• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৭ | জুলাই ২০২২ | গল্প
    Share
  • শঙ্খমালার সঙ্গে একটা বিকেল (৩) : ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত
    ১ম অংশ | ২য় অংশ | ৩য় অংশ (শেষ)

    এখনো অপ্রকাশিত উপন্যাস থেকে গৃহীত। গল্পের পটভূমিকা আশির দশকের দিল্লী।



    শঙ্খমালার সঙ্গে একটা বিকেল



    আমি বললাম - তৃতীয় অঙ্কের যবনিকা উঠতে দেখা গেল শূর মুখ থেকে একটা মুখোশ খুলে নিয়ে শঙ্খ সরোবরের জল থেকে ভগ্ন হৃদয়ে উঠে আসছেন। জীভা তার আসবের পেয়ালায় চঞ্চু ডোবাতে যাচ্ছিল। শূরকে দেখে মাথাটা তুলে নিল।

    শূর কাছে এসে ভিজে গায়ে মাটিতে বসে পড়ে বললেন – কতক্ষণ ছিলাম আমি জলের ভিতর?

    - এক পলকও নয়। ঢুকলেন আর বেরিয়ে এলেন। বলল জীভা। - কিছু ঘটেছে সেখানে? আপনার সঙ্গে সোনার কাঁটাটা আর দেখছি না।

    - জীভা, আমি এক মাস শঙ্খমালার প্রাসাদে কাটিয়ে এসেছি। কিন্তু আর তাকে পাওয়ার কোনো আশা নেই। সোনার কাঁটাটা আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।

    - শঙ্খমালা আপনাকে কিছু বলেনি?

    - কী বলবে সে? আমি যে শঙ্খমালাকে দেখেছি সে ছিল অনামিকার চেয়ে বছর তিন-চার ছোট। সে তো আমাকে বা এই ডাঙার পৃথিবীকে দেখেনি।

    - শান্ত হন রাজা। শান্ত হয়ে আমার কাছে সমস্ত বৃত্তান্ত খুলে বর্ণনা করুন। আপনি তাকে কিছু বলে আসতে পেরেছিলেন?

    - সোনার কাঁটাটা তাকে দিয়ে এসেছি। আশা ছিল সে তার সঠিক ব্যবহার খুঁজে পাবে। তবে আমি তাকে বলেছিলাম শূর একটা মদ্যপ, লোভী, ভীতু, আর রসকষহীন লোক।

    জীভা মুখ ভর্তি করে আসব নিয়েও গিলতে ভুলে গেল। শূর বলে চললেন – ও, হ্যাঁ। এও বলেছিলাম যে শূরের মতো নিকৃষ্ট মানুষকে বাঁচিয়ে কোনো লাভ নেই।

    - কেন এটা বললেন জানতে পারি?

    - মজাক জীভা। ইয়ারকি। রগড়। রঙ্গ। কৌতুক করে বলেছিলাম। সে এখানে আসার পর শূরের মুখ দেখে কীরকম চটবে সেটা ভেবে লোভ সামলাতে পারিনি।

    - কাজের কাজ হয়েছে সেটা। সৌভাগ্যবশত শঙ্খমালা আপনার কথা শোনেনি। সে ওই কাঁটা ব্যবহার করে এসেছিল আপনার জীবন বাঁচাতে। তার থাকার মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার আগে সে আপনাকে বিবাহও করে। যাই হোক, বাকিটাও বলুন। কোনো কিছু বাদ দেবেন না।

    শূর এক এক করে পাতালপুরীতে তাঁর এক মাস যাপনের সমস্ত ঘটনা আদ্যোপান্ত বলে চললেন। সেই ইতিবৃত্ত যতক্ষণে শেষ হল, ততক্ষণে আকাশে চাঁদ উঠে এসেছে। শূর বললেন – অনামিকাকে পাওয়ার আর কোনো পথ খোলা দেখছি না। শঙ্খ স্রোতের হাল তার সঙ্গে এসেছিল এবং আমার সঙ্গে ফিরে গেছে। আমার পক্ষে অতীতে ফিরে যাওয়ার আর কোনো পন্থা অবশিষ্ট রইল না। তার কাছেও দ্বিতীয়বার ভবিষ্যতে আসার কোনো যন্ত্র নেই। আমাদের কাহিনী হল একজন আরেকজনের চেয়ে একশো বছর দূরত্বে থেকে চিরবিচ্ছেদের কাহিনী। এই চন্দ্রমা অস্তগত হওয়ার আগেই আমি প্রাণ বিসর্জন দেব।

    জীভা বলল - চন্দ্রমা অস্তগত হতে এখনো ঢের দেরী। ঘরে আরো চার কুম্ভ আসব পড়ে আছে। চলুন গিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা যাক।

    - কত বড় পাষণ্ড আপনি জীভা। আমার মনে দুঃখের চিতা জ্বলছে। আর আপনি আসব পানের কথা ভাবছেন?

    - একটা গল্প আরো শোনানো বাকি ধুরন্ধর কুমার। জীভার গল্প। ভাগ্য ভালো আপনার যে আজ অত্যধিক সুরাপানের কারণে সেটা আমার মনে পড়েছে। এই বেলা শুনে নিন, নইলে কাল যদি মনে না থাকে তখন হয়তো পস্তাবেন।



    আমি আবার একটু থেমেছিলাম। তিন জোড়া ভুরু ধনুকের মতো একটুখানি করে বেঁকে উপরের দিকে উঠল। - কী ব্যাপার রাইটার, আটকে গেলে নাকি? তানিয়া একটু শঙ্কিতভাবে জিজ্ঞেস করল।

    যীশুর নাম নিয়ে শুরু করার পর যদি ফেল করি তাহলে সেটা তানিয়ার উপর অত্যাচার হয়ে যাবে। আমি বললাম – এতদূর অবধি সব কিছু পরিষ্কার বুঝতে পারছো তো তোমরা?

    - না বোঝার কী আছে? সপ্‌না একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বলল। - আমরা কি ইম্‌বেসাইল? না তুমি হিব্রুতে বলছো?

    পম্পা বলল – একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না। তুই যে মিল করিয়ে দিবি বলে প্রমিস করেছিস সেটার কী হল? টাইম ট্র্যাভেল তো আর সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।

    সপ্‌না বলল – যেভাবে ইচ্ছে গোঁজামিল লাগিয়ে দেবে। আরেকটা সোনার কাঁটা আনাবে ও। ইঁদুরটা ঘাড়ে করে নিয়ে আসবে দেখিস।

    আমি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললাম – নো মোর ইঁদুর্‌স্‌। কিন্তু কীভাবে মিল হবে তার একটা আন্দাজ আমি তোমাদের আগেই দিয়ে রেখেছি। তোমরা সেটা দেখতে পাচ্ছো না?

    তিন জোড়া ধনুক এমন বেঁকেচুরে গেল যে ভয় হল ভেঙে না যায়। তানিয়া বলল – আমি তো কোনো উপায় দেখছি না। আমি কি কাক্লি-বাক্লির চেয়েও বোকা?

    সপ্‌না বলল – আমিও অব্‌ভিয়াস কিছু দেখছি না। এমন তো নয় যে জীভাই শঙ্খমালা?

    পম্পা বলল – জয় তুই জানতে চাইছিস তো যে পাঠকরা এখানে এসে গল্পের শেষটা বুঝে যাবে কিনা? কেউ কিচ্ছু বুঝবে না। সাপের পেট থেকে ব্যাঙ কটা গল্পে বেরোয়? তবে সোনার কাঁটা ছাড়া হিরো আর হিরোইনের পক্ষে একশো বছরের গ্যাপটা ক্রস করা আমার তো অসম্ভব মনে হচ্ছে।

    কী জবাব দেব সেটা একটু ভেবে নিচ্ছিলাম। তানিয়া আমাকে থামিয়ে বলল – তুমি আমাকে জাস্ট আরেকটা হিন্ট্‌ দাও জয়। আমি ঠিক ধরে ফেলব।

    আমি বললাম – পঞ্চুকেই হিন্ট্‌ হিসেবে ধরো। সে শঙ্খমালার দেশে ছিল। শূরের বাগানে এসে বিষের তীর খেয়েছে। অথবা জীভাকে ভাবো। সেও শঙ্খমালার দেশে ছিল। এখন শূরের ড্রিঙ্কিং পার্টনার। এই টাইম ট্র্যাভেলটা কীভাবে হচ্ছে?

    - এগুলো তো থুত্থুড়ে বুড়ো! একশো দেড়শো বছর ধরে বেঁচে আছে। বুড়ি হয়ে টাইম ট্র্যাভেল করাটা কি একটা হিরোইনের পক্ষে মানায়? মানুষ অতদিন বাঁচেও না। ভাগ্যিস!

    - তোমরা হ্যাপি এন্ডিং চেয়েছিলে। হ্যাপি এন্ডিং জরুর মিলেগা। শুধু বুঝতে হবে যে বয়সের ব্যবধান রিলেশানশিপে অন্তরায় নয়। বয়স হল একটা মেন্টাল ইলিউশান, একটা অন্ধবিশ্বাস। সেটাকে ভেঙে দিলে দেখবে কারো পক্ষে চিরযুবতী থাকা কিছু শক্ত নয়।

    তিনটি তরুণী শ্রোতার চোখ ছানাবড়া। তানিয়ারটা তো ছলছলও করে উঠেছে। সে বলল – ওঃ, সেরকমটা যদি সত্যি হত!

    গল্পে কী ঘটাতে চলেছি সেটা আন্দাজ করার পর পম্পা বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে বলল - তার মানে শঙ্খমালা একশো বছর পরেও বেঁচে আছে? কটা নাতি-নাতনি তার?

    - জীভার কাছ থেকেই শোনা যাক না? বললাম আমি।




    - বাজীরাওয়ের ডিম ফুটে কী বেরিয়েছিল আপনার মনে আছে? ঘরে ফিরে আসার পর একটা নতুন মদের পাত্র ভরে নিয়ে জীভা শূরকে জিজ্ঞেস করল।

    - ডিম ফোটার আগে আমাকে চলে আসতে হয় ওখান থেকে।

    - শুনুন তবে। বেরিয়েছিল একটা তোতার বাচ্চা। বাজীরাও ভেবেছিলেন তিনি যে ডিমে তা’ দেবেন সেটা থেকে তাঁর মতো ইঁদুরই বেরোবে। সেটা না হওয়াতে তিনি সমস্যায় পড়ে যান। পাখির বাচ্চাকে কীভাবে মানুষ করতে হয় তাঁর জানা ছিল না। তাও তিনি চড়াইদের সাহায্য নিয়ে পাখিটাকে উড়তে শিখিয়েছিলেন। শঙ্খমালা তাদের দুজনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে। বাজীরাওয়ের নাম উলটে সে পাখিটার নাম দিয়েছিল জীভা!

    - কী আশ্চর্য! তার মানে আমি আপনাকে আপনার জন্মের আগে দেখেছি!

    - এবং আমার পালক পিতাকে আপনি আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই উপকারের প্রতিদান আজ দেব। প্রথমেই জানিয়ে রাখি, এই রাজ্যে আমি প্রথম এসেছিলাম একশো বছর আগে। চুরি করতে।

    - চুরি?

    - আজ্ঞে হ্যাঁ। বাজীরাও ছিলেন একজন স্নেহান্ধ পিতা। তাঁর যত্নে আমি অচিরেই পাখিদের মধ্যে বিরাট ও বলশালী হয়ে উঠি। কিন্তু পিতার প্রশ্রয়ে আমি দুর্মদ, এবং অহঙ্কারীও হয়ে উঠেছিলাম। অল্প বয়সে আমার আসব আর দ্যুতের নেশা ধরে যায়। সেই নেশার খরচ যোগাতে প্রথমে পিতার ভাঁড়ার নিঃস্ব হয়। তারপর গৃহস্থদের বাড়িতে হানা দিয়ে সিন্দুক ভাঙায় সিদ্ধহস্ত হতে আর বেশি সময় লাগেনি। শঙ্খমালার দাদু যখন মৃত্যুশয্যায় তখন এক রাতে আমি তাঁর ঘরে ঢুকেছিলাম চুরির অভিপ্রায়ে। কতটা নিচে নামলে একজন তার আশ্রয়দাতার ঘরে সিঁদ কাটে। ভাবুন।

    - আপনি গুণী মানুষ জীভারাও। গুণীদের ক্ষমতা থাকে। তাই পদস্খলন হয়।

    - শঙ্খমালা ঘরেই ছিল। অন্ধকারে কোনো শব্দ না করে আমি তার দাদুর শয্যার নিচে লুকোনো সিন্দুকটা খুলি। আশা ছিল হীরে বা চূনীর থলে পেয়ে যাব। কিন্তু দেখলাম সিন্দুকটা ফাঁকা। একটু বেশিই ফাঁকা। কারণ তার নিচে একটা অতল খাদ। মাথা ঘুরে গেল সেটাতে উঁকি দিতে গিয়ে। হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমি সেই খাদটাতে পড়ে যাচ্ছি। একটা অনন্ত অন্ধকার গহ্বরের মধ্যে পড়ছি তো পড়ছিই। ভয়ে সংজ্ঞা হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম একটা অন্য সিন্দুকের মধ্যে শুয়ে আছি। ভোরের আলো এসে পড়েছে ঘরটাতে। ধড়মড় করে উঠে উঁকি দিয়ে দেখলাম সেটা মোটেও শঙ্খমালার দাদুর ঘর নয়। একটা অস্ত্রাগার।

    - অস্ত্রাগার?

    - আপনার অঙ্গুরীয়তে যে চিহ্নটি অঙ্কিত আছে, অস্ত্রাগারের দেয়ালে সেই চিহ্নটি আঁকা। সুযোগ বুঝে অস্ত্রাগার থেকে বেরিয়ে নিজেকে এই রাজপুরীর ভিতর আবিষ্কার করলাম। সেটা আপনার প্রপিতামহের যুগ। উনি মদ স্পর্শ করতেন না।

    - আমার প্রপিতামহকে আপনি চিনতেন? চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করলেন শূর।

    - চিনতাম মানে? আমি তাঁর বেদের শিষ্য ছিলাম। আজ যেমন হয়েছি আপনার মদের চেলা। বাতাসে একটা প্রণাম ছুঁড়ে দিয়ে বলল জীভা। - রাজর্ষি মানুষ ছিলেন। ত্রিকালজ্ঞ পুরুষ। উনি জানতেন আমি আসব। ওঁর কাছে সম্পূর্ণ বেদ আর সাঙ্খ্যের কিছু বাছাই করা অংশ অধ্যয়ন করি। শঙ্খমালা তো আমাকে একটা শিশু হিসেবে দেখত। আপনার প্রপিতামহ আমাকে একজন প্রাপ্তবয়স্কর সম্মান দিয়েছিলেন। আমি তাঁর ব্যক্তিত্বে অভিভূত হয়ে মদ, জুয়া, সব ছেড়ে দিই। উনি আমাকে বলেছিলেন একশো বছর পর শঙ্খমালা এই উদ্যানের গাছের নিচে এসে উপস্থিত হবে। তখন যেন আমি তার সাথে দেখা করি এবং তাকে একটা কথা জানাই। বৃদ্ধ বয়সে আমি সব ভুলতে বসেছিলাম। কিন্তু তাঁর দেওয়া নির্দেশগুলো ভুলিনি।

    - শঙ্খমালাকে কী জানাতে বলেছিলেন তিনি?

    - একটা অদ্ভুত বার্তা। “ঘুমোতে শেখো”।

    - এর মানে কী?

    - আমি একটা সাধারণ তোতাপাখি। জ্ঞানী নই। আমি কিছুই বুঝিনি। সেজন্য আমি বার বার আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম শঙ্খমালা কিছু বলে গেছে কিনা। সে নিশ্চয়ই মানেটা বুঝেছিল। সে যদি কথাটার মানে না বুঝত তাহলে আপনাকে জিজ্ঞেস করত।

    - অনামিকা রাতে প্রায় ঘুমোত না। ঘুমের বদলে পাতলা একটা তন্দ্রা ছিল তার। সে বোধহয় আধ-জাগা হয়ে শুনত কেউ রাজপুরীতে প্রবেশ করছে কিনা। কিন্তু জীভারাও, এবার আমাদের কর্তব্য কী? সিন্দুকের পথটা কি এখনো খোলা আছে?

    - দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনার অস্ত্রাগারে সিন্দুকটা এখনো আছে, কিন্তু শঙ্খমালাদের প্রাসাদ বহু আগেই বিনষ্ট হয়েছিল। সেই সঙ্গে পথটা রুদ্ধ হয়ে গেছে। অন্তত চল্লিশ বছর আমি সেই পথে পাতালে যেতে পারিনি।

    - শঙ্খমালার কী হয়েছিল?

    - সেটাই বলছি। শুনুন।


    “ঘুমোতে শেখো”। এই বার্তাটা আমি শঙ্খমালাকে দুবার দিয়েছিলাম। প্রথমবার দিই যখন আমার বয়স পাঁচ। শঙ্খমালার দাদু সবে মারা গিয়েছেন এবং সে শোকসন্তপ্ত ছিল। সে আমাকে একটা আশ্চর্য উত্তর দেয় – জীভা তুমি এই কথাটা আমাকে ভবিষ্যতেও বলেছিলে।

    একশো বছর পর যখন তাকে এই উদ্যানের গাছের তলায় দেখতে পাই, তখন কথাটার মানে বুঝি।

    একশো বছর আগে শঙ্খমালা আমাকে বলেছিল – তুমি যেখান থেকে এসেছো সেখানে ফিরে যাও। কাকলি আর বাকলিকে চেনো তো? ওদের সঙ্গে নিয়ে আমি তোমাদের দেখতে যাব। কিন্তু এর কিছুদিন পরে শঙ্খমালা নগর থেকে উধাও হয়ে যায়। সে বা তার বন্ধুরা আমাকে কোনোদিন দেখতে আসেনি। আমি তারপরেও অনেকবার সিন্দুকের মধ্যে দিয়ে উপর নিচ করেছি। শঙ্খমালাকে বহু সন্ধান করেও পাইনি। একশো বছর পর যখন শেষবার তাকে এই রাজপুরীতে দেখি, তখন তার চুলে সোনার কাঁটা। বয়স একটু কমে গিয়েছিল। আর নাম হয়েছিল অনামিকা।

    - ব্যাস্‌, এই তোমার গল্প? শঙ্খমালা আর কিছু বলেনি তোমায়?

    - না। মনে হয় সে ভেবেছিল আমার স্মৃতির উপর ভরসা না করাই ভালো। আপনার প্রপিতামহও আমার উপর ভরসা করতে পারেননি। তাই আমাকে দিয়ে বার্তাটা দু-জায়গায় পাঠিয়েছিলেন।

    শূর অর্ধ দণ্ড নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন – ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটে তা বুঝতে পেরেছি। অনামিকার বয়স থেকে আমার অনুমান হয় শঙ্খমালা যখন সোনার কাঁটা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আসে তখন আপনার বয়স ছিল তিন কি চার। আপনি যখন প্রথমবার সিন্দুকের পথে এখানে আসেন তার কিছুদিন আগেই শঙ্খমালা ভবিষ্যত থেকে ঘুরে এসেছে। সেখানে আপনার সঙ্গে তার দেখাও হয়। তারপর আপনার বয়স যখন পাঁচ তখন শঙ্খমালার দাদু মারা যান এবং সে কোথাও গিয়ে আত্মগোপন করে।

    - হুঁ, হুঁ।

    - প্রশ্ন হল সে কোথায় গিয়েছিল? এবং তাকে আমরা খুঁজব কোথা থেকে? ঘুমোতে শেখো বার্তাটারই বা মানে কী?

    জীভা কোনো জবাব দিচ্ছে না। অনেকক্ষণ উত্তরের অপেক্ষা করার পর তার দিকে তাকিয়ে শূর টের পেলেন সেই একদা দ্যুতাসক্ত বেদ ও সাঙ্খ্যের উচ্ছৃঙ্খল পণ্ডিত নিজের আত্মকথা বলার পর থেকে অকাতরে ঘুমোচ্ছিল।



    গল্প বলতে বলতেই আমি টাইম ট্র্যাভেলের ছবিটাতে আরো কয়েকটা দাগ দিয়েছিলাম। তানিয়া সেটা আমার হাত থেকে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তারপর সে বলল – ম্যাগাজিনে এই ছবিটাও পাঠিয়ে দিও রাইটার। নইলে আমার মতো অনেকের গুলিয়ে যাবে। সোনার কাঁটাটা কেন যে হারিয়ে গেছে সেটা আবার ভুলে গিয়েছিলাম। ছবিটা দেখে ঝালিয়ে নিতে হল।




    সপ্‌না ছবিটা দেখে বলল – হ্যাঁ, এটা মাস্ট্‌। দরকার হলে আরেকটা জুড়ে দিতে পারো। সেটাতে পাঁচতলা বাড়ির মতো গল্পের ক্রস সেকশান দেখাবে। উপরে পৃথিবীর ভারী বায়ুমণ্ডল, তার নীচে শঙ্খ সরোবরের জল আর পৃথিবীর জমি, তারপর একটা স্ফটিকের মোটা লেয়ার, তার নিচে পাতালের পাতলা বায়ুমণ্ডল, আর লাস্টে হংস সরোবরের জল আর পাতালের জমি। লেয়ার আপন লেয়ার। অনেকটা জলের পিউরিফকেশান স্কীমের মতো।

    - দ্যাখো, আমি নিশ্চয়ই ম্যাগাজিনে ছবিগুলো পাঠিয়ে অনুরোধ করব ছাপাবার। তারপর সেটা তাদের মর্জি।

    ছবিটা হাতে হাতে ঘুরতে দিয়ে জীভার মতো ঠোঁট ভেজাবার পর আমি আবার বলতে শুরু করেছিলাম।




    - আর এক কুম্ভ আসব পান করে শূর তারা ভর্তি আকাশের নিচে উদ্যানে বেরিয়ে এলেন। কালো অন্তরীক্ষ থেকে অনামিকা নামের কোনো তারামণ্ডল যেন তাঁকে দেখে হাসছিল। শূর জানতেন উদ্যান ও পুরীর চতুর্দিকে দ্রাক্ষারাজের বিশ্বস্ত প্রহরীদের দিয়ে তৈরী সুরক্ষার গণ্ডি তাঁকে এই শত্রু অধ্যুষিত নগরে জীবিত রেখেছে। অথচ জীবনের অবসানই এখন তাঁর কাম্য। মৃত্যুর পথ অতিক্রম করে হয়তো তিনি অনামিকা নামের তারামণ্ডলের একটা তারা হতে পারতেন। শূর মনে মনে নিজের মৃত্যুকে ডাকলেন।

    যুবক রাজাকে যখন প্রথম বিষের কাঁটাটা এসে বিদ্ধ করল তখন প্রমত্ত শূর মাটিতে বসে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে ভেবে হাসছিলেন। কাঁটাটা এসেছিল পিছন দিক থেকে, এবং সেটা শূরের একটা কানের লতি এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়। শূর উঠে আস্তে আস্তে শঙ্খ সরোবরের দিকে এগোতে শুরু করলেন।

    দ্বিতীয় কাঁটাটা শূরের কাঁধে এসে গেঁথে গেল। শূরের মাথা ঘুরছিল। একটা ছোট্ট আঃ শব্দ করে তিনি ভাবলেন আর কয়েক পা হাঁটলেই অনামিকা এসে তাঁকে নরম আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরবে। তিনি সামনের দিকে দু বাহু বাড়িয়ে স্খলিত পায়ে এগিয়ে চললেন। কানের পাশে একটা মৃদু গুঞ্জন থেকে তিনি অনুমান করলেন দ্রাক্ষারাজের প্রহরীদের কেউ বাইরে থেকে আক্রমণ করেছে। রাজপুরীর একটা অংশের প্রাচীর লঙ্ঘন করে কারা ঢুকতে চেষ্টা করছিল। শূরের জিভ জড়িয়ে যাছে। তাও তিনি বলার চেষ্টা করলেন – আমাকে তোরা ধরতে পারবি না। অনামিকা রয়েছে আমার বুকের মধ্যে।

    তৃতীয় কাঁটাটা লাগল তাঁর হাঁটুতে। চতুর্থটা গলায়। শূরের চোখের সামনে এবার অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কোনদিকে হাঁটছেন। কোথা থেকে একটা তিক্ত রস এসে তাঁর মুখ ভরিয়ে দিল। শূর হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে ঘাসের উপর থুতু ফেলে দিলেন। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে থাকলেন। দূরে, দিগন্তের কাছে কোথাও একটা আলোর বর্তিকা নড়ছিল। শূর ভাবলেন তাঁর যাত্রা শেষ। আর যেটুকু পথ বাকি সেটা তিনি বুকে হেঁটেই চলে যেতে পারবেন।

    আসলে শঙ্খ সরোবর থেকে খানিকটা দূরেই শূরের নিস্পন্দ দেহ থেমে গিয়েছিল, যখন মুক্ত অসি হাতে সৈনিকদের একটা দল পুরীর প্রাচীর ভেদ করে ঢুকে পড়ে।

    উদ্যানের মাঝখানে একটি ছায়ামূর্তি তাদের দেখিয়ে দিচ্ছিল কোথায় শূরের দেহ মাটিতে পড়ে আছে। কিন্তু হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দেহটা আবার চলতে শুরু করল। সৈনিকদের দলটা কী করবে বুঝতে না পেরে আবার ছুটতে যাচ্ছিল। এমন সময় দেখা গেল শূরের দেহটা মাটি থেকে কয়েক হাত উপরে উঠে গেছে। আততায়ীরা সভয়ে দেখল একটা ঘোর কালো রঙের মহাসর্প শূরকে তার বিরাট হাঁয়ের মধ্যে গ্রাস করছে। আরো কয়েকটা তীর ছুটে এল সেদিকে, কিন্তু অন্ধকারে কোনটা কোথায় হারাল বোঝা গেল না। সবার বিস্ফারিত চোখের সামনে আস্তে আস্তে যখন মহান সর্পটি শঙ্খ সরোবরে নেমে যাচ্ছিল তখনও শূরের দেহের অর্ধেকটা তার মুখের বাইরে ঝুলছে।



    পরের দিন সকালে প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে জীভারাওয়ের ঘুম ভেঙেছিল। রাজপুরীতে তখন অচেনা মানুষ গিজ গিজ করছে। উচ্চতম সৌধের চূড়ায় বসে জীভা প্রাসাদের সীমানা জুড়ে সারারাত কীরকম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটা দেখতে পাচ্ছিল। মদের নেশায় সে কিছু জানতে পারেনি। আসবপ্রীতির জন্য নিজেকে দুষতে দুষতে জীভা শূরের সন্ধানে বেরোল। সারাদিন সমস্ত নগর চষে বেড়িয়েও শূরের কোনো সন্ধান নেই। নানারকম কানাঘুষো অবশ্য চলছিল। শূরকে হত্যা করে শঙ্খ সরোবরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। রাজত্ব অধিকার করেছে তার পাঁচজন বন্ধুস্থানীয় রাজপুরুষ। মহামাত্য দ্রাক্ষারাজ পাশের রাজ্যে একটি সেনার দল নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি রাজদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য এদিক ওদিক থেকে আরো কয়েকটি বন্ধু রাজত্বের সৈন্য ধার করে একটি বৃহৎ বাহিনী নিয়ে রাজ্য অবরোধ করতে আসছেন।

    এর পরের দিনগুলোতে জীভাকে নগরের মানুষ চিনে গিয়েছিল ক্ষ্যাপা জীভা বলে। আচমকা কোনো আসবের আসরে উদয় হয়ে সে সবাইকে সাবধান করত – মদ খেও না। নইলে একদিন আমার মতো পস্তাবে।

    - বেঁচে থাকলে তো পস্তাব। যা যুদ্ধ লেগেছে। জীভাকে বলত সবাই।

    যুদ্ধে কত লোক যে মরছিল, তার ঠিক নেই। একদিন জীভাকেও আর পাওয়া গেল না। কেউ দেখেনি কোথায় তার দেহ পড়েছিল। কাক আর শকুনরা বলাবলি করত – জীভা পালাল কোথায়? ব্যাটা স্বার্থপর। জন্মালে তো মরতে হবে। আমাদের একটা ভোজ দিয়ে যেতে পারল না?

    এইভাবেই শূরের রাজধানীতে শূর আর অনামিকার কাহিনী শেষ হয়েছিল। মন্ত্রী দ্রাক্ষারাজ দু-মাস লড়ে যুদ্ধটা জেতেন। কিন্তু সিংহাসনে বসবে কে? কোনো যোগ্য উত্তরাধিকারী না পেয়ে দ্রাক্ষারাজ রাজ্যটাকে তিনভাগ করে তিনটে দেশকে দিয়ে দেন। শূরের রাজ্য মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার পর শূর আর অনামিকার কথাও আর মনে রাখেনি কেউ। যে গাছটার তলায় তাদের দেখা হয়েছিল সেই গাছটা শুধু তাদের বিবাহের সাক্ষী হিসেবে রয়ে যায়।

    কিন্তু গাছেরা তো সাপেদের চেয়েও মূক। তারা কি কোনোদিন ইতিহাসের গল্প কাউকে বলে?




    আমি আবার একটু দম নেওয়ার জন্য থেমেছিলাম। লেডি তানিয়া বললেন – অনামিকার তো বেঁচে থাকার কথা ছিল। এদিকে তুমি দুজনকেই মেরে গল্প শেষ করে দিয়েছ। তোমার প্রমিসের কী হবে?

    - এটা অরিজিনাল এন্ডিং। সেটা দেখিয়ে রাখলাম আর কি, যদি তোমরা মত পালটাও। এবার নতুন এন্ডিংটা আসবে। উপসংহার। খাবারের পরের আইসক্রীমের মতো।

    পম্পা বলল – এই শেষটা আমার মন্দ লাগেনি। তাও অন্যটা কেমন শুনতে চাই।

    সপ্‌না বলল – গল্পের শেষে রাজকন্যা ডেড, রাজপুত্র ডেড, একটা হীরামন তোতা নিখোঁজ, এমনকি রাজত্বটা ছারখার হয়ে গেছে। ইয়ারকি নাকি? এরকমভাবে শেষ করলে লোকেরা প্যাঁদাতে আসবে।




    – তাহলে উপসংহারটা শোনো। তিনটে মেয়েকে বললাম আমি। - মনে করো তার প্রথম দৃশ্য। শূরের ঘুম ভাঙলে তিনি নিজেকে কোনো অচিন দেশের ঠাণ্ডা তুষারের গুহার মধ্যে আবিষ্কার করলেন। তাঁকে একটা পিতলের ছোট পালঙ্কে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। পাশে কাঠের আসবাবের উপর কয়েকটা ওষুধের পাত্র। তাঁর গায়ে মেষচর্মের পোষাক। শূর পাথরের মেঝেতে পা দিয়ে বুঝতে পারলেন তিনি কোনো পাহাড়ের চূড়ার কাছে চলে এসেছেন।

    একটু পরে গুহার অভ্যন্তরের কক্ষ থেকে যে দুজন এসে ঢুকল তাদের দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন শূর। - কাকলি, বাকলি! তোমরা এখানে থাকো? তাহলে কি আমি আবার অতীতে চলে এসেছি?

    কাকলি আর বাকলি শূরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল – ধুর, তুমি তোমার সময়েই আছো। খুব ভালো লাগছে তোমাকে সুস্থ দেখে। ওষুধগুলো কাজ করেছে তার মানে।

    ধুর বলল – কিন্তু তোমরা কীভাবে এই ভবিষ্যতে চলে এলে? আবার কি একটা সোনার কাঁটা পেয়েছিলে? শঙ্খমালাও আছে তো তোমাদের সঙ্গে?

    কাকলি বাকলি ধুরের হাত ধরে বলল – সব প্রশ্নের উত্তর পাবে। এসো আমাদের সঙ্গে।

    গুহার ভিতরে একটার পর একটা কক্ষ পেরিয়ে তারা গিয়ে হাজির হল একটা মণ্ডপের মতো খোলা জায়গায়। উপর থেকে সূর্যের আলো আসছে। খোলা জায়গাটার মাঝখানে বেদীর উঁচু পাথরের উপর একটা বিরাট স্ফটিকের খণ্ড রাখা। ধুর দেখল তার মাঝখানে একটি মহাসর্প কুণ্ডলী হয়ে নিদ্রিত।

    - কে এই মহাসর্প? জিজ্ঞেস করল ধুর।

    - কাছে গিয়ে দেখো। বলল কাকলি, বাকলি।

    ধুর গিয়ে দেখল মহাসর্পের পাশে স্ফটিকের স্তম্ভের ভিতর শোয়ানো আছে একটা সাড়ে তিন হাতের ঝকঝকে উড়ু লৌহের তলোয়ার।

    ধুরের চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তে থাকল স্ফটিকের উপর। কাকলি, বাকলি বলল – মহাসর্পের নিদ্রা হল স্বপ্নহীন। তার মধ্যে নিঃশ্বাস নেই, স্পন্দন নেই, হৃদয়ের গতি নেই। সেই নিদ্রা হল স্বেচ্ছামৃত্যুর একটা রূপ। এর মধ্যে দেহের লয় হয় না। শরীরে জরা আসে না। তোমাকে আমরা জানাইনি, পাতালের প্রাণীরা হল অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক মহাসর্প। আমরা যখন ইচ্ছে একটা রূপ থেকে অন্য রূপে গমন করতে পারি। শতাধিক বৎসর অতিক্রম করার এই একটাই উপায় ছিল আমাদের কাছে। আমরা আমাদের পরিবার, প্রিয়জন, ও আত্মীয়দের ত্যাগ করে মহাসর্পের রূপ নিয়েছিলাম, এবং মৃত্যুর চেয়ে গভীর ঘুমে তিনজনে ঘুমিয়েছি এই এক শতাব্দীর ব্যবধান অতিক্রম করে তোমার কাছে আসার জন্য।

    ধুরের অশ্রুর ফোঁটাগুলো ধারায় পরিণত হচ্ছিল। সে বলল – তোমরা জাগলে কীভাবে?

    কাকলি, বাকলি বলল – আমাদের শয্যার নিচে যন্ত্র লাগানো ছিল। একশো বছর হয়ে যাওয়ার পর সেই যন্ত্র আমাদের স্ফটিকের আবরণগুলিকে গরম করতে শুরু করে। দেহের উত্তাপ একটা জায়গায় পৌঁছোলে প্রথমে স্বপ্ন, তারপর হৃদয়ের গতি এবং শেষে নিঃশ্বাস ফিরে আসে। তখন নিদ্রাভঙ্গ হয়।

    - তাহলে শঙ্খমালার নিদ্রাভঙ্গ হল না কেন? আশঙ্কিত হয়ে প্রশ্ন করল ধুর।

    - কারণ তার শয্যায় কোনো যন্ত্র লাগানো নেই। সে বলেছিল তুমি না আসা পর্যন্ত যেন তার নিদ্রাভঙ্গ না করানো হয়। শঙ্খমালা বহুদিন তোমাকে তার আসল রূপের কথা জানায়নি। যখন সে বুঝতে পারে তুমি জেনে গেছো সে সাপ হয়ে তোমার শত্রু বধ করেছিল, তখন সে ঠিক করে তোমাকে সর্পের সঙ্গে বিবাহের বন্ধন থেকে মুক্তি দেবে। একমাত্র যদি সর্প রূপে তাকে গ্রহণ করতে পারো তবেই তাকে জাগাব আমরা।

    - আমি নিজেই সর্প হতে চাই। মানুষ হয়ে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।

    - আচ্ছা সে দেখা যাবে। এখন বাইরের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করো। আমরা শঙ্খমালাকে জাগাব।

    - সেটা আমার সামনেই করো, কাকলি, বাকলি। আমি এক্ষুণি তাকে জাগ্রত দেখতে চাই।

    - আঃ, তুমি এত অবুঝ কেন ধুর? জাগলে সে মানুষ রূপ নেবে। তখন তোমার কাছে নিয়ে যাওয়ার আগে একটা ভালো পোষাক পরাতে হবে তো?


    তানিয়া বলল – ও! এইজন্য বলা হয়েছিল ঘুমোতে শেখো!

    আমি বললাম – একশো বছরের নিদ্রা একটা হেঁজি পেঁজি ব্যাপার নয়। সেটার জন্য প্র্যাকটিস লাগে। যোগাভ্যাস করতে হয়। তিন বন্ধু মিলে সেটা করছিল। কাকলি, বাকলি মোটেও বোকা নয়। সর্প বিজ্ঞানের ধুরন্ধর পণ্ডিত। তাদের সাহায্য ছাড়া এটা সম্ভব হত না।

    সপ্‌না বলল – একটা গোঁজামিল এখনো আছে। শঙ্খমালা তো ধুরকে পেয়ে যাবে। কাকলি, বাকলি কেন নিজের ফ্যামিলি ছেড়ে এখানে এসে হাজির হল? তাদের মোটিভ কী?

    আমি বললাম – গুড কোয়েশ্চেন। উত্তরের একটা আভাস এক্ষুণি পাবে। তবে সম্পূর্ণ উত্তর যদি থাকে তাহলে সেটা যাবে পরের গল্পে।

    - এই সাপ ব্যাঙের গল্পও সিরিয়ালাইজ্‌ড্‌ করে দিবি নাকি? পম্পা শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করল।

    হে-হে-হে করে একটা হাসি দিয়ে বললাম – ভবিষ্যত কে দেখতে পারে? যাহোক শোনো, এসব ঘটনার অনেক পরে কাকলি-বাকলি শঙ্খ সাগর থেকে একটা সোনার কাঁটা ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিল। অনেকটা মাটি থেকে পেট্রলিয়াম বের করার মতো। সেটা ব্যবহার করে তারা ভূরি ভূরি ম্যাজিক দেখায়।

    সপ্‌না বলল - কিন্তু সে সব তো পরে হবে। একশো বছর আগে তারা সব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিল কেন?

    – বুঝলে না? কারণ ভবিষ্যতের কাকলি-বাকলি অতীতের কাকলি-বাকলিকে টাইম ট্র্যাভেল করে সেটা বলে দিয়ে এসেছিল।

    এটা শোনার পর তানিয়া হাসতে লাগল, সপ্‌না মাথা চাপড়াতে লাগল, আর পম্পা তাদের লুকিয়ে আমাকে একটা সাপের ফণা দেখিয়ে বলল – একটা ঋতুওয়ালী সাপ চাই তোর? কামড়াবে কিন্তু।




    পরে আমি বললাম - ধুর গুহার বাইরের কক্ষে এসে অপেক্ষা করছিল। সেখানে একটা কাঠের জামবাটিতে রাখা আখরোট আর বেদানা থেকে সে একটু আধটু তুলে মুখে দিচ্ছে। এমন সময় গুহার মুখটা অন্ধকার হয়ে এল। অতিকায় একজোড়া ডানা ঝাপটে একটা পাখি ঢুকছে। ধুরের মুখটা হাঁ হয়ে গেল তাকে দেখে।

    - পঞ্চভূতদা আপনি বেঁচে আছেন!

    ধুরকে দেখে অতিশয় হর্ষিত হয়ে পঞ্চভূত প্যাঁচা বলল - কাকলি আর বাকলির কৃপায় কালই উঠেছি বিছানা ছেড়ে। আপনিও উঠে পড়েছেন দেখে খুব আনন্দিত হলাম। কাল থেকে অপেক্ষা করছি কখন একসঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে। সেদিন যে নামগুলো বলা হয়নি সেগুলো তাহলে...?

    - মরুক তারা। আমার কোনো ইচ্ছে নেই ওই বদের রাজ্যে ফিরে যাওয়ার। তবে জীভারাওয়ের খবরটা পেলে ভালো হয়। দেশটা কি খুব দূর এখান থেকে?

    - দেশটা কাছে নয়। যদিও পাতাল দিয়ে মহাসর্পেরা অল্প সময়েই পৌঁছোতে পারে। জীভাকে নিয়ে বেশি চিন্তা করবেন না। সে অসৎ সংসর্গে অতীব অভ্যস্ত। সেটাই তার বেশি পছন্দ।

    ধুর ভাবল কথাটা হয়তো সর্বৈব মিথ্যে নয়। সে বলল - আচ্ছা আপনাকে বাঁচাল কে? সেদিন তো গাছ থেকে কাঁটাবিদ্ধ হয়ে ডিগবাজি খেয়ে পড়লেন। তারপর কেউ আপনাকে সবার অলক্ষ্যে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল? না কি অভিনয় করছিলেন?

    পঞ্চভূত তড়বড় করে বলল - সেটা একটা ঘোরতর রহস্য। আপনাকে তো কাকলি, বাকলি মহাসর্প সেজে পাহারা দিচ্ছিল। কিন্তু আমার উপরে কে নজর রেখেছিল সেটা কেউ জানে না। যে বা যারা আমাকে তুলে নিয়েছিল, তারা আমার মুমূর্ষু দেহটাকে পাতাটাতা দিয়ে মুড়ে একটা ভেটের মোড়ক বানায়। যেমন উৎসবে লোকেরা কুটুমবাড়িতে মোদক বা ফল ভেট পাঠাবার জন্য করে, সেরকম।

    - ভেটের মোড়ক?

    - আরে হ্যাঁ মশাই, হ্যাঁ। এমনকি উপরে লেখা ছিল দেশ ভ্রমণের শুভেচ্ছা সহ। কিন্তু কোনো নাম ছিল না। পাতার উপর রেশমের কাপড় আর পাটের দড়ি দিয়ে ভালো করে বাঁধা। সবার উপরে সুরক্ষার জন্য লাক্ষা দিয়ে একটা মুদ্রা অঙ্কিত। নিঃশ্বাসের জন্য আমার মুখে একটা নল লাগানো ছিল। পাখনার ভিতর ছিল ওষুধের পুরিয়া আর পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সেবনের বিধি লেখা এক খণ্ড ভূর্জ। সেই ওষুধটা তো আপনাকেও দেওয়া হয়েছে।

    - এটা কী ধরণের পরিহাস?

    - সেটাই তো বলছি। একেবারে ভুতুড়ে ব্যাপার মশাই। একমাত্র ভূতেরা এরকম আজগুবী কাজ করে। ভেটটা কাহারদের মাল সরবরাহের দোকান মারফৎ পাঠিয়ে দিয়েছে। গলার ডানদিক থেকে বিষের কাঁটাটা বের করে সেটাকে একটা সোনার নলের মধ্যে পুরেছে এই নির্বোধ প্রেত। তারপর সেটাকে (ছি-ছি) আমার ইয়েতে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

    - ইয়েতে?

    - ওই আর কি। প্রাতঃকৃত্যের সময় বেরিয়ে আসে।

    - সোনার নলের ভিতর কাঁটাটা ছিল? কই দেখি সেটা?

    পঞ্চভূত কোথা থেকে একটা নল আর কাঁটা নিয়ে এসে ধুরের হাতে দিল। ধুর দেখল শুধু নল নয় কাঁটাটাও সোনার। কয়েকটা খুব ছোট্ট আকারের মুক্তো আর হীরের কুঁচি বসানো আছে তাতে। চেষ্টা করলে দেখা যায়। ধুর বলল – পঞ্চভূতদা, সেদিন কিন্তু আমি স্পষ্ট একটা লোহার কাঁটা দেখেছিলাম।

    পঞ্চু প্যাঁচা দু-চারবার বৃত্তের আকারে চোখের মণি ঘুরিয়ে খবরটা হজম করার পর বলল – তাহলে বোধহয় আমার ইয়েতে ঢুকে সোনা হয়ে গেছে।

    ভিতর থেকে কাকলি, বাকলি ডাকল। - চলে এসো ধুর! চলে এসো!



    ভিতরের কক্ষে অনামিকা ঠিক আগের মতো সোনার অলঙ্কারগুলো পরে বসেছিল। ধুর দেখল আরেকটু যেন বয়স হয়েছে তার। আরেকটু শান্ত চাহনি। আর সেই শান্ত চোখের মণির ভিতরে যেন একশো বছর ধরে জমে থাকা জ্যোৎস্নার আলো। দূর রাতের আকাশের মতো অনামিকার সামনে দাঁড়িয়ে ধুর ভাবল সে এই রহস্যময়ীর যোগ্য নয়।

    - কালই তোমাকে দেখেছি শঙ্খমালার পোষাকে। আজ তোমাকে দেখছি একটা অন্য রূপে। ধুর তোতলাতে তোতলাতে বলল।

    অনামিকা বলল - এর মধ্যে আমার একটা জীবন কেটে গেছে। তোমার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। তারপর অনেকগুলো দিন গিয়েছে শুধু আশঙ্কায় আর অপেক্ষায়। জানো, এখনো আমার বিশ্বাস হচ্ছে না তোমাকে আবার দেখছি। এটা কি একটা স্বপ্ন?

    ধুর এগিয়ে গিয়ে অনামিকার হাত স্পর্শ করে বলল – আমি তোমার মতো সাপ হতে চাই। তুমি আমাকে সেই রূপান্তরের ক্ষমতা দাও।

    কাকলি, বাকলি আর অনামিকা পরস্পরের দিকে চাইল। তারপর সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

    - এতে হাসির কী আছে?

    কাকলি-বাকলি বলল – সাপেরা কথা বলতে পারে না।

    - সে আমি জানি।



    অনামিকা বলল – ধুর, তুমি যদি মানুষ হয়ে থাকতে একেবারে অস্বীকার করো তাহলে তোমাকে ব্যাং হতে হবে। আমরা তোমাকে সাপ হতে দেব না।

    - কেন, অনামিকা? আমার কী দোষ?

    - তোমার দোষ হল এই যে তুমি ভীষণ মিথ্যুক। জানো শূরের মুখ দেখে আমি কীরকম বিস্ময়ের ধাক্কা খেয়েছিলাম? মাথা ঘুরে গিয়েছিল আমার।

    ধুর একটু কাষ্ঠহাসি হেসে বলল – আমাকে ক্ষ-ক্ষমা করে দাও অনামিকা। আমি নির্বোধ।

    - তোমার ক্ষমা নেই। তোমার শাস্তি হল মানুষ হয়ে সারাক্ষণ বাজে গাঁজাখুরী শোনানো। সেগুলো শুনব বলেই আমরা একশো বছর ধরে অপেক্ষা করেছি।

    - অনামিকা তোমরা কি দেখেছো, পঞ্চুদার পেট থেকে একটা শঙ্খ স্রোতের হাল বেরিয়েছে?

    - ব্যাস্‌, বলতে না বলতে শুরু হয়ে গেল তোমার গুল?

    ধুর কোনো উত্তর না দিয়ে একটু একটু করে মুঠো খুলতে শুরু করল। সোনার হালটা রয়েছে যেখানে।




    হালটা দেখে অনামিকা গালে হাত দিয়ে বলল – এ তো অসম্ভব ব্যাপার! এ জিনিস কী করে এল পঞ্চুদার কাছে?

    - শুভেচ্ছা সহ কেউ তোমাদের উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে। সত্যি কথা বলব? আমার ধারণা এটাই আসল উপহার, পঞ্চুদাকে শুধু ব্যবহার করা হয়েছে একটা পাখ-পাখালির খাপ হিসেবে। যাতে আসার পথে সরু কাঁটাটা ভেঙে টেঙে না যায়। অবশ্য তাঁকে বোলো না সেটা। শুনে হয়তো দুঃখ পাবেন।

    - কিন্তু কে পাঠাল এই উপহার?

    ধুর বলল – এই সোনার কাঁটাটা আগেরটার চেয়ে অনেক উন্নত আর সরু। দেখতে পাচ্ছো এর মুক্তোগুলি যেন কুঁচির চেয়েও ক্ষুদ্র? এটা নিশ্চয় সুদূর কোনো ভবিষ্যতে বানিয়েছিল কেউ। হয়তো আমাদের পরিচিত কেউ ভবিষ্যতে গিয়ে এটা পেয়েছিল। এখন সে তার নাম জানাতে চায় না। কিন্তু কাঁটাটা যেভাবে পাঠানো হয়েছে তাতে মনে হয় পঞ্চুদার উপর তার খুব একটা শ্রদ্ধা ছিল না।



    কাকলি বাকলি বলল - সে যাই হোক, উপহারটা কী দারুণ হয়েছে বুঝতে পারছো? আমরা সবাই এক সঙ্গে একই সময়ে আছি তো? এই হালটা তাহলে আর কখনো হারাবে না। সবাই মিলে যেখানে ইচ্ছে যাব। আবার হালটাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসব এখানে।

    - আমি শুধু একটা জায়গাতেই বার বার যেতে চাই। বলল ধুর।

    - কোথায়?

    - পাতালের বাজারে। যেখানে আমরা সবাই মিলে বিকেলের আলোয় হেঁটেছিলাম। আর তোমরা সেদিন আমায় একটা ইঁদুর কিনে দিয়েছিলে।

    অনামিকা উৎফুল্ল হয়ে উঠে বলল – হ্যাঁ, সেটা আমারও একটা প্রিয় জায়গা। সেখানেই যাওয়া যাক। কিন্তু মনে রেখো, আমাদের আগের শরীরগুলোও ওখানে থাকবে। আমরা তাদের চিনতে পারব কিন্তু তারা আমাদের না চিনলেই ভালো। তাই আমাদের উচিত ছদ্মবেশে যাওয়া।

    কাকলি বলল – আমি কবুতরওয়ালী সাজব। কবুতর বেচব সেখানে।

    বাকলি বলল – আমি একটা নিষাদের মেয়ে হতে চাই।

    অনামিকা বলল – আমি একটা চোরনী সেজে আমাদের আগের শরীরগুলোকে অনুসরণ করব। তাদের সমস্ত কথা শুনব।

    ধুর বলল – অনামিকা আমি পোষা ব্যাং হয়ে তোমার কাপড়ের মধ্যে জড়িয়ে বসে থাকব। এবং মোটা গলায় গান গাইব।

    কাকলি বাকলি বলল – পঞ্চুদা বেচারা তো ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে। সে ঘুমোক।



    একটু পরে পাতাল লোকের তিনটে মেয়ে দেখতে দেখতে তাদের পছন্দের ছদ্মবেশ ধারণ করল। ততক্ষণে অনামিকার এক ফুঁয়ে ধুরও হয়ে গেছে একটা গোলগাল গালফোলা ব্যাং। তারপর সোনার কাঁটাটা সবাই একসঙ্গে ছুঁতেই তারা অদৃশ্য হয়ে গেল।

    পঞ্চভূত জেগে থাকলে দেখতে পেত যে এর পরক্ষণেই তারা হাসতে হাসতে ফিরে এসেছিল সেখানে। এবং ফিরে এসেই তৎক্ষণাৎ আবার তড়িঘড়ি ছদ্মবেশগুলো পালটে ফেলেছিল। এবার অনামিকা আর ধুর সাজল যক্ষ-যক্ষী। কাকলি আর বাকলি হল কিন্নর-কিন্নরী।

    এইভাবে তারা বার বার নতুন রূপ ধারণ করে নানা ধরণের ও বর্ণের মানুষ-মানুষী, পশু-পাখী, ভূত-প্রেত ও গন্ধর্ব-গন্ধর্বী দিয়ে আস্তে আস্তে পাতালপুরীর সেই পড়ন্ত আলোর বাজারটাকে মনের মতো করে সাজাতে শুরু করল। ফলে সময়ের স্তব্ধ সরোবরের চরকিতে আবদ্ধ এই গল্প আর এক পাও এগোতে পারেনি।

    আর এইভাবেই তাদের মনের মতো করে দিনটাকে সাজাতে সাজাতে অনেক পরে তারা বুঝতে পেরেছিল যে আসলে সেদিন সেই বাজারের প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি পরমাণু, ও প্রতিটি আলোর কণার মধ্যে তারাই ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিল।

    কারণ পৃথিবীর এক একটা দিন এমন দারুণ, যে তার সব কিছুর মধ্যে না থাকার কোনো মানেই হয় না।






    - গল্প শেষ। বললাম আমি।

    আমার সামনে তখন সিনেমার মতো একটা দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে। তিনটে মেয়ে তাদের ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে একজন অন্যজনের গায়ে ঢলে পড়ে হাসছিল। এবং হাসতে হাসতেই কারো কারো চোখ চিক চিক করে উঠছে। আমি আমাদের উদ্দেশ্যহীন একসঙ্গে বেড়ানোর দিনটাকে স্পুফ করতে গিয়ে কিছু একটা বলে ফেলেছি যেটা তাদের স্পর্শ করে দিয়েছিল। কারো চোখে সামান্য জলের আভাস দেখলে আমার নিজেকে সামলানো মুশকিল হয়ে যায়। আমি বললাম – গল্পের মধ্যে কিছু লুজ থ্রেড থাকে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেও রেখে দিই। যদি কিছু পালটাতে হয় তো বোলো। প্লটে অনেক আজগুবী জিনিসও আছে মানছি।

    সপ্‌না বলল – স্পুফ হোক, যাই হোক, শেষটা একেবারে ঠিক হয়েছে জয়। সেটা পালটিও না।

    তানিয়া বলল – আমি একশো পার্সেন্ট একমত। তারপর সে নিজের বন্ধুদের দিকে চেয়ে বলল – এই গল্পটার পর আমাদের সবার কী করা উচিত জানিস?

    পম্পা আর সপ্‌না বলল – কী?

    তানিয়া আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল – রাইটারকে একটা গিফ্‌ট কিনে দেওয়া। বিশেষ করে একটা ইঁদুর যদি পাওয়া যায়।

    হো, হো করে হাসতে হাসতে আমরা সবাই আবার পালিকা বাজারের অলি-গলি দিয়ে চললাম এবং মেয়েরা আমাকে রাহুল দেব বর্মণের তিনটে ক্যাসেটের সেট কিনে দিল। আমাদের বাড়িতে ক্যাসেট প্লেয়ার বলতে টোটোদার ভাঙা ওয়াক্‌ম্যান, যেটা সে সঙ্গে নিয়ে বম্বে চলে গেছে। সুতরাং শুনতে হলে পম্পাদের বাড়িতেই যেতে হবে। তাও আমি আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম, কারণ গল্প শুনিয়ে কখনো আগে এত ভালো উপহার পাইনি।

    এর পর আমরা কনট প্লেসের রাস্তা দিয়ে ইণ্ডিয়া গেটের দিকে হাঁটছিলাম, এবং আমার আর পম্পার ইচ্ছে ছিল রামকিঙ্করের মূর্তিগুলো আরেকবার একসঙ্গে দেখতে দেখতে হাঁটব। আমি বললাম – হনুমান মন্দিরে শিবলিঙ্গ আছে, সেখানে একটু চলো তোমরা আমার সঙ্গে। বেতালের ফুলদুটো চড়িয়ে আসি।

    সপ্‌না বলল – আরে এই দরগাটাতেই চড়িয়ে দাও না।

    আমি বললাম – না, না। কথা দেওয়া আছে শিবের মাথায় দেব আর কিছু কিছু জিনিস মেনে চলব। কথা দিয়েছি যখন সেটা আমায় রাখতে দাও প্লীজ ।

    মেয়েরা খুব বুঝদার সঙ্গীর মতো আমার সঙ্গে হেঁটে মন্দির অবধি গেল এবং ফুলদুটো শিবের জিম্মায় করে দিয়ে আমি ভারমুক্ত হলাম।

    কিন্তু ইণ্ডিয়া গেট অবধি আমাদের যাওয়া হয়নি। আকাশে একটু একটু করে মেঘ জমছিল। পার্লামেন্ট স্ট্রীটে যখন আমরা রামকিঙ্করের মূর্তির কাছাকাছি এসে পড়েছি তখন কড়্‌কড়্‌ করে বাজ পড়তে শুরু করল। তারপর যা একখানা বৃষ্টি শুরু হল তার বর্ণনা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এক একটা মেঘ আইসক্রীমের মতো ভেঙে জলের চাঁই হয়ে নামছিল ঘাড়ের উপর। চোখের সামনে একটা বিরাট কালোজাম গাছ থেকে হাজার হাজার ফল নেমে এল রাস্তায়। মানুষরা দিগ্বিদিকে ছুটে পালাল। আমরা ছুটতে ছুটতে প্যাটেল চওকের পোস্ট অফিসে ঢুকতে গিয়ে দেখি আমাদের আগে এত লোক ঢুকে পড়েছে যে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ভেজা ছাড়া উপায় নেই। মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ, স্কার্ট-ব্লাউজ সব বালতি-চোবা হয়ে গায়ের সঙ্গে লেপটে গেছে। আমি এরকম বাথটব থেকে উঠে আসা তিনটি আকর্ষণীয়া বাথশেবার বডিগার্ড হয়ে তাদের সঙ্গে চলেছি। সবাই এদিক ওদিক থেকে আমাদের হ্যাংলার মতো দেখছে। পম্পা বলল – আর মান ইজ্জত বাঁচাবার কিছু নেই। সব ট্রান্স্‌প্যারেন্ট হয়ে গেছে। তানিয়া বলল – তুই তো তাও হলুদ রং পরেছিস, আমার সবটা সাদা। নিউ দিল্লীতে রাম তেরী গঙ্গা ম্যায়লী হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বাড়ির লোকে দেখে ফেললে ঘরে নেবে না। পম্পা বলল - চল আমরা ভিজতে ভিজতেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মূর্তিগুলো দেখি।

    আমরা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে বাস স্টপ থেকে দশ পা দূরে দাঁড়িয়ে ভিজতে লাগলাম। আমার সর্দির ধাত। একটু পরে হাঁচি শুরু। পম্পা বলল – জয়ের যদি জ্বর হয় তো ওর মা আমায় দুষবে। ভয়ানক নাজুক ছেলে এটা।

    একটা থ্রি হুইলার প্লাস্টিকের পর্দা ফেলে যাচ্ছিল। মেয়েরা আমাকে বাঁচাবার জন্য হই হই করে রাস্তার মাঝখানে পথ আটকে সেটাকে দাঁড় করালো। মীটারের উপরে কুড়ি টাকা একস্ট্রা কবুল করে আমরা সবাই ঘেঁষাঘেঁষি করে বসলাম। আমি জায়গা পেলাম সীটের পাশে দরজার খাঁজটার উপর।

    মেয়েরা যাবে পার্কটাউন অবধি। আমি বললাম – আমাকে তাহলে মল রোডে নামিয়ে দাও। পম্পা আর আমার দুজনেরই ইচ্ছে ছিল তার ঘরে গিয়ে একটু একসঙ্গে সময় কাটাবার। কিন্তু এই দুই বন্ধুর সামনে পম্পা আমাকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যেতে সাহস পেল না। সে বলল – যা বাড়িতে গিয়ে গল্পটা লিখে ফ্যাল। যাওয়ার আগে আমি দেখব।

    মল রোডে এসে তানিয়া হঠাৎ আমার হাতে বুদ্ধের মূর্তিটা ধরিয়ে দিয়ে বলল – রাইটার, এটা তুমি রাখো।

    আঁৎকে উঠে বললাম – না, না। আমি কেন?

    - গডই তোমাকে পাইয়ে দিয়েছেন। যখন তুমি শিবের ফুল শিবকে দেওয়ার প্রমিস ভাঙবে না বলেছিলে তখন আমি আকাশ থেকে একটা সিগনাল পেয়েছিলাম। বুদ্ধ আমাকে বললেন – এই ছেলেটার কাছে আমাকে রাখো। ও আমাকে ফেলবে না।

    - কিন্তু আমাদের বাড়িতে প্রচণ্ড জায়গার অভাব।

    - চিন্তা নেই। এটা টেম্পোরারি ব্যাপার। কিছুদিনের মধ্যে আমি একটা ব্যবস্থা করে তোমার কাছ থেকে নিয়ে যাব। সেটা আমার প্রমিস।

    - তানিয়া আমি বোধহয় এথিইস্ট।

    - বুদ্ধও তাই ছিলেন শুনেছি। এই মুর্তিটাকে কোনো ফুলটুল দিতে হবে না। শুধু মাঝে মাঝে হাই-হ্যালো বোলো।




    বাজারের দিনটা শেষ। মল রোডের ফুটপাথে নেমে আমি শিমলিপুর রোড ধরে হাঁটছি। শার্ট প্রায় শুকিয়ে গেছে। প্যান্ট তখনো বেশ ভিজে। কোলে কাগজে র‍্যাপ করা বুদ্ধমূর্তি। পকেট জুড়ে ক্যাসেট।

    আমার মাথায় বাবলা গাছের পাতা চুঁইয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে জল পড়ছিল। ঠাণ্ডা হাওয়ার এক একটা ঢেউ অশ্বত্থের ডালগুলো ঝাঁকিয়ে জল ঝরাচ্ছে। বর্ষার মরসুম এল। দিল্লীতে মাত্র কয়েকদিনের জন্য আসে এই ঋতু। তখন আসাদের শহর হয়ে যায় একটা ঋতুমতী মহিলার মতো রহস্যের খনি।

    আমি শিমপলিপুর রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ভাবলাম - যাকে এই মাসে আমার ছোঁয়া বারণ।

  • ১ম অংশ | ২য় অংশ | ৩য় অংশ (শেষ)
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)