• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৬ | এপ্রিল ২০২২ | উপন্যাস
    Share
  • পরীবাগান ও এক গল্পের মেয়ে (১০) : অঞ্জলি দাশ



    || ১৭ ||

    সারাদিন মেঘলা ছিল। এখনও আকাশে মেঘ। আজ সন্ধে বেলায় চাঁদ উঠবে না। ঘন অন্ধকারে পরীবাগানের ভেতর থেকে ফিসফিস শব্দে হাওয়া বইবে, সঙ্গে ভেসে বেড়াবে হয়তো বা কোনো বৃষ্টিদিনের স্মৃতিচারণ। এক গাছের পাতা থেকে গড়িয়ে অন্য গাছে, আরও অন্য গাছের শিরায় শিরায়, আকলে-বাকলে, শেকড়ে শেকড়ে, পরীবাগানের বুক জুড়ে মুখ বুঁজে পড়ে থাকা কথারা উড়ে বেড়াবে। কিন্তু তারা আর আমাকে বিচলিত করবে কি? গত কয়েকদিন তো করেনি।

    নিচ থেকে গান ভেসে আসছে 'শীতল পায়ে আসলে নিশি, তুই কেন রে হোস উদাসী, ওরে নীল আকাশে অমন করে ভেসে থাকে চাঁদ...।' রাঙাদিদা রেকর্ড বাজাচ্ছেন। প্রায়ই এই সময় গ্রামোফোন রেকর্ড বাজিয়ে গান শোনেন রাঙাদিদা। ওঁর ঘরে বহুকাল আগের একটা গ্রামোফোন আছে চোঙাওলা। ওটা আমার দাদুর। এখন বাড়িতে সব আধুনিক মিউজিক সিস্টেম এসেছে, একাধিক। ওটার প্রতি কারো কোনো আকর্ষণ নেই। কিন্তু রাঙাদিদার কাছে ওর অন্যরকম আদর। বিভিন্ন ব্যাপারে ওঁকে এবাড়ির সবাই কমবেশি প্রশ্রয় দেয়। মাঝে মাঝেই দেখি তোতা কোত্থেকে সব পুরোনো লংপ্লে রেকর্ড জোগাড় করে এনে উপহার দেয়। আগে মাঝে মাঝে বাজাতেন, এখন ওটা রাঙাদিদার আশ্রয়। আমাকে ওঁর জীবনের কেন্দ্রে বসিয়ে রেখে স্বপ্নযাপন করতেন, আমার জীবন হলেও ওটা যেন ভাঙা জীবনের ফাটল গলে আসা এক টুকরো আলো। সেটুকুও মেঘ এসে ঢেকে দিলো।

    সকালবেলায় বেরোনোর সময় বলেছিলেন, আকাশের অবস্থা দেখেছিস? না বেরোলেই নয়?

    —না। এই আকাশ মাথায় নিয়েই অনেকগুলো মানুষ আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে।

    এইসব পিছুডাক আর আমাকে খুব একটা বিচলিত করে না। উপেক্ষা করতে শিখে গেছি আগলে রাখা হাতগুলোকে।

    তখনও এমনি কালো মেঘ নিয়ে ভেঙে পড়েছিল আকাশ। শ্রাবণ মাসের সে বৃষ্টি সাতদিন থামেনি। রাস্তাঘাট সব নদী। চোখের সামনে নিশ্ছিদ্র জলের দেয়াল, বাইরে তাকালে একহাত দূরের মানুষকেও দেখা যায় না। আকাশের বুকের ভেতর এত জলও ছিল। সেই জলের আড়াল নিয়েই যেন সবকিছু পালটে গেল।

    সোমনাথ চাকরিতে জয়েন করার পর তখন বছর দু'য়েক কেটে গেছে। ওদের দিক থেকে কোনোরকম উচ্চবাচ্য হলো না। সুবিমলকাকু মারা গেলেন। তারও ন'দশ মাস পর আম্মা নিজেই জয়াকাকিমার কাছে কথাটা তুললেন।

    —সোমের চাকরি তো প্রায় দু'বছর হয়ে গেল, আর কতদিন ওদের দু’জনকে আলাদা করে রাখবো বলতো জয়া? রূপুরও তো পার্ট টু শেষ হলো।

    —আমাদের কাল-অশৌচটা মিটে যাক। ব্যাপারটা আমারও মাথায় আছে বড়মা। সোম বলেছে ওর বাবার বাৎসরিকীর সময় একটু লম্বা ছুটি নিয়ে আসবে। ওর নিজের নাকি কিছু জরুরি কাজও আছে। আমি ভেবে রেখেছি তোমার অসুবিধে না হলে এবারই চারহাত এক করে দেব। কারণ সোম বলছিল, এর পরে অনেকদিন আর ছুটি পাবে না। অফিসের কাজে ওকে দেশের বাইরে যেতে হবে একবছরের জন্যে।

    —সুবিমলের বাৎসরিকী তো সেই শ্রাবণের শেষে। তারপর তো সামনে ভাদ্রমাস, সেটা মাথায় রেখো।

    জয়াকাকিমার এই কথার ওপর নির্ভর করে আম্মা ভেতরে ভেতরে কিছুটা প্রস্তুতিও শুরু করে দিলেন। প্রায়ই দেখতাম মা আর ছোট কাকিমা মিলে কখনও গয়নার দোকানে ছুটছেন কখনও শাড়ির লিস্ট বানাচ্ছেন। মেজকা আর তোতা মিলে মেনু ঠিক করছে।

    জয়াকাকিমা কী আর কতখানি মাথায় রেখেছিলেন বোঝা গেল না। সোমনাথ মাত্র পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি এলো। প্রথমে সুবিমলকাকুর বাৎসরিকী, তারপর সুমিত্রাদির ছোটছেলের অন্নপ্রাশন। তার ওপর সোমনাথের নিজের জরুরি কাজ, এসব নিয়েই ও এত ব্যস্ত হয়ে রইলো, যে বিয়ের প্রসঙ্গটা উঠলোই না। আম্মাই বা গায়ে পড়ে পড়ে কতবার বলবেন? আর বলবেনই বা কেন, দায়টা দু'পক্ষেরই থাকা বাঞ্ছনীয়। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, হাতে তখন আর মাত্র পাঁচ দিন, তার পরই সোমনাথের ছুটি শেষ। আমি দিনের হিসেব করছি। সোমনাথ এতই ব্যস্ত যে ওর মুখই দেখতে পাচ্ছি না। অপেক্ষা করে থাকছি, ও আমাকে আলাদা করে একটু কথা বলার জন্যে একবার অন্তত ডাকবে। আম্মার মুখে প্রতিদিন একটু করে ছায়া ঘনিয়ে আসছে। বানভাসি এক একটা মুহূর্ত তখন প্রবল জলোচ্ছ্বাস হয়ে আছড়ে পড়ছে আমার বুকের ভেতর।

    কথাচ্ছলে আমি রাঙাদিদাকে বললাম, শ্রাবণ যাক না চলে, তোমরা ভাদ্র মাস নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছো কেন? ভাদ্র মাসে কি আর নিজের জনের কাছে ফেরে না মানুষ, না কি ভাদ্র মাসে ভালোবাসা বারণ?

    রাঙাদিদা মারফত সেকথা পৌঁছে গেল অন্যদের কাছে। মেজ কাকিমা বললেন, শেষ পর্যন্ত ভাদ্র মাসে! মা চোখের পাতা ভিজিয়ে বললেন, ভাদ্র মাসে মানুষ বেড়ালটাকেও বাড়ির বার করে না।

    আরও অনেকের অনেক কথা, আক্ষেপ সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মাকে নিয়ে সোমনাথ ফিরে গেল ব্যাঙ্গালোরে। অজস্র প্রশ্ন আর বিস্ময়কে আত্মস্থ করে ঘন সবুজ অন্ধকারে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো পরীবাগান।

    সোমনাথ আমার সঙ্গে একবার দেখা করতে পর্যন্ত এলো না। তারপর টানা সাতদিনের বৃষ্টিই যেন শেষকথা বলে দিয়ে গেল। পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন অবিশ্বাস্য লাগছিল। চলে যাওয়ার দিন এক হাঁটু জল ভেঙে শুধু জয়াকাকিমা এলেন দেখা করতে। আম্মাকে প্রণাম করলেন। আমি আড়াল থেকে লক্ষ্য করলাম, ওঁর চোখে জল ছিল।

    —বড়মা, সবই তো তোমার হাতে রইলো।

    —সব মানে, পরীবাগানের কথা বলছো? সে আর আমার হাতে কোথায় জয়া। পরীবাগান তো আমি তোমাদেরই আবার ফিরিয়ে দিয়েছি রূপুর হাত দিয়ে। রূপুর কাছে থাকা মানে তো তোমাদের থাকা।

    আম্মা খুব আহ্লাদের সঙ্গে বললেন বটে, কিন্তু কথাটা জয়াকাকিমা গায়ে মাখলেন না। শুধু নিঃশব্দে ওদের বাড়ির চাবিটা বাড়িয়ে দিলেন আম্মার দিকে। আম্মার উৎকন্ঠা আমি টের পাচ্ছিলাম আড়াল থেকে, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না। এটা তাঁর অভিমান না অহঙ্কার আমি জানি না। শুধু আরও গম্ভীর মুখে বললেন,
    —তুমি শুধু এই কথা ক’টা বলতেই এসেছো? তোমার বাড়ির চাবিই বা তুমি আমাকে দিচ্ছো কেন জয়া?

    —সোম দিতে বললো তোমাকে।

    চাবিটা আম্মার বিছানার ওপর পড়ে রইলো। জয়াকাকিমা আমাকে ডাকলেন। কাছে যেতে জড়িয়ে আদর করলেন। সেই আদরে উষ্ণতা ছিল, কোনো আশ্বাস ছিল না। বুঁজে আসা গলায় শুধু বললেন, ভাগ্যে থাকলে দেখা হবে তোর সঙ্গে।

    কার ভাগ্যের কথা বললেন জানি না। ওঁর ভাগ্য তো উনি নিজে লিখে নিতে জানতেন না, সে ক্ষমতা ছিল না। ওঁর ভাগ্যের এই অংশটুকু হয়তো লিখে দিয়েছিল সোমনাথ।

    এখান থেকে যাওয়ার একমাস পরই এক বছরের জন্যে নিউজার্সি চলে গেল সোমনাথ। অতদূরে পৌঁছোয় না আমার কথা। ক্রমেই দূর থেকে আরো দূরে সরে যেতে থাকে ও। জয়াকাকিমা কখনো-সখনো চিঠি লেখেন আম্মাকে। সোমনাথ যে ওঁর কোনো কথাকেই গুরুত্ব দেয় না, সে কথা বলতে ভোলেন না। জানাতে ভোলেন না যে, সোমনাথ বলেছে ওর এখন বিয়ের কথা ভাবার সময় বা মন কোনোটাই নেই। ওর সামনে এখন একটা জীবনপণ যুদ্ধ। যা ওকে জিততেই হবে, যেকোনো মূল্যে। তখন বুঝিনি কী সেই যুদ্ধ, কার সঙ্গে সেই যুদ্ধ। আজ বুঝি।

    আজ বুঝি, আমাদের সম্পর্কটাকে সোমনাথ ওর ভাবনা থেকে খুব সন্তর্পণে একটু একটু করে সরিয়ে রাখছিল সেইদিন থেকে, যেদিন কাগজে কলমে পরীবাগান আমার হলো। সোমনাথ হয়তো ভেবেছিল আম্মা আবার ওকেই ফিরিয়ে দেবেন পরীবাগান। কিন্তু এইখানে রমলা গুহ একটু অন্য খেলা খেলেছিলেন। অধিকারের রাশটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন আমার হাতে। কিন্তু আমি তো এটা চাইনি। এই কাগজের অধিকারে তো কোনোদিন আমার কোনো আগ্রহ ছিল না, প্রয়োজনও ছিল না। আমি তো জানতাম পরীবাগানের প্রত্যেকটা গাছের পাতায় অন্য একটা নামের সঙ্গে আমার নাম লেখা আছে। কাগজে লেখা থাকলেও পরীবাগান আমার, না থাকলেও ওটা আমারই রাজ্যপাট। ওখানকার প্রত্যেকটা গাছ আমার ভাষা বোঝে, আমার সবটুকু গোপন খবর জানে।


    || ১৮ ||

    সোমনাথরা চলে যাওয়ার পর এক মাস কেটে গেল। বিয়ে সংক্রান্ত উৎসাহের সেই তীব্রতা তখন একটা বিস্ফোরক ক্ষোভ আর অপমানের চেহারা নিয়েছে সবার মনে। তবু পুজোর পরে গলায় কাঁটা-ফোটা মুখ করে মেজকা আম্মাকে বললেন, ওরা তো আর নিজে থেকে কোনো যোগাযোগ করলো না, আমি একবার চিঠি লিখে দেখবো সোমনাথ কি চায়?

    যদিও আমাদের বাড়িতে অনেক আগে থেকেই টেলিফোন ছিল, কিন্তু চিঠিটাই তখনও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। মেজকার প্রস্তাবে রাঙাদিদার ষোলো আনা সায়, মায়ের বিষণ্ণ মুখ কিছুটা উজ্জ্বল। কাকিমাদেরও উৎসাহ। আম্মা শুধু বিরক্তির সুরে বললেন,
    —না। যোগাযোগ যখন করেনি, বুঝতে হবে যোগাযোগ করতে চায় না, এ ব্যাপারে আর কিছু বলতে চায় না। আশ্চর্য! ব্যাপারটা তোদের আত্মসম্মানে লাগেনি? গরজটা ওদেরও কিছু কম থাকার কথা নয়। অন্য সব কিছু ছেড়েই দিলাম। কিন্তু বাস্তুভিটে মানুষের শেষ ভরসার জায়গা, এটা নিশ্চয় ওরাও বোঝে।

    ওদের বাস্তুর চাবি তখন অনেক লড়াই করে জীবনযুদ্ধ জিতে আসা রমলা গুহর আঁচলে।

    —ওরা কী বোঝে, না বোঝে, সেটার চেয়ে বড় কথা রূপুকে কী বলে বোঝাবে মা? ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি না আমি। কী চেহারা হয়েছে লক্ষ্য করেছো? হাসে না, কথা বলে না।

    মেজকার শেষ চেষ্টাকে উড়িয়ে দিলেন আম্মা।

    —কিচ্ছু বোঝাতে হবে না, রূপু নিজেই বুঝবে। আচ্ছা দীপু, তোর কেন একবারও মনে হচ্ছে না যে এই অবহেলা কোনোমতেই রূপুর প্রাপ্য হতে পারে না।

    —আমি মনে করি আমাদের মনে হওয়াটাই শেষ কথা নয় মা, রূপু কী চায় সেটা একবার জানতে চাইবে না? কোনো কিছুই তো আর লুকোনো নয়। সোমনাথকে ছাড়া নিজের জীবন নিয়ে যে মানুষ কোনোদিনই কিছু ভাবেনি, এখন অন্যভাবে কিছু ভাবা ওর পক্ষে কতটা কঠিন, সে তো তুমিও বোঝো।

    মেজকার কথা ভিজে ওঠে। আম্মা চুপ করে থাকেন। সামান্য আবেগেই চোখে জল এসে যায় মেজকার। ছোটবেলায় দেখেছি তোতার চেয়ে আমার প্রতিই মেজকার মনোযোগ ছিল বেশি। বাবার স্নেহ এত বেশি অন্তঃসলিলা যে আমি সবসময় বুঝতে পারতাম না, কিন্তু মেজকার আদর আর প্রশ্রয় আমার একটা জোরের জায়গা ছিল। আমার যাবতীয় আব্দার আর আহ্লাদিপনা ছিল মেজকার কাছে, যখন তখন। আমি কখনও কিছু পাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছি আর মেজকা সেটা পূরণ করেননি, এমন ঘটনা কখনো ঘটেছে বলে মনে পড়ে না। এটা নিয়ে বাড়িতে একটা ঠাট্টা প্রচলিত ছিল—রূপু যদি মুখ দিয়ে বার করে ‘বাঘের দুধ চাই আমার’, ওর মেজকা তাও এনে হাজির করবে।

    এই প্রথম আমার জীবনের একটা চাওয়া মেজকার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হলো না। আর এই প্রথম এই প্রসঙ্গ নিয়ে বাড়িতে এত সোচ্চার কথাবার্তা হলো। এতদিন ব্যাপারটা লুকোনো ক্ষতের মতো সন্তর্পণে ঢেকে রাখতো সবাই।

    বাতাসে তখনও উৎসবের আমেজ। রাঙাদিদা রোজ সকালে পিতলের সাজি ভরে শিউলি ফুল কুড়িয়ে নিয়ে ঠাকুরঘরে যাওয়ার সময় একমুঠো আমার টেবিলে রেখে যান। সারাদিন সেই গন্ধে ভরে থাকে আমার ঘর। সারাটা শৈশব কৈশোর আমি ফুল কুড়িয়ে এনে দিতাম রাঙাদিদাকে। শিউলিতলায় আর যাওয়া হয় না। ভোর বেলায় আর উঠতেই ইচ্ছে করে না। জেগে শুয়ে থাকি। আমার স্বপ্নের ময়ূরপঙ্খী তখনও এক অদ্ভুত দোলাচলে ডুবসাঁতার কাটছে। তাকে ঘিরে ওইসময় প্রতিদিন একটা প্রত্যাশার অঙ্কুরোদ্গম হয়—হয়তো চিঠি আসবে, হয়তো কোনো খবর। সারাদিন অপেক্ষার পর দিনের শেষে আবার তা মিলিয়ে যায়। গলার কাছে দলা পাকানো একটা কান্না গিলে ফেলি। দিনভর অন্যমনস্ক হয়ে থাকি। মাঝে মাঝে ভাবি আমি কি একটা চিঠি লিখবো সোমনাথকে? ওর কাছে আমার আবার কিসের অহঙ্কার? লেখা হয় না। প্রবল ইচ্ছেকে ঢেকে দেয় অভিমান আর ভয়। পাছে আম্মা জানতে পারেন, সেই ভয়।

    কোনো কোনো দিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে জানালায় গিয়ে দাঁড়াই, সতেরো নম্বর বাড়ি থেকে কি কোনো আলোর রেখা এসে পড়েছে পরীবাগানের ওপর? কেউ কি ফিরে এসেছে? নিজের বোকামিতে নিজেই হতাশ হয়ে ফিরে আসি বিছানায়। বুকের ভেতর কেটে বসে থাকা শূন্যতা পরমুহূর্তে আমাকে স্বপ্নভঙ্গের হাহাকার দিয়ে নিংড়ে নিতে থাকে। কখনও মনে হয় ঘন অন্ধকারে ডুবে থাকতে থাকতে কখন যেন মিলিয়ে গেছে বাড়িটা। ওটা যেন হাওয়ায় তৈরি ছিল। ও বাড়ির মানুষগুলো যেন সব কাল্পনিক, বহুকাল আগে পড়া গল্পের চরিত্র সব।

    কখনও চুপচাপ শুয়ে টুকরো টুকরো ছবিকে জুড়ে একটা পূর্ণ পটচিত্র বানিয়ে নিয়ে আমার মতো করে তাকে বিশ্বাসযোগ্যতার নিরিখে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করি। কখনও বা দোতলার উত্তর দিকের বারান্দায় বসে একা একা কথা বুনি। সামনে সার সার দাঁড়িয়ে থাকে পরীবাগানের শিরিষ অর্জুন অশোক বকুল জাম জামরুল আমার আরো আরো সব আত্মজন। ওরাও কিছু বলে, আমি বুঝতে পারি। ওদের ডালে ডালে পাতায় পাতায় জড়িয়ে থাকা পুরোনো কথাগুলো ওরা উলটো হাওয়ার খামে ভরে পাঠিয়ে দেয় আমার কাছে। উত্তর-পশ্চিম কোণের বেতঝোপের বুকের ভেতর আকুল হয়ে বাতাস বয়, বেতসলতার ডগা নুয়ে পড়ে মাটিতে, মন কেমন করে। অমনি করে লুটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে, পারি না। কষ্ট হয়। আকাশ কালো করে ঘনিয়ে আসা জলভরা মেঘ যেমন দমকা হাওয়ায় উধাও হয়ে যায়, তেমনি করে গভীর দীর্ঘশ্বাস দিয়ে উড়িয়ে দিই কান্নার দমককে।

    ছোটবেলায় কেউ একটুখানি বকুনি দিলেই যখন কেঁদে ভাসাতাম, আম্মা আদর করে কাছে নিয়ে বলতেন, যখন তখন এত চোখের জল ফেললে সব জল ফুরিয়ে যাবে যে।

    আম্মার মুখের দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে অসহায়ভাবে বলতাম – কী করবো, আমার যে কষ্ট হচ্ছে।

    আম্মা আরো বেশি আদর করে বলতেন – এটাতো ছোট কষ্ট। এখনই এত জল খরচ করে ফেললে, বড় কষ্টের সময় যখন আরো বেশি কান্না পাবে, তখন চাইলেও চোখের জল পাওয়া যাবে না। কষ্ট হলে, সেকথা গাছের কাছে গিয়ে বলে আসবে।

    আম্মার মুখ থেকে বেরনো যেকোনো কথাকেই ধ্রুব সত্য বলে মনে হতো তখন। চেষ্টা করতাম চোখের জল না ফেলতে। আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। চোখের জলকে জমিয়ে রাখার জন্যে আম্মার কথামতো একটা উপায় বার করে নিয়েছিলাম। তখন আম্মা তিনতলার এই ঘরে থাকতেন, এখন আমি যেখানে থাকি। কান্না পেলে দৌড়ে চলে আসতাম এই ঘরের লাগোয়া ছোট্ট ঝুলবারান্দাটায়, যেখান থেকে পরীবাগানের প্রায় পুরোটা দেখা যায়। একে একে সব গাছের নাম ধরে ডেকে ফিস ফিস করে নিজের কষ্টের কথা বলতাম। মুখস্থ ছিল কোন গাছের পর কোন গাছটা দাঁড়িয়ে, কার আড়ালে কে ঢাকা পড়ে আছে। মনে হতো আমি যখন একে একে গাছের নাম বলতাম, আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো গাছ উঁকি মেরে বলতো, এইযে আমি এখানে। মনে হতো স্কুলে রোল-কলের মতো করে ওরা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। মজা লাগতো। এটা আমার একটা নিভৃতের খেলা হয়ে উঠেছিল। তখন থেকে ওদের প্রাণ আমার প্রাণের তারের সঙ্গে বাঁধা। তখন থেকেই ওদের সঙ্গে আমার নিভৃতের আলাপ, বিলাপ। ওরা আমার আনন্দের উৎস, ওরাই আমার চোখের জলের বাঁধ। তো সেই চোখের জল এখন জমে বরফ হয়ে গেছে, এখন বড় কষ্টেও আর সহজে চোখে জল আসে না। কিংবা বরফ গলতে যে উষ্ণতার দরকার, আমার জীবন থেকে সেই উষ্ণতাটাই উধাও হয়ে গেছে।

    সেদিন আমার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মেজকা আর আম্মার কথাবার্তা শুনে মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত বিরক্তিসূচক শব্দ করলেন রাঙাদিদা, তারপর কাছে এলেন। ঠান্ডা হাতটা আমার চোখের ওপর রাখলেন। মনে হলো হাতের পাতায় তখনও শিশির লেগে আছে। আমার চোখ খুলতে ইচ্ছে করছিল না। কেননা ওইসব কথাবার্তায় কোথায় যেন মিশে আছে আমার অসম্মান, আমার হেরে যাওয়া। আমি জানি আম্মা সেটা বোঝেন। এই আলোচনাটা তাই কখনও বাড়তে দেন না। অন্যরা অতশত তলিয়ে ভাবে না বলেই মাঝে মাঝেই প্রসঙ্গটা ওঠে। নিজেদের কী করণীয় সেটা কেউ স্থির করে উঠতে পারে না। বাড়ির আবহে কিছু ক্ষোভ, কিছু হতাশা ছড়িয়ে আবার প্রসঙ্গটা চাপা পড়ে যায়।

    —ওঠ এখন। জলখাবার খেয়ে নিয়ে তোর আম্মার ঘরে একবার যাস, তোর খোঁজ করছিল।

    টেবিলে একটা কাঠের রেকাবিতে একমুঠো শিউলি ফুল রেখে আর একটিও কথা না বলে বেরিয়ে গেলেন রাঙাদিদা।

    আম্মার কথার পিঠে কথা বলার মতো মনের জোর বা যুক্তির দৃঢ়তা তাঁর ছেলেদের কারো নেই। সোমনাথদের ব্যাপারে আম্মার কথা সবাই নিঃশব্দে মেনে নিল। শুধু একটা ইচ্ছেপত্রে মুখ গুঁজে পড়ে রইলো আমার অসহায় অভিমান। সে অভিমানটা যে কার ওপর, আম্মা না কি সোমনাথ, তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

    মাঝে মাঝে মনে হয় আসল টানাপোড়েনটা ছিল আম্মা আর সোমনাথের মধ্যে। একটা নিরুচ্চার যুদ্ধ। আমি শুধু একটা উপলক্ষ্য, একটা দানের পুতুলমাত্র। আমাকে জড়িয়ে থাকা দু’পক্ষের ভালোবাসা কখন যে ধীরে ধীরে একটা খেলার ছকে রূপান্তরিত হয়েছে, আমি টের পাইনি। শুধু চোখ বুঁজে বাতাসে স্বপ্ন বপন করে গেছি। ওই ইচ্ছেপত্রটাকে ঘিরেই আসলে দানা বেঁধে উঠেছিল একটা আশ্চর্য সমীকরণ। আম্মার তৈরি করা ইচ্ছেপত্র—‘আমার অবর্তমানে সতেরো নম্বর গগনবাবু লেনের বাস্তুসংলগ্ন পরীবাগানের উত্তরাধিকার আমার পৌত্রী শ্রীমতী রূপাঞ্জনা গুহকে ...’ আমার প্রতি আম্মার এই বাড়তি আনুকূল্যই যে শেষপর্যন্ত আমার বিপরীতে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসবে, আম্মাও হয়তো সেটা ভাবতে পারেননি।

    আম্মা কি ভেবেছিলেন আর্থিক দুর্বলতার ফাঁকফোকরে সোনার শেকল গলিয়ে বেঁধে ফেলেছেন ওদের? বন্ধন আর বন্দীত্ব যে এক নয়, গভীর বোধবুদ্ধিসম্পন্ন রমলা গুহর একবারও সেটা মনে হয়নি। নিজের বুদ্ধি আর ক্ষমতার প্রতি আম্মার আস্থা বাড়তে বাড়তে এতটাই উঁচু হয়ে গিয়েছিল যে, পরীবাগানের গাছের পাতারাও যে প্রতিদিনের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রঙ পালটাচ্ছে, পুরোনো পাতা ঝরে গিয়ে তার জায়গায় নতুন পাতা গজাচ্ছে, প্রতিদিন যে আরো নতুন নতুন বীজের অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে সেখানে, সেদিকে তাঁর চোখই পড়েনি। দুই পরিবারের দেওয়া-নেওয়ার প্রতিটি হিসেবের মাঝখানে সোমনাথও যে বদলে যাচ্ছে একটু একটু করে, সেটাও খেয়াল করেননি। কৈশোরের সরলতা মুছে গিয়ে ওর মধ্যে যে যৌবনের অহঙ্কার, আত্মসম্মানবোধ, আর কিছুটা ঔদ্ধত্যও মাথাচাড়া দিচ্ছে, সেটা বুঝতেই পারেননি।

    ওদের নিজেদেরও যে কিছু ভাবনা, কিছু হিসেবনিকেশ থাকতে পারে, এই ব্যাপারটাকে আম্মা গুরুত্বই দেননি। ভেবেছিলেন হয়তো বরাবর নিজের পরিবারে যেমনটা হয়ে এসেছে, সেভাবেই ওঁর ইচ্ছেই সব কিছুকে চালিত করবে। কিন্তু সোমনাথ যে সুবিমলকাকু নয়, সেটা তো যত দিন যাচ্ছিল, আমি একটু একটু করে টের পাচ্ছিলাম। পাচ্ছিলাম, কিন্তু ব্যাপারটাকে আমি গায়ে মাখিনি। কিছুটা আম্মার ওপর আমার অন্ধ আস্থা, আর কিছুটা আমার স্বপ্নের আচ্ছন্নতার কারণে। সোমনাথের প্রতি ভালোবাসা আমার বুকের ভেতর এমনভাবে শেকড় ছড়িয়েছিল, যে ওর আচরণের অনেক অসঙ্গতি সত্ত্বেও, আম্মার মতো আমারও বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল – আমি ছাড়া সোমনাথের আর কোনো গন্তব্য নেই। থাকা সম্ভব নয়। সোমনাথদের বাস্তুর সমস্ত দলিলপত্র তখন আম্মার আঁচলে।

    বাস্তু কী আমি জানি না। জানতে চেষ্টাও করিনি কখনও। বাস্তু মানে কি প্রাচুর্যে ভরা চকমেলানো দালানকোঠা আর তার রঙিন শার্সির অহঙ্কার চুঁয়ে চুঁয়ে নেমে আসা আলোছায়ার খেলা? না কি জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাওয়া তিন কামরার ছোট্ট ছিমছাম একতলা বাড়ি? ভোর বেলায়, কখনও বা কোনো রাতে যার বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে এস্রাজের আলাপ। যার পিঠ জুড়ে গাছগাছালির ঘরসংসার আর পাখিদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ?

    আমার শুধু মনে হয় বাস্তু আসলে একটা অবলম্বন, একটা ভরসার জায়গা। বাস্তু বলতে তাই আমি মাটি নয়, আম্মাকেই বুঝতাম। ছোটোবেলায় আম্মার কাছে এলে আমি মাটির গন্ধ পেতাম। সেই গন্ধ নিশিন্ত করতো, ভরসা জোগাতো। আর সেই গন্ধে সম্মোহিত হয়েই আমি বেড়ে উঠেছি। গড়ে উঠেছি আমি, আমার ব্যক্তিত্ব, আমার যাবতীয় মূল্যবোধ। শুধু অঙ্কের হিসেবটাতে বড্ড কাঁচা ছিলাম, যেটাতে আম্মা আবার ছিলেন অত্যন্ত পাকা। রীতিমতো যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ করে তাঁর জীবনটাকে, তাঁর সন্তানদের শূন্য থেকে পূর্ণতায় পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু সোমনাথ যে আরও বড় অঙ্ক জানে, আম্মাকে ডাহা ফেল করিয়ে দিয়ে সেকথা তো সে প্রমাণ করে দিল। আম্মার সবচেয়ে প্রিয় খেলনা পুতুলটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে জব্দ করে দিল রমলা গুহকে।



    অলংকরণ (Artwork) : রাহুল মজুমদার
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪ | পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭ | পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০ | পর্ব ১১
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)