• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৭৩ | ডিসেম্বর ২০১৮ | রম্যরচনা
    Share
  • পঞ্চাশ-ষাটের হারিয়ে যাওয়া কোলকাতার চালচিত্র (২) : রঞ্জন রায়


    (একে চন্দ্র, দু’য়ে পক্ষ। সমুদ্র মন্থনেও দুই দল, এ ধরেছে শেষনাগের মাথা তো ও মুড়ো। এদিকে বিষ্ণুর মোহিনী মায়ায় সব লণ্ডভণ্ড। উঠল গরল, উঠল অমৃত। ভাই–ভাই ঠাঁই–ঠাঁই হল। আজও সেই দায় বয়ে চলেছি আমরা। এটি তারই এক আখ্যান, এক বাঙাল কিশোরের চোখে। এর ইতিহাস হওয়ার দায় নেই।)

    (১)

    ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

    পার্কসার্কাসের ধাঙড় বাজারের সার্কাস হোটেল। সামনের ফুটপাথে একটা হাইড্রেন, তার থেকে মুখ খুলে হোসপাইপ লাগিয়ে কর্পোরেশনের লোক রোজ ভোরে রাস্তা ধুয়ে দেয়। সময়টা যে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি। তোড়ে যে জল বেরিয়ে আসে তা কিন্তু গঙ্গার ঘোলা জল, আর ফুটপাথ থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠলেই খোলা উনুন বসানো। সেখানে ঝকঝকে শিকে গেঁথে পোড়ানো হচ্ছে মশলা মাখা লালচে হলুদ রঙের মাংসের টুকরো। তৈরি হচ্ছে শিককাবাব। তার পাশেই দু'জন ময়দা মেখে লেচি বানিয়ে সেঁকছে রুমালি রুটি আর ভেজে তুলছে পরোটা।

    রাস্তার ওপারে ভাড়াবাড়ির লম্বাটে জাফরিকাটা এল-শেপের বারান্দা থেকে আমরা বাচ্চারা উঁকি মেরে দেখি কেমন কায়দা করে দুহাতের তালুতে লেচিগুলো থাপড়ে থাপড়ে আকার দেওয়া হচ্ছে আর শেষ মুহূর্তে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবার বাজিগরের মত লুফে নেওয়া হচ্ছে।

    আমরা বড় হই শিককাবাবের সেঁকা-ঝলসানো-পোড়া মাংসের গন্ধ নাসায় নিয়ে, অভ্যস্ত হই । যদিও অজ্ঞাত কারণে ওখান থেকে লোভনীয় দেখতে শিককাবাব কিনে বাড়িতে আনার কথা কেউ বলে না। সেজকার বিয়ে হল খড়গপুরের ইন্দায়। সেখান থেকে নতুন কাকিমার বোন হিমানীমাসি এলেন ক'দিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন বলে। কিন্তু সারাক্ষণ নাকে আঁচল গোঁজা, বারান্দা পা রাখতেন নিতান্ত অনিচ্ছায়।

    --কী হল মাসি, শরীর ভালো লাগছে না?

    --হ্যাঁ রে, তেমন কিছু না। ওই বিচ্ছিরি গন্ধ, আমার মাথা ধরে যায়, গা গোলায়, বমি পায়।

    --সে কী, ও তো মাংস সেঁকার গন্ধ। আমাদের তো অসুবিধে হয় না। তুমি মাংস খাও না?

    --দূর বোকা, খাব না কেন? কিন্তু ওগুলো যে গরুর মাংস, বীফ! ছিঃ!

    আমরা এই নতুন শব্দটি উচ্চারণ করতে জিভে আরাম পাই--বীফ! বীফ! কেমন জয়ন্তী মণিমেলার মাঠে ড্রিলের হুইসিলের আওয়াজের মতন শোনায়--বীফ! বীফ! বিপ! বিপ!

    পরে মা-কাকিমাদের জিগ্যেস করি।

    সামনের হোটেলে গরুর মাংস রান্না করে কেন? কেন আবার, ওটা যে মুসলমানের হোটেল। আমরা ওসব খাই না। কেন খাই না? উঃ, এটা হদ্দ বোকা। আমরা যে হিন্দু। আমাদের ধর্মে গরু খাওয়া বারণ। কে বারণ করেছে? পণ্ডিতমশাই? হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব পণ্ডিতমশাই। এবার যা তো এখান থেকে! ছাদে গিয়ে খেল গে যা!

    ছাদে গিয়ে খেলতে থাকি নীচের তলার নীলির সঙ্গে।

    কী জানি কেন নীলিকে দেখলেই আমার ঠাকুমার গা জ্বলে যায়।

    --যা, তর গুরুঠাকুর আইছে! তুই পুষ্যালোক, মাইয়ামাইনসের লগে খেলস ক্যারে? শ্যাষে তুই ও মাইগ্যা (মেয়েলি?) হইবি, হেইডা বুঝস?

    আমি সরে যাই। এটাই বুঝি, আমি ক্লাস টু-তে পড়ি, ইলিও তাই, তবে আলাদা স্কুলে।

    হ্যাঁ, ও পরে ফ্রক আর ইজের, আমি গেঞ্জি আর প্যান্ট।

    কিন্তু ঠাকুমা যে হাত নেড়ে তেড়ে তেড়ে আসে--পড়াশুনায় মন নাই, খালি ছাদে গিয়া নীলির লগে কিলিকিলি করস্! শ্যাক বাড়ির ছেরির লগে অত কিয়ের পীরিত?

    অনুপ্রাসের ধ্বনি ও অন্ত্যমিলের মজা আমার বালক মনের নান্দনিকবোধে সুড়সুড়ি দেয় বটে, কিন্তু কথার ঝাঁঝে পিত্তি জ্বলে যায়।

    --হ্যাঁরে ইলি! তোরা মুসলমান?

    --হ্যাঁ তো; আমার ভাল নাম নিলোফার খাতুন।

    --কী অদ্ভূত নাম! আর তোর ছোটবোন সিলি? ও কি মুসলমান?

    ইলি খিলখিল করে হাসে। ও আলাদা করে কিছু হবে নাকি? ওর ভাল নাম সালেহা!

    --নিলোফার, সালেহা!--এরকম শব্দ তো কখনও শুনিনি। তোর নামের মানে কি রে?

    --আমিও জানি না। এগুলো উর্দু নাম; মার থেকে জেনে তবে কালকে বলব।

    --আমাদের বাড়ির বা চেনা কারও অমন নাম হয় না।

    --কী করে হবে, তোরা যে হিন্দু?

    --আমরা কিসে আলাদা?

    --উমম্ তোরা পুজো করিস কেষ্টঠাকুরের, নামাজ পড়িস না। আমরা, আমরা পুজো করি না, আল্লার জন্যে নামাজ পড়ি।

    --নামাজ কেমনি করে পড়ে রে?

    ও হাসতে থাকে।

    --আরে দেখা না!

    ও হাসতে থাকে।

    --তুই কিস্যু জানিস না, জানলে দেখা।

    ও গম্ভীর হয়, তারপর পালাক্রমে দু'কানে হাত দিয়ে, হাঁটু গেড়ে মাটিতে উবু হয়ে 'আল্লাহু আকবর' উচ্চারণ করে দেখাতে থাকে।

    তারপর দুজনেই হেসে ফেলি। আমি ভাবি নামাজ পড়ার রহস্য জেনে গেছি। এই ফ্ল্যাটবাড়িতে কোন বাচ্চা জানে না।

    তখন নীলি বলে যে আরেকটা ব্যাপার আছে। তোরা ছুন্নত করিস না। আমাদের ছেলেরা করে।

    --সেটা আবার কী?

    --ছেলেরা নয়-দশ বছরের হলে বাড়িতে বড়রা কোন মোল্লাকে ডেকে আনে। তারপর বাচ্চাটাকে ন্যাংটো করে হাতে একটা ছুরি নিয়ে বলে--উ দেখ লালচিড়িয়া! উ দেখ লালচিড়িয়া!

    --তারপর?

    --তারপর ঘ্যাঁচ করে নুনুর সামনেটা কেটে দেয়।

    --ওরে বাবা! ওর লাগে না? রক্ত বেরোয় না?

    --একটু লাগে, কেউ কেউ কাঁদে। তারপর ওষুধে দু-একদিনে ঠিক হয়ে যায়।

    --কাউকে ন্যাংটো করে নুনু কেটে দেওয়া? অমন অসব্য কাজ কেন করে?

    --আরে আমাদের ধর্মের নিয়ম যে! ছুন্নত করলে তবে মুসলমান হয়।

    --নাঃ, আমি কক্ক্ষণো মুসলমান হব না।

    --তোকে কে হতে সাধছে?

    --আচ্ছা, তুই তো মুসলমান, তোর ছুন্নত হয়েছে?

    --ধ্যাৎ, ওসব খালি ছেলেদের হয়, আমাদের নুনু নেই তো?

    --তোদের কী রকম? দেখাবি?

    --এবার মার খাবি। বলছি তো অন্যরকম।

    অপ্রস্তুত হয়ে অন্য কথায় আসি।

    --আচ্ছা, নীলি! তুই গোরুর মাংস খাস?

    --খেয়েছি; কখনও সখনও।

    --তোদের বাড়িতে রোজ রান্না হয় না?

    --না; আমাদের মাংস হয় মাসে একদিন। খাসির। গোস্ত রাঁধা হয় পরবের দিনে।

    --রোজ কী হয়?

    --মাছ হয়, তোদের মতনই। আর তোকে বলি খেতে ভাল খাসি আর মুরগী।

    পরের দিন দুপুরে ছোট ভাইকে মন দিয়ে হিন্দু মুসলমানের তফাৎ বোঝাচ্ছি এমন সময় কড়া নড়ে উঠল। আমার আগে ভাই দৌড়ে গেল। সবুজরঙা দরজার উঁচুতে ছিটকিনি লাগানো, আঙুল উঁচু করেও নাগাল পাইনে। ভাই জানলায় উঠে হাত বাড়িয়ে দরজাটা খোলে তারপরই 'দাদা, শকুনিবুড়ো এসেছে রে--" বলে বাড়ির ভেতরের দিকে ছুট লাগায়।

    অগত্যা আমি দরজা খুলে কড়া-নাড়া আগন্তুককে দেখি।

    লম্বা শুকনো চেহারার এক হাড়-খটখট বুড়ো। তোবড়ানো গালে সাতদিনের না-কামানো দাড়ি। বাঁকানো নাক আর হলদেটে চোখে তীব্র চাউনি।

    সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন--খোকা, তোমার দাদুকে খবর দাও। বল, আমি এখন তোমাদের বাড়ি খাব।

    --দাদু তো বাড়ি নেই।

    --ঠাকুমা আছেন তো? তাহলেই হবে, গিয়ে বল।

    ওঁর গলার হুকুমের সুরে পেছনে হটি। কী নাম বলব?

    --নাম বলার দরকার নেই। আমি খাব বললেই হবে, উনি বুঝবেন।

    দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখি ভাইয়ের মুখে খবর পৌঁছে গেছে।

    --যাও, ওনাকে এনে বাইরের ঘরের চেয়ারে বসাও।

    তারপর ঠাকুমার নির্দেশমত মাথায় ঘোমটা দিয়ে মা এসে বাইরের ঘরে মাটিতে জল দিয়ে জায়গাটা মুছে আসন পেতে দেয়। তারপর থালায় করে ভাত আর বাটিতে করে ডাল, তরকারি আর দু'টুকরো মাছের সঙ্গে ঝোল এনে দেয়।

    ভদ্রলোক খেতে বসেন।

    ঠাকুমা পাখা হাতে করে নাড়তে থাকে। উনি সুন্দর করে ডাল দিয়ে ভাত মেখে তরকারি দিয়ে গুছিয়ে পাত পরিষ্কার করে খেয়ে নিয়ে বললেন--বৌমা, আরও ভাত লাগবে।

    মা তৈরিই ছিল। উনি মাছের ঝোল দিয়ে মেখে চেটেপুটে তৃপ্তি করে খেলে মা টমেটোর চাটনি এনে দিল।

    ঠাকুমা ওনাকে জল দিয়েছেন ইসলামপুরি কাঁসার গেলাসে। দেশভাগের সময় ওপার থেকে নিয়ে আসা।

    উনি বিদায় নিলে বলি--ঠাকুমা, শকুনিবুড়ো কে? কোথায় থাকেন?

    --অ্যাই! খবরদার শকুনিবুড়ো কইবি না। উনি তোর দাদুর বয়সি।

    আমাদের ময়মনসিংহের আঠারবাড়িয়া গাঁয়ের পড়শি। এখানে ভাগ্নের কাছে থাকেন। ওনার আর কেউ নেই।

    --ভাগ্নে কে? তুমি চেন?

    --তুইও চিনিস, আমাদের পাড়ার বীরেন কম্পাউন্ডার।

    --যিনি আমাদের বাড়িতে এসে হাসিমুখে গল্প বলে কলেরা টিএবিসি ইঞ্জেক্শন, বসন্তের টিকা লাগিয়ে যান?

    --হ্যাঁ, তাইন বটে!

    --উনি আমাদের বাড়ি খাইতে আসেন ক্যারে? বিনা নিমন্তনে? দুই-তিন মাস পরে পরে?

    --ভাইগনায় ঠিকমত খাওন দেয় না, পেট ভরে না। বুড়া শুকাইয়া যাইত্যাছে, মরলে ওদের হাড় জুড়ায়।

    --হেই লেইগ্যা?

    --হ, নাতি। খিদা পাইলে মাইনষে কি না করে! প্যাটের জ্বালা বড় জ্বালা!

    ২)

    আজ সকাল থেকেই বাচ্চাগুলো ভয়ে ভয়ে রয়েছে। কেননা বাড়ির কর্তা সতীশচন্দ্রের মেজাজ সকাল থেকেই বেলা বারোটার রোদ্দুরের মত উত্তাপ ছড়াচ্ছে। তার অনেকটাই পড়েছে মেজ নাতির ওপর।

    কী জানি কেন উনি এই নাতিকে বিশেষ পছন্দ করেন না। আবার বড় নাতিকে মাথায় চড়িয়ে রেখেছেন। অনায়াসে বলেন নাতিদের মইধ্যে বড় শ্রেষ্ঠ, কিন্তু আমার ছেলেদের মধ্যে খুকা শ্রেষ্ঠ। খুকা বা খোকা তাঁর তৃতীয় সন্তান।

    পোষা জন্তু ও বাচ্চারা তাদের ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে চিনে নেয় কে তাদের আশকারা দেবে আর কে দূরছাই করবে। বড়নাতি দাদুর সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোয়। আর মেজনাতি দাদুর থেকে দূরে দূরেই থাকে।

    কিন্তু আজ ওর কপাল খারাপ।

    ছাদে খেলতে খেলতে পেটে মোচড় দেওয়ায় দৌড়ে নেমে বারান্দা পেরিয়ে এক ধাক্কায় বাথরুমের ভেজানো দরজা খুলে পায়খানায় ঢুকতে যাবে এমন সময় এক ধমক। ভেতরে ওর দাদু বসে আছেন, দরজা ঠিক মত বন্ধ হয়নি। এদিকে বাইশ জন সদস্যের জন্যে একটিই বাথরুম পায়খানা। আগে বাথরুমে ঢুকলে তবে পায়খানায় যাওয়া যায়। তাই অধিকাংশ সময়েই কোন একজন সেখানে প্রবেশাধিকার পায়--সে বড় বাইরেই হোক কি ছোট বাইরে।

    বাজপড়ার মত এক ধমকে ওর তলপেটের চাপ উর্ধমুখী হয়ে যায়। ও একহাতে প্যান্ট তুলে নিয়ে এক দৌড়ে আবার ছাদে ফিরে যায়।

    অনেকক্ষণ হয়ে গেল। উনি কি এখনও বেরোননি? আবার পেটের ভেতরে মেঘ ডাকতে শুরু করেছে যে! ও পা টিপে টিপে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় নেমেছে কি আবার সামনে দাদু। উনি সেজেগুজে কাঁধে একটি গরম চাদর নিয়ে বেরোচ্ছেন, আজ মামলার দিন পড়েছে, কোর্টে যাবেন।

    চোখে চোখ পড়তেই নাতি ভয়ে কেঁচো। উনি চোখ পাকিয়ে আহাম্মক অপোগণ্ডটিকে এক নজর দেখলেন। বন্দুকের গুলির মত মুখ থেকে ছিটকে বেরোল--বলদ!

    নাতি মাথা নীচু করে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ওঁকে পাশ কাটিয়ে সোজা বাথরুমে।

    সুযোগসন্ধানী বড়নাতি ভাইয়ের হেনস্থা আন্দাজ করে ধীরে সুস্থে নীচে নেমে রান্নাঘরে গেল। ও বড়দের গল্প ও পরচর্চা হাঁ করে গেলে। সেখানে ঠাকুমা ও পিসিমার উত্তেজিত কথাবার্তা থেকে যা বুঝল তা হচ্ছে আজ সতীশচন্দ্রের মেজাজ বিগড়োনোর প্রত্যক্ষ কারণ পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা একটি চিঠি।

    ময়মনসিংহ জেলার আঠারবাড়িয়া গ্রাম থেকে কোন এক লাউয়া মিঞা বা মোম আলি পনের টাকা ধার চেয়ে লিখেছে এক নাতিদীর্ঘ পত্র।

    ছালাম আলেকুম,

    বড়কর্তা,

    আশা করি খোদার দয়ায় আপনে মা ঠাউরাইন শংকর, নারু, খোকা, ও বাকি সব ছাওয়ালেরা খেইরতে আছেন।

    হিন্দুস্থানে গিয়া আপনারা ভাল থাকেন, আমি খোদার কাছে হেই দোয়া করি, মোনাজাত করি।

    আমরা এখানে ভাল নাই। যারা আপনের ধানীজমি আর বাড়ি কিনছে তারা অইন্য মুনিষ অইন্য মাইন্দার রাখছে। আমারে কেউ কামে লয় নাই। বড় ব্যাডার বিয়া দিছি, অপনাদের দয়ায় বড় মাইয়া জহিরন বিবিরও নিকা হইয়া গ্যাছে।

    কর্তা, কথা হইলে কিছু ধার কর্জ হইয়া গেছে। এইবার পাটের ফসল মাইর গ্যাছে। নিবেদন এই যে যদি আমার ঠিকানায় পনেরডি ট্যাহা পাঠাইয়া দেন তো খাইয়া বাঁচি।

    আমি এই ট্যাহা দশ মাসে শোধ দিয়াম। আপনে দ্যাখছেন আইজ অব্দি আপনাদের লাউয়া মিঞার মুখ দিয়া হাচা বই মিছা বাইরয় নাই।

    খোদা হাফিজ!

    আপনদের বান্দা মোম আলি উরফ লাউয়া।

    নিরক্ষর লাউয়া মিঞা নিশ্চয় এই চিঠি কাউকে ধরে লিখিয়েছে। এই চিঠি পড়ে সতীশচন্দ্রের মুখ ভার। স্ত্রী সরযূবালা সব শুনে বললেন--দ্যান পাঠাইয়া পনেরডা ট্যাহা! পারলে শোধ দিব, না পারলে নাই।

    কত ট্যাহা তো আনালে যায়।

    স্ত্রীর এই ওকালতিতে সতীশচন্দ্র রেগে আগুন।

    --এইডা কী কইলা? আমাদের নিজেদেরই একহনও মাথা গুঁজবার ঠাঁই জুটে নাই, সাহার বাড়িতে ভাড়া আছি। গুণা গনতি ট্যাহা। রোজ বাজার থেইক্যা ফিরা এক এক পয়সা তবিল মিলাইয়া তবে সকালের জলখাবার খাই।

    নাঃ শ্যাকের লাথথি খাইয়া হেই দেশ থেইক্যা এই পারে আইছি এখন আর লাউয়ার সঙ্গে কুন সম্বন্ধ নাই। মেঘনা নদী পার হইয়া সবকিছু চুইক্যা বুইক্যা গ্যাছে।

    সরযূবালা, মুখ ভার করে দুপুরে খেলেন না। বড়মেয়ে বকুল আর বড় বৌ স্মৃতিকণাকে বললেন--কথাডা শুনলি? লাউয়া আর অর ভাই বুইধ্যা আমাদের ছেলেপিলেদের কোলেকাঁখে কইর‍্যা কানমলা দিয়া বড় করছে--এখন কুন সম্বন্ধ নাই কইলে হইব?

    ৩)

    --'দ'-য়ের হইল মাথায় ব্যথা।

    দাদু শ্লেটে চক পেনসিল দিয়ে একটা বড় করে 'দ' আঁকলেন।

    --চন্দ্র আইলেন দেখতে।

    এবার দ'য়ের পাশে একটা চন্দ্রবিন্দু আঁকা হল।

    --তাইন দিলেন বাইশ টাকা।

    দাদু দয়ের পেটের নীচে বিচ্ছিরি করে ২২ লিখলেন।

    --এইবার মাথাব্যথা পলাইয়া গেল।

    একটানে উনি দয়ের মাথাও লেজ মিলিয়ে দিলেন।

    --দ্যাখ দাদুভাই, কেমুন পাখি হইছে!

    দাদুভাই শোয়া থেকে উঠে বসে দাদুর হাতের শ্লেটে উঁকি মারে।

    হ্যাঁ, একটা বাচ্চাদের আঁকা পাখির মত দেখা যাচ্ছে বটে! দ' হল পাখির ঠোঁট আর পেট, ২২ হল জোড়া পা আর চন্দ্রবিন্দু পাখির চোখ ।

    জ্বর এখনো সারেনি। একটু আগে ওর মা এসে মাথা ধুইয়ে দিয়েছেন। বালিশের নীচে একটা বড়সড় গামছা ঘাড়ের নীচে গোঁজা যাতে বালিশ না ভিজে যায় । আর তার নীচে একটা লালরঙা রাবার-ক্লথ, কিন্তু বাঙালবাড়িতে বলা হয় অয়েলক্লথ; কেন? কে জানে? সেই অয়েলক্লথ ওর বালিশ থেকে নেমে গেছে একটি লোহার বালতির ভেতর। পাশে একটা চেয়ারে বসে ওর মা ঘটি দিয়ে বালতি থেকে জল তুলে ঝিরঝির করে ওর মাথায় ঢালছেন আর মাথায় হাত বুলিয়ে জলধারাকে সঠিক দিশায় চালনা করছেন। কপাল ও মাথা ভিজিয়ে সেই জল অয়েলক্লথ বেয়ে বালতিতে ফিরে যাচ্ছে।

    দুই চোখ আরামে বুজে আসে। বারান্দায় রেলিং-এ বসে কাক ডাকছে। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের টানা বারান্দায় কেউ ধাঁই ধপাস করে কাপড় কাচছে আর ওদের লোক্যাল সেট রেডিওতে বিজনবালা ঘোষ দস্তিদার বলে একজন মহিলা ভারী পুরুষালি গলায় খেয়াল গাইছেন।

    এই মাথা ধুইয়ে দেওয়া যেন বন্ধ না হয়, অনন্তকাল ধরে চলে। ক্লাস টু'র দাদুভাই জানে না অনন্তকাল মানে কতকাল। দাদুর মুখে পুরাণের গল্প শোনার সময় অনন্তকাল শব্দটা অনেকবার শুনে ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। এটুকু বোধ হয়েছে যে এটার মানে অন্ততঃ কয়েকমাস বা তারও বেশি হবে। কিন্তু কোন ভাল জিনিসই অনন্তকাল চলে না। তাই মাথামুছিয়ে দিয়ে মা নিয়ে এসেছেন একবাটি বার্লি, লেবু দেওয়া।

    এঃ! কিছুতেই খাবে না, ওর বমি পায়। আর ও জানে যে বার্লির বাটি খালি হলেই পাশের কালো টেবিলে রাখা একটা কাঁচের শিশি থেকে একদাগ মিকশ্চার ছোট কাঁচের গ্লাসে করে খেতে ওকে বাধ্য করা হবে।

    অতদিন ধরে মা ওর মাথায় জল ঢালতেই থাকবে? দূর সে আবার হয় নাকি? বাড়ির একমাত্র বৌ ওর মা, ভোর থেকে হেঁসেল সামলায়। রাত্তির এগারটায় ছুটি।

    তো কী হয়েছে? মা না হোক, ঠাকুমা আছে, আছে পিসিমণি। আর বড়পিসিমা। এছাড়া ছুটির দিনে মেজকাকাও তো জল ঢালতে পারেন। এরা সবাই আমাকে ভাল বাসেন।

    আহা! ও যে হিন্দু সংযুক্ত পরিবারের কর্তার বড়ছেলের বড়ছেলের বড়ছেলে।

    দাদু হুকুম করলেই সবাই মেনে নেবে। ও যে দাদুর আদরে বাঁদর হচ্ছে সেটা ওর কাকারা কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন। তাতে ওর বয়েই গেছে।

    ও বায়না ধরে দাদুকে ডাক, উনি বললে তবে খাব।

    দাদু দৌড়ে এসেছেন। ওর কপালে হাত দিয়ে জ্বরের আন্দাজ নিয়ে ওর বিছানায় বসে শ্লেটে পাখি আঁকতে শেখাচ্ছেন।

    --এই বার পথ্য খাইয়া লও সোনাভাই। এক চুমুকে বাটি খালি কর। ওষুধ্ খাও, তারপরে চোখ বুইজ্যা শুইয়া থাক। তাড়াতড়ি সাইরা উঠবা।

    আচ্ছা, ঘটিদের বাড়িতে বড়দা-মেজদা-সেজদা-ছোড়দার মাঝখানে ফুলদা, নতুনদা--কী সুন্দর সব নাম।

    কিন্তু বাঙালদের সেজদা ও ছোড়দার মাঝে অবধারিত ভাবে একজন ধনদা, ধনদি, সোনাদা, সোনাদি, রাঙাদা-রাঙাদির পর একখানা কুলিদা এসে জুটবে।

    ধনদার কোন ধন নেই; কুলিদা কোন স্টেশনে মাথায় করে মাল বইতে যায় না।

    ওর কাকারা ওকে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতে শিখিয়েছেন--'সেদিন দেখিনু রেলে, কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে।'

    হাওড়া স্টেশনে লাল জামা গায়ে হাতে বাঁধা পেতলের চাকতি মাথায় গামছা পাকানো পাগড়ি কুলিদের ও দেখেছে। ওদের মনে হয়েছে অন্যগ্রহের জীব। ওর বড় হয়ে কুলি হতে একটুও ইচ্ছে করে না।

    তবে কেন দাদু ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে নীচুগলায় বলছেন--আমার সোনাভাই! আমার কুলিভাই! তাড়াতাড়ি সাইর‍্যা উঠ, সুস্থ হও। অনেক কাজ করনের আছে।

    দাদুর গলায় ময়মনসিংহের ঘুমপাড়ানি গানের সুরঃ

    'আয় ঘুম, যায় ঘুম, ঘুমালো গাছের পাতা,

    হেঁসেলঘরে যায় ঘুম মাগুরের মাথা।

    আগদুয়ারে যায় ঘুম কালো কুকুর,

    বিছানাতে যায় ঘুম বাপের ঠাকুর। '

    গানের একঘেয়ে সুরের দোলানিতে ও কখন ঘুমিয়ে পড়ে।

    সকাল বেলায় চোখে পড়ে এক ভদ্রলোককে। তিনি বাড়িতে লুঙি আর হাতকাটা গেঞ্জি পরে থাকেন আর স্নান করে খাকি জামাপ্যান্ট ও টুপি মাথায় দিয়ে কাজে বেরিয়ে যান। তাঁর বুক পকেটের উপর লাগানো থাকে একফালি সাতরঙা রিবন গোছের। ওটাকে নাকি মেডেল বলে; কাশ্মীরে যুদ্ধ করার সময়ে পেয়েছেন। এটা নাকি খুব সম্মানের ব্যাপার। একটু একটু করে মাথায় ঢোকে যে উনি মিলিটারি, যারা যুদ্ধ করে। রোজ উনি একটা দুর্গে যান যার নাম ফোর্ট উইলিয়াম। আর সন্ধের মুখে ফিরে আসেন।

    কিন্তু ভদ্রলোক যে ভারি বদমেজাজি! রাগলে বাড়িশুদ্ধ সবাই ভয় পায়। উনি এ বাড়ির কর্তার বড় ছেলে। সবার সোনাদা। একদিন ধরাচূড়া পরে সেই ভদ্রলোক রান্নাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে আমার মাকে বকুনি দিয়ে চলে গেল। মা চুপ করে রইল।

    আমার বেশ লাগল। তাহলে মাকেও চুপ করিয়ে দেওয়া যায়!

    তখন মাকে বাবার অনুকরণে ‘চউখে পাক দিয়া’ কিছু বললাম।

    মার মুখটা আমসি হয়ে গেল।

    নীচু গলায় বিড় বিড় করছিলেন—তুমার বাবা আমারে বকে, তুমিও তাই?

    আমি চুপচাপ ছাদে গেলাম।

    বারান্দার শেষ কোণায় বাথরুমের পাশে একটা ভাঙা বালতিতে রাজ্যের এঁটোকাঁটা ফেলা হত। সকাল বেলায় মাথায় গামছা বেঁধে গেঞ্জি গায়ে হাতে ঝাঁটা একজন উচ্চরবে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে দরজার কড়া নাড়ত। তার নাম জানিনে। সবাই বলত জমাদার। তার কড়া নাড়া শুনলেই সবাই খলবলিয়ে উঠত-–জমাদার আইছে, জমাদার আইছে!

    চটপট সরিয়ে দেওয়া হত বাচ্চাদের, নামিয়ে নেওয়া হত দড়ি থেকে সব জামাকাপড়। পাছে ওর ছোঁয়া লেগে যায়!

    ও বুঝত, দু’মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে তারপর বারান্দা সাফ হলে লম্বা লম্বা পা ফেলে এসে বালতি নিয়ে নীচে করপোরেশনের ময়লা ফেলার হাত-ঠেলায় আবর্জনা ঢেলে ঝাঁটা ও জল দিয়ে বালতি সাফ করে আগের জায়গায় বসিয়ে দিয়ে যেত।

    বাড়ির সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচত।

    ক’বছর পরে স্কুলের সরকারি পাঠ্যবই ‘কিশলয়’-এ পেলাম কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘কে বলে তোমারে বন্ধু অস্পৃশ্য অশুচি, শুচিতা ফিরিছে সদা তোমারি পিছনে’।

    দাদুকে জিজ্ঞেস করলাম জমাদার ওর দেশে ফিরে গেলে আমাদের বনে যেতে হবে কি না!

    দাদু অবাক। শেষে বই খুলে লাইন ক’টা দেখালাম। বইয়ে ল্যাখছে, মিছা ক্যারে অইব?

    দাদু তাঁর পেয়ারের নাতিকে বললেন যে তার বদহজম হইছে।

    কিন্তু খুব ছোটবেলায় ভাল করে অক্ষর পরিচয়ের আগে থেকেই তো ওকে দেখছি। ওর নাম মুসাফির। বেশ ফর্সা, নাকের নীচে পাতলা গোঁফ, গায়ে হাতকাটা আধময়লা ফতুয়া, পরনে মালকোঁচা মারা ধুতি আর মাথায় গামছাবাঁধা পাগড়ি। সকালবেলা ঘড় ঘড় শব্দে নীচে এসে দাঁড়াত ওর করপোরেশনের হাত-ঠেলা। এক এক করে সব ফ্ল্যাটের থেকে ময়লার বালতি এনে ও উপুড় করে দিত ওর হাত-ঠেলায়। ব্যস, তারপর ওইরকম শব্দ করে চলে যেত ওর গাড়ি।

    একদিন আমাদের বাড়ির কাজের মানুষ রাম’দা আমার ছোটভাইকে কোলে নিয়ে নীচে গেছে, পেছন পেছন এক‘পা এক’পা করে আমি। নীচে এসে থেমেছে মুসাফিরের হাত-ঠেলা আর তক্ষুণি এসেছে এক খেলনাওলা, তার ঝোলায় রঙিন প্লাস্টিকের বাঁশি ও লালরঙা সেলোফোনে মোড়া ব্যাঙ অথবা কটকটি। কাঠিটি ধরে জোরে ঘোরালেই কটকট শব্দ হয়। রামদা’র কোল থেকে ভাই হাত বাড়াতেই মুসাফির একটা কটকটি কিনে ওর হাতে ধরিয়ে দিল। সেই দেখে আমিও হাত বাড়ালাম। মুসাফির পড়লো ফাঁপরে। একেকটার দাম যে একপয়সা করে। এমন সময় আমার এক কাকা ফিরছিলেন বাজার করে। উনি সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের হাত থেকে কটকটি কেড়ে ফেরত করে দিলেন। মুসাফির বার বার বললো যে ও ভালবেসে খোঁখাবাবুকে দিয়েছে।

    ঘরে ফিরে দেখি দমকল ডাকার অবস্থা! আমার ফৌজি বাবা অপমানের জ্বালায় জ্বলছেন। আইজ ভিটামাটি থেইক্যা উচ্ছেদ হইয়া আইছি বইল্যা এই দিন দেখন লাগব! জমাদারে আমার পুলাপানরে খেলনা কিইন্যা দিব?

    কটকটি তিনটুকরো হয়ে সেই ময়লা ফেলার ভাঙা বালতিতে ঠাঁই পেল আর আমাদের দুই ভাইয়ের গালে পড়ল দুটো পেল্লায় চড়!

    ভালবাসা কি এতই সহজ?

    ৪) জ্বরজারি, পেটখারাপ ও ডাক্তারবাবুরা; ক্যাপসুল বিপ্লব ও স্লাইস ব্রেড

    দাদুর দস্তানায় রায় পরিবারের এত জন সদস্য, কিন্তু সে হিসেবে অসুখ বিসুখ হত কম। সময়ে হামাদেওয়া শিশু এবং টলটল করে হাঁটা বাচ্চা প্রথমে দুই, পরে তিন হল। কয়েক বছর পরে আরো এক এবং দুই।

    কিন্তু ততদিনে পৃথিবী বিশেষ বদলায়নি। বাচ্চাদের হত জ্বর ও পেট খারাপ। বড়দের জ্বর; সম্ভবতঃ ওঁরা পৈটিক সমস্যা হলে নিজেরাই সমাধান খুঁজে নিতেন।

    আর ওষুধ বলতে কারমেটিভ মিকশচার, তাতে সুন্দর করে ডোজ মেপে কাগজ কেটে আঠা দিয়ে শিশির গায়ে লাগিয়ে দেওয়া। মিকশচারের তলানিতে অনেকখানি গুঁড়ো পাউডার। তবে খাবার আগে শিশি ঝাঁকিয়ে নিয়ে ছোট কাঁচের গ্লাসে ঢেলে খাওয়া বিধি।

    কিন্তু কিছুদিন পরেই শুরু হল এসব অসুখে এলোপ্যাথদের কাছে না গিয়ে কাছের হোমিওপ্যাথের কাছে যাওয়া।

    আমাদের বাড়ির তালিকায় ছিলেন জনাচারেক ডাক্তার। অসুখের গুরুত্ব বুঝে তাঁদের কাছে যাওয়া; ফি ও ওষুধের দাম বাড়ির কর্তার মাথায় উঁকি দিয়ে যেত, কোন সন্দেহ নেই।

    প্রথম নম্বরে জনৈক ‘শুকনা ডাক্তর’। একই পাড়ায় একতলার নিজের ঘরে দুবেলাই বসতেন; রোগা হাড়জিরজিরে খিটখিটে ভদ্রলোক। দিতেন হোমিও ওষুধের পুরিয়া, সম্মানমূল্য দু’পয়সা, নইলে চার পয়সা অর্থাৎ তখনকার মুদ্রায় এক আনা । এরকাছে সময়ে অসময়ে যাওয়া যেত; দাদুর সংগে হাত ধরে গিয়ে জিভ দেখিয়ে পেট টিপিয়ে ওষুধ নিয়ে এসেছি।

    তারপরে এলেন ‘শম্ভু ডাক্তর’। সম্মানমূল্য এক আনা ।

    আজকের কোলকাতার বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথ ডঃ শম্ভুনাথ চ্যাটার্জি—পঞ্চাশের দশকের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ডঃ জ্ঞান মজুমদারের শিষ্য। ইনি তখন সদ্য পাশ করে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। বসতেন আমির আলি এভিনিউ-এর উপরে যেখানে ডিপো থেকে ট্রাম বেরিয়ে পার্ক স্ট্রিটের দিকে বাঁক নিয়েছে, সেখানে একটি ঘরে, প্রথমে দুজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে, পরে একমেবাদ্বিতীয়ম। দু’দশক পরে উনি চৌরংগীতে চেম্বার করে চলে যান।

    উনি ওর শান্ত মনোযোগী ব্যবহারে আমাদের পরিবারের ফেবারিট। পরিবারের কর্তা সতীশচন্দ্রের মতে ‘শম্ভুর ওষুধে কথা কয়’।

    দুটো অসুখেই বড় ছোট নির্বিশেষে একই পথ্য দেওয়া হত। জ্বর হলে দুধসাগু ও পেট খারাপে পিউরিটি ইন্ডিয়ান বার্লি। কাঁসার জামবাটি ভরে সেই হড়হড়ে সুখাদ্যটি চিনি ও লেবু চিপে মুখ ভেটকে গেলা ছিল সবচেয়ে বড় শাস্তি।

    তবে জ্বর থেকে ওঠার পর ডাক্তারবাবু ভাত খাওয়ার অনুমতি দিলে চারাপোনার ট্যালটেলে ঝোল, তাতে কচি কাটোয়ার ডাঁটা বা ‘ডেঙ্গা’।

    সতীশচন্দ্রের হোমিওপ্যাথির প্রতি পক্ষপাতের দুটো কারণ।

    এক, সুলভ ওষুধ ও পথ্য।

    ওঁর কাঁধে যে বাইশটি হাঁ-মুখে খাবার জোগানোর দায়! আয় বলতে শুধু প্রথম তিনজনের চাকরি। বড় ছেলে ফোর্ট উইলিয়মে ল্যান্স নায়েক, এন সি ও ক্যাডার, সামান্য মাইনে। বিয়ে করার সময় মাস মাইনে ছিল তিনকুড়ি পাঁচটাকা।

    মেজ ব্যারাকপুরের এয়ারফোর্স অফিসে টেলিপ্রিন্টার অপারেটর। মাসের প্রথম শনিবারে শেয়ালদা মার্কেট থেকে একটা বড়সড় নাকে দড়ি দিয়ে ঝোলানো একটি ইলিশমাছ নিয়ে হাজির হয়।

    সেজ যদুপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে মাত্র ফিলিপ্স কোম্পানিতে চারশ’ টাকায় ঢুকেছে।

    দ্বিতীয় কারণটি হল ফেলে আসা বাঙালবাড়ির স্মৃতিজনিত অভ্যাস। তিরিশ-চল্লিশের দশকে আঠারবাড়িয়া গ্রামের আশপাশের দশ গাঁয়ে ডাক্তার বলতে ছিলেন হোমিওপ্যাথ ললিত ডাগদর। তিনি সব অসুখের চিকিৎসা করতেন, এমনকি ছোটখাট অপারেশন পর্যন্ত। বড়ছেলের একুশদিনের সান্নিপাতিক জ্বর ও তার সঙ্গে বিরাট দুই কর্ণমূল—উনিই ওষুধ, পথ্য দিয়ে ও তারপর ছুরিকাঁচি ধরে বাঁচিয়ে তোলেন। এছাড়া ওঁর মাতাঠাকুরাণী সুখময়ী রায়, আমাদের বড়মা, ভুগছিলেন কোমরে জেগে ওঠা এক বিশাল ফোঁড়ায়। ললিত ডাক্তার দেখে বললেন মনে হয় কার্বাংকল (এই শতাব্দীতে কারও মুখে এই শব্দটি শুনিনি), আর কেটেকুটে পুঁজ বের করে সারিয়ে দিলেন।

    কিন্তু কোমরের কোন একটি শিরা-উপশিরা কেটে যাওয়ায় সুখময়ী আর বাকি জীবন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। হাঁটুমুড়ে বসে বসেই খাওয়া-দাওয়া, পুজো-আচ্চা এবং প্রকৃতির ডাকে সময়ে অসময়ে সাড়া দেওয়া—সব দিব্যি চালিয়ে গেলেন।

    তাই পরিবারে কারও অসুখবিসুখ হলে সতীশচন্দ্রের ফার্স্ট প্রেফারেন্স ভোট পড়ত হোমিওপ্যাথির পক্ষে; কৃতজ্ঞতা বলেও কিছু আছে তো না কী!

    আর একটা তৃতীয় কারণ ছিল বটে! তবে সেটা সতীশচন্দ্র খোলাখুলি বলতে চাইতেন না । আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রামলাইনের দিকে গুণে দশ-পা হাঁটলেই ছিল ‘আসাদ মেডিক্যাল হল’; ডাক্তার এ এম ও গণি । এটা ছিল সার্কাস মার্কেট প্লেস আর পার্ল স্ট্রীটের মোহানায়।

    গণিসাহেব সৌম্যদর্শন মৃদুভাষী ও পোশাকে আশাকে বেশ এলিট । উনি ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেবের আত্মীয়। আর আলীসাহেব তখন পার্ল রোডেই থাকতেন। তখন টেলিফোন বলতে কালো রঙের একটি যন্তর যার ডায়াল এনামেল চকচকে, তাতে গোল গোল খাঁজের মধ্যে দিয়ে ০, ১ থেকে ৯ পর্য্যন্ত সব সংখ্যা দেখা যেত। সেই খাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডায়াল করা আর তারপর ‘হ্যালো’ বলা বাচ্চাদের কাছে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ ঘষে মন্তর পড়ার চেয়ে কিছু কম ছিল না। তখন এসমস্ত পাড়াতে ওষূধের দোকান আর ডাক্তার ছাড়া কারও বাড়িতে টেলিফোন থাকত না।

    একবার বাবার সঙ্গে হাত ধরে ডঃ গণির ডিস্পেন্সারিতে গিয়ে বেঞ্চিতে বসলাম। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, কখনও রোগিদের দিকে, কখনও অ্যান্টিক ডিজাইনের দেয়ালঘড়ির দিকে। এমনসময় ঢুকলেন একজন গৌরবর্ণ সুদর্শন পুরুষ। ‘ঢুকলেন’ না বলে ‘প্রবেশ’ করলেন বলাই সঙ্গত হবে। পরনে সাদা পাজামা ও সূতির কাজ করা পাঞ্জাবি। স্মিতমুখে গণি সাহেবকে ‘বাও’ করে সোজা টেলিফোনের দখল নিলেন। তারপর কোন অজ্ঞাত ভদ্রজনের সঙ্গে চলল ওঁর কথাবার্তা, থুড়ি অতীব সরস ‘কথোপকথন’।

    চলে গেলে বাবা জিজ্ঞেস করলেন—উনি কে?

    --ওঁকে চেনেন না? আমাদের আলীসাহেব, মুজতবা আলী।

    দাদু কখনও কখনও বিড়বিড় করতেন--শ্যাকে আমরারে পূর্বপুরুষের ভিটা থেইক্যা খেদাইয়া দিছে, হেই শ্যাকের ওষুধ খাওন লাগব?

    আর এক কাকার বিশ্বাস ছিল মুসলমান কখনও ভাল ডাক্তার হয় না।

    অথচ সেই চেম্বারে ডাক্তার গণির পাশে বসে রোগি দেখতেন রেণু চক্রবর্তী। পরে কাকাদের থেকে জেনেছি গণি সাহেব অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। দাঙ্গার সময় মুসলিমবহুল পার্কসার্কাস পাড়ায় বেশ কিছু হিন্দু পরিবারের প্রাণ বাঁচানোয় তাঁর সক্রিয় সহযোগ ছিল।

    বাড়ির তৃতীয় রোজগেরে ব্যক্তি বিনয়কুমার যদুপুরের হোস্টেলে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা ও ফিলিপ্স কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার সুবাদে নব্য আলোকপ্রাপ্ত যুবক। চমৎকার ‘কইলাকাত্তাই টানে ফার্সি’, অর্থাৎ ‘ঘটি’ জুবান কইতে পারেন । বন্ধুদের আসরে শচীনকর্তার ‘রবীন্দ্রসংগীত’ এবং পঙ্কজ মল্লিকের ‘পল্লীগীতি’ গেয়ে বেশ জনপ্রিয়।

    কেউ বিশেষ অসুস্থ হলে তিনি কল দিয়ে বাড়িতে আনেন ফণিবাবুকে। স্যুটেড বুটেড ফণিবাবু আসেন কালো ভটভটিতে চড়ে, তাতে লাগানো সাইড কার। উনি বিলেতফেরত। তাই ফীস বেশি।

    মেজকা বিনয়কুমার শর্টকাট রাস্তা ধরলেন। একই ধরনের জ্বরজারিতে উনি ফণিবাবুর পুরনো প্রেস্ক্রিপশন দেখে সেই ওষুধ এনে দিলেন। কয়েকবার ফল দিল। সবাই মেজকার ‘প্রতিভায়’ চমৎকৃত। কিন্ত একবার কেস গেল বিগড়ে, একেবারে হাতে হ্যারিকেন!

    ফণিবাবু এসেই সমস্যার শেকড়ে হাত দিলেন। মেজকার দিকে উকিলের মত আঙুল তুলে বললেন—সেলফ মেডিকেশন? আপনি ইঞ্জিনিয়র, সেটাই মন দিয়ে করুন। আমাদের ভাত নাই মারলেন!

    বিনয়কুমার নতবদন হইলেন।

    কিন্তু আমরা কুঁচোকাঁচার দল ঠিক করলাম যে কোনদিন ফণিডাক্তারের ওষুধ খাব না। উনি আমাদের ফেবারিট মেজকাকে ইল্লি করেছেন। ‘ইল্লি’ কথাটা ছাদে খেলতে গিয়ে পড়শী ফ্ল্যাটের বড় বাচ্চাদের থেকে সদ্য শেখা।

    মেজকা যে আমাদের খেলনা কিনে দেয়, ঘেমো গরমে হাওয়া বন্ধ হয়ে গেলে খবরের কাগজ পাকিয়ে ‘পত্রিকা বাতাস’ করে ঘুম পাড়ায়। ঠোঙায় করে মুখরোচক নাম-না–জানা খাবার নিয়ে আসে। কোলে করে ছাদে নিয়ে যায়।

    তবে আমাদের এই যুদ্ধঘোষণা বৃথা যায়নি।

    হিন্দিতে একটা প্রবাদ আছেঃ ‘ঈশ্বর কে রাজ মেঁ দের হ্যাঁয়, অন্ধের নহীঁ’।

    ঈশ্বরের রাজত্বে দেরি হতে পারে, কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে ঠিকই নড়ে।

    সেই মেজকা’ই একদিন আমাদের কারও অসুখে নিয়ে এল আদ্দেক সাদা আদ্দেক গোলাপি লম্বাটে ছোট্ট মত ওষুধ, যা জল দিয়ে ঢক করে গিলে ফেলা খুব সোজা, আদৌ সাদা কাগজে মোড়া নিমতেতো গুঁড়ো পাউডার না । এরে কয় ক্যাপসুল। এটা পেটে গিয়ে গলে যায়, আর কোন দাগ দেওয়া শিশি থেকে বিচ্ছিরি মিক্সচার খাওয়ার দরকার নেই ।

    এহ বাহ্য; মেজকা জানাল এই ওষুধগুলো খুব কড়া। তাই এর সঙ্গে ভাল খাওয়াদাওয়া দরকার। সাগু-বার্লির দিন শেষ। খেতে হবে পাঁউরুটি। তাও বড় বড় মোটা মোটা মাথার দিকে গাঢ় তামাটে রঙের লোফ নয়, সুন্দর করে কাটা ছোট ছোট মিষ্টি মিষ্টি স্লাইস ব্রেড।

    ব্যস, আমাদের অসুখ হওয়ার হিড়িক পড়ে গেল।

    একদিন মেজকা নিয়ে এল কয়েক প্যাকেট স্লাইস ব্রেড আর একটি শিশি। তাতে টলটল করছে সোনালি রঙের চ্যাটচেটে তরল দ্রব্য। বাচ্চাদের উৎসুক চোখের সামনে সেই শিশি কেটে চামচ করে সোনালি জিনিসটি একটু একটু করে একেক পিস স্লাইসে লাগিয়ে সবাইকে দেওয়া হল।

    কাকা বললেন—এরে কয় জেলি। এইডা আনারস থেইক্যা বানাইছে, পেয়ারা আর আম থেইক্যা আরও ভাল হয়।

    কয়েক মিনিট। ব্রেড শেষ, জেলি শেষ। সবাই আঙুল চাটছে, মুখের ভাব যেন ‘ইহাই কি অমৃত’?

    *******



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণ: রাহুল মজুমদার
  • প্রচ্ছদ | পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ | পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০ | পর্ব ১১ | পর্ব ১২ | পর্ব ১৩ | পর্ব ১৪ | পর্ব ১৫ | পর্ব ১৬
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)