• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৭৯ | জুলাই ২০২০ | উপন্যাস
    Share
  • কোথাও জীবন আছে (১২) : শাম্ভবী ঘোষ


    থাটা যেন কি করে পি.এস-এর কানে চলে গিয়েছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওদের দেখতে পেয়ে হতাশভাবে মাথা নাড়লেন, “ওঃ হো! মৃণালিনী, হোয়াই আর য়ু কার্সিং ইন ভার্নাকুলার?”

    মৃণালিনী একটুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে থেকে বলল, “ম্যাম আমার পেনটা পড়ে গিয়েছিল, তাই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।”

    সারা ক্লাসে একটা চাপা হাসি ছড়িয়ে পড়ল। পি.এস আরেকবার মাথা নেড়ে ফের পড়ানো শুরু করলেন। খানিকক্ষণ আলোচনাটা স্থগিত রেখে নোট লিখল ওরা। তারপর উপলা আবার ফিস্‌ফিসিয়ে শুরু করল, “যেমন ধর্‌ কণিষ্ক। ওকে আমি সেই দশ বছর বয়স থেকে ভালবাসি; আমার একজন বেস্ট ফ্রেণ্ড তো। কিন্তু প্রেমে পড়ার ব্যাপারটা – ওটা অনেক পরের ব্যাপার – সেই ক্লাস এইট-নাইনে। আমি যেটা বলতে চাইছি, সেটা হল যে ভালবাসা রান্‌স ডীপার। ওটা লং টার্ম ব্যাপার। য়ু ক্যান ফল ইন অ্যাণ্ড আউট অফ লাভ – আমরা যেটাকে প্রেমে পড়া বলি – কিন্তু কাউকে ভালবাসলে দ্যাট স্টেয়েজ উইথ য়ু।”

    মৃণালিনী এবার অধৈর্য্যভাবে হাত নাড়ে, “আরে এটা আমি জানি। তুই যা বলছিস তাকে বলে ইন্‌ফ্যাচুয়েশান। কিন্তু আমার ব্যাপারটা তা নয়। বললাম না, আমরা সব কথা পরস্পরকে বলি, একে অপরকে এমনভাবে বুঝি যেটা আর কেউ বোঝে না? উই বিলং উইথ ইচ আদার, আই নো ইট।” উপলা হাসিমুখে মৃণালিনীর কাঁধে চাপড় মেরে বলল, “যদি তাই হয়, তাহলে তোর কোনো চাপ নেই। আজ নয় কাল শিল্‌দা ঠিকই বলবে।”

    “কতদিন?”

    “আরে! ইয়ে দিল কা মামলা হ্যায় দোস্ত! এত হুড়ো দিলে চলে না। শিল্‌দা তো বড়, তাই ভাবেও বেশি, তাই হয়তো টাইম নিচ্ছে। দেখবি, কোনো একটা রোম্যান্টিক জায়গা থেকে বেড়িয়ে এসেই সাঁ করে বলে দেবে। তখন আবার তুই হাঁ হয়ে যাবি।”

    *

    আজ আর্ট ক্লাসে ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকতে দিয়েছিল। এই দিনগুলো একটু বিরক্তিকরই মনে হয় নীরার। আর্ট টিচার সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম ডিটেলের দিকে এত বেশি নজর দেন যে কহতব্য নয়। যেন ছবি না এঁকে ফটো তোলার কথা ভাবছেন। যার ইম্‌প্রেশনিস্ট নিসর্গদৃশ্য ভাল লাগে, তার পক্ষে কি এতটা বাড়াবাড়ি নেওয়া সম্ভব? অবশ্য এ সবই হল তুলির উপর ভাল ভাবে নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য। তা, সে নিয়ে ওর যে খুব চিন্তা করবার আছে এমন নয়। ইস্কুলের অন্যান্য বিষয়গুলোতে সাধারণ হলেও, আর্টে সে বরাবর সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে আসছে। আর তো মোটে তিন মাস। ইস্কুল শেষ হয়ে গেলেই সে গভর্ন্‌মেন্ট আর্ট কলেজের ফর্ম তুলবে। অথবা কলাভবন।

    আজকের এই ল্যাণ্ডস্কেপটা আঁকতে গিয়ে থেকে থেকেই মনে-র ছবিগুলোর কথা মাথায় আসছিল। সবকটাই কী অপূর্ব! অবশ্য নীরার প্রিয় হল ওরঁ বাগানের ছবিটা, যাতে পুকুরের উপর দিয়ে সাঁকো চলে গেছে, উইলো গাছের ঝুরি নেমে এসেছে জলের উপর। কাল সারাদিন বসে বসে ওই ছবিগুলোই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখেছে সে। ভাবছিল, কতগুলো বাঁধাতে দিলে কেমন হয়?

    ছবি আঁকতে আঁকতেই আপনমনে হাসছিল নীরা। সত্যি, রুদ্র ছেলেটা খুব ভাল। বিনা বাক্যব্যয়ে দুম্‌ করে অতগুলো ছবি ওর জন্য কিনে ফেলল! নীরা তো কিছুই বলেনি, কিন্তু ও ঠিক খেয়াল করেছিল। অত্রি যে কেন তার বন্ধুকে নিয়ে এত নাচে, এতদিনে বুঝতে পারছে। আসলে রুদ্রর সব দিকে নজর; লোকেদের ভালমন্দটা তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলতে পারে। এদিক থেকে আবার অত্রি বেশ কিছুটা আলাভোলা। মাঝে মাঝে যে কোন জগতে চলে যায়, কে জানে! তখন নীরা কেন, নিজের অস্তিত্বটাই ভুলে যায় বোধহয়। রুদ্র স্পষ্টতই অনেক বেশি সজাগ। তাছাড়া, একদিনের আলাপেই বোঝা যায় যে ছেলেটার অনেক বিষয়ে পড়াশোনা আছে। কিন্তু এমনিতে এমন বিনয়ী, এমনভাবে কথা বলে, যেন তার চাইতে সাদামাটা ছেলে আর হয় না। অবশ্য অত্রি তো শুরুর থেকেই বলে আসছিল যে রুদ্র নাকি খুবই ট্যালেন্টেড, জয়েন্টে খুব হাই র্যা ঙ্ক ছিল – নাহলে আর মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পাবে কোত্থেকে? অত্রির এমনিতে বাড়িয়ে বলা স্বভাব, তাই নীরা অত গা করেনি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রুদ্রর ব্যাপারে অন্ততঃ অত্রি ঠিকই বলেছে। সব মিলিয়ে খুবই ইন্টেলিজেন্ট আর ভাল ছেলে। মিষ্টিও বটে! পরশুদিন নীরার কাছে ধরা পড়ে গিয়ে অপ্রস্তুতের একশেষ হল। ...

    “তুমি আর্ট নিয়ে কত কিছু জানো!” নীরা অবাক হয়ে বলে।

    “আরে ধূর!” রুদ্র মাথা ঝাঁকায়, “আমার জাস্ট ছবি দেখতে ভাল লাগে।”

    “ওসব বলে চাপা দিলে তো চলবে না,” নীরা ধরে-ফেলবার হাসি হাসে, “তুমি টার্নারের নাম করলে। অনেকেই টার্নারকে ইম্‌প্রেশানিস্ট বলে ভুল করে। বিশেষ করে তাঁর শেষদিকের ছবিগুলোকে।”

    রুদ্র কুণ্ঠিতভাবে হেসে বলল, “আসলে এটার পিছনে ছোটবেলার গল্প আছে একটা। ছোটবেলায় আমার বাড়িতে একটা ক্যালেন্ডার ছিল, তাতে বিখ্যাত আর্টিস্টদের আঁকা খুব সুন্দর-সুন্দর সব ছবি দেওয়া ছিল। তখন থেকেই একটা কৌতুহল তৈরি হয়েছিল, তারপর বড় হয়ে ... যাই হোক, অনেক দিন আগের কথা।”

    “তুমিও ছবি আঁকো?”

    “আরে, পাগল নাকি! আমি ছোটবেলায় ‘দ-এর বড় জ্বর’টাও আঁকতে পারতাম না! আর্টে সব সময় গোল্লা। ওই জন্যেই তো দেখতে ভাল লাগে। কী করে কেউ এত সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতে পারে, কে জানে!” খানিকক্ষণ ইতস্ততঃ করে সে বলে, “তবে, আমার গান গাইতে খুব ভাল লাগে।”

    নীরা উৎসাহিতভাবে বলে, “রাইট, রাইট! অত্রি বলছিল তুমি নাকি দারুণ গাও! গতবার য়ুনিভার্সিটির ফেস্ট-এ এমন গিটার বাজিয়েছিলে যে সবাই একেবারে – ”

    রুদ্র দু-হাতে মুখ ঢেকে গোঙানির মতো শব্দ করে বলল, “এই ছেলেটা আমাকে বাঁচতে দেবে না, বুঝলে। একটা ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ফানুসের মতো বড় না করে দিলে শান্তি হয় না ওর।”

    নীরা মিটিমিটি হেসে বলল, “এতদিন আমিও তাই ভাবতাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি এই একটিবার অন্ততঃ অত্রি বাড়িয়ে বলেনি। তুমি সত্যিই খুব ট্যালেন্টেড্‌। তোমাকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে!”

    রুদ্র হা-হা করে হেসে উঠল, “শিওর! আই অ্যাম গ্ল্যাড য়ু ওয়ান্ট টু নো মী। আমার এমনিতেও খুব বেশি বন্ধু নেই লাইফে। অবশ্য, তুমি খুব ব্রাইট অ্যাণ্ড জলি। তোমার নিশ্চয়ই অনেক বন্ধু।”

    নীরা বলল, “আমারও খুব বেশি বন্ধু কেউ নেই। তার মধ্যে অত্রিকে তো তুমি চেনোই।”

    “বাকিরা?”

    “বাকিরা আমার স্কুলের। এরাই আমার বেস্ট ফ্রেণ্ডস।”

    রুদ্রকে হঠাৎ করে কেমন যেন বিষন্ন দেখায়।

    “য়ু আর লাকি। আমার বন্ধু বলতে ওই এক অত্রিই। বাকি সবাই ... জাস্ট পাসিং, য়ু নো।”

    নীরা একটু অবাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকায়। কই, একে দেখে তো একাকীত্বের কথা কিছু টের পাওয়া যায় না! অবশ্য মুখ দেখে একটা মানুষের কতটুকু সত্যিই বা ধরা যায়। বাইরে সে সহজ গলায় বলল, “শুধু অত্রি কেন! এই তো, আমিও তো তোমার বন্ধু। এত ভাল শপিং করালে আমাকে, ভাবা যায়!” রুদ্র নিঃশব্দ হাসল, “থ্যাঙ্কস নীরা, য়ু আর সুইট।” ...

    সাত-পাঁচ ভাবতে গিয়ে ছবিটা কখন যেন আঁকা শেষ হয়ে গিয়েছিল। পারমিতা ম্যাম এসে দেখে বললেন, “ভালই হয়েছে। কিন্তু ডিটেলিংটা আরেকটু মন দিয়ে কর্‌ না বাবা, পরে যত ইচ্ছে ইম্‌প্রেশনিস্টদের নকল করিস।”

    নীরা কাঁচুমাচুভাবে হাসল। মনঃসংযোগ না করলে এরকমই হয়। সকাল থেকে একটার পর একটা আবোল-তাবোল ভেবে যাচ্ছে সে। অবশ্য আজ ঘটনা ঘটেছেও কম নয়। কে জানে, সিক-রুম থেকে তিল্লী বেরিয়েছে কিনা। ওকে নিয়ে একটা চাপা চিন্তা ছিলই। আসলে ওকে তো সবাই ঠাণ্ডা, সুস্থির দেখেই অভ্যস্ত, তাই ব্যাপারটা আরও বেশি গোলমেলে ঠেকছে। কি যে হল মেয়েটার! কোনো এক নতুন ছেলের পাল্লায় পড়ে কোনো গোলমাল পাকালো কিনা, তাই বা কে বলবে! চিন্তিত মুখে ক্লাসরুম থেকে বেরোবার মুখেই হঠাৎ মনে পড়ল, অত্রি কাল ফোন করল না তো! ওর ফিরতে ফিরতে সেই রবিবার। নীরা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলল, “কী যে করিস না অত্রি, জাস্ট কোনো মানে হয় না!”

    *

    “আজ এলিয়টের শেষ পোয়েম। ভাবলেই যে কি আরাম লাগছে, তোমরা ভাবতে পারবে না,” এ.জি. স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, “অনেক ধরণের চ্যালেঞ্জ থাকে টিচারদের; টুয়েল্‌ভ ক্লাসে এলিয়ট পড়ানোর মত আর কিছু আছে বলে আমি জানি না।”

    শিরিন বলল, “ম্যাম, এটা তো ছোট।”

    “ছোট তো বটেই। ছোট বলেই যে সহজ, তা ভাববার কোনো কারণ নেই।”

    এমন সময় তিলোত্তমা ক্লাসে ঢুকল। এ.জি. সদয়ভাবে বললেন, “কাম্‌ ইন, কাম্‌ ইন। তোমার শরীর ভাল ছিল না শুনলাম। এখন ঠিক আছ তো?”

    “ইয়েস ম্যাম।”

    শিরিন আর নীলাঞ্জনা যে একবার আড়চোখে তাকাতাকি করে নিল, সেটা শরণ্যার দৃষ্টি এড়ায়নি।

    তিলোত্তমা অবশ্য কোনোদিকে না তাকিয়ে উপলার পাশে বসে পড়েছে।

    উপলা ফিসফিস করে বলল, “সব ঠিক তো?”

    তিলোত্তমা একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “আই হ্যাভ টু টেল য়ু গাইজ সামথিং। ক্লাস হয়ে গেলে বলব।” উপলা একটু অবাক হলেও, আর কিছু বলল না। এ.জি. ততক্ষণে পড়ানো শুরু করে দিয়েছেন। তাদের সিলেবাসের শেষ কবিতা, নাম ‘Marina’। এ.জি. ধীরে ধীরে আবৃত্তি শুরু করলেনঃ

    What seas what shores what grey rocks and what islands
    What water lapping the bow
    And scent of pine and the woodthrush singing through the fog
    What images return
    O my daughter. …
    … রাজা পেরিক্লিস দিশাহীন হয়ে সমুদ্রে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁর মেয়ে ম্যারিনাকে। কত কাল পরে হঠাৎ তিনি যেন শুনতে পাচ্ছেন, কুয়াশার মধ্যে ভেসে আসছে পাখির গান, পাইনের সুগন্ধ। তবে কি সেই মায়াদ্বীপের কাছে এসে পড়েছেন তিনি, যেখান থেকে ম্যারিনা তাঁকে হাতছানি দিচ্ছে? ক্রমশই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন, তবু গন্তব্য যেন সর্বদাই একটু দূরে, কুয়াশাচ্ছন্ন, অস্পষ্ট, নাগালের সামান্য বাইরে ...

    শরণ্যার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল কতদিন আগেকার সেই চেনা চিত্রকল্প। কুয়াশার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা সেই ছেলে যে তার গন্তব্য, একথা সে তখনও জানত না! কিন্তু এই কবিতা পড়তে গিয়ে প্রত্যেকবারের মতো এবারেও তার মনে হল, লেখাটা কি তারই জন্য অপেক্ষা করে ছিল? না হলে কবি জানলেন কি করে যে তার কুয়াশা-ঘেরা সেই কাঙ্খিত মানুষের অবয়ব সব সময়ই অস্পষ্ট, দূর? তার কাছে পৌঁছাতে গিইয়ে কি তার নৌকাতেও চীড় ধরবে, দাঁড় ভেঙে দু-টুকরো হয়ে যাবে, জীর্ণ হয়ে খসে পড়বে পাল? ...

    ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও শরণ্যা অন্যমনষ্কভাবে বসেইছিল, এমন সময় মৃণালিনী এক ঠেলা দিয়ে বলল, “মরে গেলি নাকি? তিল্লী কী যেন বলবে বলছে, শুনবি না?”

    চটকা ভেঙে শরণ্যা দেখল, কখন যেন সবাই চলে গেছে, শুধু গোল হয়ে বসে আছে উপলা, মৃণালিনী, আর তিলোত্তমা। চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে সেও ওদের সঙ্গে বসল। তিলোত্তমা কোনোরকম ভূমিকা না করেই বলল, “আজকে আমি যে হঠাৎ করে এত ক্ষেপে গেলাম, তার একটা কারণ আছে – ”

    মৃণালিনী ওকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এই শোন, ওই ভেঙীগুলোকে কটা খিস্তি মেরেছিস, বেশ করেছিস। মাঝে মাঝে ওরকম ঝাড় খাওয়ার দরকার হয়। তার জন্যে আবার আমাদের কৈফিয়ৎ দিচ্ছিস কেন?”

    তিলোত্তমা মাথা নাড়ল, “কৈফিয়ৎ নয়। তোদের বলছি, কারণ তোরা আমার বন্ধু। তোরা ... আমার ফ্যামিলির মতো।”

    সবাই একটু হক্‌চকিয়ে গেল। তিলোত্তমার কাছে কেউই এতটা আবেগপূর্ণ কথা আশা করেনি। ও তাদের সব গল্পগুজব, হাসিঠাট্টায় যোগ দিয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু কোথাও যেন একটা ব্যবধান রয়েই যায়। অথচ আজ তার মুখে এই কথাটাকে একেবারেই আতিশয্য মনে হল না তো!

    উপলা বলল, “তুই বল্‌। যা কিছু তোকে বদার করছে, জাস্ট বী আউট উইথ ইট।”

    তিলোত্তমা খানিকক্ষণ চোখ বুজে রইল, যেন মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে নিল। তারপর শনিবার সকাল থেকে যা যা ঘটেছে সমস্তটা এক নিঃশ্বাসে বলে গেল। এমনভাবে বলল, যাতে কোনোভাবেই তার নিজের প্রতিক্রিয়াগুলো, বা আনুষঙ্গিক কাজগুলোকে আড়াল করা না হয়। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ঘটনাটার বর্ণনা না দিলে যে তার শান্তি হবে না, তা সে বুঝতে পেরেছিল।

    সবটা শোনবার পর সকলে খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তিলোত্তমা ওদের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছিল না; জানলার বাইরে দৃষ্টি সরিয়ে রেখেছিল। এর আগে কোনোদিন নিজেকে এতটা একা মনে হয়নি। আসলে যার কোনোদিন কেউ থাকে না, তার মনে একাকীত্ববোধ তৈরিই হয়না বোধহয়। কিন্তু আজ তিলোত্তমা স্পষ্ট বুঝতে পারল, এই একটা বছরে তার মনের ভিতরটা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। জমাটবাঁধা অন্ধকারের মধ্যে কখন যে এতগুলো আলোর রশ্মি ঢুকে পড়েছে, সে টেরও পায়নি! ক’দিন আগেও তিলোত্তমার হারানোর কিছুই ছিল না; কিন্তু এখন সে দূর্বল হয়ে পড়েছে। ... এই ঘটনা শোনবার পর শরণ্যা, মৃণালিনী, নীরা, উপলা যদি তার সঙ্গে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে না চায়, তখন কি হবে? ...

    মৃণালিনী হঠাৎ ফস করে মুখ দিয়ে একরাশ হাওয়া ছেড়ে বলল, “শা-ল্‌-লা! কি অসম্ভব হারামি!”

    “কে?” তিলোত্তমা সাবধানী গলায় জানতে চায়।

    “কে মানে?” উপলা তাজ্জব, “তোর ভাঁটের এক্স-বয়ফ্রেণ্ড রাহুল, আবার কে! শালা এত বড় শয়তান যে তোরই বাড়ির গলিতে দাঁড়িয়ে তোরই চোখের সামনে জানোয়ারগিরি করছিল, তারপর আবার তোকেই ফোন করে – ”

    “উফ্‌ফ্‌, হাতের কাছে পেলে না, শাবল দিয়ে কুপোতাম, তারপর মাথা কেটে ছাল ছাড়িয়ে খুলি হাতে ধরিয়ে দিতাম! তারপর লাশটাকে ওই তেঁতুলগাছটায় লট্‌কে দিতাম! তারপর সর্‌খেলকে দিয়ে বডিটার উপর টার্গেট প্র্যাকটিস করাতাম!” মৃণালিনী ঝড়ের বেগে হাতের মুঠো খোলা-বন্ধ করতে থাকে।

    তিলোত্তমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল একটা। শরণ্যা এতক্ষণ গালে হাত দিয়ে কি যেন ভাবছিল। তিলোত্তমা তাকাতেই বলে উঠল, “আচ্ছা, এই যে লোকটা, কী যেন নাম বললি?”

    “ধৃতিমান।”

    “সারনেম?”

    “রায়চৌধুরী।”

    “খুব লম্বা কী? ছ’ফুট ছাড়িয়ে? কোঁকড়া চুল?”

    তিলোত্তমা অবাকভাবে বলল, “তুই কি করে জানলি?”

    শরণ্যা সে কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “পি.এইচ.ডি করছে বললি না? কোন য়ুনিভার্সিটি জানিস?”

    “ক্যালকাটা।”

    “সাবজেক্ট জানিস? হিস্ট্রি কী?”

    তিলোত্তমার বুক ঢিপঢিপ করছিল। কোনো কথা না বলে মাথা নাড়ল শুধু।

    “ভাইবোন আছে কিনা জানিস?”

    “ভাই আছে একজন, নাম হল – ”

    “ঋদ্ধিমান, তাই তো?” শরণ্যা খিলখিল করে হাসতে শুরু করল হঠাৎ। উপলাও পরক্ষণেই ‘ওঃ!’ বলে লাফিয়ে উঠল। একমাত্র মৃণালিনী কিছুই না বুঝে বোকার মতো বলল, “কেসটা কী?”

    তিলোত্তমা প্রায় দম বন্ধ করে বসে ছিল। সেই অবস্থাতেই কোনোমতে বলল, “তুই – তুই ওকে চিনিস?”

    “সরাসরি না চিনলেও, ওর ভাইকে চিনি,” শরণ্যা হাসতে হাসতে বলে, “ঋদ্ধিমানদা হল রঙ্গীতদার ছোটবেলার বন্ধু। আগে রঙ্গীতদার সঙ্গেই শান্তিনিকেতনে পড়ত, ক্লাস নাইনে আবার কলকাতা চলে এসেছিল। পল্‌কে জিজ্ঞেস কর না, আমি ক’দিন আগেই ওকে পুরো ফিরিস্তি দিয়েছি। ওদের বাড়িও গিয়েছি দু-একবার, কাকিমার সঙ্গে ভালই আলাপ আছে। ধৃতিদাদা অবশ্য বাড়ি ছিল না তখন।”

    “ওরা ভাল লোক?”

    “ভাল মানে! ওদের ফ্যামিলি যেমন এডুকেটেড তেমনিই মানুষগুলো অসাধারণ। কাকিমা তো নামকরা আর্কিওলজিস্ট একজন। কাকু নিউরোসার্জেন ছিলেন; খুব অল্প বয়সে কার-আক্সিডেন্টে মারা যান। ঋদ্ধিমানদাকে তো আমি খুব ভাল করেই চিনি, হী ইজ দ্য সুইটেস্ট। ওর মতো ভালমানুষ অথচ ইন্টেলিজেন্ট ছেলে খুব কম দেখা যায়। আর ধৃতিদাদা! বাপ্‌রে বাপ।”

    মৃণালিনী হাঁ করে শরণ্যার কথা গিলছিল, এবার প্রায় ঘাড়ের উপর পড়ে বলল, “মানে?”

    “মানে, ওই সিনেমাতে দেখায় না, যে হিরো সে সবকিছুতেই ফার্স্ট? এ হল সেইরকম। পড়াশোনায় ঋদ্ধিমানদাও ভাল, কিন্তু ধৃতিদাদা বোধহয় জীবনে কোনোদিন কোনো পরীক্ষায় ফার্স্ট ছাড়া সেকেণ্ড হয়নি। স্পোর্ট্‌সে সাংঘাতিক ভাল; কি একটা মার্শাল আর্ট্‌সে ব্ল্যাক বেল্ট না কি যেন; দারুণ গান গায়, অসাধারণ রান্না করে ... মানে লিস্ট ইজ এণ্ডলেস। অবশ্য ট্যালেন্ট অনেকেরই থাকে, কিন্তু ওর মতো কাইণ্ড, ডাউন-টু-আর্থ ছেলে সত্যি সত্যি রেয়ার। ওর সঙ্গে বাড়িতে কেন, লিবিয়ার জঙ্গলে রাত কাটালেও তোর কোনো ভয় ছিল না।”

    তিলোত্তমা কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। নিজের মনের মধ্যে যে কি অসম্ভব এক যুদ্ধ চলছে! শরণ্যার বলা প্রত্যেকটা কথা অবলীলায় বিশ্বাস করে নিতে চাইছিল সে। কিন্তু সংশয় যে কিছুতেই কাটতে চায় না! ওর সারা জীবনের অবিশ্বাস কাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কি একটা ছেলের আছে? তাও কি সম্ভব?

    সে ইতস্ততঃ করে বলল, “তুই তো বললি ওকে কোনোদিন দেখিসনি। তাহলে কেমন লোক কি করে জানলি?”

    “আরে ঋদ্ধিমানদা তো ধৃতিদাদার নাম না করে জল খায় না! তবে যতই হোক, ও তো ফ্যামিলি। কিন্তু রঙ্গীতদার মন পাওয়া যে কি শক্ত কাজ সে তো আমার জানতে বাকি নেই! সেই তিনিও একবার ওর কথা শুরু করলে আর থামেন না। তারপর, রঙ্গীতদার বাবাও ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।”

    কিছুক্ষণ কেউই কোনো কথা বলে না। এতগুলো তথ্য হজম করতে সবারই একটু সময় লাগে। তারপর হঠাৎ উপলা বলে ওঠে, “তিল্লী, ডু য়ু লাইক দিস গাই?”

    তিলোত্তমা ব্যস্তভাবে বলে উঠল, “দেখ পল্‌, ওইদিন আমার মাথার ঠিক ছিল না। হোয়াট আই ডিড্‌ ওয়াজ কম্‌প্লিটলি ম্যাড, নট টু মেন্‌শান স্টুপিড অ্যাণ্ড আটারলি রং। নেহাৎ লোকটা ভদ্র বলে কিছু করেনি, নাহলে সাংঘাতিক কোনো একটা অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে যেতে পারত। এক্ষেত্রে এসব কথা বলার কোনো মানেই হয় না।”

    মৃণালিনী অধৈর্য্যভাবে হাত-পা ছুঁড়ে বলল, “তুই কোন লেভেলের গাড়ল রে? একটা ছেলে বিনা নোটিসে তোর বাড়ি চলে আসে, তোকে কফি খাওয়াতে নিয়ে যায়, তোকে বাড়ি পৌঁছে দেয়, তুই আপসেট বলে সারা রাত তোর বাড়ি থেকে গেল, এমনকি বেরোবার সময় তোর ব্রেকফাস্টটা অবধি বানিয়ে দিয়ে গেল, আর তুই এখনও দোনামোনা করে যাচ্ছিস? অফ কোর্স দ্য বয় ইজ ইন লাভ উইথ য়ু, না হলে – ”

    তিলোত্তমা তাকে থামিয়ে দিয়ে বেশ জোর দিয়ে বলে, “শোন লিনী, ব্যাপারটা অত সোজা নয়। একটা লোক আরেকটা লোককে হেল্‌প করছে বলেই হি ইজ ইন লাভ, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে রন্‌ যখন বলছে যে হি ইজ বেসিকালি জাস্ট আ গুড পার্সন, তার পক্ষে এরকম কিছু করাটা আশ্চর্য কিছুই নয়। এটাকে প্রেমে পড়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলিসনা।”

    “না, কিন্তু – ”

    “না রে, তিল্লী ইজ রাইট,” উপলা মাথা নাড়ে, “ভাল ব্যবহার করেছে বলেই তার পিছনে কিছু ইনার মীনিং আছে, সেটা নাই হতে পারে। তা ছাড়া, আমরা শুধু ছেলেটার পার্সপেক্টিভ থেকেই বা কেন দেখছি? তিল্লী কি ভাবছে, ওর পক্ষে কোনটা ভাল, সেটাই আসল কথা। এত বড় একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে ওকে যেতে হল, এই জাস্ট কালকে বজ্জাতটার সঙ্গে ব্রেক্‌-আপ করেছে, ওর কি এখন আরও একটা রোম্যান্টিক পসিবিলিটির মধ্যে মাথা ঢোকানোর মতো অবস্থা আছে? একেই তো কাল থেকে ক্রিস্টমাসের ছুটি, তারপর স্কুল খুলেই প্রি-বোর্ড এক্স্যাম্‌স। এখন এ সমস্ত ঝামেলাগুলো কি না নিলেই নয়? রন্‌, তুই বল্‌ না!”

    শরণ্যা বলল, “এক্স্যাক্টলি, পল্‌ তো ঠিকই বলছে। নাও ইজ নট আ গুড টাইম। আমার জাস্ট মনে হয় তিল্লী আগে পুরো ব্যাপারটা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে নিক। ধৃতিদাদা ইজ্‌ন্ট রানিং আওয়ে এনিহোয়্যার। রাইট নাও পরীক্ষার ব্যাপারটা অনেক বেশি ইম্পর্ট্যান্ট্‌।”

    তিলোত্তমা আরও একবার দ্বিধাভরে বলল, “রন্‌, তুই শিওর তো হি ইজ সেফ?”

    “টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট গ্যারান্টি। না হলে য়ু ক্যান টেক মি টু কোর্ট্‌। আই থিংক এই সময়ে তোর ধৃতিদাদার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে ভালই হয়েছে। রাহুল দে এর পর বেশি কায়দা করতে গেলে ঠেঙিয়ে লাশ বানিয়ে দেবে।”

    এমন সময় কণিকা গুপ্ত, ওরফে গেম-টিচার হাঙর ক্লাসে উঁকি মেরে চারজনকে দেখতে পেয়েই খিঁচিয়ে উঠলেন, “এই যে, লাস্ট বেল কখন পড়েছে খেয়াল রাখো? এটা কলেজ ক্যাম্পাস না যে গাঁজাগুলি খাবে আর রাত নটা অবধি ঠ্যাং দোলাতে দোলাতে ইয়ার্কি মারবে। ক’দিন পর তো এমনিই নরক গুলজার করতে বেরিয়ে পড়তে হবে, ততদিন বাঁদরামিগুলো বন্ধ রাখো একটু। চলো, আউট্‌!”

    সবাই ব্যাগ নিয়ে ঊর্ধ্বঃশ্বাসে দৌড় মারল।

    *

    এইট-বি থেকে হাজরার দিকের একটা বাসে উঠে পড়বে ভেবেছিল। অটোটা স্ট্যান্ডে ভিড়তে না ভিড়তেই নীরা দেখল রুদ্র একটা রোল হাতে নিয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে।

    “আরে! য়ু এগেন!” রুদ্র দেখতে পেয়ে ডাকল।

    “হাই! তুমি এখানে?”

    “আমার ক্যাম্পাস তো এটা,” রুদ্র হাসল, “একটা ক্লাস ডুব মেরেছি। বিস্তর ক্ষিদে পাচ্ছিল – তুমি বুঝি স্কুল-ফিরতি?”

    “হ্যাঁ।”

    “রোল খাও একটা আমার সঙ্গে।”

    আপত্তি ধোপে টিকবে না জেনে নীরা রাজি হয়ে গেল। রুদ্র তার য়ুনিফর্মটা বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল। রোলটা হাতে নিতেই বলে উঠল, “তোমার স্কুলের নামটা কি বলো তো?”

    নীরা বলতেই রুদ্র সচকিত হয়ে বলল, “ওঃ! ... আচ্ছা্‌, তোমার ক্লাসে কি তিলোত্তমা নামে কোনো মেয়ে পড়ে? ওরও হিউম্যানিটিজ।”

    “তিলোত্তমা দত্ত?”

    “দ্য ভেরি সেম। তুমি চেনো?”

    “চিনি মানে! আমার খুব ক্লোজ ফ্রেণ্ড!”

    “ওঃ, আই সি,” রুদ্র হাসল।

    “তুমি ওকে কি করে চিনলে?”

    রুদ্র একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “আসলে ওর বয়ফ্রেণ্ড – মানে এক্স বয়ফ্রেণ্ড রাহুল আমার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়ার। আমার সঙ্গে আলাপ আছে। ওই সূত্রেই আর কি ... ”

    “ওঃ হো! কিন্তু – কিন্তু ‘এক্স’ বলছ কেন?”

    রুদ্র ভুরু কুঁচকে বলল, “কেন, ব্রেক-আপ হয়ে তো। অ্যাট লীস্ট রাহুল তো আমাকে তাই বলল। গতকাল সকালবেলাতেই নাকি হয়েছে। তুমি জানতে না? তোমার এত বন্ধু!”

    নীরা এতক্ষণে আজ সকালের ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে পারে। আগের দিন নিশ্চয়ই বিশ্রী কিছু একটা ঘটেছে। আর আজ তো সারাদিন মেয়েটার সঙ্গে কথাই হল না। বেরোবার সময় বাকি চারজনকেও দেখতে পেল না। তিল্লী কি ইলেকটিভ ইংলিশ ক্লাসে গিয়েছিল? তখন কি অন্যদের কাছে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছে?

    সে মুখে বলল, “আসলে আজ ও একটু অসুস্থ ছিল। আমার সঙ্গে দেখা হয়নি।”

    “আচ্ছা ... ” রুদ্র অস্ফুটে বলল। সে নীরার দিকেই তাকিয়ে ছিল, কিন্তু চোখের দৃষ্টি অন্যমনষ্ক।

    খানিক কিন্তু-কিন্তু করে নীরা শেষ অবধি জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “তুমি জানো কেন ব্রেক-আপ হয়েছে?”

    রুদ্র একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার কি বলাটা উচিৎ হবে? আফ্‌টার অল, তিলোত্তমার সঙ্গে আমার সেরকম কিছু ঘনিষ্ঠতা নেই। দু-চারবার দেখা হয়েছে মাত্র। আর রাহুল ... ওয়েল, ওকে আমি ভাল করে চিনি ঠিকই, কিন্তু বন্ধু বললে বাড়িয়ে বলা হবে।”

    “তাহলে তো তুমি নিরপেক্ষ তৃতীয় ব্যক্তি। বিষয়টা বলবার জন্য তুমিই আইডিয়াল লোক।”

    রুদ্র মৃদু হেসে বলল, “হয়তো খুব ভুল বলোনি। তাও, তোমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করাটাই বোধহয় বেটার।”

    নীরা রোল চিবোতে চিবোতে অধৈর্য্যভাবে হাত নাড়ে, “আরে তাকে এখন পাচ্ছি কোথায়? এমনিতেই আমাদের ক্রিস্টমাসের ছুটি পড়ে গেছে, এখন অনেকদিন ওর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কিছুই হবে না। তোমার সঙ্গে দেখা যখন হয়েই গেল, তখন বলে ফেলো। আমার খুব কিউরিওসিটি হচ্ছে।”

    রুদ্র হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গি করে বলল, “বেশ, বলছি। আমার পার্সপেক্টিভ থেকে বলতে গেলে, প্রথম দিন থেকেই আমার ওদেরকে খুব বেজোড় মনে হয়েছিল। ওদের বাবারা বন্ধু হতে পারেন, কিন্তু ওরা ... আর তিলোত্তমাকে তো দেখেছ, শি ইজ সো বিউটিফুল। রাহুল ওকে হ্যাণ্ডেল করতে পারেনি।”

    “কি রকম?”

    “অ্যাজ ইন, তিলোত্তমা যে একটু মুডি, সেটা নিশ্চয়ই তোমাকে বলে দিতে হবে না। চট্‌ করে লোকজনের সঙ্গে মিশতে পারে না। আসলে ও তো বাড়ির একটামাত্র মেয়ে, এদিকে হার প্যারেন্টস আর রিয়লি ওয়েল অফ্‌; ওকে ছোটবেলা থেকে কোনো কিছুর সঙ্গে খুব একটা অ্যাডজাস্ট করতে হয়নি। রাহুল অন দি আদার হ্যাণ্ড ... যাই হোক। ও আসলে এমনিতেই তিলোত্তমাকে নিয়ে একটু ইনসিকিওর ছিল – একটু না, অনেকটাই। আমাকে খালি বলত, ও নিজে কি এমন অসাধারণ যে তিলোত্তমার মতো একটা মেয়ে ওর সঙ্গে থাকবে? আর মেয়েটাকে নিয়ে তো কী করবে ভেবে পেত না। এই রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাচ্ছে, এই দামী-দামী গিফ্‌ট দিচ্ছে, শাওয়ারিং হার উইথ অ্যাটেনশান, এরকম। তিলোত্তমা হয়তো এই ব্যাপারটাকে বাড়াবাড়ি বলে ভেবেছিল; অনেকেই তো স্পেস চায়।”

    নীরা শুনতে শুনতে ক্রমশই অবাক হচ্ছিল। তিলোত্তমার সঙ্গে রাহুলের ব্যাপারে দু-একবার মাত্র কথা হয়েছে নীরার। কিন্তু মোটামুটি যে ছবিটা পেয়েছিল, রুদ্রর কথা শুনে তো তার মধ্যে অনেকটাই গরমিল দেখতে পাচ্ছে! কৌতুহলীভাবে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু এমন কি ঘটল যে কাল একেবারে ব্রেক আপ হয়ে গেল?”

    রুদ্র কি যেন একটা ভেবে নিয়ে বলল, “তুমি শুচিস্মিতাকে চেনো?”

    নীরা খাবি খেয়ে বলল, “অ্যাঁ? মানে সেই অত্রি যাকে – ”

    “পছন্দ করত, রাইট,” রুদ্র হেসে ফেলল, “তিলোত্তমা অবশ্য ওকে ওর ডাকনাম ‘রিয়া’ নামে চেনে। যাই হোক, মেয়েটা একটু গায়ে-পড়া আছে, বুঝলে। অত্রিকে কাটিয়ে দেবার পর রাহুলের সঙ্গে একেবারে আঠার মতো চিপকে থাকত। রাহুল ব্যাপারটা পছন্দ করেনি, কিন্তু ও আবার চট্‌ করে লোকজনের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে না। শুচিস্মিতাও মজা পেয়ে গিয়ে ওর গ্রুপটার সঙ্গে হ্যাং আউট করা শুরু করল। তাতেও হয়তো খুব একটা কিছু হত না, যদি না ... ”

    “যদি না?”

    রুদ্র যেন কথাটা কীভাবে বলবে তা মনে মনে গুছিয়ে নিল খানিকক্ষণ। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আসলে এর মধ্যে হঠাৎ তিলোত্তমার একজন নতুন বন্ধু হয়েছিল। এটা জাস্ট মাসদুয়েক আগের ঘটনা বলছি। ও আমাদের সঙ্গে ছেলেটার আলাপ করিয়েছিল ওর কাকুর বন্ধু হিসেবে, কিন্তু ওকে দেখেই আমি বুঝেছিলাম শি অয়াজ ক্লিয়ারলি ইন্টারেস্টেড্‌ ইন দ্যাট গাই। ছেলেটার খুব ঘ্যাম কিন্তু; টল্‌, ডার্ক, হ্যাণ্ডসাম, তিলোত্তমার পাশে একেবারে পিক্‌চার পার্ফেক্ট। ওর বয়সী একটা মেয়ের পক্ষে ইনফ্যাচুয়েশান তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক। আমারই দেখে তাক লেগে গিয়েছিল!”

    নীরা অধৈর্য্যভাবে বলল, “কিন্তু তারপর হলটা কী?”

    “যা হবার তাই হল! এই নতুন ছেলেটা আসার পর থেকে তিলোত্তমা ক’দিন রাহুলকে একটু ইগ্‌নোর করছিল। আমি বলেছিলাম, এটা কেটে যাবে। তিলোত্তমা ইজ আ নাইস গার্ল, ও কখনোই এমন কিছু করবে না যাতে করে ... কিন্তু ইন্‌সিকিওর আর পজেসিভ লোকেদের মাথায় তো লজিক কাজ করে না, না! রাহুলের তখন পাগল-পাগল অবস্থা। শুচিস্মিতা তখন আবার এই সুযোগে রাহুলের সঙ্গে ক্লোজ হবার চেষ্টা করতে লাগল। আর রাহুলের তখন কাঁদবার জন্য জাস্ট একটা শোল্ডার দরকার। এদিকে পরশুদিন হয়েছে কী, রাহুল তিলোত্তমার বাড়ি যাবে ঠিক করেছিল, তো শুচিস্মিতাও যথারীতি পিছন পিছন গেছে। রাহুল গিয়ে দেখে তিলোত্তমার বাড়িতে কেউ নেই। বুঝতেই পারছ ওর রি-অ্যাকশানটা কি হল। মাটিতে বসে পড়ে প্রায় কান্না জুড়ে দেয় আর কি! শুচিস্মিতা তখন আবার পাকামি করে রাহুলকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে গেছে। আর হবি তো হ, ঠিক সেই সময় তিলোত্তমা বাড়ি ফিরে এসেছে!”

    নীরা মাথা চাপড়ে বলল, “কি কাণ্ড! এই শুচিস্মিতাটা তো আচ্ছা ইয়ে!”

    রুদ্র মাথা ঝাঁকালো, “তা আর বলতে! কিন্তু ড্যামেজ যা হবার অলরেডি হয়ে গেছে তখন। তিলোত্তমা ওদের ব্যাপারটাকে পুরো উলটোভাবে নিয়েছে। রাহুলরা অবশ্য তখন ওকে দেখতে পায়নি। ও ফিরে এসে পরদিন সকালে ফোন করেছে, আর ওদিক থেকে তিলোত্তমা এক্সপ্লোডেড্‌। রাহুল অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কে শোনে কার কথা।”

    একটু থেমে রুদ্র বলল, “এটা আমার বলা ঠিক হচ্ছে না বোধহয়, কিন্তু আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে তিলোত্তমার যা মনের অবস্থা, তাতে করে ও ব্রেক-আপ করবার একটা এক্সকিউজ খুঁজছিল।”

    নীরা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। কিছুদিন আগে বাংলা ক্লাসের কথোপকথনটা মনে পড়ছিল। সেদিনও তো তিলোত্তমা বলেছিল, সে রাহুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে চায় না। রুদ্রর বয়ানে ধোঁয়াশা অনেকটাই কেটে যাচ্ছে এখন।

    সে জিজ্ঞেস করল, “এই যে অন্য ছেলেটা, সে কিরকম মানুষ জানো?”

    “একেবারেই না। জাস্ট একদিন দেখেছি। তবে সিনেমার হিরোর মতো দেখতে লোকেদের বোধহয় খুব একটা বিশ্বাস না করাই ভাল।”

    নীরার মুখ দিয়ে ফস্‌ করে বেরিয়ে যায়, “তোমাকেও তো সিনেমার হিরোর মতো দেখতে।”

    একথা শুনে রুদ্র হাসতে হাসতে ফুটপাথ থেকে গড়িয়ে পড়ে আর কি! অবশেষে একটু দম নিয়ে বলল, “এই লোকটাকে তুমি দেখোনি, তাই একথা বলছ। এর সামনে আমি দাঁড়ালে মনে হবে প্রিন্স চার্মিং-এর সামনে নোতর্‌দামের কুঁজো লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। এনিওয়ে, অনেক গ্যাজালাম। তুমি বাড়ি যাবে তো। আমি পৌঁছে দেব?”

    “আরে না না, বাসে উঠে যাব, সোজা পাড়ার সামনে নামব।”

    “আচ্ছা, সী য়ু দেন্‌,” এই বলে রুদ্র হঠাৎ জুড়ে দিল, “শোনো নীরা, আমি জানি তিলোত্তমা তোমার বন্ধু, কিন্তু আজকে যেটা বললাম – ”

    “ওকে কিছু বলব না, চিন্তা নেই।”

    “আমার নামও কোরো না ওর কাছে।”

    নীরা এবার একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন বলো তো?”

    রুদ্র হেসে বলল, “আসলে তিলোত্তমা আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না।”

    “সেকি! কেন?”

    “সঠিক জানি না, তবে ও তো আমাকে রাহুলের বন্ধু হিসেবেই চেনে। রাহুলের কোনো বন্ধুর সঙ্গেই ওর তেমন সদ্ভাব নেই, আর এখন তো ... ”

    “আই সী। বেশ, আমি কিছুই বলব না। আজ আসি।”

    “বাই!”

    বাকিটা রাস্তা নীরা বেশ অন্যমনষ্ক হয়ে রইল। তিলোত্তমা যে জটিল মেয়ে তা সে আগেই জানত, কিন্তু তার জীবনটাও যে ততটাই জটিল হয়ে উঠেছে, সেটা তো বুঝতে পারেনি! আজ একটা ফোন করবে নাকি ওকে? ... না, দরকার কী? তিলোত্তমা এমনিতেই নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কথা বলা পছন্দ করে না। বাকিদের যদি ও কিছু বলেও থাকে, নীরা তাই নিয়ে কাউকে খোঁচাতে যাবে না এখন। সামনেই প্রি-বোর্ড। এখন পড়াশোনা ছাড়া অন্য কিছু মাথায় না ঢোকানোই ভাল। পরে না হয় সময়-সুযোগ মতো কথা বলা যাবে। আপাতত অত্রি ছাড়া আর কাউকে ফোন নয়।


    ।।১৫।।


    শীতকালের সকালে বাসে চড়ার মজাটা এমন! মিষ্টি এক চিলতে রোদ এসে পড়ে পাঁচ নম্বরের জানলার ভিতর দিয়ে। হালকা চাদর গায়ে বাসের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ঝিমোতে যে কি আরাম! অলসভাবে বাইরে তাকিয়ে ছিল উপলা। এসব দিনগুলোতে শহরটাকে অদ্ভুত সুন্দর মনে হয় তার। ঘুম ভাঙলেই দেখা যায়, সারা রাস্তা জুড়ে বাড়িঘরের উপর কুয়াশার কম্বল বিছিয়ে দিয়েছে কেউ। সাতটা, আটটা বেজে যায়, তবু কুয়াশা কাটতেই চায় না! জানলা দিয়ে ভোরের শিরশিরে হাওয়া এসে ঝাপটা মারে, তখন কাঁথাটাকে ভাল করে টেনে নিয়ে পাশ ফিরে আরেক ইন্‌স্টলমেন্ট ঘুম লাগাতে হয়। স্কুল ছুটি বলে নটা অবধি বিছানায় পড়ে ছিল উপলা। আরও অনেকক্ষণ থাকত হয়তো, নেহাৎ শরণ্যার বাড়ি যাওয়ার তাগিদে কোনোমতে দাঁত-টাত মেজে এখন বাসে উঠেছে। কিন্তু ঘুমের রেশটা এখনও কাটেনি।

    গোলপার্কের মোড়টা উপলার প্রিয় জায়গা। এখানে পা দিলেই মনটা বেশ খুশি-খুশি লাগে। একদিকে যেমন রামকৃষ্ণ মিশনের লাইব্রেরী, অন্য পিঠে তেমনি ফুটপাথের উপর অজস্র বইয়ের দোকান। আবার রাস্তার অন্য পারেই কি ভাল ভাল জাঙ্ক জুয়েলারী বিক্রি করে ... কলেজে পকেটমানি বাড়বে নিশ্চয়ই, তখন ওসব আরও একটু-আধটু কেনা যাবে ... অবশ্য সেও কি শেষ পর্যন্ত বইয়ের ভোগে লাগবে না? ... তবে মিশনের উলটোদিকে ‘গ্রাব-ক্লাব’ নামে যে নতুন রেস্তোরাঁটা খুলেছে, ওখানকার চাইনিজ কি ভাল! তা ছাড়া জলের দরে খাবার পাওয়া যায় ... রন্‌দের নিয়ে একদিন যেতেই হবে ছুটির মধ্যে, যতই পরীক্ষা থাকুক ... পুজোর ছুটিটা তো মাঠে মারাই গেছে, এখন কি ক্রিস্টমাসটাও লাটে উঠবে? ইস্কুলের শেষ বছরটাও বাজে ফিকিরে কেটে গেল বাবা ... যাইহোক, এই রবিবার গেলে কেমন হয়? ...

    হঠাৎ করে খল্‌খলে হাসির সুরে উপলার চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল। চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল, তার পাশের সীটের ছেলেটার কোলে একটা বছরখানেকের বাচ্চা। হাত-পা ছুঁড়ে সেকি হাসি তার! উপলা অবাক হয়ে ভাবল, বাচ্চাটা কি এতক্ষণ তার কোলেই ছিল? কই, আগে তো খেয়াল করেনি! পরক্ষণেই অবশ্য ভুল ভেঙে গেল। ছেলেটা পাশে দাঁড়ানো মহিলাকে বলছিল, “আপনি বসুন না, কোনো অসুবিধে হবে না ... ”

    “আরে না না, আমি সামনেই নামব। তুমি ওকে ধরো, তাহলেই হবে।”

    উপলা অবাক হয়ে দেখল, ছেলেটা নিবিষ্টমনে বাচ্চাটার সঙ্গে খেলতে শুরু করেছে। দুজনেরই বাহ্যজ্ঞান নেই, যেন জগতে তারা দুটোমাত্র প্রাণী, আশেপাশে আর কেউ নেই। সকালবেলা চোখের সামনে এমন চমৎকার দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। খেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ করে ছেলেটার মুখের দিকে দৃষ্টি পড়তেই থমকে গেল উপলা। ছেলেটা হাসছে বটে, কিন্তু তবুও এত বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন? ঢাকুরিয়া ব্রিজ পার হতেই মহিলা বাচ্চাকে নিয়ে নেমে গেলেন। উপলা ভাল করে লক্ষ্য করে দেখল, চোখের ভুল নয়, সত্যিই ছেলেটার মন ভাল নেই। এমন সুন্দর সকালে কেউ এমন করুণ শূন্যদৃষ্টি নিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকে! অথচ বাচ্চাটার সঙ্গে কিরকম মগ্ন হয়ে খেলছিল। তবে কি ব্যক্তিগত কোনো দুঃখের কথা সাময়িকভাবে ভুলে যাওয়ার জন্যই সেই খেলা? দুঃখটা কী ধরণের হতে পারে, সেটা ভাববার আগেই ছেলেটার ফোন বেজে উঠল। ছেলেটার অনেকক্ষণ হুঁশ ছিল না। অবশেষে খেয়াল হতে কিছুটা অনিচ্ছাসত্ত্বেই ফোন ধরল।

    “বল্‌ রে ঈদের চাঁদ। ... না রে, কোনো খবর নেই। ওদিক থেকেও ফোন আসেনি, আর আমারও সেমেস্টার চলছিল ক’দিন। কেন, কিছু দরকার? ... হ্যাঁ, ও তো ওরকমই। নিজের জগতে ঘুরে বেড়ায়। তোর খবর বল্‌। ... দাদার গার্লফ্রেণ্ড! কই, এমন কথা তো শুনিনি! তুই আবার কোথাও থেকে কিছু জানতে পেরেছিস নাকি? ... ওঃ, আচ্ছা। তা, তোর পছন্দ? তাহলে তোর হয়ে লাইন করে দিতে পারি কিন্তু, দা’ভাই আমার কথা ফেলতে পারেনা। ... আচ্ছা, তাই নাকি? কে সে? নিশ্চয়ই বিলিতি সাহেব কেউ, তুই তো আবার ... ও! তা ঘটিয়ে ফেলছিস না কেন ব্যাপারটা? ... আচ্ছা আচ্ছা। হেল্‌প লাগলে বলিস কিন্তু। ... আমার গার্লফ্রেণ্ড ... ?”

    উপলা উৎকন্ঠিতভাবে দেখল, একটু আগেই যে একটা ক্ষীণ হাসির সম্ভাবনা ফুটে উঠেছিল ছেলেটার মুখে, সেটা মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল। বেশ খানিকক্ষণ পাথরের মতো বসে থেকে তারপর অনেক কষ্টে উত্তর দিল যেন।

    “উই ব্রোক আপ। ... বেশিদিন নয় ... পরশু, ইন্‌ ফ্যাক্ট। ... না রে, কিছু হবে না। ... ঈশা ইজ গেটিং ম্যারেড্‌। ... আমাকে পরশুদিন ফোন করে বলল। ... কিছু জানতে পারিনি, বিশ্বাস কর্‌। ... না না, আই অ্যাম ফাইন্‌, জাস্ট একটু শক পেয়েছি। আচ্ছা শোন্‌, আমি বাসে আছি বুঝলি? আমার স্টপ এসে গেছে, নামব। আমি ফোন করব, কেমন? টাটা।”

    স্টপ অবশ্য আদৌ আসেনি। কিন্তু ছেলেটা আর কথা বলবার মতো অবস্থায় ছিল না। আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও ভিতর থেকে ঠেলে উঠে আসা কান্নাটার সঙ্গে যুদ্ধ করে পারছিল না সে। উপলা আর থাকতে পারল না। জিন্‌সের পকেট হাতড়ে রুমাল বার করে নিঃশব্দে এগিয়ে দিল ওর দিকে।

    ছেলেটা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, হয়তো কিছুটা অপ্রস্তুতও হল। খানিকক্ষণ ইতস্ততঃ করে শেষ অবধি রুমালটা না নিয়ে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল, “জল আছে?”

    উপলা বিনা বাক্যব্যয়ে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে দিল। ঢক্‌ঢক্‌ করে প্রায় অর্ধেকটা খেয়ে বোধহয় একটু ধাতস্থ হল সে। বোতলটা ফেরত দিতে গিয়ে একটু লজ্জিতভাবে বলল, “সরি, অনেকটা খেয়ে ফেললাম।”

    উপলা খানিকক্ষণ ইতস্ততঃ করে বলল, “চকলেট খাবে? আমার কাছে আছে।”

    ছেলেটা এবার প্রচ্ছন্ন বিস্ময়ে বলে উঠল, “তুমি কি প্রফেসার লুপিন্‌? বাসে-ট্রামে মানুষের মনের ডিমেন্টার্‌স তাড়িয়ে বেড়াও?”

    উপলাও এবারে হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, “তুমি হ্যারি-পটার-ফ্যান?”

    “কে নয়?” ছেলেটা এতক্ষণে একটু সুস্থভাবে হাসল, “সবাই তো। তবে তোমার জল অলরেডি শেষ করে দিয়েছি, এখন আবার চকলেটে ভাগ বসানোটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।”

    “আরে, না না। আস্ত বার আছে দুটো, একটুখানি নাও।”

    ছেলেটা আর আপত্তি করল না। উপলা ব্যাগ খুলে চকলেট দিল। দুটো বারই রনের জন্যে নিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু এর অবস্থা দেখে সত্যিই ভাল মনে হচ্ছে না। যাই হোক, আরেকটা গোটা প্যাকেট তো আছে। খানিকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ চকলেট চিবিয়ে গেল। বোঝাই যাচ্ছে উপলার সহযাত্রীর জীবনে কোনো বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু এত দুঃখেও শেষে কিনা হ্যারি পটার মনে পড়ল? এ তো তাকেও টেক্কা দিয়ে যায়!

    হঠাৎ করে ছেলেটা বলে উঠল, “আমি তোমাকে চিনি না, বাট য়ু আর ভেরি কাইণ্ড। আই নীডেড্‌ কাইণ্ডনেস টুডে। থ্যাঙ্ক য়ু।”

    উপলা একটু বিব্রত হলেও,বাইরে সদয়ভাবে বলল, “তা কেন। আমি তোমার পাশের সীটে বসে আছি, য়ু আর ক্লিয়ারলি আপসেট, এটুকু তো যে কেউ করবে।”

    “সবাই করে না,” ছেলেটা প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে, “দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ মাচ মোর ক্রুয়েল দ্যান দ্যাট।”

    এই কথাটার কি উত্তর হওয়া উচিৎ সে কথা ভেবে ওঠার আগেই ছেলেটা বলতে লাগল, “একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে কতরকমভাবে ঠকায় তার কোনো হিসেব আছে? অনেকে নিজের প্রয়োজনে, অন্য কোনো উপায় না দেখে মিথ্যে বলে, আবার কিছু লোক আছে যারা শুধু শুধুই লোককে বোকা বানিয়ে মজা পায়। কিছুর মধ্যে কিছু না, আমার তিন বছরের গার্লফ্রণ্ড ক্যাজুয়ালি এসে বলে কিনা ওর কোন এক চাইল্ডহুড সুইট্‌হার্টকে বিয়ে করছে! আই মীন, শি ইজ টোয়েন্টি ওয়ান, ফর গড্‌স সেক! আর সবচেয়ে বড় কথা – কবে ছোটবেলায় কার সঙ্গে প্রেম করেছিল, তার জন্য আমাদের তিন বছরের রিলেশানটা বিনা নোটিসে এক কথায় শেষ করে দিল? আমাকে তো অ্যাট লীস্ট এটা এসে বলতে পারত যে, আমাকে আর তার পছন্দ নয়? এইটুকু আশা করা কি আমার পক্ষে অন্যায়? বিয়ের ডেট-ফেট ঠিক করে তার পর আমাকে ফোন করে জানাচ্ছে। টেন্থ ফেব্রুয়ারী! অসাধারণ!”

    উপলা হতভম্বের মতো ছেলেটার স্বগতোক্তি শুনে যাচ্ছিল। সত্যিই এরকম আজব মেয়ের কথা এর আগে খুব কম শুনেছে। কৌতুহল চাপতে না পেরে শেষে জিজ্ঞেস করেই ফেলে, “যাকে বিয়ে করছে তাকে তুমি চেনো?”

    “কোনোদিন না। চেনা তো দূরের কথা, কস্মিনকালে নামটা অবধি শুনিনি। এখন ঈশা বলে কিনা, ছেলে খুব ভাল, বাবা-মায়ের বিশাল পয়সা, কিসের ছাতার যেন বিজনেস করেন, নেক্সট ইয়ার ছেলেও জয়েন করবে, তাই আর কোনো চাপ নেই। আন্‌বিলীভেব্‌ল! আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে এতদিন আমার সঙ্গে তোমার যে সম্পর্কটা ছিল, সেটাকে কী বলবে তুমি?’ উত্তরটা কি দিল জানো? বলল যে এতদিন নাকি ছেলেটা খুব কন্‌ফিউজড্‌ ছিল, নিজের জীবন নিয়ে কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এখন যেই ভেবে ফেলেছে, অমনি তার কাছে নাচতে নাচতে চলে যাওয়া যায়। আমার ভূমিকাটা কী ছিল তাহলে? হাতের পাঁচ? এতদিনের এত বন্ধুত্ব, কথাবার্তা, সময় কাটানো, সব মীনিংলেস?!”

    উপলা কি বলবে ভেবে পেল না। তিলোত্তমার ব্যাপারটার মতোই অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য মনে হল ঘটনাটাকে। এই লোকগুলো কারা! কী ভেবে এই ধরণের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে? তারা কি সত্যি সত্যি ভাবে, যে আরেকটা মানুষের অনুভূতি নিয়ে ছিনিমিনি খেলবার কোনো বিশেষ ছাড়পত্র আছে তাদের? সে অনেক ভেবেচিন্তে সান্ত্বনাসূচক একটা কিছু বলবার চেষ্টা করল, “কি করবে বলো, অনেক লোকে এরকম হয়। অপ্রকৃতিস্থ মাতাল টাইপ।”

    “এই লেভেল-এর অপ্রকৃতিস্থ টাইপ কেউ আছে বলে জানা নেই আমার।”

    “আমার আছে। এই আমার একজন বন্ধুর কথাই ধরো। তার এক মারাত্মক পজেসিভ, ক্রুয়েল প্রকৃতির বয়ফ্রেণ্ড ছিল। এদিকে একদিন সন্ধ্যেবেলা আমার বন্ধু বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখে কিনা তারই বাড়ির গলির অন্ধকারে ওই ছেলেটা অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ... য়ু নো হোয়াট। দেখে তো সে ওইখানেই কোল্যাপ্স করে যায় আর কি! এদিকে পরদিন সকালবেলা যেই সে ব্রেক-আপ করতে যাচ্ছে, তখন ছেলেটা বলে কিনা যে আমার বন্ধু নাকি ব্রেক-আপ করার একটা এক্সকিউজ খুঁজছিল মাত্র, বিকজ ওর নাকি অন্য কারুর দিকে নজর আছে, শি ইজ আ স্লাট! ভাবো একবার।”

    ছেলেটা এতক্ষণ চোখ বড়-বড় করে শুনছিল, এবারে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “যাক্‌, আমিই তাহলে পৃথিবীর একমাত্র হতভাগ্য লোক নই।”

    “এক্স্যাক্টলি।”

    কিছুক্ষণ আর কোনো কথা হয় না। তারপর ছেলেটা যেন উপলার চিন্তার গতি কিছুটা আঁচ করেই বলে, “আমি আগে কখনও বাসে বসে সম্পূর্ণ অচেনা কারুর সঙ্গে এই লেভেল-এর ব্যক্তিগত আলোচনা করিনি। তুমি না জানি কি ভাবলে!”

    উপলা বিজ্ঞের মতো বলে, “দেয়ার আর থিংস হুইচ ক্যান বি টোল্‌ড টু স্ট্রেঞ্জার্‌স ওনলি। ধরো, আমার সঙ্গে তো আজকের পরে আর তোমার দেখা হবে না। তাই তোমার কোনো গোপন কথা আমি কারো কাছে ফাঁস করে দিতে পারব না, কি তোমার কোনো ব্যক্তিগত দুঃখের কথা এমন কাউকে গিয়ে বলতেও পারব না যে কিনা তার উপর ভিত্তি করে তোমার কাছ থেকে কোনো ফায়দা তুলতে পারবে। কি করে বলব, আমি তো তোমাকে চিনিই না! তাই বলছি, মাঝে মাঝে নিজের জীবনের ক্রাইসিসের কথা বাসে-ট্রামে চলতি পাশের লোকটাকে বলে দিলে থেরাপি-র খরচা বেঁচে যায়।”

    ছেলেটা মাথা নাড়ল, “তোমাকে দেখে তো আমার থেকেও ছোট মনে হয়। কিন্তু এতসব কথা জানলে কি করে? তুমি ছদ্মবেশে ভগবান-টগবান কিনা কে জানে!”

    উপলা হেসে উঠে উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই কন্ডাক্টার চেঁচিয়ে উঠল, “গাঙ্গুলীবাগান, গাঙ্গুলীবাগান!”

    উপলা লাফিয়ে উঠে বলল, “এই, সরি, আমাকে নামতে হচ্ছে, বুঝলে? নাইস টকিং টু য়ু। দেখবে এর পর যা হবে, সব ভাল হবে।”

    নেমে যেতে যেতেই শুনল ছেলেটা বলছে, “থ্যাঙ্ক য়ু ফর ইয়োর কাইণ্ডনেস। তোমারও খুব ভাল হোক।”

    *

    এত বেলা হয়ে গেল, শরণ্যা তাও বিছানা ছেড়ে নামবার চেষ্টাই করছে না। ছুটির দিনগুলো কেমনভাবে যেন কাটে। স্কুল খুলেই তো সারি সারি পরীক্ষার পালা; প্রথমেই প্রি-বোর্ড, তারপর মাসখানেকের প্রেপ লীভ, আর তার পরেই আই.এস.সী-র ধাক্কা। তারপর? একটা লম্বা অনিশ্চয়তার সময়। তার কথা ভেবে দুশ্চিন্তায় এখনই রাতের ঘুম উবে গেছে। এই বয়সেই এত রাজ্যের অনিশ্চয়তা যে কেন এসে জুটল তার জীবনে!

    আটটা নাগাদ ঘুম ভেঙে উঠে নীচে নামতে নামতেই শরণ্যা শুনতে পেয়েছিল মম্‌-ড্যাড-এর কথোপকথন। ওরা কখনও চিৎকার করে না। তবু গলার স্বর শুনলেই সে বুঝতে পারে বিষয়টা কোনদিকে এগোচ্ছে। আজ যেমন বসার ঘর অবধি পৌঁছাতেও হল না। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়েই শুনতে পেল, মম্‌ বলছে, “অফ্‌ কোর্স য়ু আর রেস্‌পন্সিব্‌ল। কিন্তু একটা ভুল স্বীকার করে নিলেই তার দায়িত্বটা শেষ হয়ে যায়? য়ু হ্যাড্‌ টু ফিক্স ইট্ জয়ন্ত, বাট য়ু ডিড্‌ন্ট। চেষ্টা করলে কি আমরা সত্যিই লণ্ডনে থেকে যেতে পারতাম না? একটু কষ্ট করে হোক, সহ্য করে হোক! শুধুমাত্র তোমার কথাতে আমরা চলে এলাম, কিন্তু লাভ কি হল? বড় মেয়ে জেদ করে ওখানেই পড়ে রইল, আর ছোট মেয়ের মুখের দিকে তো তাকাতে পারি না আমি। এই পুরো ঘটনায় যে রাকাকে সবচেয়ে বেশি সাফার করতে হচ্ছে সেটা বুঝতে পারো না? এই বয়সে নিজের বাড়ি-ঘর ফেলে একটা অর্ধপরিচিত দেশে ... এর জন্যে তো ভবিষ্যতে ও আমাদেরই অভিযোগ করবে, অ্যাণ্ড শি উইল বী রাইট! এখনই তো দেখি বিদিশাকে পাতার পর পাতা চিঠি লিখে পাঠাচ্ছে – সেসব চিঠিতে কী লেখা থাকে বলে তোমার মনে হয়? আর সানা! সে যে বেঁচে আছে এই খবরটাই তো পরের মুখ থেকে শুনতে হয় আমাকে। তুমি তো অ্যাট লীস্ট চেষ্টা করতে পারতে মেয়েটার সঙ্গে যোগাযোগ করার?”

    এই অবধি শুনে শরণ্যা আবার উপরে উঠে এল। সকালবেলাগুলো কেন যে এইভাবে তেতো হয়ে যায়! আর কতদিন নীরব দর্শক হয়ে এই ভেঙে যাওয়া চিত্রটার সামনে বসে থাকবে সে? ড্যাড্‌কে কিছুই বলতে শুনল না। একটা প্রতিবাদ তো করতে পারত? মম্‌ তাকে দায়ী করছিল সমানে, কিন্তু পুরো ব্যাপারটা তো আদৌ ড্যাডের হাতেই ছিল না। কারুর দোষে তো কিছু হয়নি! তাছাড়া, শরণ্যা এখন অনেকটাই গুছিয়ে নিতে পেরেছে নিজেকে। প্রথম বছরটা কষ্ট হয়েছিল ঠিকই। এ দেশের সমস্ত ধরণধারণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেক বাধা পেয়েছিল, অনেক ঠোকর খেতে হয়েছিল। তাছাড়া তখন ঘন ঘন বিদেশ থেকে পুরোনো বন্ধুদের ফোন আসত, মেসেজ আসত। তারপর আস্তে আস্তে সবই ফিকে হয়ে যেতে লাগল। আজকাল তো কালেভদ্রে টেড্‌-অ্যালিসন্‌রা ফেস্‌বুকে দু-একটা মেসেজ করে কি করেনা। একমাত্র রণ্‌ধীরজী নিয়মিত মেল পাঠান। কিন্তু মম্‌-ড্যাড কেন কিছুতেই ভুলতে পারছে না? কেন চলে যেতে দিচ্ছে না অতীতটাকে!

    নিজের ঘরে গিয়ে ছোটমাসীর নতুন চিঠিটা ডেস্ক থেকে তুলে নিয়ে আবার শুয়ে পড়ল সে। এটা পরশুদিন এসে পৌঁছেছে। পূজনের কবিতার ব্যাপারে লিখে পাঠিয়েছিল; ছোটমাসী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিয়েছে।

    রাকা,
    তোদের ওখানে কি শীতটা টের পাওয়ার মতো পড়েছে? এখানে হঠাৎ ঝুপ করে এমন ঠাণ্ডা পড়ে গেল, কী করব ভেবেই পাচ্ছি না। অবশ্য তুই বিলেত থেকে ফিরেছিস বেশিদিন হয়নি (এটা লিখে ফেলেই জিভ কাটলাম। তোর দেশে আসার দু-বছর পুরতে আর চারটে মাস)! তবে আমি ফিরেছি, তোরও আসার অনেক আগে; ছয় বছর হয়ে এল। আমার লণ্ডনে কাটানো সময়কে এখানকার সময় ছুঁয়েই ফেলল প্রায়! জীবনের দশটা বছর কেটেছে ঐ দেশে, ঐ শহরে; সে কি কম! সেই কলেজ-য়ুনিভার্সিটির সবচেয়ে এক্সাইটিং দিনগুলো। লণ্ডন আমাকে সদ্য চলে যাওয়া মা-বাবার অভাব টের পেতে দেয়নি; তার কৃতিত্ব অবশ্য দিদির, এবং তোদেরও। বেশ তো থাকি এখানে, কিন্তু প্রত্যেক হেমন্তে কেন যেন মনটা বিষন্ন হয়ে যায়, ধোঁয়াশা-মোড়া ভিজে রাস্তার জন্য, ফুটপাথের উপর সেঁটে থাকা লাল-কমলা ঝরা পাতার জন্য। তখন কবিতা পড়ি; মনটা আরাম লাগে।

    তুইও কবিতা পড়ছিস আজকাল, বিশেষ করে এক আগন্তুকের কবিতা, যাকে অনেকবার দেখেছিস, কিন্তু পরিচয় হয়নি কোনোদিন। তার লেখা যে দুটো কবিতা পাঠিয়েছিস, পড়ে দেখলাম। সত্যিই বেশ অন্যরকম। কল্পনার নিসর্গে এমন সব উপস্থিতি যা সাধারণভাবে বীভৎস বা ভয়ংকর হিসেবে ধরা হয়। মানুষের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা ভয়ের কারবারি যেন এই কবি। তবে তোর চিঠিটা পড়ে আমার কেন যেন মনে হল তুই শুধু কবিতা নয়, কবিকে নিয়েও ভাবছিস। সেই ভাবনার গতি কোনদিকে, তা অবশ্য ধরতে পারলাম না। আসলে আমাদের সকলেরই বোধহয় শিল্পের মধ্যে দিয়ে শিল্পীকে চিনতে চাওয়ার একটা তাগিদ থাকে। তবে মজার কথা জানিস? জামাইবাবু আমাকে প্রায়ই একটা কথা শোনাত, ‘কবিরে পাবে না খুঁজে জীবন-চরিতে।’ প্রথম প্রথম অবাক হতাম, বেশি পাত্তাও দিতাম না। পরে কিন্তু কথাটার সত্যতা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছি বললে বাড়িয়ে বলা হয় না।

    কেন যে এত জ্ঞান দিচ্ছি কে জানে! বয়স হচ্ছে বোঝা যায়। আসলে সানার উপর মাসীগিরি করা যায় না; ও হাবেভাবে বরাবর আমার থেকে বড়। তাছাড়া, যতদিন ছোট ছিলি, ততদিন এত চিন্তাও হত না। আবার যখন একেবারে বড় হয়ে যাবি, তখনও যা হোক একরকম হবে। কিন্তু এই সময়টাই ভারি গোলমেলে। আরও কেন ভাবনা হয় বল্‌ তো? কারণ তোর মধ্যে আমি নিজেকে দেখতে পাই। তোর বয়সে আমাকেও তো নিজের দেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ অচেনা এক জায়গায় অনির্দিষ্টকালের জন্য চলে যেতে হয়েছিল। মাত্র পনেরোদিনের ব্যবধানে মা আর বাবার চলে যাওয়া ... ওরকম বিপর্যয় কারুর জীবনে আসুক চাইনি, কিন্তু তুইও ভবিতব্য এড়াতে পারলি না। তাই ইদানীং আশঙ্কার মাত্রাটাও বেড়ে গেছে।

    তোর রণ্‌ধীরজী আমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন শুনে ভাল লাগল। সানাও পর পর দু-দিন ফোন করেছিল। পরীক্ষাগুলো চুকে গিয়ে কিছুটা চাপমুক্ত মনে হল ওকে। অবশ্য এর পরেই চাকরী খোঁজা নিয়ে নতুন চাপ শুরু হবে। তবে ওর কথাবার্তা শুনে মনে হল ভালই আছে। বদলে যাওয়া পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে অনেকটাই। সানা তো খুব স্বাধীনচেতা মেয়ে। সেই ছোটবেলা থেকেই কখনো অন্যের কথামতো কাজ করতে পছন্দ করে না, অন্যের দেখানো পথে চলে না। দিদি বলত, একগুঁয়ে, ঘাড়-ব্যাঁকা। অনেককে আবার বলতে শুনেছি স্বার্থপর। কিন্তু আমি জানি সে কথা সত্যি নয়। এখন হয়তো সহিষ্ণুতার অভাব, কিন্তু সেটা বয়সের দোষ, স্বভাবের নয়। ওর বয়সে আমারই বা এমন কী ধৈর্য্য ছিল! হয়তো এখনই এ কথা বলা উচিৎ নয়, তবে আমার ধারণা খুব শিগ্‌গিরই সব ঠিক হয়ে যাবে। অন্ততঃ, সানা-সমস্যার সমাধান তো নিশ্চয়ই হবে।

    তুই কি এমন কিছু খুঁজছিস রাকা, যা পরশপাথরের মতো বিরল, কিন্তু যা হয়তো এই জাগতিক পৃথিবীর কোথাও না কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে? আমি খুঁজেছিলাম এক সময়, কিন্তু ঠিক জায়গায় খুঁজিনি। যখন হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে এলাম, তখন দেখি, খুঁজবার কোনো দরকার ছিল না। পরশপাথর আমার কাছেই আছে। তবে সেটা বুঝতে পারার জন্যেও হয়তো এই যাত্রাটা জরুরি।

    ভাল থাকিস রে রাকা। সাবধানে থাকিস।

    ছোটমাসী।

    চিঠিটা বারবার পড়েও স্বস্তি হচ্ছিল না শরণ্যার। ছোটমাসী তো কমদিন ধরে চিঠি লিখছে না ওকে, কিন্তু এরকম হেঁয়ালী তো কোনোদিন করে না! কি যে বলতে চাইছে সেটাই তো ভাল করে বোঝা গেল না। পূজনের ব্যাপারে কি সাবধান করতে চাইল? কেন? কিসের সাবধানতা? নিজের সম্পর্কেও কি যেন একটা ইঙ্গিত দিয়ে থেমে গেল, আর সানার ব্যাপারটাও পরিষ্কার করে কিছু বলল না। সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলল, কিন্তু কেমন করে হবে? গত দু-মাসে তো সানা একটা ফোনও করেনি তাকে। হপ্তাদুয়েক আগে নিজে থেকেই একবার খবর নিতে ফোন করেছিল, কিন্তু সানা কথাই বলতে চাইল না; মিনিটখানেক ‘হুঁ-হাঁ’ করে রেখে দিল। ড্যাড্‌ একবার এসে খোঁজ নিয়ে গেছে তার কাছে। যাতে দুশ্চিন্তা না করে তার জন্য সম্পূর্ণ মনগড়া গল্প শুনিয়ে সে যাত্রা উদ্ধার পেতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ছোটমাসী এত নিশ্চিত হচ্ছে কি করে? সানা কি ওকে কিছু বলেছে?

    শরণ্যা অন্যমনষ্কভাবে ফোনটা নিয়ে খুট্‌খাট্‌ করছিল। রঙ্গীতদা এই ক’দিনে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ওর কি নিজের কখনও মনেও পড়েনা শরণ্যার কথা? একটা এস.এম.এস. করেও তো জবাব দিতে পারে! কত অন্ধকার পার করতে সে শুধু রঙ্গীতদাকে আশ্রয় করে এসেছে, তার খবর হয়তো কোনোদিন টেরও পাবে না।

    কিন্তু আজকাল খুব অস্থির লাগে শরণ্যার। শুধুমাত্র চোখ বুজে রঙ্গীতদার নাম জপ করলে আর কাজ হয় না। কোনো কিছুই তার মনের মধ্যে ঘনিয়ে আসা মেঘের পুঞ্জকে সরিয়ে দিতে পারে না। এমনকি গান নিয়েও বসতে ইচ্ছে করে না কতদিন! থেকে থেকে এলিয়টের সেই কুয়াশামোড়া দ্বীপের কথা মনে পড়ে, যেখানে লুকিয়ে আছে তার পরশপাথর অথচ তা সব সময়ই অস্পষ্ট, দূর ...






    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণঃ রাহুল মজুমদার
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ | পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০ | পর্ব ১১ | পর্ব ১২ | পর্ব ১৩ | পর্ব ১৪ | পর্ব ১৫ | পর্ব ১৬ | পর্ব ১৭ (শেষ)
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)