• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৭ | জুলাই ২০২২ | প্রবন্ধ
    Share
  • গান নিয়ে : নিরানব্বই শতাংশ বাঙালির হেমন্ত (৩) : সম্বিৎ বসু

    গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে সঙ্গীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গল্প এক দিক দিয়ে কোন উত্তরণের গল্প নয়, আবার আরেক দিকে উত্তরণের গল্পও বলা যায়। হেমন্ত গানে সুর করছেন অল্প বয়েস থেকে। কিন্তু সঙ্গীত পরিচালক যাকে বলে, মানে ছবির জন্যে সুর করা, তা করতে কিছুটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। পরে বাংলা ছবির সুরকার হিসেবে প্রায় অসংবাদিত প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছিলেন, যা চলেছিল জীবনের শেষের বছরগুলো অব্দি। সেখানেও হেমন্তর বাঙালি সেন্সিটিভিটি তাঁকে শক্ত জমিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

    একজন প্রতিষ্ঠিত ও সফল সুরকার ঠিক যতটা সুরস্রষ্টা, ঠিক ততটাই একজন ক্রাফটসম্যান। প্রথম সুর করা এবং শেষে শ্রোতারা যে জিনিস শুনতে পান - এর মধ্যে ক্রাফটসম্যান হিসেবে একজন সুরকার তাঁর সৃষ্টিকে অনেক ঘষামাজার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যান। শচীন দেব বর্মন, সলিল চৌধুরী, রাহুল দেব বর্মন - এনারা সবাই ক্রাফটসম্যান হিসেবেও খুঁতখুঁতে ও অনবদ্য ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজের গানে ক্রাফটের দিকটায় কতটা মন দিতেন, তা জানা যায় না। তবে যেটুকু শোনা যায় তাতে সুর করার পরে, ভুলে যাবার আগে, যত তাড়াতাড়ি পারেন কাছের লোকেদের সেটি শিখিয়ে দিতেন। এরপরে সেই গানের সুর নিয়ে খুব ঘষামাজা করতেন বলে শোনা যায় না। সুরকার হিসেবে হেমন্ত রবীন্দ্রপন্থী। শুধু ঘষামাজার ব্যাপারেই নয়, গানের সুরের প্রকৃতিগত দিক দিয়েও। "... আমার সুরের উৎস তো সেই রবীন্দ্রনাথই। তেমনি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে কথার সঙ্গে সুরের যে ইনভলভ্‌মেন্ট সেটা প্রথম বুঝতে পারি। অবিশ্যি এও সত্যি যে, আমি অনেক ছোটবেলা থেকে সুর করছি, তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছুই জানি না। আঠার বছর বয়সেই সুর দেওয়া আরম্ভ করেছি।" [আমার গানের স্বরলিপি - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়] ওই একই জায়গায় নিজের সুর করা সম্বন্ধে বলেছেন, "কথা এলে, সিচুয়েশন থাকলে আমার মাথায় একটা সুর আসে। যে, এটাকে এইভাবে করা উচিত। আর আমি খুব প্যাঁচপয়জারের মধ্যে যাই না। আমি খুব সরল ভাবেই সুর করতে ভালবাসি।" অর্থাৎ, ক্রাফট নয়, সুর করার আর্টের দিকেই তাঁর লক্ষ্য।

    আঠার বছর বয়েসে যে গানের সুরের কথা বলছেন তার খোঁজ পাইনি। সে খুব সম্ভবত কাশীতে বিলোনো বিদ্রোহের লিফলেটে দেওয়া সুর। "... সেই সময়ে কাশীতে খুব স্বদেশি আন্দোলন চলছে। লাল নীল কাগজে বিদ্রোহের কবিতা ছেপে বিলোচ্ছে আন্দোলনকারীরা। আমার হাতেও ওইরকম লাল নীল কাগজ এসে পড়েছে কয়েকখানা। আমি করতাম কী, ওই সব বিদ্রোহের কবিতাগুলোতে সুর দিয়ে গাইতাম।" [আনন্দধারা - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়] এ সব গানের হদিশ না পেলেও যার খোঁজ পেয়েছি তা হল ১৯৪৩ সালে নিজের সুরে প্রথম রেকর্ড 'আমার বিরহ আকাশ' এবং 'কথা কয়োনা কো'। এর আগের তাঁর সব গানের সুরই শৈলেশ দত্তগুপ্তর। 'কথা কয়োনা কো' গানটির সুর অসম্ভব আধুনিক। শুধু সে সময়ের গানের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, আজকেও গানটা শুনলে আধুনিক লাগে। বিশেষ করে প্রথম লাইনে 'কথা কয়োনা কো'-র পরে 'শুধু শোন' কথাগুলো আসছে। শুধু আধুনিকই নয়, অরাবীন্দ্রিকও বটে। অথচ তাঁর পরের অনেক গানের সুর রবীন্দ্র-অনুসারী। যেমন, ১৯৫৪ সালে 'শাপমোচন' ছবির 'সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা'। আসলে শৈলেশ দত্তগুপ্ত হেমন্তকে স্বরলিপি পড়ে রবীন্দ্রনাথের গান তোলা রপ্ত করে দেন। এর পরে হেমন্ত রবীন্দ্রনাথের গান যত সম্ভব স্বরলিপি দেখে শিখে ফেলেছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় এরকম এক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর অসুস্থতার সময়ে চিকিৎসার খরচ তোলার জন্যে একজনের বাড়িতে ঘরোয়া এক গানের মজলিশের আয়োজন করা হয়েছিল। "এই মজলিশে গান করার জন্য আমরা দুজন শিল্পীকে অনুরোধ করেছিলাম - হেমন্ত এবং সুচিত্রা। বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথের 'চণ্ডালিকা'। হেমন্ত কাঁটায় কাঁটায় এসেছিল, কিন্তু আকস্মিক কোনও অনিবার্য কারণে শেষ মুহূর্তে সুচিত্রা আসতে পারে নি। তাতে আমরা পড়েছিলাম নিদারুণ বিপাকে। আমাদের অবস্থা অনুমান করে হেমন্ত আমাকে ডেকে বলেছিল, 'ঘাবড়াস না, আমি একাই সব গান গাইব। অনুষ্ঠান শুরু কর।' তারপর হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে ঘন্টা দেড়েক ধরে হেমন্ত 'চণ্ডালিকা'র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটার পর একটা গান একটানা গেয়ে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল।" [হেমন্তর কী মন্তর - সুভাষ মুখোপাধ্যায়]

    রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় গান এই ভাবে গেয়ে যাওয়ায় লাভ হয়েছিল সুরকার হিসেবেও। রেডিওতে যখন ফিচার প্রোগ্রামে সুর করার ভার বাণীকুমার দিয়েছিলেন, হেমন্ত ভরসা পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানের থেকে। "... সুর দেবার আগে বেশ ভয়ভয় করছিল। এই তো প্রথম। তবে ভরসা ছিল শুধু রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রসংগীত গাইতাম আর ভাবতাম, কত কথা, কত সুর। কোন বাণীর কী সুর হওয়া উচিত সেটা পেয়েছিলাম ওই রবীন্দ্রনাথের গান থেকে। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য শুনেছি বিভোর হয়ে। গেয়েছিল প্রাণ ঢেলে। সুরের কম্পোজিসান দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছি।" [আনন্দধারা - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়]

    ভি শান্তারামকেও একই কথা বলেছিলেন। একটা ছবির ব্যাপারে শান্তারাম হেমন্তকে সঙ্গীত-পরিচালনার ভার দিতে চেয়েছিলেন। "উনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'কি পারবেন তো?' আমি বললাম, 'কিচ্ছু ভাববেন না শান্তারামজী। আমার গানের গুরু হলেন রবীন্দ্রনাথ। যে কোনো বিষয়েই ছবি করুন না, সব পাওয়া যাবে রবীন্দ্রকোষ থেকে। অফুরন্ত ভান্ডার ওঁর। সব আছে। আপনাকে আমি রবীন্দ্রনাথের 'শ্যামা' শোনাচ্ছি, তাহলেই বুঝতে পারবেন।" [আনন্দধারা - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়]

    প্রথম জীবনে কিছু সফল, কিছু তত-সফল-নয় সুর করার পরে হেমন্ত জমি খুঁজে পেলেন রবীন্দ্রনাথের অনুসারী হয়ে। এখানে 'রবীন্দ্র-অনুসারী' বলতে আমি কী বোঝাচ্ছি, সেটা একটু ব্যাখ্যা করে দিই। রবীন্দ্রনাথের গানের সুর মূলতঃ ভারতীয় রাগ-ভিত্তিক। প্রথম জীবনের সুরে রাগভাব খুবই কড়া ছিল, যা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে। সেই সঙ্গে আস্তে আস্তে যোগ হয় বাংলার দেশজ গানের সুর। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই গান দাঁড়ায় এমন যাকে সত্যজিতের কথার প্রতিধ্বনি করে বলা যায়, "এখানে রাগরাগিণীর প্রশ্ন আসে না, বাউল-কীর্তনের প্রশ্ন আসে না, বাদী-সম্বাদীর প্রশ্ন আসে না"। [রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা, প্রবন্ধ সংগ্রহ - সত্যজিৎ রায়]

    হেমন্তর সুরে সেইরকম একটা হাইব্রিড সুরের কাঠামো দেখতে পাই। 'শোনো বন্ধু শোনো'-য় ভৈরবীর পর্দা লাগাচ্ছেন, কিন্তু ভৈরবীকে মনে পড়াচ্ছেন না; 'ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস'-এ বাগেশ্রীর পর্দা লাগাচ্ছেন, কিন্তু বাগেশ্রীকে মনে করাচ্ছেন না। যেখানে রাগের চলন গানে রেখেছেন, সেখানেও অন্তরাতে গিয়ে আর রাগের শুদ্ধতা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করছেন না। অন্যত্রও যখন কোন রাগে গান বাঁধছেন, কখনই গানের বাঙালিত্বকে ভুলে রাগকে বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছে না। 'ওগো কাজলনয়না হরিণী'-র প্রথম লাইন তিলং রাগের কথা মনে করালেও, 'চঞ্চল ময়ূরী এ রাত'-এর আশাবরীর কথা মনে করালেও, 'যেওনা দাঁড়াও বন্ধু' কেদারের কথা মনে করালেও প্রতিটি গানই শেষ অব্দি বাংলা গান হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পায়। এ তো রবীন্দ্রনাথ দেখানো পথ। বাংলা গানকে কালোয়াতি থেকে মুক্তি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের দেখানো পথেই হেমন্ত হাঁটলেন। তার জন্যে তাঁকে পাশ্চাত্য চলনের শরণ নিতে হল না। বাংলা গানের বহু ডাকসাইটে সুরকারই পাশ্চাত্য ঢঙের সাহায্য নিয়েছেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় থেকে হিমাংশু দত্ত থেকে সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্তরা। হেমন্ত নিজে সে পথে হাঁটলেন না। যেমন প্রথম জীবনের 'বাল্মীকিপ্রতিভা' বা 'কালমৃগয়া'-র পরে সেরকমভাবে রবীন্দ্রনাথও হাঁটেননি।

    আরেক জায়গায় হেমন্ত রবীন্দ্র-অনুসারী। রবীন্দ্রনাথই প্রথম ঢালাওভাবে বাংলা গানে ধ্রুপদের চারতুকের (স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ) আমদানী করলেন। রবীন্দ্রনাথের গানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর সঞ্চারীর প্রয়োগ। হেমন্তও সঞ্চারী করতে খুব ভালবাসতেন। বাংলা আধুনিক গানের শ্রেষ্ঠ কিছু সঞ্চারী হেমন্তর রচনা। বাংলা দেশজ গানে চারতুক নেই, যদিও কেউ কেউ (যথা, হাছন রাজা) কোন গানে চারতুকের আদল এনেছিলেন। নইলে দেশে গানের অধিকাংশই ABBB আঙ্গিকে। হেমন্ত কিন্তু 'পলাতক' ছবিতে যখন দেশজ সুরে 'জীবনপুরের পথিক রে ভাই' করছেন, সেখানেও 'মন চলে আগে আগে'র মতন সঞ্চারী ভরে দিচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানকে সঞ্চারী শিখিয়েছিলেন। এবং তিনি গানে সঞ্চারীকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছিলেন - শুধু সুরে নয়, কথায় এবং ভাবনায়ও - যে পরে কেউই সেই উচ্চতায় উঠতে পারলেন না। বরং অধিকাংশ সময়ই সুরের একঘেয়েমি কাটাতে সঞ্চারীর ব্যবহার হয়েছে। সুরকার হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর ব্যতিক্রম ছিলেন। হেমন্তর গানে কথায়-সুরে সঞ্চারীকে সঞ্চারী হিসেবে ব্যবহার করার স্পষ্ট প্রয়াস দেখা যায়।

    তবে যে ব্যাপারে সুরকার হেমন্তর রবীন্দ্র-অনুসারিতা সবচেয়ে বেশি, তা হল গানের সুরে কথাকে ওজন দেওয়া। বাংলা গানের ধারায় মোটামুটি তিরিশের দশক অব্দি বাংলা গানের রচনা মোটামুটি অখণ্ড শিল্প ছিল - যিনি গান লিখছেন তিনিই সুর করছেন। লোকসঙ্গীত তো ছেড়েই দিলাম, নাগরিক সঙ্গীতও আদি থেকে সেই ধারাতেই চলে এসেছে। নিধুবাবু নিজে লিখে নিজেই সুর করতেন, সমসাময়িকরাও তাই। শ্রীধর কথক, গোপাল উড়ে থেকে ক্রমশ রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, অমৃতলাল বসু - সকলেই নিজের লেখা গানে নিজেরা সুর করতেন। সবাই হয়ত যেরকম মাপের গীতিকার, সেরকম মাপের সুরকার ছিলেন না। কিন্তু বাংলা কাব্যগীতির ধারা মেনে কথা-সুরের ভারে সমতা সর্বদাই রক্ষিত হয়ে এসেছে। নজরুলের সময়ে এসে এই অখণ্ড শিল্পসৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটল। গানের কথা একজন লিখলেন, সুর করলেন আরেক জন। নজরুল নিজের কথায় নিজেই সুর বসালেও প্রায় সমসাময়িক হিমাংশু দত্ত, শচীন দেব বর্মনদের সুরে কিন্তু কথা বসাচ্ছেন অজয় ভট্টাচার্য, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদাররা। খণ্ডশিল্প হয়ে যাওয়ায় হয়ত এই সুবিধেটা হল যে যিনি সুরটা ভাল বোঝেন তিনি শুধু সুরেই মনোনিবেশ করলেন, গানের কথা লেখা নিয়ে তাঁকে মাথা ঘামাতে হল না। অ্যান্ড ভাইসি-ভার্সা। কিন্তু তার ফলে যেটা দাঁড়াল তা হল এতদিন ধরে গানের মান যাই হোক, কথা আর সুরের মধ্যে যে সাযুজ্য বহাল ছিল, সেটা আস্তে আস্তে খসে যেতে লাগল। হিমাংশু দত্ত সুরের ছটায় শ্রোতাদের যেরকম মুগ্ধ করলেন, তাতে তাঁর গানের কথা কিছুটা পিছিয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হল। ক্রমশ বাংলা গানের সুরের শক্তি কথাশক্তিকে শুধু ছাড়িয়েই গেল না, কথা-সুরের ভারসাম্যও অনেকটাই হারিয়ে যেতে থাকল। সলিল চৌধুরীর মতন শক্তিশালী কবি ও গীতিকারও সুরের প্রতি যত দৃষ্টি দিয়েছেন, কথার প্রতি তত দৃষ্টি দেননি। সুধীন দাশগুপ্তও - যিনি অনেক সময়েই নিজের কথায় সুর বসিয়েছেন, বা বলা ভাল নিজের সুরে কথা বসিয়েছেন - তাঁরা গানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

    হেমন্ত নিজে কথা না লিখলেও, সুরের সময়ে কথাকে গুরুত্ব দিতেন খুবই বেশি। এমনকি নিজের গানের প্রথম লাইন নিজেই লিখে গীতিকারকে দিতেন বাকি গান লেখার জন্যে। এইভাবেই লেখা হয়েছিল "ওগো মেঘ তুমি উড়ে যাও কোন ঠিকানায়" বা "কতদিন পরে এলে, একটু বোসো"-র মতন গান। হেমন্তর সুরে সেই জন্যে কখনই গানের লাইনের অসম বিভাজন বা সুরের প্রয়োজনে শব্দের উচ্চারণের বিকৃতি আমরা দেখি না। সলিল চৌধুরীর সুরের প্রয়োজনে গানের লাইনের বিভাজন করেছেন যা কথা বলার ডিকশনের সঙ্গে ষোল আনা মেলে না। রাহুল দেবের সুরে দেখেছি সুরের প্রয়োজনে কথার উচ্চারণ সাবেক বাংলা উচ্চারণ থেকে সরে গেছে ('যাবক্কি যাবনা, ভেবেব্‌ ভেবে হায় রে')। এ ধরনের জিনিস হেমন্তর সুরে খুঁজে পাওয়া শক্ত। এই কথা বলার মধ্যে ভাল-মন্দ কোন মত আরোপ করতে চাইছি না, হেমন্তর সুরের স্বকীয়তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি। হেমন্তর নিজের সুরে শ্রেষ্ঠ কিছু গানের উল্লেখ করলে হয়ত ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হবে। ১৯৫৫ সালে শাপমোচন ছবিতে 'সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা' শুধু যে কথায় আর সুরে রবীন্দ্র-অনুসারী তাইই নয়, এই গানের অন্তরা ('নবচেতনার রক্তকমলদলে, অগ্নিভ্রমর দিগন্তে জাগে রাগিণীর পরিমলে') বাংলা আধুনিক গানের অন্যতম স্মরণীয় সঞ্চারী। যদিও হেমন্ত এই সুর করেছিলেন 'নাগিন' ছবির প্রকাণ্ড সাফল্যের পরে। তখনকার যোগাযোগের যা (অ)ব্যবস্থা, তাতে বম্বের স্থায়ী বাসিন্দা হেমন্ত বাংলা গানের হালচাল সম্বন্ধে তত ওয়াকিবহাল নেই। বলেছিলেন, "... আমি যখন সেই সব সুর করছি - বস্তুত অনেক দিন পর বাংলায় সুর করছি - আমার শুধুই মনে হচ্ছে, নাঃ! কিচ্ছু হচ্ছে না।" [আমার গানের স্বরলিপি - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়] অথচ 'শাপমোচন' ছবির গান একেবারে বাঙালি সেন্সিটিভিতে মোড়া। একইরকম ভাবে ১৯৬১ 'স্বরলিপি' ছবির 'যে বাঁশি ভেঙে গেছে'। সে গানের সঞ্চারীও অসাধারণ ('একদা সুরে সুরে/ দিত যে হৃদয় ভরে/ দেখ তা গানের বীণা ধূলায় পড়ে')। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এই দুই গানের সময়েই হেমন্ত পুরোদস্তুর মুম্বাইয়া। কিন্তু বম্বের অভিজ্ঞতা হেমন্তর সুরে তেমন কোন প্রভাব ফেলেনি, যেটা শচীনদেব বর্মনের হয়েছিল, গানে সঙ্গীতায়োজনে সলিল চৌধুরীর হয়েছিল।

    এই সম্বল করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর জীবনের শেষ পনেরো-কুড়ি বছর বাংলা ছবির সুরকার হিসেবে প্রায় একচ্ছত্র রাজ্যপাট চালিয়েছেন। আধুনিক সঙ্গীত রচনার অনেক প্রকরণই তাঁর অন্তঃস্থ ছিল না। আধুনিক প্রকরণ বলতে বলছি হারমোনিক প্রোগ্রেশনের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান। সমসাময়িক সুরকারদের মধ্যে সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত আর ভি বালসারা বাদে আর কারই বা ছিল! ছিল না রাগসঙ্গীতেরও কোন গভীর শিকড়। কিন্তু সহজাত সঙ্গীতবোধ আর বাঙালি সেন্সিটিভিটি দিয়ে যতদূর যাওয়া সম্ভব তিনি তা গেছেন। আর ৯৯% বাঙালির জন্যে রেখে গেছেন এক বড়সড় খাজানা।



    অলংকরণ (Artwork) : টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া থেকে
  • আধুনিকে হেমন্ত | হেমন্তর রবীন্দ্রসঙ্গীত | সঙ্গীত পরিচালক হেমন্ত
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)