ খুলে রাখতে পারছে না এত জ্বালা করছে। মা কাছে থাকলে পাশে বসে কপালে জল-পটি দিত, পাখার বাতাস করত। এখানে এক গেলাস জল দেওয়ার কেউ নেই। মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। শিমুলের আবার কান্না পাচ্ছিল। কিন্তু একা ঘরে কাঁদলে কে আর দেখতে আসছে? শিমুল ঠোঁট টিপে কান্না আটকে রাখল। ভাই থাকলে নির্ঘাত বলত, এই আবার ফ্যাচ-ফ্যাচ শুরু হল। বোর করিস না তো। আসলে এত ঘন-ঘন শিমুলের কান্না পায় যে নিজেই বোর হয়ে যায়। চেষ্টা করে না কাঁদতে, কিন্তু গলার কাছটা ব্যথা-ব্যথা করে চোখ উপচে জল চলে আসে, কিছুতেই আটকাতে পারে না।

    দরজায় বেল বাজল। এই অসময়ে কে এল? নাইটির নিচে ভেতরের জামা নেই, গায়ে তড়িঘড়ি একটা ওড়না চাপিয়ে টলতে-টলতে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়াল শিমুল... অমিতাভদা। আসার আর সময় পেল না? চোখের পাতায় বাসি কাজল ধেবড়ে আছে, ঠোঁটের কোণে জ্বরঠুঁটো... এই নয়নাভিরাম রূপটি না দেখলে কি চলছিল না? কালকের নাটকে যারা অভিনয় করেছে বাঙালি অ্যাসোসিয়েশান তাদের প্রত্যেককে একটা করে মেমেন্টো দিয়েছে। অমিতাভদা সাত সকালে সেটা পৌঁছে দিতে এসেছিল। দরজার পাল্লা হাট করে খোলা রইল, শিমুল ফিরে গিয়ে ডিভানের ওপর গলা অব্দি চাদর টেনে শুয়ে পড়ল। অমিতাভদা ভুরু কোঁচকাল, “কী হয়েছে তোর?”

    শিমুল জবাব দিল না। কী হয়েছে জানার ইচ্ছা থাকলে কাছে এসে দেখো। অমিতাভদা ঘরের ভেতরে ঢুকে আলতো করে দরজা বন্ধ করে দিল। শিমুলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “কী রে কানে কথা গেল না? জবাব দিচ্ছিস না যে?”

    কথার ছিরি দেখো! শিমুল মুখ ফিরিয়ে নিল, চোখ টিপে বন্ধ করে রাখল। অমিতাভদার হাতের পাতা শিমুলের কপাল ছুঁল। তারপর গাল। শিমুলের বুকের ভেতরটা শিরশির করছিল। তবু চোখ বুজে যেমন পড়ে ছিল, পড়ে রইল। চোখ খুলতে ইচ্ছে যে হচ্ছিল না এমন নয়। কৌতূহল হচ্ছিল দেখতে লোকটা এবার কী করে। বাসনের আওয়াজ, জল পড়ার শব্দ পেয়ে বুঝল অমিতাভদা কিচেনে ঢুকেছে। দু-মিনিট পরে কপালে ভিজে রুমালের স্পর্শ পেল। আর পারল না, চোখ খুলে দেখল অমিতাভদা ঝুঁকে রয়েছে মাথার কাছে। তপ্ত কপালে ঠান্ডা জলের ছোঁয়া পেয়ে আরাম লাগছিল। শিমুল আবার চোখ বুজল। বেশ হয়েছে, এখন বসে-বসে সেবা করো। অমিতাভদা বলল, “কী করে বাঁধালি? প্যারাসিটামল খেয়েছিস?”

    ঘাড় নেড়ে না বলল শিমুল। অমিতাভদা জিজ্ঞেস করল, “বাড়িতে আছে? কোথায় রাখিস ওষুধ?”

    শিমুল আঙুল তুলে দেখাল, কাবার্ডের সেকেন্ড ড্রয়ারে, একটা টিফিন কৌটোর মধ্যে। অমিতাভদা উঠে গেল। কৌটো খুলে ওষুধের পাতাটা বার করে আনল। কিচেন থেকে একটা জলের বোতল নিয়ে এসে শিমুলকে বলল, “উঠে বোস, শুয়ে-শুয়ে ওষুধ খেলে বিষম লাগবে।”

    শিমুল আড়কাত হয়ে হাত বাড়িয়ে বোতলটা নিল। অমিতাভদা ওষুধ দিতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে পাতার গায়ে লেখা ডেট পড়ে বলল, “আরে, এ তো এক্সপায়ার করে গেছে, ছ’মাস আগে।”

    শিমুল বলল, “ওতেই হবে…”

    অমিতাভভদা বকুনি দিল, “মজা পেয়েছিস? দাঁড়া, আমি ওষুধ কিনে আনছি।”

    শিমুল অমিতাভদার হাত ধরে টানল, “না যেও না প্লিজ, আমার পাশে বসে থাকো,” কী করে যে বলল, নিজেই জানে না। সে যে এই রকম হঠকারী হতে পারে কোনোদিন ভাবেনি। অমিতাভদা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সত্যি সত্যিই ওর পাশে বসে পড়ল। শিমুলের শরীরটা কাঁপছিল। জ্বরের ঘোরে নাকি অমিতাভদাকে প্রথম বার ‘তুমি' বলে ডেকে, কে জানে! মনে মনে তো সব সময় তুমিই বলে। শিমুল চাদর সরিয়ে অমিতাভদার কাছে সরে বসল। কাঁধ ধরে টেনে অমিতাভদার বুকে মাথা ঘষল। শরীরের তাপটা যদি দিয়ে দেওয়া যায়। আশ্চর্য লাগল, অমিতাভদার শরীর পাথরের মত ঠান্ডা, যেন মানুষ নয়, মার্বেলে কোঁদা মূর্তি, প্রাণ নেই। অমিতাভদা নিস্তেজ গলায় বলল, “ছাড় শিমুল, ছেলেমানুষি করিস না।”

    অমিতাভদা যেন জানত শিমুল এই রকম করবে। তৈরি হয়েই এসেছিল কোনওরকম প্ররোচনায় সাড়া দেবে না বলে। আজ যদি অমিতাভদা চাইত শিমুল সর্বস্ব দিতে তৈরি ছিল। অমিতাভদা ওর হাত ঠেলে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। চাদরটা তুলে ওর গলা পর্যন্ত টেনে দিয়ে বলল, “তুই রেস্ট কর শিমুল। আমি এখন যাই, কারো হাত দিয়ে ওষুধটা পাঠিয়ে দেব। দুটো বিস্কুট খেয়ে খাবি।”

    অমিতাভদা চলে যাবার পর শিমুল ঠ্যাং ছড়িয়ে কাঁদতে বসল। এরপরও যদি কান্না না পায় শিমুল মানুষ নয়। প্রথমে গুনগুন করে শুরু করে ধীরে-ধীরে কান্নার লয় তাল বাড়াচ্ছিল, তার মধ্যেই সামনের টেবিলে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। আঃ কেউ কি একটু নিশ্চিন্তে কাঁদতেও দেবে না? ফোনটা তুলে দেখল, দময়ন্তী। মাঝপথে কান্না থামিয়ে সর্দি-বসা গলায় বলল, “হ্যালো…”

    দময়ন্তী বলল, “কী করছ শিমুল? গলা ভারী কেন? শরীর খারাপ হয়নি তো?”

    শিমুল বলল, “জ্বর হয়েছে গো দময়ন্তীদি, শুয়ে আছি, মাথা ঘুরছে...”

    দময়ন্তী বলল, “ও মা! সে কী? কত জ্বর?”

    শিমুল বলল, “বাড়িতে থার্মোমিটার নেই, একশ এক-টেক হবে…”

    দময়ন্তী বলল, “ডাক্তার দেখিয়েছ? আমি আসব?”

    শিমুল বলল, “না, না, আসতে হবে না আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব।”

    অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে যাবে, চান সেরে তৈরি হচ্ছিল দময়ন্তী। খুঁতখুঁতুনিটা যাচ্ছিল না মন থেকে। জয়ন্তকে শিমুলের অসুখের কথা বলতে বলল, “চলো, একবার যাই, মেয়েটা একদম একা থাকে, কিছু যদি লাগে-টাগে… ওখান থেকে না-হয় অঞ্জলি দিতে চলে যাব।”

    দময়ন্তী বলল, “ভাবছিলাম ওকে আমাদের বিয়ের পার্টিতে আসতে বলব… তোমার যদি আপত্তি না থাকে।”

    জয়ন্ত বলল, “ভালই তো, আপত্তি কীসের?”

    শিমুলের বাড়ি পৌঁছে দেখল শিমুল ততক্ষণে উঠে বসেছে। অমিতাভদা মলয় বলে একটা ছেলের হাত দিয়ে প্যারাসিটামল পাঠিয়েছিল। একটা বড়ি গিলে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। বিন-বিন করে ঘাম দিয়ে জ্বর নামতে শুরু করেছে। দময়ন্তী পাশে বসে গায়ে হাত দিয়ে বলল, “কেমন লাগছে এখন?”

    শিমুল বলল, “দুর্বল লাগছে একটু...”

    দময়ন্তী বলল, “চটপট সেরে ওঠো। সামনের রোববার আমাদের বিয়ের পার্টি। তোমাকে আসতে হবে কিন্তু।”

    শিমুল বলল, “বাঃ, কোথায়?”

    দময়ন্তী বলল, “প্লাজা বলে একটা নতুন হোটেল খুলেছে, হাইওয়ের ধারে...”

    শিমুল বলল, “খুব রাত হবে না তো? সাড়ে ন’টা-দশটার পর ওদিক থেকে অটোরিক্সা পাওয়া যায় না...”

    দময়ন্তী বলল, “অমিতাভদা যাবে, দেরি হলে তোমায় পৌঁছে দেবে না-হয়।”

    “অমিতাভদা...” শিমুল অন্যমনস্ক হয়ে গেল। দময়ন্তী দেখল শিমুলের চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। দময়ন্তী জয়ন্তকে বলল, “এক কাজ করো, তুমি মেডিক্যাল থেকে একটা থার্মোমিটার কিনে আনো। আমি ততক্ষণ চায়ের বন্দোবস্ত করি। মেয়েটা বোধ হয় সকাল থেকে কিছু খায়নি, দেখি ঘরে ব্রেড-ট্রেড আছে কি না।”

    জয়ন্ত বেরিয়ে যেতে দময়ন্তী শিমুলের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার বলো, কী হয়েছে?”

    যে কান্নাটা অর্ধেক কেঁদে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছিল সেটা পাথরে চিড় ধরাচ্ছে। দময়ন্তী জিজ্ঞেস করল, “অমিতাভদা কষ্ট দিয়েছে?”

    শিমুল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “কষ্ট দিতে গেলেও তো ছুঁতে হয় দময়ন্তীদি। ও তো আমাকে ছুঁয়েও দেখল না।”

    দময়ন্তী শিমুলকে কাছে টেনে, পিঠে হাত রেখে বলল, “কী হয়েছে আমাকে খুলে বলো, শিমুল। লুকিও না।”

    দময়ন্তীর কাঁধে মাথা রেখে শিমুল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

    (এর পরে)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণ: কল্লোল রায়
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)