• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮০ | অক্টোবর ২০২০ | রম্যরচনা
    Share
  • পঞ্চাশ-ষাটের হারিয়ে যাওয়া কোলকাতার চালচিত্র (৯) : রঞ্জন রায়


    (একে চন্দ্র, দু’য়ে পক্ষ। সমুদ্র মন্থনেও দুই দল, এ ধরেছে শেষনাগের মাথা তো ও মুড়ো। এদিকে বিষ্ণুর মোহিনী মায়ায় সব লণ্ডভণ্ড। উঠল গরল, উঠল অমৃত। ভাই–ভাই ঠাঁই–ঠাঁই হল। আজও সেই দায় বয়ে চলেছি আমরা। এটি তারই এক আখ্যান, এক বাঙাল কিশোরের চোখে। এর ইতিহাস হওয়ার দায় নেই।)

    দ্বিতীয় ভাগ

    || ১ ||

    শিশুবিদ্যাপীঠ গার্লস হাই স্কুল

    কাশীরামদাসী বিশালবপু মহাভারত। হলদে বাঁধানো মলাট, শিরদাঁড়ার দিকটায় মলিন লালচে কাপড়। কেলাস থ্রিতে পড়ি। দ্রুত বানান ধরে বাংলা পড়তে পারায় দুপুরবেলায় এই পারিবারিক সম্পত্তিটির গায়ে মাথায় হাত বোলানোর অধিকার পেয়েছি। দিয়েছেন স্বয়ং অবিভক্ত হিন্দু পরিবারের কর্তা আমার দাদু সতীশচন্দ্র। আমি তাঁর পেয়ারের নাতি। কোলকাতার পার্কসার্কাস পাড়ায় ভাড়া বাড়ি। মাঝের ঘরে দাদুর তক্তপোষে বসে ভর দুপুরে দুলে দুলে পড়তে থাকি।

    "দেখ দ্বিজ মনসিজ জিনিয়া মূরতি,
    পদ্মপত্র যুগ্মনেত্র পরশয়ে শ্রুতি।
    অনুপম তনু শ্যাম নীলোৎপল আভা,
    মুখরুচি কত শুচি করিয়াছে শোভা।
    সিংহগ্রীব বন্ধুজীব অধর রাতুল,
    খগরাজ পায় লাজ, নাসিকা অতুল।"
    উঃ, কী কঠিন কঠিন খটোমটো শব্দ!

    --দাদু, ও দাদু! মনসিজ মানে কী? আর শ্রুতি? ও, আচ্ছা, কিন্তু অনুপম? আর সিংহগ্রীব? অতুল ও রাতুলের মানেডাও কইয়া দাও।

    দাদুর নাসিকাধ্বনি বন্ধ হয়। উঠে বসে চোখ কচলে বুঝিয়ে দেন স্বয়ংবর সভায় ব্রাহ্মণবেশী অর্জুনের রূপ বর্ণনা। পেয়ারের নাতির বেয়াড়া প্রশ্নে এতটুকু বিরক্ত হন না।

    তারপর আবার ভাতঘুমে ঢলে পড়েন।

    আমি পাতা উল্টে ছবি দেখি। সাদাকালোয় সম্বরণ ও সূর্যকন্যা তপতী। নলদময়ন্তী। জয়দ্রথবধ। চক্রব্যুহে অভিমন্যু। শমীবৃক্ষ থেকে বৃহন্নলাবেশী অর্জুনের অস্ত্র পেড়ে আনা। একলব্যের আঙুল কেটে গুরুদক্ষিণা। সমুদ্রমন্থনের সময় বিষ্ণুর মোহিনীরূপ।

    রঙিন আর্টপ্লেটে পারিজাত হরণের সময় বজ্রপাণি ইন্দ্র। রাজসূয় যজ্ঞের সময় শিশুপাল বধ। সুভদ্রাহরণ। অর্জুনের স্বয়ম্বর সভায় লক্ষ্যভেদ। অম্বার তপস্যা ও প্রাণত্যাগ।

    চোখে লাগে পুরুষদের কানে কুণ্ডল ও গলায় হার! দীর্ঘকেশ, কেমন মেয়েলি মেয়েলি, বিশেষ করে কৃষ্ণ। আমার চেনা কোনো পুরুষের চেহারার সঙ্গে খাপ খায় না।

    আর মেয়েরা সবাই গুরুস্তনী ও নিতম্বিনী। এমন মহিলাও পার্কসার্কাস পাড়ায় কদাচিৎ চোখে পড়ত।

    মহিলা? হ্যাঁ, আমার চোখে তখন নারী মাত্রই হয় বালিকা, নয় মহিলা।

    তখন কি ছাই কেরলের রাজা রবিবর্মার নাম শুনেছি, না ময়মনসিংহের হেমেন মজুমদারের স্নান করে ঘরে ফেরা সিক্তবসনাদের ছবি দেখেছি?

    কিন্তু ভাবিয়ে তুলল অর্জুনের বৃহন্নলা রূপ ধারণ।

    -- ও দাদু, বৃহন্নলা বেশ কি?

    --- পুরুষে যখন মাইয়ামানুষের মতন বেশভুষা করে, হাবভাব দেখায় তখন তারে বৃহন্নলা কয়। হেইডা অর্জুনের ছদ্মবেশ আছিল। ডিজগাইজ।

    --- অন্যরাও তো কানে দুল পরছে, লম্বা চুল বান্ধছে, অরাও কি বৃহন্নলা?

    --- ধূর ব্যাডা প্যাটব্যাক্কল! অর্জুন যে রাজকুমারীরে নাচতে গাইতে শিখাইতো?

    --- আচ্ছা, সামনের হোটেলের পাঁইয়াজী? তাইন কি বৃহন্নলা? লম্বা চুলে কাংঘি করে যে!

    --- অর ত গোঁফদাড়িও আছে। হেইডা দ্যাখ।

    ---- তাইলে সামনের বাড়ির ফুরকুনদিরে সইন্ধ্যার সময় যে গান শিখাইতে আসে? গানের মাস্টারমশায় গোঁফদাড়ি নাই---- হে হইল বৃহন্নলা?

    ---- খামাখা আজাইরা প্যাচাল! দিল ঘুমডার বারোটা বাজাইয়া। কাইল থেইক্যা এই বই ধরবি না।

    আমি ভয় পেয়ে খাটের অন্য দিকে সরে যাই। দাদুর নাসিকাধ্বনি ক্রমশঃ গর্জনের রূপ ধরে। কিন্তু আমি অস্থির হয়ে পড়েছি।

    পুরুষ হয়ে মেয়েদের মত আচরণ?

    আমি যে শিশুবিদ্যাপীঠ গার্লস স্কুলে পড়ি। আমাকে যে সেলাইয়ের ক্লাসে বসতে হয়। গতবছর ছোট একটা চটের টুকরোয় সবাইকে ক্রস স্টিচ শিখতে হয়েছিল। এ বছর তো একটা সবুজ কাপড়ের বড় টুকরোয় রান, হেমস্টিচ ও একটা সাদা কার্পেট মত কাপড়ে ছুঁচে ডাবল সুতো পরিয়ে চেনস্টিচ করতে হচ্ছে। আমি কি আস্তে আস্তে মেয়ে হয়ে যাব? নইলে বৃহন্নলা? কক্ষনো না। আমি সেলাই ক্লাসে ফেল করব। ইচ্ছে করে। তাহলে নিশ্চয় আমাকে অন্য স্কুলে মানে বয়েজ স্কুলে দেবে।

    হ্যাঁ, কাছাকাছি একটা স্কুল আছে বটে। মডার্ন বয়েজ স্কুল। পার্ক স্ট্রীটের একমাথায়। পার্ক শো হাউস বলে একটা সিনেমা হলের কাছে। ওখানে আমার পিসতুতো দাদা পড়ে। এক কাকা আগে পড়েছে।

    আর এই শিশুবিদ্যাপীঠ? এতে আমার ছোটপিসি, দিদিভাই সবাই পড়েছে। স্কুলে যাবার পথে পাড়া থেকে যারা বয়েজ স্কুলে পড়ে তারা আমাদের খেপায়, মেয়েলি সুর বের করে নাকিসুরে কথা বলে।

    কিন্তু আমাদের স্কুলের পড়াশুনোর নাকি বেশ নাম?

    তাই ক্লাস থ্রি-এর জয়শ্রী আমাকে শিখিয়ে দেয় আর আমিও সেইমত ওই ছেলেদের দেখলে ছড়া কাটি।

    "মর্ডান পাঠশালা,
    বিদ্যে শেখায় কাঁচকলা।
    বেঞ্চিগুলো সরু সরু,
    মাস্টারগুলো আস্ত গরু।"
    ওরা থতমত খেয়ে কেটে পড়ে। ধমকে যায়, বিকেলে দেখে নেবে।

    আমাকে ঘিরে ধরে অজানা ভয়। মাস্টারমশাইরা গুরুজন, ওঁদের 'আস্ত গরু' বল্লাম? সরস্বতীঠাকুর পাপ দেবেন না তো?

    || ২ ||

    কোন এক জানুয়ারি মাসের সকালবেলায় সরস্বতীপুজোর পরের দিন আমাকে দিদিভাই নিয়ে গিয়েছিল ইশকুলে। সেই স্কুলে মর্নিং সেকশনে কেলাস ফোর পর্যন্ত, আর দুপুরে ফাইভ থেকে টেন। তখন বলত স্কুল ফাইনাল। ব্যস, তারপরে কলেজে গিয়ে আইকম বাইকম পড়তে থাক। মর্নিংয়ে সব টিচারকে মাসিমা বলতে হয় আর ডে-সেকশনে সবাই দিদি।

    তা ভর্তির জন্যে মাসিমাটি আমাকে দুটো কবতে জিগ্যেস করে এক থেকে দশ পর্যন্ত মুখস্থ শুনে ভর্তি করে নিলেন। দিদি স্কুলের স্টেশনারি থেকে একটা খাতা আর উড পেনসিল কিনে দিয়ে চলে গেল। বলল--তিন ঘন্টা পরে নিতে আসব।

    মাসিমার হাত ধরে পাঁচবছুরে আমি চল্লেম দরোজা জানলা নীল পর্দায় ঢাকা ক্লাস রুমে। ক্লাসে ঢুকে উনি আমাকে সোপর্দ করলেন বয়স্ক একটু ঝুঁকে পড়া এক মহিলার কাছে।

    --শতদলদি, নতুন ছেলে। শোন খোকা, ইনি তোমার শতদলমাসিমা--- ইনফ্যান্ট ক্লাসের টিচার। লক্ষ্মী হয়ে থাকো। ওনার কথা শুনে ভাল করে পড়াশুনো করো।

    উনি চলে গেলেন। শতদলমাসিমা আস্তে আস্তে বললেন-- কী নাম তোমার খোকা?

    -- রঞ্জন রায়।

    -- শোনো, এভাবে নয়। বলবে - শ্রীমান রঞ্জন রায়। বাবার নাম?

    -- সলিলকুমার রায়।

    -- না, না। বলতে হয় শ্রীযুক্ত সলিলকুমার রায় মহাশয়, বুঝলে? যাও, সেকন্ড বেঞ্চির কোনায় বীণার পাশে গিয়ে বসো।

    দেখলাম সবার সামনে একটি রঙিন বইয়ের পাতা খোলা। উনি অ্যাকশন করে বাংলা বর্ণমালা শেখাতে লাগলেন। আর বাচ্চারা সরু মোটা সুরে আউড়ে চলল।

    -- থ--থামগুলো সব ভারি ভারি,
    দ----দালান কোঠা সারি সারি।
    ক্লাস শেষ হতেই পেছন ত্থেকে কেউ চিমটি কাটল। পেছন ফিরে তাকাতেই একজন জোরে জোরে কিছু বলল আর সবাই হেসে উঠল।

    --- চিমটি কাটলে কেন?

    ---- না তো, তোর কালো চামড়ায় কেমন হলুদ হলুদ লেগে আছে। সেটা দেখছিলুম।

    ---- হি হি হি। দেখনা, ছেলেটার গায়ে সরস্বতী পুজোর দিনের হলুদ লেগে আছে।

    আমি আমতা করে কৈফিয়ৎ দিই-- আমাদের বাড়িতে সরস্বতী পুজোর সময় মা-কাকিমারা সব বাচ্চার গায়ে বাটা-হলুদ লাগিয়ে ছিরি তোলে। তারপর চান করায়। এতে হাসছ কেন?

    -- ওরে আমার কেলোভূত রে! হলুদ মেখে যা ছিরি হয়েছে!

    --- না, না। কালোমানিক বল।

    হাতাহাতি জাপ্টাজাপ্টি-- একেবারে কন্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি দুইজনা দুইজনে।

    -- অ্যাই, এসব কী হচ্ছে ক্লাসের মধ্যে?

    এবার একটা ভারী গলা।

    কোনোরকমে উঠে দেখি এক দশাসই মহিলা, আস্তে আস্তে দুলে দুলে ক্লাসে ঢুকছেন।

    --- দেখুন না মাসিমা! এই নতুন ছেলেটা খাতাবই কিছু নেই, পড়তে এসেছে আর প্রথম দিনেই মারামারি করছে।

    --আমাকে---- আমাকে ও কেলোভূত কালোমানিক এইসব বলেছে।

    মাসিমার বড় বড় চোখ, বিশাল হাতের থাবা। কিন্তু উনি পরম মমতায় আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে কুঁচকে যাওয়া শার্টের কলার টেনে টুনে ঠিক করে দিয়ে বললেন-- যাও খোকন, ঝগড়া কোরো না। এরা সব তোমার বন্ধু। দেখবে কাল থেকে সবার সঙ্গে ভাব হয়ে যাবে।

    পাশে বসা মেয়েটিকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করি --উনি কে?

    ও তেমনি ফিসফিস করে বলে-- জগদম্বা মাসিমা। ড্রইং শেখান।

    আমি আনন্দে ভরে উঠি। ছবি আঁকতে বড় ভালো লাগে যে!

    আর উনি দ্রুত হাতে একটি চকখড়ির সাহায্যে ব্ল্যাকবোর্ডে ফুটিয়ে তোলেন-- একটি নদী, পাড়ে একটি গাছে নৌকো বাঁধা।

    তারপর একগাল হেসে গোটা ক্লাসকে জিগ্যেস করেন--কি, ভালো লেগেছে?

    সবাই আকাশবাণীর শিশুমহলের মত একসুরে বলে ওঠে--হ্যাঁ-অ্যা অ্যা—

    -- আচ্ছা, তোমরা খালি একটা গাছ আঁকো, যেকোনো গাছ, যার যেমন ইচ্ছে।

    এর পরের ক্লাস শোভামাসিমার। উনি গান শেখান। হারমোনিয়ামে ঝড়ের মত হাত খেলিয়ে একটা সুর তুলে তারপর ক্লাসের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললেন-- আগের দিন যেটা শেখানো হয়েছিল?

    ব্যস, সবাই কোরাস ধরলঃ

    ইন্ডি, মিন্ডি, সিন্ডি তিনোজনে,
    গাছের আড়াল থেকে উঁকি মারে।
    একদিন শনিবারে কে যেন গাইছিল গান,
    তাই শুনে ইন্ডিমিন্ডির উড়ে গেল প্রাণ।
    -- অ্যাই খোকা, চুপ করে আছ কেন? বোবাকালা নাকি?

    -- আমি-- আমি আজ নতুন ভর্তি হয়েছি।

    -- গানের আবার নতুন পুরনো কী? এসব চলবে না।

    এরপর দ্বিতীয় গান শুরু হল।

    - লালরঙা ঘুড়ি! আয় না উড়ি।
    - সবজে ঘুড়ি, আয় না লড়ি।
    --আয় না উড়ি, নীল আকশে।
    --- আয় না লড়ি, জোর বাতাসে।
    আজকের মতন ইস্কুল শেষ। সবার মত আমিও অফিসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। একে একে সব বাচ্চারা বড়রা চলে যাচ্ছে। বাচ্চাদের বাবা-মা বা দাদাদিদি আসলে নাম জিগ্যেস করে ওদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। একটু বড় ছেলেমেয়েরা নিজেরাই চলে যাচ্ছে। আমার বাড়ি থেকেও দিদিভাই আসবে, নিয়ে যাবে।

    একে একে স্কুল বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। প্রায় সবাই চলে গেছে। কিন্তু দিদিভাই কই? এবার আমি কী করি? অনেকক্ষণ ধরে গলার ভেতর চেপে থাকা কান্না আর আটকানো গেল না। অফিসের ক্লার্ক মণিবাবু চমকে উঠে চশমার ফাঁক দিয়ে দেখলেন। তারপর আমার হাত ধরে স্টাফরুমে নিয়ে গেলেন।

    সেই মাসিমা, যিনি ভর্তি করেছিলেন।

    --কোথায় থাকো?

    -- ধাঙড়বাজারের সামনে। সার্কাস হোটেলের সামনে।

    তারপর খাতাটা দেখাই। দিদিভাই গোটাগোটা অক্ষরে প্রথম পাতাতেই নাম ঠিকানা লিখে দিয়েছে।

    উনি একপলক দেখে জোরে ডাকলেন--লক্ষ্মী-ই-ই!

    সাদা সেমিজ ও সাদা থান পরা একজন আয়ামাসি এগিয়ে এল। দেখলাম মাসি খালিপায়ে।

    --শোনো, এর বাড়ি থেকে কেউ আসেনি। ওদিকের পাড়ার কোনো বাচ্চা আছে? একটু বড়মত?

    --আছে, ক্লাস ফোরের কাবেরী সান্যাল। কিন্তু হে ত নিজে নিজেই বাড়ি যায়। এক্ষণই রওনা দিব।

    -- বাজে বোকো না। তুমি আর কাবেরী একসঙ্গে একে নিয়ে যাও। প্রথম দিন তো। বাড়িতে পৌঁছিয়ে তবে এসো।

    চশমাচোখে হাসিখুশি ফুটফুটে এক দিদি আমার হাত ধরে। আর ব্যাজার মুখে আয়ামাসি। সাবধানে রাস্তা পেরনো হয়। বাড়ির একটু কাছে আসতেই লক্ষ্মীমাসি বলে--কাবেরী, অরে তুমি সাবধানে বাড়ি অব্দি ছাইড়্যা আইসো। আমার একটু তাড়াতাড়ি আছে।

    তারপর চটপট রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে চলে যায়।

    আমি হাঁফ ছাড়ি।

    কাবেরীদি আমাকে হাসিমুখে গল্প শোনাতে শোনাতে বাড়ির দরজায় নিয়ে আসলে বলি-- এই তো দোতলায়। এবার আমি নিজেই পারব। তুমি যাও।

    তারপর এক ঝটকায় ওর হাত ছাড়িয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকি।

    একটু পরে আমার বাঙাল পরিবার বাচ্চাছেলেকে আরেকটি বাচ্চামেয়ের দায়িত্বে ঘরে পাঠানোর অপরাধে স্কুলে গিয়ে ঝগড়া করবার জন্যে কোমর বাঁধে।

    সে উৎসাহে একঘটি জল ঢেলে দিয়ে আমি বলে উঠি-- যদি তুমরা কেউ স্কুলে গিয়া আমারে লইয়া কাইজ্যা কর, তবে আমি কাইল থেইক্যা স্কুলে যাইতাম না।

    শ্বেতপতাকা পতপত করে ওড়ে। পিকাসোর পায়রা অলিন্দে বকবকম করে।

    || ৩ ||

    ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে মা ডেকে তুলেছে। ঘড়ি বলছে শীতের ভোর পাঁচটা। কিন্তু বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় বৃষ্টি নামল। অকালবর্ষণ। হু-হু হাওয়ার ঠেলায় মুখ দিয়ে হি-হি বেরোচ্ছে। মা পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে সাদা জামাপ্যান্ট পরিয়ে পুজোর বাসি প্রসাদী ফুল মাথায় ঠেকিয়ে দিল। এবার স্কুল যেতে হবে। এমনসময় কড়কড় করে বাজ পড়ল।

    দাদুর মুখ ব্যাজার।

    --এই রকম দিনে কি না গেলেই নয়? ঠাডা পরতাছে যে!

    ঘোমটার ভেতর থেকে মার নরম কিন্তু দৃঢ় কন্ঠস্বর।

    --- বার্ষিক পরীক্ষা যে, বাবা! না গেলেই নয়। রাম রিকশা ডাইক্যা আনতাছে।

    আমি বুকপকেটে রাখা অ্যাডমিট কার্ডটাকে একবার বের করে ভয়ে ভয়ে আবার যথাস্থানে চালান করি। একটুকরো সাদা কার্ডবোর্ডের টুকরো, তাতে পেন দিয়ে আমার নাম ও রোল নম্বর লেখা। অমন একটি নিরীহ চিট যে কী পরিমাণ আতংকের উৎস হতে পারে বোঝা মুশকিল। তখন বুঝিনি যে সেই একটুকরো কাগজ কখনো প্রেমপত্র, কখনো মেমো, কখনো শোকজ বা চার্জশিট হয়ে আমাকে আজীবন তাড়া করে বেড়াবে।

    পরীক্ষার পরে একদিন শতদল মাসিমা হাতে ধরিয়ে দিলেন হলুদ রঙা এক কার্ড। সেটা পড়ে বাড়িতে কাকাপিসির দল আহ্লাদে ডগোমগো। আমি নাকি "বেবি বা ইনফ্যান্ট" কেলাসে সেকন্ড হইয়া বংশের মুখ উজ্বল করিয়াছি।

    দাদুর গর্বিত ঘোষণা -- আমি আগেই কইসিলাম, এ ছেলে---!

    এখন বুঝি আমি নিশ্চয়ই মুখে প্রথম বুলি ফুটলে বাবা-মা না বলে গুংগা বলে চেঁচিয়েছিলাম।

    হাতে এল কার্সিভ রাইটিং অভ্যাসের বই! পাঁচবছুরের জন্যে কী কঠিন! এর ফলে আজও কোন কিছু লিখতে গায়ে জ্বর আসে। কিন্তু ছোটকা এনে দিল ন্যাশনাল বুক এজেন্সির বই "পাতাবাহার"। কী বই! কভার এঁকেছেন সত্যজিৎ রায়। ইলাস্ট্রেশন -- পূর্ণেন্দু পত্রী, খালেদ চৌধুরী। গল্প লিখেছেন লীলা মজুমদার, সমরেশ বসু, মানিক বন্দ্যো, সৌরীন্দ্রমোহন, চিন্মোহন সেহানবীশ, ননী ভৌমিক।

    প্রবন্ধ রয়েছে "বেদে আছে", "মানুষ! মানুষ!" ও হরপ্পা মহেঞ্জোদারো নিয়ে।

    (এর পরবর্তী সংস্করণ বেরোল দুবছর আগে বইমেলায়, প্রায় ৫৮ বছর পরে!!)

    তা আমি একটা উডপেন্সিল নিয়ে বইয়ে আঁকা মহেঞ্জোদারো হরপ্পার পাশে গোদা গোদা করে লিখলাম 'এমেরিকা'! সেটা দেখে দাদু আমার জন্মগত মেধার বিষয়ে সন্দিহান হলেন।

    পরের বছর বাবা ইন্ডিয়ান আর্মির থেকে বেরিয়ে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের হাজারীবাগ জেলায় গোমোর কাছে বোকারো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে যোগ দিয়ে লেবার ইউনিয়নের সেক্রেটারি হয়ে আমাদের ছোট্ট পাহাড়ের কোলে মহুয়া-পলাশের জঙ্গলে নতুন গড়ে ওঠা টাউনে নিয়ে গেলেন। সেখানে ছাতা খুললে লাফিয়ে পড়ত কেউটের বাচ্চা। রাত্তিরে শোয়ার সময় কানে আসত হায়েনার হাসি। আর বসন্তের দিনে পলাশে পলাশে আকাশে আগুন ধরিয়ে দিত।

    পাহাড়ের ধাপ কেটে কেটে তৈরি লেবার কলোনি। দু'কামরার ঘরে অ্যাসবেস্টসের ছাদ। ঘরের সামনে একফালি মাঠ পেরোলেই সামনে একটি ডোবা; কিন্তু পাঁচবছুরে বাচ্চার চোখে মস্ত বড় পুকুর, আর তার পাড় ঘেঁষে উঠে গেছে খাড়া পাহাড়।

    কিন্তু ওখানে স্কুল নেই।

    শিশুবিদ্যাপীঠ ছেড়ে ঘরে বসে একবছর সহজ পাঠ, ধারাপাত --কড়াকিয়া, গন্ডাকিয়া, শতকিয়া আর আর্যা মুখস্থ করতে হল।

    "কাঠায় কাঠায় ধূল পরিমাণ,
    বিশগন্ডা হয় কাঠার সমান"।
    ইংরেজির জন্যে ওয়ার্ড বুক পড়াতো মা।
    "ব্রিন্জল বার্তাকু, কুকুম্বার শসা,
    পামকিন লাউকুমড়ো প্লোম্যান চাষা"।
    বাকি সময় সকাল সন্ধ্যে খেলে বেড়ানো। বন্ধু জুটল -- বাঙালি, বিহারি, তেলেগু, পাঞ্জাবী সবরকম।

    কিন্তু এই সুখ বেশিদিন সইল না। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পিতৃদেব পাড়ি দিলেন পারস্য উপসাগরের কোলে বাহরিন বলে একটি ছোট দ্বীপে, দেশটি তখন কোন শেখের অধীনে। চাকরি বাগিয়েছিলেন মার্কিন তেলের কোম্পানি ক্যালটেক্সে। আমরা স্বর্গচ্যুত হয়ে আবার কোলকাতায় --সেই পার্কসার্কাসের ঠেসাঠেসি ঘেঁষাঘেষি সংযুক্ত পরিবারের ভাড়াবাড়িতে।

    || ৪ ||

    আবার শিশু বিদ্যাপীঠ। বেকবাগানের মিঠাইয়ের দোকানের পাশ দিয়ে একটু এগিয়ে বাঁয়ে মুড়লে কর্নেল বিশ্বাস রোড। পাঁচ-ছটা বাড়ি ছাড়াতেই রাস্তা মিশে গেল পারপেন্ডিকুলার তারক দত্ত রোডে। ব্যস্‌, ওইখানেই দাঁড়িয়ে ছিল মেটে রঙের দোতলা পাকাবাড়িটি। অধিকাংশ স্কুল বাড়ির মতই ইংরেজি ইউ অক্ষরের আকারে। সামনে ছোট্ট একটু বাগানের মত। একটি কুঁকড়ে বেঁকে যাওয়া বেঁটে টগর গাছ। তাতে সাদা ফুল ফোটে, একটি শিউলি গাছ তার সঙ্গী। এই জায়গাটায় প্রেয়ার হয়। বেশ সুরেলা গলায় কোন মেয়ে লিড করে। মর্নিংয়ে হৈমন্তী; ডে-সেশনে মানসীদি, ক্লাস টেনের।

    জোড় হাত, বোঁজা চোখ-- "তুমি আমাদের পিতা, তোমায় পিতা বলে যেন জানি; তোমায় নত হয়ে যেন মানি। তুমি কোর না, কোর না রোষ।"

    হ্যাঁ, মেয়েরা শুরু থেকেই পাঠ নিচ্ছে, নত হয়ে মানতে হবে, সারাজীবন।

    এই গানের সুরে একটা বিষণ্ণ বিপন্ন গন্ধ টের পাই। অন্যমনস্ক হয়ে যাই। কিন্তু মনটা বলে --পোষাবে না। চল, অন্য কোথাও যাই।

    আচ্ছা, প্রার্থনা গাওয়ার সময় মেয়েদের অমন সুন্দর দেখায় কেন?

    ইউ অক্ষরের শেষ বিন্দুতে আমার ক্লাস রুম--ক্লাস-টু। লম্বা বেঞ্চের মধ্যে টিনের ছোট ছোট দোয়াত পোঁতা। তাতে স্কুলের অফিস থেকে দপ্তরী শ্যামভাই এসে কালি ভরে দিয়ে যায়। আমরা বাড়ি থেকে নিব-কলম নিয়ে আসি। ঘরেও সুলেখা কোম্পানির তৈরি ছোট ছোট কালির বড়ি জলে গুলে কালি বানিয়ে লেখা অভ্যেস করি ও বড়দের ঝর্নাকলম জুল জুল করে দেখি। কোনটা ভাল কলম তা নিয়ে বাড়িতে বড়দের তুমুল তর্কবিতর্ক চলে--শেফার্স না পার্কার? আমরা শিশু সাহিত্য সংসদের "ছড়ার ছবি" সিরিজ থেকে কোরাসে পড়ি--

    ‘বেড়াল জাতির মাঝে সুবিশাল বাঘ যে,
    লালচে শরীরে তার কালো ডোরা দাগ যে।
    এশিয়ার সুগহন বিশাল অরণ্য,
    সেইখানে বাস করে অতিশয় বন্য।
    বিকট আওয়াজ তার হিংস্র মেজাজ যে,
    সাক্ষাৎ যম যেন পশুদের রাজ্যে।‘
    না, একবছর পরে ফিরে এসে আমার বছর নষ্ট হয় নি। মর্নিং সেকশনের হেডমিস্ট্রেস হাসি মাসিমা আমাকে পুরনো বন্ধুদের ব্যাচেই অ্যাডমিশন দিয়েছেন। ক্লাস-২, সেকশন-- বি। আমার ইংরেজ জমানার উকিল দাদু এই অবিচারে বিস্মিত, আহত ও ক্রুদ্ধ।

    -- বি -সেকশন ক্যারে? এ-সেকশনে না? তুই কি ক্লাসে পড়া কইর‍্যা ‌ যাস না?

    আমি হতভম্ব। ওঁর জমানার হিসেবে এ, বি, সি হল মেরিটের ভিত্তিতে গ্রেডেশন।

    উনি বললেন-- বৌমা, এত কম সময় পড়লে হইব না। ভাল কইর‍্যাত মুখস্থ করাও। জাইন্যা রাখ-- "আবৃত্তি সর্বশাস্ত্রাণাং মেধাদপি গরিয়সী"। মুখস্থ না করলে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট হয় না। যখন কইল্কাতায় রিপন কলেজে ল' পড়তাম, তখন সকালে হস্টেল থেইক্যা পায়ে হাঁইট্যা গঙ্গাস্নান করতে যাওয়ার সময় বন্ধুরা একে অন্যেরে সিভিল প্রসিডিওর কোডের সেকশনগুলা মুখস্থ শুনাইতাম।

    আগামী সপ্তাহে আমি অর স্কুলে গিয়া কথা কইয়াম। আমার নাতি বি-সেকশনে? হইতে পারে না।

    *******



    অলংকরণ (Artwork) : অলংকরণ: রাহুল মজুমদার
  • প্রচ্ছদ | পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ | পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০ | পর্ব ১১ | পর্ব ১২ | পর্ব ১৩ | পর্ব ১৪ | পর্ব ১৫ | পর্ব ১৬
  • এই লেখাটি পুরোনো ফরম্যাটে দেখুন
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)