• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ১০৪ | অক্টোবর ২০২৬ | রম্যরচনা
    Share  
  • রকবাজির আড্ডা (৭) : রঞ্জন রায়

    যে যার মাল নিজদায়িত্বে রাখিবেন (কোলকাতা পর্ব ৪)

    আমাদের আড্ডার স্থায়ী সদস্য সংখ্যা কমেছে। কারণ, সুদীপ নায়কোচিত বীরত্ব দেখিয়ে সুভদ্রাহরণ করল বটে, কিন্তু আমাদের আড্ডায় আসা ছেড়ে দিল। না না, কোন মনকষাকষি হয় নি। আসলে ওর শ্বশুরের সংগে ট্রেড প্যাক্ট বা ব্যবসায়িক সন্ধি হয়েছে। (পর্ব ৩ দ্রষ্টব্য)

    ওকে জুতোর দোকানের সেলসম্যানের চাকরি ছাড়তে হয়েছে। জাত-বেজাত-অজাত-কুজাত বড়লোক-ছোটলোক ছেলেমেয়ে বুড়োবুড়ি সবার পায়ে হাত বুলিয়ে জুতোর মাপ নেওয়া, জুতো পরানো? কভী নেহি!

    বামুন জামাই পেয়ে ওর গয়লা ঘোষ শ্বশুর হঠাৎ করে মেয়েজামাইয়ের জাত ও মর্যাদার ব্যাপারে খুব চেতে উঠেছেন। কিন্তু সুদীপ যে কয়েক বছর ধরে শুধু একটা কাজে দক্ষতা অর্জন করেছে, তা হল আন্দাজ করে মেপে নেয়া—চোখে দেখে জুতোর সাইজ এবং খদ্দের দেখে তার মানিব্যাগের ওজন। তাই ওর বউ বাবাকে ধরল—তুমি একটু সাহায্য করলে, মানে ক্যাপিটাল—

    —ক্যাপিটাল!

    কোলকাতা যে পশ্চিমবঙ্গের ক্যাপিটাল সেটুকু জ্ঞানগম্যি ওনার আছে। কিন্তু মেয়ে কী বলতে চায়?

    —বাবা, তুমি যা চাও তাই হবে। তোমার জামাই অবাধ্য হবে না। জুতোর দোকানের কাজ ছেড়ে দেবে। কিন্তু আমরা খাব কী?

    —খাবি কী? ভাত ডাল মাছের ঝোল যা সবাই খায়। ঝামেলি কোতায়?

    —উঃ বাবা তুমি না! আরে চাকরি ছেড়ে দিলে মাসের খরচাপাতি, শাড়ি জামাকাপড়, পদ্মশ্রীতে সিনেমা দেখা—এসবের টাকা কোত্থেকে আসবে?

    —সেটা তোরা ঠিক কর, আমি কী বলব? ওকে কি ঘরজামাই বানাতে চাস?

    —না বাবা, ও নিজে জুতোর দোকান দেবে। অন্যের গোলামি নয়। সেইজন্যেই তোমার হেল্প চাই। নতুন কিছু করতে গেলে পুঁজিপাটা দরকার। যদি কিছু ধার দিতে পার—! ও তো কোন পণ চায়নি। এককাপড়ে আমাকে নিজের বাড়িতে তুলেছে। আজ যদি —

    —ফন্দিটা কার, জামাইয়ের?

    —না বাবা, আমার। ওর ভীষণ সম্মানবোধ। অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছি। একটু লাভ হলেই তোমাকে কিস্তিতে শোধ দেবে।

    শ্বশুর মশায় ভির্মি খেলেন। ওনার দুধ, দই নিয়ে কারবার। কিন্ত নিজের মেয়ে রাধা এমন ঘোল খাওয়াবে এটা উনি ভাবেননি। ওনাকে তো আরেকটি মেয়েকে পার করতে হবে—বৃন্দা।

    হুঁঃ, নয় মণ তেলও পুড়বে, রাধাও নাচবে! ভাবতে গিয়ে খেয়াল হল –তেল পুড়ুক না পুড়ুক, রাধা নাচছে। আর ওনাকেও নাচাতে শুরু করেছে। নাঃ, এর একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার। এখন থেকেই। কথায় আছে না—কাঁচায় নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে টাঁশ টাঁশ।

    —ঠিক আছে। আজ সন্ধ্যেবেলা জামাইকে নিয়ে আয়, সামনাসামনি কথা হবে। ও হ্যাঁ, রাত্তিরে খেয়ে যাবি।

    রাধার মুখে হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে— বাপি! আমি জানতাম, তুমি আমার কথায় কক্‌খনো না বলবে না।

    —তাহলে ওই কথাই রইল।

    বৃন্দা দুষ্টু দুষ্টু হাসি নিয়ে উঁকি মারে।

    —না বাবা; তোমার প্ল্যান একটু বদলাতে হবে।

    —কেন, সন্ধ্যায় তোর কোচিং ক্লাস? আজ তো রোববার।

    —সে কথা নয়। রাত্তিরে খেয়েদেয়ে ফেরার পথে বিধান পল্লীর ক্লাবের ছেলেরা যদি সুদীপ জাম্বুকে ক্যালায়?

    —ক্যালায়? এটা আবার কী কথা? ঘরের মেয়ে রাস্তার ভাষা আওড়াচ্ছে! আর জাম্বু কী, জামাইবাবু বল! ও কি জাম্বুবান! বামুনের ঘরের ছেলে বলে কতা!

    —সরি বাবা! যদি প্যাঁদায়? মানে জামাইবাবুকে ঠ্যাঙায়?

    —বিনি! যা গিয়ে জিভ ছুলে আয়। ওরা খামোখা সুদীপকে মারতে যাবে কেন?

    রাধা বলে ওঠে—বিনি ঠিক বলেছে বাবা। তুমিই তো সেবার ওদের কীসব বলে তাতিয়েছিলে। তোদের পাড়ার মেয়েকে একটা বেপাড়ার ছেলে এসে তুলে নিয়ে যাবে আর তোরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবি গোছের কী যেন! তারপর ওরা চুক্কি খেয়ে গেল। যদি সেই খার তুলতে—

    ঘোষ হতাশ। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়তে পারে। উনি ওদের ক্লাবের পুজোয় মোটা চাঁদা দেবেন কথা দিয়েছিলেন—অবশ্য ওরা যদি হবু জামাইকে দু’ঘা দিয়ে বিয়ে কেঁচিয়ে দিতে পারে।

    —আচ্ছা আচ্ছা! কাল দিনের বেলায় আয়, তোরা যা ভাল বুঝিস।

    পরের দিন সব ভালয় ভালয় মিটে গেল। সুদীপ যেন দ্বিতীবার দ্বিরাগমনের খাওয়া খেল। শুধু শাঁখ বাজানো আর উলু দেয়া বাকি ছিল।

    কথা হল—সুদীপ গোড়ায় শ্রীলেদার্স আর রাদুর জুতোর ডিলারশিপ নেবে। সেটার সিকিউরিটির টাকা ঘোষমশায় দেবেন। এছাড়া প্রথম ছ’মাস মাল তোলার টাকা শ্বশুর দেবেন, ধারটার নয়, পাকাপাকি ইনভেস্টমেন্ট। সুদীপ গলে জল। এতটা আশা করেনি।

    সুদীপকে দুটো কাজ করতে হবে। দোকান ঘর ঠিক করে তার সেলামির টাকা ও দোকান সাজানো, ফার্নিচার—অর্থাৎ শো কেস, র‍্যাক, চেয়ার ও কাউন্টার— এসবের ব্যবস্থা করতে হবে। সুদীপ রাজি। ওসব বাড়ি থেকে ও বন্ধুবান্ধবের থেকে হয়ে যাবে।

    এমন সময় শাশুড়ি মাঠে নেমে ছক্কা হাঁকালেন।—দুটো কথা বাবা। দোকানের রেজিস্ট্রি হবে আমার মেয়ের নামে। দোকানের নাম হবে শ্রীরাধা লেদার্স!

    সুদীপ এমন ইয়র্কারে বোল্ড!

    যথাসময়ে শ্রীরাধা লেদার্সের উদ্বোধন হল। পরের দিন থেকে রাধা সেজেগুজে কাউন্টার সামলাতে লাগল। সুদীপ আগের চাকরির মতই হবু খদ্দেরদের জুতো এনে দেখাতে, পায়ের মাপ নিতে ও পায়ে হাত দিয়ে জুতো পরাতে লাগল। খদ্দেরটি তন্বীশ্যামা শিখরিদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী হলে রাধা আড়চোখে সুদীপের দিকে নজর রাখতে শুরু করল। বলা তো যায় না। মা সতর্ক করে দিয়েছে।

    শুধু ব্যস্তসমস্ত সুদীপের আড্ডায় আসা বন্ধ হয়ে গেল, পাকাপাকি ভাবে। জুতোর দোকানের মালিক রকে বসবে? একটা সিগ্রেটে ভাগাভাগি করে টান দেবে—ভাবা যায় না।

    আমরা ভাবছিলাম আড্ডায় কোন নতুন মেম্বারকে এন্ট্রি দিলে কেমন হয়! তাহলে চা সিগ্রেটের খরচার আর একজন শেয়ারহোল্ডার জুটবে। তাই ভন্টু নিয়ে এসেছে ওদের নতুন ভাড়াটেকে—সদানন্দ মণ্ডল। দেখতে একটু গোবেচারা গোছের। সারাজীবন হিন্দি বলয়ে কাটিয়েছে। ব্যাংকের চাকরি। সদ্য ট্রান্সফার হয়ে কোলকাতায় এসেছেন সদানন্দ, বাঁশদ্রোণী শাখায়। অসুবিধে একটিই—বাংলা বলেন রাষ্ট্রভাষা মিশিয়ে। ঠিক হয়েছে আপাতত আমাদের আড্ডায় ওনাকে ছ’মাস প্রোবেশনে থাকতে হবে। তারপর দেখা যাবে।

    এমন সময় আমাদের সবচেয়ে ছোট অথচ পোঁয়াপাকা সদস্য শ্রীমান পচা দুটো নতুন সমস্যা নিয়ে হাজির হল।

    —আজ সিনিয়রদের থেকে একটু পরামর্শ চাই, এই বলে পচা সুবীরদার দিকে তাকায়।

    সবাই অবাক, পচা চাইছে পরামর্শ! ওর মাথায় তো সারাক্ষণ নানান ফন্দিফিকির উকুনের মত কুটকুট করে। সবাই অপেক্ষা করছে ওভারের প্রথম বলের জন্যে—গুড লেংথ, নাকি হঠাৎ বুকের কাছে লাফিয়ে ওঠা শর্টপিচ?

    পচা খানিকক্ষণ আঙুল দিয়ে নখ খুঁটতে থাকে। তারপর হঠাৎ মুখ তুলে শুরু হয়ে যায়।

    “ফুলবাগানের বুলটিকে মনে আছে? সেই যে দেয়াল পত্রিকায় (মানে ঠেকের পেছনে ইঁটের দেয়ালে) চক দিয়ে একটা ছড়া লিখেছিল? আপনারা বললেন—স্টকহোম কন্ডোম না কি যেন”?

    নতুন সদস্য সদানন্দ লাফিয়ে ওঠে—কেয়াবাত! কেয়াবাত! আপুনি সিন্ড্রোমকে কন্ডোম বানিয়ে দিলেন—গাঁড় মেঁ দম হ্যায়, মাননা পড়েগা।

    —আরে ওকে আপনি বলতে হবে না। শ্রীমান পচা এখনও স্কুলে পড়ে। হ্যাঁ, ও হোল আমাদের আড্ডার আনকাট ডায়মন্ড। নে পচা, শুরু কর।

    —কাল অনেকদিন পরে গিয়েছিলাম ফুলবাগানে পুরনো বন্ধুদের সংগে দেখা করতে। গিয়ে দেখি হেব্বি ক্যাচাল! পরশু ফুলির বাবা বুলটিদের বাড়ি এসে ওকে আর ওর মাকে ধমকে গেছে। বলেছে—আপনার ছেলেকে বলুন সমঝে চলতে। যদি কখনও আমাদের বাড়ির আশেপাশে ছোঁক ছোঁক করতে দেখি তাহলে বিপদ আছে। কখনও যেন সর্বাণীর সংগে কথা না বলে! ধরতে পারলে হাড়গোড় ভেঙে দেব।

    উনি শেয়ালদার রেলে টিকিট চেকার। ডব্লিউ টিদের দেখেই বুঝতে পারেন এবং ক্যাঁক করে ধরেন। কালো কোট চাপিয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে হেবি র‍্যালা নিয়ে ঘোরেন।

    এদিকে বুলটির বাবা নেই, এককামরার টালির ছাদওলা বাড়ি। মা প্রাইমারি স্কুলের টিচার।

    বিজন বলে-–তারপর?

    বিপুল ফুট কাটে—ইন্টারেস্টিং!

    ভন্টুদা বলে-–কেস জমেছে। মনে হচ্ছে লম্বা টানবে। তা পচা একটু খর্চাপাতি কর। বেশি না সবার জন্যে তোর নামে লিখিয়ে চা নিয়ে আয়।

    পচা মাথা চুলকোয়—অপরাধ নেবেন না। আপনার কথা ন্যায্য। তবে আমি এখনও স্কুলের ছাত্র। পকেট মানি পাই নে। তাই অধীরদা আমার নামে ধারের খাতা খুলবে না বলে দিয়েছে। কিন্তু আমি যা পারি সেটা করেছি। আপনাদের জন্যে এক প্যাকেট চারমিনার আর টেক্কা মার্কা দেশলাই নিয়ে এসেছি। এটাই মেনে নিন।

    নারায়ণ বলে—সত্যিই তো, পচাকে সবাইকে চা খাওয়াতে বলা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। ঠিক আছে, চায়ের পয়সা আমি দেব। আজ বৌদি টিউশনির মাইনে দিয়েছে। দু’মাসের বাকি ছিল—সবটা একসাথে দিয়েছে। কারণ মেয়েটা পাশ করেনি, কিন্তু ছেলেটা করেছে।

    বাধা দেয় নতুন ক্যান্ডিডেট সদানন্দ — আজ আমার পহেলা দিন। আজকের সব খরচ আমার জেব থেকে হবে। আপলোগ না করিয়েন না। আমি এই পঞ্চাশ টাকা অ্যাডভান্স দিলাম। লে লো শ্রীমান জী।

    সিনিয়র মোস্ট আড্ডাধারী এবং চারুচন্দ্র কলেজের কালচারাল সেক্রেটারি সুবীর বলে—কেস শুনলাম, ভাবতে দে। ততক্ষণ চা নিয়ে আয়।

    হতাশ পচা চেঁচিয়ে ওঠে—আরে তোমরা আসল কেসটা শোনইনি। বলতে দিলে কই! মাঝখানে ভন্টুদা ডাইভ মারল।

    তিমির বলে—ও বাবা, আরও আছে? তুই যে বললি একটা কেস। বেশ, বলে ফ্যাল।

    —শোন তা’লে। বুলটির মা, আমাদের সার্বজনীন মাসিমা, কিন্তু ঝগড়ায় ওস্তাদ। শিঙ মাছের মত পট করে কাঁটা ফুটিয়ে দিতে পারে। প্রথমে গম্ভীর মুখ করে বলল—সর্বাণী কে? চিনি না তো?

    —আমার মেয়ে। আপনি না চিনলেও আপনার ছেলে ঠিক চেনে।

    —আপনার ক’টি মেয়ে?

    —ইয়ার্কি করছেন? একটিই মেয়ে। যার পেছনে আপনার বখাটে ছেলে ঘুরঘুর করে।

    —অ! ফুলি? সে আবার কবে সর্বাণী হোল? যাকগে, ছেলে আপনার বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করে প্রমাণ করতে পারবেন? মোবাইলে ছবি তুলেছেন? কই দেখান দিকি।

    ফুলির বাবা রাগে বাক্যহারা।

    —এবার থেকে ছবি তুলে রাখব।

    —তখন নালিশ করতে আসবেন। এখন যান, নইলে চেঁচিয়ে পাড়ার লোক ডাকব, পুলিশও ডাকতে পারি। কারও বাড়িতে জোর করে ঢুকে একা মেয়েছেলেকে ধমকানো, ভয় দেখানো আবার গালমন্দ করা! আমার ভাই ব্যাংকশাল কোর্টের নামজাদা উকিলের মুহুরী।

    আচমকা পালটা আক্রমণে মেশোমশাই, মানে ফুলির বাবা, পিছোতে লাগলেন।

    —আমি-–আমি আপনার ঘরে জোর করে ঢুকেছি? এটা কী বললেন!

    —না; আপনাকে আমি নেমন্তন্ন করে এনেছি। এটাকে বলে ট্রেসপাস! আর চলে যেতে বললেও যাচ্ছেন না।

    —এত মিথ্যে কথা বলবেন না বৌদি। আপনি একজন টিচার। ছেলেপুলেকে কী শিক্ষা দিচ্ছেন? আমি কোথায় গালি দিয়েছি?

    —আমার ছেলেকে বলেছেন-–বখাটে! এটার মানে ডিকশানারিতে দেখে নেবেন। এটা গালি নয়, ভাল কথা?

    —খামোখা আমার মেয়ের পেছনে লাগা বখামি নয়? স্কুল যাবার সময় ওর সংগে দেখা করে—

    মাসিমা হাত তুলে থামালেন।

    —কথাটা সত্যি, তবে আমার কাছে খবরটার আগে পিছে আরও আছে। ফুলি আমার ছেলেকে চিঠি দিয়ে স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখা করতে বলেছিল, ও তাই গেছল।

    —যা নয় তাই! আপনার গুণধর ছেলে যা বলবে তাই মানতে হবে?

    —তা কেন, সেই চিঠি আমি নিজের চোখে দেখেছি, নইলে বলতাম না।

    মেশো শান্ত কিন্তু হিমশীতল গলায় বললেন—কই, দেখি সেই চিঠি? কার হাতের লেখা?

    —সেটা আপনাকে দেখাতে পারব না।

    —কেন? উনি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

    —কারণ, সেটা আমি ছিঁড়ে ফেলেছি, কুটিকুটি করে।

    —একটা মিথ্যেকে ঢাকতে?

    —না, আপনার মেয়ের সম্মান বাঁচাতে।

    আমি সেটা ছিঁড়ে ফেলে ছেলেকে বললাম যা, গিয়ে ফুলির সংগে দেখা কর। ওকে বুঝিয়ে বল এরকম চিঠি না লিখতে। অন্য কারও হাতে পড়লে বদনাম হতে পারে, ব্ল্যাকমেল হতে পারে। উঠতি বয়সের মেয়েদের অনেক বিপদ। সাবধানে চলাফেরা করতে হয়। এসব বাড়ি থেকেই শিখিয়ে দিলে ভাল হত। সে আপনারা দেননি। তাই গুরুমন্ত্র আমিই দিলাম। বলতে গেলে ফুলিও আমার মেয়ের মত।

    মাসিমার কথার তোড়ে মেশো মিইয়ে গেছেন। বল্লেন—কী সেই মন্ত্র?

    —যা বলার মুখে বলুক, কক্ষণো মনের কথা লিখতে নেই। শাস্ত্রে আছে না—শতং বদ, মা লিখ? ও আপনার বোধহয় ম্যাট্রিকে সংস্কৃত কম্বিনেশন ছিল না। ওর মানে-–মুখে যা খুশি বল, একশোবার বল; কিন্তু খবর্দার! ভুলেও কোন কিছু কাগজে লিখবে না। সেটা ডকুমেন্ট।

    মেশোমশায় বোল্ড আউট! সন্দিগ্ধ চোখে বুলটির মাকে দেখছেন, ভাবছেন আপিল করবেন কিনা। নো বল হয়নি তো? তারপর হাতের ছাতিটা বাগিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন এমন সময় পেছন থেকে বুলটির মা শিঙিমাছের কাঁটা ফুটিয়ে দিলেন।

    —যাবার আগে একটা কথা শুনুন। আমার ছেলেকে না ধমকে নিজের মেয়েকে সামলান।

    ফুলির বাবা ব্যালে ডান্সারের মত এক পাক ঘুরে গেলেন।

    —মানে?

    —মানে খুব সহজ। আপনি তো শ্যালদা’র রেলে চাকরি করেন। দেখেননি রেল কামরার দেয়ালে কী লেখা থাকে? ‘যাত্রীগণ নিজের মাল নিজদায়িত্বে রাখিবেন। খোয়া গেলে বা নষ্ট হইলে রেল কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে!’

    মেশোমশায় রাগে জ্ঞান হারালেন। মাসিমা নির্বিকার, শুধু চশমার কাঁচ আঁচল দিয়ে আরেকবার পরিষ্কার করলেন।

    —কী বললেন আপনি? আমার মেয়ে মাল? কোন বাবা তার মেয়েকে ‘মাল’ ভাবতে পারে। আপনি আবার টিচার! আপনার চাকরি যাওয়া উচিত।

    —অ্যাই! মুখ সামলে! আমার চাকরির দিকে নজর দিলে ভাল হবে না। রক্ত জল করে খেটে খাই, যা পাই তাতে সংসার চালাই। আপনার মত ঘুষের টাকা দিয়ে নয়।

    তারপর যা হল!—একেবারে বস্তিবাড়ির রাস্তার টিউকলে জলের লাইনের ঝগড়া! কেউ কম যান না। তবে মাসিমা বিশ, মেসো উনিশ—এই আর কি!

    পাড়ার ভিড় জুটল, লোক এল দু’পক্ষ থেকেই। সালিশি সভা বসল। কোন মীমাংসা হোল না।

    মেসোমশায় দশ নম্বরে নামা প্লেয়ারের মত ব্যাট হাঁকড়াচ্ছেন। –-এই মেয়েছেলে, যে নাকি টিচার, আমার মেয়েকে মাল বলেছে। এর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়ব।

    মাসিমা লাগাতার গুডলেংথে বল ফেলছেন।

    —ফুলি আমার মেয়ের মত। ওকে কেন মাল বলতে যাব? আমি খালি রেলওয়ের বিজ্ঞাপনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছি। রেটোরিক।

    ব্যাপারটা প্রায় দু’পক্ষে হাতাহাতির মত দাঁড়িয়ে গেল। অনেকে পেছন থেকে নারদ! নারদ! করে যাচ্ছে। বুলটি আরেক কাঠি সরেস। কোথায় মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা ঠান্ডা করবে তা না! ভিড়ের মধ্যে মাথা গলিয়ে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ বলে চোঁ চাঁ দৌড়।

    দুর্গাপুজোর আগে কোন ফয়সালা হোল না। শেষে খাপ পঞ্চায়েতের পাকাচুলের দল বললেন –ব্যাপার গুরুচরণ। দু’পক্ষেরই দোষ।

    ছেলেটা উঠতি বয়সের মেয়েকে স্কুলে যাতায়াতের পথে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে বকবকম করেছে। ওর মা উলটে মেয়ের বাপকে বলছে-–আগে নিজের মেয়েকে সামলান। মাল নিজদায়িত্বে রাখিবেন!

    ওদিকে মেয়ে নাকি আগ বাড়িয়ে চিঠি দিয়েছিল! মেয়ের বাপ একা থাকা মহিলার বাড়িতে চড়াও হয়ে ধমকেছেন, গালমন্দ করেছেন—কোনটাই ভালো কথা নয়।

    ফয়সালা হয়েছে দুপক্ষকেই সমঝোতা করতে হবে। একটা ফর্মুলা বের করতে হবে যাতে সবারই মানসম্মান রক্ষা হয় আর পাড়ায় শান্তি ফেরে। এখন দুর্গাপুজো হয়ে গেছে। বিজয়ার সময়েও দুপক্ষে কোন সমঝোতা হয়নি। এখন শেষ চান্স! কালীপুজোর আগে সমঝোতা করতে হবে। নইলে—

    —নইলে? নইলে কী হবে?

    —কী হবে কেউ জানে না। বড় কিছু একটা ঘটবে।

    চায়ে চুমুক দিয়ে বিজন বলল—সব শুনলাম। এর মধ্যে তুই কোথায়?

    তিমির নাক কোঁচকালো—ও তো ফুলবাগান বস্তির ব্যাপার। এর মধ্যে আমরা কী করব?

    পচা ফের মাথা চুলকোয়।

    —বুঝলে না? কালীপুজো আসতে বেশি বাকি নেই। তার আগে সমঝোতা চাই, এখন অব্দি কোন ফর্মুলা বেরোয় নি। আমাকে দেখে বুলটি অ্যান্ড কোং ফর্মুলা চাইল। যাতে সীজফায়ার হয়। ওর মায়ের স্কুলের চাকরির টিউব পাংচার না হয়। স্কুল কমিটির প্রেসিডেন্ট ফুলির বাবার বন্ধু।

    আমি বললাম-–মাথায় কোন আইডিয়া আসছে না। তাতে বুলটি প্রায় কেঁদে ফেলে। বললাম—দুটো দিন দে। আমার নাকতলার আড্ডার বড় বড় দাদা আছেন। সব জ্ঞানীগুণী, এক সে এক ফান্ডাবাজ! ওদের সামনে একবার তোর প্রবলেম নিয়ে ফেলে দেব। দেখবি দু’মিনিটে সলিড সল্যুশন! এখন তোমরা যা ভাল বোঝ করো। আমার দোষঘাট মাপ করে দিও।

    সত্যিই দু’মিনিটে সল্যুশন হয়ে গেল।

    পোড়া সিগ্রেটের শেষ চুসকিটা চায়ের খালি কাপে ফেলে বিপুল বলল—একটা আইডিয়া এসেছে। হুমায়ুন বাদশা—রাণী কর্ণা ফর্মুলা।

    আড্ডার মধ্যমণি সুবীর দ্বিতীয় সিগ্রেট ধরাতে গিয়ে থেমে গেল—সেটা আবার কী?

    —বুলটি আর ফুলি ভাইবোন পাতাবে। কালীপুজোর দু’দিন পরে ভাইফোঁটা। ফুলির বাবা আগে থেকে চিঠি লিখে বুলটিকে ওনার বাড়ি গিয়ে ফুলির হাতে ভাইফোঁটা নেবার জন্যে নেমন্তন্ন করে আসবেন। ব্যস, …

    ভন্টু বলল—এটা কোন সল্যুশন? এ তো সাইকেলের পাংচার সারানোর রাবার সল্যুশন; দু’দিন বাদে জোড় খুলে যাবে। কার লাভ হবে?

    শ্রীমান পচা এসে ঢিপ করে বিপুলকে পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম ঠুকল—দারুণ ফান্ডা বিপুলদা! একেবারে মারকাটারি সল্যুশন। এতে তিন পক্ষের লাভ। আমি গুনেছি।

    এক, দুই পরিবারের কিচ্যাইন খতম। দুই, পাড়ায় শান্তি। কিন্তু আসল লাভ বুলটি ও ফুলির। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করলে কিছু বলা যাবে না—ওরা ভাইবোন যে! মেশোমশাইয়ের মুখ বন্ধ। ওরা দুজন গাছেরও খাবে তলারও কুড়োবে।

    আমরা হৈ হৈ করে উঠি—ল্লে পচা!!



    অলংকরণ (Artwork) : অনন্যা দাশ
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  •   (?)
  • মন্তব্য পড়ুন / Read comments