• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৩ | জুলাই ২০২১ | রম্যরচনা
    Share
  • পঞ্চাশ-ষাটের হারিয়ে যাওয়া কোলকাতার চালচিত্র ((১২) : রঞ্জন রায়


    (একে চন্দ্র, দু’য়ে পক্ষ। সমুদ্র মন্থনেও দুই দল, এ ধরেছে শেষনাগের মাথা তো ও মুড়ো। এদিকে বিষ্ণুর মোহিনী মায়ায় সব লণ্ডভণ্ড। উঠল গরল, উঠল অমৃত। ভাই–ভাই ঠাঁই–ঠাঁই হল। আজও সেই দায় বয়ে চলেছি আমরা। এটি তারই এক আখ্যান, এক বাঙাল কিশোরের চোখে। এর ইতিহাস হওয়ার দায় নেই।)

    দ্বিতীয় ভাগ

    || হারিয়ে যাওয়া কোলকাতার গল্প (১৯৬০—৭০) ||


    গৌরচন্দ্রিকা

    প্রথম ভাগে বলেছিলাম পঞ্চাশের দশকের কোলকাতার গল্প। এক বাঙাল বালকের চোখে স্বাধীনতা ও দেশভাগের ঘা নিয়ে লাগাতার বেড়ে ওঠা কোলকাতাকে দেখা। এবার স্মৃতির ঝাঁপি খুলছি ষাটের দশক নিয়ে, শেষ হবে সত্তরের দোরগোড়ায় পৌঁছে। ছয় দশক আগের কথা।

    আমার ব্যক্তিগত জলছবির খাতা খোলার আগে একবার সামগ্রিক ছবিটা কত বদলে গেছে তার একটি স্কেচ আঁকা দরকার বলে মনে হয়। ষাট বছরে এই মহানগরে কত কিছু পালটে গেছে। যাকে বলে ‘পরিবত্তোন’। শুধু বহিরঙ্গে নয়, অন্তরঙ্গেও।

    বদলেছে পরিবারের গড়ন, বদলেছে নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনায়, কথাবার্তায়, বদল এসেছে মূল্যবোধে, বিশেষ করে মেয়েদের জীবনে।

    এই গৌরচন্দ্রিকায় সেই স্কেচ আঁকার প্রচেষ্টা যাতে বাঙালিজীবনের বাঁকবদলের কিছু দিকচিহ্ন ধরা পড়ে। তারপরে হবে আমার ব্যক্তিগত পথচলার জার্নাল।

    এ হল পাতে শুক্তো ও উচ্ছেভাজা। তারপর ডাল-বেগুনভাজা, মাছ-মাংস দই-মিষ্টি সবই আসবে একে একে; ততক্ষণ ধৈর্য ধরুন। আর জানেনই তো, বুড়োরা বেশি বকে।

    পরিবর্তন ও ক্ষয় জীবনের ধর্ম। এসব কথা ভগবান বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর আগে বলে গেছেন। বার্নার্ড শ’ খেয়াল করেছেন যে সমস্ত গোলাপসুন্দরীর ভবিতব্য হল একদিন বাঁধাকপি হওয়া। তাই বুদ্ধিমান অভিনেতারা কিছুদিন পরে সময়ের দেয়াললিখন পড়ে ফেলে ক্রমশ নায়ক-নায়িকার পালা সেরে দাদা-বউদি এবং আরও পরে বাবা-মায়ের ভূমিকা স্বীকার করে নেন।

    পুরানোর কাজই হল নতুনকে জায়গা ছেড়ে দেয়া। দেখুন, গান্ধীপরিবার এটা মানছে না, ফলে বার বার নাকের জলে চোখের হলে হচ্ছে। বঙ্গে ও ত্রিপুরায় সিপিএম বুঝতেই চাইছিল না যে বয়েস হয়েছে, নতুন চিন্তা দরকার। কেরালায় খেলাটা বুঝে জায়গা অদলাবদলি করে আজও দিব্যি রয়েছে।

    বিজেপি এটা বুঝতে পেরে ধুতি-পরা ধনুকবাণ-হাতে রথে-চড়া পিতামহকে বানপ্রস্থে পাঠিয়ে দিল, ফল পেল হাতেনাতে।

    বাঙালির ঘরেও ছেলে-ছেলেবউকে মেয়ে-জামাইকে ঘর ছেড়ে দেয়ার পালা চলতেই থাকে। কাজেই আমি কোন নবাব খাঞ্জা খাঁ যে ‘যা হারিয়ে যায়’ তা আগলে বসে থাকব? শায়েস্তা খাঁর সময়ে টাকায় আট সের চাল পাওয়া যাইত বলে কান্নাকাটি করব?

    করছি না, করব না। জানি নাকে কেঁদে কোনো লাভ নেই। কালের চাকা পেছনে ঘোরানো যায় না।

    “চোখ ভেসেছে বুক ভেসেছে ভেসে যাচ্ছে হিয়ে,
    খসম যদি থাকত কাছে পুঁছত নুমাল দিয়ে।”
    আমায় রুমাল এগিয়ে দেয়ার জন্যে কোন খসম বসে নেই, সবাই নিজের নিজের তালে আছে। কোন শাপমন্যি করছি না, আমিও তো একই রাশিতে জন্মেছি।

    তা বেশ, কিন্তু একটা কাজ করতেই পারি। তাহল পরিবর্তনের কিছু টুকরোটাকরা ছবিকে তুলে ধরা--মা যা ছিলেন, মা যা হইয়াছেন।


    বঙ্গ মানে কোলকাতা

    আমার কাছে বঙ্গ মানে কোলকাতা। কলোনিয়াল ঐতিহ্যের কোলকাতা, রিফিউজি কোলকাতা। আমি গ্রামবাংলার মুখ বুড়ো হওয়ার আগে দেখিনি। কোলকাতায় জন্মেও প্রথম জীবনে সুন্দরবন, শান্তিনিকেতন, সিরাজদৌল্লার আমবাগান, দার্জিলিং—কোথাও যাইনি। ষাটের দশকে কোলকাতা কেমন ছিল?

    মানে এমন এক কোলকাতা যেখানে একটাই ব্রিজ—হাওড়া ব্রিজ, খাবার জলের একটাই ট্যাংক, মানে টালা ট্যাংক। সবচেয়ে উঁচু বাড়ি বলতে নিউ রাইটার্স বিল্ডিং। এবং অক্টরলোনি মনুমেন্ট তখনও শহীদ মিনার হয়নি আর ঘোড়ায় চড়া ইংরেজ রাজপুরুষেরা তখনও উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। যদিও নেতাজি তখন থেকেই ডান-হাতের সঙ্গে ডান-পা এগিয়ে ভুল ভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাই আজও ‘দিল্লি চলো’ বাঙালির জন্যে কথার কথা হয়ে রয়ে গেল।

    আমার কোলকাতার সীমানা উত্তরে বাগবাজার -- শ্যামবাজার-পাইকপাড়া, পুবে ট্যাংরা-তিলজলা—বালিগঞ্জ স্টেশন-ঢাকুরিয়ার তনুপুকুরের মাঠ। দক্ষিণে গোলপার্ক-পঞ্চাননতলা—বড়জোর সেলিমপুর-যোধপুর পার্ক। তখনও ঢাকুরিয়ার ফ্লাই ওভার তৈরি হয়নি। নাকতলার ছেলেরা যাদবপুর পেরিয়ে ঢাকুরিয়া গেলেই বলত—কইলকাতা গেছিলাম।

    পশ্চিমে কাশীপুর থেকে গঙ্গার ধার, বড়জোর চেতলা। বেহালা ঠিক কোলকাতায় মনে হত না। ধর্মতলা তখনও লেনিন সরণি হয়নি। ডবল ডেকার বাস এবং ট্রাম সগৌরবে চলিতেছে। কোলকাতার কোথাও অটোরিকশার আবির্ভাব হয়নি। করপোরেশন এলাকায় হাত-রিকশা এবং মিউনিসিপ্যাল এলাকায় সাইকেল রিকশা। মোটরবাইক দেখা যায়নি।

    দূরদর্শনের দিন দূর-অস্ত। কাজেই সব বাড়ির ছাদে বাঁশের বা পাইপের ডগা থেকে রেডিওর এরিয়ালের জাল বিছানো, মাঝে মাঝে দু’একটা ঘুড়ি পথ ভুলে ফাঁদে পড়ে।

    লোকে রেশনের লাল চাল খাচ্ছে, আমেরিকার পি.এল. ৪৮০র খয়রাতি গম নিতে মুখ ভ্যাটকাচ্ছে। চিনি ও কেরোসিন নিচ্ছে। বিয়ে হলে চিনির জন্যে আলাদা করে পারমিট নিতে হচ্ছে। তখনও অলিগলিতে হাতরুটি সেঁকা বউদিরা আবির্ভূত হননি। জলখাবার ছাড়া বাঙালি রুটি খাওয়ার কথা ভাবতে পারত না। না না, চাওমিন, এগরোল, ম্যাগি এসব আশির দশকের আগে দেখা দেয়নি। অনাদির মোগলাই পরোটা (৭৫ পয়সা) কেনার পয়সাই জোটা মুশকিল ছিল। দিলখুসা কেবিনের ডিমের ডেভিল কল্পনায় নাচত। কফিহাউসে ২৫ পয়সায় কফি এবং ৪০ পয়সায় কোল্ড কফি আমাদের কৈশোরোত্তীর্ণ দিনগুলিকে গার্ডেন গার্ডেন করে দিত।

    অবশ্য কোলকাতা ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনের কথা না বললে উপর থেকে যিনি দেখছেন, তিনি পাপ দেবেন! ১৯৬৮ সালে চার আনা খরচ করলে কোন হাফপ্যান্ট পরা ধিনিকেষ্ট টেবিলে সাজিয়ে দিত কেকের টুকরো— ১০ পয়সা, কফি— ১০ পয়সা, দুটো পানাম সিগ্রেট— ৫ পয়সা।

    অনাদি কেবিন এখন উঠে গেছে। সেদিন নস্টালজিয়ায় ভুগে দিলখুসায় ডিমের ডেভিল খেতে গিয়ে একেবারে কে-এল-পি-ডি! নতুন দিলখুসার রাঁধুনি পালটে গেছে, নাকি পঞ্চাশ বছরে আমিই পালটে গেছি! অথবা উভয়েই?


    প্রেম, মনপ্রাণদেহ ইত্যাদি

    সেসব দিনে গার্লফ্রেন্ডকে লেকের পাড়ে বা গড়ের মাঠে চিনেবাদাম খাওয়ানো যথেষ্ট ছিল, সঙ্গে চা হলে-- তুমি কী ভালো? মেয়েরাও ভাবত—পয়সার গরম দেখাচ্ছে না যখন, ছেলেটার ক্যারেক্টার ভালো।

    অনেক সময় পকেট খালি টের পেলে নিজেরাই ছোট্ট পার্স থেকে পয়সা বের করে দিত। তাতে হারামির হাতবাক্স ছেলেগুলোর একটুও লজ্জা হোত না। বলত—এটাই ন্যাচারাল; অন্নপূর্ণার দ্বারে শিব সদাই ভিখারি বটেক!

    মেয়েরা ছেলেদের সহজে তুই বলত না, ‘তুমি’ বলত। ‘তুই’ মানে নম্বর কেটে গেছে।

    আমাদের বুকের মধ্যে ধুকপুক করত—রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব-ও-ও-ও!

    তখন ছেলেমেয়ে উভয়েই প্রেম নিয়ে ভিক্টোরীয় ছুঁৎমার্গে ভুগত। ভাবত প্রেম একটা বায়বীয় ব্যাপার। ‘যারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গিয়ে আর পেলাম না।’ তাই শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম? তাই সন্ধ্যার গলায় “হয়তো কিছুই নাহি পাব, তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালো বেসে যাব” শুনে আমাদের টনসিলে ব্যথা শুরু হত।

    কিন্তু এই ভিক্টোরীয় প্রুডারি বা রাবীন্দ্রিক প্রেমের আড়ালে চাপা থাকত বিরাট বঞ্চনার গল্প এবং ছেলেদের বদমায়েশি ও স্বার্থপরতা।

    আজকের মেয়েরা মুখোশের আড়ালে মুখ চিনে ফেলেছে। তাই অনায়াসে ছেলেদের সম্বন্ধে বলতে পারে—“প্রেম না বাল, খালি ওইসব করবার তাল!”

    অবশ্য এটা বলার সাহস এবং ক্ষমতার পেছনে একটা কারক তত্ত্ব হল জন্ম-নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তি এবং তার সুলভ প্রাপ্তি। ১৯৬৮ সালের গোড়ায় যখন নাকতলার মোড়ের দোকানে ৫ পয়সায় একটা এবং ১০ পয়সায় তিনটে করে ‘নিরোধ’ বিক্রি শুরু হল, আমরা হতবাক, আমাদের কৌতূহল মানে-না-মানা। জিনিসটা কী? খায় না মাথায় দেয়। আজকের বাচ্চারা অত নাঈভ নয়।

    বুড়োরা মালা জপতে শুরু করলেন—অনাচারে দেশ ছেয়ে যাবে, তিনপোয়া কলি পূর্ণ হল বলে! বামপন্থীরা পদিপিসির মতো গেল-গেল রব তুললেন। বললেন—এসব ইয়াংকি বেলেল্লাপনা! যুবশক্তির চেতনা আবিল করে বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখা। জন্মনিয়ন্ত্রণ হল গরীবের বিরুদ্ধে ধনীদের ষড়যন্ত্র।

    একটা মজার কথা। তখন স্টেটসম্যান পত্রিকায় জনৈক মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের চিঠি ছাপা হল যার মূল প্রতিপাদ্য—সরকার যদি গরীবদের জন্ম-নিয়ন্ত্রণে বাধ্য না করে তাহলে দেশের সম্পদের বড় অংশ গরীবদের বাড়তি জনসংখ্যার পেটে চলে যাবে!

    আমাদের কী আফসোস! শেষে ‘বালিকা বধূ’ মৌসুমীও! উনি তখন বাংলায় প্রথম ফিল্মেই সুপারহিট নায়িকা। অন্যেরা প্রবোধ দিলেন: বাংলায় আরও মৌসুমী চট্টো আছেন।

    এখন আছেন, তখন ছিলেন কি? আজও মনটা খচখচ করে।

    যখন একই পত্রিকায় সমাজতান্ত্রিক চীনে পরিবার নিয়ন্ত্রণের জন্যে দুইয়ের বেশি সন্তান হলে সরকারি চাকুরেদের ইনক্রিমেন্ট ও প্রমোশন বন্ধ হওয়ার খবর বেরোল, আমরা জানলাম -- ওসব বুর্জোয়া পত্রিকার অপপ্রচার। চোট্টামি করে ‘সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি’ লিখে দিয়েছে। ওরা কত নীচে নামতে পারে দেখলে?

    মাও-চৌ এন-লাইয়ের জমানায় জন্মনিয়ন্ত্রণ? মামদোবাজি! লং মার্চের কঠিন সময়েও মাও জন্ম-নিয়ন্ত্রণ করেননি। লন্ডনে আর্থিক কষ্টের দিনে মার্ক্সও ওপথে হাঁটেননি। তাহলে?

    আচ্ছা, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ যদি বার্থ-কন্ট্রোল করতেন তাহলে কি আমরা রবি ঠাকুরকে পেতাম? এর পরে কোনো কথা হবে না, হতে পারে না।

    আসলে যেটা জানতাম না যে ‘ভক্ত প্রহ্লাদেরা’ সব যুগেই ছিলেন, আছেন ও থাকবেন; এবং বাম-ডান সব শিবিরেই। জানতাম না মার্ক্স বলে গেছেন—প্রযুক্তি জীবনে বিরাট পরিবর্তন আনে, মজদুরের জীবনেও।


    যুদ্ধটুদ্ধ

    বাঙালি ষাটের দশক জুড়ে দু’দুটো সীমান্তে যুদ্ধ (চিন ও পাকিস্তান) সামলে উঠল। রোজ সকালে আকাশবাণীতে “দেশাত্মবোধক গান” (দশ মিনিট) -- “আর এক পা’ও নয় শত্রু, সময় দিলাম পিছু হটবার; অনেক রক্ত তুমি নিয়েছ, সেই ঋণ শোধ কর এইবার”—হজম করে ফেলল। ১৯৬৫ সালে নতুন প্রজন্ম কয়েক মাস ব্ল্যাক আউট এবং সাইরেনের দিন কেমন হয় তা টের পেয়ে পুলকিত হল।

    ফোর্ট উইলিয়ামের সামনের মাঠে প্যাটন ট্যাংক মাত্র এসেছে। পাতাল রেলের মাটি খোঁড়া শুরু হয়েছে। লোকজন সিএমডিএ’র ব্যাখ্যা করেছে ‘কাটছি - মাটি- দেখবি -আয়’। নতুন দেশি নামগুলোর বদলে পুরোনো কলোনিয়াল নামগুলোই-- যেমন স্ট্র্যান্ড রোড, হ্যারিসন রোড, রসা রোড, বেন্টিংক স্ট্রিট, সেন্ট্রাল এভিনিউ -- লোকের মুখে চলছে। সল্ট লেক তখনও লবণ হ্রদ, রাজারহাট-নিউ টাউন? মাছের ভেড়ি ও ধানখেত। কালিকাপুর-সোনারপুরের ধানখেতে কেউ কেউ লালঝান্ডা পুঁতে ধান কেটে আরেকটা নকশালবাড়ি গোছের ঘ্যাম নিয়েছিল।

    এখন সেসব এলাকা দিয়ে যেতে যেতে ‘শূন্যপথে চাই, আর তার কোনো চিহ্ন নাই’, পরিবত্তোন এবং নগরায়নের তাণ্ডবে এক্ষণে সর্বত্র শান্তিকল্যাণ বিরাজমান।

    তখন ধীরে ধীরে বাঙালি লাল-সাদা ও লাল-হলুদ মশলায় বোমা বাঁধা ও তার সকা-সন্ধ্যে কড়-কড়াৎ-বুম শুনতে অভ্যস্ত হয়েছে, যেন সারাবচ্ছরই কালীপুজো।

    এসে গেল ‘সত্তরের দশক, মুক্তির দশক’। আমরা দিন গুনছি—কবে ‘বঙ্গের বিস্তৃত সমতল দিয়ে গণফৌজ মার্চ করে যাবে’? ফলে ‘স্কুল-কলেজে খিল, রাস্তায় মিছিল, ক্র্যাকারের শব্দে কাঁপে রাজপথ কিনু গোয়ালার গলি’।

    কিন্তু মাঝখানে হিসেবের বাইরে কিছু ঘটে গেল। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু, পার্কসার্কাসের থেকে নিত্য ব্রডকাস্ট করছে স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্র। চীন নাকি ইয়াহিয়া খানের সামরিক জুন্টাকে সমর্থন করছে? ওদের ‘ন্যাশনাল গভর্নমেন্ট’ বলছে? বঙ্গের কৈশোর যৌবন বিভ্রান্ত, চারু মজুমদার পুলিশ কাস্টডিতে মারা গেছেন। অসীম চ্যাটার্জি দেওঘরে ধরা পড়েছে। লিন পিয়াও নাকি দেশ ছেড়ে পালাতে গিয়ে নিহত?


    হে ঈশ্বর! তুমি কোথায়? কত উঁচু মগডালে বসে আছ?

    এক সময় আবহাওয়া অফিসের ফোরকাস্ট সত্যি হল। সব ঝড় থেমে গেল। সব পাখি ধীরে ধীরে ফিরিছে কুলায়।

    যাদের ছেলে বনে গেছল, তাদের কারও কারও হারানিধি ফিরে এসেছে। কেউ কেউ ফেরেনি। মাতৃভক্ত বাঙালি বলল -- তারা সবাই মায়ের ভোগে গেছে।

    দেয়াল জুড়ে স্টেনসিলে টুপি পরা মাওয়ের মাথা এবং “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান” লেখাগুলো হয় অস্পষ্ট, নয় মুছে গেছে। তার জায়গায় জ্বলজ্বল করছে “এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধী যুগ যুগ জিও”।

    এমার্জেন্সি এল এবং মাত্র দু’বছরে চলেও গেল। যুব কংগ্রেসি ছেলেদের বন্দুক ও পাইপগান হাতে ধুনুচি নৃত্য দেখল বাঙালি।

    তারপর দেখা গেল দেয়ালের পর দেয়াল জুড়ে চুণকাম করিয়ে তার উপর লেখা-- ‘এই দেয়াল ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ পর্য্যন্ত রিজার্ভ’; নীচে ডানদিকের কোণে সিপিএম।

    জীবন বয়ে চলেছে নিজের নিয়মে। নতুন শতাব্দীর প্রথম দশক পেরোতেই ফের পরিবত্তোন! ফের নর্তন-কোঁদন, নতুন বুলি।

    জানি, ইস রাত ভী বদল জায়েগি। ‘রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত আঁখি’ একদিন শিশুপাঠ্য কাহিনীতে মুখ ঢাকবে। ইদানিং কারও কারও স্মৃতিচারণে সেই প্রবণতা প্রবল ভাবে দেখা যাচ্ছে।


    পুজোটুজো, পালাপার্বণ

    ও হ্যাঁ, বাঙালির মাত্র তিনটে পুজো। বড়দের দুর্গাপুজো, জোয়ানদের কালীপুজো এবং কিশোর-কিশোরীদের সরস্বতী পুজো। কিছু মাইনর পুজো ছিল বটে, বিশ্বকর্মা পুজো—তার গজবাহন প্রতিমা দেখা যেত নতুন গড়ে ওঠা ফ্যাক্টরিগুলোতে, যেমন জয় ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কিছু ওয়ার্কশপে। তবে বাঙালি ছেলেপুলের জন্যে সেটা ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব। গণেশ পুজো, রামনবমী হত না। শিবরাত্রির উপোস, মনসা পুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো—এগুলো অঞ্চলভিত্তিক। আর জগন্নাথের রথযাত্রা হল ছোট বাচ্চাদের।

    একটা ব্যাপার লক্ষণীয়। সব পুজোর ভাসানের মিছিলে কমন শ্লোগান---- মাঈকি জয়!

    যেমন দুর্গা মাঈকি জয়! কালী মাঈকি জয়! সরস্বতী মাঈকি জয়! আবার বিশ্বকর্মা মাঈকি জয়!

    তার সঙ্গে ঝুংকুরুক্কুর তাসাপার্টি ও নাচ।

    আর একটা নতুন পার্বণ শুরু হল। সরকারের সমর্থনে বাঙলা বন্ধ। শুনশান পিচের রাস্তায় ক্রিকেট।

    ঘুড়ি ওড়ানো

    সরস্বতী পুজোর দিন থেকে ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হত, শেষ হত বিশ্বকর্মা পুজোয়। ঘুড়ি উড়ত রাস্তা থেকে এবং বাড়ির ছাদ থেকে। মনে রাখতে হবে তখনকার অধিকাংশ বাড়ি দোতলার বেশি মাথা তুলত না। আর কত রকম ঘুড়ি! পেটকাট্টি, মোমবাত্তি, চাঁদিয়াল, চৌরঙ্গী। দাম? দু’পয়সা থেকে শুরু, তারপর চারপয়সা, দু’আনা, চার আনা; সাইজের ওপর নির্ভর করে। মাঞ্জা দেয়া হত কাঁচের মিহিগুঁড়ো আর বার্লি, চিঁড়ের মাড় বা ময়দার আঠা দিয়ে। প্রায় সমস্ত কর্পোরেশনের বাজারে বেশ ক’টি ঘুড়ির দোকান থাকত। তাতে বিভিন্ন দামের ঘুড়ি, লাটাই, সাধারণ সুতো এবং মাঞ্জা বিক্রি হত।

    তারপর একসময় ছাদ এবং আকাশ ছেয়ে গেল টিভির এরিয়ালে আর তার অনেকগুলো এলুমিনিয়ামের পাইপে ঘুড়ি জড়িয়ে অকালে মারা যেতে লাগল।

    এখন ঘুড়ির দোকান কদাচিৎ কোথাও চোখে পড়ে।

    খেলার মাঠ

    টেলিভিশন আসেনি। তাই বাঙালি পেলে-পুসকাস-লেভ ইয়াসিনের গল্প পত্রিকায় পড়ে এবং রেডিওতে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচের ধারাবাহিক ভাষ্য শুনে ইলিশ-চিঙড়ি নিয়ে খেউড় ও হাতাহাতি করে।

    সল্ট লেক স্টেডিয়াম তখন শুধু ইচ্ছে হয়ে মনের মাঝারে বন্দী। গড়ের মাঠে লম্বা লাইন। কাউন্টার খোলার আগে আবির্ভাব হয় ঘোড়সওয়ার পুলিশের। এলোমেলো লাইন দেখলে ঘোড়া ছুটিয়ে হান্টার চালিয়ে লাইন সোজা করে। কিন্তু কোত্থেকে উদয় হয় এক উনপাঁজুরে হাড়-বজ্জাত লক্ষ্মীছাড়া ছেলে। সে এসে চুপচাপ ঘোড়ার গুহ্যদ্বারে গুঁজে দেয় এক জ্বলন্ত সিগ্রেট। জনতা তখন সোল্লাসে দেখে মাউন্টেড পুলিশের তুর্কী নাচ। যারা এন্ট্রি পেল না, তারা কাছের র‍্যামপার্টে চড়ে বসে। কোন কোন লাঙ্গুলহীন মর্কট গাছে চড়ে। তাদের জন্যে শস্তায় বিক্রি হয় ঘরে তৈরি পেরিস্কোপ, কার্ডবোর্ডের লম্বাটে বাক্সোর গায়ে দুটো আয়নাকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ফিট করে তৈরি।

    খেলাধুলো নিয়ে অনেক পত্রিকা বেরোত। ইংরেজিতে স্পোর্টস অ্যান্ড পাস্টটাইম, তাতে ফুটবলের সঙ্গে ক্রিকেট, দাবা সবই থাকত। ওয়েসলি হল--ল্যান্স গিবস--সোনী রামাধীন, ট্রুম্যান-স্ট্যাথাম-টাইসন, ডেভিডসন-মেকিফ-লিন্ডওয়ালের বোলিংয়ের ডেলিভারি, সোবার্স ও কানহাইয়ের ড্রাইভ, সুভাষ গুপ্তের লেগস্পিনের ডেলিভারি—সব ছবি কেটে একটা খাতায় আঠা দিয়ে সাঁটিয়ে স্বপ্ন দেখা—একদিন ভালো অফ স্পিনার হব।

    কিন্তু সস্তায় ট্যাবলয়েডের মত বিক্রি হত খেলার মাঠ, ময়দান, গড়ের মাঠ, অলিম্পিক। মূলত স্থানীয় ফুটবল নিয়ে। টেলিভিশনের আবির্ভাবে এরা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

    ক্রিকেট নিয়ে এত মাতামাতি তখন ছিল না। খেলা হত শুধু শীতকালে, মরশুমি ফুল-ফলের মতো। ফুটবল গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল জুড়ে, কাদায় গড়াগড়ি খেয়ে। কোথায় আর্টিফিশিয়াল টার্ফ?

    ক্রিকেট খেলা বলতে শুধু পাঁচ দিনের টেস্ট, তায় মাঝে একদিন রেস্ট ডে। কুল্লে চারটে দেশ খেলত। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান। নিউজিল্যান্ড সবে মাথা তুলছে, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ ব্যাট ধরতে হাত ঘোরাতে শুরু করেছে।

    ওয়ান ডে, টোয়েন্টি-টোয়েন্টি? থামুন তো, এমন অভিজাত খেলার জাত মেরে তাকে প্লেবিয়ান লেভেলে নামাবেন না। তখন সবাই শুধু দেশের জন্যে খেলত। ট্রেনে থার্ড ক্লাসে যেত। পেটের জন্যে স্টেট ব্যাংক (বুধি কুন্দেরন, বেদী, অজিত ওয়াড়েকর এবং আরও অনেকে), রেলওয়ে এবং সার্ভিসেসে (কর্নেল হেমু অধিকারী) চাকরি করত। অনেকে অফিস ক্লাবের লীগে খেপ খেলত, মানে সামান্য টাকার বিনিময়ে ভাড়া খাটত। একই ব্যাপার ফুটবল ও হকিতে; কেউ পেশাদার নন। খেলা কারও জীবিকা নয়। চুনী গোস্বামী স্টেট ব্যাংকের ল’ অফিসার। পিকে ব্যানার্জি ইস্টার্ন রেলে।

    গুরুসদয় দত্ত রোডের কোনায় ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের মাঠের চারপাশে উঁচু পাঁচিল ছিল না। তারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে রবাহুত অনাহুত যে কেউ ভেতরে ঢুকে বাউন্ডারি লাইনের পাশে ঘাসের উপর ধপাস হয়ে খেলা দেখতে পারত। টিকিটের বালাই ছিল না।

    বরং হকি লীগ এবং বাইটন কাপ নিয়ে উত্তেজনা ছিল। মোহনাবাগান, কাস্টমস, ইস্টবেঙ্গল, মহমেডান। অলিম্পিয়ান ক্লডিয়াস, লেফট হাফে লিয়েন্ডার পেজের বাবা ভি পেজ, সেন্টার হাফে ধ্যানচাঁদের ছেলে অশোক কুমার, ফরওয়ার্ডে ইনামূল হক, ইক্রামূল হক, গোলকীপার ক্রিস্টি!

    একসময় কোলকাতায় হকি লীগ হত, তাতে ভিন রাজ্য থেকে প্লেয়ার আসত--- ভাবা যায়!

    ঢাকুরিয়া লেকের এন্ডারসন ক্লাব ছিল সাঁতার এবং নৌকো বাইচের জন্যে বিখ্যাত, তবে সেসব অভিজাতবংশীয়দের জন্যে ।

    হ্যাঁ, তখনও নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম হয় নি।


    উৎসব, গানবাজনা, লেখাপড়া এবং কালচার মারানো বাঙালি

    উৎসব বলতে দোল-দুর্গোৎসব, রবীন্দ্রজয়ন্তী, তার সঙ্গে নমো নমো করে নজরুল ও সুকান্ত সন্ধ্যা। তখনও বাংলার কোকিল বলতে সন্ধ্যা মুখার্জি, লতা-আশারা অনেক পরে। মান্না দে হেমন্তের পাশে ফার্স্ট রানার্স, পল্লীগীতিতে একছত্র সম্রাট নির্মলেন্দু চৌধুরি।

    ছেলেদের নাচ তখনও মধ্যবিত্ত বাঙালির চোখে অস্বাভাবিক ব্যাপার। উদয়শঙ্করের ক্রিয়েটিভ নাচ বা বামঘরানার শম্ভু ভট্টাচার্য্যের ‘রানার’ এবং ‘অহল্যা’ ব্যালে ব্যতিক্রমের মতো। যেমন ব্যতিক্রম ছিল ডিভোর্স এবং বিধবা-বিবাহ।

    জীবিকা হিসেবে গান শেখাও ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে। নাচের প্রশ্নই ওঠে না। পেশাদারি অভিনয়? অন্যের বাড়ির ছেলে-মেয়েদের জন্যে। বাড়ির মেয়ে গান শিখবে, পাড়ার ফাংশনে একটু-আধটু গাইবে, কনে দেখানোর সময় পাত্রপক্ষের সামনে, তারপর ইতি। বাড়ির বউ স্টেজে উঠে গান গাইতে থাকলে ঘর সামলাবে কে? ছেলে-মেয়ে মানুষ করবে কে?

    মন দিয়ে পড়াশুনো কর। ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ।

    শিক্ষকরা নিয়মিত মাইনে পান না। অধিকাংশ টিচার ঘরে গিয়ে বা বাড়িতে ডেকে ছেলে-মেয়েদের পড়ান। টিউটোরিয়াল ব্যাপারটা মাত্র শুরু হয়েছে। তখনও নামমাত্র মাইনেতে স্কুল-কলেজে ভর্তি হওয়া যেত। বাচ্চার অ্যাডমিশনের জন্যে বাপ-মাকে ইন্টারভিউ দিতে হত না। এবং জন্মের থেকেই বড় স্কুলে সীট রিজার্ভ করাতে হত না।

    সেতার-সরোদ-বেহালা বাদন? ওসব এলিটদের ব্যাপার। হাওয়াইয়ান গিটার কিশোর ও তরুণদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে।

    বটুক নন্দী ‘মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য’ এবং সুনীল গাঙ্গুলি রবীন্দ্র সঙ্গীতের সুর বাজাচ্ছেন। নজরুল-পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ গিটারে বাবার গানের সুর বাজাচ্ছেন এবং কাজী সব্যসাচী কবিতা আবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

    স্প্যানিশ গিটার জনপ্রিয় ছিল না। আজ হাওয়াইয়ান গিটার কেউ বাজায় না।

    কলেজের তিনদিন সোশ্যালে দ্বিতীয় দিনে এনাদের খুব চাহিদা। প্রথম দিনে অবশ্যই ক্ল্যাসিকাল; এ টি কানন, মালবিকা কানন, প্রসূন ব্যানার্জি, চিন্ময় লাহিড়িরা। সেতারে অমিয়কান্তি, সরোদে রাধিকামোহন মৈত্র, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। তৃতীয় দিনে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের নিজস্ব প্রোগ্রাম, এছাড়া পি রাজের গলায় হিন্দি ফিল্মের গান। ভি বালসারার বিভিন্ন তাক লাগানো যন্ত্রে জনপ্রিয় গানের সুর।


    তথ্যসূত্র:

    (১) জর্জ বার্নার্ড শ, “অ্যাপলকার্ট”।

    (২) দীনবন্ধু মিত্র, “জামাইবারিক” নাটকে মানিকপীরের গান।

    *******

    (ক্রমশ)



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণ: রাহুল মজুমদার
  • প্রচ্ছদ | পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ | পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০ | পর্ব ১১ | পর্ব ১২ | পর্ব ১৩ | পর্ব ১৪
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)