• Parabaas
    Parabaas : পরবাস : বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি
  • পরবাস | সংখ্যা ৮৮ | অক্টোবর ২০২২ | রম্যরচনা
    Share
  • সে (৮) : সমরেন্দ্র নারায়ণ রায়
    | | | | | | | ৮ | | ১০


    আমাদের ওই রেলওয়ে শহরটি সে যুগে একটা হাওয়া বদলের জায়গা ছিলো। এখনকার মতো তিনদিনের ট্যুরিজম ডেস্টিনেশন হয়ে ওঠেনি। পশ্চিম বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান, বিহার আর উড়িষ্যার অনেক বাঙালীই গরমের, পুজোর আর বড়দিনের ছুটি কাটাতে আসতেন ওখানে।

    প্রচুর বাড়ী, বাংলো সেই জন্য বছরের অনেকটা সময় খালি পড়ে থাকতো। স্থানীয় বহু লোকজন, যারা চাষবাসে ব্যস্ত নয়, তারা চুপচাপ বসে থাকতো বা রেলে কন্ট্র্যাক্ট লেবারের কাজ খুঁজতো। মাঝিন কামিনরাও। আবার অনেকে খালি বাড়ী আর ফুল ফলের বাগানগুলো দেখাশুনো করতো, সামান্য কিছু মাইনেও পেতো। ওই কেয়ারটেকারদের বলা হতো মালী।

    রোজগারের এই টানাটানিটা তাই ঘুরে গিয়ে শহরের ছুটির সময়গুলোতে একটা যাকে বলে উইন-উইন অবস্থার সৃষ্টি করতো। বলছি।

    যেমন ধরুন আশ্বিনের গোড়ায় এক সকালে মোগলসরাই প্যাসেঞ্জারের রিজার্ভ বার্থে করে একটু লেটে সকাল সাড়ে ন'টায় দুটো টাঙ্গায় চেপে মধুপুরের "হালদার ম্যানর"এ এসে ঢুকেছেন ভবানীপুরের প্রোফেসর, গৃহিনী, মেয়ে আর ছেলে। আলো, পাখা, সেগুলোর সুইচ, জলের কল, চেন টানা বাথরুম এ সব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে জায়গাটার আবহাওয়ার দোষে সকলেরই পেয়ে গেছে প্রচণ্ড খিদে।

    এমন সময়ে বাগানে ফটকের কাছে বেড়ালের ডাক শুনে প্রোফেসরিণী চমকে উঠলেন। মা-মেয়েতে এগিয়ে গিয়ে বেড়াল-টেড়াল দেখতে পেলেন না। তার জায়গায় দণ্ডায়মতী দুজন ঘোমটাধারিণী। কৃশা। কৃষ্ণাঙ্গী। একজন একটু লম্বা। অন্যজন একটু বেঁটে। তারাই "মা" বলে ডেকেছিলো।

    পাণ্ডিত্যময় বাংলাতে কথাবার্তা শুরু হলো, একজনের ভাষা তো বেশ পরিষ্কার।

    - তুরা এই গাড়ীতে আসলি মা?
    - হ্যাঁ কেন কি হয়েছে?
    - ঝাড়ু শাড়ু কুথা? মালী কুথা?
    - খুকু দেখ তো কি সব হিন্দী ফিন্দী বলছে
    - ওরা ঝাড়ু চাইছে মা, মালীকেও খুঁজছে
    - খোট্টাটাকে ডেকে দে, আর একটু নজর রাখিস
    - মাইজী আমরা এ বাড়ীতে ডেঞ্চিবাবুদের কাজ করি রে। বেসী মাহিনা দিতে হবে না
    - অ। বুঝেছি। তা কোন জন করবি? কি করবি? কত নিবি?
    - তুরা চারগো লোগ তো? সঅব করবো। ঝাড়ু, পুঁছা, কাপড় ফিঁচা, বর্তন মলনা, জল তোলা, সাগ কোটা, পাকানা সঅব। আমাদের জল চলে তো
    - মা, খোকা বললো বাবা ডাকছে
    - কি হলো আবার?
    - আরে কলগেটটা হোল্ডলের ভেতর, স্ট্র্যাপটা খুলছে না
    - খোকাকে বলো। দুজন ঝি এসেছে, কথা বলছি
    - ওরা কিসসু পারবে না ওই তো ওদের চেহারা
    - তোমাকে আর ওদের চেহারা দেখতে হবে না তুমি এদিকটা দেখো
    - বাপস্!
    - এই শোন, কত নিস তোরা
    - সব চীজ বঢ়তী মা, চার চার আঠ রূপেয়া চাই।
    - কুয়োটা দেখছেন তো মা, দূর আছে, ওই লেবু গাছটার ধারে
    - ঝাড়ু মোছা দু বেলা হবে, বুঝলি তো? হ্যাঁ রে এদিকে একটু জলখাবার পাওয়া যাবে এখন?
    - আমি এনে দিচ্ছি মা, রামদীনের প্যাঁড়া পুরী হালুয়া খুব ভালো, আপনাদের কলকাতার মতো, এই তো সামনে। ও ভঁয়সা দুধও পাঠিয়ে দেয় কেউ চাইলে
    - এই নে টাকাটা নিয়ে যা। তাড়াতাড়ি আসবি। রাঁধতে পারিস তো? আজকে অবিশ্যি বাজার নেই
    - আপনারা মাছ খান তো মা? ওইটা শুধু পারি না
    - মা আপনাদের ধরণের ডাল তরকারী রুটি পরোটা লুচি সব করে দেবো। এ বাড়ীতে তো ভালো পাতা উনুন আছে, আপনারা কি ইস্টোভ এনেছেন? বোতল থাকলে দেবেন, কিরাসিন এনে দেবো

    এই যে মিউচুয়াল ইনটারভিউটি শুনলেন পাঠিকা, এর ফল হলো এই - পাতিয়া (লম্বা, ভাঙা বাংলা, মধুপুরের বাইরে কখনো যায়নি) আর মোতিয়া (বেঁটে, ভালো বাংলা, একবার কালীঘাট গিয়েছিলো) যে তিন চারটি বাড়িতে মাসিক দেড় বা দু টাকায় ঠিকে কাজ করতো সে বাড়িগুলোর কাজকর্ম মাসখানেকের জন্য মাথায় উঠলো।

    অনেক বাড়িতেই ওই এক কাহিনী। প্রত্যেক ছুটিতে। ফলে আমাদের শহরের বহু স্থায়ী বাসিন্দা গৃহিণীর অসন্তুষ্টি।

    পাঁচ পো' দিশী আলু ছ আনা থেকে সাত আনায় চড়লো। তেরোটা ডিমের ডজন চোদ্দ আনা হলো। স্থানীয় জনসাধারণ অনেকেই চটতে শুরু করলেন। নেহরু, আয়ুব, ক্রুশ্চেভ সাময়িক ভাবে রেহাই পেয়ে গেলেন। মোটামুটি আবার ঠিক হয়ে গেলো যে দুম করে সায়েবগুলোকে তাড়ানোটা একটু হঠকারিতা হয়ে গেছে।

    সামাজিক বিপ্লব, পারিবারিক বিদ্রোহ ও দুর্গাপুজোর বিগ্ৰহ, এই তিনে মিলে মাস দেড়েক দিব্যি কেটে গেলো।

    বকপঞ্চক। শহর অল্পবিস্তর স্তিমিত। তাতে কি? হৈ হৈ করে এগিয়ে এলো ধার্মিক বাঙালীর ঘোর ধর্মীয় অনুষ্ঠান - বড়দিন। একেবারে লেপ জড়িয়ে।

    অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করা গেলো যে পাঁটার মাংস যদিও আবার পাঁচ টাকায় চড়লো, বাড়ির কাজের লোকজন ঠিক এবার আর তেমন ডুব মারলো না। অন্ততঃ এ পাড়ায়। কি ব্যাপার?

    জানুয়ারির গোড়ার দিক। কিউলের কাছে মালগাড়ি বেলাইন, চতুর্দিকে সব কিছু লেট। সেভেন আপ থেকে টাটকা গ্ৰেট ইস্টার্ন পাঁউরুটি আর টাটকা অমৃতবাজার নেওয়ার জন্য দু'নম্বরে দাঁড়িয়ে রয়েছি সাইকেলে হেলান দিয়ে। ক'মিনিট আগে বাসী স্টেটসম্যান আর লিলি বিস্কুটের শেঠ কোম্পানীর টাটকা পাঁউরুটি নামিয়ে দিয়ে গেছে শেয়ালদা-বারাউনী। দূরে দেখতে পাচ্ছি আপ ইনকামিং আউটার, যেটা আমাদের বাড়ির গায়ে, সেটা এখনো সেভেন আপের জন্য পড়েনি।

    উল্টোদিকে তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম ডেঞ্চি চেঞ্জারে ভর্তি। সকালের ডাউন বেনারস, দুপুরের এইট ডাউন সব লেট। ছোট ছেলেপুলে, ফেরিওলা, বালতি, হোল্ডল, কুলি, চেঁচামেচি সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।

    তারই মধ্যে হঠাৎ দেখি চেনা একজন চেঞ্জারদের সঙ্গে দিব্যি কথাবার্তা বলছে, বকশিশ পেলে "গোড়"ও করে ফেলছে; মনে হলো যেন একটা এক টাকার নোটও দেখতে পেলাম। ভীড়ের ভেতরেই সে হারিয়েও গেলো।

    বেশ দেরীতে আপ তুফান ঢুকলো। পাঁউরুটি আর কাগজ নিয়ে অন্ধকারে বাড়ি এলাম।

    তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে কি দেখতে পেয়েছিলাম দিদাকে বললাম। দিদা শুনে বললেন - বেশ করেছে।

    - মানে?
    - আরে ও করেছিলো কি, ওদের জল চলে তো, ওদের পাড়ার সব ছেলেমেয়েদের নিয়ে গিয়ে চেঞ্জারদের বাড়ী বাড়ী কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলো। আবার রোজ গিয়ে খোঁজ নিতো সব ঠিক আছে কি না। আমার কাছ থেকে ৫০১ সাবানের টুকরো নিয়ে গিয়েছিলো।

    আমি অবাক! না, ভুল বললাম, একেবারে স্তম্ভিত!



    অলংকরণ (Artwork) : দীপঙ্কর ঘোষ
  • | | | | | | | ৮ | | ১০
  • মন্তব্য জমা দিন / Make a comment
  • (?)