




ওই সামনে তাকিয়ে দেখুন ল্যাম্পোস্টের আলোয় দীর্ঘ ছায়া— টেরিকটনের প্যান্ট, হাফ শার্ট, কাপড়ের ঝোলা কাঁধে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন একজন। ছায়ারা বড়ো হয়, মানুষ ততটা নয়। স্মৃতিতে তালগোল সব— দুর্গা পিথুরি লেন, ঢাকুরিয়া, নুঙ্গি-বাটানগরের গঙ্গার পার, গোবরডাঙা স্টেশন। এখন হয়তো দেখুন হলদে আলো-জ্বলা ইট-পাতা রাস্তা দিয়ে ঘরে ফিরছেন। তাঁর শরীরে কাগজ-কালির গন্ধ। তাঁর ঘরে দেওয়ালে-দেওয়াল বইপত্তর, ভ্যান গঘ, রবীন্দ্রনাথ। ঘরের দক্ষিণ দিকে একচিলতে বারান্দার গায়ে দরজায় পিঠ রেখে বসে আমি তাঁকে দেখেছি সামনের বিছানায় আলগোছে শুয়ে থাকতে। এখন মনে হয় জানি না তিনি সেইখানে শুয়েছিলেন কি না। কারণ কিছুক্ষণ আগেই স্তূপাকার ইংরেজি-বাংলা বই নামানো হয়েছিল সেই বিছানায়।
তাঁর নাম বলিনি এখনও না! ধরুন নীলু, সৈকত কিংবা কৃষ্ণগোপাল— যাই হোক না কেন। তিনি নিজেই খুঁজছেন তাঁর নাম। নামও নয়, জানতে চান তিনি আসলে কে? তাই এই নিরন্তর কড়া নাড়া। বিলায়েত খানের ঝালার মতো বেগবান কিন্তু অস্থির নয়। আরও খনন, আরও আরও। তাই চলনে বলনে কবিতা, নাটক, গদ্য আর রক্ত। ভলকে ভলকে। কলেজ স্ট্রিটে, নাকতলায়, শান্তিনিকেতনে, ছাপাখানায়, লাইব্রেরির আবছায়ায়। কিন্তু কে আর মানুষকে অত গুরুত্ব দিয়ে দেখে। ইতিহাস কবে কথা বলে। সে তো ঘাড়নাড়া বুড়ো, সুতো আছে অবনী কিংবা নিখিলেশের হাতে। অবনী কিংবা নিখিলেশরা হয়তো সোদপুর থেকে আসে, ব্যাকব্রাশ করা চুল, গোল ফ্রেম চশমা, ডান হাতে ঘড়ি। হরি ঘোষের গোয়াল থেকে বাংলায় এমএ ড্রপ আউট। কিন্তু গোলদিঘির হাওয়া গায়ে লাগলে কি কবিতার কাগজ না বের করে থাকা যায়? এই সংক্ষেপে ব্যক্তিপরিচয়। আর বাকিটা একেবারেই ব্যক্তিগত স্তরে। একা একা কথা বলা। নাটকীয় একোক্তি তো বটেই, কিন্তু তাতে আরিস্ততলের কিংখাব জড়ানো নেই। বরং হাত জড়িয়ে ধরার আকুতি আছে। বন্ধুর কাঁধে বিষণ্ন মুখ রেখে নিজেরই নষ্টকোষ্ঠী উদ্ধার। অলটার ইগোর সঙ্গে জামা বদলে নিয়ে পাশাপাশি হেঁটে চলা। আমি ভাবছি বুঝি সে, কিন্তু সে আসলে সে নয়, পাশের জন। তাতে হয় কি, আপনার মনের ভেতরটাও সে স্পষ্ট পড়ে নিতে পারে।
যেভাবে পিছলে তার সংলগ্ন হয়ে পড়েছি, ভোরে যখন একপাতা লেখা ফেলে রেখে সে চলে যায় তখন সেই লিপি থেকে লাল রং গড়ায়। তার ঘুমন্ত মুখ ছাড়া আমার আর কিছু মনে নেই। স্মৃতি থেকে মুছে গেছে সব। কেউ বলতেও পারে না আর কি কখনো কবে আবার দেখা হবে। অন্ধত্বের মহামারিতে আক্রান্ত হলাম না কি? চোখের সামনে থেকে লোকটা উবে গেল কী করে!
কিন্তু একবার ঘুম থেকে উঠেই মনে হয় হারায়নি তো। নেভেনি আলো। কোথাও বিরোধ নেই। শত্রু-মিত্র, প্রতিষ্ঠান-প্যারালাল, পুরস্কার-জলসত্র, কাশী বিশ্বনাথ-পল্টনদার চায়ের দোকান সব একাকার। ছাপোষা বলে ক্রমাগত প্রত্যখ্যান সইতে সইতে একদিন ভোরবেলা এভাবেই আমরা আত্মপ্রতিকৃতি আঁকতে শুরু করি। ফটোগ্রাফ তো নয়, তাই নিখুঁত থাকার দায় নেই। আমরা কেবল দরজা খুলে তাকে দেখতে চাইনি— ‘ওই একটি পরমাদ ছিল’।
* শিরোনামের পঙ্ক্তিটি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে নেওয়া।