




রায়সাহেব ও গজল গাওয়ার দিন (ছত্তিশগড় পর্ব ৩)
কিছুদিন ধরে রকের আড্ডা খালি যাচ্ছে। আসলে একটা ঘটনা ঘটেছে। মহরম শেষের হওয়ার ঠিক দু’দিন পরে। তাজুদ্দিন খুন হয়েছে। তাজুদ্দিন কে? কারবালা পাড়ার বড় গুন্ডা। ওর ভাইবোনেরা সব স্কুলের বেড়া টপকে কলেজের মুখ দেখছে। কিন্তু বড় ভাই তাজুদ্দিনের বিদ্যে অঞ্জুমান পাঠশালার আলিফ, বে, তে, সে’র প্রাথমিক পাঠ ছাড়িয়ে এগোয়নি।
তাতে কী হয়েছে? বড়দাদা তো বটে। তাই ওদের ওয়ালিদ সাহেবের (পিতাশ্রী) এন্তেকাল হওয়ার পর ও-ই বাড়ির কর্তা। আম্মিজান ও ভাইবোনের খাওয়াপরার প্রাথমিক ধাক্কাটা ওই সামলিয়েছে। এক ভাই ও দুই বোনের বিয়ে করিয়েছে। কী করে এতসব করল? মানে ওর মাসিক আয়ের উৎস কী?
এমন বেয়াড়া প্রশ্ন করলে খেলব না। এর উত্তর ওর ভাইবোনেরা জানে না, তো আমি কোন ছার! আরে দস্যু রত্নাকরের আয়ের খুঁটিনাটি কি ওর পরিবারের সবাই জানত? নাকি জানতে চেয়েছিল? সাফ বলে দিয়েছিল—আমরা তোমার পাপের ভাগ কেন নেব? তোমার কাজ আমাদের খাইয়ে পরিয়ে রাখা, ব্যস্।
বিশ্বাস হচ্ছে না? ফের রামায়ণ পড়ুন। রামমন্দির নিয়ে গলা ফাটাবেন আর বাল্মীকি মন্দিরের কথা ভাববেন না তা’ হয় নাকি? উপর থেকে একজন সব দেখছেন। কিছু রত্নাকর সব যুগে এবং সব দেশে থাকে।
জনান্তিকে বলে রাখি, বিলাসপুরে মহর্ষি বাল্মীকির মূর্তি আছে, নদীর পাড়ে শনিচরি বাজারের মধ্যে। কেন? উনি যে দলিতদের দেবতা। অনেক দলিত পরিবার নিজেদের পদবি লেখেন বাল্মীকি। আরও বলি, ওমপ্রকাশ বাল্মীকি একজন ভাল লেখক ও বুদ্ধিজীবী। চাকরি করতেন ভারত সরকারের নাবার্ড নামক ব্যাংকে — আসলে রিজার্ভ ব্যাংকের তুতো ভাই। রায়পুর-বিলাসপুরের গ্রামীণ ব্যাংকের গভর্নিং বডিতে কিছুদিন অন্যতম ডায়রেক্টর ছিলেন।
গল্পের রেলগাড়ি বেলাইন হল তো? দাঁড়ান, লাইনে আনছি। তাজুদ্দিন ছিল আমাদের বন্ধু ব্যক্তি। নানারকম বন্ধু হয়। স্কুল কলেজের বন্ধু, পানঠেলার বন্ধু, মদের আড্ডার বন্ধু, খেলার মাঠের বন্ধু। কেউ কেউ বাড়ির বৈঠকখানা অব্দি এন্ট্রি পায়, কেউ অন্দরমহল অব্দি।
তাজুদ্দিন ছিল আমাদের রকে বসে গান শোনানোর বন্ধু। রকও নানারকম। খাওয়াদাওয়ার পর রাত এগারোটা নাগাদ যখন সদর বাজার শুনশান, সব দোকানে তালা ঝুলছে, আলো নিভেছে—তখন বৈজয়ন্ত স্টোর্স নামের কাপড়ের দোকানের বন্ধ দরজার সামনে শান বাঁধানো রকে বসত আমাদের একটা মিনি আড্ডা। সেইসময় দৈবাৎ যদি তাজুদ্দিনের সংগে দেখা হয়ে যায় তাহলে বসে যেত গানের আসর। গায়ক ও, আমরা শ্রোতা।
দৈবাৎ বলছি, কারণ, ওটাই তো তাজুদ্দিনের কাম-ধান্ধার সময়। আমরা দেখলে আওয়াজ দিতাম—ফুর্সৎ মে হো ক্যা? ও মাথা নাড়লে আমরা কোরাসে বলতাম—ধান্দে কা কুছ বাত করোঁ, কুছ পয়সা জোড়ো।
ও হেসে উঠে হাত নেড়ে চলে যেত।
কিন্তু যেদিন খালি থাকত সেদিন রকে পাজামা গুটিয়ে বাবু হয়ে বসে হাত বাড়াতো সিগ্রেটের জন্যে, গাঁজার কল্কে ফাটানোর মত টান দিয়ে সিগ্রেটটা আদ্দেক করে ধোঁয়া ছেড়ে বলত “ক্যা সুনাউঁ?” ওর স্টক বিশাল। বলিউডি সিনেমার গান থেকে গজল এবং ভক্তিগীতি, বিশেষ করে নাৎ ও কাওয়ালি। গলা ছেড়ে গাইত এবং অসম্ভব সুরে।
নির্জন রাতে দু’একজন পথচলতি মানুষ সাইকেল থেকে নেমে পড়ে দাঁড়িয়ে যেত। পুলিশের সেপাই খানিকক্ষণ শুনে নম্রভাবে বলত—রাত দেড়টা বেজে গেছে। এবার আপনারা গা তুলুন, বাড়ি যান।
তাজুদ্দিন ছিল শিয়া সম্প্রদায়ের, মাইনরিটি মুসলিম। ওদের মোহররম সুন্নীদের একদিন আগে হত। তার আগের দিন ওর কাজ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে গান গেয়ে সম্প্রদায়ের লোকজনকে জাগিয়ে রাখা। ওর সঙ্গে শেষ বৈঠক হয়েছিল ওই সদরবাজারের বন্ধ দোকানের রকে বসে। পরের দিন বিকালে ব্যাংক থেকে ফেরার সময় গোলবাজারের সামনে দেখলাম মোহররমের মিছিল। শিয়া সম্প্রদায়ের। তাজুদ্দিন লীড সিংগার। ভৈরবীতে গান ধরেছে—রব উঠি হ্যায় ইয়া হুসেন! ইয়া হুসেন!
আমরা ক’জন হেসে হাত নেড়ে এগিয়ে যাই।
দু’দিন পরে সকালবেলায় কোতোয়ালি থানা থেকে তলব। আমাদের গিয়ে স্টেটমেন্ট দিতে হবে। তাজুদ্দিন খুন হবার ক’দিন আগে রাতের বেলায় আমাদের সঙ্গে রকে বসেছিল। কী কথা হয়েছিল? কোনও দুশমনের উল্লেখ? কী গান? ইসলামী গানে আপনাদের কিসের শখ? শেষে ক’দিন ওই রকে না বসতে পরামর্শ দিল, বলা তো যায় না এরপরের টার্গেট আপনারা কিনা।
আর কে না জানে থানার ওসি’র পরামর্শ মানে আদেশ।
তবে তাজুদ্দিন আমাদের বন্ধু ছিল। সবার মন খারাপ। শুনলাম রেলের বাজারের দখল নিয়ে গ্যাং ওয়ার। এইভাবে মাস খানেক কেটে যাওয়ার পর এসে গেল বর্ষশেষ—৩১শে ডিসেম্বর। সেদিনের বর্ষ বিদায় সমারোহ কোথায় হবে?
নতুন ঠেকের জোগাড় হয়ে গেছে। রায়সাহেব গজানন মাহেশ্বরীর সদ্য তৈরি হওয়া হোটেলে রাত ন’টা থেকে বারোটা।
আরে বলতে ভুলে গেছি এই বছরের শোকের ঘটনা যেমন তাজুদ্দিনের অকালে খুন হওয়া, আবার আনন্দের ঘটনা হল গজানন মাহেশ্বরীর রায়সাহেব খেতাব প্রাপ্তি। তাও শহরের মেয়রের হাত থেকে। সম্বর্ধনা সভা হয়েছিল ওর ইচ্ছে অনুযায়ী মধ্যনগরী দুর্গাপূজা চৌকে।
তাতে মেয়র ছাড়াও জনাকয়েক উকিল, তিনটে স্থানীয় সংবাদপত্রের মালিক (বেশির ভাগ গজাননের লতায় পাতায় আত্মীয়, মাড়োয়ারি বটেক), দু’জন কবি ও দু’জন উর্দূ শায়র উপস্থিত ছিল। শ’খানেক লোক প্যান্ডেলের নীচে হাজির। মহিলাদের সংখ্যা হাতে গোনা, বেশিরভাগ ওর একান্নবর্তী পরিবারের—ভাবি, জিজি, চাচি, মামী ইত্যাদি।
মেয়র মানপত্র পড়ার পরে মাড়োয়ারি সমাজের প্রেসিডেন্ট বললেন—সবাই জানে মাড়োয়ারিরা লক্ষ্মীপুত্র। এরা রাজস্থানের মাড়োয়ার থেকে লোটাকম্বল নিয়ে ভারতের যেখানেই যায় সেখানে নিজেদের ঝান্ডা উঁচু করে, কয়েক বছরের কঠোর পরিশ্রমে ফুলে ফেঁপে ওঠে। আর বলতে হয় এদের সংযুক্ত হিন্দু পরিবারের মজবুত ভিতের কথা।
গজানন মাহেশ্বরীর পরিবারও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ও দেখিয়ে দিল মাড়োয়ারির খালি টাকা নয়, হৃদয়ও আছে। গরীবের জন্যে, বঞ্চিত দলিত মানুষের জন্যে প্রাণ কাঁদে। সমাজসেবক হিসেবে গজাননের নাম এখানকার সবাই জানেন। তবু আমি প্রমাণ হিসেবে লায়ন্স ক্লাব, রোটারি ক্লাব, বিনয় মিত্র মণ্ডল—সবার জারি করা সার্টিফিকেট আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
এই বলে উনি ল্যামিনেট করা কিছু কাগজ উঁচুতে তুলে ধরে পাখার হাওয়া খাওয়ার মত নাড়াতে লাগলেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বাল্ব ফটাস ফটাস জ্বলে উঠল।
আমরা এ ওকে চিমটি কাটি। গজ্জু শেঠ আর এতসব সমাজসেবা! কই, কখনও শুনিনি তো? ওর সামাজিক কাজ বলতে এই চৌকের দুর্গাপুজো কমিটির সভাপতি হওয়া। তবে মুঙ্গেলি শহরে কমলি বাঈজিদের উন্নয়নের জন্য কিছু দানধ্যান করে থাকতে পারে।
সবশেষে মেয়র বললেন-–আজকের এই অনুষ্ঠান ইতিহাসের পাতায় উঠে গেছে। কারণ শ্রী গজানন মাহেশ্বরী স্বাধীন ভারতের প্রথম এবং একমাত্র রায়সাহেব হওয়ার সম্মান অর্জন করে একই সঙ্গে নিজের এবং বিলাসপুর নগরীর নাম সার্থক করেছেন।
উঃ কালীদা গো, কালীদা! আর পারি না।
তারপর ক’দিন চলল আরেক উৎপাত। আমরা গজ্জু বা ক্যা হাল গজ্জু শেঠ বলে ডাকলে ও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অভিমান? জানা গেল, যখন সবার সামনে ওকে রায়সাহেব খেতাব দেয়া হয়েছে, তখন বন্ধুরা কেন গজ্জু বলে ডাকবে?
দু’দিন পরে গজ্জু শেঠ আমাদের সিদ্ধার্থ টকিজে সিনেমা দেখাল। কিন্তু নাইট শোতে কেন? গজ্জু দেখাল খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন। বড় বড় করে লেখা—আঠারো বছরের কমবয়েসিদের যেন সিনেমা হলের ধারেকাছে দেখা না যায়। কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য!
যা হোক, সবাই গেলাম। সিনেমাটার নাম—জংলী জওয়ানি। দেখি বেশিরভাগ দর্শকের বয়েস আঠেরোর কম। সব পত্রিকার বিজ্ঞাপন পড়ে দেখতে এসেছে। তবে রায়সাহেব নিজে আসেনি। এখন এইসব সিনেমা হলে ঢুকলে ওর সম্মানহানি হয়। তাই ও গেছে সেই পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের মুঙ্গেলী শহরের রামলাল সাউয়ের পাড়ায় কমলি বাঈয়ের দাদরা-ঠুংরি শুনতে। ওই সার্টিফিকেট দেখানোর পর কমলির মা ওকে বিশেষ খাতিরদারি যত্নআত্তি করছেন যে!
এসে গেল ৩১ ডিসেম্বরের রাত।
আমরা সবাই, বিবাহিত বা অবিবাহিত, বাড়িতে বলে এসেছি যে ফিরতে দেরি হবে। মহিলারা মুখ বাঁকালেন—বাড়িতে বসে টিভির নানান বর্ষবিদায় দেখে খাওয়াদাওয়া করলে হয় না? ওই গজ্জু শেঠের আড্ডায় গিয়ে খানিক ছাইপাঁশ না গিললেই নয়!
কে শোনে কার কথা! সবাই কথা না বাড়িয়ে মাথায় কান-ঢাকা টুপি পরে পকেটে ওয়ালেট পুরে চটপট ঘরের বাইরে।
সেদিন রায়সাহেব হোটেলে নতুন কোন খদ্দের নেবে না বলেছিল।
গিয়ে দেখি এলাহী কাণ্ড! হোটেল আলোর মালায় সুন্দর করে সাজানো। আবার লাল নীল হলুদ সবুজ রঙিন বেলুন! টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো একটা বড় বোর্ডে লেখা—
“সুস্বাগতম! বর্ষ বরণ মহোৎসব”
নিবেদক—রায়সাহেব গজানন মাহেশ্বরী এবং পরিবার
গেটে দাঁড়িয়ে রায়সাহেব, কিন্তু এ কী পোষাক! কংগ্রেসি নেতাদের নকলে দামি সাদা খাদির চুস্ত পাজামা এবং হাঁটুর নীচে নেমে আসা কুর্তা। মাথায় আবার গান্ধী টুপি, একটু তেরছা করে বসানো। পানঠাসা মুখে হাতজোড় করে সবাইকে বলছে—হেঁ হেঁ! আপকো ভী পতা চল গয়া হ্যায় না? খবরটা আপনিও পেয়ে গেছেন তো? এতক্ষণে গোটা শহর জেনে গেছে।
কী ব্যাপার! কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার ভ্যাবাচাকা ভাব দেখে সুধীর ঠেলা মেরে বলে আগে ভেতরে চল।
ভেতরে গিয়ে দেখি চেয়ার-টেবিল সরিয়ে হলঘরে মেজেতে জাজিম বিছিয়ে একগাদা তাকিয়া রাখা এবং মাঝে মাঝে ছাইদান ও পিকদান। একপাশে বারকোষ ভরে কাবাব ও চিকেন টিক্কা। মাঝখানে বড় গোল থালায় অনেকগুলো নতুন গেলাস ও সুরাসুন্দরী বিরাজমান।
পরিচিত বন্ধুবান্ধব ছাড়া কিছু নতুন চেহারাও আছে। সবাই মুচকি মুচকি হাসছে। খালি আমিই হাবা হয়ে বসে আছি। ব্যাপারটা কী? আজ কি ওর বিবাহবার্ষিকী না জন্মদিন? ছেলেমেয়ে অনেক ছোট। তাহলে? হিসেব মিলছে না।
এমন সময় গজ্জু শেঠ, থুড়ি রায়সাহেব গজানন এল। সবার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে নমস্কার করে বলল—নাউ ইট ইজ অফিসিয়াল। তাই খুলেই বলি। আজ চিফ মিনিস্টারের পিএ ফোন করেছিলেন। মন্ত্রীসভা কা বিস্তার কিয়া জা রহা হ্যায়। আপনাদের এই সেবক রায়সাহেব গজানন এবার মন্ত্রী হচ্ছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই শপথ গ্রহণ। সেদিন আপনাদের সবাইকে রাজধানীতে আসতে হবে। আমার ব্যক্তিগত গেস্ট হিসেবে। যাতায়াতের থাকাখাওয়ার সমস্ত খরচা আমার।
সমবেত হাততালি ও জয়ধ্বনি। রায়সাহাব জিন্দাবাদ।
তারপর সমবেত আড্ডা শুরু হল। জাজিমে বসে। একপাশে একটা টিভি সেট রংবেরঙের অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু সেদিকে কারও মন নেই। সবাইকে পালা করে কিছু না কিছু শোনাতে হবে—হয় গান, নয় জোকস্। বেশিরভাগই আদিরসাত্মক।
যেমন জুনি লাইনের সঞ্জু উকিল শুরু করল-–আপনারা বললে বিশ্বাস করবেন না, তবু বলছি বেনজির ভুট্টো ওনার দেশের প্রধানমন্ত্রী হবার আগে আমাদের শহরেই থাকতেন। হ্যাঁ, জুনি লাইনে আমাদের বাড়ির পাশেই। একবার হল কি—
আমার পালা এলে বললাম—মানুষ কখন বুড়ো হয়? যখন সকাল বেলায় চা খেতে খেতে খবরের কাগজ হাতে বৌমাকে ডেকে বলেঃ শুন রহী হো বহু? ভুট্টো কা ফির সে ফাঁসি হো গয়ী।
শুনছ বউমা, ভুট্টোর নাকি আবার ফাঁসি হয়েছে!
বলামাত্র সমবেত প্রতিবাদ। না না, এ চলবে না। অনেক পুরনো জোক, বাসি হয়ে গেছে।
আমি কী করব? এই বছরটাও তো পুরনো হয়ে গেছে।
ঠিক আছে, নতুন কিছু ভেবে রাখো। দশজনের পর ফের তোমার পালা আসবে।
—রায়সাহেব একটা গান শোনাক না! খালি ঘন ঘন মুজরো শুনতে যায়! আমরা কিছু শুনব না?
গজ্জু রায়সাহেব যেন তৈরি হয়ে ছিল। হাঁটু মুড়ে কানে হাত দিয়ে শুরু করল— বাবুল মোরা, নৈহর বীতা জায়ে!
চড়া স্কেলে ধরেছে। সুরেলা গলা। কিন্তু— কিন্তু রাগ মনে হচ্ছে দরবারি কানাড়া। সায়গল তো ভৈরবীতে গাইতেন। যাই হোক, শুনতে খুব ভাল লাগছে। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনছি। শেষ হলে আমার টিপ্পনীকে পাত্তা না দিয়ে ও বলল—অত রাগটাগ বুঝি না। মাথায় ওই সুরটা ঘুরছিল, গেয়ে দিলাম।
তালিয়াঁ! তালিয়াঁ!
আমি অপ্রস্তুত হয়ে তেলুগু বন্ধু শিবপ্রসাদের দিকে তাকাই। ও হল কুন্দনলাল সায়গলের একলব্য শিষ্য। আগে বলত-–চাকরি করলে প্রত্যেক মাসে দুটো এলপি রেকর্ড কিনব। একটা সায়গলের, অন্যটি কিশোরের। সায়গলেরটা বারবার বাজিয়ে শুনব। কিশোরেরটা হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করব। আমরা ওর খ্যাপামি দেখে হাসতাম।
আমি তাকাতেই ও একটু নীচের থেকে ভৈরবীতে ধরল—বাবুল মোরা। গাইতে গাইতে ওর ভাব এসে গেল। (আসবে না কেন? তিন পেগ হুইস্কি নীট মেরে দিয়েছে যে!)
উঠে দাঁড়িয়ে কীর্তনীয়ার আখর দেয়ার মত মাঝে মাঝে ব্যাখ্যা করত লাগল। প্রথমে গাইল “অংগনা মোর পর্বত ভয়াঁ ঔর ডেহড়ি হয়ী বিদেশ”!
শুনুন সব সাহেবান! কদরদান! আমার একটি মেয়ে আছে। আমার বুকের উপর শুয়ে ঘুমোয়। দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে। একদিন বিয়ে হয়ে শ্বশুরঘর যাবে। সেদিন ওর মন চাইবে না এই ঘর বাবা মা-–সবাইকে ছেড়ে যেতে। ওর খেলার আঙিনা আজ পর্বতের মত উঁচু হয়ে পথ আটকাচ্ছে।
সমবেত শ্রোতা স্তব্ধ। একজন ফোঁপাতে ফোঁপাতে মুখে হাতচাপা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ওনাকে চিনি। একটি বড় ব্যাংকের প্রাক্তন অফিসার। টাকাপয়সা গণ্ডগোলের দায়ে চাকরি খুইয়ে এখন একটি মোটরসাইকেল ডিলারের দোকানে হিসাবরক্ষক।
আবেগের জোয়ার চলে গিয়ে ভাটার টান। আমার চোখ পড়ে নতুন তিন আমন্ত্রিতের দিকে, গায়ে পুলিশের খাকি পোষাক। কাঁধে দুটো স্টার! এরা এখানে কেন? কেমন মনে হয় এরা এসে আদ্দেক আনন্দ মাটি করে দিল। বিরক্তি চেপে রাখতে পারি না।
—রায়সাহেব, আপনি এ শহরের সম্ভ্রান্ত নাগরিক। আপনার হোটেলে কোন দু’নম্বরী কারবার চলে না। গাঁজা, ভাঙ, ড্রাগস, স্মাগলিং কিচ্ছু না। তাহলে তিনজন পুলিশকে এত খাতির করে আমাদের সঙ্গে বসিয়েছেন কেন? এরকমটা কথা ছিল না তো।
—আপনি ভুল বুঝছেন, এঁরা আমার বন্ধু, গুণী ব্যক্তি। সেই সুবাদে এসেছেন। পুলিশের হপ্তা আদায় করতে নয়।
ওদের মধ্যে অল্পবয়েসি পুলিশ বেশ হ্যান্ডসাম দেখতে। সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে একটানে তার খাকি উর্দি খুলে পাশে নামিয়ে রেখে গেঞ্জি গায়ে বসে পড়ে।
—এবার আপত্তি আছে? আপনি চাইলে খাকি প্যান্ট বেল্ট খুলে জাঙ্গিয়া পরে বসে থাকতে রাজি।
সবাই হেসে ফেলে এবং না না করে ওঠে। আমি নিজের ব্যবহারের জন্য লজ্জা পেয়ে বলি—সরি, আমার ভুল হয়েছে।
ও হেসে হার্মোনিয়ামটি টেনে নিয়ে ডান হাতে বেলো করতে শুরু করে। বাঁ-হাত আলতো করে রীডের উপর চলছে। সামান্য ভ্রমরগুঞ্জনের পর গেয়ে ওঠে-–“-–কিসনে তোড়া দিল হমারা ইয়ে কহানী ফির সহী”। আরে, এতো গুলাম আলীর গজল। পুলিশের পেটে এত!
তারপর নিজেই শুরু করে—
তুম অপনী রঞ্জ-ও-গম, অপনী পরেশানি মুঝে দে দো,
কুছ দিন কে লিয়ে, ইয়ে নিগবানী মুঝে দে দো।”
তোমার যত ব্যথা, যত দুঃখ সব আমায় সঁপে দাও। ক’দিনের জন্য তোমার দেখাশুনোর ভার আমায় দিয়ে দাও।
ঘরের হাওয়া পালটে গেছে। পিন পড়লেও আওয়াজ শোনা যাবে। এবার ও অন্তরায় এলঃ
ম্যাঁয় দেখুঁ তো দুনিয়া তুমহে ক্যায়সে সতাতী হ্যায়
দেখি তো কে তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে! তোমার জন্যে গোটা দুনিয়ার মুখোমুখি দাঁড়াতে রাজি।
গান চলতে থাকে। বুকের ভেতর একটা ব্যথা ঘুরপাক খায়। বাস্তব জীবনে কি পারব কারও সমস্ত দুঃখের ভার নিতে? চোখের জল মোছাতে? ওকে আড়াল করে গোটা দুনিয়ার মুখোমুখি হতে? জানি না। কিন্তু এখন গানের দুনিয়ায় আমার পক্ষে সবই সম্ভব।
হঠাৎ চটকা ভাঙে। রায়সাহেব চেঁচাচ্ছে।
“আরে, চল চল । সবাই বাইরে চল। নতুন বছর এসে গেছে। ওকে অভিনন্দন করি সবাই মিলে”।
হ্যাঁ, ঘড়ি বলছে রাত বারোটা। বাইরে আতসবাজির ঝলক, পটকা ফাটার আওয়াজ। সবাই হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়ে কোলাকুলি করি। আমার সায়গলভক্ত বন্ধুটি ট্রাকের হর্ন বাজাতে থাকা ড্রাইভারকে রাস্তায় নামিয়ে এনে কোলাকুলি করছে। এই মুহূর্তে আপনপর ভেদাভেদ নেই। সর্বে সুখিনা ভবন্তু, সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ। সবার ভালো হোক।
একসাথে চেঁচাই-–নয়া সাল মুবারক!
পরের দিন ১লা জানুয়ারি। দেরিতে ঘুম ভেঙেছে। অফিস যেতে হবে।
গিন্নিকে বলি—শুনেছ, আমাদের রায়সাহেব গজ্জু সম্ভবতঃ নগর উন্নয়ন মন্ত্রী হবে।
—তুমিও যেমন! ও যেমন রায়সাহেব হয়েছে, তেমনই মন্ত্রী হবে।
—কী বলতে চাও? পুরো গুল মেরেছে?
—না ঘুঁটে দিয়েছে। সত্যিটা হল-–এখানকার বিধায়ক হবেন মন্ত্রী, তোমার বন্ধুটি হবে তাঁর আপ্ত সহায়ক বা পিএ।
সে ছিল স্বপন দেখার, গজল গাওয়ার দিন। অলস সময়ে রাজাউজির মারার দিন।
হায় রে কবে কেটে গেছে কালিদাসের কাল!
এখন রায়সাহেব গজানন আর তাকে মানপত্র দেয়া মেয়র সবাই উপরে চলে গেছেন। ওর হোটেল এখন ওর ছেলে সামলাচ্ছে। খুব কাজের ছেলে। তবে ওখানে আর বর্ষবরণ হয় না।